মারমা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মারমা
Marma
မရမာကြီး
Chimui.jpg
মারমা নৃত্য
মোট জনসংখ্যা
২১০,০০০
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চলসমূহ
 বাংলাদেশ: বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, পটুয়াখালী এবং বরগুনা১৫৭,৩০১
 মিয়ানমার: রাখাইন রাজ্যঅজ্ঞাত
 ভারত: ত্রিপুরাঅজ্ঞাত
ভাষা
আরাকানি ভাষাসমূহ
ধর্ম
থেরাবাদ বৌদ্ধ
১৯০৬ সালে তোলা বান্দরবানে মারমারা (কেন্দ্রে বোহমং)
মারমা বালিকারা নববর্ষ উৎসব "সাংগ্রাই"তে জল উৎসবে

মারমা বাংলাদেশের একটি আদিবাসী ও বৃহৎ জাতিসত্ত্বা। তিন পার্বত্য জেলায় তাদের বসবাস দেখা গেলেও মূল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস বান্দরবানে। ‘মারমা’ শব্দটি ‘ম্রাইমা’ থেকে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারা মিয়ানমার থেকে এসেছে বিধায় তাদের ‘ম্রাইমা’ নাম থেকে নিজেদের ‘মারমা’ নামে ভূষিত করে।[১] মারমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষদের মতো মেয়েরাও পৈতৃক সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারী হয়। ভাত মারমাদের প্রধান খাদ্য। পাংখুং, জাইক, কাপ্যা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়। তাদের প্রধান উৎসব ও পার্বণগুলো হচ্ছে সাংগ্রাই পোয়ে, ওয়াছো পোয়ে, ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে এবং পইংজ্রা পোয়ে। বান্দরবানে মারমা লোকসংখ্যা প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে মারমারা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশে চাকমার পর মারমা দ্বিতীয় বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠী (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী)।

এন্ডোনিম ও এক্সোনিম[সম্পাদনা]

মারমা শব্দটি বোহমং মাউং শোয়ে প্রু কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে তার বৃত্তের মানুষের কাছে ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে মুদ্রিত হয়। [২] বর্মী ভাষায়, মারমারা মারামা (မရမာ) নামে পরিচিত।

মারমারা পূর্বে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মগ বা মাঘ নামে পরিচিত ছিল কারণ চট্টগ্রামে আগ্রাসনের সময় ডাচ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের সাথে হাত মেলানোর জন্য বাঙালিরা তাদের মগ/মাঘ বলে অভিহিত করত। মারমারা এই নামগুলোকে মর্যাদাহানিকর হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ এর মানে "জলদস্যু", এবং এইভাবে ১৯৪০-এর দশকে নতুন নাম মারমা গ্রহণ করে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কিছু মারমা মারিমা বা মগ বা মাঘ হিসেবে আত্মপরিচয় অব্যাহত রেখেছে, কারণ তারা মনে করে শব্দটি মগধ থেকে উদ্ভূত, যা একটি ঐতিহাসিক ভারতীয় রাজ্যের নাম।[৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মারমারা বর্তমান রাখাইন রাজ্য থেকে ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিপ্রায়ণ করে, যে সময়টি ম্রাউক উ রাজ্যের চট্টগ্রাম বিজয়ের সময়ের সাথে মিলে যায়।[৪] ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অন্যান্যদের রেকর্ড থেকে জানা যায় যে মারমারা ম্রাউক উ রাজ্য থেকে ১৪শ থেকে ১৭শ শতাব্দীতে অভিবাসনের দুটি পর্যায়ে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম পর্যায়ে ম্রুক উ রাজ্য বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু অংশ অব্দি সম্প্রসারণ করে। ১৭৮৫ সালে বর্মী রাজা বোদাওপায়া আরাকানী রাজ্য দখল করে নিলে দ্বিতীয় পর্যায়ে মারমাদের পূর্বপুরুষেরা চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় ও সেখানে বসতি স্থাপন করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানরা কৌশলগতভাবে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত করে।[৫] ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে সরকার ৪,০০,০০০ এরও বেশী বাঙালি মুসলমানকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করে,[৬] প্রতিটি পরিবারকে ৫ একর জমি এবং বিনামূল্যে খাদ্য রেশন প্রদান করে। পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে মারমা জনসংখ্যা কমে গেছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীর জেলায়।[৭] ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে বাঙালি মুসলিম বসতি স্থাপনকারী ও বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের উপর ১৫টিরও বেশি গুরুতর গণহত্যা চালায়।[৬] সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক অস্থিরতার প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেকে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্য ও বার্মায় (বর্তমানে মায়ানমার) পালিয়ে যায়।[৬] বাংলাদেশ সরকার জোরপূর্বক বাংলাদেশী সমাজে একীভূত করার মাধ্যম হিসেবে মারমাদেরকে বৌদ্ধধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে এবং বৌদ্ধ মন্দির (কিয়াউং) ধ্বংস করেছে।[৬] অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী অধিবাসীদের নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিয়মতান্ত্রিক বিবরণ নথিভুক্ত করেছে।[৮]

বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান মারমা সম্প্রদায়ের উপর ধর্মীয় সহিংসতাকে তীব্র করেছে।[৯] ২০০৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে, মুসলিম চরমপন্থীরা সামরিক বাহিনীর সাথে মিলে ১,০০০ বৌদ্ধ বাড়ি এবং ১৮টি বৌদ্ধ মন্দির জ্বালিয়ে দেয়, হাজার হাজার মারমাকে বাস্তুচ্যুত করে এবং ৩০ জন ব্যক্তিকে হত্যা করে।[৯] ২০১৮ সালে রাঙ্গামাটি জেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ১৯ ও ১৪ বছর বয়সী দুই মারমা বোনকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করে। [১০] [১১] জমি দখলও মারমা সম্প্রদায়কেও প্রভাবিত করেছে। বান্দরবানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সেক্টরের সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালে কর্তৃপক্ষ মারমাদের ৩৪ একর কৃষিজমি দখল করে নেয়।[১২] ২০১৮ সালে জসিম উদ্দিন মন্টু নামে এক হোটেল ডেভেলপার ৪২টি মারমা পরিবারের অধ্যুষিত ১০০ একর জমির দখল নেয়।[১৩]  

জিনগত গবেষণা[সম্পাদনা]

জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মারমা জনসংখ্যায় মাতৃ হ্যাপ্লোগ্রুপের ক্ষেত্রে উচ্চ মাত্রার ভারতীয় ও নিম্ন মাত্রার পূর্ব এশীয় জিনগত পূর্বপুরুষত্ব রয়েছে, এবং ত্রিপুরা এবং চাকমা জনসংখ্যার তুলনায় মার্মাদের মধ্যে হ্যাপ্লোটাইপ বৈচিত্র্য অধিকতর, এবং এটি তাদের মধ্যেই সর্বোচ্চ, এর দ্বারা প্রমাণিত হয় এই অঞ্চলে মারমাদের উপনিবেশায়ন গভীরতর ছিল।[১৪]

মারমাদের প্রধান প্রধান উৎসব[সম্পাদনা]

মারমাদের প্রধান প্রধান ধর্মীয় ও সামিাজিক উৎসব হচ্ছেঃ- বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চিবর দান, ওয়াহ্গ্যই বা প্রবারণা পূর্ণিমা এবং সাংগ্রাই। মারমাদের বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান-কে সাংগ্রাই বলে।পাশাপাশি নানান প্রাকৃতিক উৎসবও পালন করতে দেখা যায়। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের মাঝেও দেখা যায়।

বুদ্ধ পূণির্মা[সম্পাদনা]

এই পূর্ণিমা তিথীতে মহামতি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এটি একটি ধর্মীয় উৎসব।প্রত্যেক বছরেই অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে দিনটি মহাসমারোহে পালন করা হয়।

কঠিন চীবর দান[সম্পাদনা]

তুলা থেকে সুতা তৈরী করে তা রং করে এক রাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের পরিধানের চীবর তৈরী করা হয় বলে একে কঠিন চীবর বলে।

ওয়াহ্গ্যই[সম্পাদনা]

ওয়াহ্গ্যই বা প্রবারণা পূর্ণিমা হলো মারমাদের একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই দিন মারমাদের প্রতিটি সমাজ ও বিহারে এই উৎসবটি অতি আনন্দ ও খুশির সঙ্গে পালন করা হয় । এই দিন ঘরে ঘরে সুস্বাদু পিঠা তৈরী করা হয় । রাত্রে বেলায় এই দিনে মারমারা গৌতম বৌদ্ধের মহা চুলকে পূজা ও উৎসর্গ করার জন্য ফানুসবাতি উড়ানো হয়।

সাংগ্রাই[সম্পাদনা]

সাংগ্রাইয়ের তাৎপর্যঃ পৃথিবীর সকল জাতির মতন করে মারমারা গ্রেগরিয়ান ইংরেজি ক্যালেন্ডার ছাড়াও নিজস্ব একটা ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করে, মারমাদের ক্যালেন্ডার অবশ্য বর্মী ক্যালেন্ডারের কে অনুসরণ করেই করা হয়। মারমাদের বর্ষপঞ্জিকাকে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” বলা হয়। “ম্রাইমা সাক্রঃয়” এর পুরনো বছরের শেষের দুই দিন আর নতুন বছরের প্রথম দিনসহ মোট ৩দিন কে মারমারা সাংগ্রাই হিসেবে পালন করে থাকে। আগে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” অনুযায়ী এই ৩ দিন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে পড়লেও এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে মিল রেখে এপ্রিলের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে পালন করা হয়। ১৩ তারিখের সকালে পাঃংছোয়াই(ফুল সাংগ্রাই),১৪ তারিখে প্রধান সাংগ্রাই আর ১৫ তারিখে পানি খেলার সাথে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোও অনুষ্ঠিত হয়।

সাংগ্রাই এর প্রধান আকর্ষন হল পানি খেলা যেটিকে মারমারা বলে “ড়ি লং পোয়ে” । সাংগ্রাইয়ের পানি খেলা শুধুমাত্র মারমাদের নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া আর চীনের দাই জাতিগোষ্ঠীরাও এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান করে থাকে। মায়নামারে এই ধরনের অনুষ্ঠানকে “থিনগন” আর থাইল্যান্ড ও লাওসে এই অনুষ্ঠানকে “সংক্রান” বলে। থাই ভাষায় “সংক্রান” এর অর্থ হল পরিবর্তন। সাংগ্রাই আসলেই পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়াকেই বোঝায়। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে নতুন জুম চাষের মৌসুমের শুরুও সাংগ্রাই-এর পরেই হয়ে থাকে।শুধু জুম চাষই নয় মারমারা মাঘী পূর্ণিমার পর থেকে সাংগ্রাই এর আগ পর্যন্ত নতুন বিয়েই করে না অর্থাৎ সাংগ্রাইকে মারমারা নতুন বছরের শুরুসহ পুরনো সব জিনিসকে ঝেরে ফেলে নতুন করে শুরু করাকেই বোঝায়। আর তাই মারমারা এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্শীবাদ আর শুভাকাঙ্কার আশায় নতুন বছর উদযাপন করে থাকে।।

সাংগ্রাইয়ের পূর্ব প্রস্তুতিঃ

সাংগ্রাই এপ্রিলের ১৩ তারিখ থেকে শুরু হলেও মারমাদের মাঝে সাংগ্রাই নিয়ে উদ্দীপনা জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়। মারমা গ্রামের গিন্নীরা সাংগ্রাই নিয়ে নানা পরিকল্পনা করতে থাকে। তারা নতুন করে তাদের ঘরগুলো সাজাতে থাকে। মাটির ঘরগুলোকে আবার নতুন করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়, মাচাং আর ছনের ঘরগুলোতে পুরনো ছন বাদ দিয়ে পাহাড় থেকে নতুন ছন এনে বাড়িতে লাগানো হয়। এছাড়া জুম থেকে পাওয়া চাউল নানা রকমের পিঠার জন্য রেখে দেওয়া হয়।।

মারমা শুকর ব্যবসায়ীরা ৩ মাস আগে থেকেই নতুন নতুন শুকরের ছানা পালতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর বাজারে বিক্রি করতে পারে। মারমা শিকারীরা সাংগ্রাইয়ের আগে তাদের অস্ত্র গুলো গুছাতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর আগেই বড় রকমের হরিণ,গুইসাপ,কচ্ছপসহ আরো নানা রকমের পশু-পাখী শিকার করতে পারে।এছাড়া অন্যন্য ব্যাবসায়ীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে তাদের ব্যবসায়ী পরিকল্পনা বানাতে থাকে।

সেই সাথে তরূণ-তরূণীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের চিন্তাভাবনা করতে থাকে। কী করে সাংগ্রাই কে আরো আকর্ষনীয় করা যায় আর নতুন বছরের প্রথম দিনের উদযাপনকে কী আরো সুন্দর করা যায়?? মারমা তরূনীরা দর্জিদের কাছে ছুটে যায় যেন তার সাংগ্রাইয়ের “থামি(মারমা মেয়েদের পোশাক)” টী সব থেকে সুন্দর আর ব্যতিক্রমী হয়। এছাড়া যুবক- যুবতীরা তাদের বিয়ের তারিখগুলোও সব সাংগ্রাইয়ের পরে ঠিক করে রাখে। মোটামোটিভাবে জানুয়ারির পর থেকে সাংগ্রাইকে ঘিরে সকল স্তরের মারমারা নানা রকমের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে।

পাঃংছোয়াই(ফুল সাংগ্রাই)ঃ “পাঃংছোয়াই” এর অর্থ ফুল ছিঁড়ার দিন।এটি সাধারণত ১২ এপ্রিলের রাতেই হয়ে থাকে।শীতের পর বসন্তের আগমনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতেও বসন্তের ছোঁয়া লাগে, ফলে পাহাড়ে দেখা যায় নানা ফুলের সমারোহ।। নানা রকমের ফুলে গ্রামের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোতে ছেয়ে যায়। আর এই ফুলগুলো সাংগ্রাইয়ের আগে ছেঁড়া হয় না এক্কেবারে “পাঃংছোয়াই” এর রাতেই পাহাড় থেকে ফুলগুলো ছিঁড়ে বাড়িগুলোতে সাজানো হয়। পাহাড়ে অনেক ফুল থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ফুল আছে যেগুলো দিয়েই বাড়িঘর গুলো সাজানো হয়। তন্মধ্যে “সাংগ্রাই পাঃং” নামে সাদা রংঙের ফুলটিই সবথেকে প্রিয়। সবাই মূলত এই ফুলকে প্রধান করেই “পাঃংছোয়াই” এর পরের দিনে গিন্নারা তাদের ঘরগুলো সাজাতে থাকে। এই ফুল ছেঁড়ার কাজটি মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরাই করে থাকে।এই “পাঃংছোয়াই” কে কেন্দ্র করে মারমা তরূন-তরূণীরা এর আগের রাতে নানা রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেক সারারাত জেগে পিঠা বানায়, আবার অনেকে মারমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলার ব্যবস্থা করে, অনেকে মারমা নাচ-গান করে থাকে,মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরা সারারাত জেগে থাকার জন্য নানা কিছু করে। এরপরে আলো ফোটার আগেই একদম ভোর-সকালে দলে দলে পাহাড়ে গিয়ে “সাংগ্রাই পাঃং” তুলে নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দেই।।

ঘিন্নিরা সকাল হলেই সুতা দিয়ে ফুলগুলো সাজাতে থাকে। প্রথমে ভগবান বুদ্ধকে ফুল পূজা করে নিয়ে বাড়ির প্রতিটি দরজাগুলোকে “সাংগ্রাই পাঃং” দিয়ে সাজানো হয়। বাড়ির দরজায় সাজানো ফুলগুলো দিয়েই বোঝতে পারা যায় সাংগ্রাই অর্থাৎ নতুন বর্ষবরন শুরু হয়ে গেছে।

শুধু তরূন-তরূণীরাই নই মারমা ছোট ছেলেমেয়েদেরও এই পাঃংছোয়াই নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ থাকে। কিন্তু মারমাদের বয়োজষ্ঠ্যরা ছোট ছেলেমেয়েদেরকে সবসময় “ফ্রুজুমা”(মারমা ডাইনী) এর ভয় দেখিয়ে রাখে। এমনকি এই “পাঃংছোয়াই” নিয়ে অনেক কিচ্ছাও আছে। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল ফ্রুজুমা-র ফাঁদে আটকে যাওয়া। ফ্রুজুমা “সাংগ্রাই পাঃং” এর লোভ দেখিয়ে কোনএকজনকে দলছুট করে এমন গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাবে যে তা থেকে দিনের আলো ফোটার আগে কখনোই আর মুক্তি পাওয়া যাবে না কারণ ফাঁদে পড়ার পর যেখানেই যাবে শুধু জংগল জংগলই পাবে। আর সাংগ্রাই পাঃং সাধারণত সকালের আলো ফোটার আগেই ছিঁড়তে হয়। এই কিচ্ছা দিয়েই মারমা মা-বাবারা তাদের সন্তানদের আগলে রাখে।

সাংগ্রাই জীঃঈ (সাংগ্রাই বাজার)ঃ “পাঃংছোয়াই” এর দিনেই অর্থাৎ ১৩ তারিখেই সাংগ্রাই জীঃঈ হয়ে থাকে। সাংগ্রাইকে উপলক্ষ করে অনেক বড় হাট বসে। হাটে সাংগ্রাইয়ের জন্য সকল প্রয়োজনীয় জিনিসই পাওয়া যাই। গিন্নীরা সাংগ্রাইতে বিহারে পাঠানোর জন্য অনেক ভালো ভালো খাবার কিনে। এছাড়া গৌতম বুদ্ধেকে স্নানের জন্য পবিত্র পানি, নারকেল, চীনা কাগজ, মোমবাতি,আগরবাতি মোটামোটিভাবে বিহারে পাঠানোর জন্য যার যেরকম সামর্থ্য সেই অনুযায়ী কিনে।

এছাড়া সাংগ্রাইতে ছোট-বড় সবারই মাঝে নতুন জামা থাকবেই। আর ছোট্ট বাচ্চারা সাংগ্রাইতে পানি মারার জন্য পানির বোতল, পানি মারার নানা রকমের প্লাস্টেকের অস্ত্রও কিনে রাখে।

প্রধান সাংগ্রাইঃ

প্রধান সাংগ্রাই বর্তমানে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিলের ১৪ তারিখেই পালন করা হয়। মারমা গৃহিণীরা(“ইংথসাং”) ভালো ভালো খাবার(“ছোয়াঈ”-বিহারে যে খাবার পাঠানো হয় তাকে “ছোয়াঈ” বলে) আর পিঠা নিয়ে বিহারে যায়। শুধু নিজেদের বিহার ছাড়াও আশেপাশের বিহারেও “ছোয়াঈ” পাঠানো হয়। “ছোয়াঈ” শুধু ভগবানের উদ্দেশ্যে নয়, নিজেদের আত্নীয়দের মাঝে যারা উপোসথ শীল পালন করে তাদের উদ্দেশ্যেও পাঠানো হয়। বিহার ছাড়াও মারমা বিভিন্ন দেবতাদেরকেও পূজা দেওয়া হয়। এছাড়া গ্রামের পরিচিত বয়োজৈষ্ঠদেরকেও খাবার আর পিঠা পাঠানো হয়।

আর মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বয়োজৈষ্ঠ্যদের স্নান করাতে যায়। প্রত্যেক পরিবারের বয়োজৈষ্ঠ্যরা গোসল শেষে তরূন-তরূণীদেরকে সাংগ্রাই এর সেলামি দেই। সেই সাথে তরূন-তরূণীরা বছরের শুরুতে বয়োজৈষ্ঠ্যদের কাছে নতুন বছরের আর্শীবাদ নিয়ে আসে। শুধু গোসলই নয় প্রতি পরিবার থেকে মারমা তরূণ-তরূণীদের কিছু না কিছু খেয়ে আসতে হয়।

বুদ্ধ স্নান আর ধর্মদেশনাঃ

প্রধান সাংগ্রাই তে বিহারে যে ভগবান বুদ্ধ আছে তাদেরকে পবিত্র পানি দিয়ে গোসল করানো হয়। বুদ্ধকে স্নানস্কৃত পানিকে মারমারা খেয়ে থাকে কারণ মারমাদের বিশ্বাস এই বুদ্ধ স্নানস্কৃত পানি তাদের শরীরে সকল রোগমুক্তির অবসান করাবে।

আর এর পরেই ধর্মদেশনা হয়। এতে এলাকার সকল পুরুষ-মহিলা যোগ দেই। সকল পরিবারেই চাল-নারকেল-চীনা কাগজ-মোমবাতি বিভিন্ন দ্রব্যাদি বিহারে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসে। বিহারের প্রধান বৌদ্ধ ভিক্ষু নতুন বছরের শুভদিনের জন্য ধর্মদেশনা দেই।সেই সাথে নতুন বছরের দিনগুলো যেন শুভাকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ হয় তার জন্য প্রার্থনা করা হয়।

ধর্মদেশনার পরই বৌদ্ধ বিহারে সকলেই ভগবানের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হয়। শুধু ভগবান নয় অনেক তাদের পূর্বপুরুষদের জাদিতেও মোম্বাতি প্রজ্বলন করা হয়।

মোমবাতি প্রজ্বলনঃ প্রধান সাংগ্রাই এর দিনের আলো শেষেই সন্ধ্যে নামলেই মারমা তরূণ-তরূণীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বিহারে চলে যাই। সাংগ্রাইকে কেন্দ্র করে প্রত্যেক বিহারেই এক নতুন সাজে সেজে যায়।বিহারে বিহারে গিয়ে তারা মোমবাতি জ্বালাতে থাকে। এরপরে তরূণ-তরূণীরা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কাছে একসাথে বসে ধর্মদেশনা শুনে।এছাড়া পরবর্তী দিনের “ড়িলংপোয়ে” এর জন্য একসাথে বসে আলোচনা করে।

“ড়িলংপোয়ে”(জুলকেলি উৎসব)ঃ প্রধান সাংগ্রাইয়ের পরেই বিভিন্ন জায়গায় “ড়িলংপোয়ে” এর আয়োজন করা হয়ে থাকে। এটি শুধু এপ্রিলের ১৫ তারিখেই নই,অনেক জায়গায় ১৬,১৭,১৮ তারিখেও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় যেন সকলেই সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারে। অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে মারমারা তাদের ঐতিহ্যবাহী “থামি(মেয়েরা)” আর লুংগি(ছেলেরা) পরে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে। খুব সকালেই স্থানীয় এলাকার তরূণ-তরূণীরা সাংগ্রাই র‍্যালী করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মারমা তরূণ-তরূণীরা “ সাংগ্রাই মা ঞিঞীই ঞাঞাই, রিগ জাঃং কাঈ পাঃ মেঃ” গান গেয়ে দলে দলে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে।

এরপরে মারমা রাজা কিংবা মারমাদের হেডম্যান(মৌজা প্রধান) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের পরই আনুষ্ঠানিক “ড়ীলং পোয়ে” শুরু হয়। মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, এরপরে তাদের এক অপরের দিকে পানী ছোড়াছুঁড়ি শুরু হয় যথক্ষন পর্যন্ত তাদের সামনে রাখা পানির পাত্রটি শেষ না হয়ে যায়। এভাবে একদলের পর আরেকদল পানী খেলতে থাকে।

মারমা তরুন-তরুণীদের পরস্পরকে পানি ছিটানোর দৃশ্য

এভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পানি খেলা ছাড়াও ওইদিন সবার হাতেই একটা করে পানির বোতল থাকে। যার যাকে মন চায় সে তাকেই পানি ছিটাতে পারবে, এতে কেউ কোন আপত্তি করে না বরং এটিকে আর্শিবাদ আর শুভ লক্ষনের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়।

পানি খেলার পরপরই মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ছেলেদের বলি খেলা, মেয়েদের দড়ি টানাটানি খেলা হয়ে থাকে। আর সবথেকে আকর্ষন হল ছেলেদের বাশঁ উঠানো(“তং তাং”) খেলা। এতে একটা লম্বা ২৫+ ফুট বাশঁ থাকে যার একদম শীর্ষে একটি বড় পরিমাণের টাকা থাকে।মোটামোটিভাবে একজনের কাধেঁ আরেকজন উঠে শীর্ষের টাকাটা নিতে হবে। মোটামোটিভাবে পাঁচজন হলেই টাকার নাগাল পাওয়া যায়।আর যে দল আগে নিতে পারবে সেই দল সেই টাকা পেয়ে যাবে। তবে অততা সহজ নয়, কারণ বাশেঁর উপরে তেল থাকে তাই যতই বাশঁ নাড়ানো হোক না কেন ততই উপর থেকে তেল পরে বাশঁকে পিচ্ছিল করতে থাকে।

বাশেঁর শীর্ষে থাকা টাকা নেওয়ার জন্য কিছু মারমা তরুনের চেষ্টা

দুপুরের পরই এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে মারমাদের ঐতিহ্যগুলোকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়। সাংগ্রাই নৃত্য সহ আরো নানা ধরনের নৃত্য এতে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া মারমা গুনী শিল্পীরা এতে অংশগ্রনণ করে বিভিন্ন মারমা গান পরিবেশন করা হয়। বর্তমান দিনে মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরই কনসার্টের আয়োজন করা হয়। এই মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর কনসার্টকে নিয়ে মারমা তরূণ-তরূণীরা তাদের নতুন “ম্রাইমা সাক্রয়” কে বরন করে নেয়।

মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মারমা তরুণীদের পরিবেশনায় ছাতা নৃত্য

মারমা শাসনব্যবস্থা

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Marma"sites.google.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১০-০৯ 
  2. "Marma"Voice of Jummaland। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  3. I, Fonkem Achankeng (২০১৫-০৯-২৮)। Nationalism and Intra-State Conflicts in the Postcolonial World (ইংরেজি ভাষায়)। Lexington Books। আইএসবিএন 9781498500265 
  4. Pain, Frederic (২০১৭-০৮-০৯)। "Towards a Panchronic Perspective on a Diachronic Issue: The Rhyme <-uiw> in Old Burmese" (PDF) (ইংরেজি ভাষায়): 424–464। আইএসএসএন 0726-8602ডিওআই:10.1080/07268602.2017.1350129 
  5. "Ethnic violence in Bangladesh: assault on minority peoples continues - Asian Studies Association of Australia"Asian Studies Association of Australia (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৭-০৮-০২। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  6. I, Fonkem Achankeng (২০১৫-০৯-২৮)। Nationalism and Intra-State Conflicts in the Postcolonial World (ইংরেজি ভাষায়)। Lexington Books। আইএসবিএন 9781498500265 
  7. "Marma"Voice of Jummaland। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  8. "Human rights violations in the Chittagong Hill Tracts: An update" (PDF)Amnesty International (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯৯১-০৯-১৩। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  9. I, Fonkem Achankeng (২০১৫-০৯-২৮)। Nationalism and Intra-State Conflicts in the Postcolonial World (ইংরেজি ভাষায়)। Lexington Books। আইএসবিএন 9781498500265 
  10. "BANGLADESH: ENSURE IMMEDIATE SAFETY AND SECURITY OF THE TWO MARMA SISTERS WITH THEIR CONSULTATION AND CONSENT AND LAUNCH INVESTIGATION INTO THE SEXUAL ASSAULT ON THEM BY MEMBERS OF BANGLADESH ARMY"Amnesty International (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৩-০৬ 
  11. "Justice hard to come by for victims of sexual violence"Dhaka Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৭-১১-২৪। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  12. "100 indigenous families at a loss"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৪-১০-২৯। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  13. "Last six Marma families evicted"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮-০৮-০৯। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৯-১৮ 
  14. Gazi, Nurun Nahar; Tamang, Rakesh (২০১৩-১০-০৯)। "Genetic Structure of Tibeto-Burman Populations of Bangladesh: Evaluating the Gene Flow along the Sides of Bay-of-Bengal" (ইংরেজি ভাষায়): e75064। আইএসএসএন 1932-6203ডিওআই:10.1371/journal.pone.0075064পিএমআইডি 24130682পিএমসি 3794028অবাধে প্রবেশযোগ্য