বাংলা ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বাংলা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
"বাংলা" ও "বঙ্গভাষা" এখানে পুননির্দেশ করা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত কবিতার জন্য, দেখুন বঙ্গভাষা (কবিতা)। বাংলার জন্য, দেখুন বাংলা (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
এই নিবন্ধটি বাংলা ভাষা সম্পর্কিত। বাংলা লিপির জন্য, দেখুন বাংলা লিপি
.বাংলা নিবন্ধের সাথে বিভ্রান্ত হবেন না।
বাংলা
Bangla Script.svg
বাংলা লিপিতে "বাংলা" শব্দটি
দেশোদ্ভব বাংলাদেশ, ভারত (প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং অসমের বরাক উপত্যকা)
অঞ্চল বঙ্গ
নৃতাত্ত্বিক বাঙালি জাতি
দেশীয় ভাষাভাষী ২১কোটি[১]
মোট: ২৩কোটি (২০০৩)[২]
ভাষা পরিবার
প্রারম্ভিক ধরন:
পালি-প্রাকৃত
উপভাষাসমূহ
লিখন পদ্ধতি বাংলা লিপি
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা
সরকারি ভাষা

 বাংলাদেশ
 ভারত; নিম্নলিখিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে:


 সিয়েরা লিওন (অনারারি সরকারী ভাষা)[৫]

পাকিস্তান করাচী, পাকিস্তান (দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত)[৬][৭][৮][৯]
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বাংলা একাডেমী
ভারত পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-১ bn
আইএসও ৬৩৯-২ ben
আইএসও ৬৩৯-৩ ben
লিঙ্গুয়াস্ফেরা 59-AAF-u
Bengali-world.svg
বিশ্বে বাংলা ভাষার ভৌগোলিক বিস্তার
  বাংলা ভাষার মর্যাদা যেখানে একমাত্র জাতীয় ও সরকারি ভাষা
  বাংলা ভাষার মর্যাদা যেখানে অনেকগুল সরকারি ভাষার মধ্যে একটি
  বাংলাভাষী মানুষ বাস করেন (১,০০,০০০+)
  বাংলাভাষী মানুষ বাস করেন (১০,০০০+)
Bengalispeaking region.png
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলা ভাষার বিস্তার

বাংলা ভাষা (/bɑːŋlɑː/; এই শব্দ সম্পর্কে উচ্চারণ ) দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা, এই অঞ্চলটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত। এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা ভাষাতে কথা বলা হয়। এই ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। এই অঞ্চলের প্রায় বাইশ কোটি স্থানীয় মানুষের ও পৃথিবীর মোট ৩০ কোটি মানুষের ভাষা হওয়ায়, এই ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে।[২][১০][১১][১২] ভারতবাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এই ভাষাতেই রচিত এবং তা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব বোঝা যায়।

বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে ব্যবহার, উচ্চারণ ও ধ্বনিতত্ত্বের সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে, বাংলা ও তার বিভিন্ন উপভাষা বাংলাদেশের প্রধান ভাষা এবং ভারতে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা।[১৩][১৪] এই ভাষা বালার নবজাগরণের ফলে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নির্মাণ ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছে, শুধু তাই নয়, এই ভাষা বাঙালি জাতীয়তাবাদ গঠনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৫১-৫২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছিল। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলা ও লেখাপড়ার অধিকারের দাবীতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। মাতৃভাষার জন্য তাঁদের বলিদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।[১৫][১৬]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে মাগধী প্রাকৃতপালির মতো পূর্ব মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহ থেকে বাংলা ও অন্যান্য পূর্ব ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে।[১৭] এই অঞ্চলে কথ্য ভাষা প্রথম সহস্রাব্দে মাগধী প্রাকৃত বা অর্ধমাগধী ভাষায় বিবর্তিত হয়।[১৮][১৯] খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর শুরুতে উত্তর ভারতের অন্যান্য প্রাকৃত ভাষার মতোই মাগধী প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশ ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে।[২০] পূর্বী অপভ্রংশ বা অবহট্‌ঠ নামক পূর্ব উপমহাদেশের স্থানীয় অপভ্রংশ ভাষাগুলি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় বিবর্তিত হয়, যা মূলতঃ উড়িয়া ভাষা, বাংলা-অসমীয়াবিহারী ভাষাসমূহের জন্ম দেয়। কোনো কোনো ভাষাবিদ ৫০০ খ্রিস্টাব্দে এই তিন ভাষার জন্ম বলে মনে করলেও [২১] এই ভাষাটি তখন পর্যন্ত কোনো সুস্থির রূপ ধারণ করেনি; সে সময় এর বিভিন্ন লিখিত ও ঔপভাষিক রূপ পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। যেমন, ধারণা করা হয়, আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীতে মাগধী অপভ্রংশ থেকে অবহট্‌ঠের উদ্ভব ঘটে, যা প্রাক-বাংলা ভাষাগুলির সঙ্গে কিছু সময় ধরে সহাবস্থান করছিল। [২২]

চৈতন্য মহাপ্রভুর যুগে ও বাংলার নবজাগরণের সময় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃত ভাষা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল।[২৩] সংস্কৃত থেকে যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ করা হয়, তাঁদের উচ্চারণ অন্যান্য বাংলা রীতি মেনে পরিবর্তিত হলেও সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে নদিয়া অঞ্চলে প্রচলিত পশ্চিম-মধ্য বাংলা কথ্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য বাংলা ভাষা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত ভাষার মধে অনেকখানি পার্থক্য রয়েছে।[২৪] আধুনিক বাংলা শব্দভাণ্ডারে মাগধী প্রাকৃত, পালি, সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি ভাষা এবং অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাসমূহ সহ অন্যান্য ভাষা পরিবারের শব্দ স্থান পেয়েছে।

চর্যাপদের একটি পৃষ্ঠা

বাংলা ভাষার ইতিহাসকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়:[২০]

  1. প্রাচীন বাংলা (৯০০/১০০০ – ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) — চর্যাপদ, ভক্তিমূলক গান এই সময়কার লিখিত নিদর্শন। এই সময় আমি, তুমি ইত্যাদি সর্বনাম এবং -ইলা, -ইবা, ইত্যাদি ক্রিয়াবিভক্তির আবির্ভাব ঘটে।
  2. মধ্য বাংলা (১৪০০–১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) — এ সময়কার গুরুত্বপূর্ণ লিখিত নিদর্শন চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। শব্দের শেষে "অ" ধ্বনির বিলোপ, যৌগিক ক্রিয়ার প্রচলন, ফার্সি ভাষার প্রভাব এই সময়ের সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ভাষাবিদ এই যুগকে আদি ও অন্ত্য এই দুই ভাগে ভাগ করেন।
  3. আধুনিক বাংলা (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে-বর্তমান) — এই সময় ক্রিয়া ও সর্বনামের সংক্ষেপণ ঘটে, যেমন তাহারতার; করিয়াছিলকরেছিল

অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে, বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারীতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও সর্বপ্রথম ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস (পর্তুগিজ: Vocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes) নামক বাংলা ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। [২৫] ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদবিদ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ (ইংরেজি: A Grammar of the Bengal Language) নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। [২] বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায়[২৬] ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্ (ইংরেজি: Grammar of the Bengali Language) নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন।[২৭]

১৯৫১–৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগণের প্রবল ভাষা সচেতনতার ফলস্বরূপ বাংলা ভাষা আন্দোলন নামক একটি ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নিকট বাংলা ভাষার সরকারী স্বীকৃতি দাবী কর হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস পালিত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকম ভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়।

ভৌগোলিক বিস্তার[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষা বঙ্গ অঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীর মাতৃভাষা। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গত্রিপুরা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এছাড়া ভারতের অসম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও এই ভাষা বহুল প্রচলিত। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।

সরকারি মর্যাদা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা ও সরকারি ভাষা হল বাংলা। এছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম।[২৮] ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা হল বাংলা[২৯][৩০] এছাড়াও বাংলা ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা।[৩১][৩২] ২০১১ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস হতে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা রূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচী শহরের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা রূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে।[৬][৭][৮] ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ ঐ রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫,৩০০ বাংলাদেশী সৈনিকদের সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা ভাষাকে সরকারী ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন।[৩৩][৩৪]

নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুইটি বাংলা কবিতা ভারতবাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়।[৩৫] ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার দাবী জানান।[৩৬]

কথ্য ও সাহিত্যের ভাষার বিবিধতা[সম্পাদনা]

বাংলার কথ্য ও লেখ রূপের মধ্যে বিবিধতা বর্তমান।[৩৭][৩৮] বিভিন্ন শব্দভাণ্ডার দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে বাংলায় দুই ধরণের লিখনপদ্ধতি তৈরী হয়েছে।[৩৯]

  1. সাধু ভাষা বাংলার এক ধরণের লেখ রূপ, যেখানে সংস্কৃতপালি ভাষাসমূহ থেকে উদ্ভূত তৎসম শব্দভাণ্ডার দ্বারা প্রভাবিত অপেক্ষাকৃত লম্বা ক্রিয়া বিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই ধরণের ভাষা বাংলা সাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সাহিত্যে এই ভাষারূপের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
  2. চলিতভাষা, যা ভাষাবিদদের নিকট মান্য চলিত বাংলা নামে পরিচিত, বাংলার এক ধরণের লেখ রূপ, যেখানে মানুষের কথ্য বাগধারা স্থান পায়। এই লিখন শৈলীতে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের ক্রিয়া বিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এই ধরণের শৈলী অনুসরণ করা হয়ে থাকে। উনবংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরে দুলাল প্রভৃতি রচনাগুলিতে এই ধরণের শৈলী সাহিত্যে জায়গা করে নেয়।[৪০] এই শৈলী নদিয়া জেলার শান্তিপুর অঞ্চলে প্রচলিত কথ্য উপভাষা থেকে গঠিত হয়েছে, ফলে একে অনেক সময় শান্তিপুরী বাংলা বা নদিয়া উপভাষা বলা হয়ে থাকে।[৪১]

মান্য চলিত বাংলায় অধিকাংশ বাংলা সাহিত্য রচিত হলেও, কথ্য বাংলা উপভাষাগুলির মধ্যে যথেষ্ট বিবিধতা রয়েছে। কলকাতা সহ দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরা মান্য চলিত বাংলায় কথা বলে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলগুলির কথ্য ভাষা মান্য চলিত বাংলার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের কথ্য ভাষার সঙ্গে মান্য চলিত বাংলার খুব সামান্যই মিল রয়েছে।[৪২][৪২] তবে অধিকাংশ বাঙালি নিজেদের মধ্যে ভাব আদানপ্রদানের সময় মান্য চলিত বাংলা সহ একাধিক উপভাষায় কথা বলতে সক্ষম বলে মনে করা হলেও[৪৩] অনেক ভাষাবিদ তা স্বীকার করেন না।[৪৪][৪৫]

ধ্বনিব্যবস্থা[সম্পাদনা]

বাংলা স্বরধ্বনি
সম্মুখ কেন্দ্রীয় পশ্চাৎ
সংবৃত ই~ঈ
i
i
উ~ঊ
u
u
সংবৃত-মধ্য
e
e

ʊ~o
u/o
বিবৃত-মধ্য এ্যা/অ্যা
æ
ê

ɔ
ô
বিবৃত
a
a
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি
উভয়ৌষ্ঠ্য দন্ত্য দন্তমূলীয় মূর্ধন্য
জিহ্বাগ্র্য-পশ্চাৎ-দন্তমূলীয়
জিহ্ব্য-পশ্চাৎ-দন্তমূলীয় কণ্ঠনালীয়
নাসিক্য

ঞ ~ ণ ~ ন

 
ŋɔ
ngô
 
স্পর্শ অঘোষ


t̪ɔ

ʈɔ
ṭô

tʃɔ~sɔ
chô/sô


অঘোষ
ɸɔ

t̪ʰɔ
thô

ʈʰɔ
ṭhô

tʃʰɔ~ssɔ
chhô/ssô

kʰɔ
khô
ঘোষ


d̪ɔ

ɖɔ
ḍô
জ ~ য
dʒɔ~dzɔ
jô ~ zô

ɡɔ
ঘোষ
bʱɔ
bhô

d̪ʱɔ
dhô

ɖʱɔ
ḍhô

dʒʱɔ
jhô

ɡʱɔ
ghô
উষ্ম

শ ~ ষ
ʃɔ
shô


তরল

তরল

ড় ~ ঢ়
ɽɔ~ɽʱɔ
rô / rhô

নমুনা পাঠ্য[সম্পাদনা]

নিম্নলিখিত বাংলা ভাষাতে মানবাধিকার সনদের প্রথম ধারার নমুনা পাঠ্য:

বাংলা লিপিতে বাংলা ভাষা

ধারা ১: সমস্ত মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাঁদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে; সুতরাং সকলেরই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিৎ।

বাংলার রোমানীকরণ

Dhara êk: Sômôstô manush sbadhinbhabe sôman môrzada ebông ôdhikar niye jônmôgrôhôn kôre. Tãder bibek ebông buddhi achhe; sutôrang sôkôleri êke ôpôrer prôti bhratritbôsulôbh mônobhab niye achôrôn kôra uchit.

আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালাতে বাংলা ভাষার উচ্চারণ

d̪ʱara æk ʃɔmɔst̪ɔ manuʃ ʃad̪ʱinbʱabe ʃɔman mɔrdʒad̪a ebɔŋ ɔd̪ʱikar nie̯e dʒɔnmɔɡrɔhɔn kɔre. t̪ãd̪er bibek ebɔŋ budd̪ʱːi atʃʰe; sut̪ɔraŋ sɔkɔleri æke ɔpɔrer prɔt̪i bʱrat̪rit̪ːɔsulɔbʱ mɔnobʱab nie̯e atʃɔrɔn kɔra utʃit̪.

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Världens 100 största språk 2010" [The world's 100 largest languages in 2010]Nationalencyklopedin (সুয়েডীয় ভাষায়)। ২০১০। সংগৃহীত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ 
  2. ২.০ ২.১ ২.২ Bengali language in Asiatic Society of Bangladesh 2003
  3. "Profile: A&N Islands at a Glance"Andaman DistrictNational Informatics Center। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  4. "Andaman District"Andaman & Nicobar Police। National Informatics Center। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  5. "Daily Times - Leading News Resource of Pakistan"। eb.archive.org। সংগৃহীত ১৪ জানুয়ারি ২০১৪ 
  6. ৬.০ ৬.১ Syed Yasir Kazmi (অক্টোবর ১৬, ২০০৯)। "Pakistani Bengalis"DEMOTIX। সংগৃহীত এপ্রিল ২, ২০১৩ 
  7. ৭.০ ৭.১ "کراچی کے 'بنگالی پاکستانی'(Urdu)"محمد عثمان جامعی। ১৭ নভেম্বর ২০০৩। সংগৃহীত এপ্রিল ২, ২০১৩ 
  8. ৮.০ ৮.১ "The Language Movement : An Outline"। সংগৃহীত এপ্রিল ২, ২০১৩ 
  9. "Karachi Department of Bengali"। সংগৃহীত এপ্রিল ২, ২০১৩ 
  10. "Statistical Summaries"। Ethnologue। ২০১২। সংগৃহীত ২০১২-০৫-২৩ 
  11. "Most Widely Spoken Languages in the World, This data includes all speakers of the languages, not only native speakers"। www.infoplease.com। ২০১২। 
  12. "The 50 Most Widely Spoken Languages (1996)"। www.photius.com। ১৯৯৬। 
  13. "Languages of India"। সংগৃহীত ২০০৯-০৯-০২ 
  14. "Languages in Descending Order of Strength — India, States and Union Territories – 1991 Census"Census Data Online। Office of the Registrar General, India। পৃ: ১। আসল থেকে ১৪ জুন ২০০৭-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ২০০৬-১১-১৯ 
  15. "Amendment to the Draft Programme and Budget for 2000–2001 (30 C/5)" (PDF)। General Conference, 30th Session, Draft Resolution। UNESCO। ১৯৯৯। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  16. "Resolution adopted by the 30th Session of UNESCO's General Conference (1999)"International Mother Language Day। UNESCO। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  17. Oberlies, Thomas Pali: A Grammar of the Language of the Theravāda Tipiṭaka, Walter de Gruyter, 2001.
  18. Shah 1998, পৃ. 11
  19. Keith 1998, পৃ. 187
  20. ২০.০ ২০.১ (Bhattacharya 2000)
  21. (Sen 1996)
  22. Abahattha in Asiatic Society of Bangladesh 2003
  23. Tagore ও Das 1996, পৃ. 222
  24. http://lrc.cornell.edu/asian/courses/bengali
  25. Rahman, Aminur। "Grammar"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত ২০০৬-১১-১৯ 
  26. Wilson ও Dalton 1982, পৃ. 155
  27. Rammohan Roy’s Goudiya Grammar
  28. "Languages of India"। Ethnologue Report। সংগৃহীত ২০০৬-১১-০৪ 
  29. Bhattacharjee, Kishalay (এপ্রিল ৩০, ২০০৮)। "It's Indian language vs Indian language"ndtv.com। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  30. NIC, Assam State Centre, Guwahati, Assam। "Language"। Government of Assam। আসল থেকে ২০০৬-১২-০৬-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ২০০৬-০৬-২০ 
  31. "Profile: A&N Islands at a Glance"Andaman DistrictNational Informatics Center। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  32. "Andaman District"Andaman & Nicobar Police। National Informatics Center। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  33. "Sierra Leone makes Bengali official language"। সংগৃহীত ২৯ ডিসেম্বর ২০০২ 
  34. Zahurul Alam (২৭ ডিসেম্বর ২০০২)। "Bengali Made One of The Official Languages of Sierra Leone" 
  35. "Statement by Hon'ble Foreign Minister on Second Bangladesh-India Track II dialogue at BRAC Centre on 07 August, 2005"। Ministry of Foreign Affairs, Government of Bangladeshআসল থেকে ১৮ এপ্রিল ২০০৮-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  36. Subir Bhaumik (২২ ডিসেম্বর ২০০৯)। "Bengali 'should be UN language'"BBC News। সংগৃহীত ২০১০-০১-২৫ 
  37. Debaprasad Bandyopadhyay 'Triglossia in Bangla'
  38. "Bengali Language At Cornell: Language Information"Department of Asian Studies at Cornell UniversityCornell University। সংগৃহীত ২০০৮-০৫-২৭ 
  39. Huq, Mohammad Daniul। "Sadhu Bhasa"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত ২০০৬-১১-১৭ 
  40. Huq, Mohammad Daniul। "Alaler Gharer Dulal"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত ২০০৬-১১-১৭ 
  41. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; morshed নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  42. ৪২.০ ৪২.১ Ray, Hai এবং Ray 1966, পৃ. 89
  43. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; SKumar নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  44. Colony’s Burden: A Case of Extending Bangla
  45. Indian Linguistic Nation State: A Report

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • আলম, এম (২০০০)। ভাষা সৌরভ: ব্যাকরণ ও রচনা। S. N. Printers, Dhaka .
  • Ali, Shaheen Sardar; Rehman, Javaid (২০০১)। Indigenous Peoples and Ethnic Minorities of Pakistan: Constitutional and Legal Perspectives। Routledge। আইএসবিএন 0-7007-1159-7 .
  • Asiatic Society of Bangladesh (২০০৩)। Banglapedia, the national encyclopedia of Bangladesh। Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka .
  • Baxter, C (১৯৯৭)। Bangladesh, From a Nation to a State। Westview Press। আইএসবিএন 0-8133-3632-5 .
  • Bhattacharya, T (২০০০)। "Bengali"। in Gary, J. and Rubino. C.। Encyclopedia of World's Languages: Past and Present (Facts About the World's Languages)। WW Wilson, New York। আইএসবিএন 0-8242-0970-2 [অকার্যকর সংযোগ].
  • Bonazzi, Eros (২০০৮)। "Bengali"। Dizionario Bengali। Avallardi (Italy)। আইএসবিএন 978-88-7887-168-7 .
  • Cardona, G; Jain, D (২০০৩)। The Indo-Aryan languages। RoutledgeCurzon, London .
  • Chakraborty, Byomkes, A Comparative Study of Santali and Bengali, K.P. Bagchi & Co., Kolkata, 1994, ISBN 81-7074-128-9 Byomkes Chakrabarti
  • Chatterji, SK (১৯২১)। "Bengali Phonetics"। Bulletin of the School of Oriental and African Studies 2: 1। ডিওআই:10.1017/S0041977X0010179X .
  • Chatterji, SK (১৯২৬)। The Origin and Development of the Bengali Language। Calcutta Univ. Press .
  • Chisholm, H (১৯১০)। Hugh Chisholm, সম্পাদক। The Encyclopædia Britannica : A Dictionary of Arts, Sciences, Literature and General Information। Cambridge, England ; New York : At the University Press। ওসিএলসি 266598 .
  • Ferguson, CA; Chowdhury, M (১৯৬০)। "The Phonemes of Bengali"। Language, 36(1), Part 1 .
  • Haldar, Gopal (২০০০)। Languages of India। National Book Trust, India। আইএসবিএন 81-237-2936-7 .
  • Hayes, B; Lahiri, A (১৯৯১)। "Bengali intonational phonology"। Natural Language & Linguistic Theory (Springer Science) 9: 47। ডিওআই:10.1007/BF00133326 .
  • Keith, Arthur Berriedale (১৯৯৮)। The Sanskrit Drama। Motilal Banarsidass Publ। আইএসবিএন 81-208-0977-7 .
  • Klaiman, MH (১৯৮৭)। "Bengali"। in Bernard Comrie। The World's Major Languages। Croon Helm, London and Sydney। আইএসবিএন 0-19-506511-5 .
  • Masica, C (১৯৯১)। The Indo-Aryan Languages। Cambridge Univ. Press .
  • Radice, W (১৯৯৪)। Teach Yourself Bengali: A Complete Course for Beginners। NTC/Contemporary Publishing Company। আইএসবিএন 0-8442-3752-3 .
  • Ray, P; Hai, MA; Ray, L (১৯৬৬)। Bengali language handbook। Center for Applied Linguistics, Washington। এএসআইএন B000B9G89C .
  • Sen, D (১৯৯৬)। Bengali Language and Literature। International Centre for Bengal Studies, Calcutta .
  • Shah, Natubhai (১৯৯৮)। Jainism: The World of Conquerors। Sussex Academic Press। আইএসবিএন 1-898723-31-1 .
  • Tagore, Rabindranath; Das, Sisir Kumar (১৯৯৬)। The English Writings of Rabindranath Tagore। Sahitya Akademi। আইএসবিএন 81-260-0094-5 .
  • Wilson, A.J; Dalton, D (১৯৮২)। The States of South Asia: Problems of National Integration. Essays in Honour of W. H. Morris-Jones। University of Hawaii Press। আইএসবিএন 0-8248-1183-6 .
  • শ, রামেশ্বর: সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাঙ্গাল ভাষা, পুস্তক বিপনি, ১৯৯৭
  • হালদার নারায়ণ : বাংলা ভাষা প্রসঙ্গ: বানান কথন লিখনরীতি, পুস্তক বিপনি, কলকাতা, ২০০৭
  • Bonazzi, E (২০০৮)। Grammatica Bengali। Librera Bonomo Editrice, Bologna। আইএসবিএন 978-88-6071-017-8 .
  • Thompson, Hanne-Ruth (2012). Bengali. Volume 18 of London Oriental and African Language Library. John Benjamins Publishing. ISBN 9027273138.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Indo-Iranian languages