সাঁওতাল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
সাঁওতাল
Santali dance photo.png
সাঁওতালী মানুষ, নাচের সময়
মোট জনসংখ্যা
৬,১৫৬,২৬০
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চলসমূহ
ভারত ৫,৯৫৯,০০০ [১]
              ঝাড়খণ্ড ২,৪১০,৫০৯[২]
              পশ্চিমবঙ্গ ২,২৮০,৫৪০[৩]
              বিহার ৩৬৭,৬১২[৪]
              ওড়িশা ৬২৯,৭৮২
              ত্রিপুরা[১] --
              মিজোরাম[১] --
নেপাল ৪২,৬৯৮[৫]
              ঝাপা জেলা ২৩,১৭২
              মোরঙ জেলা ১৬,৩৮৭
বাংলাদেশ ১,৫৭,৬৯৮[৬][৭]
ভুটান[১] --
ভাষা
সাঁওতালী
ধর্ম
সারি ধরম  • সারনা ধরম
সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী
মুণ্ডা  • হো  • কোল

সাঁওতাল[৮] বা মান্দি[৯] পূর্বভারতবাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলির একটি । এরা নিজেদেরকে কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ রচিত মহাভারতে বর্ণিত কুরু-পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের প্রত্যাখ্যিত-ভাবশিষ্য একলব্যের বংশধর ব'লে বিশ্বাস করে এবং তীরচালনাালে এখনও নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুল ব্যবহার করে না কারণ তাদের আদিপুরুষ একলব্যকে গুরুদক্ষিণাস্বরূপ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দান করেছিলেন । সান্তাল , সান্তালি , হোর , হর , সাঙ্তাল , সান্দাল , সন্থাল , সান্থাল , সান্তালি , সাতার প্রভৃতি অভিধায়ও এ নৃগোষ্ঠী অভিহিত হয়ে থাকে ।[১০] সাঁওতাল সম্পর্কে লিখতে হলে সাঁওতালদের সৃষ্টির আদি কথার ইতিহাস বা দর্শন জান খুবই প্রয়জন । (তাই অতি সংখেপে ) সৃষ্টির প্রাগ কালে এই পৃথিবীতে জল ও প্রাণএর কোন অস্তিত্ব ছিল না । দেবতারা সর্গে থাকত । সর্গ থেকে যখন মর্তে আসত, তখন দেখত জন মানব হীন শূন্য এই পৃথিবী । তখন দেবতারা সর্গে চাঔরিয়া সভাই ভাবছে এই পৃথ্বীকে কেমন করে সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলা যাই আর সাজাতে হলে মানুষের দরকার এবং তাদের হাতেই আমরা পূজা গ্রহন করবো । তখন লিটৌ (marang buru ) দুটি মানুষ সৃষ্টি করে এবং ঠাকুর তাদের প্রাণ দিলেন । তখন এই মর্তে শুধু পাথর আর পাথর কোথাও জল ছিল না । ঐ মানুষ দুটির জন্য জল প্রয়জন তাই দেবতারা মাটির নিচে থেকে জল বার করার জন্য কুঁয়ো খঁড়তে শুরু করেন । শেষে মাটির তলা থেকে এমন জল বের হয় যে, চারিদিক জল মগ্ন হয়ে গেল । তখন ঐ দুটি মানুষ জলের তোড়ে ভেসে যায় এবং marang buru তাদের নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় দেয় । তারপর দেবতারা নানা প্রকার জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করে । তখন লিটৌ (marang buru ) siram ( বেনা কাঠি ) দিযে দুটি হাঁস ও হাঁসিল তৈরি করেন । ঐ দুটি হাঁস হাঁসিল থেকে প্রথম পিলাচু হাড়াম (বুড়ো) পিলচু বুডির জন্ম হয় । তাদের থেকে খেঁড়ওয়াল (সাঁওতাল ) দের সৃষ্টি । তারপর এই জলমগ্ন মর্ত্য কে দেবতারা বাস যোগ্য করে তোলার জন্য marang buru জলজ জীবদের সহযোগিতািয় জলের নিচ থেকে মাটি তুলে এই সমতল পৃথ্বী সৃষ্টি করে । খেঁড়ওয়ালরা ( সাঁওতাল ) পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুডির বংশধর। খেঁড়ওয়ালদের জাতিয় অস্ত্র আঃ সার্ কাপি (তীর ধনুক ও কাপি ) এটা স্বয়ং marang buru ধারণ করেন । তাই খেঁড়ওয়ালরা (সাঁওতাল ) দৌনাচারয বা একলব্যর নিকট তীর ধনুক বিদ্যা শিখেছে বলা কখনও ঠিক হবে না । প্রাচীন কালে থেকে kherwal দের নিদিষ্ট কোন বই গ্রন্থ উল্লেখ পওয়া না গেলেও তারা শ্রুতি বা গানের আকারে নিজদের জীবন দর্শন কে বাঁচিয়ে রেখেছে যা স্বয়ং marang buru নিজে হাতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতেকটি আরি চালি, রীতি নীতি শিখায়ে ছেন তা kherwal রা পালন করে চলেছে তাই চলার পথে অনেক বাঁধা বিপত্তি পাথেয় করে নিজদের অস্তিত্ব, ঐতিয্য নিয়ে বেঁচে আছে। kherwal দের প্রধান ধর্ম গ্রন্থের নাম "জম্ সিম্ বিন্তি " তাছাড়া কারাম বিন্তি , বাপলা বিন্তি , সরহায় বিন্তি , ছৌটৌয়র বিন্তি ইতাদি । conti.........

গোত্র[সম্পাদনা]

সাঁওতালরা আদি মানব ও মানবী পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ির সাত জোড়া সন্তান থেকেই তাদের উদ্ভব । যখন তাঁদের বংশ বৃদ্ধি পাই তখন marang Buru তাঁদের 12 পারিস ( পদবি ) তে ভাগ করেন ।

  1. হাঁসদা
  2. সরেন
  3. টুডু
  4. কিসকু
  5. মুরমু
  6. মারুদি
  7. বাস্কে

হেম্ব্র্ম, বেশরা, পাউরিয়া, চঁড়ে ও গণ্ড এই 12 পারিস লোকদের 12 টি করে আলদা আলদা খঁড় (গোত্র ) এ বিভক্ত -- hansda দের খঁড় (গোত্র ) --- হাঁস, হাঁসদা হাঁসলী, হাঁসদা চি্ল, হাঁসদা কাঁড়া " সাদা " সিরম গেলে " টাটি ঝাড়ি " হাঁডি " শিঁগাড় ॥ শিকলী ॥ সিঁদুর ॥ ওদ্গোয় ॥ kisku দের খঁড় (গোত্র ) ---- কিচুয়া, কিস্কূ রাপাজ, ॥ তুড়কু ॥ সামানম ॥ সনা ॥ হুরুড় ॥ বিঠল ॥ বঁগা চাতম ॥ কিয়ৌ ॥ হাঁডি ॥ সাদা ॥ সাদম ॥ মুরমু দের খঁড় (gotra) জৌত মুরমু টীকৌ ॥ অবর ॥ হাড় গিলা ॥ বিঠল ॥ চাম্পা ॥ হাডিঁ ॥ সাদা ॥ গিঁড়ুয়ার ॥ হাট ॥ অর্ ওয়াল ॥ আদোয়া মুরমু । Saren দের খঁড় (গোত্র ) --- সিঞ সরেন সিদুপ ॥ তুড়কু ॥ ডোবোঃ ॥ মান্ ॥ জাতি তুলৌও ॥ হাট ॥ সাদা ॥ ওদগোড় ॥ সনা ॥ সলে ॥ চাম্পা সরেন । Hebram দের খঁড় (গোত্র ) জৌত Hembram গুয়া ॥ লাহের ॥ কারিজ ॥ বাড়ে লেওয়েৎ ॥ সাদা ॥ সনা ॥ গিদি ॥ তওয়া ॥ টিকা ॥ যুগী ॥ হাঁডি ॥ mandi দের খঁড় (গোত্র ) -- জৌত Mandi ঘাস ॥ রোত ॥ গদা ॥ হেসেল ॥ সিরু বাহা ॥ সনা ॥ তারপ ॥ লোবোঃ ॥ ওদ্গোয় ॥ টিকৌ ॥ হাঁডি ॥ Tudu দের খঁড় (gotra) -- জৌত টুডু রৌসকৌ ॥ কাঁড়া ॥ শাঁগে ॥ ডুঃ ডুকুর ॥ লাৎ ॥ জাতি তুলৌও ॥ অঃ ॥ বারছি ॥ সাদা ॥ জুগী ॥ হাঁডি ॥ বেশরা দের খঁড় (গোত্র ) -- জৌত বেশরা বায়ার ॥ শামা ॥ কাহু ॥ চারেচ্ ॥ টিকৌ ॥ ভিঁদৌড় ॥ মাঝি খিলি ॥ নায়কে খিলি ॥ সাদা ॥ সনা ॥ হাঁডি ॥ বাস্কে দের খঁড় (গোত্র ) -- জৌত বাস্কে সাদা ॥ মাঝি খিলি ॥ নায়কে খিলি ॥ লাহের ॥ তুড়ুক ॥ সনা ॥ ভিন্দাড় ॥ বারছি ॥ টিকা ॥ জুগি ॥ কাঁড়া ॥ পাঁউরিয়া দের খঁড় (গোত্র ) -- জৌত পাঁউরিয়া মাঝি খিলি ॥ নায়কে খিলি ॥ সাদা ॥ জুগি ॥ বিঠল ॥ কাঁড়া ॥ গিন্ডুয়ার ॥ রঃ লুতুর পাঁউরিয়া চঁড়ে দের খঁড় (গোত্র ) জৌত চঁড়ে সাদা ॥ মাঝি খিলি ॥ নায়কে খিলি ॥ জুগী ॥ বিঠল্ ॥ হাঁডি ॥ তুড়ুক ॥ সনা ॥ চন্দনা ॥ গিদি ॥ টিকৌ চঁড়ে । গেণ্ডুয়া দের খঁড় ( গোত্র ) -- সাদা গেন্ডুয়া মাঝি খিলি ॥ নায়কে খিলি ॥ সনা ॥ রঃ লুতুর ॥ চন্দনা ॥ গীদি ॥ তুড়ুক ॥ টিকৌ ॥ কাঁড়া ॥ সিদুপ ॥ জৌত গেন্ডুয়া ।

ভাষানৃতাত্ত্বিক পরিচয়[সম্পাদনা]

ভাষা এবং নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে সাঁওতালরা বাংলাদেশের অন্য অনেক নৃগোষ্ঠীর মত মঙ্গোলীয় গোত্রের নয় । এরা সাঁওতালী ভাষায় কথা বলে যে ভাষাটি অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত । এদের মধ্যম গড়নের আকৃতির শরীর , ত্বকের গাঢ় রঙ , চ্যাপ্টা নাক , পুরু ঠোঁট এবং কোঁকড়ানো চুল তাদের অস্ট্রেশীয় নৃতাত্বিক উৎস নির্দেশ করে যে গোষ্ঠির মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিল দ্রাবিড়দেরও আগে অস্ট্রেলিয়া এবং সন্নিহিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপমালা থেকে । দেহ কাঠামোর বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে সাঁওতালদেরকে বিশুদ্ধ প্রাক-দ্রাবিড়ীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে মনে করা হয় । তবে অস্ট্রেলীয় কৌমগুলোর সাথে সাঁওতালদের বেশ মিল লক্ষ করা যায় বলে তাদেরকে আদি অস্ট্রেলীয় বলা হয় । ধারণা করা হয় সুঁতার(Soontar) কথাটি থেকে সাঁওতাল শব্দের উদ্ভব। সুঁতার বাঙালিদের প্রদত্ত খেতাব ।

আবাস[সম্পাদনা]

সাঁওতালরা দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে বাস করে। দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট , ফুলবাড়ি, চিরিরবন্দর , কাহারোল এবং রংপুর জেলার পীরগঞ্জে সাঁওতালরা অধিক সংখ্যায় বাস করে। রাজশাহী এবং বগুড়া অঞ্চলে কিছু সংখ্যক সাঁওতাল আছে। প্রাচনিকাল থেকেই সাঁওতালরা এদেশে বসবাস করে আসছে।

বাসস্থান ও পোশাক[সম্পাদনা]

এদের ঘরগুলো ছোট এবং মাটির তৈরি। ঘরে সাধারণত কোনো জানালা থাকে না । সাঁওতালরা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালো বাসে। সাঁওতাল পুরুষরা আগে সাদা থান কাপড়ের ধুতি পরতেন। বর্তমানে লুঙ্গি, ধুতি, গেঞ্জি, গামছা ব্যবহার করে। নারীরা ‘ফতা‘ নামের দুই খন্ডের কাপড় প'রে থাকে। বর্তমানে 'আরা শাড়ি'ও ব্যবহার করতে দেখা যায় । পুরুষ সকলে হাতে উল্কির ছাপ দেয় । মেয়েরা রূপার তৈরি গহনা যেমন- বালা, ঝুমকা, আংটি, মল, হাঁসুলি ইত্যাদি ব্যবহার করে এবং খোঁপায় ফুল গুঁজতে ভালোবাসে । অভিভাবকদের পছন্দ অনুযায়ী সাঁওতালি সমাজে যে বিয়ে হয় তাকে সাঁওতালি ভাষায় ‘ডাঙুয়াবাপলা‘ বলে। আগের দিনে মৃতদেহ দাহ করার নিয়ম ছিল । বর্তমানে অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সকল এলাকায় সাঁওতালরা মরদেহের কবর দেয়।

খাদ্যাভ্যাস[সম্পাদনা]

ভাত সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য। মাছ, কাঁকড়া, শুকর, মোরগ, মুরগি, বন জঙ্গলের পশু, পাখি, খরগোশ, গুইসাপ, ইঁদুর বেঁজির মাংস এদের খুবই প্রিয় খাবার।

পেশা[সম্পাদনা]

আদিকাল থেকেই কৃষিকে এরা প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে । নারী পুরুষ সবাই জমিতে কাজ করে । পুরুষেরা হাল চাষ এবং নারীরা বজি বোনা ও ফসল তোলার কাজ করে। সাঁওতালরা কৃষিকাজের যন্তপাতি নিজেরা তৈরি করে। শিকার করার ব্যাপারে এদের উৎসাহ খুব বেশি। বাংলাদেশে বন জঙগল কমে যাওয়ার কারণে তাদেও এই পেশায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে অনেক সাঁওতাল নারী পুরুষ কুলি, মজুর, মাটি কাটার শ্রমিক ও অন্যান্য কাজ করে।

সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান[সম্পাদনা]

পরিবার[সম্পাদনা]

সাঁওতাল সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সম্পত্তিতে পুত্রদের অধিকার সমান, কিন্তু মেয়েদের কোন অধিকার নেই। তবে পিতা ইচ্ছা করলে মেয়েকে কিছু দিয়ে যেতে পারেন। তবে সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে পিতা প্রত্যেক মেয়েকে একটি করে গাভী প্রদান করে। পুত্রহীন ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানা তার সহোদর ভাইয়েরা পেয়ে থাকে।

বিবাহ প্রথা[সম্পাদনা]

সাঁওতাল সমাজে বহিঃগোত্র বিবাহ প্রচলিত। এমনকি উপগোত্রের মধ্যেও বিবাহ হয় না। তাদের সমাজে ছয় প্রকার বিবাহ রীতের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তিন ধরনের বিবাহের প্রচলন দেখা যায়। যথা

  • আসলি
  • রাজারাজি
  • হুর কাটারা বা ইতুর বিবাহ

সাধারণত ছেলের বয়স ১৯ ও মেয়ের বয়স ১৫-১৬ হলে বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া নিরবোলক নামক বিয়ের প্রচলন সাঁওতাল সমাজে লক্ষণীয়।

  • আসলি বিবাহ: আসলি বিবাহ সম্ভ্রন্ত পরিবার ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যেই প্রচলিত। এ ধরনের বিবাহ কন্যার পিতা-মাতা ও আত্নীয় স্বজনের সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়।
  • রাজারাজি: রাজারাজি বিবাহ হল প্রেম করে বিবাহ। সাঁওতালদের প্রত্যেক গ্রামেই হাট বসে। বস্তুত কেনাবেচার উদ্দেশ্য হলেও সাঁওতাল যুবক যুবতীরা তাদের পছন্দমত প্রিয়জনদের সেখানে খোঁজ করে। মেয়েরা যখন হাটে যায়, তখন তাদের সাথে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকে। সাঁওতালী ভাষায় তাদের যোগমাঝি বলা হয়। কোন সাঁওতাল মেয়ের যদি কোন ছেলেকে পছন্দ করে তখন সে যুবতী যোগমাঝির কাছে তা প্রকাশ করে। তারপর যোগমাঝি সে যুবককে সন্ধান করে বের করে এবং তার নিকট সব কিছু খুলে বলে। যুবকটি‍ুযদি এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন যোগমাঝি ছেলে ও মেয়ের অভিভাবকের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বিয়ের দিন ধার্য করে।
  • হুর কাটারা: হুর কাটারা বিবাহ হচ্ছে জোর করে বিবাহ। কোন যুবক যদি কোন যুবতীকে ভালোবেসে ফেলে এবং সেই যুবতী যদি তাকে অপছন্দ করে ও বিয়েতে অসম্মতি জানায় এক্ষেত্রে যুবক তাকে পাবার জন্য হাটে যায়। সেখানে সে যুবতীর খোঁজ করতে থাকে। যুবতীর সাক্ষাৎ পেলে যুবক সুযোগ মত যদি যুবতীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারে তাহলে সে যুবতীর অন্যত্র বিয়ে হতে পারে না। সাঁওতালদের মধ্যে প্রচলিত সংস্কার হল অবিবাহিত যুবতীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিলে সে যুবতীর আর অন্যত্র বিয়ে হতে পারে না। তার গ্রামের মাতব্বরদের মাধ্যমে যুবককে অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয় এবং তা আদায় হলে যুবক যুবতীর বিবাহ কার্য সমাধা করা হয়।

ধর্মাচার[সম্পাদনা]

সাঁওতালদের প্রধান উপাস্য যদিও সূর্য (তাদের ভাষায় সিং বোঙ্গা) তবু পর্বত দেবতাও (মারাং বুরু) তাদের জন্য যথেষ্ট মর্যাদাব্যঞ্জক হয়ে গ্রামদেবতায় পরিণত হয়েছে। সাঁওতালদের বিশ্বাস আত্মা অমর এবং সেই অনৈসর্গিক আত্মাই (বোঙ্গা) সব ঐহিক ভালমন্দ নির্ধারণ করে থাকে। তাই দৈনন্দিন পূজা-অর্চনায় বোঙ্গা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাদের গৃহদেবতা হিসেবে তাই ‘আবে বোঙ্গা’র যথেষ্ট প্রতাপ। এছাড়া লৌকিক হিন্দু দেবদেবীর প্রভাবও তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে দেখা যায়। সাঁওতাল নর-নারী আসলে ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে সর্বপ্রাণবাদী ও প্রকৃতি উপাসক, আবার তারা ‘ঠাকুরজিউ’-কে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মান্য করে। তাদের ধর্মাচরণে মূর্তিপূজার প্রচলন নেই।সাঁওতাল - বাংলাপিডিয়া bn.banglapedia.org/index.php?title=সাঁওতাল

আচার অনুষ্ঠান[সম্পাদনা]

সাঁওতালরা খুবই উৎসবপ্রিয় জাতি। বাঙালিদের মতো এদেরও বারো মাসে তেরো পার্বণ। তাদের বছর শুরু হয় ফাল্গুন মাসে। প্রায় প্রতিমাসে বা ঋতুতে রয়েছে পরব বা উৎসব যা নৃত্যগীতবাদ্য সহযোগে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নববর্ষের মাস ফাল্গুনে যেমন অনুষ্ঠিত হয় স্যালসেই উৎসব, তেমনি চৈত্রে বোঙ্গাবোঙ্গি, বৈশাখে হোম, আশ্বিনে দিবি, পৌষ শেষে সোহরাই উৎসব পালিত হয়। সোহরাই উৎসব সাঁওতালদের একপ্রকার জাতীয় উৎসব যা পৌষ সংক্রান্তির দিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উদ্যাপিত হয়। ফসলের দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও এ অনুষ্ঠানের অঙ্গ। নাচ-গান-বাদ্য আর ফুলের মনোরম শোভায় এবং সেইসঙ্গে আহার্যে-পানীয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে জমজমাট। সম্ভবত এর বড় আকর্ষণ সাঁওতাল তরুণীদের দলবদ্ধ নৃত্য। সাঁওতালদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের নাম বাহা অর্থাৎ ফুলফোটার উৎসব। বসন্তের শুরুতে এ উৎসবের উদ্দেশ্য নানা রঙের ফুলফোটার সৌন্দর্যকে অভ্যর্থনা ও অভিনন্দন জানানো। এখানেও থাকে নাচ-গান ও বাদ্যের সমারোহ।

বসন্ত উৎসবের অন্যতম দিক হলো তরুণ-তরুণীদের জন্য চিত্তবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা। এ ধরনের চিত্তবিনিময় বা সঙ্গী-সঙ্গিনী নির্বাচনের কেন্দ্রস্থল হলো ‘আখড়া’। সাঁওতাল সমাজে তরুণ-তরুণীর বিবাহ-পূর্ব স্বাধীন মেলামেশায় কোনো বাধা নেই। সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান রয়েছে। বিয়েতে কনেকে পণ দেওয়ার রীতি এখনও লোপ পায় নি, তবে তা অতিসামান্য। বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তদের পুনর্বিবাহের অধিকার স্বীকৃত।

সাঁওতাল নৃত্য

সাঁওতাল সমাজে পুরুষের আধিপত্য অপেক্ষাকৃত বেশি। তবু পারিবারিক জীবনে নারীর ভূমিকা কম নয়। জীবিকা অর্জনে বা কর্মজীবনে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাঁওতালদের ঘর ছোট, কিন্তু গৃহাঙ্গন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। মাটির দেয়ালে নানারকম কারুকার্য চিত্রণ সাঁওতাল নারীর সৌন্দর্যস্পৃহা ও শিল্পমনের পরিচয় তুলে ধরে। ঘরের  আসবাবপত্র খুবই সাদামাটা যা তাদের সরল জীবনরীতির পরিচায়ক। সাঁওতাল সমাজ এখনও ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েতি ব্যবস্থায় পরিচালিত এবং গ্রামপ্রধান সমাজে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে থাকে। সাঁওতালদের মধ্যে এখনও ১২টি গোত্রবিভাগ রয়েছে। সাধারণ নিয়মে একই গোত্রের ছেলেমেয়ের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ। কিন্তু এসব অনুশাসন এখন ততটা সচল নয়।সাঁওতাল - বাংলাপিডিয়া bn.banglapedia.org/index.php?title=সাঁওতাল

শিল্পকলা[সম্পাদনা]

শিল্পকলার পতি এদের আগ্রহ রয়েছে। এরা ঢোল, দোতারা, বাঁশি, মেগো প্রভৃতি বাদ্যযন্ত তৈরি কওে ও বাজায় । ঘরবাড়ির দেয়ালে ছবি আঁকে। হাঁড়ি কলসির গায়ে চুনকালি দিয়ে আমরা সকলে এদেশে মিলেমিশে বাসকরব। উপজাতিরাও বাংলাদেশের নাগরিক । তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও আচর আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব। এভাবে আমাদের সকলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে উঠবে।

অন্য বাসস্থান[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে উপজাতি জনগোষ্টি যে সমস্ত এলাকায় বাস করে তার কিছু অংশের নাম উল্লেখ্য করা হলোঃ রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম, বান্দরবান সহ বাংলাদেশে আরও অনেক জায়গায় বসবাস করে।

প্রতিপালিত দিবস[সম্পাদনা]

সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস[সম্পাদনা]

৩০শে জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস । আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগের কথা । সেদিনটি ছিল ৩০শে জুন ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দ । অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসক এবং শোষক জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে সান্তালদের গণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল এই দিনে । নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় সান্তাল আদিবাসিরা ভারত বর্ষে জেঘে উঠেছিল প্রতিবাদের দাবানল । বর্তমান সাঁওতালদের দেখে অনুমান করাই দুঃসাধ্য যে এ সান্তালরা একদিন ইংরেজ শাসকদের কঠিন বুকে কাপন ধরিয়ে দিয়েছিল । ক্রমাগত শোষন, বঞ্চনা , নির্যাতন , দাসত্ব এবং নারীদের অবমানোনা যখন ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দেয় তখন শান্তিপ্রিয় সান্তালদের মধ্যে ক্ষোভের দাবানল জ্বলে উঠে এবং প্রতবিাদের ঝড় উঠে । আদিবাসিদের অধিকার ও মযার্দা প্রতিষ্টায়কার সে রক্তঝরা সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসটিকে বিশেষ র‌্যালি এবং সাঁওতাল কৃষ্টিতে মহিলাদের নৃত্যের মাধ্যমে এ দিনটিি যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিপালিত হয়ে থাকে ।

সাঁওতাল কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১৯৯৭ http://www.tribalzone.net/language/santali.htm
  2. "Jharkhand: Data Highlights the Scheduled Tribes" (PDF)। Census of India 2001। Census Commission of India। সংগৃহীত ২০১০-০১-১০ 
  3. "West Bengal: Data Highlights the Scheduled Tribes" (PDF)। Census of India 2001। Census Commission of India। সংগৃহীত ২০১০-০১-১০ 
  4. "Bihar: Data Highlights the Scheduled Tribes" (PDF)। Census of India 2001। Census Commission of India। সংগৃহীত ২০১০-০১-১০ 
  5. "Santali: Also spoken in Nepal"। সংগৃহীত ২০১১-০৪-০১ 
  6. (2001 Johnstone and Mandryk)
  7. http://www.tribalzone.net/language/santali.htm। সংগৃহীত ২০১১-০৪-০১  |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  8. আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে
  9. নিজস্ব বলয়ে আত্মপরিচয় দেওয়ার সময়ে
  10. http://www.tribalzone.net/language/santali.htm
  11. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫৬৪, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  12. Exhibition of works of Ramkinkar Baij The Hindu, Oct 05, 2007.
  13. http://www.outlookindia.com/article.aspx?210639