বিষয়বস্তুতে চলুন

বাঙালি মুসলিম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বাঙালি মুসলমান থেকে পুনর্নির্দেশিত)
বাঙালি মুসলিম
বাংলাদেশের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায়রত বাঙালি মুসলিম পুরুষেরা
মোট জনসংখ্যা
২১কোটি (২০২২)[]
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল
 বাংলাদেশ১৬কোটি (২০২২ আনুমানিক)[]
 ভারত (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা)৪কোটি (২০২২ আনুমানিক)[][][][][]
 পাকিস্তান২২লক্ষ[][]
 সৌদি আরব২০লক্ষ (২০২১)[১০]
 সংযুক্ত আরব আমিরাত৭লক্ষ[১১]
 যুক্তরাজ্য৬লক্ষ[][১২][১৩]
 ওমান১.৫লক্ষ[১৪]
 কাতার৫.৫লক্ষ[১৫]
ভাষা
বাংলা
আরবি (ধর্মীয়)
ধর্ম
প্রধানত সুন্নি ইসলাম
এছাড়াও শিয়াআহমদিয়া সংখ্যালঘু
সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী
বাঙালি, বাংলাদেশি

বাঙালি মুসলিম বা বাঙালি মুসলমান হলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা জাতিগত, ভাষাগত ও বংশগতভাবে নিজেদের বাঙালি হিসেবে পরিচয় দেন। বিশ্বব্যাপী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ বাঙালি মুসলমান; মুসলমানদের মধ্যে তারা আরবদের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী।[১৬][১৭]

বাঙালি মুসলমানরা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। একই সঙ্গে তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাআসাম রাজ্যে বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।[১৮]

বাঙালি মুসলমানরা বাংলা ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন বা তার সঙ্গে পরিচিত। তাঁদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলমান এবং ইসলামী আইনের হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন।

বিস্তৃত বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল। তবে দিল্লি সালতানাত কর্তৃক বাংলা অঞ্চল বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এখানকার শাসকেরা স্বাধীন হয়ে বঙ্গ সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন, যা মধ্যযুগীয় ইসলামী পূর্বাঞ্চলের একটি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।[১৯] ইউরোপীয় বণিকেরা বঙ্গ সালতানাতকে বাণিজ্যের জন্য “সবচেয়ে ধনী দেশ” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।[২০]

বঙ্গের সুলতানরা বাংলা ভাষার বিকাশ এবং বাংলায় ইসলামী সাহিত্য রচনায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এর ফলে একটি স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। একই সময়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ বাংলায় আগমন করেন।

যদিও বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছিল, তবুও সপ্তদশ শতকের শুরুতে মুঘলদের বাংলা বিজয় এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার বনাঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণের প্রচেষ্টার পরই বাংলার বৃহৎ অংশে ইসলামী পরিচয় সুদৃঢ় হয়। মুঘল রাজস্ব নীতির ফলে মুসলমান অভিযাত্রীরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে উৎসাহিত হন। এই জনগোষ্ঠীর হিন্দুধর্মের সঙ্গে পূর্ব সম্পর্ক দুর্বল ছিল এবং তারা ধীরে ধীরে ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে লোকজ ধর্মীয় ধারণা ও চর্চার সমন্বয় ঘটায়। এর ফলেই মধ্য, উত্তর ও পূর্ব বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ ইসলামী পরিচয় গ্রহণ করে। আজকের অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান এই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর।[২১]

কৃষি সম্প্রসারণের ফলে বাংলায় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে এবং সুবাহ বাংলা বিশ্বের অন্যতম ধনী অঞ্চলে পরিণত হয়। বাংলার সুবাদার মুহাম্মদ আজম শাহ এক সময় মুঘল সম্রাটের সিংহাসনেও আরোহণ করেন। অষ্টাদশ শতকে বাংলার নবাবদের অধীনে মুঘল বাংলা ক্রমে আরও স্বায়ত্তশাসিত হয়ে ওঠে।

অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘলদের কাছ থেকে বাংলা দখল করার পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে। এর ফলে প্রধানত উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারদের একটি নতুন শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং মুসলমান কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো ধর্মীয় সংস্কারকরা নিম্নবর্গের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত অইসলামি লোকাচার পরিত্যাগের আহ্বান জানান এবং পরবর্তীতে জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন।

ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করে, যার মাধ্যমে মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়। যদিও ১৯১১ সালে এই বিভাজন বাতিল করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘অনাবাদি’ ভূমিকে চাষের আওতায় আনার ব্রিটিশ নীতির ফলে বহু বাঙালি মুসলমান কৃষক নিম্ন আসামআরাকান অঞ্চলে অভিবাসন করেন, যা পরবর্তীকালে মিয়ানমারের অংশ হয়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে জমির মালিকানা নিয়ে হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানদের অসন্তোষ তীব্র হয়। এর ফলস্বরূপ তাঁরা ব্যাপকভাবে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবিকে সমর্থন করেন এবং দেশভাগের সময় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তানের জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পরিচয়

[সম্পাদনা]

বাঙালি বলতে দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের জাতিগত ও ভাষাগত ঐতিহ্যসম্পন্ন সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের ভাষা ইন্দো-আর্য পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বাংলা ভাষা। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে ইসলাম বাংলায় আগমন করে এবং স্থানীয় বাঙালি সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে পারস্য, তুর্কি, আরবমুঘল বসতিস্থাপনকারীদের আগমনের ফলে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিকাশে আরও বৈচিত্র্য যুক্ত হয়।[২২]

মুঘল শাসনামলে কৃষি ও প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে, বিশেষ করে পূর্ব বাংলায়, মুসলমান জনসংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।[২২][২৩][২৪] বর্তমানে অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশে বসবাস করেন। এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গআসাম রাজ্যেও তাঁদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।[২৫]

বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলমান এবং তারা ইসলামী আইনের হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। এ ছাড়া শিয়াআহমদিয়া মুসলমানদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও রয়েছে। কিছু মানুষ নিজেদের নির্দলীয় (বা “শুধু মুসলমান”) হিসেবেও পরিচয় দেন।[২৬]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

প্রারম্ভিক যোগাযোগ

[সম্পাদনা]

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ থেকেই বাংলায় ধানচাষভিত্তিক সমাজের অস্তিত্ব ছিল। এ অঞ্চলটি একটি বৃহৎ কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি ছিল, যারা তুলনামূলকভাবে ধার্মিক ধর্ম দ্বারা সীমিত মাত্রায় প্রভাবিত ছিল।[২৭] খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে বৌদ্ধধর্ম এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে অপভ্রংশ, সংস্কৃতমাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। একসময় বাংলা ভাষা অসমীয়াওড়িয়ার সঙ্গে একই ইন্দো-আর্য শাখাভুক্ত ছিল; পরে ভাষাগুলি পৃথক স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে।[২৮]

ইসলামের আগমনের বহু পূর্বে বাংলা ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল।[২৯] কয়েক শতাব্দী ধরে অঞ্চলটি বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর ১১৭০-এর দশকে পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর হিন্দু সেন সাম্রাজ্য কর্তৃক বাংলা অধিকৃত হয়।[২৯] এই সময়টি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের যুগ ছিল। বৌদ্ধধর্মের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ব্রাহ্মণ্য বর্ণভিত্তিক ক্ষমতাকাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।[৩০][৩১]

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের পথে যায়। হিন্দু রাজ্যগুলো ধাপে ধাপে বৌদ্ধ অঞ্চলগুলো গ্রাস করে এবং তথাকথিত ‘বৌদ্ধবিমুক্তকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর আওতায় বহু বৌদ্ধ ব্যক্তিত্বকে হিন্দু অবতার হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং প্রতিরোধকারী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে সমাজের নিম্নবর্ণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেহেতু পাল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল উত্তর ও পূর্ব বাংলা, তাই এসব অঞ্চলে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল এবং সেন শাসনে তারা বিশেষভাবে দমনমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

ঐতিহাসিক প্রমাণে দেখা যায়, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে রেশম পথ ধরে যাতায়াতের সময় প্রাথমিক মুসলমান ব্যবসায়ী ও বণিকেরা বাংলায় আগমন করেন।[৩২] দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি বর্তমানে উত্তর বাংলাদেশের একটি স্থানে খননাধীন রয়েছে, যা নবী মুহাম্মদ-এর সময়কালে এ অঞ্চলে মুসলমানদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।[৩৩]

নবম শতাব্দী থেকে মুসলমান বণিকেরা বাংলা উপকূলীয় বন্দরগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে তোলে।[৩৪] পাল শাসনামলেই আরব আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে বাংলায় ইসলামের প্রথম আবির্ভাব ঘটে।[৩৫] আব্বাসীয় খিলাফতের মুদ্রা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে।[৩৬]

দশম শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সমতট অঞ্চলের জনগণ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসারী ছিল। এ সময় আরব ভূগোলবিদ আল-মাসুদি তাঁর গ্রন্থ The Meadows of Gold রচনার সময় এ অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং এখানে বসবাসরত একটি মুসলমান জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেন।[৩৭]

বাণিজ্যের পাশাপাশি সুফি সাধকদের অভিবাসনের মাধ্যমেও বাংলায় ইসলামের প্রসার ঘটে। বিজয়ের আগেই এই সুফি ধর্মপ্রচারকেরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। প্রাচীনতম পরিচিত সুফি মিশনারিদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ শাহ সুরখুল আনতিয়া ও তাঁর শিষ্যরা। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শাহ সুলতান রুমি, যিনি একাদশ শতাব্দীতে বর্তমান নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন এবং স্থানীয় শাসক ও জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রাথমিক পর্যটকগণ

[সম্পাদনা]

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রসার একটি বিতর্কিত বিষয় হতে পারে।[৩৮] ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে প্রথম সহস্রাব্দে সিল্ক রোড অতিক্রম করার সময় প্রথম দিকের মুসলিম ব্যবসায়ী ও বণিকরা বাংলায় আসেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে একটি উত্তর বাংলাদেশে খনন করা হয়েছে, যা নবী মুহাম্মদের জীবনকালেই এই এলাকায় মুসলমানদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।[৩৯] নবম শতাব্দীতে মুসলিম বণিকগণ বাংলার সমুদ্রবন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে। বাংলা এবং আরব আব্বাসীয় খিলাফতের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে পাল শাসনামলে বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব ঘটে।[৪০] এই অঞ্চলের অনেক জায়গায় আব্বাসীয় খিলাফতের মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। দশম শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় সমতটের লোকেরা বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করত। এই সময়ে, আরব ভূগোলবিদ আল-মাসুদি, যিনি দ্য মিডোজ অফ গোল্ডের লেখক, এই অঞ্চলে ভ্রমণ করেন এবং বাসিন্দাদের একটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেন।[৪১]

মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে, বাণিজ্যের পাশাপাশি, সুফি ধর্মপ্রচারকদের আগমনের মাধ্যমেও বাংলার মানুষের কাছে ইসলামের পরিচয় ঘটেছিল। প্রাচীনতম সুফি ধর্মপ্রচারক ছিলেন সৈয়দ শাহ সুরখুল আন্তিয়া ও তাঁর শিষ্যগণ, বিশেষ করে ১১শ শতাব্দীর শাহ সুলতান রুমি। রুমি বর্তমান নেত্রকোণা, ময়মনসিংহে বসতি স্থাপন করেন যেখানে তিনি স্থানীয় শাসক ও জনগণকে ইসলাম গ্রহণে প্রভাবিত করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ শাসনের আগ পর্যন্ত বাঙালিদের নিজস্ব ঐক্যবদ্ধ পরিচয় পাওয়া যায়নি। যেখানে শামসুদ্দিনের আগমনের আগে সংস্কৃত, ফার্সি এবং আরবি ছিল বাংলার রাষ্ট্রভাষা, তার বিজয়ের পর বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়।

প্রাথমিক ইসলামি সাম্রাজ্য

[সম্পাদনা]
বাংলা সালতানাত

বাংলায় সেনদের আগমনের প্রায় একশ বছর পরেই বাংলায় ইসলামের বিস্তার ঘটে। বাংলা যখন হিন্দু সেন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, পরবর্তী মুসলিম বিজয়, সমগ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বখতিয়ার খলজি, একজন তুর্কি মুসলিম সেনাপতি, ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করেন ও বাংলার বিশাল অংশ দিল্লি সালতানাতের সাথে যুক্ত করেন। খলজি তিব্বতও অভিযান চালান। এই প্রাথমিক বিজয়ের পর বাংলায় ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে এবং অনেক বাঙালি ইসলামকে তাদের জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। সুলতান বলখী এবং শাহ মখদুম রূপস উত্তরবঙ্গের বর্তমান রাজশাহী বিভাগে বসতি স্থাপন করেছিলেন ও সেখানকার মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। উত্তর-পূর্বের শহর উত্তর-পূর্বের শহর শ্রীহট্টে (সিলেট) বুরহানউদ্দিনের ছত্রছায়ায় ১৩টি মুসলিম পরিবারের একটি সম্প্রদায় বাস করত, তদের দাবি অনুযায়ী তাদের বংশধররা চট্টগ্রাম থেকে এসেছিল।[৪২] ১৩০৩ সাল নাগাদ, শাহ জালালের নেতৃত্বে শত শত সূফী প্রচারক বাংলার মুসলিম শাসকদের সিলেট জয় করতে সাহায্য করেন, যা ধর্মীয় কার্যকলাপের জন্য শহরটিকে জালালের সদরদপ্তরে পরিণত করে। বিজয়ের পর, জালাল ইসলাম প্রচারের জন্য তার অনুসারীদের বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন এবং বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটি সুপরিচিত নাম হয়ে ওঠেন।

বাংলা সালতানাত

[সম্পাদনা]
বঙ্গীয় সালতানাতের একটি পাণ্ডুলিপির চিত্র যেটিতে নিজামী গাঞ্জভির ইস্কান্দারনামায় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটকে চিত্রিত করেছে। পাণ্ডুলিপিটি সুলতান নুসরাত শাহের আমলে তৈরি করা হয়েছিল।
পাতরাইল মসজিদ
ছোট সোনা মসজিদ
একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদআদিনার ধ্বংসাবশেষ।
বাংলার সুলতান কর্তৃক চীনের সম্রাটকে উপহার দেওয়া জিরাফটি, ২০ সেপ্টেম্বর ১৪১৪ তারিখে একজন বাঙালি দূত উপস্থিত করেন।
"বাংলা সাম্রাজ্যের মানুষ", ১৬ষ শতকের পর্তুগিজ চিত্র

১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ কর্তৃক একটি একক অখণ্ড বাংলা সালতানাত প্রতিষ্ঠার ফলে একটি সামাজিক-ভাষিক পরিচয় "বাঙালি"-র জন্ম দেয়।

১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ কর্তৃক একটি একক ঐক্যবদ্ধ বাংলার সালতানাত প্রতিষ্ঠা অবশেষে একটি "বাঙালি" সামাজিক-ভাষিক পরিচয়ের জন্ম দেয়। ইলিয়াস শাহী রাজবংশ স্বীকার করে যে মুসলিম বৃত্তি, এবং এই জাতিগত পটভূমি অতিক্রম করেছে। উসমান সিরাজউদ্দিন, যাকে আখি সিরাজ বাঙ্গালী নামেও পরিচিত, তিনি পশ্চিমবঙ্গের গৌড়-এর অধিবাসী ছিলেন এবং ইলিয়াস শাহের রাজত্বকালে সুলতানি দরবারে পণ্ডিত হয়েছিলেন। ফার্সি ও আরবি ভাষার পাশাপাশি , সার্বভৌম সুন্নি মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রটিও বাঙালি জনগণের ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন পেতে সক্ষম করে, পূর্ববর্তী রাজ্যগুলির বিপরীতে যা একচেটিয়াভাবে সংস্কৃত, পালি এবং ফারসিকে সমর্থন করেছিল।" আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, একজন সমসাময়িক চীনা পরিব্রাজক রিপোর্ট করেছেন যে আদালতে কেউ কেউ ফার্সি বুঝতে পারলেও সেখানে সর্বজনীন ব্যবহারের ভাষা ছিল বাংলা।এটি বিদেশী মানসিকতার বিলুপ্তির দিকে ইঙ্গিত করে, যদিও এখনও নিখোঁজ হয়নি। বাংলায় মুসলিম শাসক শ্রেণী দুই শতাব্দী আগে তার আগমনের পর থেকে প্রদর্শন করেছিল। এটি সরকারী সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে স্থানীয় বাঙালি সংস্কৃতির টিকে থাকার এবং এখন বিজয়ের দিকেও নির্দেশ করে।"

মুঘল বাংলা

[সম্পাদনা]
বাংলা জয় করার পর আকবরের প্রার্থনা

এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাবের কয়েক শতাব্দী আগে, বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। ১১৭০-এর দশকে হিন্দু সেন সাম্রাজ্যের পতন এবং পরবর্তীতে বিজয়ের আগ পর্যন্ত এলাকাটি কয়েক শতাব্দী ধরে বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ ধর্মীয় সংঘাতের একটি যুগ কারণ তারা ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিপরীত শিবিরের প্রতিনিধিত্ব করত এবং বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি সাম্যের প্রতি ব্রাহ্মণ জাতি-ভিত্তিক ক্ষমতা কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে। পূর্ববর্তী শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে হ্রাস পায় কারণ হিন্দু রাজ্য ধীরে ধীরে বৌদ্ধ রাজ্যগুলিকে এই অঞ্চলে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং বৌদ্ধ ব্যক্তিদের হিন্দু অবতার হিসাবে পুনর্গঠন এবং প্রতিরোধী বৌদ্ধ প্রজাদের নিম্ন বর্ণের মধ্যে পুনর্মিলন দ্বারা উদ্ভাসিত "বৌদ্ধকরণ" প্রক্রিয়া শুরু করে। সমাজ যেহেতু পাল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল উত্তর এবং পূর্ব বাংলায়, তাই সম্ভবত এগুলি ছিল বড় বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল যা সম্ভবত সেন সাম্রাজ্যকে ব্যাপকভাবে পরাধীন করেছিল। এই অঞ্চলে সেন বিজয়ের কয়েক দশক পরে, বখতিয়ার খলজি এই অঞ্চলটিকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের একটি বৃহত্তর আগমনের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে সেনারা নিজেরাই জয়ী হয়েছিল। এই অনুমান ব্যাখ্যা করবে কেন ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে পূর্ব বাংলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মূলত, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গে প্রচুর বৌদ্ধ জনসংখ্যা ছিল। হিন্দু সাম্রাজ্যের দ্বারা এলাকা জয়ের ফলে এই অঞ্চলে বৌদ্ধদের অধীনতা দেখা দেয়। তুর্কিদের বিজয়ের সাথে সাথে সুফি ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে যারা পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর হিন্দু অঞ্চল বনাম বৃহত্তরভাবে অসন্তুষ্ট বৌদ্ধ পূর্ব বাংলাকে রূপান্তর করতে আরও সফল হয়েছিল।

বনাম বৃহত্তরভাবে অসন্তুষ্ট বৌদ্ধ পূর্ব বাংলাকে রূপান্তর করতে আরও সফল হয়েছিল।

কয়েক শতাব্দী পরে মুঘল সাম্রাজ্যের কৃষি সংস্কার সুফি মিশনকে কেন্দ্র করে কৃষি গ্রামগুলির একটি ব্যবস্থা তৈরি করে সমগ্র বাংলাদেশে রূপান্তর এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল। উর্বর গঙ্গা সমভূমির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য মুঘলরা এই উদ্যোশ্যে আশেপাশে ভূমিহীন কৃষকদের জমি দেয়। সুফি ধর্মপ্রচারকদের ইসলাম প্রচারের আরও সুযোগ সহ এলাকার লোকেদের বৃহত্তর ঘনত্বের দিকে পরিচালিত করে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম. ইটনের মতে, ইসলাম বাংলা বদ্বীপে লাঙ্গলের ধর্ম হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘনিষ্ঠভাবে কৃষির সাথে জড়িত ছিল। বদ্বীপটি ছিল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল। মুঘল উন্নয়ন প্রকল্পগুলি বন পরিষ্কার করেছে এবং হাজার হাজার সুফি-নেতৃত্বাধীন গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেছে, যা শিল্পোন্নত কৃষিকাজ এবং কারিগর সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। ব-দ্বীপের সবচেয়ে উর্বর অংশ পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলে প্রকল্পগুলো সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ছিল।

এটি পূর্ব বাংলাকে শক্তিশালী বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কের সাথে একটি সমৃদ্ধ গলনাঙ্কে পরিণত করেছিল। এটি ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশ। পূর্ব বাংলা পূর্ব উপমহাদেশে মুসলিম জনসংখ্যার কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং আধুনিক দিনের বাংলাদেশের সাথে মিলে যায়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কাল

[সম্পাদনা]
ব্রিটিশ বাংলার প্রধানমন্ত্রীরা ছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এর মুসলিম সম্প্রদায় থেকে

১৭৫২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (EIC) দ্বারা বঙ্গীয় অঞ্চল অধিভুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী দশকগুলিতে, বাঙালিরা কোম্পানি শাসন এর বিরুদ্ধে অসংখ্য বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়। ১৯ শতকের গোড়ার দিকে, তিতুমীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। এদিকে, বাঙালি মুসলমান হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন-এর নেতৃত্ব দেন, যা ইসলামিক পুনরুজ্জীবনের পক্ষে। ফরায়েজিরা একটি খিলাফত গঠন করতে চেয়েছিল এবং এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজকে তারা "অ-ইসলামিক প্রথা" বলে মনে করে তা পরিষ্কার করতে চেয়েছিল। তারা EIC-এর বিরুদ্ধে বাঙালি কৃষককে জাগিয়ে তুলতে সফল হয়েছিল। যাইহোক, ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ দমনের পর আন্দোলনটি একটি ক্র্যাকডাউনের সম্মুখীন হয় এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর পুত্র দুদু মিয়া এর মৃত্যুর পর গতি হারিয়ে ফেলে। ১৮১৭ সালের পর, মুসলমানরা ক্রমবর্ধমান বৃহত্তর সংখ্যায় ব্রিটিশ ধাঁচের শিক্ষার সন্ধান শুরু করে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান-এর নেতৃত্বে ভারতের মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি ভাষার প্রচারও বাঙালি মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছিল।, যিনি খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, লেখক ইসমাইল হোসেন সিরাজী এবং মীর মোশাররফ হোসেন; এবং নারীবাদী নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী এবং বেগম রোকেয়া

পূর্ব বাংলা এবং আসাম (১৯০৫-১৯১২)

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রের একটি অগ্রদূত ছিল ব্রিটিশ ভারত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ। প্রদেশটি ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। প্রদেশটি বর্তমান বাংলাদেশ, উত্তরপূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশকে আচ্ছাদিত করে। সেখানে বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ঢাকা, বাংলার প্রাক্তন মুঘল রাজধানী, ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলা এবং আসামের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করেছিল। প্রদেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলার প্রথম বিভাজনের মাধ্যমে। ব্রিটিশ সরকার নতুন প্রদেশ সৃষ্টির জন্য প্রশাসনিক কারণ উল্লেখ করে। এটি নতুন প্রদেশের শিক্ষা এবং অর্থনীতিতে বর্ধিত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিভাজন দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে এবং ১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠনের দিকে পরিচালিত করে। এটি হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম বিরোধী মনোভাব এবং ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তোলে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা, যেটি ব্রিটিশদেরকে ভাগ করা এবং শাসন করা নীতির জন্য অভিযুক্ত করেছিল, ব্রিটিশ সরকারকে নতুন প্রাদেশিক ভূগোল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছিল। ১৯১১ সালে দিল্লি দরবার চলাকালীন, রাজা জর্জ পঞ্চম ঘোষণা করেছিলেন যে প্রদেশগুলি আবার পুনর্গঠিত হবে। বঙ্গভঙ্গ প্রথম রদ হয়; যখন কলকাতা ভারতের সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসাবে তার মর্যাদা হারিয়েছে। সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত হয় নয়া দিল্লি; যদিও কলকাতা বঙ্গ প্রদেশের ছোট হলেও পুনর্মিলনের রাজধানী হয়ে ওঠে। আসামকে আলাদা প্রদেশ করা হয়। উড়িষ্যা ও বিহারও বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। ঢাকার জন্য ক্ষতিপূরণ হিসাবে, ব্রিটিশ সরকার ১৯২১ সালে শহরের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে।

প্রদেশের সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালে, স্কুলে তালিকাভুক্তি ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ফারসি, সংস্কৃত, গণিত, ইতিহাস এবং বীজগণিত সহ কলেজ পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয়গুলি চালু করা হয়েছিল। সমস্ত শহর একটি আন্তঃজেলা সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে। ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ২১% বৃদ্ধি পেয়েছে।

১৯৪৭ দেশভাগ ও বাংলাদেশ

[সম্পাদনা]
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্যরা

বাঙালির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ছিল ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব, যা রাজনীতিবিদ আবুল কাশেম ফজলুল হক। রেজুলেশনটি প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া এর "পূর্বাঞ্চল"-এ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে, পরবর্তীতে সর্বভারতীয় শীর্ষ নেতৃত্ব দ্বারা এর পাঠ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। মুসলিম লীগ। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২৯৪২ সালে একটি স্বাধীন, অবিভক্ত, সার্বভৌম "ফ্রি স্টেট অফ বেঙ্গল" প্রস্তাব করেন। উদারপন্থী বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাদের একটি স্বাধীন সংযুক্ত বঙ্গ আহ্বান সত্ত্বেও, সরকার যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সাথে এগিয়ে যায়। পরে এর নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং ঢাকা এর রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালে ঢাকায় গঠিত হয়েছিল। সংগঠনটির নাম পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে আওয়মী লীগ হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষকরণ করা হয়। দলটিকে বাঙালি বুর্জোয়া, কৃষিবিদদের দ্বারা সমর্থিত ছিল। মধ্যবিত্ত, এবং বুদ্ধিজীবী। স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, এবং এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী, যাদের সবাই বাঙালি মুসলমান, প্রত্যেকেই ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; যাইহোক, তিনটিই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স দ্বারা পদচ্যুত হয়েছিল। বাংলা ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে তমদ্দুন মজলিশ সহ ইসলামি দলগুলির কাছ থেকে জোরালো সমর্থন পেয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছয় দফা আন্দোলনশেখ মুজিবুর রহমান প্রধান নেতা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের আন্দোলনের উত্থান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দেয়।

বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

জালালউদ্দিনের রুপার পয়সা

বাংলার ১৮৪১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, মুসলমানরা বাংলার জনসংখ্যার একটি খালি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (৪৮.৫ শতাংশ হিন্দুদের তুলনায় ৫০.২ শতাংশ)। তবে বাংলার পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা মাটিতে পুরু ছিল। রাজশাহী, ঢাকাচট্টগ্রাম বিভাগে মুসলমানদের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৬৩.২, ৬৩.৬ এবং ৬৭.৯ শতাংশ। বিতর্কটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কিছু লেখকের লেখার উপর আকৃষ্ট হয়, কিন্তু বর্তমান আকারে এটি প্রাথমিকভাবে ১৯৬৩ সালে এম এ রহিম দ্বারা প্রণয়ন করা হয়েছিল। রহিম পরামর্শ দিয়েছিলেন যে বাংলার মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিন্দু ধর্মান্তরিত নয় বরং তারা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা 'কুলীন' অভিবাসীদের বংশধর। বিশেষভাবে, তিনি অনুমান করেছিলেন যে ১৭৭০ সালে, বাংলার প্রায় ১০.৬ মিলিয়ন মুসলমানের মধ্যে ৩.৩ মিলিয়ন (প্রায় ৩০ শতাংশ) 'বিদেশী রক্ত' ছিল। ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে রিচার্ড ইটন, একটি বই এবং কাগজপত্রের একটি সিরিজে, হিন্দুধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার সামাজিক মুক্তি তত্ত্ব সম্পর্কে বিশ্রী প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যেগুলি এখনও সম্পূর্ণরূপে সমাধান করা হয়নি, রহিমের যুক্তিকে আরও সমর্থন করে। ১৯ শতকের শেষের দিকে, যখন (১৮৫২) সালে বাংলা অঞ্চলে প্রথম আদমশুমারি পরিচালিত হয়, তখন দেখা যায় যে হিন্দুদের সংখ্যা (১৪মি) এবং মুসলমানদের সংখ্যা (১৭.৫মি) প্রায় একই ছিল। ১৪৭২ সালের আদমশুমারি অনুসারে, মাত্র ১.৫২% বা বলতে গেলে ২.৬৬% লক্ষ বাঙালি মুসলিম জনসংখ্যা বিদেশী বংশের দাবি করে।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ হিন্দু রাজা রাজা গণেশের পুত্র যদু হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মান্তরিত মুসলমান হিসেবে বাংলার অধিকাংশ শাসন করেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ বাংলার হিন্দুদের ইসলামে দীক্ষিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি তার রাজ্যে অমুসলিমদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ডি.সি. ভট্টাচার্যের একটি সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাখ্যা অনুসারে, জালালুদ্দিন রাজ্যধর নামে একজন হিন্দুকে তার সেনাবাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি মুসলিম পন্ডিত – উলামা ও শায়খদের সমর্থন লাভ করেন। তিনি রাজা গণেশ দ্বারা ধ্বংস করা মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপত্য পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

[সম্পাদনা]
পুরস্কারপ্রাপ্ত আধুনিকতাবাদী বাইত উর রউফ মসজিদ

বাংলায় বিদ্যমান ঐতিহাসিক ইসলামি সাম্রাজ্যগুলো স্থাপত্য, কৃষি, নির্মাণ প্রকৌশল, পানি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মতো অসংখ্য ক্ষেত্রে বেশ কিছু চতুর প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। খাল ও জলাধার সৃষ্টি সুলতানি আমলের একটি সাধারণ রীতি ছিল। সেচের নতুন পদ্ধতি সুফিদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। বাঙালী মসজিদ স্থাপত্যে পোড়ামাটি, পাথর, কাঠ এবং বাঁশ, বাঁকা ছাদ, মিনার এবং একাধিক গম্বুজ রয়েছে। বাংলা সালতানাতের সময়, আরও একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক শৈলীর বিকাশ ঘটে যেটিতে কোন মিনার ছিল না, তবে মিহরাব এবং মিম্বরগুলি কুলুঙ্গি হিসাবে সমৃদ্ধভাবে ডিজাইন করা হত।[৪৩]

ইসলামি বাংলার ১৭শ ও ১৮শ শতকে মসলিন রপ্তানি সহ বস্ত্র বয়নের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে, জামদানির বয়নকে ইউনেস্কো একটি অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা হয়। ১৮৬২ সালে রেলপথ চালু করা হয়েছিল, যা বাংলাকে একটি রেল নেটওয়ার্কের জন্য বিশ্বের প্রথমতম অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি করে তোলে।[৪৪] সাধারণ জনগণের জন্য, বুনিয়াদি বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। ঔপনিবেশিক সরকার ও বাঙালি অভিজাতরা বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। ঢাকার নবাবগণ আহসানুল্লাহ স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠা করেন যেটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়[৪৫] নামে পরিচিত।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, মাকিন-বাঙালি মুসলমান ফজলুর রহমান খান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য প্রকৌশলীদের একজন হয়ে ওঠেন, বিশ্বের উচ্চতম ভবনের নকশা তৈরিতে যার অবদান অনস্বীকার্য।[৪৬] আরেকজন বাঙালি মুসলিম জার্মান-আমেরিকান, জাভেদ করিম ছিলেন ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।[৪৭]

২০১৬ সালে, বাংলা সালতানাত-শৈলীর ইমারত দ্বারা অনুপ্রাণিত, আধুনিকতাবাদী বাইত-উর-রউফ মসজিদ, স্থাপত্যের জন্য আগা খান পুরস্কার জিতেছে।[৪৮]

জনপরিসংখ্যান

[সম্পাদনা]

বাঙালি মুসলমানরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জাতিসত্তা (আরব বিশ্বের পরে) এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মুসলিম সম্প্রদায়।[৪৯] ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫২ মিলিয়ন বাঙালি মুসলমান বাস করে, যেখানে ইসলাম হল রাষ্ট্রধর্ম এবং জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠকে নির্দেশ করে।[৫০] ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ২০২১ সালের হিসাবে আনুমানিক ২৩-২৪ মিলিয়ন বাঙালি মুসলমান রয়েছে, বাকি ৬-৭ মিলিয়ন উর্দুভাষী মুসলমান এবং সুরজাপুরি ভাষী মুসলমান রয়েছে।[] পশ্চিমবঙ্গের দুটি জেলা  মুর্শিদাবাদমালদহে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং উত্তর দিনাজপুরে বহুত্ব রয়েছে।[৫১] আসামের ১৩ মিলিয়ন ইসলাম ধর্মাবলম্বীর মধ্যে ৯ মিলিয়নেরও বেশি বাঙালি মুসলমান।

[]

আসামের তেত্রিশটি জেলার মধ্যে নয়টিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।[৫২][৫৩][৫৪][৫৫][৫৬] ভারতের উত্তর-পূর্বের আরেকটি রাজ্য ত্রিপুরায় প্রায় ৩.৮ লক্ষ বাঙালি মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯%।[৫৭] পশ্চিম মায়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মাঝেও উল্লেখযোগ্য বাঙালি মুসলিম ঐতিহ্য রয়েছে।[৫৮]

পারস্য উপসাগরের আরব রাষ্ট্রগুলোতে একটি বৃহৎ বাঙালি মুসলিম প্রবাসী পাওয়া যায়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েক মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিকের বাসস্থান। আরও সুপ্রতিষ্ঠিত ডায়াস্পোরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং পাকিস্তানে বসবাস করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বাঙালি মুসলিম বসতি স্থাপনকারীরা ছিলেন জাহাজ জাম্পার যারা ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকে হারলেম, নিউ ইয়র্ক এবং বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেছিলেন।[৫৯]

ইতেশামুদ্দীন ছিলেন পহেলা উচ্চশিক্ষিত বাঙালি এবং দক্ষিণ এশীয় যিনি ইউরোপ সফর করেছিলেন।

সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]
বারো ভূঁইয়াদের থেকে এসেছে "ভুঁইয়া" পদবী

বাঙালি মুসলিম সমাজে উপাধিগুলি এই অঞ্চলের মহাজাগতিক ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে। এরা মূলত বাংলা, আরবিফার্সি বংশোদ্ভূত। বাঙালি মুসলমান সমাজে তালুকদার, হাওলাদার, মোল্লা, মিঞা, ভুঁইয়া, মজুমদার, মৃধারখন্দকারের মতন পদবী জন্মেছে। এছাড়াও চৌধুরী, কাজী, সরকার, দেওয়ান ও ইনানমদারের মতন উপমহাদেশীয় পদবীয় উল্লেখযোগ্য। খান, শেখ, আহমেদ (বাংলা: আহমদ), মির্জা, মীর, সাইদ (বাংলা: সৈয়দ) ও উদ্দীনের মতন ইত্যাদি পদবী মুসলমানদের মধ্যে খুবই সাধারণ। বাউলদের মাঝে "ফকির" পদবীটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখা যায়।"বেগম" মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের একটি রাজকীয় এবং অভিজাত উপাধি

মুসলিম পারিবারিক নাম

[সম্পাদনা]
নাম (বাংলা অক্ষরে)
সৈয়দ
উল্লাহ
মীর
লস্কর
আখন্দ
বেগম
মীর্জা/মির্জা
শাহ
মুন্সী
দেওয়ান
গাজী
কাজী
খান/খাঁ
চৌধুরী
সরকার
মুহুরী
মল্ল
পাটোয়ারী
মোল্লা
ফকির
খন্দকার
হাজারী
শিকদার
তালুকদার
মজুমদার
নাম (বাংলা অক্ষরে)
হালদার
জোয়ার্দার
ইনামদার
মিয়া
সরদার
চাকলাদার
হাওলাদার
ডিহিদার
ভূঁইয়া
মুস্তাফী
মলঙ্গী
মাতুব্বর
গোমস্তা
পন্নী
লোহানী
কানুনগো
কারকুন
মল্লিক
মণ্ডল
বিশ্বাস
প্রামাণিক
শেখ
মৃধা

পোশাক

[সম্পাদনা]
রাজকীয় ব্যক্তির জন্য মসলিনের তৈরী একখণ্ড শাল।
শেখ মুজিবুর রহমান পাঞ্জাবির ওপরে পরে আছেন মুজিব কোট

জামা বাঙালিদের লম্বা, ঢিলেঢালা ফিটিং, সেলাই করা পোশাক। জামা মূলত বাঙালী নারীরা মুঘল দরবারে মর্যাদা ও সম্পদের প্রতীক হিসেবে পরতেন। সময়ের সাথে সাথে, এটি এখন বাংলাদেশ সহ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে মহিলাদের দ্বারা আরও ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। জামা ইসলামী মোদি নিয়মের কিছু ব্যাখ্যাও পূরণ করতে পারে।

এলাকায়, বয়স্ক মহিলারা হিজাবের সাথে শাড়ি পরেন এবং তরুণ প্রজন্ম হিজাবের সাথে সালোয়ার কামিজ পরেন, উভয়ই সাধারণ ডিজাইনের। শহরাঞ্চলে, সালোয়ার কামিজ এবং নেকাব-বোরকা-চাদরের সংমিশ্রণটি বেশি জনপ্রিয় এবং এর আলাদা ফ্যাশনেবল ডিজাইন রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে শহুরে বাঙালি পুরুষরা মোগলাই জামা পরতেন, যদিও সেলোয়ার বা পাজামার মতো পাঞ্জাবির পোশাক গত তিন শতাব্দীর মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নৈমিত্তিক পরিবেশে বাঙালিদের মধ্যে ফোতুয়া, একটি খাটো উপরের পোশাকের জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। গ্রামীণ বাঙালি পুরুষদের জন্য লুঙ্গি এবং গামছা একটি সাধারণ সংমিশ্রণ। বিশেষ অনুষ্ঠানের সময়, বাঙালি মহিলারা সাধারণত শাড়ি, সালোয়ার কামিজ বা আবায়া পরিধান করে, হিজাব বা ঐতিহ্যবাহী ওড়না দিয়ে চুল ঢেকে রাখে; এবং পুরুষরা একটি পাঞ্জাবি পরে, এছাড়াও টুপি, টকি, পাগড়ি বা রুমাল দিয়ে তাদের চুল ঢেকে রাখে।

এছাড়াও মেয়েদের মাঝে কাপড়, ফতুয়া, বাঙালি কুর্তি ও ছেলেদের মাঝে ফতুয়া, কাবলি, গেঞ্জিসহ, উপমহাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পোশাক যেমন মেয়েদের লেহেঙ্গা, ঘারারা, আনারকলি ও ছেলেদের শেরওয়ানি, আচকানসহ, আংরাখাচুড়িদারের মতো পোশাক জনপ্রিয়। যদিও ঘাগরা ছোলি, কুর্তাধুতি বাঙালি হিন্দুদের দারা এদেশে এসেছে, বাংলাদেশে আধুনিক যুগে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে এখন মুসলমানরাও এসব পোশাক আপন করে নিয়েছে। শাল বা চাদর মূলত শীতকালে পরা হয়।

শিল্পকলা

[সম্পাদনা]
মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুখোস
জামদানি বয়ন শিল্প

বাংলার লোকশিল্প ও চিত্রকলার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে যা বাঙালি মুসলমান শিল্পীরা গড়ে তুলেছেন। এই শিল্পকর্মগুলি তাদের প্রাণবন্ত রঙ, জটিল বিবরণ এবং অনন্য শৈলী দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এই ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিল্পী হলেন আবদুস শাকুর শাহ, যিনি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের চিত্রায়নের জন্য পরিচিত। তার কাজগুলিতে প্রায়ই কৃষকদের ক্ষেতে কাজ করার দৃশ্য, মহিলারা বস্ত্র বুনছে এবং জেলেদের তাদের জাল ফেলার দৃশ্য রয়েছে।

জয়নুল আবেদিন (২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪ - ২৮ মে ১৯৭৬) বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী। পূর্ববঙ্গে তথা বাংলাদেশে চিত্রশিল্প বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু প্রচেষ্টার জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধি লাভ করেন।

এই ক্ষেত্রের আরেকজন বিশিষ্ট শিল্পী হলেন কামরুল হাসান, যিনি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তাঁর চিত্রকর্মগুলি প্রায়শই তাঁর সময়ের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যাগুলিকে প্রতিফলিত করে এবং তিনি সাহসী রঙ এবং শক্তিশালী লাইন ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন। কামরুল হাসান নিজেকে পটুয়া হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। বাংলাদেশের পটুয়া একটি অনন্য সম্প্রদায়, তাদের ঐতিহ্যগত পেশা হল চিত্রাঙ্কন যা পটচিত্র নামে পরিচিত এবং হিন্দু মূর্তির মডেলিং, তথাপি তাদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান।

এস এম সুলতান হলেন আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী যিনি বাংলাদেশের লোকশিল্পের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তার কাজগুলি প্রায়ই শ্রমিক শ্রেণী এবং কৃষকদের সংগ্রামকে চিত্রিত করে এবং তিনি মাটির সুর এবং রুক্ষ টেক্সচার ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন।

শাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণকারী একজন বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফ্টস থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তাঁর কাজগুলি সাহসী রেখা, প্রাণবন্ত রঙ এবং ঐতিহ্যগত ও আধুনিক শিল্পের একটি অনন্য মিশ্রণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

আলপনা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প ফর্ম, যাতে বিবাহ, উৎসব এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে বাড়ির মেঝে বা দেয়ালে চালের পেস্ট ব্যবহার করে জটিল নকশা তৈরি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক প্লেসে আলপনা দেওয়ার জন্য বাঙালিদের সমস্যায় পড়ার খবর পাওয়া গেছে। আলপনার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে জড়িত। যাইহোক, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সরকারী স্বীকৃতি সত্ত্বেও, সংখ্যালঘু ভাষা ও সংস্কৃতিগুলি পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত ও প্রচার হচ্ছে না বলে উদ্বেগ রয়েছে।

রিকশাচিত্র বা রিকশা আর্ট বা ত্রিচক্রযানচিত্র বাংলাদেশের, নব্য-রোমান্টিকতার মধ্যে আবির্ভূত একটি শিল্প ধারা। এই শিল্পকে বহমান ঐতিহ্য বা লিভিং ট্রেডিশনও বলা হয়।

বাংলায় মসলিন উৎপাদন খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে শুরু হয়। এই অঞ্চলটি প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে কাপড় রপ্তানি করত। বাংলা সিল্ক ১৩ শতকের ভেনিস প্রজাতন্ত্রে গঙ্গা সিল্ক নামে পরিচিত ছিল। মুঘল বাংলার একটি প্রধান রেশম রপ্তানিকারক ছিল। জাপানি রেশম উৎপাদন বৃদ্ধির পর বাঙালি রেশম শিল্প হ্রাস পায়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী সিল্ক উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। মধ্যযুগীয় ভারতের সাথে ইউরোপীয় বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ার পর, মুঘল বাংলা ১৭ শতকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মসলিন রপ্তানিকারক হয়ে ওঠে। মুঘল আমলের ঢাকা ছিল বিশ্বব্যাপী মসলিন ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। মুঘল বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত শৈল্পিক ঐতিহ্য ছিল সূক্ষ্ম মসলিনের উপর জামদানি মোটিফের বয়ন প্রথম বাঙালি মুসলমান হাতে শুরু হয়, যা এখন ইউনেস্কো একটি অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। জামদানি মোটিফ ছিল ইরানি টেক্সটাইল আর্ট (বুটা মোটিফ) এবং পশ্চিমা টেক্সটাইল আর্ট (পেইসলে) এর মতো। ঢাকার জামদানি তাঁতিরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। আধুনিক বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল উৎপাদক, যেখানে একটি বৃহৎ তুলা ভিত্তিক তৈরি পোশাক শিল্প রয়েছে।

নকশি কাঁথা, সাধারণ কাঁথার উপর নানা ধরনের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথা। এটি গ্রামবাংলার বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ। অনেক বাঙালিরা নকশী কাঁথার জায়নামাজ ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে ফুলচাঙ্গ নকশী সিকা কোরআন শরীফে ও টুপি মতন ধর্মীয় সামগ্রী রাখার জন্যে। বাংলার বস্ত্রবয়ন কলাদারুশিল্পপাটশিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালি মুসলমান শিল্পীদের হাতেই।

স্থাপত্য

[সম্পাদনা]
সুলতানি আমলের ষাট গম্বুজ মসজিদ
মসজিদকুঁড় মসজিদ

বাংলা ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত অঞ্চলটি মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। এই সময়কালে, এই অঞ্চলে অনেক মসজিদ, সমাধি এবং প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল। বাংলায় ইসলামী স্থাপত্যের সবচেয়ে বিশিষ্ট উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হল ষাট গম্বুজ মসজিদ, যা বাংলাদেশের বাগেরহাটে অবস্থিত শৈত গম্বুজ মসজিদ নামেও পরিচিত। এই মসজিদটি ১৫ শতকে উলুগ খান জাহান নামে একজন তুর্কি সেনাপতি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি ইট দিয়ে তৈরি এবং ষাটটি গম্বুজ রয়েছে যা এর নামকরণ করেছে। এছাড়াও মসজিদটির দেয়ালে অনেক জটিল পোড়ামাটির অলঙ্করণ রয়েছে।

বাংলাদেশে ইসলামিক স্থাপত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল পুরান ঢাকায় অবস্থিত লালবাগ কেল্লা। দুর্গটি ১৭ শতকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র প্রিন্স মুহাম্মদ আজম দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। দুর্গটিতে মুঘল এবং বাঙালি স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে এবং এতে একটি মসজিদ, একটি প্রাসাদ এবং একটি সমাধির মতো বেশ কয়েকটি ভবন রয়েছে।

এই স্থাপনাগুলি ছাড়াও, তারা মসজিদ এবং বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মতো মসজিদ সহ সারা বাংলাদেশে ইসলামিক স্থাপত্যের আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। এই মসজিদগুলিতে গম্বুজ, মিনার এবং খিলানের মতো ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক স্থাপত্য উপাদান রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, বাংলা ও বাংলাদেশের ইসলামিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য হল ইট ও পোড়ামাটির মতো স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার এবং ইসলামিক উপাদানের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বাংলা স্থাপত্য শৈলীর সংযোজন।

সুফিবাদ

[সম্পাদনা]

সুফিবাদ একটি আধ্যাত্মিক মুসলিম সম্প্রদায়। সুফিদের সাধারণ আচার হল যিকির (প্রার্থনার পর ঈশ্বরের নাম পুনরাবৃত্তি করা)। সুফিবাদ মহানবী মুহাম্মাদ (বাংলা: মোহম্মদ/মোহাম্মদ/মুহম্মদ/মুহাম্মদ) কে একজন নিখুঁত মানুষ হিসাবে বিবেচনা করে যিনি ঈশ্বরের নৈতিকতা ও মহাত্ম্যের সাথে মানুষকে পরিচিতি করান বলে বিশ্বাস করা হয়। সুফিবাদকে ইসলামী বিশ্বাস ও অনুশীলনের স্বতন্ত্র অভ্যন্তরীণকরণ এবং তীব্রতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মধ্যযুগে বাঙালি মুসলিম সমাজের বিকাশে সুফিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঐতিহাসিক সুফি ধর্মপ্রচারকদের শাহ জালাল, খান জাহান আলী, শাহ আমানত, শাহ মখদুম রূপস এবং খাজা এনায়েতপুরী সহ সন্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের সমাধি দাতব্য, ধর্মীয় সমাবেশ এবং উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু।

সমন্বয়বাদ

[সম্পাদনা]

ইসলামে রূপান্তর তাওহিদ-এর ইসলামিক ধারণাকে হিন্দু লোকদেবতাদের উপাসনার মধ্যে মিশ্রিত করা হয়েছিল, যারা এখন পীর হিসাবে বিবেচিত হয়। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বাংলা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার একটি ভাষা। এটি বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অন্যান্য স্থানে এবং প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়ের মূল ভাষা। বাঙালিরা 'দেশ' নামে ভাষাটির উপরে গর্ব প্রকাশ করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ শাসনে বঙ্গের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ফার্সি, সংস্কৃত বা আরবির জায়গায় প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা হয় রাষ্ট্রভাষা। প্রায় ১০,০০০ বাংলা শব্দ ফার্সি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এবং প্রায় ৫,০০০ শব্দ সরাসরি আরবি, ফার্সি এবং তুর্কি থেকে ধার করা হয়েছিল। ১৪৮৩ সালের দিকে ব্রিটিশরা এটিকে ইংরেজিতে পরিবর্তন করা পর্যন্ত ফারসি ৬০০ বছর ধরে বাংলার সরকারী রাষ্ট্রভাষা ছিল।[৬০] নিঃসন্দেহে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে, বাংলা ব্যাপকভাবে কথিত হয় কারণ এটি বাংলাদেশের সরকারী ভাষা এবং এটি বাঙালিদের মাতৃভাষা, যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা রয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়েরও বাংলা ভাষার নিজস্ব উপভাষা রয়েছে যা আরবি ও ফারসি ভাষা দ্বারা প্রভাবিত।

এরকম একটি উপভাষা "বাঙ্গাল" নামে পরিচিত, যেটি পূর্ববঙ্গে (বর্তমানে বাংলাদেশ) বসবাসকারী মুসলমানরা বলে। বাংলার অনেক আরবি এবং ফারসি ঋণ শব্দ রয়েছে এবং প্রমিত বাংলার তুলনায় একটি স্বতন্ত্র শব্দভাণ্ডার এবং উচ্চারণ রয়েছে।উভয় পশ্চিমবঙ্গবাংলাদেশের মুসলমানদের দ্বারা কথিত আরেকটি উপভাষা "মুসলিম বাঙালি" নামে পরিচিত। এই উপভাষায় অনেক আরবি এবং ফার্সি ঋণ শব্দ রয়েছে এবং এটি উর্দু দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। "গোসল", "অজুহাত", "পানি", "খালামনি", "চাচা", "হালখাতা", "আম্মু", "আব্বা", "মাফ" ইত্যাদি সব শব্দ, মুসলিম বাংলার অন্তর্ভুক্ত।

মুসলমান শাসনের সময় বাংলা ভাষার উন্নয়ন হয়। আরবিফার্সি ভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষা উন্নয়ন হয়। ১৩-১৪ শতাব্দীর মুর্শিদাবাদের সুলতান, গিয়াসুদ্দীন আজাম শাহ, রাজা হুসেন শাহ, রাজা আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, রাজা সিকন্দর, রাজা নরর্ত্তি, রাজা রুকন্নুদ্দিন, উদ্দিন সিদ্দিকী, রাজা আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং রাজা শাহ্‌ সুলতান মুহাম্মদ আদিল. এই রাজা-মহারাজা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রেরণের জন্যে প্রচুর পরিমাণে আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, ফার্সি, তুর্কি, গ্রীক, ল্যাটিন ভাষা, নরওয়েজীয় ভাষা, পর্তুগিজ ভাষাইংরেজি নিয়ে নিরন্তর চেনা। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বহুভাষিকতার প্রচারের জন্য প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে দিবসটি ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি হয়েছিল। . বিক্ষোভের ফলে মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে ওকালতিকারী বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রচারের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিতে দিনটি এখন বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।

৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ভাষা আন্দোলন

সাহিত্য

[সম্পাদনা]

মুসলমান কবিরা পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় লিখতেন। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে, এই অঞ্চলে সুফিবাদ এবং ইসলামিক সৃষ্টিতত্ত্বের ধারণার উপর ভিত্তি করে একটি আঞ্চলিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। বাংলা মুসলিম অতীন্দ্রিয় সাহিত্য ছিল ইসলামিক ভারতের অন্যতম মৌলিক সাহিত্য। প্রাক-ইসলামী যুগে প্রোটো-বাঙালির আবির্ভাব হলেও, বাংলা সাহিত্য ঐতিহ্য ইসলামী যুগে স্ফটিক হয়ে ওঠে। ফার্সি এবং আরবি মর্যাদাপূর্ণ ভাষা হওয়ায় তারা স্থানীয় বাংলা সাহিত্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছিল। মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে বাংলাকে জনপ্রিয় করার প্রথম প্রচেষ্টা সুফি কবি নূর কুতুব আলমের। কবি রিখতা ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে অর্ধেক ফার্সি এবং অর্ধেক কথ্য বাংলায় কবিতা লেখা হয়। আমন্ত্রণ ঐতিহ্যে দেখা যায় যে বাঙালি মুসলমান কবিরা ভারতীয় মহাকাব্যগুলিকে ইসলামের মূর্তি দিয়ে হিন্দু দেব-দেবীর আমন্ত্রণ প্রতিস্থাপন করে পুনরায় রূপান্তরিত করেছেন। রোমান্টিক ঐতিহ্যের পথপ্রদর্শক শাহ মুহম্মদ সগীর, যার ইউসুফ এবং জুলাইখার কাজ বাংলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রোমান্টিক কাজের মধ্যে রয়েছে বাহরাম খানের লায়লা মাদজুন এবং সাবিরিদ খানের হানিফা কায়রাপারি। দোভাষী ঐতিহ্যে মুসলিম প্রেক্ষাপটকে চিত্রিত করার জন্য বাংলা গ্রন্থে আরবিফারসি শব্দভান্ডার ব্যবহার করা হয়েছে। মধ্যযুগীয় বাঙালি মুসলমান লেখকরা মহাকাব্য ও উপাখ্যান তৈরি করেছেন, যেমন শাহ বারিদের রসুল বিজয়, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশা, আবদুল হাকিমের জঙ্গনামা এবং মোহাম্মদ খানের মাকতুল হুসেন। সুফি লেখকদের মধ্যে সৃষ্টিতত্ত্ব একটি জনপ্রিয় বিষয় ছিল। ১৭ শতকে, আলাওলের মতো বাঙালি মুসলমান লেখকরা আরাকানে আশ্রয় পেয়েছিলেন যেখানে তিনি তার মহাকাব্য, পদ্মাবতী তৈরি করেছিলেন।

সাহিত্য সমাজ ও সমিতি

[সম্পাদনা]

সাহিত্য পত্রিকা

[সম্পাদনা]

ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের পত্র-পত্রকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষার সাময়িকপত্রে ঈদ সংখ্যার চর্চা নতুন নয়, বরং এটি বিশ শতকেরই প্রায় সমান বয়সী। সে অর্থে এটি বাঙালিদের শত বছরের একটি ঐতিহ্য। যেহেতু ওই সময়ে কলকাতা ছিল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী, সেহেতু এটি শুরু হয়েছে কলকাতা থেকেই। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও ঈদ সংখ্যা প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। সাহিত্য পত্রিকার তালিকা:

  • বেগম
  • মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা
  • সওগাত

সঙ্গীত

[সম্পাদনা]
নজরুল " নজরুলগীতি " শিখাচ্ছেন

বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গীত এবং গান সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে যা শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে। এই সম্প্রদায়টি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, সুফি সঙ্গীত এবং লোকসংগীতের অনন্য মিশ্রণের জন্য পরিচিত, যা সময়ের সাথে সাথে এই অঞ্চলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রভাবকে প্রতিফলিত করে।

বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গীতের অন্যতম জনপ্রিয় রূপ হল বাউল সঙ্গীত। মূলত বাউল সংগীত একধরনের সুফিবাদ। বাউলরা হল একদল অতীন্দ্রিয় সঙ্গীতকার যারা প্রেম এবং আধ্যাত্মিকতার গান গায়। তাদের সঙ্গীত সাধারণ গান, পুনরাবৃত্তিমূলক সুর এবং একতারা, দোতারা এবং বাংলা ঢোলের মতো ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রের ব্যবহার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। বাউলরা আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য সঙ্গীতের শক্তিতে বিশ্বাস করে এবং তাদের গান প্রায়শই এই আধ্যাত্মিক দর্শনকে প্রতিফলিত করে।

বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হল নজরুল গীতি। এই ধারাটির প্রবর্তক কাজী নজরুল ইসলাম, একজন বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ এবং বিপ্লবী যিনি ২০ শতকের প্রথম দিকে বসবাস করেছিলেন। নজরুল গীতি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোকসংগীত এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের উপাদানগুলিকে একত্রিত করে একটি অনন্য ধ্বনি তৈরি করে যা নজরুলের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। তার গান প্রায়শই স্বাধীনতা, সমতা এবং মানবাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করে।

এই ধরনের সঙ্গীতের পাশাপাশি বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকসংগীতেরও রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এর মধ্যে রয়েছে ভাটিয়ালির মতো ঘরানা, যা নৌকাচালক এবং নদী ভ্রমণের সাথে যুক্ত; জারি গান, যা বাংলার মহররম এবং আশুরার শোক উৎযাপনে গাওয়া হয়; এবং ভাওয়াইয়া, যা ফসল কাটার উৎসবের সাথে জড়িত। এছাড়াও আছে সারি গান, পালা গান, ঘাটু গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত।

রন্ধনশৈলী

[সম্পাদনা]

কথায় আছে "মাছে ভাতে বাঙালি"। তুরস্ক, ইরানআফগানিস্তান এর মতন মুসলমান দেশগুলোর মানুষ বেশিরভাগ খাবারেই রুটি খেতেন, কিন্তু বাঙালিদের প্রধান খাবার ভাত। ইতিহাস বলে তুরস্ক, ইরানআফগানিস্তানের মতো দেশ থেকে আসা মানুষরা বাঙালিদের এমন ভাতপাগল দেখে বাঙালিদেরকে "ভাত খাওয়া ভেতো বাঙালী" বলে গালি দিতেন। বাঙালি মুসলমানরা দৈনন্দিন জীবনে খাঁটি বাঙালি খাবারই খেয়ে থাকেন। বেশিরভাগ খাবারই গুলোই খাঁটি বাঙালি হবার কারণে বেশিরভাগ খাবারই পূর্ব বাংলা মানে বাংলাদেশে উৎপত্তি পেয়েছে। খাবারই গুলোর মধ্যে সর্ষে ইলিশ, মুরগির ও বিভিন্ন প্রকারের মাছের ঝোল, ভুনা, কালিয়া, দই, পোস্ত, কষার মতন রান্না ইত্যাদি প্রচলিত আছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ডালের বিভিন্ন কৌশলে রান্নার প্রচলন ও দেখা যায়। এছাড়াও শুঁটকি, ভর্তা, ভাজি, চচ্চড়ি ও বিভিন্ন সবজির ভাজা, তরকারি ও আচার জনপ্রিয়। "আচার" শব্দ এসেছে ফার্সি থেকে। বাঙালিদের মিষ্টান্নের তালিকা শুরু করলে শেষ হবার নাম নেয় না। বাংলা রন্ধনশৈলীতে মুঘল প্রভাবের ফলে মিষ্টি খাবার যেমন বগুড়ার মিষ্টি দই, টাঙ্গাইলের চমচম, ঢাকার কমলাভোগ, খুলনার সন্দেশ, বিক্রমপুরের রসগোল্লা, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, নেত্রকোণার বালিশ (মিষ্টি), কুমিল্লার রসমালাই, মেহেরপুরের রসকদম, ক্ষীরকদম ও সাবিত্রী (মিষ্টি), ফেনীর খন্ডলের মিষ্টি, মানিকগঞ্জের পান্তুয়া আর পুরো বাংলায় জনপ্রিয় ল্যাংচালেডিকেনির মতন ইত্যাদি মিষ্টান্নর তৈরি করার জন্য দুধ ও চিনির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। মুঘলদের দারা জিলাপি, গোলাপ জাম, বরফি, হালুয়া, ক্ষীর, কুলফি, ফালুদা ইত্যাদি মিষ্টান্ন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জামতলার মিষ্টি, ময়মনসিংহের পাতক্ষীর, পায়েস, তুশা শিন্নি, খন্ডলের মিষ্টি, চট্টগ্রামের ছানার পোলাও কালোজাম, মালাই চপ ইত্যাদি সব মিষ্টি বাংলার মুসলমানদের দ্বারাই প্রথম তৈরি হয়েছিল। উপমহাদেশীয় মিষ্টান্ন লাড্ডু খ্যাতি পেয়েছে মুসলমান শাসনামলে। মালাই, খাশি, মুরগির এবং ঘি, এলাচ ও জাফরানের মতো মশলার ব্যবহার প্রবল মুঘল প্রভাবের কারণে বেড়েছে। প্রবল মুঘল প্রভাবে বাঙালি রান্নায় আদা ও রসুনের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে এসব খাবার বেশি দেখা যায় কারন বাঙালি মুসলমানরা সাধারণ ভাবেই এসব খাবার খেয়ে থাকেন যেখানে সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে এসব খাবারের প্রবলতা খুবই সামান্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন খাবার আছে। বাংলাদেশের খাবার যেযন ইলিশ বরিশালি, চিংড়ি মালাই কারি, ডাব চিংড়ি, আনারস চিংড়ি, নারকেল চিংড়ি, চিংড়ি জল বড়া, ভাপা চিংড়ি, দই চিংড়ি, লাউ চিংড়ি, নারকেল দুধে কই, বেলে মাছ ঝুরি, দই পটোলের মতন খাবার পশ্চিমবঙ্গের খাবারের তুলনায় ঝাল বেশি হয়ে থাকে যা বাংলাদেশের খাবার বা ভারতীয় বাংলা ভাষায় "বাঙাল খাবার" হিসেবে বিখ্যাত। এছাড়াও রয়েছে মাছের পাতুরি, পাতারি, আমিষ, নিরামিষ, লাবরা, মাছের মুইঠা, শুকতো।

বাঙালিরা ইফতারিতে বেগুনি, আলুর চপ, ডিম চপ, পিঁয়াজু, পাকোড়াসহ বিভিন্ন ভাজা-পোরা ও শাহী জিলাপি, ছানার জিলাপি, বোঁদে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাখরখানি খিচুড়িবুট ভুনা খাওয়া হয়। পানীয়র মধ্যে ঘোল, লাচ্ছি ও নানারকম শরবত পান করা হয়। আগে গ্ৰামের বাঙালিরা মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা ঠান্ডা পানি দিয়ে রোজা ভাঙতেন। বরিশালে "মলিদা" নামক এক শরবত জনপ্রিয়। ঢাকার চকবাজারের ইফতার ছাড়া রমজান অপূর্ণ থেকে যায়। অনেকে বিউটি লাচ্ছির লাচ্ছি, শরবত ও ফালুদা খেতে পছন্দ করেন। পুরান ঢাকার ইফতারির পাশাপাশি সেহেরিও বেশ জনপ্রিয়। মুঘল ও অনান্য মুসলমান শাসনামল থেকে বাঙালিদের খাদ্যাবভাসে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। মুঘলদের দারা বিরিয়ানি, সমুচা, পোলাও, কাবাব, চিকেন টিক্কা, তন্দুরি চিকেন, মুরগি মুসল্লম, হালিম, নেহারি, পরোটা, আটার রুটি, নান রুটি ইত্যাদি সব খাবার বাঙালিদের খাদ্যাবভাসে যোগ হয়। মোঘলাই পরোটা একটি জনপ্রিয় নাস্তা। বাংলায় মুসলমানদের দ্বারাই গরু, দুম্বা, ছাগল, ভেড়া, হরিণমহিষের মতন প্রাণীর মাংস ও হালাল খাবার খাওয়া শুরু হয়। মুসলমানদের আগমনের পর ঢাকা, সিলেটচট্টগ্রাম বিভাগের খাবারে বেশ উন্নতি ঘটে। বাঙালিয়ানা ও মুঘল ছোঁয়ার মিশ্রনে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় নানারকম খাবারের উৎপত্তি হয়েছে। ঢাকার বাকরখানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, পাক্কি বিরিয়ানি, বোবা বিরিয়ানি, হাজী বিরিয়ানী, মোতি বিরিয়ানি, মোহি বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, মাখন বিরিয়ানি, জালি কাবাব, সুতি কাবাব, হাঁড়ি কাবাব, কাঠি কাবাব, ঢাকাই পরোটা ইত্যাদি। সিলেটের সাতকরা, সাতকরা আচার, বিরন পোলাও, আখনী পোলাও, আলপাইন বিরিয়ানি, নুনগড়া, ডাল পিঠা, রোস্ট চিকেন, হাঁস-বাঁশ, হিদল চাটনি, ফরাশ, ফাতলা খিসুরি, ফাতলা জাউ, ইত্যাদি। চট্টগ্রামের কালাভুনা, লাল ভুনা, মেজবানি মাংস, মেজবানি ডাল, নল্লির ঝোল, রূপচাঁদা, দুরুজ, দুরুজ পোলাও, দই পটোল, খুড়বো ইত্যাদি সব খাবার। এছাড়াও গ্রামবাংলায় জন্মেছে ছোলা বিরিয়ানি, ইলিশ বিরিয়ানি, চিংড়ি বিরিয়ানি, ঝাল বিরিয়ানি আর চাল বিরিয়ানি। উপমহাদেশীয় দম বিরিয়ানি আর টিক্কা বিরিয়ানি অন্যতম। বাঙালি মুসলমানদের বিয়েতে এমন বাহারী নবাবি খাবার পরিবেশন করা হয়। চট্টগ্রামের বিয়েতে জামাইয়ের জন্য দুরুজ আর অতিথিদের নন্নূচ পরিবেশন করা হয়ে থাকে। ঢাকা বিভাগের বেশিরভাগ জায়গায়ই হলুদের সময় তেহারি বা বিরিয়ানি আর বিয়ে ও বৌভাতে পোলাও, বিরিয়ানি, ঢাকাই চিকেন রোস্ট/বিয়ে বাড়ির রোস্ট, রেজালা, টিকিয়া, কাবাব আর মিষ্টান্নের মধ্যে বিয়েবাড়িতে কাপ দই, বিয়ে বাড়ির ফিরনি, জর্দা, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামাই জর্দা ইত্যাদি খাবার পরিবেশন করা হয়। সিলেটে বিয়ের সঙ্গে পানের একটি সম্পর্ক আছে। বিয়ের পূর্বে "পান চিনি" নামক রীতি আছে। এছাড়াও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর কনেকে "পান শরবত" পান করানো হয়। এছাড়াও চট্টগ্রামের মেজবান, সিলেটের ফুরির বাড়ি ইস্তারি আর ঢাকার মিলাদ বা দোয়া মাহফিলের পরে মিষ্টান্ন বিতরণের প্রথার মতন খাবারকে ঘিরে বিভিন্ন প্রথা মুসলিম সমাজে বাঙালিদের দারা শুরু হয়েছে।

মেজবানির জন্য রান্না।
আকবর, একজন মুসলমান শাসক এবং বাংলা বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তক

বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলমান। তার কারণে বাংলার বেশিরভাগ উৎসব ও ধর্মীয় আচার গুলো সুন্নি মুসলমানদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। বাংলায় শত শত বছর ধরে মিলাদ মাহফিল, মেজবানি আয়োজন ও ওরশ আয়োজন হয়ে আসছে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বছর জুড়ে পহেলা বৈশাখরবীন্দ্র জয়ন্তী, জৈষ্ঠ্য উৎসব, নজরুল জয়ন্তী, বর্ষা ও ইলিশ উৎসব, শরৎ উৎসব, নৌকা বাইচ, নবান্ন, পৌষ সংক্রান্তি, পিঠা উৎসব, পহেলা ফাল্গুন, বসন্ত উৎসবচৈত্র সংক্রান্তি পর্যন্ত সারা বছর জুড়েই সাংস্কৃতিক উৎসবের আমেজ লেগেই থাকে। এছাড়াও বাউল উৎসব, ফল উৎসব ও অন্যান্য উৎসব ও পালন করেন বাঙালিরা। মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ১৫ আগস্টের মতন দিবসও পালনে কোনো ত্রুটি নেই। নজরুল জয়ন্তী ও রবীন্দ্র জয়ন্তী ছাড়াও বাংলাদেশে প্রায়ই মনীষী স্মরণােৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মনীষী-স্মরণােৎসবের মধ্যে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মীর মশাররফ হােসেন, মহাকবি কায়কোবাদ, ইসমাইল হােসেন সিরাজি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান প্রধান। এছাড়াও বাংলাদেশে কারণে, অকারণে নানা রকমের মেলা বসে থাকে। এছাড়াও রোকেয়া দিবস পালিত হয়। তাঁদের জন্ম, মৃত্যু এবং অবদান সম্পর্কে প্রতিবছরই আলােচনা ও স্মরণােৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসব। কিছু ইসলামী বক্তারা বাংলা সনকে নবী মোহাম্মদের হিজরতের সৌর গণনা বলে উল্লেখ করেন। বাংলা সন ও এর উৎযাপন মুঘল সম্রাট আকবরের দারা শুরু হয়েছিল, যিনি একজন মুসলমান ছিলেন। বাংলাদেশে নতুন বছর ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা হয়। রমনা পার্কের বটগাছের তলায় বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়।

এছাড়াও ধর্মীয় উৎসব যেমন ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা,‌ রমজান, চাঁদ রাত, জুমাতুল বিদা, জ্বিলহজ্জ মাসের চাঁদ, লাইলাতুল কদর, ঈদে মিলাদুন্নবি, শবে মেরাজ, মহররম মাসের পূর্বের দিন, ইসলামী নববর্ষ, আশুরা, আরাফাতের দিন, ঈদে গাদীর, মহররম মাসের প্রথম ৯ দিন, ও চল্লিশা উৎযাপিতো হয় । বাংলার মুসলমানদের নিজস্ব কিছু উৎসব আছে জা কিনা বাংলায়ই উৎপত্তি হয়েছে। উৎসবগুলো হলো বিশ্ব ইজতেমা,‌‌‌‌ মাইজভান্ডারী মিলন/মাইজভান্ডারী মেলা, হুজুর সাহেব মেলা, আখেরী চাহার শোম্বা, সাকরাইন, হালখাতার দাওয়াত পালন করা হয়। ইরাকিয়দের ইসলাম প্রচারের সময় ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম পালন করা শুরু হয়। এশিয়া মহাদেশের অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলের সাথে বাংলায়ও শবে বরাত পালন করা হয়। ইসলামে সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল আজহা হলেও, বাঙালিদের সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শাওয়ালের ঈদ/রোজার ঈদ

বাংলাদেশে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয় পবিত্র রমজান মাসের শেষ প্রান্তিক থেকে। মার্কেট ও শপিংমলগুলো মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে। যারা চাকরি বা জীবিকার জন্য তাদের পরিবার থেকে দূরে থাকেন, তারা পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে উৎসব পালন করতে নিজ শহর ও গ্রামে ফিরে আসেন। চাঁদ রাতে শিশুরা শাওয়াল মাসের হিলাল (অর্ধচন্দ্র) দেখতে খোলা মাঠে জড়ো হয়। মেয়েরা মেহেদী দিয়ে তাদের হাত সাজাচ্ছে। বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী সেমাই সকালের নাস্তা হিসাবে রোটি বা পরোটা বা লুচির সাথে পরিবেশন করা হয়। এরপর মানুষ ঈদগাহে ঈদের নামাজে অংশ নেয়। শিশুরা পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের পা ছুঁয়ে ‘সালাম’ করে। এবং প্রবীণরা তাদের অল্প পরিমাণ অর্থ দেন যা "সালামি" বা "ঈদি (উপহার)" নামে পরিচিত, যা শিশুদের জন্য ঈদের আনন্দের একটি বড় অংশ। খাবার টেবিলে বিরিয়ানি, পোলাও, পিঠা, কাবাব, কোর্মা, পায়েস, হালুয়া ইত্যাদির মতো সুস্বাদু নবাবি খাবার পরিবেশন করা হয়। বাংলাদেশের ধনী মুসলমানরাও দরিদ্র লোকদের মধ্যে যাকাত বিতরণ করে। লোকেরা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের বাড়িতে যায় এবং একে অপরকে "ঈদ মোবারক" (শুভ ঈদ) বলে শুভেচ্ছা জানায়। ঈদোৎসব উপলক্ষে পুরান ঢাকায় পুকুর পাড়ে ও চকবাজারে ঈদ মেলা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলা গ্ৰামবাংলায় বেশ জনপ্রিয়। পুরান ঢাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন ঈদ মিছিল হয়। ঈদ শোভাযাত্রাও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, জা কিনা সাধারনত ঈদের তৃতীয় দিনে ঘটে। টেলিভিশনে "ইত্যাদি" নামক অনুষ্ঠান হয় জা কিনা ঈদের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন নাটকের আয়োজনও করা হয়। ঈদে খেলাধুলার আয়োজনো করা হয়ে থাকে। হা-ডু-ডু, কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি গ্ৰামিন খেলা উভয় খেলোয়াড় ও দর্শকদের পর্যাপ্ত আনন্দ দেয়। এর পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। উত্তরবঙ্গে ঈদ-পর্বের সময় গ্রামের যুবকরা ‘চামড়ি’ খেলা দেখায়। বাঙালিরা ঈদুল ফিতরে রঙিন পোশাক পরতে পছন্দ করেন।

বিশ্ব হিজাব দিবস হল ২০১৩ সালে নাজমা খান নামে একজন মার্কিন বাঙালি মহিলা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান, প্রতি বছর ১লা ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী ১৪০টি দেশে অনুষ্ঠিত হয়।

বাঙালি শিল্পকলার উপাদানের অনুপ্রেরণায় জাতীয় ইদগাহ সজ্জিত
ঢাকা শহরের বসিলা কোরবানের সময় পশু হাঁটে নেবার পূর্বে গরুকে গোসল করানো হচ্ছে
Cuisine of India
ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাতের বিশেষত্ব হালুয়া
ঢাকাইয়াদের সাকরাইন
পুরান ঢাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতা
বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতের সময়
নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বিশ্ব ইজতেমা

[সম্পাদনা]

বিশ্ব ইজতেমা বা টঙ্গী ইজতিমা, প্রতিবছর সাধারণত বৈশ্বিক যেকোনো বড় সমাবেশ, কিন্তু বিশেষভাবে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক বৈশ্বিক সমাবেশ, যা বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাবলিগ জামাতের এই সমাবেশটি বিশ্বে সর্ববৃহৎ, এবং এতে অংশগ্রহণ করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। সাধারণত প্রতিবছর শীতকালে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়ে থাকে, এজন্য ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসকে বেছে নেয়া হয়।

ঢাকার নিকটবর্তী তুরাগ নদীর তীরে ইজতেমার তাঁবু।

লোকাচার

[সম্পাদনা]

কানে আযান

[সম্পাদনা]

একজন নবজাতকের কানে আযান, অন্যভাবে চিত্রনেত্রের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে শিশুরা শব্দের উৎস ও দিশা নির্দেশনা পেতে পারে। এছাড়াও, এর মাধ্যমে শিশুরা স্পষ্টতা বাড়ানোর চেষ্টা করে।

আকীকা

[সম্পাদনা]

আকীকা হল শিশুর জন্ম উপলক্ষে পশু কোরবানি করার একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক রীতি। এটি সাধারণত সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে সঞ্চালিত হয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটি ১৪ বা ২১ দিন পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। আকিকার উদ্দেশ্য হল সন্তানের নেয়ামতের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁর নিরাপত্তা ও দোয়া চাওয়া।বাঙালি সংস্কৃতিতে আকীকাকে ‘আকীকা’ বা ‘আকীকা’ বলা হয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে আকিকা পদ্ধতি ও রীতিনীতি ইসলামী ঐতিহ্যের অনুরূপ। নবজাতক শিশুর বাবা-মা তাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী একটি বা দুটি পশু কোরবানির ব্যবস্থা করেন। তারপর মাংস পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।আকিকাকে বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে পালিত হয়। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের এই ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত, নবজাতক শিশুর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা এবং সুস্বাদু খাবারের ভোজ।

মুখে ভাত

[সম্পাদনা]

শিশুর প্রথম শক্ত খাবার খাওয়ার দিনটিকে মুখে ভাত উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। সত্যি বলতে কি একটি শিশুর জীবনে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ শিশুর পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম, কিন্তু ছয় মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি তাকে সম্পূরক খাদ্য দিতে হবে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বিসমিল্লাখানি

[সম্পাদনা]

বিসমিল্লাহখানি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা পালন করে থাকে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুকে আরবি ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত শিখানো শুরু হয়। এটি আসলে ইসলামের অংশ নয়। বরং একে ইসলাম শিক্ষার হাতেখড়ি জাতীয় অনুষ্ঠান বলা যেতে পারে। কীভাবে ইবাদত (প্রার্থনা) করা উচিত, কীভাবে কুরআন পড়া উচিত- এ জাতীয় বিষয়গুলো শিক্ষা দানের সূচনা হয় এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে বিসমিল্লাহ (আরবি: بسم الله‎‎) শব্দানুসারে যার অর্থ আল্লাহ'র নামে।

হাতেখড়ি

[সম্পাদনা]

হাতেখড়ি হল একটি ঐতিহ্যবাহী বাঙালি অনুষ্ঠান যেখানে শিশুদের শিক্ষার জগতে পরিচিত করানো হয়। এই অনুষ্ঠানে বাচ্চাদের তাদের বড় বা শিক্ষকদের হাতে থাকা কলম দিয়ে তাদের প্রথম অক্ষর লিখতে শেখানো হয়। এই আচারটি একটি শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি শুভ সূচনা বলে মনে করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

ইসলামি সংস্কৃতিতে পুরুষদের খৎনা করার প্রথা বহুল প্রচলিত। পুরুষ খৎনা ইসলামি সমাজে ব্যাপক প্রচলিত এবং আইনত ইসলামের সকল মাযহাব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অনুশাসন হিসাবে গৃহীত হয়েছে। এটি বৃহত্তর ইসলামি সম্প্রদায়ের (উম্মাহ) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চিহ্ন হিসাবে বিবেচিত হয়। বাংলার সংস্কৃতিতে মুসলমানি বা খৎনাকে ঘিরে নানান লোকাচার রয়েছে। প্রিয়জনরা খৎনাদারের জন্য বিভিন্ন উপহার আনেন। ভজনের আয়োজন ও অনুষ্ঠান করা হয়। যার খৎনা হয়েছে তার লুঙ্গি পরার প্রচলন আছে। বড়রা বকশিশও দিয়ে থাকে।

জন্মদিন

[সম্পাদনা]

গ্ৰাম বাংলায় জন্মদিন উপলক্ষে পায়েশ ও পিঠা-পুলির আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের জন্য জন্মদিন প্রায়ই বেশি ধুমধাম করে পালিত হয়। অনেক পরিবার একটি পার্টি বা সমাবেশের আয়োজন করবে, যা সাজসজ্জা, সঙ্গীত এবং খাবারের সাথে সম্পূর্ণ হবে। যে ব্যক্তি তাদের জন্মদিন উদযাপন করছে সে পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে পারে এবং এই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ ক্রিয়াকলাপ বা গেমস সংগঠিত হতে পারে। অনেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রাণী কুরবানী করে।

বিয়ে

[সম্পাদনা]

বাঙালি মুসলমানদের বিবাহে নানা রকমের রীতি ও আনুষ্ঠান পালন করা হয়। বিয়ের পূর্বে বাঙালি মুসলমানদের পাকা দেখা, কাবিন, পান-চিনি, তত্ত্ব বিতরণ, রং খেলা ইত্যাদি লৌকিক আচার ও বিয়ের পরে বৌ ভাতের মতন লৌকিক আচার পালন করা হয়।

গায়ে হলুদ গায়ে হলুদ বাঙালি জাতির বহু প্রচলিত উৎসবের একটি। এটি মুলতঃ বিয়ে সম্পর্কিত একটি আচার যেটি বর ও কনে উভয় পক্ষ দ্বারা পালিত হয়। গ্ৰামে গায়ে হলুদ ও উপটান দিয়ে সকালে গোসল করানো হয়। পরে অনুষ্ঠান করা হয়। মুসলিম সমাজে কনে ও বরের গায়ে হলুদ আলাদা ভাবে করা হয়। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে বরের গায়ে হলুদে বরের গায়ে ও কনের গায়ে হলুদে কনের গায়ে হলুদ দেওয়ার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও রকমারি মিষ্টি, পিঠা, ফল ও কেক দিয়ে কনের ও বরকে মিষ্টি মুখ করা হয়। অতিথি আপ্যায়নে সাধারনত থাকে তেহারি বা বিরিয়ানি। অনুষ্ঠানে নাচ গানেরও আয়োজন করা হয়। মহিলারা মেয়েলী গান গায় ও আলপনা আঁকেন।

বিয়ে বাঙালি মুসলমানদের বিয়ে অনান্য মুসলমানদের মতন কাজী দিয়ে পড়ানো হলেও কাজীর কথা পুনরাবৃত্তি করার একজন পুরুষ থাকে, যাকে বলা হয় "উকিল বাবা"। বিয়ে পরানোর পর মোনাজাত হয় আর তার পর মিষ্টি, বাতাসা বা খুরমা বিতরণ করা হয়। বিয়েতে রকমারি মুঘল খাবার পরিবেশন করা হয়। বরযাত্রির আগমনের পর মেয়ে পক্ষরা পথ আটকায়, এই রীতিকে বলা হয় "গেট ধরা"। বর বরনের পর বরযাত্রিকে বিশেষ এক খাবার পরিবেশন করা হয়, যাকে বলা হয় "লগ্নন"।

বৌভাত বউ ভাত হল একটি বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান যা সাধারণত বাঙালি বিয়ের এক বা দুই দিন পরে হয়। এই অনুষ্ঠানে বরের বাবা বা পরিবারের দ্বারা একটি পার্টির আয়োজন করা হয়, যেখানে বর এবং কনের পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সাধ দেওয়া বা সাতশা[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

[সম্পাদনা]

গর্ভবতী মহিলাদের সাধ বা সাতশা অনুষ্ঠান হল একটি পুরাতন সংস্কৃতি যা প্রায় সমস্ত দেশে পাওয়া যায়। এই অনুষ্ঠানে, গর্ভবতী মহিলা একটি উন্নয়নের অনুরোধ করে, যা কিছু মিষ্টি, ফল, ফুল, নারিকেল, আরোগ্যকর খাবার, স্নান, পুরিফিকেশন, ইত্যাদির মাধ্যমে পূর্বের 'নিশি' (নিশি-নাচ) । এই প্রথাটি মূলত বাঙালি মুসলিম মহিলারা অনুসরণ করেন। উদযাপন সাধারণত গর্ভাবস্থার সপ্তম মাসে সঞ্চালিত হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে এই উদযাপনের উদ্দেশ্য হল মা এবং অনাগত সন্তান উভয়ের মঙ্গল নিশ্চিত করা। গর্ভবতী মহিলা একটি নতুন শাড়ি বা পোষাক পরেন এবং গহনা দিয়ে সজ্জিত হন। তাদের হাত-পা আলতা শোভা পায়। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তারা মা এবং অনাগত সন্তানের জন্য উপহার নিয়ে আসে। ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন পিঠা, মিষ্টি এবং ফল পরিবেশন করা হয়। মাকে হলুদ এবং অন্যান্য ভেষজ দিয়ে একটি বিশেষ স্নান করা হয়, তারপর একটি ম্যাসাজ করা হয়

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

যখন একজন মুসলমান মারা যায়, তখন পরিবার এবং সম্প্রদায়ের সদস্যদের দ্বারা অনুসরণ করা বেশ কিছু রীতিনীতি এবং আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। প্রথমত, লাশ ধুয়ে দাফনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এটি গোসল নামে পরিচিত এবং মৃত ব্যক্তির সমলিঙ্গের ব্যক্তিরা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করিয়ে থাকেন। তারপর মৃতদেহটিকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়, যা কাফন নামে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, জানাযার নামাজ, জানাযা নামে পরিচিত, অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয়ত, লাশ দাফনের জন্য কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে এটি মৃত্যুর পরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হয়, বিশেষত ২৪ ঘন্টার মধ্যে। মৃতদেহটি মক্কার দিকে মুখ করে ডান পাশে কবরে রাখা হয়েছে। দাফনের আগে ও পরে দোয়া করা হয়। দাফনের পরে, পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী পরিবারকে সমবেদনা জানানোর প্রথা রয়েছে। এটি পরিদর্শন, ফোন কল বা বার্তার মাধ্যমে করা যেতে পারে। মুসলমানদের জন্য মৃত ব্যক্তির পক্ষে দাতব্য কাজ করাও সাধারণ, যেমন একটি দাতব্য সংস্থাকে দান করা বা দরিদ্রদের খাওয়ানো। বাঙালি সংস্কৃতিতে শোকের ঘরে কোন ধরনের খাবার রান্না করা হয় না, আত্মীয় -সজন ও প্রিয়জনরাই খাবারের আয়োজন করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কেও মারা গেলে ঐতিহ্যবাহী মেজবান রান্না করা হয়।

নেতৃত্ব

[সম্পাদনা]
বায়তুল মোকাররম, বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ ও দেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদর দপ্তর

বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কোনো একক পরিচালনা পর্ষদ নেই, ধর্মীয় মতবাদের জন্য দায়বদ্ধ কোনো একক কর্তৃপক্ষও নেই। যাইহোক, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন, একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান, উৎসবের তারিখ নির্ধারণ ও যাকাত সম্পর্কিত বিষয়গুলি সহ বাংলাদেশে ইসলামিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ বাঙালি মুসলিম পণ্ডিতগণ গভীরভাবে গোঁড়া এবং রক্ষণশীল। পণ্ডিতদের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে মাওলানা, ইমাম, উলামামুফতিগণ

বাঙালি মুসলিম শিয়া সংখ্যালঘু ধর্মযাজগণ ১৮শ শতক থেকে পুরান ঢাকায় অবস্থান করছে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ

[সম্পাদনা]
বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

মুহাম্মদ ইউনূস হলেন প্রথম বাঙালি মুসলিম নোবেল বিজয়ী যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রধন ধারণার জনক, এবং যেকারণে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।[৬১] বেগম রোকেয়া ছিলেন বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারীবাদীদের একজন। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং ব্রিটিশ ভারতে বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিইস্কান্দার মির্জা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। খাজা সলিমুল্লাহ ছিলেন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রুশনারা আলী ছিলেন যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের প্রথম মুসলিম এমপিদের মধ্যে একজন। ফজলুর রহমান খান ছিলেন একজন বিশিষ্ট মার্কিন-বাঙালি মুসলিম প্রকৌশলী যিনি আধুনিক আকাশচুম্বী নির্মাণের নকশায় অসাধারণ পরিবর্তন এনেছিলেন।[৪৬] ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জাভেদ করিমসালমান খান হলেন খান একাডেমির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এম এ জি ওসমানী ছিলেন একজন চার তারকা জেনারেল যিনি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আলতামাস কবির ছিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি[৬২] নাফিসা আলী হলেন বিশিষ্ট বাঙালি মুসলমান যিনি ভারতীয় সিনেমায় অভিনয় করেন। আলাওল ছিলেন একজন মধ্যযুগীয় বাঙালি মুসলিম কবি যিনি আরাকানের রাজদরবারে কাজ করতেন।[৬৩] মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় বাঙালি মুসলিম নারীবাদী, কবি এবং সুশীল সমাজের নেত্রী। জয়নুল আবেদিন ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশী শিল্পের পথিকৃৎ। মাজহারুল ইসলাম ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিকতাবাদী পোড়ামাটির স্থাপত্যের গ্র্যান্ড মাস্টার।

পরিচয়

[সম্পাদনা]

বাঙালিরা দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলে বসবাসকারী এবং বাংলাভাষী অনার্য জাতির লোক। ঐতিহাসিভাবে এ অঞ্চলটি গঙ্গা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা ভারত থেকে বিভক্ত, যা বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন ভাষা ও সংস্কৃতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। প্রথম সহস্রাব্দে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে এবং তা বাঙালি সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। পারস্য, তুর্কি, আরব ও মুঘল শাসকদের আগমন বাংলার সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন, আহমদ শরিফ, মুহাম্মদ মোহর আলী ও যদুনাথ সরকার একমত পোষণ করেন যে, ইসলাম ধর্মপ্রচারক দ্বারা নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে অধিক সংখ্যায় বাঙালি মানুষ ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আজকের দিনে অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গআসাম রাজ্যে বসবাস করে।

বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই দেওবন্দীবেরলভী মতবাদের অনুসারী। কিছু সালাফী, ফুলতলী, শিয়া, কাদিয়ানী ও নির্দিষ্ট কোন দর্শনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন মুসলিমও এখানে বাস করে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

অন্যান্য বাঙালি ধর্মীয় সম্প্রদায়

[সম্পাদনা]

অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠী

[সম্পাদনা]

রূপরেখা

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Khan, Mojlum (২০১৩)। The Muslim Heritage of Bengal: The Lives, Thoughts and Achievements of Great Muslim Scholars, Writers and Reformers of Bangladesh and West Bengal। Kube Publishing Ltd। পৃ. ২। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৭৭৪-০৫২-৬Bengali-speaking Muslims as a group consists of around 200 million people.
  2. "Religions in Bangladesh | PEW-GRF"। ৯ এপ্রিল ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০২২
  3. 1 2 3
  4. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; PopAssam নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  5. "'Not cows to be milked' — Muslims in Bengal, Kerala, Assam are now assertive, want recognition"ThePrint। ৭ এপ্রিল ২০২১। ২৬ মার্চ ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মার্চ ২০২৩
  6. Bhattacharya, Abhik (২৬ অক্টোবর ২০২২)। "Museum To Display 'Miya' Culture In Assam Sealed, CM Says Only 'Lungi' Belongs To Them"Outlook
  7. "Explained: Why religious fault lines are emerging in Tripura"scroll.in। ১১ নভেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মার্চ ২০২৩
  8. Chaudhury, Dipanjan Roy। "Bengali-speaking Muslims languish in Pakistan"The Economic Times। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০২২There are around three million Bengalis in Pakistan
  9. "Microsoft Word — Cover_Kapiszewski.doc" (পিডিএফ)। United Nations। ৯ মে ২০১৬ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  10. "Stateless and helpless: The plight of ethnic Bengalis in Pakistan"। Al Jazeera। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২Ethnic Bengalis in Pakistan – an estimated two million – are the most discriminated ethnic community
  11. "Labor Migration in the United Arab Emirates: Challenges and Responses"। Migration Information Source। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩। ২৮ জুন ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩
  12. "Ethnic group by religion – Office for National Statistics"ons.gov.uk। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৩
  13. Scotland's Census 2021 Ethnic Group and Religion Update (2021). Scotland's Census.
  14. "Oman lifts bar on recruitment of Bangladeshi workers"News.webindia123.com। ১০ ডিসেম্বর ২০০৭। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  15. Snoj, Jure (১৮ ডিসেম্বর ২০১৩)। "Population of Qatar by nationality"Bqdoha.com। ২২ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  16. Richard Eaton (২০০৯)। Barbara D. Metcalf (সম্পাদক)। Islam in South Asia in Practice। Princeton University Press। পৃ. ২৭৫।
  17. Meghna Guhathakurta; Willem van Schendel (২০১৩)। The Bangladesh Reader: History, Culture, Politics। Duke University Press।
  18. Andre, Aletta; Kumar, Abhimanyu (২৩ ডিসেম্বর ২০১৬)। "Protest poetry: Assam's Bengali Muslims take a stand"। Al Jazeera।
  19. Mohammad Yusuf Siddiq (২০১৫)। Epigraphy and Islamic Culture। Routledge। পৃ. ৩০।
  20. J. N. Nanda (২০০৫)। Bengal: the unique state। Concept Publishing Company। পৃ. ১০।
  21. Richard Eaton। The Rise of Islam and the Bengal Frontier
  22. 1 2 Eaton, Richard Maxwell (১৯৯৬)। The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760। University of California Press। আইএসবিএন ৯৭৮০৫২০২০৫০৭৯। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০১৬ Google Books এর মাধ্যমে।
  23. Ali, Mohammad Mohar (১৯৮৮)। History of the Muslims of Bengal, Vol 1 (পিডিএফ) (2 সংস্করণ)। Imam Muhammad Ibn Saud Islamic University। পৃ. ৬৮৩, ৪০৪। আইএসবিএন ৯৮৪০৬৯০২৪৮। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০১৬
  24. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; nfb13May2005 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  25. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; aj23Dec2016 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  26. "Chapter 1: Religious Affiliation"Pewforum.org। ৯ আগস্ট ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুলাই ২০১৬
  27. Richard Maxwell Eaton (১৯৯৬)। The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760। University of California Press। আইএসবিএন ৯৭৮০৫২০২০৫০৭৯। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  28. "Bengali language"Encyclopædia Britannica। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  29. 1 2 Sen, Sailendra Nath (১৯৯৯)। Ancient Indian history and civilization (Second সংস্করণ)। New Delhi: New Age International। আইএসবিএন ৮১-২২৪-১১৯৮-৩
  30. Harper, Francesca (১২ মে ২০১৫)। "The 1,000-year-old manuscript and the stories it tells"। University of Cambridge। সংগ্রহের তারিখ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯
  31. "Monumental Absence: The Destruction of Ancient Buddhist Sites"The Caravan। ৯ জুলাই ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯
  32. Ahmed, Iftekhar; Reza, Mohammad Habib, সম্পাদকগণ (২০১৮)। Re-Imagining Bengal: Architecture, Built Environment and Cultural Heritage। Copal Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮৯৩৮৩৪১৯৬৪৭
  33. "Ancient mosque unearthed in Bangladesh"। Al Jazeera। ১৮ আগস্ট ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  34. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  35. Raj Kumar (২০০৩)। Essays on Ancient India। Discovery Publishing House। পৃ. ১৯৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭১৪১-৬৮২-০
  36. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  37. Al-Masudi (১৯৬২)। Les Prairies d'or [Murūj al-dhahab]। Paris: Société asiatique।
  38. Reza, Mohammad Habib; Ahmed, Iftekhar (২০১৮)। "Re-imagining Bengal: Critical thoughts"। Re-Imagining Bengal:Architecture, Built Environment and Cultural Heritage (ইংরেজি ভাষায়)। Copal Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮৯৩৮৩৪১৯৬৪৭
  39. "Ancient mosque unearthed in Bangladesh"। Al Jazeera। ১৮ আগস্ট ২০১২। ২১ মার্চ ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  40. Raj Kumar (২০০৩)। Essays on Ancient India। Discovery Publishing House। পৃ. ১৯৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭১৪১-৬৮২-০
  41. Al-Masudi, trans. Barbier de Meynard and Pavet de Courteille (১৯৬২)। "1:155"। Les Prairies d'or [Murūj al-dhahab] (ফরাসি ভাষায়)। Société asiatique।
  42. Qurashi, Ishfaq (ডিসেম্বর ২০১২)। "বুরহান উদ্দিন ও নূরউদ্দিন প্রসঙ্গ" [Burhan Uddin and Nooruddin]শাহজালাল(রঃ) এবং শাহদাউদ কুরায়শী(রঃ)
  43. Perween Hasan; Oleg Grabar (২০০৭)। Sultans and Mosques: The Early Muslim Architecture of Bangladesh। I.B. Tauris। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৫১১-৩৮১-০
  44. "History"Bangladesh Railway। ১৫ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১২
  45. "About BUET"BUET। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬
  46. 1 2 Encyclopædia Britannica {{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}: |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  47. "Surprise! There's a third YouTube co-founder"USA Today। ৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ জুলাই ২০১৭
  48. "China, Denmark projects among architecture award winners"The Washington Times (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯
  49. "Understanding the Bengal Muslims Interpretative Essays Hardcover"Irfi.org। ২৭ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  50. "Muslim Population by Country 2021"। ৬ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০২২
  51. "Bengal beats India in Muslim growth rate"The Times of India। ২১ জুলাই ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬
  52. "Assamese Muslims plan 'mini NRC'"The Hindu। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২০ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০২২
  53. "Population by religion community – 2011"Census of India, 2012। The Registrar General & Census Commissioner, India। ২৫ আগস্ট ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  54. "Muslim majority districts in Assam up"The Times of India। ৪ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০২২
  55. "Assam Muslim growth is higher in districts away from border"। ৩১ আগস্ট ২০১৫। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫
  56. "Census 2011 data rekindles 'demographic invasion' fear in Assam"। ২৬ আগস্ট ২০১৫। ৪ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫
  57. "Tripura: Anti-Muslim violence flares up in Indian state"BBC News। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০২২
  58. Topich, William J.; Leitich, Keith A. (১ জানুয়ারি ২০১৩)। The History of Myanmar। ABC-CLIO। আইএসবিএন ৯৭৮০৩১৩৩৫৭২৪৪ Google Books এর মাধ্যমে।
  59. Dizikes, Peter। "The hidden history of Bengali Harlem"MIT News Office। MIT। ১০ মে ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ নভেম্বর ২০১৬
  60. https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/special-read/news/alimuddins-graveyard-family-legacy-helping-the-poor-3302986
  61. "The Nobel Peace Prize for 2006"। Nobel Foundation। ১৩ অক্টোবর ২০০৬। ১৯ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০০৬
  62. "Altamas Kabir to become CJI on Sept 29"Hindustan Times। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১২। ১৫ মে ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ২০২০
  63. Rizvi, S.N.H. (১৯৬৫)। "East Pakistan District Gazetteers" (পিডিএফ): ৩৫৩। ৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৬ {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য |journal= প্রয়োজন (সাহায্য)

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]
  1. Figure only includes Muslims who reported their ethnicity as "Bangladeshi" in the 2021 census of England & Wales, combined with Scotland 2011 census figure (3,053)
উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামক গ্রুপের জন্য <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি