বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলাদেশের সংস্কৃতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসব।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের গণমানুষের সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, ভোজনরীতি, পোশাক, উৎসব ইত্যাদির মিথস্ক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বাঙালিদের রয়েছে, শত শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। বাংলাদেশ পৃথিবীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন‍্যতম।

বাঙালী সংস্কৃতি বলতে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেই বোঝানো হয়। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকের বঙ্গীয় রেনেসাঁ, প্রখ্যাত বাঙালি লেখক, সাধু, লেখক, বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তাবিদ, সংগীত রচয়িতা, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতারা বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বেঙ্গল রেনেসাঁর মধ্যে একটি নবজাতক রাজনৈতিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ রয়েছে যা আধুনিক ভারতীয় শৈল্পিক সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির অনেক উপায়ে অগ্রদূত ছিল।

এম. নজরুল ইসলাম তমিজ, একজন মানবাধিকার কর্মী এবং জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির (এনএইচআরএস) চেয়ারম্যানের মতে, মানবাধিকার বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের সংমিশ্রিত সংস্কৃতিতে ইসলাম ধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব রয়েছে। এটি সঙ্গীত, নৃত্য, নাটকসহ বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়; শিল্প নৈপুণ্য; লোককাহিনী লোককথা; ভাষা সাহিত্য; দর্শন ধর্ম; উৎসব উদযাপন; সেইসাথে একটি স্বতন্ত্র রন্ধনশৈলীতে রন্ধন সম্পর্কীয় ঐতিহ্য।

সাহিত্য ও সঙ্গীত

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি পুরনো। ৭ম শতাব্দীতে লেখা বৌদ্ধ দোহার সঙ্কলন চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি, ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে।১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ বাংলা ভাষায় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলার লোক সাহিত্যও সমৃদ্ধ; মৈমনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। আধুনিক সাহিত্যিকদের মধ্যে আল মাহমুদ, হুমায়ূন আহমেদ খুব বেশি জনপ্রিয়। তাছাড়াও ছোটদের কাছে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, রকিব হাসান, খুব জনপ্রিয়। অন্যান্য প্রধান ধারার সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী আনোয়ার হোসেন, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গীত বাণীপ্রধান; এখানে যন্ত্রসঙ্গীতের ভূমিকা সামান্য। গ্রাম বাংলার লোক সঙ্গীতের মধ্যে বাউল গান, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, গম্ভীরা, কবিগান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গ্রামাঞ্চলের এই লোকসঙ্গীতের সাথে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে মূলত একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক সংগীতকাররা অবশ্য বিদেশী বাদ্যযন্ত্র যেমন কীবোর্ড, ড্রামস, গীটার ইত্যাদিরও ব্যবহার করে থাকেন। কেউ কেউ আবার লোকজ ও আধুনিকতার মিশ্রণে ফিউশন ধারারও প্রচলন করেন।

নৃত্য

[সম্পাদনা]

নৃত্যশিল্পের নানা ধরন বাংলাদেশে প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে উশের গ্রামাঞ্চলে যাত্রা পালার প্রচলন রয়েছে। ঢাকা-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র শিল্প হতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হতে ১০০টি বাংলা চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়।[]

বাংলার নৃত্যকলার তালিকা-

বাঙালি মেয়েরা নবান্ন উৎসব উপলক্ষে লোকনৃত্য পরিবেশন করছে

গণমাধ্যম

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে মোট প্রায় ২০০টি দৈনিক সংবাদ পত্র ও ১৮০০রও বেশি সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তবে নিয়মিতভাবে পত্রিকা পড়েন এরকম লোকের সংখ্যা কম, মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫%। [] গণমাধ্যমের মধ্যে রেডিও অঙ্গনে বাংলাদেশ বেতারবিবিসি বাংলা জনপ্রিয়। অবশ্য একবিংশ শতাব্দিতে বেশ ক'টি বেসরকারি এফএম বেতার অনুমোদন পাওয়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে এফএমও বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তাছাড়া কিছু অনলাইন রেডিওও ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা নিয়ে গণমাধ্যমে স্থান করে নেয়ার প্রয়াস নিয়েছে। সরকারি টেলিভিশন সংস্থা বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে ২৫টিরও বেশি উপগ্রহভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারিত হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন তার টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার দ্বারা দেশের সর্বত্র বিরাজমান থাকার পাশাপাশি বিটিভি ওয়ার্ল্ড-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাঙালির মাঝে নিজের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।

রন্ধন

[সম্পাদনা]
বাংলাদেশের বিভিন্ন লোভনীয় খাবার: সর্ষে ইলিশ, কাচ্চি বিরিয়ানিপিঠা

বাংলাদেশের রান্না-বান্নার ঐতিহ্যের সাথে ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের রান্নার প্রভাব রয়েছে। ভাত, ডাল ও মাছ বাংলাদেশীদের প্রধান খাবার, যার কারণে বলা হয়ে থাকে মাছে ভাতে বাঙালি। দেশে ছানা ও অন্যান্য প্রকারের মিষ্টান্ন , যেমন রসগোল্লা, চমচম বেশ জনপ্রিয়। ভাতজাতীয় খাবারের মধ্যে বিরিয়ানি, পোলাওজাতীয় উচ্চ ক্যালরির খাবার বেশ সমাদৃত। তাছাড়া তেল-চর্বিজাতীয় মসলাযুক্ত রন্ধনপ্রণালী এতদ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যতালিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারণ মানুষ শাক-সবজিকে তুলনামূলক গরীবদের খাদ্য মনে করেন আর মাছ-মাংসকে আভিজাত্য ধরে নেন।

বয়ান শিল্প

[সম্পাদনা]
বাংলাদেশের নকশি কাঁথা
ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে অপরূপ জামদানি নকশা

ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভেনিস প্রজাতন্ত্রে বাংলার রেশম গঙ্গার রেশম নামে পরিচিত ছিল। মুঘল বাংলা ছিল একটি প্রধান রেশম রপ্তানিকারক। জাপানি রেশম উৎপাদন বৃদ্ধির পর বাংলার রেশম শিল্পের পতন ঘটে। রাজশাহীর রেশম উত্তর বাংলাদেশের অংশে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। মুঘল বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত শৈল্পিক ঐতিহ্য ছিল সূক্ষ্ম মসলিনের উপর জামদানি নকশা বুনন, যা এখন ইউনেস্কো দ্বারা একটি অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। জামদানি নকশা ইরানি বস্ত্র শিল্প (বুটা নকশা) এবং পশ্চিমা বস্ত্র শিল্প (কলকা) এর অনুরূপ ছিল। ঢাকার জামদানি তাঁতিরা সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। আধুনিক বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে একটি, যেখানে একটি বৃহৎ তুলা ভিত্তিক তৈরি পোশাক শিল্প রয়েছে।

পোশাক

[সম্পাদনা]
শেরওয়ানিতে বাঙালি বর
নিকাব

বাংলাদেশের নারীদের প্রধান পোশাক শাড়িশাড়ির মধ্যে মসলিন, তাঁত, টাঙ্গাইল, রাজশাহী সিল্ক, ঢাকাই রেশম, কাতান ও সুতি বাংলাদেশের নিজস্ব বোনন। অল্পবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সালোয়ার কামিজেরও চল রয়েছে। একবিংশ শতাব্দিতে শহরাঞ্চলের কিশোরী-যুবতীরা শার্ট-প্যান্ট কিংবা জিন্স-কামিজ বা জিন্স-ফতুয়াও পরে থাকেন। পুরুষদের প্রধান পোশাক লুঙ্গি, তবে শহরাঞ্চলে পাশ্চাত্যের পোশাক শার্ট-প্যান্ট প্রচলিত। গ্রামাঞ্চলেও দাপ্তরিক পোশাক হিসেবে শার্ট-প্যান্টকে আভিজাত্যের অংশ মনে করা হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানে পুরুষরা পাঞ্জাবী-পায়জামা পরিধান করে থাকেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবি বাংলাদেশী পুরুষদের অন্যতম অনুষঙ্গ। নারীদের মধ্যে জামদানি, ঢাকাই, জামা, ফতুয়া, বাংলা কুর্তি, কাপড় ও পুরুষদের মধ্যে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, গামছা, ফতুয়া, কাবলি বাংলার নিজস্ব পোশাক।

বাংলায় মুসলমান শাসকদের আগমনের পর সেলাই করা পোশাক যেমন গোল জামা ও মধ্যে এশিয়া থেকে মুঘল শাসকদের দারা আনা সালোয়ার-কামিজ বাঙালি নারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

লাল জামদানি শাড়িতে কনে
লুঙ্গি

সামাজিক অনুষ্ঠান

[সম্পাদনা]

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসব ঈদুল ফিত্‌র , ঈদুল আজহা। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গা পূজা, বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা, আর খ্রিস্টানদের বড়দিনও ঘটা করে পালিত হয়ে থাকে স্ব স্ব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই দিবসগুলোতে রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। সার্বজনীন উৎসবের মধ্যে পহেলা বৈশাখ প্রধান। গ্রামাঞ্চলে নবান্ন, পৌষ পার্বণ ইত্যাদি লোকজ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং ভাষা আন্দোলনের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারি সাড়ম্বরে পালিত হয়। এছাড়াও পালিত হয়, পহেলা ফাল্গুন, বর্ষা উৎসব, সাকরাইন, চাঁদ রাত, ঈদে মিলাদুন্নবি, শবে বরাত, শবে কদর, শবে মেরাজ, আশুরা, মহররম,‌ আখেরি চাহার সোম্বা, বিশ্ব ইজতেমা, কালী পূজা, সরস্বতী পূজা, দোল পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমাইস্টার

ক্রীড়া

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম খেলা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ফুটবল জনপ্রিয় হলেও ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টেস্ট ক্রিকেট খেলার মর্যাদা লাভ করার পর থেকে ক্রিকেট বাংলাদেশীদের কাছে খুবই প্রিয় খেলা হয়ে উঠে। কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা, যা গ্রামাঞ্চলে খুব বেশি প্রচলিত। অন্যান্য খেলার মধ্যে হকি, হ্যান্ডবল, সাঁতার এবং দাবা উল্লেখযোগ্য। এযাবৎ ৫ জন বাংলাদেশী - নিয়াজ মোরশেদ, জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিবএনামুল হোসেন রাজীব - দাবার আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ড মাস্টার খেতাব লাভ করেছেন।[] লাঠি খেলা একটি ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মার্শাল আর্ট[][]–লাঠির দ্বারা এক ধরনের লড়াই–যা ভারতবাংলাদেশ অনুশীলন করা হয়।[][][] 'লাঠি খেলা' অনুশীলনকারীকে 'লাঠিয়াল' বলা হয়।[১০] জব্বারের বলীখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা চট্টগ্রামের এর লালদিঘী ময়দানে প্রতিবছরের ১২ই বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়।[১১] মক্কার বলী খেলা বা মক্কারো বলীখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত মাদার্শা ইউনিয়নে প্রতিবছর বাংলা সনের ০৭ই বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলায় অংশগ্রহণকারীদেরকে বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি, বলীখেলা নামে পরিচিত।[১২][১৩]গ্রামাঞ্চলে সাধারণ, নোকা বাইচ বহু শতাব্দী আগের লোকজ বাঙালি সংস্কৃতির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। [১৪] অষ্টাদশ শতাব্দীতে শহরাঞ্চলে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল। মোঘল আমল জুড়ে বিভিন্ন নবাব পরিবার নৌকা বাইচের আয়োজনের জন্যও পরিচিত ছিল এবং ঐসময় সারি গান আরও জনপ্রিয় হতে শুরু করে। [১৫]

লোক ও কারুশিল্প

[সম্পাদনা]
গাজীর পট

বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্প এ দেশের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারুশিল্পের বিশাল ভান্ডারে রয়েছে জামদানি, সতরঞ্জি, ধাতব শিল্প, শঙ্খ শিল্প, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, ঝিনুক শিল্প, পুতুল শিল্প, পিতল-কাঁসা শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, শোলা শিল্প ইত্যাদি। এছাড়া নকশি কাঁথা, নকশি শিকা, শীতল পাটি, মাটির ফলকচিত্র, পাতা ও খড়ের জিনিস, লোকচিত্র প্রভৃতি এদেশের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন।[১৬]

তাঁত ও বয়ন শিল্প

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের তাঁত ও বয়ন শিল্পের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। এ দেশের মসলিন ও জামদানি বিশ্ববিখ্যাত। ঢাকাই শাড়িও জনপ্রিয়।

নকশি কাঁথা

[সম্পাদনা]

নকশি কাঁথা বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের ঐতিহ্যমন্ডিত ও নান্দনিক নিদর্শন। পুরনো কাপড়ের কাঁথা সেলাই করে তার ওপর গ্রামবাংলার মহিলারা বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তোলেন।

শিকাশিল্প

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন শিকাশিল্প। পাট শিকা তৈরির প্রধান উপকরণ। নকশি শিকা তৈরিতে কঞ্চি সুতলি, ঝিনুক, কড়ি, শঙ্খ, কাপড়, পোড়ামাটির বল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়।

নকশি পাখা

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যের আরেক প্রতীক নকশি পাখা। তালপাতা, সুপারীর পাতা ও খোল, সুতা, পুরনো কাপড়, বাঁশের বেতি, নারিকেল পাতা, চুলের ফিতা, পাখির পালক ইত্যাদি অতি সাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়।

শীতলপাটি

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পের নিদর্শন শীতলপাটি। মুর্তা নামক এক ধরনের বেতি বা পাতি দিয়ে শীতলপাটি বোনা হয়।

লোকচিত্র

[সম্পাদনা]

হাঁড়ির ওপর বিভিন্ন চিত্র আঁকা এ দেশের একটি প্রাচীন সংস্কৃতি। আবহমান বাংলার লোক সমাজের দৈনন্দিন জীবন, ধর্ম বিশ্বাস, লৌকিক আচার-আচরণ ধারণ করে আসছে এই চিত্রিত হাঁড়ি। এসব হাঁড়িতে ঘোড়া, পাখি, শাপলা ফুল, পানপাতা, মাছ প্রভৃতি মটিফ ব্যবহৃত হয়।

মৃৎশিল্প

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে মৃৎশিল্প। এ শিল্পের হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃত শিল্পসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে হাঁড়িপাতিল, কলসি, সানকি, চুলা, শাক-সবজি, ফলমূল, খেলনা, পুতুল, ঘরের টালি, ধর্মীয় প্রতিকৃতি, প্রাণীজ প্রতিকৃতি, অলঙ্কার প্রভৃতি।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ‘মেলা’। [১৭] মেলার উৎপত্তি মূলত গ্রাম-সংস্কৃতি হতে।[১৮] বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষ, কৃষি মেলা, ঋতুভিত্তিক মেলা, সাধু-সন্তের ওরশ উপলক্ষে মেলা, বরেণ্য ব্যক্তিত্বের স্মরণোৎসব উপলক্ষে মেলা, জাতীয় দিবসসমূহ উদ্‌যাপন উপলক্ষে মেলা ইত্যাদি এদেশের লোক সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।[১৯]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. অনুপম হায়াৎ (২০১২)। "চলচ্চিত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  2. ওয়াকিল আহমদ (২০১২)। "লোকনৃত্য"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  3. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং গোলাম রহমান (২০১২)। "সংবাদপত্র ও সাময়িকী"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  4. Rifat gets GrandMaster title ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে, দ্য নিউ নেশন, জুলাই ৮, ২০০৬।
  5. Khan, Saleque (২০০৭)। Performing the (imagi)nation: A Bangladesh Mise-en-scene। New York University। পৃ. ২৩৭। আইএসবিএন ৯৭৮০৫৪৯০৯৯৬২৮
  6. Sylhet: History and Heritage (ইংরেজি ভাষায়)। Bangladesh Itihas Samiti। ১ জানুয়ারি ১৯৯৯। আইএসবিএন ৯৭৮৯৮৪৩১০৪৭৮৬
  7. Lathi khela, Lāthi khela: 1 definition
  8. "Lathi Khela to celebrate Tangail Free Day"। Tangail: the daily star। ১৩ ডিসেম্বর ২০১১।
  9. "Lathi Khela to celebrate Tangail Free Day"। Tangail: the daily star। ১৩ ডিসেম্বর ২০১১।
  10. "'Lathi khela' at Charukala"। bangladesh2day.com। ২৭ ডিসেম্বর ২০০৮। ৯ মে ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুন ২০১৩
  11. বাংলাদেশের খেলাধুলা, রশীদ হায়দার, বাংলা একাডেমী
  12. "মক্কার বলী খেলা পরিচিতি"chittagong.gov.bd। ১৪ অক্টোবর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ অক্টোবর ২০২০
  13. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; n নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  14. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; zahid2 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  15. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  16. বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন
  17. আমাদের লোকমেলা আমাদের সম্প্রীতি ভোরের কাগজ[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  18. সাইমন জাকারিয়া (২০১২)। "মেলা"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  19. সমবারু চন্দ্র মহন্ত (২০১২)। "পহেলা বৈশাখ"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M