বাংলা উপভাষা

(যেগুলোর পাশে তারাকৃতি চিহ্ন (*) আছে সেগুলো কখনও কখনও উপভাষা এবং কখনও কখনও আলাদা ভাষা হিসেবে বিবেচিত হয়)
| বাংলার সংস্কৃতি |
|---|
| বিষয় সম্পর্কিত ধারাবাহিক |
| ইতিহাস |
| রান্না |
| বাংলাদেশের সংস্কৃতি |
|---|
| বিষয় সম্পর্কিত ধারাবাহিক |
বাংলা ভাষার উপভাষাসমূহ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষা দলের অংশ। বাংলা উপভাষা বাংলাদেশ, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু রাজ্য, মায়ানমারের কিছু অংশ এবং নেপালের কিছু অংশে পাওয়া যায়।
শ্রেণিবিভাগ
[সম্পাদনা]বাংলা ভাষায় অঞ্চলভেদে ভিন্ন উচ্চারণ হয়ে থাকে, যেমন: বাংলাদেশের একটি উপভাষায় বলা হয়, 'আমি অহন ভাত খামু না' যা আদর্শ বাংলায় বলা হয়, 'আমি এখন ভাত খাব না।' ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষার শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলা ভাষা উচ্চারণ ভিত্তিতে আলাদা। তাই, বাংলা উপভাষা ছয় প্রকার:
বৈশিষ্ট্য সমূহ
[সম্পাদনা]১. রাঢ়ী উপভাষা
[সম্পাদনা]ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া (পূর্ব), হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, উত্তর চব্বিশ পরগণা (উত্তর পশ্চিম), নদীয়া জেলা ও বাংলাদেশের বৃহত্তর কুষ্টিয়া (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর) এই উপভাষার প্রচলন লক্ষ করা যায়। এই উপভাষাকে ভিত্তি করে প্রমিত বাংলা গঠন করা হয়েছে।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- অনেক শব্দের স্থলে ব্যবহৃত ‘অ’-এর ‘ও’-রূপে উচ্চারণ প্রবণতা।
- যেমন—অতুল→ওতুল, মধু→মোধু,
- শব্দে ব্যবহৃত ‘ন’ ‘ল’ রূপে এবং ‘ল’ ‘ন’ রূপে উচ্চারণ লক্ষ করা যায়।
- যেমন—নৌকা→লৌকা, নয়→লয়; লুচি→নুচি, লেবু→নেবু।
- কর্তৃকারকের বহুবচনে ‘গুনো’, ‘গুনা’ এবং অন্য কারকের বহুবচনে ‘দের’ বিভক্তির প্রয়োগ।
- যেমন—মেয়েগুনো, পাখিগুনা, রামেদের।
ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]এটি অধুনা বাংলাদেশের প্রধান উপভাষা। ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, খুলনা বিভাগ (বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরা বাদ দিয়ে), বরিশাল বিভাগ, বৃহত্তর কুমিল্লা-নোয়াখালী, বারাক উপত্যকা, উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁও, হোজাই, চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট বিভাগ, জিরিবাম, ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং মিয়ানমারের মংডো জেলা জুড়ে আছে এই উপভাষা। ভাষাভাষী সংখ্যা বিবেচনায় এই উপভাষাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- এ >অ্যা (কেন > ক্যান ) , উ >ও (মুলা > মোলা), ও >উ (দোষ >দুষ), র >ড় (ঘর >ঘড়) ধ্বনিতে পরিবর্তন ঘটে।
- গুল, গুলাইন দিয়ে বহুবচন পদ গঠিত হয়।
- যেমন- বাত গুলাইন খাও।
- গৌণকর্মে 'রে' বিভক্তি প্রযুক্ত হয়।
- যেমন- আমারে মারে ক্যান।
ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]উত্তরবঙ্গের মালদহ বিভাগ (উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর বাদে), এবং বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগ, গাইবান্ধা ও দিনাজপুর জেলার কিছু অংশের লোকমুখের উপভাষা হল এটি। এটি ঝাড়খণ্ড ও বিহারের কিছু অংশেও বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- অপ্রত্যাশিত স্থানে 'র' আগম বা লোপ।
- যেমন- আম > রাম, রস > অস।
- গৌণকর্মে 'কে', 'ক' বিভক্তি দেখা যায়।
- যেমন- হামাক দাও।
ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ, পশ্চিম বর্ধমান জেলা ও ঝাড়খণ্ডের বোকারো, ধানবাদ, সড়াইকেলা, পূর্ব ও পশ্চিম সিংভূম জেলা, হাজারিবাগ জেলা এবং ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ ও বালেশ্বর জেলায় এই উপভাষা প্রচলিত।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- প্রায় সর্বত্র 'ও'-কার লুপ্ত হয়ে 'অ'-কারে পরিণত হয়েছে।
- যেমন- লোক > লক, মোটা > মটা, অঘোর >অঘর, ছোটো > ছটো
- ক্রিয়াপদে স্বার্থিক 'ক' প্রত্যয়ের প্রচুর প্রয়োগ।
- যেমন- যাবেক, খাবেক, করবেক।
- নামধাতুর প্রচুর ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
- যেমন- জাড়াচ্ছে, গঁধাচ্ছে।
ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার; আসামের বঙাইগাঁও, কোকড়াঝাড়, গোয়ালপাড়া, ধুবড়ী জেলা ও বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ এর কিছু জেলায় এটি প্রচলিত। বরেন্দ্রী ও বঙ্গালী উপভাষার মিশ্রণে এই উপভাষা গড়ে উঠেছে। এটি নেপালের মোরাং ও ঝাপা জেলাতেও বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- 'র' ও 'ড়' এবং 'ন' ও 'ল'-এর বিপর্যয় লক্ষ করা যায়।
- যেমন- বাড়ি >বারি, জননী >জলনী।
- শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাতের জন্য 'অ', 'আ' রূপে উচ্চারিত হয়।
- যেমন- অসুখ >আসুখ, কথা >কাথা।
- 'ও' ধ্বনি কখনো কখনো 'উ' হয়ে যায়।
- যেমন- কোন >কুন, বোন >বুন।
- যৌগিক ক্রিয়াপদে 'খোয়া' ধাতুর ব্যবহার আছে।
- যেমন- রাগ করা >আগ খোয়া।[১]
ভৌগোলিক সীমা
[সম্পাদনা]বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা এবং যশোর ও খুলনা জেলার কিছু অংশ, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা (বনগাঁও, ব্যারাকপুর ও বারাসাত মহাকুমা বাদে) ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা (কাকদ্বীপ মহকুমা বাদে), নদীয়া জেলার দক্ষিণ অংশ এই অঞ্চলের ভাষার বাচনভঙ্গি ও টান কোনোভাবেই রাঢ়ী এবং বঙ্গালী উপভাষার সাথে সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্য বহন করেনা। যার কারণে এটিকে আলাদা হিসেবে গণ্য করা হয়।

বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- ‘তি’, ‘কে’, ‘গে’ বা ‘গি’ বিভক্তি যোগ হয়।
- যেমন- দৌড়ে দৌড়ে স্কুলে যাবো → দৈর্গে দৈর্গে ইসকুলি যাবান।
- শব্দের শুরুতে হ-ধ্বনি যুক্ত রূপ শোনা যায়।
- যেমন- এখন → হেকন, এমন → হামন।
- অঘোষ ব্যঞ্জন অনেক সময় ঘোষ হয়ে যায়।
- যেমন- ফুপু → ফুবু।
- নাসিক্য উচ্চারণের প্রবণতা দেখা যায়।
- যেমন- কাচ → কাঞ্চ, ঝাটা → ঝ্যান্টা।
আঞ্চলিক উপভাষার পার্থক্য
[সম্পাদনা]
বাংলা ভাষায় উপভাষাগত পার্থক্য তিনটি রূপে রয়েছে: প্রমিত উপভাষা বনাম আঞ্চলিক উপভাষা, সাহিত্যিক ভাষা বনাম কথোপকথন ভাষা এবং আভিধানিক (শব্দভান্ডার) ভিন্নতা। উপভাষাগুলোর নাম সাধারণত সেই জেলা থেকে উদ্ভূত হয় যেখানে ভাষাটি বলা হয়।
যদিও ভাষার প্রমিত রূপ দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাভাষী অঞ্চল জুড়ে খুব বেশি বৈচিত্র্য দেখায় না, কথ্য বাংলায় আঞ্চলিক বৈচিত্র্য একটি উপভাষা ধারাবাহিকতা গঠন করে। বেশিরভাগ উপভাষা মাত্র কয়েক মাইলের দূরত্বের পরেই পরিবর্তিত হয়। আবার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও স্বতন্ত্র রূপ নেয়। বাঙালি হিন্দুরা সংস্কৃত বাংলায় কথা বলার প্রবণতা রাখে (সাধু ভাষার একটি অবশিষ্টাংশ), বাঙালি মুসলমানরা বেশি ফার্সি-আরবি শব্দভান্ডার ব্যবহার করে (দোভাষী উপভাষার একটি অবশিষ্টাংশ) এবং বাঙালি খ্রিস্টানরা তাদের নিজেদের চেনাশোনাতে জড়িত থাকার সময় খ্রিস্টীয় বাংলায় কথা বলে। বর্তমান উপভাষাগুলি ছাড়াও আরও কয়েকটি রয়েছে যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, 'বিক্রমপুরী', সাতগাইয়া' (এটি পূর্ববঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম রাড় অঞ্চলের উপভাষার জন্য ব্যবহৃত নাম)।
খারিয়া থার এবং মাল পাহাড়িয়া সহ পরবর্তী দুটি পশ্চিমী বাংলা উপভাষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তবে সাধারণত আলাদা ভাষা হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। একইভাবে, রাজবংশী এবং হাজংকে পৃথক ভাষা হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যদিও তারা উত্তর বাংলা উপভাষার সাথে খুব মিল। এছাড়াও আরও অনেক ছোটোখাটো উপভাষা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পূর্ণিয়া ও সিংভূমের সীমান্তবর্তী জেলা এবং হাজং ও চাকমাদের মতো পূর্ব বাংলাদেশের উপজাতিদের মধ্যে কথা বলা।
উচ্চারণগত বৈচিত্র
[সম্পাদনা]পদ্মা নদীর পশ্চিম পাড়ে এবং পূর্ব পাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের কথাবার্তার মধ্যে লক্ষণীয় দ্বান্দ্বিক পার্থক্য রয়েছে।
বাঙালি উপভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা উপভাষা: পূর্ব উপভাষাগুলো ঢাকা জেলার প্রাথমিক কথোপকথন ভাষা হিসাবে কাজ করে। পশ্চিমা উপভাষাগুলোর বিপরীতে যেখানে ট /t̠/ এবং ড /d̠/ যথাক্রমে তালুদন্তমূলীয় ধ্বনি, এছাড়া বেশিরভাগ পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপভাষায়ও একইভাবে উচ্চারণ করে, বিশেষ করে কম আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায়। এই উপভাষাগুলোরও বৈপরীত্য অনুনাসিক স্বর বা র /r~ɾ/, ড়, ঢ় /ɾ̠, ɾ̠ʱ/-এ একটি পার্থক্যের অভাব রয়েছে, এসবের বেশিরভাগই /ɹ/ হিসাবে উচ্চারণ করে, যদিও কিছু বক্তা বুঝতে পারেন একটি ব্যঞ্জনবর্ণ বিরতির আগে ঘটলে /r~ɾ/। এটি সিলেটি উপভাষার ক্ষেত্রেও সত্য, যা বিশেষ করে আসামের কামরূপী উপভাষার সাথে অনেক মিল রয়েছে এবং কখনো কখনো এটি একটি পৃথক ভাষা হিসাবে বিবেচিত হয়। পূর্ব উপভাষাগুলি দক্ষিণ-পূর্ব উপভাষা পর্যন্ত বিস্তৃত, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের কিছু অংশ। চট্টগ্রামের উপভাষায় তিব্বত-বর্মনের প্রভাব রয়েছে।
উষ্ম
[সম্পাদনা]বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে (বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা) প্রচলিত উপভাষায়, রাঢ়ি উপভাষায় শোনা অনেক স্পষ্ট ধ্বনি উষ্মধ্বনি হিসেবে উচ্চারণ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের দন্তমূলীয়-তালব্য বা তালুদন্তমূলীয় ঘৃষ্টধ্বনি চ [tɕ~tʃ], ছ [tɕʰ~tʃʰ], জ [dʑ~dʒ] এবং ঝ [dʑʱ~dʒʱ] যা পূর্ব বাংলার চ [s], ছ [s], জ [z~ð̠], এবং ঝ [z~ð̠~zʱ]-এর সঙ্গে পুরোটা মেলে না। তবে এই উচ্চারণ অসমিয়াতে পাওয়া যায়, যেটি ভারতের সীমান্তের ওপারের একটি সম্পর্কিত ভাষা। পূর্ব বাংলায় স [s]-কে শ [ʃ] উচ্চারণ করা হয়, যেখানে পশ্চিম বাংলায় স এবং শ [ʃ]-কে s উচ্চারণ করা হয়।
পশ্চিম বাংলার মহাপ্রাণ পশ্চাত্তালব্য স্পর্শ খ [kʰ], অঘোষ মহাপ্রাণ উভয়ৌষ্ঠ্য স্পর্শ ফ [pʰ], ঘোষ মহাপ্রাণ উভয়ৌষ্ঠ্য স্পর্শ ভ [bʱ] আর অঘোষ দন্ত্য স্পর্শ থ [t̪ʰ] পূর্ব বাংলার বহু উপভাষায় যথাক্রমে খ় [x], ফ় [ɸ~f], ভ় [β~v] এবং থ় [θ] রূপে উচ্চারিত হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বরযুক্ত স্টপগুলো শ্বাস-প্রশ্বাস হারায়। ঘোষ পশ্চাত্তালব্য গ [g] আর গ় [ɣ]-এর ঘর্ষণীয় হতে পারে আর পরে বেশিরভাগ সময়ই হারিয়ে যায়।
পূর্ব বাংলার বহু উপভাষা অসমীয়ার সঙ্গে ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ভাগ করে, যার অন্তর্ভুক্ত স ও শ [ʃ]-এর মুখবিবরবিহীনিকরণ দ্বারা হ [h~ɦ] হয় (কিন্তু খ় [x] উচ্চারিত হয় না)।
পুর্ববঙ্গীয় (বাংলাদেশীয়) বাংলার ধ্বনিব্যবস্থায় তিব্বতোবর্মী ভাষাসমূহের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
এই প্রভাবের ফলস্বরূপ উক্ত অঞ্চলের উপভাষাসমূহে নাসিক্য স্বরধ্বনির প্রায় সম্পূর্ণ লোপ লক্ষ্য করা যায়। তদুপরি ট, ঠ, ড, ঢ ব্যঞ্জনধ্বনিসমূহ প্রচলিত ভারতীয় মূর্ধন্য উচ্চারণরীতির পরিবর্তে প্রায়ই দন্তমূলীয় প্রক্ষেপে উচ্চারিত হয়, যা থাই ও লাও ভাষার সমগোত্রীয় ধ্বনির সহিত অধিকতর সাদৃশ্য প্রদর্শন করে। অধিকন্তু র [ɾ] এবং ড়, ঢ় [ɾ̠, ɾ̠ʱ]–এর ধ্বনিগত প্রভেদ বহু উপভাষায় বিলুপ্তপ্রায়।
এলাকার অন্যান্য ভাষার তুলনায় কিছু পুর্ববঙ্গীয় উপভাষায় নিঃশ্বাস সমৃদ্ধ ব্যঞ্জনধ্বনি—ঘ [gʱ], ঝ [dʒ], ঢ [d̠ʱ], ধ [d̪ʱ], ভ [bʱ]—অনুপস্থিত বা অত্যন্ত বিরল।
চাটগাঁইয়া ও চাকমা ভাষা বাংলার ন্যায় পূর্বদক্ষিণাঞ্চলীয় কিছু রূপে পুনরায় স্বরভিত্তিক উচ্চ-নীচতার বৈশিষ্ট্য প্রতীয়মান; অর্থাৎ স্বরভঙ্গির পার্থক্য শব্দার্থে কিছুটা পরিবর্তন সাধন করতে পারে।
উত্তর-বাংলাদেশের হাজং-উপভাষাসহ কতিপয় রূপে উ এবং ঊ ধ্বনির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
‘উ’ ধ্বনিটি মানক বাংলার সমতুল্য হলেও ‘ঊ’ ধ্বনিটি উক্ত উপভাষায় জাপানি [ü͍] ধ্বনির ন্যায়। অনুরূপভাবে, উত্তরাঞ্চলের বহু উপভাষায় ই [ɪ] ও ঈ [i] ধ্বনিরও সমান্তরাল বিভেদ সংরক্ষিত আছে।
তুলনা
[সম্পাদনা]| প্রমিত কথ্য বাংলা | প্রমিত সাহিত্যিক বাংলা | যশোর-খুলনাইয়া | বরিশালী | পুরান ঢাকাইয়া | বিক্রমপুরী-ঢাকাইয়া | ফরিদপুরি | বরেন্দ্রী | ময়মনসিংহী | পূর্ব রাঢ়ী | মেদিনীপুরী | নোয়াখাইল্লা | চাটগাঁইয়া | সিলেটী | রংপুরী | সুন্দরবনী | কুমিল্লাইয়া | ঝাড়খণ্ডী | মালদাহিয়া/শেরশাবাদিয়া |
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| আমি | আমি/মুই | আমি | আমি/মুই | আমি | আমি | আমি | হামি/আমি | আমি | আমি | আমি/মুই | আঁই | আঁই | আমি | মুই | আমি | আমি | হামি/আমি | হামি |
| খাব | খাইব | খাবো/খাবানি | খামু | খামু | খামু/খায়বানি | খামু | খাবো/খামো | খামু/খাইবাম | খাব | খাইব | খাইয়ুম | হাইয়ুম | খ়াইমু | খাইম্ | খাব | খামু/খায়াম্ | খাব | খামো |
| খাচ্ছি | খাইতেছি | খাইতিছি | খাইতাছি | খাইতাছি | খায়তাছি | খাইতাছি | খাইচ্ছি | খাইতাছি | খাচ্চি | খাইটি/খাইতেচি | খাইয়ের | হাইর | খ়াইয়ার | খাবার ধরছুং | খাইতিচি | খাইতাছি | খাইছি | খাইতিছি/খেতিছি |
| টাকা | টাকা | টাহা | টাহা | ট্যাকা | টেহা/টেকা | টাহা | ট্যাকা | ট্যাহা | টাকা/টেকা | টেকা | টিঁয়া | টিঁয়া | টেখ়া | টেকা | টাকা/টাআ | ট্যাহা | টেকা | ট্যাকা/টেকা |
| ঢাকা | ঢাকা | ঢাহা | ঢাহা | ঢাকা | ঢাহা/ঢাকা | ঢাহা | ঢাকা | ঢাহা | ঢাকা | ঢাকা | ঢাহা | ঢাহা | ঢাখ়া | ঢাকা | ঢাকা/ঢাআ | ঢাহা | ঢাকা | ঢাকা |
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ বাংলা ভাষা ও উপভাষা, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স
- আহসান, সৈয়দ আলী (২০০০), বাংলা একাডেমী বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, বাংলা একাডেমি, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪০৩৮-৫.
- হালদার, গোপাল (২০০০), লাঙ্গুয়েজেস অগ ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, আইএসবিএন ৮১-২৩৭-২৯৩৬-৭