জানাজার নামাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(জানাযা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

জানাযা একটি বিশেষ প্রার্থনা যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সচরাচর এটি জানাযার নামাজ নামে অভিহিত হয়। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মামলম্বীদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া বা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব অর্থাৎ কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অবশ্যই জানাযার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো এলাকা বা গোত্রের পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।

জানাযার নামাজ একজন ইমামের নেতৃত্বে জামাতের সাথে বা দলবদ্ধভাবে অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা বেজোড় সংখ্যক কাতারে বা সারিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করেন। এটি ৪ তকবিরের নামাজ। দাঁড়িয়ে এ নামাজ আদায় করতে হয় এবং সালাম ফেরানোর মধ্য দিয়ে এ নামায শেষ হয়। সাধারণত জানাযার নামাযের শেষে মুনাজাত বা দোয়া করতে হয় না কারণ ইসলামের প্রতিষ্ঠিত বিধান অনুযায়ী এ নামাযের মাধ্যমেই মৃতের জন্য দোয়া করা হয়। জানাযা শেষে মৃতব্যক্তিকে অবিলম্বে গোরস্থানে নিয়ে যেতে হয় এবং ইসলামী রীতিতে কবর তৈরী করে মাটিতে দাফন করতে হয়।

মৃত ব্যক্তির গোসল[সম্পাদনা]

মৃতকে গোসল দেওয়া ফরযে কেফায়াহ। যারা মৃত ব্যক্তিকে শর‘ঈ পদ্ধতিতে অর্থাৎ ইসলামের প্রতিষ্ঠিত বিধান অনুযায়ী গোসল দিতে জানেন, তারাই মৃতদের গোসলের দায়িত্ব নিবেন। মৃত ব্যক্তিকে এমন এক ঘেরা জায়গায় নিতে হবে, যেখানে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। যারা তাকে গোসল করানোর কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করবে এবং যারা তাদেরকে সহযোগিতা করবে, তারা ছাড়া আর কেউ তার কাছে যাবে না।

অতঃপর যে গোসল করাচ্ছে সে সহ অন্য কেউ যাতে মৃতের লজ্জাস্থান দেখতে না পায় সেজন্য মৃতের লজ্জাস্থানে এক টুকরা কাপড় বা ন্যাকড়া দিয়ে আবৃত করে দেহের কাপড়-চোপড় খুলে ফেলতে হয়। তারপর তাকে পরিষ্কার-পরিছন্ন করতে হবে। অতঃপর নামাজের অযূর ন্যায় তাকে অযূ করাতে হয়। তবে আলেমগণ মৃতের নাক-মুখে পানি প্রবেশ করাবে নিষেধ করেছেন। পরিবর্তে একটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে তা দিয়ে মৃতের দাঁতসমূহ এবং নাকের ভেতরে ঘষে পরিষ্কার করে দিতে হয়। এরপর মৃতের মাথা ধুয়ে দিতে হয়। অতঃপর তার সমস্ত শরীর পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে।

ইসলামের রাসুল মুহাম্মদ (সা:)-এর নির্দেশ এরকম যে শরীর ধোয়ানোর সময় মৃত ব্যক্তির ডান পাশ থেকে ধৌতকরণ শুরু করতে হবে। পানিতে বরই পাতা দেওয়া উত্তম কেননা তা পরিষ্কারকরণে সাহায্য করে। বরই পাতার ফেনা দিয়ে মৃতের মাথা, দাড়ি ধুয়ে দিতে হয়। তবে শেষ বার ধোয়ানোর সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশাতে হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাকে গোসলদানকারী মহিলাগণকে বলেছিলেন, “শেষবার ধোয়ার সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশাবে”। গোসল শেষে মৃতের গায়ের পানি মুছে ফেলে তাকে কাফনের কাপড় পরাতে হবে।[১][২]

নামাজে জানাজার সঠিক নিয়ম

লাইয়া সিহ্হহুস্ সালাতা ইল্লা বি ফাতিহা

"লা ইয়া সিহুসসালাতা ইল্লা বি ফাতি"

অর্থাৎ সুরা ফাতেহা ব্যাতিত কোন নামাজ সহিহ নয়।

অবিশ্যয় প্রথম তাকবিরের শেষে ছানা পড়ার পর সুরা ফাতিহা পড়ে অন্য যে কোন একটি সুরা পড়বে। দ্বিতীয় তাকবীর দুরুদে ইবরহীম

তৃতীয়তাকবিরে মৃত ব্যাকিতর জন্য দোয়া পড়বে।

আল্লাহুম্মাগ ফিরলী হাইয়েনা ওয়া মাইয়্যাতিনা শেষ পর্যন্ত

এবং রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতে শেষ পর্যাপ্ত পড়ে চতুর্থ তাকবির দিয়ে সালাম ফিরিয়ে শেষ করবে জানাজার নামাজ।

তাকবিরের পর দুরুদে ইব্রাহীম পড়বে।

কাফন[সম্পাদনা]

কোন মৃত মুসলমানকে মাটিতে দাফন করার পূর্বে যে কাপড় পরানো হয় তা কাফন নামে অভিহিত। কাফন ব্যতিরেকে জানাযা পড়া যায় না। মৃতকে গোসল দেওয়া শুরুর আগেই কাফনের কাপড় সংগ্রহ করে রাখতে হয়।

জানাযার পদ্ধতি[সম্পাদনা]

মৃতকে মুছল্লীদের সামনে রাখতে হবে। মৃত পুরুষ হলে ইমাম মাথা বরাবর দাঁড়াবেন আর মহিলা হলে মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন । অতঃপর প্রথম তাকবীর দিয়ে (অর্থাৎ, ‘আল্লাহু আকবার’ বলে) সানা পড়বেন, দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দরূদ শরীফ পড়বেন এবং তৃতীয় তাকবীর দিয়ে মৃতের জন্য নিম্নরূপ দো’আ করবেন।

«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ, اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ»

  • উচ্চারণঃ আললাহুম্মাগফিরলি হাইয়্যেনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহীদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগীরিনা ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আললাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলামী, ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ঈমান, বেরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহীমিন।
  • অনুবাদঃ হে আললাহ্ আমাদের জীবিত ও মৃত উপস্থিত ও অনুপস্থিত বালক ও বৃদ্ধ পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে ক্ষমা কর। হে আললাহ! আমাদের মধ্যে যাহাদিগকে তুমি জীবিত রাখ তাহাদিগকে মৃত্যু মুখে পতিত কর।

তৃতীয় তাকবীর দিয়ে ইমাম উক্ত সাধারণ দো’আটি পড়বেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত মৃতের জন্য বিশেষ দো‘আ পড়বেন। তা সম্ভব না হলে অন্য যে কোন দো’আর মাধ্যমে তার জন্য দো’আ করবেন। মোদ্দাকথাঃ মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষাবে কিছু দো’আ করবেন। কেননা সে দো’আর খুব বেশী মুখাপেক্ষী। অতঃপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে সামান্য একটু অপেক্ষা করে “আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ” বলে যথারীতি সালাম ফিরাবেন। বাম দিকে সালাম ফিরানোর মধ্য দিয়ে জানাজার নামাজ শেষ হবে। কোন কোন বিদ্বান চতুর্থ তাকবীরের পরে بَّنَا آتِنَا فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِى الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ﴾ [سورة البقرة পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন।[৩][৪]

গায়েবী জানাযা[সম্পাদনা]

কবরে দাফনের পূর্বে মৃত ব্যক্তির কাফন মোড়ানো দেহ সম্মুখে রেখে জানাজার নামাজ পড়াই ইসলামের বিধান। বিদ্বানগণের অগ্রাধিকারযোগ্য অভিমত হচ্ছে: যার জানাযা পড়া হয় নি, কেবল তার ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কারো গায়েবানা জানাযা শরী’আত সম্মত নয়। যেমনঃ কেউ যদি কাফের রাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করে এবং তার জানাযা পড়া না হয়, তাহলে তার গায়েবানা জানাযা পড়া আবশ্যক। কিন্তু যদি তার জানাযার নামাজ যথাযথভাবে একবারও সম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে সঠিক বিধান হলো তার গায়েবানা জানাযা শরী’আতসম্মত হবে না। কেননা বাদশাহ নাজাশী ছাড়া অন্য কারো গায়েবানা জানাযার কথা হাদীসে উল্লিখিত নেই।[৫] আর নাজাশীর জানাযার ছালাত তাঁর দেশে সম্পন্ন হয় নি। সে কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন। অনেক বড় বড় সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় ভিন্ন স্থানে মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাযা পড়েছেন মর্মে কিছুই বর্ণিত হয় নি।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ইমাম মুসলিম উম্মে আত্বিইয়া (রাদিয়াল্লাহু ’আনহা) হতে র্বণনা করেন, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৩৯ 
  2. জানাযার বিধিবিধান \ লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ 
  3. জানাযার বিধিবিধান \ লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ.। শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ.। 
  4. মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৭ 
  5. বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩১৩২৭; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]