বিষয়বস্তুতে চলুন

মুফতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কোরআন ও হাদিসের বিশদ জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে একজন মুফতিকে ইসলামের বিধান সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া প্রদান করতে হয়।

মুফতী (আরবি: مفتي) শব্দটি মূলত আরবি ক্রিয়াপদ "أفتى" (আফতা) থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো "কোনো ধর্মীয় বা আইনগত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা" কিংবা "ব্যাখ্যা করা"। ব্যাকরণগতভাবে এটি 'ইসমুল ফায়িল' বা اسم الفاعل (কর্তা) রূপে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় "ফতোয়া প্রদানকারী", "ধর্মীয় আইন বিশেষজ্ঞ" বা "পরামর্শদাতা"।

ইসলামি আইনশাস্ত্রে বা ফিকহের পরিভাষায়, মুফতি হলেন একজন উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ, যিনি ইসলামি আইনের উৎসসমূহ যেমন: পবিত্র কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে সাধারণ মানুষ বা বিচারকের জিজ্ঞাসিত জটিল বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সমাধান প্রদান করেন।[] একজন মুফতি কেবল শাস্ত্রীয় জ্ঞানই রাখেন না, বরং সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ইসলামের বিধানসমূহ ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা রাখেন। তাঁর প্রদত্ত এই আইনগত মতামত বা সিদ্ধান্তকেই 'ফতোয়া' বলা হয়।

পরিভাষা

[সম্পাদনা]

ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহ শাস্ত্রের পরিভাষায়, মুফতি হলেন সেই বিশেষায়িত ব্যক্তিত্ব, যিনি ইসলামি শরীয়াহ্‌র ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য, গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী। তিনি মূলত ইসলামি আইনের প্রধান উৎসসমূহ—অর্থাৎ পবিত্র কুরআন, হাদিস, ইজমা (ঐক্যমত) এবং কিয়াস (যৌক্তিক অনুমান)—এর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনগত সমস্যার প্রামাণিক সমাধান প্রদান করেন।

একজন মুফতি শরীয়াহ্‌র মূলনীতিসমূহ অনুসরণ করে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত নতুন নতুন সমস্যার ইসলামি বিধান বা ফতোয়া জারি করেন। তাঁর এই দায়িত্ব কেবল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি মুসলিম উম্মাহকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের নানাবিধ সংকটে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথনির্দেশনা প্রদান করেন। মুফতি হওয়ার জন্য ইসলামি আইনশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি (তাকাসসুস ফিল ফিকহ) লাভের পাশাপাশি সমকালীন সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও গভীর সচেতনতা থাকা আবশ্যক বলে গণ্য করা হয়।

যোগ্যতা

[সম্পাদনা]

ইসলামি আইনশাস্ত্রে একজন ব্যক্তিকে 'মুফতি' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তাঁকে কতগুলো কঠোর শাস্ত্রীয় ও চারিত্রিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। ফতোয়া প্রদানের মতো গুরুতর দায়িত্ব পালনের পূর্বে এই যোগ্যতাগুলো বরেণ্য ইসলামি পণ্ডিতদের দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে সত্যায়িত হওয়া আবশ্যক। একজন ব্যক্তি ফতোয়া প্রদানের যোগ্য কি না, তা মূলত নিচের মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়:[]

  • আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি: মুফতিকে আরবি ভাষার ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং সাহিত্যের ওপর পূর্ণ দখল থাকতে হয়। যেহেতু ইসলামি আইনের মূল উৎসসমূহ আরবিতে, তাই মূল টেক্সট থেকে সরাসরি বিধান উদ্ঘাটনের জন্য এই দক্ষতা অপরিহার্য।
  • কুরআনহাদীস শাস্ত্রে পারদর্শিতা: তাঁকে পবিত্র কুরআনের নাসিখ-মানসুখ (রহিত ও রহিতকারী আয়াত), শানে নুযূল (আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট) এবং আহকাম সংক্রান্ত আয়াতগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হয়। একইভাবে, হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের নীতি (উসুলুল হাদিস) এবং হাদিসের মর্মার্থ বুঝতে গভীর জ্ঞান থাকতে হয়।
  • উসুল আল ফিকহ বা ইসলামি আইনতত্ত্বে গভীর জ্ঞান: এটি মুফতি হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শরিয়তের দলিলসমূহ থেকে কীভাবে আইনি সমাধান বের করতে হয় (ইস্তিমবাত), তার গাণিতিক ও যৌক্তিক পদ্ধতি বা মূলনীতিগুলোর ওপর তাঁর বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
  • সামাজিক অবস্থা ও সমকাল সম্পর্কে সচেতনতা: কেবল কিতাবগত জ্ঞানই একজন মুফতির জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁকে সমসাময়িক যুগের সামাজিক রীতিনীতি, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, মনস্তত্ত্ব এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। কারণ, পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় ফতোয়ার প্রয়োগের ধরণও পরিবর্তিত হতে পারে।
  • তাকওয়া ও বিশ্বস্ততা: শাস্ত্রীয় যোগ্যতার পাশাপাশি একজন মুফতিকে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপ্রাণ, সৎ এবং চারিত্রিক স্খলনমুক্ত হতে হয়, যাতে তাঁর প্রদত্ত সমাধান বা ফতোয়ার ওপর জনমনে আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় থাকে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "Dictionary, Encyclopedia and Thesaurus - The Free Dictionary"TheFreeDictionary.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
  2. Reaching the status of mufte[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]