বিষয়বস্তুতে চলুন

সিলেটি

পরীক্ষিত
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সিলেটি
ꠍꠤꠟꠐꠤ
সিলেটি
মোট জনসংখ্যা
আনু.~১ কোটি ১৮লাখ []
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল
বাংলাদেশ (সিলেট বিভাগ)
ভারত (বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, শিলং)
মধ্যপ্রাচ্য (জিসিসি দেশগুলো)
পশ্চিমা-বিশ্ব (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র)
ভাষা
সিলেটি ভাষা
প্রমিত বাংলা[]
ধর্ম
ইসলাম (সংখ্যাগুরু), হিন্দু (বৃহৎ সংখ্যালঘু)
ছোট সংখ্যালঘু:

সিলেটি (সিলেটি: ꠍꠤꠟꠐꠤ) একটি বাঙালি জনগোষ্ঠী যারা সিলেটি ভাষায় কথা বলে এবং বাংলাদেশের সিলেট বিভাগভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় বাস করেন। বাংলাদেশ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিলেটি ভারতের শিলং (মেঘালয়) ও ত্রিপুরা এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে বসবাস করে। 'সিলেটি' আঞ্চলিক পরিচয়টি মূলত ভাষা এবং সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত যেটি সিলেটিদের বৃহত্তর সংস্কৃতিগত এবং জাতিগত বাঙালি পরিচয়ের সঙ্গেও একইসঙ্গে সমানভাবে সংযুক্ত।[][][][]

সিলেট নামের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি ধারণা প্রচলিত আছে। হিন্দু ধারণা অনুযায়ী সিলেটি শব্দটি প্রাচীন নাম শ্রীহট্টিয়া থেকে উদ্ভূত, যার নামকরণ হয়েছে হিন্দু নাথ সম্প্রদায়ের কুলদেবতা 'শ্রীহট্টনাথ'-এর নামানুসারে। নাথ রাজবংশ দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে সুরমা ও বরাক উপত্যকায় (বর্তমান বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল) নাথদের প্রাথমিক বসতি স্থাপনে সহায়তা করেন, শ্রীহট্ট জনপদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সমগ্র অঞ্চল জুড়ে শ্রীহট্টনাথের মূর্তি স্থাপন করেন।[] পুরাণ ও দেবীপুরাণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সিলেটের পরবর্তীকালের হিন্দু রাজারা দেবতাকে 'হাটকেশ্বর' বা 'হট্টনাথ' রূপে পূজা প্রদান অব্যাহত রেখেছিলেন।[] মুসলিম ধারণা অনুযায়ী সিলেটি শব্দটি শিলাহাট শব্দ থেকে এসেছে। সাধারণ ঐতিহ্যে শিলা দ্বারা পাথর এবং হাট দ্বারা বাজার বা শহর বুঝানো হতো। আর মুসলিম ঐতিহ্যে এটি দ্বারা হযরত শাহজালালের পাথরকে সরে যাওয়ার নির্দেশকে বুঝানো হয়।[]

প্রাথমিক ইতিহাস

[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

মৌলভীবাজার জেলার পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে প্রমাণিত আছে যে দশম শতাব্দীতে চন্দ্র রাজা শ্রীচন্দ্রের আমলেও, শ্রীহট্টের (সিলেটের পূর্বনাম) সকল অধিবাসীদেরকে (স্থানীয় লোকদেরকে) "বঙ্গাল" নাম দিয়ে জাতি পরিচয় দেওয়া হতো এবং অন্যদিকে বিদেশী অভিবাসীদেরকে "দেশান্তরীয়" ডাকা হতো।[১০]

১৯৪৭-এর দেশ ভাগের আগমুহূর্ত পর্যন্ত, সিলেটিরা ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসামের সাথে ছিল।[১১] সিলেটি প্রবাসী মূলত অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতার প্রয়োজনে আবির্ভূত হয়, অন্যদিকে উন্নততর কর্মসংস্থান সন্ধানী অল্পবয়সী যুবকেরা সিলেটি প্রবাসী প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দেন।[১২] ব্রিটিশ শাসনের অস্থিরতার সময়, সিলেটের যেসব যুবকেরা ব্রিটিশ বণিক হিসেবে কাজ করত, তারা উন্নততর জীবন সন্ধানের জন্য জাহাজ ছেড়ে লন্ডনে নেমে পড়ে এবং অন্যরা মাতৃভূমিতে প্রবেশের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে পায়, যা শৃঙ্খল স্থানান্তর ঘটায় এবং লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে কর্মক্ষেত্রের আশেপাশে তাদের স্থান করে দেয়। ফলে লুটন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, লিডস, ব্র্যাডফোর্ড, ওল্ডহ্যাম ইত্যাদির মতো শিল্প নগরী এবং শহরগুলিতে ভাল কাজের পরিবেশ লাভ করায় বিপুল পরিমাণ সিলেটি এসব জায়গায় আসতে থাকে।[১৩] সিলেটিরা একটি নাবিক জাতি; সমুদ্রযাত্রা সমস্ত সিলেটিদের রক্তে সমাহিত হয়ে আছে, এবং যা সিলেটের যুবকদের জন্য একটি দুঃসাহসিক অভিযান ছিল; এবং ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন অনুসারে তাদের জমিদারি পুনর্বিবেচনা না করা পর্যন্ত দেশের সমগ্র সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন এবং সমুদ্রে যাওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সিলেটের তরুণরা প্রধানত কলকাতা, মুম্বাই এবং সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজে উঠে। প্রথম দিককার কিছু সিলেটি নাবিক ব্রিটেনমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিদর্শন করে এবং কর্মসংস্থান চায়; যদিও ম্যাগনা কার্টা লিবার্টটামের অনুসারে, তাদের উপর কোন আইনানুগ নিষেধাজ্ঞা ছিল না যাতে তারা স্বাধীনভাবে ব্রিটেন প্রবেশ করতে বা বের হতে পারে; কিছু লেখক বিক্ষিপ্তভাবে বলেন যে সিলেটি নাবিকরা জানত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে যেরূপ প্রয়োজন ছিল, মাতৃভূমিতে প্রবেশে তেমন অভিপ্রায় ঘোষণা করতে হয় না। প্রথম দিকের সংগৃহীত ইতিহাস সিলেটি প্রবাসী এবং সিলেটি নাবিকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ নির্দেশ করে।[১৪]

বিপিনচন্দ্র পাল, হবিগঞ্জের প্রখ্যাত বাগ্মী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও লেখক।
সৈয়দ মুর্তাজা আলী, বাংলা সাহিত্যের অবদানের জন্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপক।

সিলেটি প্রবাসী বলতে সিলেট বিভাগের বংশোদ্ভূতদের বোঝায়, যারা সিলেট বিভাগ থেকে এসেছেন, এবং সিলেটের সাথে যাদের একটি নির্দিষ্ট দেশে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রবাসী সিলেটির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, বিশেষত যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, মধ্য প্রাচ্য এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ মিলিয়ে। ২০০৮-এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ব্রিটেনে সর্বোচ্চ সংখ্যক সিলেটি প্রবাসী বসবাস করে, যেখানে ৫,০০,০০০ লোক সিলেটি ভাষায় কথা বলে, যা যুক্তরাজ্যে বাস করা মোট বাংলাদেশীদের ৯৫%।[১৫] ২০০৯ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।[১৬] বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সিলেটি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ করা ব্যতীত বাংলাদেশে সিলেটিরা প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত হয়েছে এবং উন্নয়ন উদ্যোগের অভাবে সিলেটি সম্প্রদায়ের লোকেরা চরমভাবে সরকারি উদ্যোগের অভাব বোধ করছে।[১৭] নব্য-শাস্ত্রীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, দরিদ্র লোকেরা সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে পাড়ি জমাবে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার লোকেরা আরো বেশি জনবিরল অঞ্চলে চলে যাবে। যদিও এই তত্ত্ব স্পষ্টভাবে সমাধান করা হয়নি। মেধা পাচার মূলত হৃদয় থেকে হৃদয়ের একটি স্থানান্তর ছিল, বিশেষত অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে, যখন সিলেটের তরুণরা আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক জনসংখ্যার বাংলাদেশ থেকে স্পিটলফীল্ডের জনাকীর্ণ রাস্তায় চলে আসে, বাংলাদেশের সকল এলাকা থেকে দরিদ্ররা সিলেট চলে আসে একটি উন্নততর জীবনের জন্য, যা সিলেটে অধিক জনসংখ্যা এবং সম্পদের অপ্রাপ্যতা সৃষ্টি করে। [১৮]

সিলেটিরা ইতিহাস জুড়ে সংস্কৃত সাহিত্যে অবদান রেখেছে। ১৫ শতকে, জগদীশ তর্কালঙ্কার বেশ কয়েকটি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে অনেকগুলি অসংখ্য খণ্ডে তৈরি হয়েছিল। তর্কালঙ্কারের 'শব্দশক্তিপ্রকাশিকা' ছিল সংস্কৃত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিখ্যাত পাঠ্যপুস্তক। তাঁর সমসাময়িক, লাউড়ের অদ্বৈত আচার্য, যোগবশিষ্ঠ-ভৈষ্ঠ এবং গীতা বৈশ্য নামে দুটি মধ্যযুগীয় সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেন।[১৯] ১৬ শতকে, সিলেটের বিখ্যাত লেখকদ্বয় মুরারি গুপ্ত চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রথম সংস্কৃত জীবনী রচনা করেন এবং রঘুনাথ শিরোমণি সংস্কৃতে ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেন।[২০][২১] হিন্দুধর্মের প্রধান গ্রন্থ মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদ ১৭ শতকে সিলেটের শ্রী সঞ্জয় লিখেছিলেন।[২২][২৩]

সিলেট শাহী ঈদগাহ

সিলেটিদের অধিকাংশ জনগণ ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করেন। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সুন্নি মুসলিম, যারা প্রধানত হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে। এই অঞ্চলে সুফিবাদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর; বিশেষ করে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর সিলেট বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে। শাহ জালাল ও তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গীর আগমন সিলেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুফি কেন্দ্রে পরিণত করে, যা আজও শাহ জালাল দরগাহসহ বিভিন্ন মাজার ও খানকাহর মাধ্যমে জীবন্ত রয়েছে।[২৪][২৫]

সিলেটী ধর্মপ্রচারক চৈতন্য মহাপ্রভুর কাঠের মূর্তি ধামেশ্বর রূপে। সংগৃহীত নবদ্বীপ, নদিয়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গ[২৬]

যদিও বর্তমানে সিলেটিদের মধ্যে হিন্দুধর্ম দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম, সিলেটে এর প্রভাব আরও দীর্ঘ ও গভীর এবং সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে এখানেই হিন্দুদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। একসময় সিলেটের ধর্মীয় মেরুদণ্ড হলেও সেখানে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রান্তিকীকরণ এবং লক্ষ্যবস্তু সহিংসতার শিকার হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর, হিন্দুধর্মাবলম্বী সিলেটবাসীরা নিপীড়নের শিকার হন। ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাসে, বিয়ানীবাজার ও বড়লেখার হিন্দুদের বাড়িঘর লুট, ধ্বংস ও অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং এরপর তাদের উপর হামলা, হত্যা ও ধর্ষণ করা হয়।[২৭] পরের বছর সিলেটের ৮০০টিরও বেশি মন্দির অপবিত্র করা হয়েছিল।[২৮] হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরেশচন্দ্র বিশ্বাস, কুলাউড়ার জমিদার মোহিনী মোহন কর এবং কৃপেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের মতো নেতৃস্থানীয় সিলেটী রাজনীতিবিদরা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও গ্রেপ্তার হন।[২৯] বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে কৃষ্ণপুর গণহত্যা, মাকালকান্দি গণহত্যা, আদিত্যপুর গণহত্যা, বুরুঙ্গা গণহত্যা, গালিমপুর গণহত্যা এবং নড়িয়া গণহত্যা সিলেটি হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ছিল। হিন্দুধর্মাবলম্বী সিলেটিদের বিশ্বাস, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জৈনপুর গ্রামে সতীর কণ্ঠাবন পতিত হয়েছিল এবং বর্তমানে তা সিলেটের অন্যতম প্রধান শাক্তপীঠ শ্রীশৈলে রক্ষিত আছে।[৩০] চৈতন্য মহাপ্রভু কৃষ্ণবাদী গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক এবং ভক্তি আন্দোলনের একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তিনি সিলেটি ছিলেন এবং এখনও তাঁর বহু সিলেটি অনুসারী তাঁকে কৃষ্ণের অবতার হিসেবে পূজা করেন।[৩১]

প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম ও হিন্দুধর্মের পাশাপাশি, সিলেটি সমাজ ঐতিহাসিকভাবে লোক, দেশীয় এবং ধর্মীয় সমন্বয়ের এক সমৃদ্ধ স্তর সংরক্ষণ করেছে। এই বিশ্বাস ব্যবস্থাগুলো ধ্রুপদী হিন্দুধর্ম ও ইসলামের সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে এবং সিলেট শহরের রক্ষাকর্তা দেবতা শ্রীহট্টনাথের পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলে উপাসিত লৌকিক দেব-দেবী হিসেবে সিলেটিদের গ্রামীণ ধর্মীয় জীবন, আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রভাবিত করে চলেছে। এই ধর্মীয় স্তরটি একাধিক স্থানীয় দেব-দেবীর উপাসনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে—যেমন গ্রামের রক্ষক, উর্বরতার জননী, সর্পদেবী, বন ও জলের আত্মা। সিলেটি ধর্মীয় চর্চা অন্তর্নিহিত পবিত্রতার উপর জোর দেয় এবং গাছ, নদী, মাঠ, পাহাড় ও পৈতৃক স্থানে ঐশ্বরিক উপস্থিতি খুঁজে পায়। সাধারণত প্রাচীন বট, অশ্বত্থ বা কাঁঠাল গাছের নিচে খোলা আকাশের নিচে নির্মিত মন্দিরে আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পাথর, ডালপালা বা মাটির চিহ্ন দেবতাদের প্রতীকহীন উপস্থাপনা হিসেবে কাজ করে। কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদী মধ্যস্থতা ছাড়াই দুধ, ফল, শস্য এবং মিষ্টি নিবেদন করা হয় এবং আচারের কর্তৃত্ব প্রায়শই নারী, কৃষক, জেলে এবং গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের হাতে থাকে। সর্বপ্রাণবাদ এবং উর্বরতা পূজার এই সংমিশ্রণ সিলেটি ধর্মীয় জীবনের অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে স্থায়ী একটি দিক গঠন করে, যা বহুঈশ্বরবাদের সাথে এই অঞ্চলের গভীর ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করে। এই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, প্রায়শই এই দেশীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এই প্রথাগুলির হিন্দু উৎস থাকা সত্ত্বেও, মুসলমানরা বাদশাহ (ভৈরবের একটি আঞ্চলিক রূপ)-এর মতো দেবতাদের সম্মান জানাতে পারে এবং স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও উর্বরতার জন্য নৈবেদ্য নিবেদন ও মানত করতে পারে। এই সমন্বয়বাদ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের এক দীর্ঘ ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় জীবনের সীমানা প্রায়শই পরিবর্তনশীল। এই কারণে, এই বহুঈশ্বরবাদী আচার-অনুষ্ঠানে যৌথ অংশগ্রহণ সিলেটি আধ্যাত্মিকতার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে, যেখানে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই লোকপ্রথায় নিযুক্ত হয়ে প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে শক্তিশালী করে।[৩২]

বাউলরা সিলেটির ধর্মীয় জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কঠোর ধর্মীয় সীমানাকে অতিক্রমকারী এক অনন্য সমন্বয়ী ঐতিহ্য। বাউলরা হলেন পরিব্রাজক লোকসংগীত শিল্পী, কবি এবং সাধক, যারা আনুষ্ঠানিক উপাসনার চেয়ে ঈশ্বরের ব্যক্তিগত ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার উপর বেশি জোর দেন। তাদের শিক্ষা ও অনুশীলনে ঈশ্বরের অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি এবং মনের মানুষের সঙ্গে মানবাত্মার একাত্মতার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বাউলদের আসরে প্রায়শই প্রেম, ভক্তি এবং নিজের মধ্যে ঈশ্বরের সন্ধানের কথা বলা হয়, যেখানে আত্মার সঙ্গে বিশ্বাত্মার মিলনের উপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়। মুসলিম বা হিন্দু নির্বিশেষে সকল সিলেটিবাসীই তাদের শ্রদ্ধা করেন, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বহুত্ববাদের ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। শারীরিক গুপ্তবিদ্যা এবং অপবিত্র জাদুবিদ্যা উভয় থেকেই উদ্ভূত এই ধারা আধ্যাত্মিক সাধনায় দেহ-মন উভয়ের ব্যবহারের উপর জোর দেয়। তাদের আচার-অনুষ্ঠান, যা সম্ভাব্য বিতর্কিত প্রকৃতির কারণে প্রায়শই বহিরাগতদের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়, তা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনের মাধ্যমে দেহতরল, "নয়টি দ্বার" (শরীরের উন্মুক্ত স্থান) এবং 'পরাণ' (প্রাণশক্তি)-কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বাউলবাদে নারীদের একটি পবিত্র ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে তান্ত্রিক সাধন সঙ্গিনী (হাধন হঙ্গিনী) হিসেবে, যাকে আধ্যাত্মিক সাফল্যের উৎস হিসেবে পূজা করা হয়। এই সম্পর্কটি পুরুষ সাধকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় এবং কিছু বাউল বিবাহের অপ্রচলিত রূপ ব্যবহার করেন, যেমন মালাবদল বা মালা বিনিময়, যা আধ্যাত্মিকভাবে বন্ধনমূলক। বাউলরা গাঁজা এবং চটচটে হাশিশের মতো মাদকদ্রব্যও ব্যবহার করে, এই বিশ্বাসে যে এগুলো মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ায় এবং তাদের আধ্যাত্মিক সাধনায় সহায়তা করে। একটি বিতর্কিত প্রথা হলো প্রেমভজ নামক একটি আনুষ্ঠানিক পদার্থ তৈরি করা, যা দেহতরল দিয়ে গঠিত এবং জ্ঞানার্জনের সাধনায় ব্যবহৃত হয়, যা তাদের অনুশীলনকে গুপ্ত ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করে। ফকির লালনের সময়ে সিলেট বাউল কেন্দ্রগুলির আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত ছিল।[৩৩]

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি

[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]
  1. Sylheti Ethnologue.
  2. "Identity, Language Use, and Attitudes: Some Sylheti-Bangladeshi Data from London, UK"Sage Journals (ইংরেজি ভাষায়)। ডিওআই:10.1177/0261927X03261223। সংগ্রহের তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  3. Bhattacharjee, Nabanipa (২০১৩)। "'We are with culture but without geography': locating Sylheti identity in contemporary India"। Fazal, Tanweer (সম্পাদক)। Minority Nationalisms in South Asia। Routledge। পৃ. ৫৩–৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৩১৭-৯৬৬৪৭-০
  4. Sebastian M. Rasinger (2007). Bengali-English in East London: A Study in Urban Multilingualism. pp. 26-27. Retrieved on 2017-05-02.
  5. Glanville Price (2000). Encyclopedia of the Languages of Europe. pp. 91-92.
  6. Shahela Hamid (2011). Language Use and Identity: The Sylheti Bangladeshis in Leeds. pp.Preface. Verlag Peter Lang. Retrieved on 4 December 2020.
  7. চৌধুরী, মুজীবুর রহমান (৩১ জুলাই ২০১৯)। "গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা"সিলেটের ডাক। ৫ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জানুয়ারি ২০২৩
  8. অচ্যুতচরণ চৌধুরী (২০০০) [১৯১৬]। "উত্তর শ্রীহট্টের নামতত্ত্ব"। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত উত্তরাংশ (পিডিএফ)। কলিকাতা: কথা। পৃ. ২১।
  9. "নাম কি করে সিলেট হলো"বাংলানিউজ২৪। ২৭ জুলাই ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১২ মে ২০২৬
  10. চৌধুরী, ইন্দ্রজীত (৪ আগস্ট ২০১৬)। "পুণ্ড্র, গৌড় পেরিয়ে সেই বঙ্গেই ফিরলাম?" (প্রবন্ধ)। আনন্দবাজার পত্রিকা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ আগস্ট ২০২০
  11. Zia Haider Rahman, A Community Without Aspirations, The Guardian, 2 May 2007, https://www.theguardian.com/commentisfree/2007/may/02/yesterdaysawthepublication,
  12. "আপন মহিমায় টিকে থাকুক সিলেটি ভাষা"। প্রথম আলো। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
  13. Claire Alexander, Joya Chaterji and Annu Jalais, The Bengal Diaspora: Rethinking Muslim Migration, p.2, Routledge (2015) London.
  14. Across Seven Seas and Thirteen Rivers: Life Stories of Pioneer Sylheti Settlers in Britain, Caroline Adams, Tassaduq Ahmed and Dan Jones, THAP (1987), London, আইএসবিএন ৯৭৮-০৯০৬৬৯৮১৪৩
  15. Benjamin Zeitlyn (সেপ্টেম্বর ২০০৮)। "Challenging Language in the Diaspora" (পিডিএফ)Bangla Journal (14): ১২৬–১৪০। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০১৫
  16. Neighbourhood Statistics (২০০৭)। "Lead View Trend"। neighbourhood.statistics.gov.uk। ৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০১৫
  17. Yong, T.T.; Rahman, M.M. (২০১৩)। Diaspora Engagement and Development in South Asia। Palgrave Macmillan। পৃ. ১০৮। আইএসবিএন ৯৭৮১১৩৭৩৩৪৪৫৯। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০১৫
  18. Anne Kershen, Strangers, Aliens and Asians – Huguenots, Jews and Bangladesh in Spitalsfields 1660–2000, p.19 (2004)
  19. Momin, Mignonette; Mawlong, Cecile A.; Qādrī, Fuz̤ail Aḥmad (২০০৬)। Society and Economy in North-East India (ইংরেজি ভাষায়)। Regency Publications। পৃ. ২৭১। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৯২৩৩-৪০-২
  20. কানাই লাল রায় (২০১২)। "মুরারি গুপ্ত"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  21. কানাই লাল রায় (২০১২)। "রঘুনাথ শিরোমণি"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  22. সমবারু চন্দ্র মহন্ত (২০১২)। "মহাভারত"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  23. শামসদ হোসাম। "বাংলা সাহিত্যে সিলেট"Thikana। ২৬ অক্টোবর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৩
  24. "৫০০ বছর আগের শিলালিপিতে হযরত শাহজালাল (র.)"Sylhetview24.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  25. প্রতিবেদক, নিজস্ব (১৫ নভেম্বর ২০১৯)। "সিলেটের অজানা ইতিহাস"Prothomalo। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  26. Valpey, Kenneth (২০১৮)। "Caitanya"। Jacobsen, Knut A.; Basu, Helene; Malinar, Angelika; Narayanan, Vasudha (সম্পাদকগণ)। Brill's Encyclopedia of Hinduism Online। Brill।
  27. মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসাদ (২০০৭)। Partition, Bengal and After: The Great Tragedy of India। নয়া দিল্লি: রেফারেন্স প্রেস। পৃ. ৪০। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৪০৫-০৩৪-৯
  28. সিংহ, নগরেন্দ্র কুমার (২০০৩)। Encyclopaedia of Bangladesh। নয়া দিল্লি: আনমোল পাবলিকেশন্স। পৃ. ১১৩। আইএসবিএন ৮১-২৬১-১৩৯০-১
  29. Kamra, A.J. (২০০০)। The Prolonged Partition and its Pogroms: Testimonies on Violence Against Hindus in East Bengal 1946-64। নয়া দিল্লি: Voice of India। পৃ. ৯৪–৯৫। আইএসবিএন ৮১-৮৫৯৯০-৬৩-৮
  30. Kapoor, Subodh (২০০২)। The Indian Encyclopaedia। খণ্ড ২০। New Delhi: Cosmo Publications। পৃ. ৬৩২৫। আইএসবিএন ৮১-৭৭৫৫-২৭৭-৫
  31. টনি কে. স্টুয়ার্ট (২০১২)। "চৈতন্য, শ্রী"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  32. অনিরুদ্ধ সেন (২০১৪)। "বরাক উপ্যতকার বঙ্গীয় সমাজের লৌকিক দেবতা ও ব্রত পার্বণ"। করিমগঞ্জ কলেজ। পৃ. ২৩–২৯। {{বই উদ্ধৃতি}}: |journal= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য); |title= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য).
  33. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M