বাংলা কিচ্ছা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বাংলা কিচ্ছা (বাংলা কিসসা বা কেচ্ছা নামেও পরিচিত),[১] বাংলা কবিতা এবং গদ্যের একটি ধারার পাশাপাশি মৌখিক গল্প-বর্ণনার বাংলা ভাষায় একটি ঐতিহ্য। স্থানীয় বাঙালি লোককাহিনী এবং আরব ও টার্কো-পার্সিয়ান অভিবাসীদের গল্পের সংমিশ্রণে এটি বাংলায় সমৃদ্ধি লাভ করে।[২] এই জনপ্রিয় শিল্পটি গ্রামীণ বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো অবশিষ্ট রয়েছে।

কিচ্ছার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে প্রেম, বীরত্ব, সম্মান এবং নৈতিক অখণ্ডতার জনপ্রিয় কাহিনীর মাধ্যমে ইসলামী এবং / অথবা পার্সিয়ান ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেছিল। এটি বাংলায় পৌঁছে ধর্মের গণ্ডিকে অতিক্রম করে আরও ধর্মনিরপেক্ষ রুপে পরিণত হয়েছিল এবং বিদ্যমান প্রাক ইসলামিক সংস্কৃতির সাথে বাঙালি সংস্কৃতি এবং এর সত্তার লোককাহিনী যুক্ত করেছিল।

ব্যুৎপত্তি এবং উচ্চারণ[সম্পাদনা]

কিসসা শব্দের উৎপত্তি আরবি শব্দ ক্বিসসা (قصه‎) থেকে, যার অর্থ মহাকাব্য কিংবদন্তি বা লোক কাহিনী। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের অনেকগুলি ভাষাকে প্রভাবিত করেছে এবং এটি বাংলা, গুজরাটি, উর্দু এবং হিন্দি জাতীয় ইন্দো-আর্য ভাষা সমূহে নিয়মিত বিশেষ্য হিসাবে দেখা যায়। যদি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয় তবে শব্দটির অর্থ একটি আকর্ষণীয় গল্প বা উপকথা

ইতিহাস[সম্পাদনা]

কথিত আছে যে ১৫শ শতাব্দী থেকে কিচ্ছা বাংলায় প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বাঙালি মুসলিম লেখকরা তাদের কিচ্ছায় প্রেম, যুদ্ধ, ধর্ম এবং বীরত্বের পার্সো-আরব বিষয়গুলি মিশ্রিত করতেন। বাংলার দোভাশি উপভাষা কিচ্ছা লেখার জন্য একটি জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল। এটি সুবাহ বাংলা এবং শাহী বাংলার (যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাংলার পূর্বে বিদ্যমান ছিল) সরকারী ভাষা ও ফার্সি ভাষার শব্দভাণ্ডার দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সমগ্র বঙ্গ জুড়ে প্রচুর কিচ্ছা প্রকাশনা সংস্থা, বিশেষত বটতলায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার আয়োজন করা হয়েছিল। হাওড়ায় মুসালমানি কিচ্ছা সাহিত্যের মতো সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।[৩] বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবশ্য কিচ্ছা এর জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। যখন বিশুদ্ধ বাংলার (সাধু ভাষা) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুরু হয়, তখন দোভাশি উপভাষার পাশাপাশি এটিও জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। এর প্রমাণ পরবর্তীকালে মীর মোশাররফ হোসেনের কারবালার যুদ্ধ সম্পর্কে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে লেখা কিচ্ছা বিষাদ সিন্ধু, যা তিনি ঊনিশ শতকের শেষভাগে ফারসি ভাষায় দোভাশির পরিবর্তে শুধুমাত্র সংস্কৃত সাধু ভাষায় লিখেছিলেন।[৪]

উল্লেখযোগ্যতা[সম্পাদনা]

বাঙালি মুসলিম পরিবারে লিখিত বাঙালী কিচ্ছা গৃহস্থালী সরঞ্জাম হয়ে ওঠেছিল। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা হিসাবে বিবেচিত হত।[৫] চট্টগ্রামের বাহরাম খান লায়লা ও মজনুরর নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছিলেন যাকে তিনি "লাইলী-মজনু" নামে অভিহিত করেন। সাতকানিয়ার নিকটবর্তী মুহাম্মদ ইয়ার খন্দকারের পুত্র কবি নওয়াজীশ খান গুলী বাকাওয়ালি লিখেছিলেন, এটি ছিল প্রেম সম্পর্কে এবং এতে পরীদের মতো প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বর্ণিত গল্পের বিভিন্ন সংস্করণ বাংলার কবি লিখেছিলেন। অন্যান্য বিখ্যাত কিচ্ছার মধ্যে রয়েছে আমির হামজা, মধুমালতি, শিরিন-ফরহাদ, টুটিনামা, হাতিম তায়ি, সখী সোনা, জাংনামা, আলিফ-লায়লা ওয়া লায়লা এবং গুলে তারমুজ। উপর্যুক্ত তালিকা ব্যতীত উল্লেখযোগ্য লেখকদের মধ্যে সৈয়দ হামজা, নাসের আলী, রওশন আলী এবং ফকির শাহ গরিবউল্লাহ অন্তর্ভুক্ত ছিল।[২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "কেচ্ছা - শব্দের বাংলা অর্থ"english-bangla.com 
  2. Islam, Sirajul। "Kissa"Banglapedia: National Encyclopedia of BangladeshAsiatic Society of Bangladesh 
  3. Kumar Banerji, Amiya। West Bengal District Gazetteers। পৃষ্ঠা 462। 
  4. "Bishad Sindhu (Book II Chapter 4)"The Daily Star। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৪ আগস্ট ২০১৬ 
  5. Ahmed, Wakil। "Yusuf-Zulekha"Banglapedia: National Encyclopedia of BangladeshAsiatic Society of Bangladesh