বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা ভাষা আন্দোলন

পরীক্ষিত
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাংলা ভাষা আন্দোলন
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মিছিল
তারিখ১৯৪৭ – ১৯৫৬
অবস্থান
কারণপাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত
পদ্ধতি
ফলাফল
পক্ষ
নেতৃত্ব দানকারী

যৌথ নেতৃত্ব

বাংলা ভাষা আন্দোলন তথা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত পাকিস্তানের তৎকালীন প্রদেশ পূর্ববঙ্গে (১৯৫৬ সালের পর পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে মাতৃভাষা বাংলাকে ঘিরে প্রদেশে সৃষ্ট এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশটির অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত এর বীজ রোপিত হয়েছিল বহু আগে; অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ শাসিত ভারত বিভাজিত হয়ে পাকিস্তান অধিরাজ্যভারত অধিরাজ্য নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। পাকিস্তানের ছিল দুটি অঞ্চল: পূর্ব পাকিস্তান]ল তথা পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তান। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের (প্রায় ১২৪৩ মাইল) অধিক দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেকগুলো মৌলিক পার্থক্য বিরাজমান ছিল। ১৯৪৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কার্যত পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ মাতৃভাষা বাংলার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে একাধিক মানুষ নিহত ও আহত হন। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র প্রদেশে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১শে ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। ২২শে ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতেও মানুষ মারা যায়।

ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দু উভয়কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সাংবার্ষিকভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদ্‌যাপন করা হয়।

পটভূমি

দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়: ভারত, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) এবং পাকিস্তান (যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা এখন বাংলাদেশ)।

অধুনা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র দুটি পূর্বে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উর্দু ভাষাটি খাজা সলিমুল্লাহ, সৈয়দ আহমদ খান, ওয়াকার-উল-মুলক এবং মৌলভী আবদুল হক সহ প্রমুখ কিছু সংখ্যক মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় নেতাদের চেষ্টায় ভারতীয় মুসলমানদের সাধারণ যোগাযোগের ভাষার মর্যাদায় উন্নীত হয়।[][] উর্দু একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা ইন্দো-ইরানীয় ভাষাসমূহর সদস্য। এই ভাষা আবার ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি অপভ্রংশের (মধ্যযুগের ইন্দো-আর্য ভাষা পালি-প্রাকৃতের সর্বশেষ ভাষাতাত্ত্বিক অবস্থা) ওপর ফার্সি, আরবি এবং তুর্কির ঘনিষ্ঠ প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে[] দিল্লি সালতানাতমুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বিকশিত হয়।[] এর পার্সি-আরবি লিপির কারণে উর্দুকে ভারতীয় মুসলমানদের ইসলামি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হত; অন্যদিকে হিন্দিকে হিন্দুধর্মের উপাদান বিবেচনা করা হত।[]

উর্দুর ব্যবহার ক্রমেই উত্তর ভারতের মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে, কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশ বঙ্গের মুসলমানেরা বাংলা ভাষাকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহারেই অভ্যস্ত ছিল। বাংলা পূর্বাঞ্চলীয় মধ্য ইন্দো ভাষাসমূহ থেকে উদ্ভূত একটি পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষা,[] যা বঙ্গীয় নবজাগরণের সময়ে বিপুল বিকাশ লাভ করে। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই আধুনিক ভাষা হিসেবে বাংলার বিস্তার বিকশিত হয়। বাংলা ভাষার সমর্থকরা ভারত ভাগের পূর্বেই উর্দুর বিরোধিতা শুরু করেন, ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে বাংলার সভ্যরা উর্দুকে ভারতের মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। মুসলিম লীগ ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজনৈতিক দল, যা ভারত বিভাজনের সময় পাকিস্তানকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।[] এছাড়া একই বছরে এলাহাবাদে মুসলিম লীগের অধিবেশনে উর্দুকে ভারতের মুসলমানদের জন্য সাধারণ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।[] কিন্তু আবার বিতর্কটি শুরু হয় যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিশ্চিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে তারিখে চৌধুরী খলীকুজ্জমান ও জুলাই মাসে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব প্রদান করেন। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মুহম্মদ শহীদুল্লাহমুহম্মদ এনামুল হকসহ বেশ বাঙালি কয়েকজন বুদ্ধিজীবী প্রবন্ধ লিখে প্রতিবাদ করেন৷[] ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্টে ধর্মের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত থেকে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান ও হিন্দু অধ্যুষিত ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত পাকিস্তান অধিরাজ্যের পূর্ববঙ্গ প্রদেশটি (পরবর্তীতে নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান) দেশের অবশিষ্ট অঞ্চল থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল এবং ধর্ম ছাড়া পূর্ববঙ্গের সাথে পাকিস্তান অবশিষ্ট অঞ্চলের সাদৃশ্য খুব কমই ছিল।[] ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বঙ্গ প্রদেশের বাংলাভাষী ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যাবিশিষ্ট পূর্ববঙ্গ প্রদেশের মানুষ হিসেবে নবগঠিত পাকিস্তানের নাগরিকে পরিণত হয়।[১০] কিন্তু পাকিস্তান সরকার, প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল।[১১] ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে বাংলাকে প্রদেশের আদালত ও শিক্ষার ভাষা ঘোষণা করা ও রাষ্ট্রভাষার সিদ্ধান্ত জনসাধারণের উপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।[১২] একই মাসে তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকদের নিয়ে গঠিত এই সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান নিয়ে প্রচারণা চালাতে থাকে।[১৩] ৫ ডিসেম্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সিদ্ধান্ত নেয় যে উর্দু পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা হবেনা। অন্যদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভকারীরা প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউজে এলে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আকরম খাঁর আশ্বাসে তারা ফিরে যায়।[১৪] ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়।[১৫][১৬] তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই সমাবেশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবল দাবি উত্থাপন করা হয়।[১৭] পূর্ববঙ্গে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৪৭ সালের ৮ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রদের একটি বিশাল সমাবেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ছাত্ররা ঢাকায় মিছিল এবং সমাবেশের আয়োজন করে।[১০] কিন্তু পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয়তালিকা থেকে বাদ দেয় ও সাথে সাথে মুদ্রা এবং ডাকটিকেট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে, যার ফলে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় ও সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়।[১৮] কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।[১৯][২০][১০]

প্রাথমিক পর্যায় (১৯৪৭–১৯৫২)

বিস্তৃতি

১৯৪৭ সালের শেষের দিকে তমুদ্দিন মজলিসের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।[২১][২২] বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাওয়া আন্দোলনকারীদের উপর বিভিন্ন দিক থেকে হামলা ও হেনস্তা করার ফলে আন্দোলন আরো জেগে উঠতে থাকে।[২৩] ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংগঠনটি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্মারকলিপির জন্য স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করে এবং কয়েক হাজার স্বাক্ষর সহ একটি স্বারকলিপি সরকারের নিকট প্রেরণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করা হলে পূর্ববঙ্গ থেকে সদস্যগণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে করাচী যাওয়ার আগে তমুদ্দিন মজলিস তাদেরকে পাকিস্তানের মুদ্রা, ডাকটিকেট ইত্যাদিতে বাংলা বাদ দেওয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সদস্যগণ ব্যাপারটি দেখার আশ্বাস দেন।[২৪]

১৯৪৮ সালের ২৩ ও ২৫শে ফেব্রুয়ারি তারিখে[২৫] পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রথম প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে মৌলভি তমিজউদ্দিন খাঁ এবং তা গণপরিষদের ভোটে বাতিল হয়ে যায়।[১০][২৫] দ্বিতীয় প্রস্তাবে[২৫] ইংরেজিতে প্রদত্ত বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলেন।[২৬]

প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তারা পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং তাদের এ সমর্থনের মাধ্যমে মূলত প্রদেশের স্বাভাবিক মতামতই প্রতিফলিত হয়েছিল। তমিজউদ্দিন খাঁয়ের নেতৃত্বে পরিষদে উপস্থিত মুসলিম লীগ সকল মুসলিম সদস্য একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি দাবি করেন যে, "পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক"।[২৭][২৮] পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে"। অনেক বিতর্কের পর সংশোধনীটি ভোটে বাতিল হয়ে যায়।[১০][২৯][৩০] পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলে যে তার প্রদেশের জনগণ শুধু উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চায়।[৩১]

গণপরিষদের ঘটনার প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায়। ২৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজজগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে।[২৭] একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই ছাত্রসভায় গণপরিষদের সিদ্ধান্ত, খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য ও গণপরিষদের বাঙালি মুসলিম সদস্যদের নীরবতার প্রতি নিন্দা জানানো হয়। এছাড়া সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।[৩২] ২৯ ফেব্রুয়ারি তারিখেও ধর্মঘট ঘোষিত হয় এবং ঐদিন সমগ্র প্রদেশে প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘট পালন করা হয়। সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করে এবং অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে।[২৭] তমদ্দুন মজলিস ঐসময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছাত্র-বুদ্ধিজীবিদের এক সমাবেশ ঘটে।[২৮] ঐ সভায় নতুন করে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং শামসুল আলম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এ পরিষদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও ছাত্রাবাসগুলো থেকে দুই জন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়।[২৭][৩৩] সেখান থেকে ছাত্ররা ১১ মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করে।[৩৪] অন্যদিকে সিলেটে ৮ই মার্চে গোবিন্দ পার্কে তমুদ্দিন মজলিস ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের আয়োজনে জনসভায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। জনসভায় উর্দুর সমর্থক হিসেবে স্বচিহ্নিত দুষ্কৃতকারীরা বাধা দেয় এবং হাঙ্গামা করে, যার ফলে জনসভা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর হাঙ্গামার প্রতিবাদে ১০ মার্চ সভার আয়োজন করা হলে জেলা প্রশাসন সিলেট জেলায় ২ মাসের জন্য বাংলা ভাষার প্রশ্নে সভা আয়োজন করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।[৩৫]

১১ মার্চের কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য এর আগের দিন ফজলুল হক হলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ ভোরে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনা ডাকঘরে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রদের আরও একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল গণি রোডে পিকেটিংয়ে অংশ নেয়। তারা হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্যে সবাইকে চাপ দিতে থাকে, ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদেরকে পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে হয়। লাঠিচার্জের প্রতিবাদে হাইকোর্টের উকিলরা আদালত বর্জন করে।[৩৬] ধর্মঘটে ছাত্রদের উপর গুন্ডাদের লেলিয়ে দেওয়া হয়, যারা অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় ছাত্রদের ভয় দেখানোর পাশাপাশি তাদের উপর হামলা করে। হামলায় অধ্যাপক আহসান হাবীব আহত হন।[৩৭] বিকেলে নির্যাতনের প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা পণ্ড করে দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী, রওশন আলম, রফিকুল আলম, আব্দুল লতিফ তালুকদার, শাহ্ মোঃ নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন নঈমুদ্দিন আহমদ।[২৮] সেদিন সমগ্র প্রদেশে ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে।[৩৭]

১১ তারিখের এ ঘটনার পর ১২ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ ধর্মঘট পালন করা হয়। ১৫ মার্চ ছিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক আইনসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন, তাই ওইদিন ধর্মঘট অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৪ই মার্চে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের দ্বারা সতস্ফূর্তভাবে ধর্মঘট পালিত হয়। ওই দিন ঢাকায় বিকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের সভায় ১১ই মার্চের ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। তখনো ছাত্রদের একাংশ রাত পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।[৩৮] ১৫ই মার্চে ধর্মঘট সফল করার জন্য টঙ্গীকুর্মিটোলায় কর্মীদের রেল কর্মচারীদের আনতে পাঠানো হয়। ধর্মঘটে ঢাকার বিভিন্ন অফিসের কর্মচারীরা যোগ দেয়। ধর্মঘট থেকে সরকার আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করতে শুরু করে।[৩৯] আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ১৫ মার্চ প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আবুল কাশেম, কামরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুর রহমান চৌধুরী প্রমূখ অংশগ্রহণ করেছিলেন। আলোচনা সাপেক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে ৮টি বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তি সম্পাদনের খবর শুনে আন্দোলনকারীরা উত্তেজিত হয়ে যায়। তখন মোহাম্মদ তোয়াহা সহ সংগ্রাম পরিষদের কিছু সদস্য তাদেরকে শান্ত করেন। তবে চুক্তি সম্পাদনের পরও বিক্ষোভ প্রদর্শন অব্যাহত থাকে এবং সেদিন ১৬ই মার্চে ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়।[৪০] ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সরকারের এ নমনীয় আচরণের প্রধান কারণ ছিল ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা আগমন। তার আসার পূর্বে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত করার জন্য নাজিমুদ্দিন চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিটি তখন পর্যন্ত মেনে নেয়া হয়নি।[২৭] চুক্তিগুলো ছিল:[৪০][৪১]

  1. ভাষার প্রশ্নে গ্রেপ্তার করা সবাইকে মুক্তি প্রদান করা হবে।
  2. পুলিশি অত্যাচারের বিষয়ে তদন্ত করে একটি বিবৃতি প্রদান করা হবে।
  3. বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
  4. সংবাদপত্রের উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
  5. আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
  6. ২৯শে ফেব্রুয়ারি হতে জারিকৃত ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করতে হবে।
  7. পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা হিসাবে ইংরেজি উঠে যাবার পর বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে প্রবর্তন করা হবে।
  8. রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন "রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই" এই মর্মে প্রধানমন্ত্রী ভুল স্বীকার করে বক্তব্য দিবেন।

আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চুক্তির ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়ার দাবি করে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। প্রাদেশিক আইনসভায় প্রধানমন্ত্রী চুক্তি সম্পাদনের কথা স্বীকার করেন। তবে একই সময়ে বিক্ষোভকারীরা পরিষদ ভবনের সামনে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।[৪২] তখন শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হলেও সেনাদের বহাল রাখা হয়েছিল।[৪৩] পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতি হওয়ার পর্যায়ে পরিষদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী সংগ্রাম পরিষদের কিছু সদস্যদের সাথে আলোচনা করা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।[৪৪] সন্ধ্যায় পূর্ববঙ্গের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং আইয়ুব খানের নিকট প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন পরিস্থিতিতে সমাধান চাইলে খান তাদেরকে অধিবেশন মুলতুবি করে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীকে ভবনের পুরাতন রান্নাঘরে মধ্যে দিয়ে বের করে আনা হয়।[৪৫] একই দিনে বন্দী আন্দোলনকর্মীদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং ঢাকায় ফজলুল হক হলে তাদেরকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়।[৪৬] ১৬ মার্চের কর্মসূচির জন্য ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান ও শওকত আলী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। সকালে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় চুক্তিপত্র সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয় যা ঐক্যমতের ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়। তৎকালীন সময়ে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক মুসলিম লীগ খাজা নাজিমুদ্দিন ও তফাজ্জল আলী নেতৃত্বাধীন দুটি উপদলে বিভক্ত ছিল। তফাজ্জল আলীর উপদল তখন আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তফাজ্জল আলীর মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদের নিকট জানতে চান যে চুক্তির বিনিময়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের "অলিখিত সমঝোতা" হওয়ার পরেও কেন তা অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যুত্তরে নেতারা জানান যে আন্দোলন এখন শান্ত করার পর্যায়ে বাইরে চলে গেছে। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নিজস্ব উদ্যোগে একটি সভার আয়োজন করা হয়,[৪৭] যেখানে তিনি বক্তৃতা দেওয়ার পর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে প্রাদেশিক আইনসভা ভবনে যাওয়ার অকস্মাৎ আহ্বান করেন। আহূত মিছিল আইনসভার নিকটে আসার পর পুলিশ বাধা দিলে আন্দোলনকারীরা আইনসভার সদস্যদের মারধোর ও গালমন্দ করতে থাকে। এমন পর্যায়ে ভবনে সদস্যগণ অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন।[৪৮] আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস মারতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশের হাতে আহত আন্দোলনকারী শওকত আলী অজ্ঞান হয়ে যান।[৪৯] রাতে সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে ১৭ মার্চে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ স্বরূপ সভা ও ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৭ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আগমন উপলক্ষে হরতাল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।[৫০] অন্যদিকে ১৮ই মার্চে অবাঙালি মোহাজেরদের একটি দল যশোরে বিক্ষোভ মিছিল পরিচালনা করে ও যশোর রেলওয়ে স্টেশনে জনসাধারণের উপর হামলা চালায়।[৫১]

স্থিতাবস্থা

১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এক ভাষণে ঘোষণা করেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চলমান আন্দোলন ও সংসদীয় দলের মধ্যকার কোন্দলের ফলে প্রাদেশিক সরকার পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাহায্য কামনা করে এবং তাকে পূর্ববঙ্গে আসার আমন্ত্রণ জানায়। তড়িঘড়ি করে সরকার ঢাকায় তার আসার তারিখ হিসেবে ১৯শে মার্চ ঘোষণা করে।[৫২] মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর আগে কখনো ঢাকায় আসেননি।[৫৩] তার আসার পূর্বে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।[৫৪] তার এই ভাষণ অনুষ্ঠানস্থলে মোহাম্মদ আকরম খাঁ দ্বারা উর্দুতে ও হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী দ্বারা বাংলায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।[৫৫] ১৯শে মার্চে ঢাকায় এসে পৌঁছান জিন্নাহ। ভারত বিভাগের পর এটাই ছিল তার প্রথম পূর্ব পাকিস্তান সফর।[৫৬] ২০শে মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের এক পর্যায়ে মোহাম্মদ তোয়াহা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক সম্পর্কে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।[৫৭] ২১শে মার্চে রেসকোর্স ময়দানে এক গণ-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ও সেখানে তিনি ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।[৫৬][৫৮][৫৯][৬০][৬১] যদিও তিনি বলেন পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক ভাষা নির্ধারিত হবে প্রদেশের অধিবাসীদের ভাষা অনুযায়ী; কিন্তু দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ঘোষণা করেন - "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়"।[১০][৫৯][৬২][৬৩] তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "জনগণের মধ্যে যারা ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে, তারা পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের কখনোই ক্ষমা করা হবে না"। জিন্নাহর এ বিরূপ মন্তব্যে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উপস্থিত ছাত্র-জনতার একাংশ। এই ধরনের একপেশে উক্তিতে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।[৫৮] জিন্নাহর ভাষণের সমালোচনা করে পূর্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ২৩ মার্চে একটি বিবৃতি প্রদান করেন।[৬৪] ২৪শে মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অতিথি করা হয়েছিল।[৬৫] সেখানে গিয়েও তিনি একই ধরনের বক্তব্য রাখেন।[১১] বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি "উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" বললে উপস্থিত বেশকিছু ছাত্র সমস্বরে না, না বলে চিৎকার করতে থাকে।[৬৬]

একই দিনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম, তাজউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল ইসলাম।[৬৭] কিন্তু জিন্নাহ খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে একপেশে এবং চাপের মুখে সম্পাদিত বলে প্রত্যাখান করেন।[৬৮] অনেক তর্ক-বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জিন্নাহর নিকট স্মারকলিপি পেশ করে।[৬৯] বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ কে ফজলুল হককে সন্দেহ করেছিলেন। তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ করার আমন্ত্রণ পাঠালে এ কে ফজলুল হক নাকচ করে দেন। পরে তিনি রাজি হয়ে জিন্নাহর সাথে দেখা করতে গেলে আলোচনার সময় দুপক্ষের মাঝে বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠে। কিন্তু প্রাদেশিক সীমান্তে দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করার পর জিন্নাহ প্রদেশের গভর্নর ফ্রেডরিক বোর্নের মাধ্যমে সমঝোতা করেন।[৭০] ২৮শে মার্চে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সেদিন সন্ধ্যায় বেতারে দেয়া ভাষণে তার পূর্বেকার অবস্থানের কাছাকাছি পুনর্ব্যক্ত করেন।[৭১] এ পর্যায়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জনপ্রিয়তা ও তার প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধার ফলে আন্দোলন থমকে যায়, যার ফলে প্রাদেশিক সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ পায়। পূর্ববঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জনপ্রিয়তা অনেকখানি কমে আসে এবং আন্দোলনের প্রতি তার আচরণের ফলে আন্দোলনের নেতাদের মাঝে হতাশা নেমে আসে।[৭২]

জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তমুদ্দন মজলিসের আহ্বায়ক শামসুল আলম তার দায়িত্ব আবদুল মান্নানের কাছে হস্তান্তর করেন।[৭৩] মূলত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দিন মজলিসের মাঝে আন্দোলনের কর্তৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ছিল এর কারণ।[৭৪]

৬ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ আইনসভার অধিবেশনে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রস্তাব করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মাধ্যম অধিকাংশ শিক্ষকের মাতৃভাষা প্রস্তাব করলে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের নেতা বসন্তকুমার দাস প্রস্তাব সংশোধন উত্থাপনের জন্য সময় প্রস্তাব করেন৷ পরবর্তীতে ৮ এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষক শব্দের বদলে ছাত্র বসিয়ে সংশোধনের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সংশোধনী প্রস্তাবে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের দফা যুক্ত করলে[৭৫] একাধিক সদস্য তার বিরোধিতা করেন ও প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী জানান যে শুধু প্রাদেশিক ব্যাপারগুলো আইনসভায় উত্থাপন করা যেতে পারে।[৭৬] তবে তিনি পরবর্তী অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট সুপারিশের একটি প্রস্তাব আইনসভায় উত্থাপনের আশ্বাস দেন এবং ১৫ই মার্চে তা করা হয়। তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আরেকটি সংশোধনী উত্থাপন করেন।[৭৭] এই সংশোধনীকে বিবেচনার অযোগ্য বলা হলে তিনি আরেকটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন।[৭৮] তবে প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক আরম্ভ হয়।[৭৯] এই সময় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দোহাই দিয়ে উর্দুর পক্ষ নেন।[৮০]

১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন।[৮১] ১৪ই সেপ্টেম্বরে সালে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের নতুন গভর্নর জেনারেল হন।[৮২] ফলে নুরুল আমিন পূর্ববঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন।[৮৩]

১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বরে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন।[৮৪] ২০ নভেম্বরে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী "বাঙালিদের প্রাদেশিকতা" নিয়ে পরোক্ষভাবে হুশিয়ারি প্রদান করেন।[৮৫] ২৭শে নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিনি এক ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। ঐ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের তরফ থেকে সম্পাদক গোলাম আজম প্রদত্ত মানপত্রে বাংলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোনোরূপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। ১৭ই নভেম্বর তারিখে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের এক সভায় আজিজ আহমদ, আবুল কাশেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আবদুল মান্নান, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ একটি স্মারকলিপি প্রণয়ন করেন এবং সেটি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের কাছে পাঠানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রেও কোনো সাড়া দেননি।[২৭][৮৬]

অন্যদিকে প্রাদেশিক সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নির্যাতনমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল কার্যক্রমের ফলে ১৯৪৯ সাল থেকে ছাত্র ও জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রামে লিপ্ত হতে থাকে।[৮৭] ১৪ই ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ঢাকায় শিক্ষা উপদেষ্টার বৈঠকে[৮৮] উর্দুকে জাতীয় ভাষা হিসেবে অভিহিত করে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষা দেওয়ার কথা জানান।[৮৯]

অন্যদিকে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করে বাঙালি ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন এবং তার সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আরবি সংঘ গণপরিষদে স্মারকলিপি প্রেরণ করে।[৯০]

১৯৪৯ সালের ১২ই মার্চে পাকিস্তানের সংবিধানের মূলনীতি নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ১৯৫০ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বরে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে এর বিপরীতে পূর্ববঙ্গে বিক্ষোভ হয়।[৯১] ১৯৫০ সালের ২রা অক্টোবরে পাকিস্তান গণপরিষদে সংবিধানের মূলনীতি কমিটির আলোচনায় ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন।[৯২]

১৯৫১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে একাধিক ব্যক্তির স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনকে দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা হিসেবে দ্রুত কার্যকর করার জন্য আহ্বান করা হয়। উল্লেখ্য যে ১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ আইনসভায় বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে এপ্রিলে আবদুল মতিন সমগ্র দেশে প্রচারের জন্য একটি স্মারকলিপি প্রকাশ করে যা তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়। স্মারকলিপিতে লেখা ছিল যে শুধু বাংলাই পাকিস্তানের উপযুক্ত রাষ্ট্রভাষা হতে পারে।[৯৩]

আততায়ীর হাতে লিয়াকত আলী খান মারা যাওয়ার পর ১৭ অক্টোবরে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।[৯৪]

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রদত্ত ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সিদ্ধান্তকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে শুধু উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হবে। ভাষণে তিনি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে দেওয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণের একাংশ উদ্ধৃত করেন।[৯৫] উল্লেখ্য যে বাংলা ভালো না জানায় নাজিমুদ্দিনকে ভাষণটি উর্দু বর্ণমালায় লিখে দেওয়া হয়েছিল।[৯৬] তার এই ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় প্রদেশে জনসাধারণের মাঝে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেদিন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ প্রধানমন্ত্রীকে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা মনে করিয়ে দেন। ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জানুয়ারিতে বিক্ষোভ সভার আয়োজন করা হয়।[৯৭] তারপরের দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতীকী ধর্মঘট পালন করে।[৯৮] ধর্মঘটের পর ছাত্ররা আমতলায়[] আয়োজিত প্রতীকী সভা হয় ও তারপর মিছিল বের হয়।[৯৮] সেদিন ঢাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডাকা হয়। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়।[৯৯] ৩০ জানুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ডাকে।[১০০] ঢাকা বার লাইব্রেরিতে ৩১ জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহূত সর্বদলীয় সভায়[৯৯] অন্তত ৪০ সদস্য[১০১] নিয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সভায় চুক্তি ভঙ্গের জন্য খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন, তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা, বাংলার জন্য আরবি অক্ষর প্রচলনের নিন্দা, ঢাকার ছাত্রদের ৪ ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্তকে সমর্থন প্রদান, বাংলা ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব, আটক বন্দিদের মুক্তি ও জননিরাপত্তা আইন প্রত্যাহারের দাবি ঘোষণা করে।[১০২]

চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২–১৯৫৬)

দমনপীড়ন

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নবাবপুরে জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের মিছিল।

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে সমবেত হয়। সমাবেশ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ছাত্ররা তাদের সমাবেশ শেষে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে।[১০৩] ধর্মঘট স্থিমিত করার উদ্দেশ্যে সরকার সেদিন ক্লাস সকাল ৮টায় শুরু করার ঘোষণা দিলেও ছাত্ররা ক্লাসে যোগদান করা থেকে বিরত থাকে। সেদিন আয়োজিত ছাত্রদের ও সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির দুটি পৃথক সভায় প্রদেশব্যাপী ২১ শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারিতে ধর্মঘট সারা প্রদেশের একাধিক স্থানে পালিত হয়।[১০৪] ৮ ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সভায় ১১ ফেব্রুয়ারিতে পতাকা দিবস পালনের জন্য এর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শাখার কর্মীদের বলা হয়।[১০৫] এছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলন সম্পর্কে একটি সার্কুলার প্রকাশ করে।[১০৬] সার্কুলারে কর্মীদের নিকট আন্দোলন সফল করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।[১০৭]

২০ ফেব্রুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।[১০৮] কিন্তু প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সংসদীয় দল ও কর্মদলের সভায় সদস্যরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা মেনে নেওয়ার প্রস্তাব করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।[১০৯] একই দিনে নবাবপুরস্থ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সদরদপ্তরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ধর্মঘট পালিত হবে কিনা এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। বৈঠকে অধিকাংশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে গেলেও যুবলীগের নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দেওয়া হয়।[১১০] সবশেষে ১১-৩ ভোটে[১১১] ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।[২৭] একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে একই বিষয় নিয়ে পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ হলে ফকির শাহাবুদ্দীনের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সভায় নেতৃত্ব দেন আবদুল মোমিন। শাহাবুদ্দিন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেন আবদুল মোমিন এবং শামসুল আলম।[১১২] পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।[১১৩]

২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রশ্নে পুরাতন কলাভবন প্রাঙ্গণে আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসভা।

পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ভোরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হয়। সকাল নয়টার মধ্যে ক্যাম্পাসের আমতলায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়।[১১৪] একই সময়ে এলাকায় পুলিশি উপস্থিতি জোরদার করা হয়।[১১৫] আমতলায় ছাত্ররা সভা শুরু করে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করতে তাদের অনুরোধ করে।[১১৬] সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।[১১৭] ছাত্ররা গেটে জড়ো হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভেঙে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছাত্রদের সতর্ক করে দেয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের পুলিশ গ্রেফতার করতে থাকে।[১০][১১৮] ছাত্ররাও পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে।[১১৯] বেলা ১১টায় ছাত্ররা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ক্যাম্পাস হতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তারা আইনসভা ভবন ঘেরাও করতে যাচ্ছিল।[১২০]

২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: পুরাতন কলাভবন প্রাঙ্গণ, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রাক্কালে।

বেলা ৩টার দিকে আইনসভায় অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে ছাত্ররা আইনসভা ভবনের দিকে যেতে নিলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে যায়। এমন সময়ে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল গেটের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছাত্রদের উপর গুলি করে।[১২১] পুলিশের গুলিবর্ষণে আব্দুল জব্বার এবং রফিক উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন।[১২২] এছাড়া আব্দুস সালাম, আবুল বরকতসহ আরও অনেকে সেসময় নিহত হন।[১০][১২৩] ঐদিন অহিউল্লাহ নামের একজন ৮/৯ বছরের কিশোরও নিহত হয়।[১০]

ছাত্র হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনগণ ঘটনাস্থলে আসার উদ্যোগ নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত অফিস, দোকানপাট ও পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন সাথে সাথে জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।[৬২] রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহ্বান করে এবং রেডিও স্টেশন পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকে।[১২৪][১২৫]

ঐসময় আইনসভায় অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান।[১০] আইনসভায় মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ কিছু সদস্য প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের লক্ষ্যে অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলেন।[১২৬] বেশ কিছু সদস্য এই কার্যক্রমে সমর্থন দিয়েছিলেন। যদিও নুরুল আমিন অন্যান্য নেতাদের অনুরোধ রাখেননি এবং অধিবেশনে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।[১০][১২৬] গুলির ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে স্থাপন করা মাইকে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ করা হয় ও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।[১২৭] সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ ও যুবলীগ একত্রে পরের দিন সকালে হোস্টেল প্রাঙ্গণে গায়েবানা জানাজা, জনসভা ও মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।[১২৮] ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বাইরে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে হরতালের কারণে দোকানপাট বন্ধ ছিল।[১২৯]

২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে বিশাল মিছিল বের হয়।

ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে যথাসময়ে নিহতদের জন্যে গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয়।[১৩০] সারা দেশ হয়ে উঠে মিছিল ও বিক্ষোভে উত্তাল। জনগণ ১৪৪ ধারা অমান্য করার পাশাপাশি শোক পালন করতে থাকে।[১৩১] বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থল ত্যাগ করে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয়।[১৩২] নবাবপুর রোডে আন্দোলনের পক্ষে শোভাযাত্রা পরিচালিত হয়।[১৩২]

শহরের বিভিন্ন অংশে একইভাবে জানাজা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন কলেজ, ব্যাংক-সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে লোকজন এই মিছিলে অংশ নিতে আসে।[৬২] বিকেলে আরেকটি বিশাল মিছিল পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিক্ষুদ্ধ জনতা সরকার পক্ষের প্রথম সারির দুটি সংবাদপত্র জুবিলী প্রেস এবং মর্নিং নিউজ অফিসে অগ্নিসংযোগ করে।[১৩৩][১৩৪]

বিকেলে পুলিশ মেডিকেল হোস্টেলে স্থাপন করা মাইক খুলে নিয়ে যায়।[১৩৫] সারা ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। সেদিন শহরে সব যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। ধর্মঘটে শ্রমিকরা যোগ দেয়। রেল শ্রমিকরা ধর্মঘটে যোগ দেওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।[১৩৬] ২১শে ফেব্রুয়ারিতে গুলিতে নিহতদের জন্য শহরের প্রতিটি মসজিদে মুসল্লিরা জড়ো হয়ে তাদের জন্য দোয়া করে।[১৩৭] বিকেলে পূর্ববঙ্গ আইনসভার অধিবেশনে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও খয়রাত হোসেন অধিবেশনের নির্ধারিত কার্যাবলী পুলিশের গুলিতে আহত ও নিহতদের ব্যাপারে আলোচনার জন্য মুলতুবি ও শোক প্রস্তাবের আবেদন করেন। কিন্তু শোক প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়।[১৩৮] আইনসভায় প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশের প্রস্তাব করেন। তবে বিরোধীপক্ষ থেকে এর একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হলে সেগুলো অগ্রাহ্য হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়।[১৩৯] একইদিনে চট্টগ্রামে জনসাধারণ মিছিল বের করে ও লালদীঘিতে জনসভা করে। মিছিলে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের স্লোগান দেওয়া হয়।[১৩৯] সিলেট ও খুলনার মোরেলগঞ্জেও প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়।[১৪০]

২৩শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় হরতাল পালিত হয় ও সব দোকানপাট বন্ধ থাকে। রেল কর্মচারীদের ধর্মঘটের কারণে শহরে ট্রেন চলাচল সীমিত ছিল। সকালে নাজিরাবাজার পশু হাসপাতালের নিকটে পুলিশের লাঠিচার্জে ৪জন আহত হন। ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও প্রচুর মানুষ তা ভঙ্গ করে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। তবে সেজন্য সড়কে কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি।[১৪১] দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাঙ্গণে ২২শে ফেব্রুয়ারিতে নিহতদের জন্য গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয়।[১৪২] এই দিন শহরের বিভিন্ন সংগঠন ও পেশাজীবিরা সভা আয়োজন করে ঘটনার নিন্দা জ্ঞাপন করে প্রাসঙ্গিক প্রস্তাব উত্থাপন করে।[১৪৩] সকালে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে ম্যাজিস্ট্রেট নেতাদের ধর্মঘট ভাঙ্গার নির্দেশ দেন। কিন্তু নেতারা জানান যে যানবাহন চালকরা ধর্মঘটে যোগ দেওয়ায় তা সম্ভব নয়, তাছাড়া দুর্ঘটনার জন্য তাদের যানবাহন বীমাভুক্ত করা হলেও দাঙ্গার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা বীমার অধীনে ক্ষতিপূরণের যোগ্য বিবেচিত হবেনা। বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।[১৪৪] বিকেলে মেডিকেল হোস্টেলে কর্মী আজমল হোসেনের রুমে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি ২৫ শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ধর্মঘট ও ৫ই মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতাল আহ্বানের প্রস্তাব গৃহীত হয়।[১৪৫] রাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সংসদীয় দলের সদস্যগণ উপস্থিত হন। সেখানে সদস্যগণ নুরুল আমিনের সমালোচনা করেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তার উপর আস্থা ভোট করা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে নুরুল আমিন জিতে যান।[১৪৬]

একইদিনে ময়মনসিংহে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যশোরের শিরোলিস্তান ও টাঙ্গাইলে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। গুলিবর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে কুমিল্লায় হরতাল পালিত হয় ও টাউন হলের সামনে পাঁচ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সভা আয়োজিত হয়। সংবাদপত্র অনুযায়ী কুমিল্লার ইতিহাসে এমন ধর্মঘট অদ্বিতীয়।[১৪৭]

চলমান বিক্ষোভ

১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি: প্রথম শহীদ দিবস সকালে ছাত্র-জনতার শোক শোভাযাত্রা মেডিক্যাল হোস্টেল মোড়ে (যেখান থেকে গুলি চলেছিল) শহীদানের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করছে।
১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরিতে ফ্যাস্টুন হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা।

২৩শে ফেব্রুয়ারির পর সরকার আন্দোলনের বিপক্ষে জোরালো অপপ্রচার চালাতে থাকে।[১৪৮] তারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে যে, কমিউনিস্ট ও পাকিস্তানবিরোধীদের প্ররোচনায় ছাত্ররা পুলিশকে আক্রমণ করেছিল। তারা বিভিন্নভাবে তাদের এই প্রচার অব্যাহত রাখে।[১৪৯][১৫০]

২৪শে ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক আজাদে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের প্রস্তাব প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবে পুলিশের গুলিতে নিহতদের জন্য দুঃখপ্রকাশ করা হয় এবং ঘটনার জন্য পূর্ববঙ্গ হাইকোর্টের বিচারপতির অধীনে একটি তদন্ত কমিটি করার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়।[১৫১] তবে একই দিনে বেতারে দেওয়া বক্তৃতায় নুরুল আমিন হতাহতের দোষ বিশৃঙ্খলাকারীদের উপর দিয়ে দেন।[১৫২] এর প্রতিবাদে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব বিবৃতি দান করেন।[১৫৩] গুলিবর্ষণের ঘটনার পর পূর্ববঙ্গ আইনসভা থেকে আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পদত্যাগ করেন।[১৫৪]

২৪শে ফেব্রুয়ারি রাতে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও ২৫শে ফেব্রুয়ারিতে প্রাক্তন মুসলিম লীগ সদস্য আবুল হাশিম, মনোরঞ্জন ধর ও গোবিন্দলাল ব্যানার্জিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ২৫ ফেব্রুয়ারিতেও ঢাকায় হরতাল চলতে থাকে। তবে হতাহত কিংবা হরতালে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেনি। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে একাধিক লোকজন মাইকে বক্তৃতায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, পুলিশি নির্যাতন, ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার নিয়ে কথা বলতে থাকেন। ফলে পুলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস মাইক কেড়ে নিতে হল ঘেরাও করতে এসে গেট বন্ধ থাকার কারণে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। পরে হলের প্রভোস্ট ওসমান গণির সমঝোতায় মাইক পুলিশের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়। মাইক কেড়ে নেওয়ায় ছাত্ররা ফুঁসে উঠে ও হল থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত মিছিল বের করে। অন্যদিকে পুলিশ জগন্নাথ হল ও ফজলুল হক হলের মাইকও কেড়ে নেয়।[১৫৫] ২৫শে ফেব্রুয়ারি তারিখে, কল-কারখানার শ্রমিকরা নারায়ণগঞ্জ শহরে ধর্মঘটের ডাক দেয়।[১৫৬] ধর্মঘটে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল।[১৫৭] দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আয়োজিত বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় যে পরের দিনের ধর্মঘট স্থগিত, প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের নিকট চরমপত্র প্রদান, ৫ মার্চ শহীদ দিবস পালন ও ছাত্র ধর্মঘট অব্যাহত রাখা হবে। বৈঠকে সিভিল লিবার্টি কোঅর্ডিনেশন কমিটিও ছিল।[১৫৮]

পাশাপাশি ব্যাপক হারে সাধারণ জনগণ ও ছাত্র গ্রেফতার অব্যাহত রাখে। ২৫ ফেব্রুয়ারি আবুল বরকতের ভাই একটি হত্যা মামলা দায়ের করার চেষ্টা করলে, উপযুক্ত কাগজের অভাব দেখিয়ে সরকার মামলাটি গ্রহণ করেনি।[১৫৯] রফিকউদ্দিন আহমদের পরিবার একই ধরনের একটি প্রচেষ্টা নিলে, ঐ একই কারণে তাও বাতিল হয়।[১৬০]

২৬ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পি সি চক্রবর্তী, মোজাফফর আহমদ চৌধুরীমুনীর চৌধুরী এবং জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক অজিত গুহযতীন সেনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া পুলিশ সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে ২৮ জনকে গ্রেফতার করে।[১৬১] ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।[১৬২]

২৯শে ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাই স্কুলের এক শিক্ষিকাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের পথ আটকানোর চেষ্টা করে ও পথে গাছ কেটে ফেলে রাখে। জনতার উপর লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হয়ে সরকার ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ এনে পরিস্থিতি সামলায়। একই দিনে আওয়ামী লীগ কর্মী মহম্মদ আওয়াল ও নেতা এবং আইনসভা সদস্য ওসমান আলী ও তার ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়।[১৬৩]

৫ই মার্চ ঢাকা ব্যতীত প্রদেশের সর্বত্র ডাকা ধর্মঘট পালিত হয়। ৭ই মার্চে ঢাকার শান্তিনগরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভা ডাকা হয়।[১৬৪] খুব সতর্কতার সাথে এই সভার আয়োজন করা হয়েছিল।[১৬৫] তবে সভা চলাকালে বৈঠকস্থলে পুলিশ এসে উপস্থিতদের গ্রেফতার করে।[১৬৬] ফলে ১৪ই মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। নতুন কমিটিতে আতাউর রহমান খান আহ্বায়ক ও কমরুদ্দীন আহমদ যুগ্ম-আহ্বায়ক হন। অন্যদিকে আন্দোলন ঢাকার বাইরে পুরোদমে চলতে থাকে।[১৬৭] একইদিনে করাচীতে পাকিস্তান গণপরিষদের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে তাগাদা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। যদিও আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী করাচী পৌঁছানোর আগে ভাষার প্রসঙ্গ তোলা হবেনা। তবে সেদিন রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর শোকে অধিবেশন মুলতুবি করা হয়।[১৬৮] ইতোমধ্যে সদস্য নূর আহমদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের নোটিশ গণপরিষদে প্রেরণ করেছিলেন। ১৮ই মার্চে গণপরিষদে এ এম এ হামিদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থন করে বক্তব্য দেন।[১৬৯] অপরদিকে ১৩ মার্চে পূর্ববঙ্গ সরকার ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে হতাহতের ঘটনার জন্য পূর্ববঙ্গ হাইকোর্টের বিচারপতি টমাস হোবার্ট এলিসকে প্রধান করে একটা তদন্ত কমিশন গঠন করে।[১৭০] ২৭ মার্চে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি একটি বিবৃতিতে তদন্ত কমিশন যেন কাজ প্রকাশ্যে পরিচালনা করে সে দাবি জানিয়েছিল এবং তা অগ্রাহ্য করা হলে তারা নিজেরাই তদন্ত কমিশন গঠন করবে বলে জানায়। তারা কমিশনে নিরপেক্ষ সদস্য রাখার পাশাপাশি আরো কিছু দাবি করে। তবে দাবিগুলো মেনে না নেওয়ায় ২৮ মার্চে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা কমিশন বর্জন করে।[১৭১] ১০ এপ্রিলে গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সেদিনই এ সংক্রান্ত আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।[১৭২] ১৬ এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয় এবং ১৯ এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি সভায় কারাগারে বন্দী শিক্ষক ও ছাত্রদের মুক্ত করার জন্য লিগ্যাল ডিফেন্স কমিটি গঠিত হয়।[১৭৩]

২৭ এপ্রিলে যথাসময়ে ঢাকার বার লাইব্ররি হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সম্মেলনে আনুমানিক ৫০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন, যেখানে ১৫টি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল; আন্দোলনে আহত ও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সরকারের গড়িমসি করার নিন্দা জ্ঞাপন, ইংরেজিকে আরো ২০ বছরের জন্য রাষ্ট্রভাষা রাখার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ, নির্বাচনের ভিত্তিতে নতুন গণপরিষদ গঠন, আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের নিন্দা জ্ঞাপন ও তাদের বিনা শর্তে মুক্তির দাবি, দমনপীড়নের নিন্দা জানিয়ে নিবর্তনমূলক আইন বাতিল করে বন্দীদের মুক্তির দাবি, নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহত কর্মীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিরাপত্তা বন্দীদের ও তাদের পরিবারকে উপযুক্ত সুবিধা প্রদান, নারায়ণগঞ্জে রাইফেলের গুলিতে নিহত কনস্টেবলের জন্য শোক প্রকাশ করে তদন্তের দাবি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লোপের নিন্দা জ্ঞাপন, পাকিস্তান অবজার্ভার সংবাদপত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির নিন্দা করে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দেওয়ার দাবি, পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য প্রাদেশিক সরকারগুলোকে অনুরোধ করা আর তা না হওয়া পর্যন্ত উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐচ্ছিক ভাষা করার অনুরোধ করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করতে বাংলায় বইপত্র অনুবাদ করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ।[১৭৪]

৮ই এপ্রিল এলিসের কমিশন তদন্ত শুরু করে যা ৩রা মে তারিখে শেষ হয়েছিল। কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের মতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ যা করেছি তা ঠিক ছিল।[১৭৫] প্রতিবেদনে আরো বলা হয় প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানোর জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্ধমান হাউস থেকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে পুলিশের কাছে গুলি চালানোর জন্য একটি লিখিত আদেশ হস্তান্তর করা হয়েছিল। এর সাথে একটি চিঠিও সংযুক্ত ছিল, যেখানে তদন্তের সীমিত সুযোগ নিয়ে ছাত্রদের অসন্তোষ উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয় যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়তো সম্ভব হবে না বা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হবে।[১৭৬] জনগণের নিকট এই তদন্ত কমিশন আগেই প্রত্যাখ্যান হয়েছিল।[১৭৭] এপ্রিল ও মে মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা একাধিক বৈঠক করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে শুভেচ্ছা মিশন পাঠানো, বাংলা ভাষার সমস্যার জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ ও স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।[১৭৮] ৫ই ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ দিবস ঘোষণা করে এবং ওই দিনে ঢাকার আরমানিটোলার ময়দানে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে জনসভা করা হয়। [১৭৯] দিবসটি প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়েছিল।[১৮০]

১৯৫৩ সালে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় কর্মপরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারি স্মরণে শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও দিবসটি পালনে সম্মত হন।[১৮১][১৮২] ১৯৫৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।[১৮৩] ভাষা আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে সারা দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ দিবস পালিত হয়। অধিকাংশ অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ প্রভাতফেরীতে যোগ দেন। হাজার হাজার মানুষ শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসে এবং মিছিল করে প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে। সহিংসতা রোধের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়।[১৮৪] অন্তত লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে আরমানিটোলায় বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে একাধিক দাবি ব্যক্ত করা হয়; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সংগ্রামের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়, রাজবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা হয়, জননিরাপত্তা আইন প্রত্যাহারের দাবি করা হয়, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর চিকিৎসা ব্যাহত করার নিন্দা জানিয়ে তার মুক্তি দাবি করা হয়।[১০][১৮৫] একইদিনে রাজবন্দীরা সেই দিনের জন্য অনশন করে। যদিও তার আগে কিছু বন্দী মুক্তি পেয়েছিলেন।[১৮৬] সন্ধ্যায় জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ের ব্রিটানিকা সিনেমা হলে শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল।[১৮৭] রেলওয়ের কর্মচারীরা ছাত্রদের দাবির সাথে একমত হয়ে ধর্মঘট পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসের ছাত্ররা শহীদদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে।[১৮৮] অন্যদিকে ২রা মার্চে বগুড়ার নবাব প্যালেসে দেওয়া ভাষ্কণে পাকিস্তানের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ফজলুর রহমান বলেন যে বাংলাকে যারা রাষ্ট্রভাষা করতে চায় তারা দেশদ্রোহী। তার এ বক্তব্যে বগুড়া ও রংপুরের জনগণ রেগে গিয়ে তাকে কালো পতাকা দেখায় ও সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়।[১৮৯] ১১ই মার্চে প্রদেশে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয় এবং সেই উপলক্ষ্যে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের উদ্যোগে ঢাকার বার অ্যাসোসিয়েশন হলে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। ১৮ই এপ্রিল থেকে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও খয়রাত হোসেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন শুরু করেন এবং কারাগারের অধিকাংশ কারাবন্দী তাতে অংশগ্রহণ করেন। কারাগার থেকে ২১শে এপ্রিলে মাওলানা ভাসানী মুক্তি লাভ করেন।[১৯০] পরবর্তীতে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা ও অন্যান্য দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ৪ঠা জুলাইয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়।[১৯১] একই বছরের এপ্রিল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত আরো অনেক বন্দী কারাগার থেকে মুক্তি পায়।[১৯২] ১৯৫৪ সালের ১৯শে এপ্রিলে পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের সভায় উর্দু ও বাংলা উভয় ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।[১৯৩] অবশেষে গণপরিষদে সদস্য আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দুই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু ২০শে এপ্রিলের অধিবেশন কিছু বিষয় সমাধা করার কারণ দেখিয়ে মুলতুবি করা হয়। উল্লেখ্য যে তখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বাবায়ে উর্দু মৌলভী আবদুল হক ও কিছু সংবাদপত্র কাজ করছিল। সংসদীয় দলের ভাষা কমিটিতে সরদার আব্দুর রব নিশতারকে রাখা হলেও তিনি এর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করেন। ২২শে এপ্রিল করাচীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করে বিক্ষোভ হয়।[১৯৪] বিক্ষোভের ফলে শহরে অগ্নিসংযোগ ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা গণপরিষদ ভবনে ভাঙ্গচুর করতে থাকলে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। মিছিলকারীদের একটি প্রতিনিধিদলকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া আবদুল হককে পরবর্তী দিনের পরিস্থিতি সংক্রান্ত বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানান। ভাষা বিবাদের কোনো সমাধান না করে ২৬শে এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে হাঙ্গামার আগের দিন ভাষা কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। পরবর্তী সপ্তাহে করাচীতে শেখ আবদুল মাজিদ সিন্ধির সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় পাকিস্তানের সকল ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পরে গণপরিষদের অধিবেশন সমাপ্ত হয় ও ৩০ এপ্রিলে পশ্চিম পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন জানান যে রাষ্ট্রভাষার জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ৩০ মে তারিখে গভর্নর-জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদ পূর্ববঙ্গে গভর্নরের শাসন জারি করলে পূর্ববঙ্গের সরকারের পতন হয়। ১লা জুন থেকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িতদের ধরপাকড় শুরু হয়। [১৯৫] গভর্নরের শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পরে শহীদ দিবস আয়োজনে সরকার বাধা দিতে থাকে। ১৯৫৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলনের সময় পুলিশ কিছু ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে। এই সময় ক্যাম্পাসের ছাত্রাবাস থেকে ছাত্ররা কালো ব্যাজ ধারণ করে বেরিয়ে স্লোগান দিতে থাকে, তাদেরকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে বন্ড দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবে ছাত্ররা কঠোরভাবে বিরোধিতা করার ফলে প্রশাসন হার মেনে নিয়ে পরে তাদেরকে মুক্তি দেয়।[১৯৬]

আবুল বরকতের পরিবার শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে।

শহীদদের সংখ্যা

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিলেন, তা নিয়ে সরকারি হিসাব এবং গবেষকদের তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। সরকারিভাবে ৫ জনকে (রফিক, শফিউর, জব্বার, বরকত, সালাম) স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম দলিল হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন এবং গবেষক বশীর আল হেলালের গবেষণায় অন্তত ৮ থেকে ৯ জন শহীদের নাম পাওয়া যায়।[১৯৭] ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। এম আর আখতার মুকুল এবং অন্যান্য গবেষকদের তথ্যানুযায়ী ৮ জন শহীদের একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা পাওয়া যায়, যেখানে শিশু অহিউল্লাহ এবং একজন অজ্ঞাতনামা কিশোরও অন্তর্ভুক্ত।[১৯৮] তাদের মধ্যে রফিকউদ্দিন আহমদকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়;[১৯৯] অন্যদিকে ২১ ফেব্রুয়ারিতে গুলিবিদ্ধ হলেও সর্বশেষ শহীদ আবদুস সালাম ৭ এপ্রিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলেও অহিউল্লাহকে সর্বকনিষ্ঠ ভাষাশহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।[২০০]

নিচে গবেষকদের তালিকা ও সমসাময়িক পত্রিকার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শহীদদের তালিকা দেওয়া হলো:

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের তালিকা
নাম মৃত্যুর তারিখ মৃত্যুর স্থান ও বিবরণ পেশা তথ্যসূত্র
রফিকউদ্দিন আহমদ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ ছাত্র, দেবেন্দ্র কলেজ;
মালিক, বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেস
[২০১]
আবদুল জব্বার ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (আমতলায় গুলিবিদ্ধ) কৃষক ও দর্জি (গফরগাঁও)
বি.দ্র. কোনো কোনো সংবাদে তাঁকে ভুলবশত ঢাবি শিক্ষার্থী উল্লেখ করা হয়েছে।
[২০২]
আবুল বরকত ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (হোস্টেল প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ) ছাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [২০৩]
শফিউর রহমান ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (বংশাল রোডে গুলিবিদ্ধ) কর্মচারী, হিসাব রক্ষণ শাখা, ঢাকা হাইকোর্ট [২০৪]
আবদুস সালাম ৭ এপ্রিল ১৯৫২ (২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পিয়ন, প্রাদেশিক শিল্প অধিদপ্তর [২০৫]
অহিউল্লাহ ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নবাবপুর রোড (খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে গুলিবিদ্ধ) রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের ছেলে (বয়স ৮-৯ বছর);
সমসাময়িক মতে শিশু শ্রমিক বা শিক্ষার্থী
[১৯৭][২০২]
আব্দুল আউয়াল ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ জনসন রোড (রথখোলার মোড়) রিকশাচালক [১৯৮][২০২]
অজ্ঞাতনামা কিশোর ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নওয়াবপুর রোড অজ্ঞাত [২০২][১৯৮]
সালাউদ্দীন ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ বিস্তারিত জানা যায়নি কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করেন, রফিকউদ্দিনকেই ভুল করে সংবাদপত্রে সালাউদ্দীন উল্লেখ করা হয়েছিল। [২০২]

প্রতিক্রিয়া

পশ্চিম পাকিস্তানে

যদিও পূর্ব পাকিস্তানের অনেক বাঙালি মনে করেন যে, বাংলা ভাষা আন্দোলন জাতিগত জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়েছিল; কিন্তু এ আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের দুই অংশের সংস্কৃতির পার্থক্যগুলো সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।[][৫৯][২০৬] পশ্চিম পাকিস্তানে এ আন্দোলনটি পাকিস্তানি জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে বিভাগীয় উত্থান বলে মনে করা হয়।[২০৭] দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে "শুধু উর্দু" নীতি প্রত্যাখ্যান করাকে মুসলমানদের পার্সি-আরবি সংস্কৃতি এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার মূল মতাদর্শের গুরুতর লঙ্ঘন হিসাবে দেখা হয়।[] পশ্চিম পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন শক্তিশালী রাজনীতিবিদ মনে করতেন যে, "উর্দু" হল ভারতীয় ইসলামি সংস্কৃতির অংশ, আর বাংলাকে তারা হিন্দু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি এক সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচনা করতেন।[১১] অধিকাংশই যারা "শুধু উর্দু" নীতির পক্ষে ছিলেন, তারা মনে করতেন যে, উর্দু কেবলমাত্র পাকিস্তান দেশের ভাষা হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র জাতির ভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এধরনের চিন্তা-ভাবনাও উর্দু নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল; কেননা, পাকিস্তানে তখন আরও বেশ কিছু ভাষাগত পার্থক্যের সম্প্রদায় ছিল।[১১] বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় ক্রমাগতভাবে বর্ণবাদের শিকার হয়। ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আইয়ুব খান বলেন যে, "পূর্ব পাকিস্তান... এখনো হিন্দু সংস্কৃতি এবং প্রভাবের অধীনে রয়েছে"।[১১] ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের নৃগোষ্ঠী ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কার্যক্রমে গতির সঞ্চার করে।[]

পূর্ব পাকিস্তানে

বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত আন্দোলন চলাকালে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি তথা বাঙালিদের কাছে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বৈষম্যের ব্যাপারটি সামনে চলে আসে। যেহেতু পাকিস্তানের ক্ষমতা পশ্চিম থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো সেহেতু বাঙালি ও অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে ঘৃণা জেগে উঠতে থাকে।[২০৮]

মধ্যবিত্ত বাঙালিরা শোষকদের উর্দুভাষী ও পশ্চিম পাকিস্তানি হিসেবে দেখতে শুরু করে। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গে বসবাসরত উর্দুভাষী মোহাজেররা বাংলা ভাষা আন্দোলন সমর্থনকারী বাঙালিদের ইসলামের শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে, কেননা তাদের কাছে উর্দু ছিল ইসলামি সাহিত্যসংস্কৃতির ভাষা। ফলস্বরূপ অবাঙালি মোহাজেররা পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।[২০৮]

গণমাধ্যমে

পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিতর্কের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সংবাদপত্রগুলো বাংলা ভাষার পক্ষে-বিপক্ষে নানা নিবন্ধ, সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে ভাষার এই ইস্যুটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কলকাতা থেকে মুসলিম লীগের সমর্থক পত্রিকাগুলো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রসঙ্গে বেশকিছু প্রবন্ধ ছাপায়। দৈনিক ইত্তেহাদ বাংলা ভাষার পক্ষে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। দৈনিক আজাদও ভূমিকা রেখেছিল৷ তারা বাংলার সমর্থনে বেশকিছু প্রবন্ধ ছাপায়। দেশভাগের আগে দৈনিক আজাদ ভাষার প্রশ্নে করা বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করে। তবে এ ব্যাপারে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি রহস্যঘেরা ছিল শুরু থেকেই। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কখনো বাংলা ভাষার পক্ষে আবার কখনো বিপক্ষে বক্তব্য বা সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নে এই পত্রিকাটির অবস্থান সুনির্দিষ্ট ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা বাংলা—না উর্দু? নামক একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এই পুস্তিকায় দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের প্রবন্ধও বিদ্যমান ছিল। শুরু থেকেই মর্নিং নিউজ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। এই পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও খবর প্রকাশ করত। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তানের একচোখা নীতি বিষয়ে তমদ্দুন মজলিসের কয়জন নেতা মন্ত্রী ফজলুর রহমানের সাথে আলোচনা করেন, কিন্তু মন্ত্রী বিষয়টিকে ' অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে বক্তব্য করেন। ইত্তেহাদ পত্রিকা তাঁর এই বক্তব্যের ওপর ‘ভুলের পুনরাবৃত্তি’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয়। সেখানে পাকিস্তান গণপরিষদের বাঙালি প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ২৫ ফেব্রুয়ারিতে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তান গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের জন্য দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি অমৃতবাজার পত্রিকা থেকে এই খবর প্রকাশিত হয়৷ ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাজা নাজিমুদ্দিন গণপরিষদে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে। ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক আজাদ খাজা নাজিমুদ্দিনের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। এই সম্পাদকীয়-এর বক্তব্যটি বাংলা ভাষার পক্ষে পত্রিকাটির দৃঢ় সমর্থন নির্দেশক। তবে ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রিকাটি সর্বতোভাবে উর্দুকেই সমর্থন করে তাও একই বছরে। কিছু পত্রিকা বাংলা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে জিন্দেগী, ইনসাফ, ও দেশের দাবী পত্রিকা থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের পর বাংলা ভাষা আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এসময় পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের চেষ্টা করে। দৈনিক আজাদে বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের খবর বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালের ২৪শে মে তারিখে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনার পর ভাষার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে দৈনিক আজাদ। সেদিন সন্ধ্যায় বিশেষ টেলিগ্রাম প্রকাশ করে দৈনিক আজাদ। ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’ ব্যানার শিরোনাম করা হয়। দৈনিক আজাদ তখন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে মর্নিং নিউজ উর্দু ভাষাকে সমর্থন করত। পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে তারা অন্য রূপ দিয়ে ২২শে ফেব্রুয়ারি খবর প্রকাশ করে।[২০৯]

পরিণাম

রাজনীতি

১৯৫৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের উদ্দেশ্যে প্রভাতফেরিতে নগ্ন পায়ে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৫৪ সালকে পূর্ব বঙ্গের রাজনৈতিক ও ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক পট পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মুসলিম লীগ বিরোধীদের সংহতি নষ্ট করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। সেজন্য তারা ভাষা আন্দোলন দিবসের আগে যুক্তফ্রন্টের একাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে।[২১০]

প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর তাদের ইশতেহার প্রকাশ করে, যেখানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, কৃষি ও শিক্ষা খাতে সংস্কার, এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের আহ্বান জানানো হয়েছিল।[২১১] দলটি জানুয়ারি ১৯৫৪ সালে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে।[২১২]

অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ৪১ দফা ইশতেহার প্রকাশ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক সংস্কার এবং জাতীয়করণ।[২১৩] কমিউনিস্ট পার্টি ২ ডিসেম্বর ২২ দফা ইশতেহার প্রকাশ করে, যেখানে তারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানায় এবং পাশাপাশি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবি তোলে।[২১৪]

বিভিন্ন বিরোধী দলগুলো একত্র হয়ে একটি যৌথ দল গঠনের আহ্বান জানায়। ৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং কৃষক শ্রমিক পার্টির মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন হয়।[২১৫] পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টি এবং গণতন্ত্রী দলও এই ফ্রন্টে যোগ দেয়।[২১২]

বাংলা ভাষা আন্দোলন দমন করার ফলে সরকার জনসাধারণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ হেরে যায়।[২১৬]

১৯৫৪ সালের ৫ই এপ্রিল প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শিক্ষা, বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প দফতরের মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক (নান্না মিয়া) সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি পূর্ববর্তী মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষা ও বিকাশের লক্ষ্যে একটি বাংলা ভাষা গবেষণাগার হিসেবে রূপান্তর করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারিকে একটি পরিকল্পনা তৈরির করার নির্দেশনা দিয়েছেন।[২১৭][২১৮]

১৯৫৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসের চত্বরে মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার বাংলা একাডেমির উদ্বোধন করেন।[২১৯]। এই প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়।[২১৮] যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই প্রাদেশিক সরকার বাতিল ঘোষণা করা হয়।[২১০] ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তারিখে যুক্তফ্রন্ট পুনর্গঠন করা হয়; যদিও আওয়ামী লীগ মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেয়নি।[২২০]

অন্যদিকে ১৯৫৫ সালে গণপরিষদ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গ ভিত্তিক যুক্তফ্রন্ট ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করে।[২২১][৬২][২২২][২২৩]

১৯৫৬ সালে প্রদেশে ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবস শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রথমবারের মতো পালন করা হয়। সরকার নতুন শহীদ মিনার নির্মাণের একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। শহীদ ছাত্রদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গণপরিষদের অধিবেশন পাঁচ মিনিটের জন্য স্থগিত রাখা হয়। বাঙালি নেতাদের উদ্যোগে বড় বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং সরকারি-বেসরকারি সব অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়।[২২৪][২২৫]

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতীক ১৯৫৪ সালে গৃহীত হয়, যেখানে জাতীয় মূলমন্ত্র ঈমান, ইত্তিহাদ, নাজম-এর বাংলা অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ের পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে।[২২৬] ১৯৫৪ সালের ৭ মে গণপরিষদে মুসলিম লীগের সমর্থনে বাংলাকে সরকারি মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত করে।[২২২] ১৯৫৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির বিক্ষোভের পর সরকারের বুঝতে পারে যে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ নেই। তাই সরকার তাদের সাথে আপোস করার সিদ্ধান্ত নেয়।[২২৭] ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে, অনুচ্ছেদ ২১৪(১)-এ উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।[২২৮] কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া সংসদে সংবিধানের ভাষা-সংক্রান্ত ধারাগুলি উত্থাপন করেন। এই ধারাগুলির অনুযায়ী বাংলা ভাষাকে উর্দুর মতোই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। সংসদ ও আইনসভায় উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় বক্তব্য রাখার সুযোগ ছিল। সংবিধানে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহারের সুযোগেরও বিধান ছিল।[২২৯] তবে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক সরকার উর্দুকে একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের ৬ জানুয়ারি সামরিক সরকার একটি সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে ১৯৫৬ সালের সংবিধানের দুটি রাষ্ট্রভাষা নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়।[২৩০]

স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভাব

১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রের পরোক্ষ প্রস্তাব দেওয়া হলেও পরে এটি পাকিস্তানের প্রদেশ হওয়ায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন চাইতেন। এমন অবস্থায় বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেতনার সাথে অসচেতনভাবে স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন মিশে গিয়েছিল।[২৩১] বাংলা ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আন্দোলনের পর প্রদেশের জনগণের মধ্যে পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটি গুরুত্ব পেতে থাকে।[২৩২] বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পর জাতি গঠনের ক্ষেত্রেও এটি ছিল একটি মূল উপাদান[২৩৩] এই আন্দোলনের সাফল্য পাকিস্তান সরকারকে তাদের ভাষানীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করে এবং এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব এবং পাকিস্তানের বিভক্তির পথ তৈরি করে।[২৩৪] যদিও ১৯৫৬ সালের পর সরকারি ভাষার বিতর্ক সম্পন্ন হয়, কিন্তু আইয়ুব খানের সামরিক শাসন পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ও পশতুনদের দেনাগুলো বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়। জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সামরিক এবং বেসামরিক চাকুরীর ক্ষেত্রে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব এবং সরকারি সাহায্যের দিক থেকেও বাঙালিদের প্রাপ্ত অংশ ছিল খুবই কম। জাতিগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাঙালিদের এ বৈষম্যের ফলে চাপা ক্ষোভের জন্ম নিতে থাকে। এরই প্রভাব হিসেবে আঞ্চলিক স্বার্থসংরক্ষণকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের সমর্থন নিরঙ্কুশভাবে বাড়তে থাকে।[৫৯] পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, কেন্দ্রীয় সরকার এবং যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে প্রদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল ১৯৫৮ সালে সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যূত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ।[৬২] এর ফলেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আরো বড় অধিকার আদায় ও গণতন্ত্রের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আকার ধারণ করে।[][১১]

কিংবদন্তি

বাঙালি সংস্কৃতিতে প্রভাব

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানে বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে এবং পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় ভাবধারার সাহিত্যচর্চার ইতি ঘটে সেখানে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল বাংলা সাহিত্যচর্চার বিকাশ ঘটে।[২৩৫] এই আন্দোলনের ফলে পূর্ববঙ্গের পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটে। প্রদেশের মুসলিম মেয়েরা সম্মুখে বেরিয়ে আসে এবং ছাত্ররা স্যুট-কোট ছেড়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়তে শুরু করে। মেয়েদের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যোগ দিতে দেখা যায়। এর ফলে প্রদেশে নতুন এক বাঙালি চেতনার উদ্ভব হতে শুরু করে।[২৩২] আন্দোলনের পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম মুসলিম লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে এবং দলের নাম থেকে "মুসলিম" শব্দটি বাদ দিয়ে দেয়।[২৩৬] বাংলা ভাষা আন্দোলন এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলী নিষিদ্ধ করার ফলে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের ফলেই ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে শহরে রাঢ়ী উপভাষা ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।[২৩৭] লেখক আবদুল হকের মতে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটলেও তা অরাজনৈতিক ছিল। অন্যদিকে বশীর আল হেলালের মতে আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রভাব দেখা যায়নি।[২৩৮]

স্মৃতিস্তম্ভ

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার; ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পাশে নির্মিত
ভারতের কোলকাতায় ভাষা শহীদ মিনার
মোদের গরব, ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে একটি স্মারক ভাস্কর্য

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু করে। কাজ শেষ হয় ২৪ তারিখ ভোরে। তাতে একটি হাতে লেখা কাগজ গেঁথে দেয়া হয়, যাতে লেখা ছিল শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ[১৫৬] শহীদ মিনার নির্মাণের খবর দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে পাঠানো হয় ঐ দিনই। শহীদ বীরের স্মৃতিতে - এই শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহীদ মিনারের খবর।[২৮]

মিনারটি তৈরি হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হোস্টেলের (ব্যারাক) বার নম্বর শেডের পূর্ব প্রান্তে। কোণাকুণিভাবে হোস্টেলের মধ্যবর্তী রাস্তার গা-ঘেষে। উদ্দেশ্য ছিল যাতে বাইরের রাস্তা থেকে সহজেই দেখা যায় এবং যেকোনো ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে ভেতরের লম্বা টানা রাস্তাতে দাঁড়ালেই যেন চোখে পড়ে। শহীদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উচু আর ৬ ফুট চওড়া। মিনার তৈরির তদারকিতে ছিলেন জিএস শরফুদ্দিন (ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে পরিচিত), নকশা অঙ্কন করেছিলেন বদিউল আলম। তাদের সাথে ছিলেন সাঈদ হায়দার। শহীদ মিনার নির্মাণে সহযোগিতা করেন দুইজন রাজমিস্ত্রী। মেডিক্যাল কলেজের সম্প্রসারণের জন্য জমিয়ে রাখা ইট, বালু এবং পুরনো ঢাকার পিয়ারু সর্দারের গুদাম থেকে সিমেন্ট আনা হয়। ভোর হবার পর একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় মিনারটি।[২৮] ঐ দিনই অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে, ২২শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে শহীদ শফিউর রহমানের পিতা অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন।[৮৬] ২৫শে ফেব্রুয়ারি সকালে দশটার দিকে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।[২৮] উদ্বোধনের দিন অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী মেডিক্যালের ছাত্রদের আবাসিক হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে।[২৮][২৩৯]

অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ সালে সরকারিভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে ১৯৬৩ সালে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।[৮৬] এবং ১৯৬৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ আবুল বরকতের মা উক্ত মিনারটি উদ্বোধন করেন।[২৪০] ১৯৭১ সালে অপারেশন সার্চলাইট চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহীদ মিনার ভেঙ্গে দেওয়ার পর ১৯৭৩ সালে আবার এটি নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৮৩ সালে নির্মাণ শেষ হয়।[২৪১]

উদ্‌যাপন

সিডনির অ্যাশফিল্ড পার্কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিস্তম্ভ ও মাতৃভাষা উদযাপন।

১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকারের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। শহীদ মিনার নতুনভাবে তৈরি করার লক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে পাকিস্তানের গণপরিষদে কার্যক্রম পাঁচ মিনিট বন্ধ রাখা হয়। সারাদেশব্যাপী পালিত হয় শহীদ দিবস এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ।[২২০] আরমানিটোলায় এক বিশাল সমাবেশের নেতৃত্ব দেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।[২২০][২৪২][২৪৩]

১৯৫৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। ২০০১ সাল থেকে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। বাংলাদেশে এদিনে সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একুশে পদক প্রদান করে।[১০][২৪৪] বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয় পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে।[২৪৫]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

মানুষের ভেতর একুশের আবেগ পৌঁছে দিতে একুশের ঘটনা ও চেতনা নিয়ে রচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার দেশাত্মবোধক গান, নাটক, কবিতা ও চলচ্চিত্র।[২৪৬] ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব সূচিত হয়ে আসছে।[৮৬] ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার আহ্বায়ক ও দৈনিক সীমান্তের সম্পাদক মাহবুব উল আলম চৌধুরী "কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি" কবিতা রচনা করেন, যা বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা। কবিতাটি লেখার পরের দিন লালদীঘিতে পঠিত হওয়ার পর কবির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় এবং কবিতা বাজোয়াপ্ত করা হয়।[২৪৭] ১৯৫৩ সালে "একুশের সংকলন" শিরোনামে কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়।[২৪৮] আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর "মাগো ওরা বলে" কবিতায় মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে।[২৪৯] জসিমউদদীনের "একুশের গান" কবিতায় বাংলা ভাষার সাথে জনগণের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক হতে বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেতনা আগত হয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে।[২৫০] অন্ত্যমিল বিন্যাসে রচিত সুফিয়া কামালের "এমন আশ্চর্য দিন" কবিতায় বাংলা ভাষা আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের মৃত্যুকে তুলে ধরা হয়েছে।[২৫১] ফররুখ আহমদ ২১শে ফেব্রুয়ারির দিনটি স্মরণে লিখেন "ভাষা-আন্দোলনে নিহত আত্মার প্রতি" কবিতাটি।[২৫২] ষাটের দশকে একই বিষয় নিয়ে সিকান্‌দার আবু জাফর "তিমিরান্তিক" ও "বৈরী বৃষ্টিতে" কবিতা দুটি রচনা করেন।[২৫৩] "ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯" শিরোনামের কবিতায় শামসুর রহমান বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী ফেব্রুয়ারি ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে একত্র করেছেন।[২৫৪] "একুশের কবিতা"-এ আল মাহমুদ ভাষা আন্দোলনকে সুদীর্ঘ সময় থেকে চলা আসা আন্দোলন ও বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখিয়েছেন।[২৫৫] মাহবুব সাদিক "বাংলা ভাষা আমার" কবিতায় বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন।[২৫৬] ১৯৮৫ সালের দিকে রচিত "ফেব্রুয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক" কবিতায় খোন্দকার আশরাফ হোসেন রূপকের মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে তুলে ধরেছেন।[২৫৭] "চর্যাপদের হরিণীর গায়ে তির" কবিতা শামসুল আলমের বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ভিন্নধর্মী কবিতা যেখানে বাংলা ভাষার অতীত ও বর্তমান ফুটে উঠেছে।[২৫৮]

১৯৫৬ সালে জহির রায়হান বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচনা করেন "সূর্যগ্রহণ" নামক ছোটগল্প। রোমান্টিক আবেগ যুক্ত কাব্যিক ধারার এই ছোটগল্প চেতনা বিশিষ্ট হওয়ার ফলে এটি পাঠকদের মন জয় করেছিল।[২৫৯] অন্যদিকে লেখকের "মহামৃত্যু" ছোটগল্পে বাংলা ভাষা আন্দোলনে নিহতদের মৃত্যুকে মহিমান্বিত করা হয়েছে।[২৬০] লেখকের "অতিপরিচিত" ছোটগল্পে বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সুবিধাবাদী শ্রেণীর স্বরূপ তুলে ধরা হয়।[২৬১] ১৯৭১ সালে প্রকাশিত "কয়েকটি সংলাপ" ছোটগল্পে লেখক ১৯৫২, ষাটের দশক ও সম্ভাব্য ভবিষ্যতকে তিনটি পর্যায়ে দেখানোর মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্দোলনের অপব্যবহারকে দেখিয়েছেন।[২৬২] এছাড়া "একুশের গল্প" লেখকের বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প।[২৬৩] শওকত ওসমান রচিত "মৌন নয়" ছোটগল্পটি বাংলা ভাষা আন্দোলন পটভূমিতে রচিত "বহুজনের সম্মিলিত মৌন শোকাবহ পরিবেশ" ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।[২৬৪] সাইয়িদ আতীকুল্লাহ রচিত "হাসি"-এ আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর শোকাবহ পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।[২৬৫] আনিসুজ্জামানের "দৃষ্টি" গল্পে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রভাব ও তার সাথে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে নতুন আশার ইঙ্গিত দেখানো হয়েছে।[২৬৬] গল্পকার সিরাজুল ইসলাম তার "পলিমাটি" ছোটগল্পে বাংলা ভাষা আন্দোলন চলাকালে অন্তর্দন্দের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।[২৬৭] সরদার জয়েনউদ্দীন উচিত "বকসো আলী পণ্ডিত" ছোটগল্পে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক সংগ্রামী সত্তাকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে দেখানো হয়েছে।[২৬৮] অন্যদিকে শহীদুল্লা কায়সারের "মুন্না" গল্পে বাংলা ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার লোকদের অবদানকে দেখানো হয়েছে।[২৬৯] বাংলা ভাষা আন্দোলনের উপজীব্যে সেলিনা হোসেনের লেখা "মীর আজিমের দুর্দিন" গল্পে আশির দশকের প্রেক্ষাপটে বর্তমান ও আগের প্রজন্মের মানসিকতা ও চেতনার পার্থক্যকে দেখানো হয়েছে।[২৭০]

তুলনামূলকভাবে অল্প সংখ্যক হলেও বাংলা ভাষা আন্দোলন অবলম্বনে কিছু উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। জহির রায়হান রচিত ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত "আরেক ফাল্গুন" সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।[২৭১] সমালোচকদের মতে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত সর্বপ্রথম এই উপন্যাসটি শিল্পমানের দিক থেকে মহাকাব্যিক।[২৭২] ৯টি পর্বে বিভক্ত এই উপন্যাসের পটভূমি হচ্ছে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলন চলাকালীন সময় এবং ১৯৫৫ সালে ভাষা শহীদ দিবস উদযাপনের দিন। উপন্যাসে ভাষা আন্দোলনকে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।[২৭৩] সিপাহী বিদ্রোহে ব্রিটিশদের কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাথে বাংলা ভাষা আন্দোলনে সংঘটিত পাকিস্তান কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের সাদৃশ্য দেখানো হয়েছে।[২৭৪] ১৯৯২ সালে প্রকাশিত জহির রায়হানের আরেকটি উপন্যাস "একুশে ফেব্রুয়ারী"-এ পাঁচটি চরিত্রের গল্প দেখা যায়।[২৭৫] পাঁচটি চরিত্র বাংলা ভাষা আন্দোলন চলাকালীন পৃথক পৃথক শ্রেণি ও চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে এটি লেখা হলেও পরে ঈষৎ সম্পাদিত অবস্থায় দৈনিক সমীপেষুতে প্রকাশিত হয়েছিল।[২৭৬] ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত শওকত ওসমান রচিত "আর্তনাদ" বাংলা ভাষা আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস যেটি "কোরাস" ও "একাকী" অংশে বিভক্ত।[২৭৭] এতে মৃত্যুর দিকে ধাবিত একটি চরিত্রের চিন্তাচেতনাকে শৈল্পিক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।[২৭৮] ১৯৮১ সালে রচিত সেলিনা হোসেনের "যাপিত জীবন" বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে রচিত উপন্যাস। এতে ১৪টি পর্বে ভারত ভাগ হতে শুরু করে বিভিন্ন ঘটনাকে উপজীব্য করা হয়েছে।[২৭৯] এছাড়া লেখিকার ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস "নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি" বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত না হলেও এতে বাংলা ভাষা আন্দোলন সীমিত পরিসরে উল্লেখ পাওয়া যায়।[২৮০]

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কমিউনিস্ট বন্দিদের মঞ্চস্থ করার জন্য রণেশ দাশগুপ্ত সাহিত্যিক মুনীর চৌধুরীকে একটি নাটক লিখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে কারাগারে বসে তিনি "কবর" নাটকটি রচনা করেন।[২৮১] এরপর নাটকটি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে নাটকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হওয়ার পর বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এই নাটক আনিসুজ্জামানের মতে "রাজনৈতিক চেতনার কলামণ্ডিত রূপ"।[২৮২] নাটকে ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সমসাময়িক পরিস্থিতি ফুটে উঠে।[২৮৩] ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ রচিত নাটক "বিবাহ", যেখানে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।[২৮৪] নাটকটিতে নাট্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্যের ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।[২৮৫] সৈয়দ শামসুল হকের বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত নাটক "আমাদের জন্ম হলো" প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। এতে নাটকের মাধ্যমে শিল্পরস প্রকাশের চেয়ে ইতিহাসকে তুলে ধরার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।[২৮৬] বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তী সময়ে জাতির কাছে কীভাবে বিবেচিত হচ্ছে তা দেখা যায় ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত আলাউদ্দিন আল আজাদের "কালমহাকাল" নাটকে যা প্রকাশের ৪ বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম সম্প্রচার হয়।[২৮৭] ১৯৫১ সালে আসকার ইবনে শাইখ রচিত "দুর্যোগ" নাটকে ফুটে উঠেছে বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভিক কাল।[২৮৮]

১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার বিপরীতে বাঙালিদের প্রতিবাদের ঘটনাকে উপজীব্য করে গীতিকার আনিসুল হক চৌধুরীর লেখা গান বাংলা ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত সর্বপ্রথম গান।[২৮৯] ১৯৫৩ সালে মোশারেফ উদ্দিন আহমদ আরেকটি গান "মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিলো" রচনা করেন যা ২১শে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম গাওয়া হয়েছিল। একই বছরে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত "একুশে ফেব্রুয়ারী" গ্রন্থে সংকলিত আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী" গানটি শহীদ দিবস উদযাপনের গান হিসেবে পরিচিত যা গীতিকার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা অবলম্বনে লিখেছেন।[২৯০] ১৯৫৩ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের কর্মী গাজীউল হক রচনা করেন "ভুলবো না" যার সুরের সাথে আজ হিমালয় কী চোটী সে গানের মিল পাওয়া যায়।[২৯১] চারণকবি শেখ শামসুদ্দিন আহমদ ১৯৫২ সালে "রাষ্ট্রভাষা" শিরোনামে গান লিখেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গানে বাঙালির স্বকীয়তাকে তুলে ধরা হয়েছে।[২৯২] ১৯৫৩ সালে আব্দুল লতিফ রচিত ও সুরকৃত "ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়" বাংলা ভাষা আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য গান।[২৯৩] ১৯৬৯ সালে ফজল-এ-খোদা রচিত ও আব্দুল জব্বারের সুর করা সালাম সালাম হাজার সালাম গানটি আন্দোলনের শহীদদের প্রতি উৎসর্গ করে তৈরি।[২৯৪] ১৯৫৫ সালে কবিয়াল রমেশ শীলের রচিত "ভাষার জন্য জীবন হারালি" বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত গান।[২৯৫] এছাড়া বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিম বাংলা ভাষা আন্দোলনের একাধিক গান রচনা করেছেন।[২৯৬]

আরও দেখুন

টীকা

  1. এটি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের পাশে অবস্থিত।

তথ্যসূত্র

  1. 1 2 উপাধ্যায়, আর (১ মে ২০০৩)। "Urdu Controversy – is dividing the nation further"পেপার্স। সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ। ২১ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
  2. 1 2 3 4 5 রহমান, তারিক (১৯৯৭)। "The Medium of Instruction Controversy in Pakistan" (পিডিএফ)জার্নাল অফ মাল্টিলিঙ্গুয়াল অ্যান্ড মাল্টিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট১৮ (২): ১৪৫–১৫৪। ডিওআই:10.1080/01434639708666310আইএসএসএন 0143-4632। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে মূল থেকে (PDF) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুন ২০০৭
  3. শাশ্বতী হালদার (২০১২)। "অপভ্রংশ"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  4. "A Historical Perspective of Urdu"। উর্দু ভাষার পদোন্নতির জন্য জাতীয় পরিষদ। ১১ জুন ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০০৭
  5. ভট্টাচার্য, টি (২০০১)। "Bangla" (পিডিএফ)। গ্যারি, জে এবং রুবিনো, সি (সম্পাদক)। Encyclopedia of World's Languages: Past and Present (Facts About the World's Languages)। নিউ ইয়র্ক: এইচ ডব্লিউ উইলসন। আইএসবিএন ০৮২৪২০৯৭০২। ২৫ জুন ২০০৬ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুন ২০০৭ {{বই উদ্ধৃতি}}: |format= এর জন্য |url= প্রয়োজন (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: সম্পাদকগণের তালিকা (লিঙ্ক)
  6. রহমান, তারেক (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। "The Urdu-English Controversy in Pakistan"। মর্ডান এশিয়ান স্টাডিজ৩১ (1): ১৭৭–২০৭। ডিওআই:10.1017/S0026749X00016978পিএমআইডি 312861
  7. আহমদ ২০২৫, পৃ. ১৭।
  8. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,বাংলাদেশ (নবম-দশম শ্রেণী) (২০১৫)। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি (বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়)। পৃ. ১ থেকে ৪ পর্যন্ত।
  9. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১।
  10. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 "ভাষা আন্দোলন"বাংলাপিডিয়া - বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ। এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ। ৫ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬
  11. 1 2 3 4 5 6 ওল্ডেনবার্গ, ফিলিপ (আগস্ট ১৯৮৫)। ""A Place Insufficiently Imagined": Language, Belief, and the Pakistan Crisis of 1971"। দ্য জার্নাল অফ এশিয়ান স্টাডিজ৪৪ (৪): ৭১১–৭৩৩। ডিওআই:10.2307/2056443আইএসএসএন 0021-9118জেস্টোর 2056443
  12. উমর ১৯৭১, পৃ. ১১–১২।
  13. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৪।
  14. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৯–২০।
  15. মর্নিং নিউজ। ৭ ডিসেম্বর ১৯৪৭।
  16. দৈনিক আজাদ। ঢাকা: আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৮।
  17. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২১৪।
  18. উমর ১৯৭১, পৃ. ৪৩।
  19. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২২৭-২২৮।
  20. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,বাংলাদেশ (নবম-দশম শ্রেণী) (২০১৮)। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি (বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়)। পৃ. ১ থেকে ৪ পর্যন্ত।
  21. উমর ১৯৭১, পৃ. ৪২।
  22. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২২২।
  23. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২২৭।
  24. উমর ১৯৭১, পৃ. ৪৩–৪৪।
  25. 1 2 3 উমর ১৯৭১, পৃ. ৫২।
  26. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২৪২।
  27. 1 2 3 4 5 6 7 মালেক, আবদুল (২০০০)। হোসেন, আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার (সম্পাদক)। ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস। ঢাকা: সেলিনা হোসেন, পরিচালক, গবেষণা সংকলন ফোকলোর বিভাগ, বাংলা একাডেমি। পৃ. ৫–২৭। আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪০৪৫-৮
  28. 1 2 3 4 5 6 7 একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস - আহমদ রফিক পৃষ্ঠা: ৫৬, ১৪২, ৫৯
  29. রহমান, হাসান হাফিজুর (১৯৮২)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র। তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
  30. "বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র. পৃ-৫৪-৬৫
  31. উমর ১৯৭১, পৃ. ৫৪।
  32. উমর ১৯৭১, পৃ. ৬৩।
  33. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২৫৩–২৫৪।
  34. উমর ১৯৭১, পৃ. ৬৪।
  35. উমর ১৯৭১, পৃ. ৬৫–৬৭।
  36. উমর ১৯৭১, পৃ. ৬৯–৭২।
  37. 1 2 উমর ১৯৭১, পৃ. ৭৭।
  38. উমর ১৯৭১, পৃ. ৮০।
  39. উমর ১৯৭১, পৃ. ৮২।
  40. 1 2 উমর ১৯৭১, পৃ. ৮৫।
  41. আহমদ ২০২৫, পৃ. ২৬।
  42. উমর ১৯৭১, পৃ. ৮৬।
  43. উমর ১৯৭১, পৃ. ৮৮।
  44. উমর ১৯৭১, পৃ. ৮৯–৯০।
  45. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯০–৯১।
  46. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯১–৯২।
  47. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯২–৯৩।
  48. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯৪।
  49. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯৫।
  50. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯৬।
  51. উমর ১৯৭১, পৃ. ৯৭।
  52. উমর ১৯৭১, পৃ. ১০৬।
  53. আহমদ ২০২৫, পৃ. ২৯।
  54. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৩১।
  55. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৩৮।
  56. 1 2 চৌধুরী, জি. ডব্লিউ. (এপ্রিল ১৯৭২)। "Bangladesh: Why It Happened"। International Affairs৪৮ (২)। Royal Institute of International Affairs: ২৪২–২৪৯। ডিওআই:10.2307/2613440আইএসএসএন 0020-5850জেস্টোর 2613440
  57. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৪৮–৪৯।
  58. 1 2 উমর ১৯৭১, পৃ. ১০৭–১১১।
  59. 1 2 3 4 উদ্দিন ২০০৬, পৃ. ৩-১৬, ১২০-১২৪।
  60. দৈনিক আজাদ। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮।
  61. আর. উপাধ্যায় (৭ এপ্রিল ২০০৭)। "De-Pakistanisation of Bangladesh"। বাংলাদেশ মনিটর, সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ। ১১ জুন ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০০৭
  62. 1 2 3 4 5 জেমস হেইটজম্যান এবং রবার্ট ওয়ার্ডেন, সম্পাদক (১৯৮৯)। "Pakistan Period (1947–71)"Bangladesh: A Country Study। সরকারী মুদ্রণ অফিস, কান্ট্রি স্টাডিজ ইউএস। আইএসবিএন ০-১৬-০১৭৭২০-০। ২২ জুন ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০০৭
  63. সাঈদ, খালিদ বিন (সেপ্টেম্বর ১৯৫৪)। "Federalism and Pakistan"। Far Eastern Survey২৩ (৯): ১৩৯–১৪৩। ডিওআই:10.1525/as.1954.23.9.01p0920lআইএসএসএন 0362-8949জেস্টোর 3023818
  64. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৭৭।
  65. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৭৮।
  66. উমর ১৯৭১, পৃ. ১১৩।
  67. আহমদ ২০২৫, পৃ. ৮৮–৮৯।
  68. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২৮৭।
  69. আল হেলাল ২০০৩, পৃ. ২৮৭–২৮৯।
  70. আহমদ ২০২৫, পৃ. ১১২–১১৩।
  71. উমর ১৯৭১, পৃ. ১২৬।
  72. উমর ১৯৭১, পৃ. ১২৯।
  73. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৩০।
  74. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২৯১।
  75. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৩১–১৩২।
  76. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৩৩।
  77. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৩৪।
  78. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৩৫।
  79. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৫৮।
  80. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৬৪–১৬৫।
  81. "MR. M. A. JINNAH PASSES AWAY"। অমৃতবাজার পত্রিকা (ইংরেজি ভাষায়)। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮। পৃ. ১।
  82. "NAZIMUDDIN SWORN IN"। অমৃতবাজার পত্রিকা (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮। পৃ. ১।
  83. "পূর্ব্ববঙ্গের নূতন মন্ত্রিসভা বিভিন্ন দপ্তর বণ্টন"। যুগান্তর পত্রিকা। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮। পৃ. ৬।
  84. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৭০।
  85. উমর ১৯৭১, পৃ. ১৭১।
  86. 1 2 3 4 ইসলাম, রফিকুল (২০০০)। আমার একুশে ও শহীদ মিনার। ঢাকা: পরমা। পৃ. ৬২–৮৫। আইএসবিএন ৯৮৪-৮২৪৫-৩৯-১
  87. উমর ১৯৭১, পৃ. ২১৪–২১৫।
  88. উমর ১৯৭১, পৃ. ২৭৬।
  89. উমর ১৯৭১, পৃ. ২৭৭।
  90. উমর ১৯৭১, পৃ. ২৮২।
  91. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ২৯৯।
  92. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৩০০।
  93. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৩০০–৩০৬।
  94. দৈনিক আজাদ, ১৮ অক্টোবর ১৯৫১, পৃ. ১
  95. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২১৭।
  96. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২১৮।
  97. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২২০।
  98. 1 2 উমর ১৯৮৪, পৃ. ২২১।
  99. 1 2 উমর ১৯৮৪, পৃ. ২২২।
  100. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২২৮।
  101. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৩২২।
  102. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২২৪–২২৫।
  103. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ৫, ১৯৫২
  104. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৩০।
  105. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৩৯।
  106. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৪৩।
  107. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৪৮।
  108. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৫২।
  109. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৩–২৬৪।
  110. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৫৪–২৫৫।
  111. পরিষদের সভায় মোট ১৫জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু মোহাম্মদ তোয়াহা ভোট দানে বিরত ছিলেন।
  112. গাজীউল হক, একুশের সংকলন, প্রকশিত: ১৯৮০, পৃষ্ঠা: ১৩৮
  113. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৫–২৬৯।
  114. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৫।
  115. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৬।
  116. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৭।
  117. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৬৯।
  118. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৭১।
  119. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৭৬।
  120. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৭৬–২৭৮।
  121. উমর ১৯৮৪, পৃ. ২৮৪।
  122. ইতিহাস, কবির উদ্দিন আহমেদ. পৃ-২২৫-২৬
  123. "ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও সতেরো ব্যক্তি আহত"। দৈনিক আজাদ। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।
  124. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৫২
  125. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৩৯৮।
  126. 1 2 হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৩৭৭-৩৯৩।
  127. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩০৬।
  128. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩০৭–৩০৮।
  129. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩১৭।
  130. উমর ১৯৮৩, পৃ. ৩২৩।
  131. আল হেলাল ২০০৩, পৃ. ৩৭৭-৩৯৩।
  132. 1 2 হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৪১২।
  133. দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৫২
  134. "বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের শুপারিশ। শুক্রবার শহরের অবস্থার আরো অবনতি: সরকার কর্তৃক সামরিক বাহিনী তলব। পুলিশ ও সেনাদের গুলিতে চারজন নিহত ও শতাধিক আহত: সাত ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে শতস্ফূর্ত হরতাল পালন"। দৈনিক আজাদ। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।
  135. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৩৩।
  136. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৩৪।
  137. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৩৬।
  138. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৪১–৩৪২।
  139. 1 2 উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৫৫।
  140. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৫৬।
  141. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৬৩।
  142. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৬৪।
  143. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৬৪–৩৬৭।
  144. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৬৭–৩৬৮।
  145. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৬৯–৩৭০।
  146. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৭৫–৩৭৬।
  147. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৮২–৩৮৩।
  148. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৭৫–৩৮০।
  149. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৮১।
  150. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫১৫–৫১৬।
  151. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৮৯–৩৯০।
  152. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৯০।
  153. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৩৯৩।
  154. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৪৫৫–৪৫৮।
  155. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪০১–৪০২।
  156. 1 2 দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
  157. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪০২।
  158. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪০৫।
  159. দৈনিক আজাদ, ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
  160. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৭২–৪৭৩।
  161. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪০৭।
  162. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪১১।
  163. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪১৭–৪১৮।
  164. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৪৩।
  165. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৪৪।
  166. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৪৯।
  167. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৫৬।
  168. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৫৩।
  169. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৫৪।
  170. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৫৭।
  171. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৫৬–৪৫৯।
  172. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৫৬।
  173. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৭৪–৫৭৫।
  174. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৭৮–৪৮১।
  175. উমর ১৯৮৪, পৃ. ৪৮৫।
  176. এলিস, টমাস হোবার্ট (২৭ এপ্রিল ১৯৫২)। "রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকালে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনার উপর জাস্টিস এলিসের রিপোর্ট"পাকিস্তান সরকার
  177. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৪৪১।
  178. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৭৫।
  179. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৭৮–৫৭৯।
  180. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮০।
  181. সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ফেব্রুয়ারি ৮, ১৯৫৩
  182. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮১।
  183. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮১–৫৮২।
  184. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮২–৫৮৪।
  185. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮৪।
  186. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮৫।
  187. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৮৬।
  188. সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ১৯৫৩
  189. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৯৪।
  190. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৯৪–৫৯৫।
  191. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৯৮।
  192. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৫৯৮–৫৯৯।
  193. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০০।
  194. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০১।
  195. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০২–৬০৩।
  196. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০৪-৬০৯।
  197. 1 2 "আমাদের ভাষা শহীদ আসলে কত জন"প্রথম আলো। ১৩ ডিসেম্বর ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  198. 1 2 3 "কতোজন শহীদ হয়েছিলেন ৫২-র এই দিনে"ইত্তেফাক। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  199. "শহীদ রফিকের স্মৃতিচিহ্ন নেই তার নামের জাদুঘরে"বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  200. ভৌমিক, রীতা। "বিস্মৃতির আড়ালে সর্বকনিষ্ঠ ভাষাশহীদ অহিউল্লাহ | কালবেলা"কালবেলা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  201. হেলাল, বশীর আল। "আহমদ, রফিকউদ্দিন"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  202. 1 2 3 4 5 "ফাগুনের কিশোর শহীদ অহিউল্লাহ ও অন্যান্য"সারাবাংলা.নেট। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  203. হেলাল, বশীর আল। "বরকত, আবুল"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  204. শাহী, মিয়াজান। "রহমান, শফিউর"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  205. হেলাল, বশীর আল। "সালাম, আবদুস"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  206. "বাংলাদেশের ইতিহাস" (ইংরেজি ভাষায়)। ডিসকভার বাংলাদেশ। ৯ জুন ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুন ২০০৭
  207. রহমান, তারিক (সেপ্টেম্বর ১৯৯৭)। "Language and Ethnicity in Pakistan"। এশিয়ান সার্ভে৩৭ (৯): ৮৩৩–৮৩৯। ডিওআই:10.1525/as.1997.37.9.01p02786আইএসএসএন 0004-4687জেস্টোর 2645700
  208. 1 2 উমর, বদরুদ্দীন (২০০৬)। The Emergence of Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। খণ্ড ২। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃ. ২১২–২১৩। আইএসবিএন ০১৯৫৯৭৯০৮৭
  209. "সংবাদপত্রে-ভাষা-আন্দোলন"। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
  210. 1 2 হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০০-৬০৩।
  211. নায়ের ১৯৯০, পৃ. ১৩৭–১৩৮।
  212. 1 2 নায়ের ১৯৯০, পৃ. ১৪৯।
  213. নায়ের ১৯৯০, পৃ. ১৩৯।
  214. নায়ের ১৯৯০, পৃ. ১৪৫।
  215. নায়ের ১৯৯০, পৃ. ১৪৮।
  216. আহমদ ২০২৫, পৃ. ১২৭।
  217. "বাংলা গবেষণাগার রূপে বর্ধমান হাউস"দৈনিক আজাদ। ৬ এপ্রিল ১৯৫৪।
  218. 1 2 বশীর আল হেলাল (২০১২)। "বাংলা একাডেমী"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  219. চৌধুরী, আশরাফ উদ্দীন (৪ ডিসেম্বর ১৯৫৫)। "জাতীয় সভ্যতা ও তমদ্দনের বাহনরূপে বাংলা ভাষা বিশ্বে মর্যাদার আসন লাভ করিবে"দৈনিক আজাদ
  220. 1 2 3 আল হেলাল ২০০৩, পৃ. ৬০৮–৬১৩।
  221. "গণপরিষদে বিভিন্ন দলের শক্তি নির্বাচিত সদস্যদের নামের তালিকা"। দৈনিক আজাদ। ২৪ জুন ১৯৫৫। পৃ. ৬।
  222. 1 2 "UF elections victory"ক্রনিকলস অব পাকিস্তান। ১৮ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০১১
  223. দৈনিক আজাদ। ২২শে এপ্রিল ১৯৫৪।
  224. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০৮–৬১৩।
  225. "গম্ভীরপূর্ণ পরিবেশে শহীদ দিবস উদযাপন"। Weekly Notun Khobor। ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬।
  226. "PAKISTANIS IN RIOT ON LANGUAGE ISSUE"। New York Times। ২৩ এপ্রিল ১৯৫৪। প্রোকুয়েস্ট 113105078
  227. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৬০৮-৬০৯।
  228. হেলাল ২০০৩, পৃ. ৬১৩।
  229. Callahan, John (৮ মে ১৯৫৪)। "PAKISTANIS MAKE BENGALI OFFICIAL: East Zone Tongue Is Raised to Status Equal to Urdu, the Western Language"। New York Times প্রোকুয়েস্ট 112939727
  230. Lambert, Richard D. (এপ্রিল ১৯৫৯)। "Factors in Bengali Regionalism in Pakistan"। Far Eastern Survey২৮ (4)। Institute of Pacific Relations: ৪৯–৫৮। ডিওআই:10.2307/3024111আইএসএসএন 0362-8949জেস্টোর 3024111
  231. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৮৩৫।
  232. 1 2 মুখার্জি ১৯৭২, পৃ. ৫৯।
  233. Schendel, Willen van (২০২০)। "A History of Bangladesh"Cambridge.org (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০২৩
  234. Rahman, Tariq (২০০২)। "Language, Power and Ideology 37, no. 45"Economic and Political Weekly, jstor.org (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। জেস্টোর 4412816। সংগ্রহের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০২৩
  235. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৫–১৬।
  236. লিন্টনার, বের্টিল (জানুয়ারি ২০০৪)। "Chapter 17: Religious Extremism and Nationalism in Bangladesh" (পিডিএফ)। সাতু লিমায়ে, রবার্ট উইর্সিং, মোহন মালিক (সম্পাদক)। Religious Radicalism and Security in South Asia [দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় মৌলবাদ ও নিরাপত্তা] (PDF)। হনলুলু, হাওয়াই: এশিয়া-প্যাসিফিক সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ। পৃ. ৪১৩। আইএসবিএন ০-৯৭১৯৪১৬-৬-১। ৪ এপ্রিল ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুন ২০০৭{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: সম্পাদকগণের তালিকা (লিঙ্ক)
  237. Rubel, Abul Hasan (১৫ নভেম্বর ২০১৭)। ঢাকার ভাষা, ঢাকাইয়া ভাষা, নাকি অন্য ভাষাকালের কণ্ঠ। সংগ্রহের তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
  238. হেলাল ১৯৮৫, পৃ. ৮৩৪–৮৩৫।
  239. দ্য ডেইলি স্টার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
  240. "জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ৭৫"- ওলি আহাদ পৃ-১৫৩
  241. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৯২–১৯৩।
  242. "গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে শহীদ দিবস উদ্‌যাপন"। সাপ্তাহিক নতুন খবর। ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬।
  243. সাপ্তাহিক নতুন খবর, ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৫৬
  244. খান, সানজিদা। "জাতীয় পুরস্কার"বাংলাপিডিয়া। এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ। ৩ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুন ২০০৭
  245. পারভেজ, এজাজ (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)। "যেভাবে শুরু হয়েছিল অমর একুশে বইমেলা"দেশ রূপান্তর
  246. আমিনজাদে, রোনাল্ড; ডগলাস ম্যাকঅ্যাডাম; চার্লস টিলি (১৭ সেপ্টেম্বর ২০০১)। "Emotions and Contentious Politics"। Silence and Voice in the Study of Contentious Politics। কেমব্রিজ: কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃ. ৪২। আইএসবিএন ০৫২১০০১৫৫২। ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুন ২০০৭
  247. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৬।
  248. খাতুন ২০২৪, পৃ. ২১।
  249. খাতুন ২০২৪, পৃ. ২৬।
  250. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৩০।
  251. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৩১।
  252. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৩২।
  253. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৩৩।
  254. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৩৯–৪০।
  255. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৪৬।
  256. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৫৭।
  257. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৫৯।
  258. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬১।
  259. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬৩–৬৪।
  260. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬৫।
  261. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬৬।
  262. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬৭–৬৯।
  263. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৬৯।
  264. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭০।
  265. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭১–৭২।
  266. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭৩–৭৪।
  267. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭৪।
  268. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭৬–৭৭।
  269. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৭৯।
  270. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৮০–৮১।
  271. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৯১।
  272. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৯২।
  273. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৯৩।
  274. খাতুন ২০২৪, পৃ. ৯৩–৯৬।
  275. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১১৩।
  276. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১২০।
  277. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১২৪।
  278. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১২৯।
  279. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১২৯–১৩০।
  280. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৪৭।
  281. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৫০।
  282. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৫১।
  283. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৫৮।
  284. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৬০।
  285. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৬৪।
  286. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৬৫।
  287. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৬৯।
  288. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৭৪।
  289. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৭৫।
  290. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৭৭।
  291. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮০।
  292. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮১।
  293. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮২।
  294. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮৪।
  295. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮৫।
  296. খাতুন ২০২৪, পৃ. ১৮৯।

গ্রন্থপঞ্জি

আরও পড়ুন

  • আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ঢাকা, ১৯৭৫।
  • আবদুল হক, ভাষা-আন্দোলনের আদি পর্ব, ঢাকা, ১৯৭৬।

বহিঃসংযোগ