বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)
|
বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের শাসনকর্তা লর্ড কার্জনের নির্দেশে প্রথম বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়।
বাংলা বিভক্ত করার ধারনাটি অবশ্য লর্ড কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল ১৭৬৫ সাল থেকে বিহার ও ওড়িশা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারি প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই।[১] কিন্তু ১৯১১ সালে প্রচণ্ড গণআন্দোলনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়। দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালে, যার ফলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যুক্ত হয়। এই পূর্ববঙ্গই পরবর্তীকালে পাকিস্তানের কাছ থেকে একটি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে এবং বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্র হয়ে যায়।
পটভূমি
[সম্পাদনা]বঙ্গ প্রদেশের আয়তন ছিল ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল (৪,৯০,০০০ বর্গকিলোমিটার) এবং জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখ। বঙ্গের পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিক এবং অপ্রতুল যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে পশ্চিমাঞ্চল হতে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। ১৮৩৬ সালে উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোকে বঙ্গ থেকে পৃথক করে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধিনে ন্যস্ত করা হয় এবং ১৮৫৪ সালে বঙ্গের প্রশাসনিক দায়িত্ব হতে গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে অব্যাহতি দিয়ে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের উপর অর্পণ করা হয়। ১৮৭৪ সালে সিলেট সহ আসামকে বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে চিফ-কমিশনারশীপ গঠন করা হয় এবং ১৮৯৮ সালে লুসাই পাহাড়কে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
বিভক্তিকরণ
[সম্পাদনা]১৮৯৯ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনাধীন ভারতের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন লর্ড কার্জন, যিনি প্রথমবার বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবসমূহ বিবেচনা করেন। তখন বঙ্গ প্রদেশ হতে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাদ্বয়কে আসাম প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাবও ছিল। তেমনিভাবে ছোট নাগপুরকে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে আত্তিকরণেরও একটি প্রস্তাব ছিল। ১৯০৪ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারীভাবে এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে লর্ড কার্জন বঙ্গের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে এক সরকারি সফরের মাধ্যমে এই বিভক্তির ব্যাপারে জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে এই বিভক্তির বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা দেন।
পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহী (দার্জিলিং বাদে) বিভাগ এবং মালদা জেলা, আসাম প্রদেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে এই নতুন প্রদেশ গঠন করবে। এর ফলে বঙ্গ শুধু তার বৃহৎ পূর্বাঞ্চলই হারাবে না, তাকে হিন্দীভাষী পাঁচটি রাজ্যও মধ্যপ্রদেশকে ছেড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে পশ্চিমে সম্বলপুর এবং মধ্যপ্রদেশের পাঁচটি ওড়িয়া-ভাষী রাজ্যের সামান্য অংশ বঙ্গকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। ফলে বঙ্গের আয়তন দাঁড়ায় ১,৪১,৫৮০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৫ কোটি ৪০ লাখ, যার মধ্যে ৪ কোটি ২০ লাখ হিন্দু ও ৯০ লাখ মুসলিম।
নতুন প্রদেশটির নামকরণ করা হয় “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” যার রাজধানী হবে ঢাকা এবং অনুষঙ্গী সদর দফতর হবে চট্টগ্রাম। এর আয়তন হবে ১,০৬,৫০৪ বর্গমাইল (২,৭৫,৮৪০ বর্গকিলোমিটার) এবং জনসংখ্যা হবে ৩ কোটি ১০ লাখ, যাদের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম ও ১ কোটি ২০ লাখ হিন্দু। এর প্রশাসন একটি আইন পরিষদ ও দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি রাজস্ব বোর্ড নিয়ে গঠিত হবে এবং কলকাতা হাইকোর্টের এখতিয়ার বজায় থাকবে। সরকার নির্দেশ দেয় যে পূর্ব বঙ্গ ও আসামের পশ্চিম সীমানা স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট থাকবে সাথে সাথে এর ভৌগোলিক, জাতিক, ভাষিক ও সামাজিক বৈশিষ্টাবলিও নির্দিষ্ট থাকবে। সরকার তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ১৯শে জুলাই, ১৯০৫ সালে এবং বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ই অক্টোবর।
নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ
[সম্পাদনা]| বিভাগ ও নাম | অন্তর্ভুক্ত জেলাসমূহ |
|---|---|
| ঢাকা (রাজধানী) | ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও সুন্দরবন। |
| চট্টগ্রাম | চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, কুমিল্লা। |
| রাজশাহী | রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, মালদহ ও জলপাইগুড়ি। |
| সুরমা উপত্যকা ও পার্বত্য বিভাগ | সিলেট, কাছাড়, লুসাই পার্বত্য জেলা, নাগা পার্বত্য জেলা, খাসিয়া জয়ন্তিয়া পার্বত্য জেলা ও গারো পার্বত্য জেলা। |
| আসাম উপত্যকা | গোয়ালপাড়া, কামরূপ, দাররাং, নওগাও, শিবসাগর ও লখিমপুর জেলা। |
| দেশীয় রাজ্য | পার্বত্য ত্রিপুরা ও মনিপুর।[২] |
বঙ্গভঙ্গ রদ
[সম্পাদনা]বঙ্গভঙ্গ এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করে। যারা ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তারা কেউই বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানাননি। কেননা, বঙ্গভঙ্গের অন্যতম একটি কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ‘বিভক্ত ও শাসননীতি' (Divide and Rule Policy), পরবর্তীতে যাতে তারা সফল হয়। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে মুসলমানরা ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। তাছাড়া, স্মরণাতীতকাল থেকে পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের ও পশ্চিম বাংলায় হিন্দুদের প্রাধান্য বিরাজমান ছিল। এজন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গের জন্য উদ্যোগী হয়। পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের এই ধারণা হয় যে নতুন প্রদেশের ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ বেড়ে যাবে। একইসাথে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ এই বিভক্তি মেনে নিতে পারেনি এবং প্রচুর পরিমাণে জাতীয়তাবাদী লেখা এই সময় প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিতে আমার সোনার বাংলা গানটি লেখেন বলে অপ্রমাণিত দাবি রয়েছে, যা অনেক পরে, ১৯৭২ সালে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়।
এই সকল রাজনৈতিক প্রতিবাদের ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে বঙ্গ আবার একত্রিত হয়। ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমীয়া অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়। এরই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নয়া দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। মুসলমানরা উপলব্ধি করে যে ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলমানদের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে না। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ বাংলার মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শিক্ষা দেয়।
প্রভাব
[সম্পাদনা]বঙ্গভঙ্গ রদের পর বাঙালি মুসলমানদের ভাঙা মনের ক্ষত সারাতে ব্রিটিশরা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেয়। ১৯০৫ সালের রাজনৈতিক ধাক্কায় বিশেষভাবে পূর্ববঙ্গ জেগে উঠে এবং ব্যস্ত হয়ে পড়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সম্প্রসারনে। পরবর্তী পাঁচ বছরে এই এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় বৃদ্ধির শতকরা হার দাঁড়িয়েছিলো ৮২.৯ ভাগ।[৩]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Partition of Bengal | Indian history" (ইংরেজি ভাষায়)। ৪ মে ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ১ জুলাই ২০২৩।
- ↑ Imperial gazatte of India Provincial Series, Eastern Bengal and Assam, 1909
- ↑ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (২০০৭)। বাঙালীর জাতীয়তাবাদ। ঢাকা: ইউপিএল। পৃ. ৭৯। আইএসবিএন ৯৮৪-০৫-০২১৫-৮।



