বাংলাদেশের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
National emblem of Bangladesh.svg

এটি একটি ধারাবাহিক নিবন্ধশ্রেণীর অংশ যার বিষয়:

বাংলাদেশের ইতিহাস

প্রাচীন ইতিহাস
প্রাচীন ইতিহাস
গুপ্ত শাসন
গুপ্তোত্তর কাল
পাল সম্রাজ্য
সেন রাজবংশ
মধ্যযুগীয় ইতিহাস
মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা
তুর্কী শাসন
ইলিয়াস শাহী শাসন
হুসেন শাহী যুগ
আফগান শাসন
মুগল শাসন
ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা
ঔপনিবেশিক যুগ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন
বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন
নবজাগরণ
বঙ্গভঙ্গ
দেশ বিভাগ
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম
পূর্ব পাকিস্তানে বৈষম্য
স্বাধীনতা যুদ্ধ
স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৭২ - ১৯৭৫
১৯৭৬ - ১৯৯০
১৯৯১ - ২০০৬

প্রবেশদ্বার আইকন বাংলাদেশ প্রবেশদ্বার


বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটি বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অংশে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অঞ্চলের প্রধান অংশের সাথে দেশটির সীমানা মিলেছে, যেখানে চার হাজারেরও বেশি বছর ধরে সভ্যতা চলছে, ক্যালকোলিথিক যুগেও। এই অঞ্চলের ইতিহাস বাংলার ইতিহাস এবং ভারতের ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এলাকাটির প্রারম্ভিক ইতিহাস হল ভারতীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং হিন্দু ও বৌদ্ধের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরে যখন মুসলিম অভিযাত্রীরা, যেমন তুর্কী, ইরানীয়, মুঘল প্রভৃতি এদেশে এসেছিল তখন ইসলাম ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসকরা মসজিদ এবং মাদ্রাসা নির্মাণের মাধ্যমে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে শক্তিশালী করে ।

পরিচ্ছেদসমূহ

বাংলা শব্দের উৎপত্তি[সম্পাদনা]

বাংলা বা বাংগালা শব্দটির সঠিক উৎপত্তিটি অজানা রয়েছে। খুব সম্ভবত ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি এ অঞ্চলে বসবাসকারী দ্রাবিড় গোষ্ঠী বঙ থেকে বঙ্গ শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য তথ্যসূত্র থেকে ধারণা করা হয় যে অষ্ট্রিক জাতির সূর্যদেবতা "বোঙ্গা" থেকে বঙ্গ কথাটির উদ্ভব হয়েছে। মহাভারত, পুরাণ ও হরিবংশের মতে রাজা বালীর বঙ্গ নামে এক দত্তক পুত্র ছিলেন যিনি বঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[১]মুসলিম তথ্যসূত্রগুলো থেকে জানা যায়, হযরত নূহ (আঃ) এর দৌহিত্র হিন্দ এর পুত্র বঙ প্রথমবারের মত এই অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করেন। রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের নেসারী শিলালিপিতে প্রথম বঙ্গলা শব্দটির উল্লেখ রয়েছে যেখানে ধর্মপালকে বঙ্গলার রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ "শাহ-ই-বাঙ্গালাহ" নামক উপাধি গ্রহণ করেন এবং তারপর থেকে সকল মুসলিম সূত্রেই বাংলাকে বাঙ্গালাহ বলা হয়েছে।[২]

প্রাচীন বাংলা[সম্পাদনা]

মহস্থানগড়ে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন লিপি
উয়ারি-বটেশ্বরের ধ্বংসস্তুপ

প্রাক-ঐতিহাসিক বাংলা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে সংগঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজগুলি ভারতীয় উপমহাদেশের NBPW যুগের (৭০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নিদর্শন প্রকাশ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে লৌহ যুগের সংস্কৃতি প্রায় ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় এবং ৫০০-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। উত্তর ভারতের ১৬টি মহা রাজ্য বা মহাজনপদের উত্থান এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পরবর্তী উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে এই যুগ বিরাজমান ছিল।[৩] প্রাচীন ভারতের পূর্বাঞ্চল, বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের বা প্রাচীণ বঙ্গ রাজ্য এই মহাজনপদগুলির অংশ ছিল, যা ষষ্ঠ শতকে সমৃদ্ধ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।[৪]

ভাষাগতভাবে, এই ভূখণ্ডের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী হয়তো দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলত যেমন কুরুক্স, বা সম্ভবত অস্ট্রো-এশীয় ভাষায় কথা বলত যেমন সাওতাল। পরবর্তীকালে, তিব্বতী-বার্মানের মতো অন্যান্য ভাষা পরিবারের লোকেরা বাংলায় বসতি স্থাপন করে। সপ্তম খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল মগধের অংশ হিসেবে ইন্দো-আর্য সভ্যতার অংশ হয়ে উঠেছিল।[৫] নন্দ রাজবংশ হচ্ছে প্রথম ঐতিহাসিক রাষ্ট্র যা ইন্দো-অার্য শাসনের অধীনে বাংলাদেশকে একত্রিত করেছিল। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের উত্থানের পর অনেক পুরোহিত ধর্ম বিস্তারের জন্য এখানে বসতি স্থাপন করেছিল এবং মহাস্থানগড়ের মতো অনেক স্তম্ভ স্থাপন করেছিল।

বিদেশী উপনিবেশকরণ[সম্পাদনা]

বাঙ্গালী জাতি প্রাচীন ভারতের একটি পরাক্রমশালী সমুদ্র অভিযাত্রী জাতি ছিল। শুধু বাঙ্গালী জাতিই নয়, প্রাচীনকালে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জাতি, যেমন বাঙ্গালী, কলিঙ্গী, তামিল প্রভৃতি জাতি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় নানা উপনিবেশ গড়ে তুলতেন। তারা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এরকম একটি বিরাট সভ্যতাও গড়ে তুলেছিলেন। এটি শ্রীবিজয়া সভ্যতা নামে পরিচিত। ভিয়েতনামের ইতিহাসে উল্লেখ অাছে ভারতবর্ষের বন-লাং (বাংলা) নামক দেশ থেকে লাক লোং (লক্ষণ?) নামক এক ব্যক্তি ভিয়েতনামে গিয়ে "বন-লাং" নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই বন-লাং যে ভারতবর্ষের বাংলা সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই বাঙালীদের রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।[৬] অপরদিকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে উল্লেখ অাছে বঙ্গ দেশ থেকে অাগত বিজয় সিংহ নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় দ্রাবিড় রাজাদের পতন ঘটিয়ে সিংহল (সিংহ বংশীয়) নামে একটি নতুন রাজ্যের পত্তন করেন। বিজয় সিংহকে সিংহলী জাতির পিতা হিসেবে পরিগণিত করা হয়। বিজয় সিংহকে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় একটি মহাকাব্যও রয়েছে যা "মহাবংশ" নামে পরিচিত।[৭]

নন্দ সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

নন্দ সাম্রাজ্য ছিল বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় যুগ। এই যুগে বাংলার শক্তিমত্তা ও প্রাচুর্য শীর্ষে অারোহন করে। এই যুগে বাংলা সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। নন্দ রাজাদের জন্ম হয়েছিল বাংলায়। তারা বাংলা থেকে মগধ (বিহার) দখল করে এবং উভয় রাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে বঙ্গ-মগধ নামে একটি নতুন সাম্রাজ্যের পত্তন করে। প্রাচীণ গ্রীক ইতিহাসে বাংলাকে গঙ্গারিডাই এবং মগধকে প্রাসি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রীক ইতিহাসে এই সংযুক্ত রাজ্যকে গঙ্গারিডাই ও প্রাসি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[৮] নন্দ রাজাগণ ছিলেন জৈন ধর্মের অনুসারী। এবং তারা ছিলেন জৈন ধর্মের অাজীবিক শাখার অনুসারী।

মহাপদ্ম নন্দ ছিলেন নন্দ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কোশল (উত্তর প্রদেশ), কুরু (পূর্ব পাঞ্জাব), মৎস্য (রাজপুতানা), চেদী (মধ্য প্রদেশ ও বিহারের মধ্যস্থিত জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল),অবন্তী (মধ্য প্রদেশ) প্রভৃতি অঞ্চল জয় করেন। দিগ্বিজয়ার্থে মহাপদ্ম এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন। তৎকালীন ইতিহাস অনুসারে মহাপদ্মের অধীনে ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ অশ্বারোহী, ৪,০০০ যুদ্ধরথ ও ২,০০০ হস্তীবাহিনী ছিল। মতান্তরে তার নিকট ২,০০,০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৮,০০০ যুদ্ধরথ ও ৬,০০০ হস্তীবাহিনী ছিল।[৯]

"কথাসরিৎ সাগর" থেকে জানা যায় তিনি দক্ষিণ ভারতেরও বিরাট অংশ জয় করেছিলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের কলিঙ্গ ও অশ্মক এ রাজ্য দুটো জয় করেছিলেন। অশ্মক হচ্ছে মহারাষ্ট্রের পূর্ব অংশে একটি প্রাচীণ রাজ্যের নাম। এটি দক্ষিণ ভারতে অার্যদের একটি বিখ্যাত উপনিবেশ ছিল। কলিঙ্গ হচ্ছে উড়িষ্যার প্রাচীণ নাম। কলিঙ্গের হস্তিগুম্ফা শিলালিপি থেকে জানা যায় মহাপদ্ম কলিঙ্গে জল সেচের জন্য একটি বিরাট জল প্রণালী নির্মাণ করেছিলেন। তিনি কলিঙ্গ থেকে একটি জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তিও রাজধানীতে নিয়ে যান। মহাপদ্ম ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হন। সমগ্র ভারতবর্ষ জয় করে তিনি একরাট উপাধি গ্রহণ করেন। পরে তাকে অনুসরণ করে পশ্চিম ভারতের রাজারা বিরাট ও দক্ষিণ ভারতের রাজারা সম্রাট উপাধি গ্রহণ করে।[১০]

মহাপদ্ম নন্দের পর ক্ষমতায় অাসীন হন তার পুত্র উগ্রনন্দ। উগ্রনন্দের সময় রাজ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখা দেয়। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে ৯৯০ মিলিয়ন স্বর্ণখণ্ডের অধিকারী ছিলেন। উগ্রনন্দের সময়ে পাটালিপুত্রে পাচটি ধর্মস্তূপ নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীণ ভারতের বিভিন্ন ইতিহাসে উগ্রনন্দকে অর্থপিপাসু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকে ধননন্দ নামে অভিহিত করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে উগ্রনন্দ এবং তার পিতা মহাপদ্ম বিপুল পরিমাণ রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তারা উক্ত রাজ্যের পরাজিত রাজন্যবর্গের ওপর কর অারোপ করেছিলেন। কাজেই এইসব অভিযোগ উক্ত পরাজিত রাজন্যবর্গের বিষোদ্গার হতে পারে।[১১]

উগ্রনন্দের সময় গ্রীক সম্রাট অালেকজাণ্ডার ভারতবর্ষ অাক্রমণ করেন। কিন্তু উগ্রনন্দ একটি বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে অালেকজাণ্ডারের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হন। প্লুটার্ক বলেছেন, পোরাসের সাথে যুদ্ধের পর মেসিডোনিয়ার সৈন্যরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এবং ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে অারও প্রবেশের জন্য অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। তারা জানতে পারে গঙ্গা নদী যা ২৩০ স্টেডিয়া বিস্তৃত ছিল এবং ১০০০ ফুট গভীর ছিল, তার পাশের সমস্ত তীর সমস্ত তীর সশস্ত্র যোদ্ধা, ঘোড়া এবং হাতি দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবৃত ছিল। গঙ্গারিডাই ও প্রাসি এর রাজা তার (আলেকজান্ডার) জন্য ২,০০,০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী, ৮,০০০ যুদ্ধরথ ও ৬,০০০ হস্তিবাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।[১২]

প্রাথমিক মধ্যযুগ[সম্পাদনা]

গৌড় সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

ষষ্ঠ শতকের মধ্যে উত্তর ভারত শাসনকারী বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্য বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এগুলোর মধ্যে মগধ (বিহার) ও মালব (মধ্য প্রদেশ) এ রাজ্য দুটি গুপ্ত বংশের দুটি শাখা দ্বারা শাসিত ছিল। অপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল উত্তর প্রদেশের মৌখরী রাজ্য এবং পাঞ্জাবের পুষ্যভূতি রাজ্য। শশাঙ্ক ছিলেন মগধের গুপ্ত সম্রাট মহাসেন গুপ্তের একজন সীমান্তবর্তী মহাসামন্ত। মহাসেন গুপ্তের পর তিনি বাংলার ক্ষমতা দখল করেন এবং গৌড়ের কর্ণসূবর্ণে তার রাজধানী স্থাপন করেন। শশাঙ্ক ৬১৯ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা অাক্রমণ করেন এবং সেখানকার শৈলোদ্ভব বংশীয় রাজাকে পরাজিত করে উড়িষ্যা দখল করেন । এ সময় উত্তর ভারত দখলের জন্য বিভিন্ন সাম্রাজ্যের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতা শুরু হয়। মালবের রাজা দেবগুপ্ত মৌখরী রাজা গ্রহবর্মণকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। কিন্তু একই সময় পুষ্যভূতির রাজা রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তকে অাক্রমণ করে তাকে পরাজিত করেন। এ সময় শশাঙ্ক কনৌজ অাক্রমণ করেন। তিনি কনৌজের অধিকারী রাজ্যবর্ধনকে পরাজিত ও নিহত করে ক্ষমতা দখল করেন।[১৩] রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তার ভাই ও উত্তরাধিকারী হর্ষবর্ধন এক বিপুল বাহিনী গঠন করেন। শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের সাথে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করেন। কিন্তু হর্ষবর্ধন ছিলেন অত্যধিক শক্তিশালী যোদ্ধা। ছয় বৎসর ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করার পর শশাঙ্ক শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। হর্ষবর্ধন বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে নেন। এভাবে বাংলার ক্ষণস্থায়ী গৌড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

পাল রাজবংশ[সম্পাদনা]

পাল সাম্রাজ্যের যুগ ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল যুগ। এ সময় বাংলার ইতিহাসে আবার দিগ্বিজয়ের সূচনা হয়। পাল রাজাগণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে। একারণে পাল শিলালিপিতে বরেন্দ্রকে জনকভূ বা রাজ্যাম পিত্রাম বলা হয়েছে। পাল সাম্রাজ্যের রাজাগণ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। পাল রাজাগণ ছিলেন প্রথমত বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও পরবর্তীতে তান্ত্রিক শাখার অনুসারী। পাল বংশীয় রাজাগণ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রভূমি কনৌজ দখলের জন্য রাজপুতানার গুর্জর এবং দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূটদের সাথে এক প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই ভয়ঙ্কর ও ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধ পরবর্তী দুই শত বৎসর অব্যাহত থাকে।

পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা গোপাল। তিনি ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা দেশ শাসন করেন।[১৪] গোপালের অাগমনের পূর্বে বাংলাদেশ পাচটি খণ্ডে বিভক্ত ছিল যথা- অঙ্গ, বঙ্গ, গৌড়, সুহ্মসমতট। গোপাল এই সমস্ত খণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ করেন ও বাংলাদেশে শান্তি শৃঙ্খলা অানয়ন করেন।[১৫] গোপাল বিহার, উড়িষ্যা ও কামরূপও দখল করেন। এরপর গোপাল উত্তর ভারতের রাজধানী কনৌজ অক্রমণ করেন। তিনি কনৌজের অায়ুধ বংশীয় রাজা বজ্রায়ুধকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন।[১৬] কিন্তু গুর্জর রাজা বৎসরাজের নিকট তিনি পরাজিত হন। বৎসরাজ পরবর্তীতে রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব ধারাবর্ষের নিকট পরাজিত হন। ফলে গোপাল তার সাম্রাজ্য রক্ষা করতে সক্ষম হন।

গোপালের পুত্র ধর্মপাল (৭৯০-৮১০) ছিলেন একজন সুদক্ষ ও পরাক্রমশালী সম্রাট। তিনি উত্তর ভারতে অাক্রমণ করেন এবং গুর্জর রাজা নাগভট্টকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। তিনি সমগ্র উত্তর ভারতব্যাপী বিশাল সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছিলেন। খালিমপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় তিনি মদ্র (পাঞ্জাব), গান্ধার (খাইবার প্রদেশ), মৎস্য ([[রাজস্থান|রাজপুতানা), যদু(গুজরাট), অবন্তী (মধ্য প্রদেশ) প্রভৃতি অঞ্চল বিজয় করেছিলেন।[১৭] কিন্তু এ অঞ্চলগুলো তিনি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন নি। ধর্মপাল সেনাপতি লাউসেনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রকূট রাজাকে পরাজিত করে উড়িষ্যা পুনর্দখল করতে সক্ষম হন। এই ঘটনাটি তৎকালীন বিখ্যাত মহাকাব্য ধর্ম মঙ্গলে উল্লেখ অাছে।

ধর্মপালের সুযোগ্য পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০) পুনরায় সমগ্র ভারতব্যাপী তার অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে কম্বোজ (কাশ্মীর) পর্যন্ত তার সমরাভিযান পরিচালনা করেন। দেবপাল গুর্জর রাজা রামভদ্রকে পরাজিত করে তাকে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। বিন্ধ্যা পার্বত্য অঞ্চল বিজয় করে তিনি মালব ও গুজরাট দখল করেন।[১৮] কিন্তু এ অঞ্চলগুলো পরবর্তীতে তিনি মিহির ভোজ|মিহির ভোজের কাছে হারিয়ে ফেলেন। দেবপালের দাক্ষিণাত্য অভিযান সফল হয়েছিল। তার নির্দেশে ভ্রাতা জয়পাল রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষকে পরাজিত করে উড়িষ্যা পুনর্দখল করেন। এরপর উড়িষ্যা চিরস্থায়ীভাবে পাল সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল।[১৯][২০][২১]

পাল সম্রাটগণ বহু বৌদ্ধবিহার ও ধর্মীয় পীঠস্থান নির্মাণ করেছিলেন। বিক্রমশীল, ওদন্তপুরী ও জগদ্দল প্রভৃতি বৃহদায়তন মহাবিহার পাল স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পাল সম্রাটগণ প্রথমত "মহাযান" বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে পালগণ হিন্দুদের বৌদ্ধধর্মে অাকৃষ্ট করার জন্য তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন করেন। বহু হিন্দু দেবদেবীকে এই ধর্মে স্থান দেওয়া হয়। পাল সম্রাটগণ সংস্কৃত বা পালি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। পাল রাজাদের সময়ই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীণতম নিদর্শন চর্যাপদসমূহ রচিত হয়। তাই পাল রাজবংশকে অনেক সময় বাংলা সাহিত্যের জনক মনে করা হয়।

সেন রাজবংশ[সম্পাদনা]

সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন প্রাথমিক জীবনে পাল রাজাদের অধীনে দক্ষিণবঙ্গের এক সামন্তপ্রভু ছিলেন। পরে তিনি নিজ বাহুবলে সাম্রাজ্য বিস্তার করে পূর্ববঙ্গের বর্মণ রাজাদের পরাজিত করেন। তিনি উত্তরবঙ্গের এক যুদ্ধে পাল সম্রাট মদনপালকে পরাজিত করে রাজধানী গৌড় দখল করেন। তিনি ত্রিহুত (উত্তর বিহার) ও কামরূপও (পশ্চিম অাসাম) জয় করে নেন।[২২] তবে তিনি দক্ষিণ বিহার জয় করতে ব্যর্থ হন। পাল রাজাগণ এখানে গাহড়বাল সাম্রাজ্যের সহায়তায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। বিজয়সেন শৈব ধর্মের ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তার সময় কনৌজ, অযোধ্যা ও হরিদ্বার থেকে যেসমস্ত কায়স্থ এদেশে অাসেন তারাই মূলত বাঙালী কায়স্থদের অাদিপুরুষ।

বল্লাল সেন বিজয়সেনের পর বাংলার সিংহাসনে অাসীন হন। বল্লাল সেন তার রাজ্যের প্রায় ১,০০০ ব্রাহ্মণকে চিহ্নিত করেন। এদেরকে রাজ পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সংবদ্ধ করা হয় এবং এদের উচ্চ পদ মর্যাদা প্রদান করা হয়। এই মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ রাজ্যে কুলীন নামে পরিচিত হয়। বল্লাল সেন একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দানসাগর ও অদ্ভূতসাগর নামে দুইটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থ দুটো থেকে তার অভূতপূর্ব প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।[২৩] বল্লাল সেনের সময় বঙ্গদেশে শৈব, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক প্রভৃতি বিভিন্ন মতবাদ দেখা দেয়। বল্লালসেন ব্যক্তিগতভাবে তান্ত্রিক মতের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, যদিও তার পিতা বিজয়সেন শৈব মতের অনুসারী ছিলেন।

বল্লাল সেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন সিংহাসনে অাসীন হন। পিতার মত লক্ষণ সেনও সাহিত্য ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তার সময়ে রাজ্যে বহু প্রতিভাবান কবির অাবির্ভাব হয়। যেমন শরণ, হলায়ুধ, উমাপতিধর প্রমুখ। ধর্মীয় মতের দিক থেকে লক্ষণ সেন ছিলেন বৈষ্ণব। অানুলিয়ায় প্রাপ্ত তাম্র শাসনে লক্ষণ সেনকে পরমবৈষ্ণব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষণ সেনের সময় বখতিয়ার খিলজী বাংলা অাক্রমণ করেন। এসময় লক্ষণ সেন নদীয়ার একটি তীর্থকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন। বখতিয়ার খিলজী অতর্কিতে নদীয়া অাক্রমণ করেন যার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। লক্ষণ সেন পূর্ব বঙ্গে অাশ্রয় গ্রহণ করেন, মুসলমানরা পূর্ববঙ্গ জয় করতে ব্যর্থ হয়।

দেব রাজত্ব[সম্পাদনা]

দেব রাজ্য ছিল বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অারাকানের দান্যবতী বংশের একটি রাজ্য। এই রাজ্যটি বিস্তৃত ছিল অারাকান হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং এর রাজধানী ছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু স্থানীয় বাঙালী প্রভাবে দেব রাজাগণ বাঙ্গালী ও হিন্দু হয়ে পড়ে। এই রাজবংশের প্রথম শাসক ছিলেন পুরুষোত্তম দেব, যিনি প্রথম জীবনে একজন সাধারণ গ্রামিক (গ্রাম প্রধান) ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি সেন সম্রাটদের অধীনে দক্ষিণাঞ্চলের প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে উন্নীত হন। তাঁর পুত্র মধুসূদন দেব প্রথম সেন সাম্রাজ্যের হাত থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং অানুষ্ঠানিকভাবে নৃপতি উপাধি ধারণ করেন। দামোদর দেব এই রাজবংশের একজন শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তার রাজত্ব বর্তমান কুমিল্লা-নোয়াখালী-চট্টগ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।[২৪]

এই রাজবংশের পরবর্তী শাসক দশরথ দেব এই বংশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী শাসক ছিলেন। তিনি সেন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটান এবং সমগ্র পূর্ববঙ্গ ( ঢাকা-ময়মনসিংহ-খুলনা) অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের সাথে মিত্রতা করে অাগ্রাসনকারী মুঘীসউদ্দীন তুঘরলকে পরাজিত করেন এবং বাংলার হিন্দু সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেন। এ উপলক্ষে তিনি দনুজ মর্দন দেব উপাধি গ্রহণ করেন। গিয়াসউদ্দীন বলবনের ইতিহাসে তাকে দনুজ রায় বলে অভিহিত করা হয়েছে। দেব বংশ অারও কিছুকাল তার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। যদিও এই সময়কার রাজাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অবশেষে বাংলার মাহমুদ শাহী সুলতান ফিরোজ শাহের অাক্রমণে দেব রাজবংশের পতন হয়।

মধ্যযুগ এবং ইসলামের আগমন[সম্পাদনা]

সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলিম ব্যবসায়ী ও সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় প্রথম ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। দ্বাদশ শতকে মুসলিমরা বাংলায় বিজয় লাভ করে এবং তারা ঐ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১২০২ সালের শুরুর দিকে দিল্লী সালতানাত থেকে একজন সামরিক অধিনায়ক বখতিয়ার খিলজী বাংলা ও বিহারকে পরাজিত করেছিলেন। প্রথমদিকে বাংলা তুর্কী জাতির বিভিন্ন গোত্র দ্বারা শাসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে অারব, পারসীয়, অাফগান, মুঘল প্রভৃতি অভিযানকারী জাতি দ্বারা বাংলা শাসিত হয়। মুসলিম শাসকদের অধীনে বাংলা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। কারণ শহরগুলো উন্নত হয়েছিল; প্রাসাদ, দূর্গ, মসজিদ, সমাধিসৌধ এবং বাগান; রাস্তা এবং সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল; এবং নতুন বাণিজ্য পথগুলো সমৃদ্ধি ও নতুন সাংস্কৃতিক জীবন বয়ে নিয়ে এসেছিল।

তুর্কি শাসন[সম্পাদনা]

খিলজী শাসন[সম্পাদনা]

বখতিয়ার খিলজী ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিহার অাক্রমণ করেন। তিনি বিহারের পাল রাজবংশের অবশিষ্টাংশের পতন ঘটিয়ে বিহার দখল করেন। বখতিয়ার খিলজী এরপর বাংলা অাক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ১৭ সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীর্থকেন্দ্র নদীয়ায় অাক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পলায়ন করেন এবং তিনি পূর্ব বঙ্গে অাশ্রয় গ্রহণ করেন। মুসলমানদের কোন নৌবাহিনী না থাকায় তারা পূর্ববঙ্গ দখল করতে পারেনি। উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এরপর তিব্বত অাক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১২০৬ সালে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি তিব্বতে অাক্রমণ করেন। এবং তিব্বতের কারামাত্তান নগর পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু প্রচণ্ড শীত ও রসদপত্রের অভাবে বখতিয়ার খিলজীর এ অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।[২৫]

বখতিয়ার খিলজীর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হয়। বখতিয়ারের অন্যতম সহকারী শিরণ খিলজী নিজেকে বাংলার সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সিংহাসনের অপর দাবীদার মর্দান খিলজী শিরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। শিরণ মর্দানকে পরাজিত ও বন্দী করেন। মর্দান খিলজী দিল্লীর সম্রাট কুতুবুউদ্দিন অাইবেককে বাংলা অাক্রমণের জন্য অাহ্বান জানান। অাইবেকের সেনাপতি কায়েমাজ রূমী শিরণকে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন, এবং মর্দান খিলজীকে বাংলার গভর্নর নিয়োগ করা হয়।[২৬] মর্দান প্রথমত দিল্লীর অধীনস্ত থাকেন, কিন্তু কুতুবউদ্দীন অাইবেকের মৃত্যুর পর তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মর্দান ক্রমশ অত্যাচারী হয়ে উঠলে খিলজী অমাত্যগণ তাকে হত্যা করেন এবং ইওয়াজ খিলজীকে বাংলার সুলতান মনোনীত করেন।

ইওয়াজ খিলজী একজন সুদক্ষ ও রণকুশলী সম্রাট ছিলেন। তিনি একটি নৌবাহিনী গঠন করেন এবং এই নৌবাহিনীর সাহায্যে তিনি বঙ্গ দখল করেন। তিনি বিহার, উড়িষ্যা ও কামরূপও (পশ্চিম অাসাম) দখল করেন। কিন্তু ইওয়াজ এইসমস্ত রাজ্য সরাসরি রাজ্যভুক্ত করেননি, তিনি এই রাজ্যগুলোকে সামন্ত রাজ্যের মর্যাদা প্রদান করেন।[২৭] ইওয়াজের এই রাজ্য বিস্তারের ফলে ১২২৫ সালে দিল্লীর সুলতান শামসউদ্দীন ইলতুতমিশ তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। যুদ্ধে ইওয়াজ পরাজিত হন। কিন্তু ইলতুতমিশ দিল্লী প্রত্যাবর্তন করলে ইওয়াজ পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এবার যুদ্ধে ইলতুতমিশের পুত্র মাহমুদ নেতৃত্ব দেন, এবং যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইওয়াজের পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে।

মামলুক শাসন[সম্পাদনা]

মামলুকগণ ছিলেন তুর্কী জাতির একটি বিশেষ ধরণের ভাড়াটে সেনাবাহিনী। দিল্লীতে এই সময় মামলুকগণই অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং দিল্লী কর্তৃক নিয়োগকৃত বাংলার সকল গভর্নরগণও ছিলেন মামলুক। বাংলার মামলুক সুলতান তুঘরল তুঘান খান ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর বিরুেদ্ধ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি শধু বাংলার উপরই অাধিপত্য বিস্তার করলেন না এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং বিহারবদায়ুন অঞ্চল নিজের শাসনাধীনে অানেন।[২৮] যাই হোক দিল্লীর শাসনকর্তা তমর খানের নির্দেশে এক সেনাবাহিনী বাংলার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তুঘান খান পরাজিত হন এবং শেষ পর্যন্ত দিল্লীর শাসন মেনে নেন।

১২৫১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর মুঘীসউদ্দীন ইউজবাক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইউজবাক বাংলার দক্ষিণ দিক হতে অাগত উড়িষ্যার একটি অাক্রমণ প্রতিহত করেন। তিনি উড়িষ্যার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এর রাজধানী লুন্ঠন করেন এবং একটি শ্বেত হস্তীও লাভ করেন। তুঘানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইউজবাক বিহারঅাউয়াধ দখল করেন।[২৯] এর ফলে তিনি পূর্ব ভারত ব্যাপী এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে পড়েন। ইউজবাক যতদিন জীবিত ছিলেন দিল্লীর সম্রাট ততদিন পর্যন্ত তাকে পরাজিত করতে পারেননি। ইউজবাক উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অাসামও দখল করেন। কিন্তু অাসামের একটি বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে তিনি নিহত হন।

দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের সময় বাংলার গভর্নর মুঘীসউদ্দীন তুঘরল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি সমগ্র বাংলাবিহারের ওপর অাধিপত্য স্থাপন করে উড়িষ্যা অাক্রমণ করেন এবং তা তার সাম্রাজ্যভূক্ত করেন। সম্রাট বলবন মালিক তুরমতীকে এক বিরাট বাহিনী দিয়ে বাংলার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি মুঘিসউদ্দীন তুঘরলের হাতে পরাস্ত হন। বলবন এবার দ্বিতীয় অভিযান প্রেরণ করেন সেনাপতি শিহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে। কিন্তু তিনিও তুঘরলের হাতে পরাজিত হন।[৩০] এর ফলে বলবন ১২৮০ সালে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে স্বয়ং বাংলা অভিযান করেন। তুঘরল প্রবল পরাক্রমের সাথে যুদ্ধ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।

মাহমুদ শাহী রাজবংশ[সম্পাদনা]

সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বুঘরা খান বাংলা দেশে একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। তিনি মাহমুদ শাহ উপাধী গ্রহণ করেন, এজন্য তার বংশ মাহমুদ শাহী বংশ নামে পরিচিত হয়ে থাকে। দিল্লীর সম্রাট ছিলেন মাহমুদ শাহের পুত্র কায়কোবাদ। কিন্তু তিনি দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী নিজামউদ্দীনের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে পড়েন। মাহমুদ শাহ তার পুত্রকে উদ্ধারের জন্য এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। দিল্লীর উজির নিজামউদ্দীন এক বিরাট বাহিনী নিয়ে সরযু নদীর তীরে তার গতিরোধ করেন।[৩১] যাই হোক বাংলা ও দিল্লীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ না হয়ে উভয়পক্ষের মধ্য সমঝোতা হয়। মাহমুদ শাহ তার বাহিনী নিয়ে লখনৌতিতে ফিরে অাসেন ও সগৌরবে রাজত্ব করতে থাকেন। অপরদিকে দিল্লীতে তার নির্দেশে সুলতান কায়কোবাদ মন্ত্রী নিজামউদ্দীনকে পদচ্যুত করে রাষ্ট্রকে নিষ্কণ্টক করেন।

মাহমুদ শাহের পর তার পুত্র রুকুনউদ্দীন কায়কাউস বাংলার সিংহাসনে অাসীন হন। রুকুনউদ্দীন কায়কাউসের সময় দিল্লীর সুলতান ছিলেন অালাউদ্দীন খিলজী। ১৩০১ সালে অালাউদ্দীন খিলজী বাংলা অাক্রমণ করেন। যুদ্ধে কায়কাউস পরাজিত ও নিহত হন। খিলজী কায়কাউসের ভাই ফিরোজ শাহকে তার গভর্নর হিসেবে বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। ফিরোজ শাহ একজান খ্যাতিমান বিজেতা ছিলেন। তিনি খিলজীর নির্দেশে পূর্ববঙ্গ অাক্রমণ করেন এবং দেব বংশকে সমূলে উৎখাত করেন। এর ফলে পূর্ববঙ্গ চিরস্থায়ী ভাবে মুসলিন শাসনাধীনে চলে অাসে।[৩২] তার সময়েই বিখ্যাত অাউলিয়া শাহ জালাল বঙ্গদেশে অাগমন করেছিলেন এবং সিলেট জয় করেছিলেন। অালাউদ্দীন খিলজীর মৃত্যুর পরে তিনি স্বাধীনতা অর্জন করেন এবং কিছুদিন স্বাধীনভাবে রাজকার্য করার পর মৃত্যুবরণ করেন।

ফিরোজ শাহের পর তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী বাহাদুর শাহ সমগ্র বাংলার অধিপতি হন। কিন্তু এ সময় দিল্লীর তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাদেশে সমরাভিযান করেন। ষড়যন্ত্রকারী ভ্রাতা নাসিরউদ্দীন ইব্রাহীমের সহায়তায় রাজধানী লখনৌতি অাক্রমণ করেন এবং বাহাদুর শাহ পরাজিত হন। গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে সাতগাও, লখনৌতি ও সোনারগাঁও এই তিন ভাগে ভাগ করেন এবং এই তিন ভাগকে তিনজন পৃথক শাসকের হাতে নিযুক্ত করেন। কিন্তু গিয়াসউদ্দীন তুঘলক প্রত্যাবর্তন করলে বাহাদুর শাহ পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সাতগাওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খান তার বিরুদ্ধে সমরাভিযান করেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।

ইলিয়াস শাহী রাজবংশ[সম্পাদনা]

ইলিয়াস শাহ বাংলাদেশে ইরানের সিজিস্তান হতে অাগত এক উদ্বাস্তু ছিলেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে বাংলায় নিযুক্ত দিল্লীর গভর্নর অালী শাহের সিলাহদার ছিলেন। কিন্তু পরবরতীতে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে বাংলার সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। ইলিয়াস শাহ বাংলা, বিহারউড়িষ্যা দখল করে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে এক বিশাল সাম্রাজ্য কায়েম করেন । তিনি উত্তর প্রদেশনেপালেরও বিরাট অংশ দখল করে নেন।[৩৩] এর ফলে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক অাতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ১৫৫৩ সালে তিনি বাংলা অক্রমণ করেন। ইলিয়াস শাহ বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চল দুটো হারিয়ে ফেলেন কিন্তু তিনি বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হন।

ইলিয়াস শাহের পরে সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে অাসীন হন। ইতোপূর্বে ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা অক্রমণ করে বাংলা প্রদেশটি দখল করতে ব্যর্থ হন। ফলে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনি পুনরায় বাংলা অক্রমণ করেন। সুদীর্ঘ দুই বৎসর ফিরোজ শাহ বাংলা অবরোধ করে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিকান্দার শাহের হাতে পরাজিত হন।[৩৪] সিকান্দার শাহ সাহিত্য ও স্থাপত্যের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার সময়ে বিশেষ করে স্থাপত্য ও ইমারত শিল্প ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। তার অমর কীর্তি হচ্ছে বিখ্যাত অাদিনা মসজিদ নির্মাণ করা। এই মসজিদটি তৎকালীন ভারতবর্ষের বৃহত্তম মসজিদ (দিল্লীর চেয়েও বৃহৎ) ছিল।

সিকান্দার শাহের পর অাজম শাহ সিংহাসনে অসীন হন। তার শাসনকাল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং এ সময় তেমন যুদ্ধ বিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি। তার সময়ে চীনের রাষ্ট্রদূত মা হুয়ান বাংলাদেশে অাগমণ করেন। তিনি ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজকে বাংলায় অাগমনের জন্য অাহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি রওয়ানাও হয়েছিলেন কিন্তু পথিমধ্যে মারা যান। ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ বাংলার হিন্দুদের ক্ষমতায়িত করতে চেয়েছিলেন। বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়। এবং হিন্দুদের বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্তপ্রভু হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এতে হিন্দুরা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখল করে বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের অবসান ঘটান।

গণেশীয় রাজবংশ[সম্পাদনা]

রাজা গণেশ প্রাথমিক জীবনে দিনাজপুরের ভাতুরিয়া অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। তিনি বাংলার এক অামীর বায়েজীদ শাহকে ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করেন। পরে বায়েজীদ শাহকে সরিয়ে তিনি নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। গণেশ বাংলাদেশে সত্যপীর নামক এক নতুন পূজার উদ্ভাবন করেন। সত্যপীর একইসঙ্গে মুসলিম পীর ও হিন্দু দেবতার প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গণেশের পূর্বে বাংলার হিন্দুগণ মুসলমান শাসকদের প্রভাবে ব্যাপক মাত্রায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিলেন। এই ধর্মান্তর রোধ করার জন্য তিনি এই নতুন সত্যপীর প্রথার প্রচলন করেন।

রাজা গণেশ নিজ পুত্র জিতেন্দ্রদেবের পরিবর্তে মহেন্দ্রদেবকে পরবর্তী রাজা হিসেবে নিয়োগ করেন। এতে জিতেন্দ্রদেব অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম অামীরদের সহায়তায়, জালালউদ্দীন মুহাম্মাদ শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন। মুহাম্মাদ শাহ একজন বিখ্যাত বিজেতা ছিলেন। তিনি পার্শ্ববর্তী জাউনপুর রাজ্য অাক্রমণ করেন। এবং তাদের কাছ থেকে বিহার প্রদেশটি ছিনিয়ে নেন। মুহাম্মাদ শাহের সময় অারাকান রাজ মেং তি মুন বার্মার হাত থেকে রক্ষার জন্য মুহাম্মাদ শাহের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং মুহাম্মাদ শাহ তাকে উদ্ধার করেন। এরপর থেকে অারাকান বাংলার একটি সামন্ত রাজ্যে পরিণত হয়।[৩৫]

মুহাম্মাদ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী আহমাদ শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। তার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মতামত বিভ্রান্তিকর। ফেরেশতার মতে, তিনি তার মহান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন এবং ন্যায়পরায়ণতার অাদর্শ প্রাণপনে রক্ষা করেন। অপরপক্ষে গোলাম হোসেন বলেন, তিনি অত্যাচারী ও রক্তপিপাসু ছিলেন। তিনি বিনা কারণে রক্তপাত করতেন এবং অসহায় নারী-পুরুষদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতেন। যাই হোক তিনি জাউনপুরের কাছে পরাজিত হন। এবং বিহার প্রদেশটি হারিয়ে ফেলেন। সাদী খান ও নাসির খান নামক দুইজন ক্রীতদাস, যারা তার অমাত্য পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাকে হত্যা করেন এবং বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

পরবর্তী ইলিয়াস শাহী রাজবংশ[সম্পাদনা]

সাদী খান ও নাসির খান নামক ক্ষমতা দখলকারী অামীরদের সরিয়ে মাহমুদ শাহ নামক ইলিয়াস শাহী বংশের একজন বংশধর বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। এর ফলে বাংলায় ইলিয়াস শাহী রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান মাহমুদ শাহের সময় বাংলার ইমারত ও স্থাপত্য শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরণের ইমারত নির্মাণ করে একে সুসজ্জিত করেন। এসব ইমারতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, ঢাকার বিনত বিবির মসজিদ, গৌড়ের বাইশগজী প্রাচীর প্রভৃতি।[৩৬] এজন্য অনেক ঐতিহাসিক তার যুগকে অগাস্টান যুগ বলে অভিহিত করে থাকেন।

মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে অারোহন করেন। বরবক শাহ জাউনপুরকে পরাজিত করে বিহার দখল করে নেন এবং কেদার রায় নামক তার একজন হিন্দু সেনাপতিকে এই অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করেন। বরবক শাহের একজন সেনাপতি ইসমাইল গাজী অাসামের রাজাকে পরাজিত করে কামরূপ (পশ্চিম অাসাম) দখল করে নেন।[৩৭] বরবক শাহের শাসনামলে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক হাবশী ক্রীতদাসের অাগমন ঘটে। বরবক শাহ এদের অনেককে সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদে নিয়োগ করেন। এই হাবশীরা পরে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাড়ায়।

সুলতান ইউসুফ শাহ একজন দানশীল, ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক শাসক ছিলেন। তিনি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি দরবারে জ্ঞানী-গুণী, অালেম ও বিচারকদের অাহ্বান করতেন। পরবর্তী সুলতান ফতেহ শাহও একজন দয়ালু, কর্মঠ ও ক্ষমতাশালী সম্রাট ছিলেন। তিনি সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে রাজ্য শাসন করতেন। তার সময়ে হাবশী ক্রীতদাসগণ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি এই হাবশী সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দিতে উদ্যত হন। ফলে হাবশী সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করে এবং তাকে হত্যা করে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। এর ফলে বংলার ইলিয়াস শাহী রাজবংশের পতন ঘটে।

হোসেন শাহী রাজবংশ[সম্পাদনা]

সুলতান অালাউদ্দিন হোসেন শাহ জোরদখলকারী হাবশী শাসকদের সরিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে অারব দেশের ইয়েমেন থেকে বাংলাদেশে অাগত এক উদ্বাস্তু ছিলেন। হোসেন শাহ বাংলার সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহ যেমন কামরূপ (পশ্চিম অাসাম), ত্রিহুত (উত্তর বিহার) ও চট্টগ্রাম (অারাকানের হাত থেকে) জয় করেন।[৩৮] তবে তিনি দক্ষিণ বিহার জয় করতে ব্যর্থ হন কারণ দিল্লীর সম্রাট সিকান্দার লোদী তার পূর্বেই উক্ত অঞ্চল দখল করে নেন। হোসেন শাহের শাসন অামলে সাহিত্য ও স্থাপত্য কলার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি ছিলেন হিন্দু মুসলিম সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক। অনেক ঐতিহাসিক তার যুগকে বাংলার স্বর্ণযুগ হিসেবে অাখ্যায়িত করে থাকেন।

হোসেন শাহের পর তার পুত্র নুসরাত শাহ বাংলার সিংহাসনে অাসীন হন। পিতার মত তিনিও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পিতার অামলে সাহিত্যকলা ও স্থাপত্য শিল্পের যে বিকাশ ঘটে তা তার সময়ও অব্যাহত থাকে। নসরত শাহের সময় ভারতবর্ষে অাফগান শাসনের অবসান হয় ও মুঘল শাসনের পত্তন ঘটে। বিপুল সংখ্যক অাফগান অামীর পলায়ন করে বাংলাদেশে অাসেন। নসরত শাহ সম্রাট মাহমুদ লোদী ও জালাল খানের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুঘল অাক্রমণ প্রতিরোধের জন্য অগ্রসর হন। কিন্তু ঘাগরার যুদ্ধে মিত্রবাহিনী পরাজিত হয়।[৩৯] নসরত শাহ বাবরের সাথে একটি সন্ধিচুক্তি করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন।

নসরত শাহের পর তার পুত্র ফিরোজ শাহ বাংলার সিংহাসনে অাসীন হন। কিন্তু তার খুল্লতাত মাহমুদ শাহ তাকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেন। এর ফলে রাজপরিবারে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ত্রিহুতের শাসনকর্তা মখদুম অালম স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন। কিন্তু মাহমুদ শাহ তাকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। এসময় বিহারের শাসনকর্তা জালাল খান তার অভিভাবক শের খানের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মাহমুদ শাহকে বিহার অাক্রমণের জন্য অাহ্বান জানান। মাহমুদ শাহ বিহার অাক্রমণ করেন কিন্তু তিনি পরাজিত হন। অতঃপর ১৫৩৮ সালে শেরশাহ বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে নেন।[৪০] ফলে বাংলার হোসেন শাহী রাজবংশের পতন ঘটে।

পাখতুন শাসন[সম্পাদনা]

পাখতুনগণ ছিলেন অাফগানিস্তান থেকে অাগত উদ্বাস্তু এবং তারা পাঠান নামেও পরিচিত ছিলেন। পাখতুনগণ ছিলেন ভারতবর্ষের অধিশ্বর এবং তারা ভারতে লোদী বংশ নামে একটি শক্তিধর রাজবংশ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে পানিপথের যুদ্ধে মুঘলদের হাতে তাদের পরাজয় হয় এবং তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

সূরী রাজবংশ[সম্পাদনা]

সূরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সূরী প্রাথমিক জীবনে বিহারের সাসারাম অঞ্চলের এক ক্ষুদ্র জায়গীরদার ছিলেন। পরে নিজ প্রতিভাবলে তিনি বিহারের শাসনকর্তা বিহার খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন এবং বিহারের উপ প্রশাসকের পদে নিযুক্ত হন। ১৫৩৬ সালে শের শাহ বাংলার শাসনকর্তা মাহমুদ শাহের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে মাহমুদ শাহ কিউল থেকে সিকরিগলি পর্যন্ত অঞ্চলটি শের শাহকে সমর্পণ করেন। ১৫৩৭ সালে শের শাহ দ্বিতীয়বার বাংলা অাক্রমণ করেন এবং এবার সম্রাট মাহমুদ শাহকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন। শের শাহ নিজেকে বাংলার সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ফরিদউদ্দীন শের শাহ উপাধি ধারণ করেন।[৪১]

শেরশাহ বাংলা ও বিহারের বিরাট ভূখণ্ডের অধিকারী হয়ে বসলে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন চুনার দখল করে বাংলা অাক্রমণ করেন। সুচতুর শেরশাহ সম্মুখ সমরে লিপ্ত না হয়ে বাংলাদেশ পরিত্যাগ করেন এবং পরোক্ষভাবে বারানসী, রোটাস ও জাউনপুর দখল করে কনৌজের দিকে অগ্রসর হন। হুমায়ুন অাগ্রার পথে যাত্রা করলে বক্সারের নিকট চৌসা নামক স্থানে শের শাহ তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। ১৫৪০ সালের ১৭ই মে কনৌজ এর বিলগ্রামের যুদ্ধে শের শাহ হুমায়ুনকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সূরী বংশের সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।[৪২] শের শাহ হচ্ছেন বাংলার একমাত্র মুসলিম সম্রাট যিনি উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শেরশাহের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের সেনাধ্যক্ষগণ জ্যেষ্ঠ্যপুত্র আদিল খানের পরিবর্তে ইসলাম শাহকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন, কারণ ইসলাম শাহ রাজপুত্র অবস্থায় অধিকতর সামরিক প্রতিভা প্রদর্শন করেছিলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অাদিল খান ইসলাম শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অাদিল খান তার বাহিনী নিয়ে অাগ্রার দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু ইসলাম শাহের হাতে পরাজিত হন।[৪৩] ইসলাম শাহের সময় মুঘল সম্রাট হুমায়ুন রাজনৈতিক অাশ্রয়ের জন্য তার নিকট প্রার্থনা জানান। কিন্তু তিনি এ অাবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ইসলাম শাহের শাসনকাল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এ সময় তেমন কোন যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি।

ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর সূরী সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হয়। ইসলাম শাহের পর তার পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসনে অারোহন করেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি অাদিল শাহ সূরী (এই আদিল শাহ পূর্ববর্তী অাদিল শাহ হতে পৃথক) কর্তৃক পদচ্যূত হন। অদিল শাহ পরবর্তীতে ইব্রাহীম শাহ সূরী নামক সূরী বংশীয় অপর একজন দাবীদারের কছে পরাজিত হন এবং তিনি দিল্লী ও অাগ্রা দখল করে বসেন। ইব্রাহীম শাহ অবার সিকান্দার শাহ সূরী কর্তৃক পরাজিত হন এবং সিকান্দার শাহ নিজেকে ভারতবর্ষের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে সূরী সাম্রাজ্য বিপর্যস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়।

কররানী রাজবংশ[সম্পাদনা]

১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে তাজ খান কররানী বাংলার দুর্বল সুলতান গিয়াসউদ্দীনকে পরাজিত করে সিংহাসন দখল করেন। তাজ খান দিল্লীর সূরী বংশীয় সম্রাট ইসলাম শাহের একজন বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন। কিন্তু তার পরে অাদিল শাহ অনৈতিকভাবে সিংহাসন দখল করলে তাজ খান বাংলায় পলায়ন করেন এবং এখান থেকেই তিনি আদিল শাহের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এখানে তিনি বাহাদুর শাহের অধীনে চাকরী গ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বে অাদিল শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন।[৪৪] তাজ খান বাংলার মাটিতে তার ক্ষমতার বীজ শক্তভাবে প্রোথিত করেন। পরবর্তীতে সুলতান গিয়াসউদ্দীনকে পরাজিত করে তিনি বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

তাজ খানের পর তার ভাই সুলায়মান খান কররানী বাংলার মসনদে অসীন হন। দিল্লীতে হুমায়ুন কর্তৃক মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবার পর দলে দলে অাফগান অভিবাসীগণ বাংলায় এসে বসবাস শুরু করে। ফলে সুলায়মানের অাধিপত্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুলায়মানের সাথে উড়িষ্যার সম্রাট মুকুন্দ হরিচন্দনের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। বিরোধের কারণ বাংলার সিংহাসনের অন্যতম দাবীদার ইব্রাহীম সূরীকে অাশ্রয় প্রদান করা। ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে সুলায়মান তার পুত্র বায়েজীদ খান ও সেনাপতি কালাপাহাড়কে এক বিশাল সেনাবাহিনী সহ উড়িষ্যায় প্রেরণ করেন। রাজা হরিচন্দন মুসলিম বাহিনীর নিকট পরাজয় বরণ করেন। পুরীসহ সমস্ত উড়িষ্যা কররানী রাজ্যের অধীনস্ত হয়।[৪৫]

সুলতান দাউদ খান কররানী সুলায়মান খান অপেক্ষা অধিকতর স্বাধীনচেতা ও অাগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। মুঘল সম্রাট আকবর সেনাপতি মুনিম খানকে বাংলা অাক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু মুঘল সেনাপতি পরাজিত হন। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর স্বয়ং পাটনা অবরোধ করেন। ফলে দাউদ খান পরাজিত হন। ১৫৭৬ সালে মুঘলবাঙ্গালী সেনাবাহিনী রাজমহলের প্রান্তরে একটি চূড়ান্ত যদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের প্রথমদিকে বাঙ্গালী বাহিনী বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীতে সেনাপতি কতলু খান ও বিক্রমাদিত্য বিশ্বাসঘাতকতা করলে তারা পরাজিত হয়।[৪৬] ফলে বাংলা, বিহারউড়িষ্যাসহ সমগ্র পূর্ব ভারত মুঘল সাম্রাজ্যের পদানত হয়।

মুঘল যুগ[সম্পাদনা]

বাংলা সম্রাট অাকবরের সময় মুঘল সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয় এবং ঢাকা বাংলার মুঘল প্রদেশের রাজধানী হয়ে ওঠে। এ সময় বাংলা সুবাহ বাংলা নামে অভিহিত হয়। বাংলার বিভিন্ন সুবাদারগণ বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হন। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুবাদার ছিলেন ইসলাম খান, মীর জুমলা, শায়েস্তা খান প্রমুখ।

ইসলাম খান[সম্পাদনা]

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ১৬০৮ সালে ইসলাম খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে বাংলার শাসন কাজ পরিচালনা করতেন, যার নামকরণ করা হয়েছিল জাহাঙ্গীর নগর। বিদ্রোহী রাজা, বারো-ভূঁইয়া, জমিদার ও আফগান নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ। তিনি বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খানের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং ১৬১১ সালের শেষের দিকে মুসা খান পরাজিত হন।[৪৭]ইসলাম খান যশোরের প্রতাপাদিত্য, বাকলার রামচন্দ্র এবং ভুলুয়া রাজ্যের অনন্ত মানিক্যকে পরাজিত করেছিলেন। এরপর তিনি কোচবিহার, কোচ হাজো এবং কাছাড় রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, এইভাবে চট্টগ্রাম ব্যতীত সমগ্র বাংলায় অাধিপত্য স্থাপন করেছিলেন।

মীর জুমলা[সম্পাদনা]

মীর জুমলা বাংলার একজন বিখ্যাত সুবাদার ছিলেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে গোলকুণ্ডায় একজন হীরক ব্যবসায়ী হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন। এ সময়ই তিনি কোহীনুর নামে বিখ্যাত হীরক খণ্ডের অধিকারী হন। এ হীরক খণ্ডটি পরে তিনি সম্রাট শাহজাহানকে উপহার দেন। তার সময়ে কোচবিহার (পশ্চিম অাসাম) ও অাসামে (পূর্ব অাসাম) মুঘল অভিযান প্রেরিত হয়। গহীন জঙ্গল পার হয়ে কোচবিহারে মুঘল বাহিনী প্রবেশ করলে প্রাণভয়ে রাজা প্রাণনাথ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। কোচবিহার দখলের পর মীর জুমলা অাসামে অভিযান পরিচালিত করেন। মুঘল বাহিনী অনায়াসে কামতা, গোয়ালপাড়া, গোহাটী প্রভৃতি সীমান্তবর্তী শহর দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত যুদ্ধে রাজধানী ঝাড়গাও দখলকৃত হয় এবং রাজা জয়ধ্বজ নারায়ণ অাত্মসমর্পণ করেন।[৪৮]

শায়েস্তা খান[সম্পাদনা]

১৬৬৩ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাংলার দীর্ঘতম গভর্নর ছিলেন। তার সময়ে বাংলার সুখ ও শান্তি চরমে ওঠে। কথিত রয়েছে তার সময় টাকায় অাট মণ চাল পাওয়া যেত। শায়েস্তা খানের বিখ্যাত কীর্তি অারাকানের জলদস্যুদের হাত থেকে চট্টগ্রামের পুনর্দখল করা। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খান নিজ পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানকে অধিনায়ক মনোনীত করে অারাকানে সৈন্য প্রেরণ করেন। ১৬৬৬ সালের ২৩ ও ২৪ জানুয়ারী সংঘটিত কাঠালিয়ার যুদ্ধে মগ বাহিনী সম্পূর্ণ রূপে বিধ্বস্ত হয়। পরে তারা কর্ণফুলী নদীতে প্রতিরোধ গড়ে তুললে মুঘল নৌবহরের কামানের সামনে পরাস্ত হয়। চট্টগ্রামে পুনরায় মুঘল অাধিপত্য স্থাপিত হয়।[৪৯] শায়েস্তা খান এর নতুন নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। চট্টগ্রাম দখল করে মগদের হাতে বন্দী অসংখ্য নর নারীকে মুক্তি দেওয়া হয়।

বাংলার নবাব[সম্পাদনা]

মুর্শিদকুলী খান ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর সুবাহ বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি রাজধানী মাখসুদাবাদে স্থানান্তর করেন যা তার নাম থেকে মুর্শীদাবাদে নামকরণ হয়। তিনি একজন ধর্মনিষ্ঠ, ন্যয়পরায়ণ ও প্রজাদরদী শাসক ছিলেন। তিনি ইসলামী শরীয়ত অনুসারে কঠোরভাবে দেশ শাসন করতেন। তিনি সপ্তাহে দুবার স্বয়ং বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তার সময়ে দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাংলা তুর্কী, পারসী, ওমান, ইংরেজ, ফরাসী প্রভৃতি জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।[৫০] তার সময়ে বাংলার হুগলী একটি বিখ্যাত অান্তর্জাতিক বন্দরে পরিণত হয়।

মুর্শিদকুলী খানের পর তার জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলার নবাব হন। তিনি ত্রিপুরা অাক্রমণ করেন এবং ত্রিপুরা বাংলার একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। তিনি বীরভূমের শাসক বদিউজ্জামানের বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি কঠোরভাবে ইউরোপীয় বণিকদের দস্তক প্রথা ও শুল্ক ফাকি বন্ধ করেন। তার সময়ে ইংরেজ, ফরাসীপর্তুগীজ বণিকগণ কোনরূপ শুল্ক ফাকি দিতে পারতেন না। উপবন্তু নবাবকে ইউরোপীয় বণিকদের নজরানা দিয়ে সবসময় সন্তুষ্ট রাখতে হত। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ নবাবকে তুষ্ট করার জন্য তিন লক্ষ টাকা নজরানা দেন।[৫১]

নবাব অালীবর্দী খানের সময় বাংলায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তার সময়ে মারাঠাগণ বাংলা অাক্রমণ করে। তবে অালীবর্দী খান একজন বিখ্যাত মহাবীর ছিলেন। তিনি সুদীর্ঘ দশ বছর মারাঠাদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত থাকেন। এবং বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হন। তবে তিনি উড়িষ্যা প্রদেশটি মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।[৫২] নবাব অালীবর্দী খানের পরে সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার নবাব হন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবীতর্ন হন। প্রথমদিকে কলকাতার যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করলেও শেষ পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হন। ফলে বাংলার নবাবী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

ঔপনিবেশিক শাসন[সম্পাদনা]

বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে (Baxter [৫৩] , pp. 23–28)। ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। (Baxter[৫৩], pp. 30–32) ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রীস্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।[৫৪]

১৯০৫ হতে ১৯১১ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়। (Baxter[৫৩], pp. 39–40) তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায় ১৯১১ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে আবার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়, আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের নাম পাল্‌টে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়। [৫৫]

পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১)[সম্পাদনা]

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা ভারত ও পাকিস্তান। মুসলিম আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বাংলা নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। পূর্ব পাস্তিানের ইতিহাস মূলত: পশ্চিম পাকিস্তানীদ শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সামরিক শাসন।

১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ভূমি সংস্কারের অধীনে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়।(Baxter[৫৩], p. 72) কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫২ খ্রীস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়। (Baxter[৫৩], pp. 62–63) পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।

পাকিস্তানী প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল বা 'কপ'-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দলোনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে।

১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসাবে আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে, এবং ১৯৬৯ নাগাদ দলটি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে কারাবন্দী করা হয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মাধ্যমে আবার তাঁকে বন্দী করা হয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন ঘটলেও সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। কারাবন্দীত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে শেখ মুজিব ১৯৭০-এ অনুষ্ঠিত জেনারেল ইয়াহিয়া প্রদত্ব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জ্জন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯৭১)[সম্পাদনা]

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। (Baxter[৫৩], pp. 78–79) মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেন[৫৬] এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। গ্রেফতারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে যান। [৫৭] ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।[৫৮] [৫৯] পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে[৬০] সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। (LaPorte [৬১] , p. 103) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। [৬২] [৬৩] ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত নেতারা ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস। মুক্তি বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে জয়লাভ করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পন করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানী সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে ধরা পড়ে, যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। [৬৪]

বর্তমান যুগ[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগ[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয় ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭৫ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধু দেশে বাকশালের অধীনে সকল দল এবং ব্যক্তি নিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর কিয়দংশ ষড়যন্ত্রে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তিনি সপরিবারে নিহত হন। [৬৫]

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মুশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করে। সে নতুন করে মন্ত্রী সভা গঠন করে। তার কার্যকাল ছিল ১৫ই আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫; এ সময় সামরিক আইন জারী করা হয়। তার কর্মকাল ছিল সংক্ষিপ্ত। পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব লাভ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মুহাম্মাদ সায়েম।

সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই নভেম্বর সিপাহি বিপ্লব নামের আন্দোলনের পর পর্যায়ক্রমে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হন। ১৯৭৮ সালের ৩রা জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নামের রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ২৯শে মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন। অত:পর উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন।

সামরিক শাসন[সম্পাদনা]

বিচারপতি আবদুস সাত্তারের দুর্বল নেতুত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ মাসে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতবিহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনে রাজনৈতিক নিপীড়ন ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক আন্দোলন ও দুর্নীতির জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন জারি করা হয়। এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো নিষিদ্ধ করা হয়।

যাইহোক, এরশাদ সরকার প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য একটি সুসংঘবদ্ধ আইন প্রনয়ণ করে। দেশের আঠারটি জেলাকে ৬০ টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। এবং ৬০ টি জেলাকে বিভিন্ন উপজেলায় বিভক্ত করা হয়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ প্রথম স্থানীয় পরিষদের জন্য নির্বাচন করেন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রার্থীগণ বিভিন্ন পদে জয়ী হন। এটি প্রেসিডেন্টের বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচিকে অগ্রসর করাবার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হয়।

তার অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতিতে এবং হালকা উৎপাদন, কাঁচামাল এবং ভারী শিল্পে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। বিদেশী কোম্পানিগুলিকে বাংলাদেশের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, এবং উৎপাদন রক্ষা করার জন্য কঠোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এরশাদ স্বৈরশাসক হিসাবে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয়।

সাম্প্রতিক যুগ[সম্পাদনা]

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী হিসাবে ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ এবং ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারি ও ২০০১ হতে ২০০৬ পর্যন্ত ২ বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ এ বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর চেয়ারম্যান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল এবং ২০০৯ হতে ২০১৪ সাল বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ এর নেতৃত্বে গঠিত সরকার এর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক স্থাপন করে। তারা ক্ষমতার পাঁচবছর সময় অতিবাহিত করতে সক্ষম হয়। পাঁচবছর পুর্তি শেষে আওয়ামী লীগ তত্তাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১০ম সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে, এবং দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি তত্বাবধায়ক সরকারের অনুপস্থিতির কারণে ব্যাপক আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বললেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Salim, Ghulam Husain (১৯০২)। RIYAZU-S-SALĀTĪN: A History of Bengal RIYAZU-S-SALATIN, A History of Bengal। The Asiatic Society,Calcutta। 
  2. Bangladesh (People'S Republic Of Bangladesh) Pax Gaea World Post Human Rights Report. Paxgaea.com. Retrieved on 12 July 2013.
  3. Shaffer, Jim. 1993, "Reurbanization: The eastern Punjab and beyond." In Urban Form and Meaning in South Asia: The Shaping of Cities from Prehistoric to Precolonial Times, ed. Howard Spodek and D.M. Srinivasan.
  4. Singh, Upinder (২০০৮)। A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century। Delhi: Pearson Education। পৃ: 260–4। আইএসবিএন 978-81-317-1120-0 
  5. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 33। 
  6. Bandyopadhyay, Rakhaldas (১৯১৪)। History of Bengal, Part-1। Manomohan Projashoni। পৃ: ২০। 
  7. Bandyopadhyay, Rakhaldas (১৯১৪)। History of Bengal, Part-1। Manomohan Projashoni। পৃ: ১৯। 
  8. Islam, Kabedul (২০০৬)। Prachin Banglar Jonopod o Jonojati goshthi। Mowla Brothers। পৃ: ১২৪। আইএসবিএন 978-9843108043 
  9. Gabriel, Richard A. (৩০ নভেম্বর ২০০২)। The great armies of antiquity (1.udg. সংস্করণ)। Westport, Conn. [u.a.]: Praeger। পৃ: ২১৮। আইএসবিএন 9780275978099 
  10. Shahnawaz, A.K.M (২০০৩)। History of South Asia। Abasar prokashona। পৃ: ১৩০। আইএসবিএন 984-446-074-3 
  11. Shahnawaz, A.K.M (২০০৩)। History of South Asia। Abasar prokashona। পৃ: ১৩০। আইএসবিএন 984-446-074-3 
  12. Majumdar, R.C. (১৯৬০)। The Classical Accounts of India। FIRMA K.L.M। পৃ: ১৯৮। 
  13. Nitish Sengupta (২০০৮)। History of Bengal and Bengali people। Dey's Publishing। পৃ: 36। 
  14. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 65। 
  15. Sengupta, Nitish K. (২০১১)। Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib। Penguin Books India। পৃ: ৪০। আইএসবিএন 978-0-14-341678-4 
  16. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 66। 
  17. George E. Somers (১৯৭৭)। Dynastic History of Magadha। Abhinav Publications। পৃ: 185। আইএসবিএন 978-81-7017-059-4 
  18. Sailendra Nath Sen (১৯৯৯)। Ancient Indian History and Civilization। New Age International। পৃ: 277–287। আইএসবিএন 978-81-224-1198-0 
  19. Rajanikanta Chakrabarti (১৯৯৯)। History of Gaur। Dey's Publishing। পৃ: 74। আইএসবিএন 81-7612-444-3 
  20. Nitish Sengupta (২০০৮)। History of Bengal and Bengali people। Dey's Publishing। পৃ: 43। 
  21. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 74। 
  22. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 108। 
  23. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 112। 
  24. Roy, Niharranjan (১৯৯৩)। Bangalir Itihas: Adiparba। Calcutta: Dey's Publishing। পৃ: 408–9। আইএসবিএন 81-7079-270-3 
  25. "Bangladesh Studies O Level (7094) Pilot Textbook"। University of Cambridge Local Examinations Syndicate। আসল থেকে ২৫ জানুয়ারি ২০১৩-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ২৫ জানুয়ারি ২০১৪ 
  26. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 162। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  27. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 162। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  28. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 171। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  29. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 173। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  30. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 173। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  31. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 175। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  32. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 179। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  33. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 189। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  34. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 192। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  35. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 209। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  36. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 214। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  37. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 215। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  38. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 228। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  39. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 238। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  40. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 243। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  41. Singh, Surinder; Gaur, I. D. (২০০৮)। Popular Literature and Pre-modern Societies in South Asia। Pearson Education India। আইএসবিএন 978-8131713587 
  42. Haig, Wolseley (১৯৬২)। "Sher Shah and the Sur Dynasty"। in Burn, Richard। The Cambridge History of India: The indus civilization (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press। পৃ: ৫১। সংগৃহীত ১৬ নভেম্বর ২০১৬ 
  43. "Biography of Islam Shah the Successor of Sher Shah" 
  44. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 252। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  45. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 253। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  46. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 256। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  47. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 265। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  48. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 278। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  49. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 280। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  50. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 293। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  51. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 295। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  52. Mahmudul Hasan (২০০৩)। History of Bengal। Ononna prokashoni। পৃ: 300। আইএসবিএন 984-477-034-3 
  53. Baxter, C (১৯৯৭)। Bangladesh, From a Nation to a State। Westview Press। আইএসবিএন ০-৮১৩৩-৩৬৩২-৫ 
  54. সেন, অমর্ত্য (১৯৭৩)। Poverty and Famines। অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস। আইএসবিএন ০-১৯-৮২৮৪৬৩-২ 
  55. Collins, L; D Lapierre (১৯৮৬)। Freedom at Midnight, Ed. 18। Vikas Publishers, New Delhi। আইএসবিএন ০-৭০৬৯-২৭৭০-২  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  56. Sheikh :a traitor" say president। "CIVIL WAR FLARE E.PAKISTAN"ডেভিড লোশহাক। দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ। সংগৃহীত ১ মার্চ ২০১৫ 
  57. Sheik Mijib Arrested After a Broadcast Proclaiming Region's Independence DACCA CURFEW EASED Troops Said to Be Gaining in Fighting in Cities -Heavy Losses Seen। "LEADER OF REBELS IN EAST PAKISTAN REPORTED SEIZED"। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। সংগৃহীত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  58. "declaration of independence of Bangladesh-Original Speech by Ziaur Rahman"ইউটিউব 
  59. Salik, Siddiq (১৯৭৮)। Witness to Surrender। Oxford University Press। আইএসবিএন ০-১৯-৫৭৭২৬৪-৪ 
  60. "Genocide in Bangladesh, 1971"। Gendercide Watch। 
  61. LaPorte, R (১৯৭২)। "Pakistan in 1971: The Disintegration of a Nation"। Asian Survey। 12(2): 97–108। 
  62. White, M (November ২০০৫)। Death Tolls for the Major Wars and Atrocities of the Twentieth Century  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  63. "The Bangladeshi holocaust"। VirtualBangladesh.com। 
  64. Burke, S (১৯৭৩)। "The Postwar Diplomacy of the Indo-Pakistani War of 1971"। Asian Survey 13 (11): 1036–1049। 
  65. Mascarenhas, A (১৯৮৬)। Bangladesh: A Legacy of Blood। Hodder & Stoughton, London। আইএসবিএন ০-৩৪০-৩৯৪২০-X 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]