মারমা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মারমা
Marma
မရမာကြီး
Chimui.jgp.jpg
মারমা নৃত্য
মোট জনসংখ্যা
210,000
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চলসমূহ
 বাংলাদেশ: Bandarban, Khagrachari, Patuakhali District and Barguna Districts 157,301
 মায়ানমার: Rakhine State Unknown
 ভারত: Tripura Unknown
ভাষা
Arakanese language
ধর্ম
Theravada Buddhism
মারমা বালিকারা নববর্ষ উৎসব "সাংগ্রাই"তে জল উৎসবে

মারমা বাংলাদেশের একটি আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা। তিন পার্বত্য জেলায় তাদের বসবাস দেখা গেলেও মূল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস বান্দরবানে। ‘মারমা’ শব্দটি ‘ম্রাইমা’ থেকে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারা মিয়ানমার থেকে এসেছে বিধায় তাদের ‘ম্রাইমা’ নাম থেকে নিজেদের ‘মারমা’ নামে ভূষিত করে। মারমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষদের মতো মেয়েরাও পৈতৃক সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারী হয়। ভাত মারমাদের প্রধান খাদ্য। পাংখুং, জাইক, কাপ্যা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়। তাদের প্রধান উৎসব ও পার্বণগুলো হচ্ছে সাংগ্রাই পোয়ে, ওয়াছো পোয়ে, ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে এবং পইংজ্রা পোয়ে। বান্দরবানে মারমা লোকসংখ্যা প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে মারমারা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।

মারমাদের প্রধান প্রধান উৎসব[সম্পাদনা]

মারমাদের প্রধান প্রধান ধর্মীয় ও সামিাজিক উৎসব হচ্ছেঃ- বৌদ্ধ পূণিমা, কঠিন চিবর দান, ওয়াহ্গ্যই এবং সাংগ্রাই। মারমাদের বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান-কে সাংগ্রাই বলে।

বৌদ্ধ পূর্ণিমা[সম্পাদনা]

এই পূর্ণিমা তিথীতে মহামতি গৌতম বৌদ্ধ জন্মগ্রহণ, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এটি একটি ধর্মীয় উৎসব।

কঠিন চীবর দান[সম্পাদনা]

তুলা থেকে সুতা তৈরী করে তা রং করে এক রাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের পরিধানের চীবর তৈরী করা হয় বলে একে কঠিন চীবর বলে।

ওয়াহ্গ্যই[সম্পাদনা]

এটিও একটি ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে মারমাদের মারমারা গৌতম বৌদ্ধদের মহা চুলকে পূজা ও উৎসর্গ করার জন্য ফানুষবাতি উড়ানো হয়।

সাংগ্রাই[সম্পাদনা]

সাংগ্রাইয়ের তাৎপর্যঃ পৃথিবীর সকল জাতির মতন করে মারমারা গ্রেগরিয়ান ইংরেজি ক্যালেন্ডার ছাড়াও নিজস্ব একটা ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করে, মারমাদের ক্যালেন্ডার অবশ্য বর্মী ক্যালেন্ডারের কে অনুসরণ করেই করা হয়। মারমাদের বর্ষপঞ্জিকাকে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” বলা হয়। “ম্রাইমা সাক্রঃয়” এর পুরনো বছরের শেষের দুই দিন আর নতুন বছরের প্রথম দিনসহ মোট ৩দিন কে মারমারা সাংগ্রাই হিসেবে পালন করে থাকে। আগে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” অনুযায়ী এই ৩ দিন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে পড়লেও এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে মিল রেখে এপ্রিলের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে পালন করা হয়। ১৩ তারিখের সকালে পাঃংছোয়াই(ফুল সাংগ্রাই),১৪ তারিখে প্রধান সাংগ্রাই আর ১৫ তারিখে পানি খেলার সাথে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোও অনুষ্ঠিত হয়।

সাংগ্রাই এর প্রধান আকর্ষন হল পানি খেলা যেটিকে মারমারা বলে “ড়ি লং পোয়ে” । সাংগ্রাইয়ের পানি খেলা শুধুমাত্র মারমাদের নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া আর চীনের দাই জাতিগোষ্ঠীরাও এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান করে থাকে। মায়নামারে এই ধরনের অনুষ্ঠানকে “থিনগন” আর থাইল্যান্ড ও লাওসে এই অনুষ্ঠানকে “সংক্রান” বলে। থাই ভাষায় “সংক্রান” এর অর্থ হল পরিবর্তন। সাংগ্রাই আসলেই পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়াকেই বোঝায়। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে নতুন জুম চাষের মৌসুমের শুরুও সাংগ্রাই-এর পরেই হয়ে থাকে।শুধু জুম চাষই নয় মারমারা মাঘী পূর্ণিমার পর থেকে সাংগ্রাই এর আগ পর্যন্ত নতুন বিয়েই করে না অর্থাৎ সাংগ্রাইকে মারমারা নতুন বছরের শুরুসহ পুরনো সব জিনিসকে ঝেরে ফেলে নতুন করে শুরু করাকেই বোঝায়। আর তাই মারমারা এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্শীবাদ আর শুভাকাঙ্কার আশায় নতুন বছর উদযাপন করে থাকে।।

সাংগ্রাইয়ের পূর্ব প্রস্তুতিঃ

সাংগ্রাই এপ্রিলের ১৩ তারিখ থেকে শুরু হলেও মারমাদের মাঝে সাংগ্রাই নিয়ে উদ্দীপনা জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়। মারমা গ্রামের গিন্নীরা সাংগ্রাই নিয়ে নানা পরিকল্পনা করতে থাকে। তারা নতুন করে তাদের ঘরগুলো সাজাতে থাকে। মাটির ঘরগুলোকে আবার নতুন করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়, মাচাং আর ছনের ঘরগুলোতে পুরনো ছন বাদ দিয়ে পাহাড় থেকে নতুন ছন এনে বাড়িতে লাগানো হয়। এছাড়া জুম থেকে পাওয়া চাউল নানা রকমের পিঠার জন্য রেখে দেওয়া হয়।।

মারমা শুকর ব্যবসায়ীরা ৩ মাস আগে থেকেই নতুন নতুন শুকরের ছানা পালতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর বাজারে বিক্রি করতে পারে। মারমা শিকারীরা সাংগ্রাইয়ের আগে তাদের অস্ত্র গুলো গুছাতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর আগেই বড় রকমের হরিণ,গুইসাপ,কচ্ছপসহ আরো নানা রকমের পশু-পাখী শিকার করতে পারে।এছাড়া অন্যন্য ব্যাবসায়ীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে তাদের ব্যবসায়ী পরিকল্পনা বানাতে থাকে।

সেই সাথে তরূণ-তরূণীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের চিন্তাভাবনা করতে থাকে। কী করে সাংগ্রাই কে আরো আকর্ষনীয় করা যায় আর নতুন বছরের প্রথম দিনের উদযাপনকে কী আরো সুন্দর করা যায়?? মারমা তরূনীরা দর্জিদের কাছে ছুটে যায় যেন তার সাংগ্রাইয়ের “থামি(মারমা মেয়েদের পোশাক)” টী সব থেকে সুন্দর আর ব্যতিক্রমী হয়। এছাড়া যুবক- যুবতীরা তাদের বিয়ের তারিখগুলোও সব সাংগ্রাইয়ের পরে ঠিক করে রাখে। মোটামোটিভাবে জানুয়ারির পর থেকে সাংগ্রাইকে ঘিরে সকল স্তরের মারমারা নানা রকমের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে।

পাঃংছোয়াই(ফুল সাংগ্রাই)ঃ “পাঃংছোয়াই” এর অর্থ ফুল ছিঁড়ার দিন।এটি সাধারণত ১২ এপ্রিলের রাতেই হয়ে থাকে।শীতের পর বসন্তের আগমনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতেও বসন্তের ছোঁয়া লাগে, ফলে পাহাড়ে দেখা যায় নানা ফুলের সমারোহ।। নানা রকমের ফুলে গ্রামের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোতে ছেয়ে যায়। আর এই ফুলগুলো সাংগ্রাইয়ের আগে ছেঁড়া হয় না এক্কেবারে “পাঃংছোয়াই” এর রাতেই পাহাড় থেকে ফুলগুলো ছিঁড়ে বাড়িগুলোতে সাজানো হয়। পাহাড়ে অনেক ফুল থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ফুল আছে যেগুলো দিয়েই বাড়িঘর গুলো সাজানো হয়। তন্মধ্যে “সাংগ্রাই পাঃং” নামে সাদা রংঙের ফুলটিই সবথেকে প্রিয়। সবাই মূলত এই ফুলকে প্রধান করেই “পাঃংছোয়াই” এর পরের দিনে গিন্নারা তাদের ঘরগুলো সাজাতে থাকে। এই ফুল ছেঁড়ার কাজটি মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরাই করে থাকে।এই “পাঃংছোয়াই” কে কেন্দ্র করে মারমা তরূন-তরূণীরা এর আগের রাতে নানা রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেক সারারাত জেগে পিঠা বানায়, আবার অনেকে মারমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলার ব্যবস্থা করে, অনেকে মারমা নাচ-গান করে থাকে,মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরা সারারাত জেগে থাকার জন্য নানা কিছু করে। এরপরে আলো ফোটার আগেই একদম ভোর-সকালে দলে দলে পাহাড়ে গিয়ে “সাংগ্রাই পাঃং” তুলে নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দেই।।

ঘিন্নিরা সকাল হলেই সুতা দিয়ে ফুলগুলো সাজাতে থাকে। প্রথমে ভগবান বুদ্ধকে ফুল পূজা করে নিয়ে বাড়ির প্রতিটি দরজাগুলোকে “সাংগ্রাই পাঃং” দিয়ে সাজানো হয়। বাড়ির দরজায় সাজানো ফুলগুলো দিয়েই বোঝতে পারা যায় সাংগ্রাই অর্থাৎ নতুন বর্ষবরন শুরু হয়ে গেছে।

শুধু তরূন-তরূণীরাই নই মারমা ছোট ছেলেমেয়েদেরও এই পাঃংছোয়াই নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ থাকে। কিন্তু মারমাদের বয়োজষ্ঠ্যরা ছোট ছেলেমেয়েদেরকে সবসময় “ফ্রুজুমা”(মারমা ডাইনী) এর ভয় দেখিয়ে রাখে। এমনকি এই “পাঃংছোয়াই” নিয়ে অনেক কিচ্ছাও আছে। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল ফ্রুজুমা-র ফাঁদে আটকে যাওয়া। ফ্রুজুমা “সাংগ্রাই পাঃং” এর লোভ দেখিয়ে কোনএকজনকে দলছুট করে এমন গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাবে যে তা থেকে দিনের আলো ফোটার আগে কখনোই আর মুক্তি পাওয়া যাবে না কারন ফাঁদে পড়ার পর যেখানেই যাবে শুধু জংগল জংগলই পাবে। আর সাংগ্রাই পাঃং সাধারণত সকালের আলো ফোটার আগেই ছিঁড়তে হয়। এই কিচ্ছা দিয়েই মারমা মা-বাবারা তাদের সন্তানদের আগলে রাখে।

সাংগ্রাই জীঃঈ (সাংগ্রাই বাজার)ঃ “পাঃংছোয়াই” এর দিনেই অর্থাৎ ১৩ তারিখেই সাংগ্রাই জীঃঈ হয়ে থাকে। সাংগ্রাইকে উপলক্ষ করে অনেক বড় হাট বসে। হাটে সাংগ্রাইয়ের জন্য সকল প্রয়োজনীয় জিনিসই পাওয়া যাই। গিন্নীরা সাংগ্রাইতে বিহারে পাঠানোর জন্য অনেক ভালো ভালো খাবার কিনে। এছাড়া গৌতম বুদ্ধেকে স্নানের জন্য পবিত্র পানি, নারকেল, চীনা কাগজ, মোমবাতি,আগরবাতি মোটামোটিভাবে বিহারে পাঠানোর জন্য যার যেরকম সামর্থ্য সেই অনুযায়ী কিনে।

এছাড়া সাংগ্রাইতে ছোট-বড় সবারই মাঝে নতুন জামা থাকবেই। আর ছোট্ট বাচ্চারা সাংগ্রাইতে পানি মারার জন্য পানির বোতল, পানি মারার নানা রকমের প্লাস্টেকের অস্ত্রও কিনে রাখে।



প্রধান সাংগ্রাইঃ

প্রধান সাংগ্রাই বর্তমানে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিলের ১৪ তারিখেই পালন করা হয়। মারমা গৃহিণীরা(“ইংথসাং”) ভালো ভালো খাবার(“ছোয়াঈ”-বিহারে যে খাবার পাঠানো হয় তাকে “ছোয়াঈ” বলে) আর পিঠা নিয়ে বিহারে যায়। শুধু নিজেদের বিহার ছাড়াও আশেপাশের বিহারেও “ছোয়াঈ” পাঠানো হয়। “ছোয়াঈ” শুধু ভগবানের উদ্দেশ্যে নয়, নিজেদের আত্নীয়দের মাঝে যারা উপোসথ শীল পালন করে তাদের উদ্দেশ্যেও পাঠানো হয়। বিহার ছাড়াও মারমা বিভিন্ন দেবতাদেরকেও পূজা দেওয়া হয়। এছাড়া গ্রামের পরিচিত বয়োজৈষ্ঠদেরকেও খাবার আর পিঠা পাঠানো হয়।

আর মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বয়োজৈষ্ঠ্যদের স্নান করাতে যায়। প্রত্যেক পরিবারের বয়োজৈষ্ঠ্যরা গোসল শেষে তরূন-তরূণীদেরকে সাংগ্রাই এর সেলামি দেই। সেই সাথে তরূন-তরূণীরা বছরের শুরুতে বয়োজৈষ্ঠ্যদের কাছে নতুন বছরের আর্শীবাদ নিয়ে আসে। শুধু গোসলই নয় প্রতি পরিবার থেকে মারমা তরূণ-তরূণীদের কিছু না কিছু খেয়ে আসতে হয়।

বুদ্ধ স্নান আর ধর্মদেশনাঃ

প্রধান সাংগ্রাই তে বিহারে যে ভগবান বুদ্ধ আছে তাদেরকে পবিত্র পানি দিয়ে গোসল করানো হয়। বুদ্ধকে স্নানস্কৃত পানিকে মারমারা খেয়ে থাকে কারন মারমাদের বিশ্বাস এই বুদ্ধ স্নানস্কৃত পানি তাদের শরীরে সকল রোগমুক্তির অবসান করাবে।

আর এর পরেই ধর্মদেশনা হয়। এতে এলাকার সকল পুরুষ-মহিলা যোগ দেই। সকল পরিবারেই চাল-নারকেল-চীনা কাগজ-মোমবাতি বিভিন্ন দ্রব্যাদি বিহারে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসে। বিহারের প্রধান বৌদ্ধ ভিক্ষু নতুন বছরের শুভদিনের জন্য ধর্মদেশনা দেই।সেই সাথে নতুন বছরের দিনগুলো যেন শুভাকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ হয় তার জন্য প্রার্থনা করা হয়।


ধর্মদেশনার পরই বৌদ্ধ বিহারে সকলেই ভগবানের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হয়। শুধু ভগবান নয় অনেক তাদের পূর্বপুরুষদের জাদিতেও মোম্বাতি প্রজ্বলন করা হয়।

মোমবাতি প্রজ্বলনঃ প্রধান সাংগ্রাই এর দিনের আলো শেষেই সন্ধ্যে নামলেই মারমা তরূণ-তরূণীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বিহারে চলে যাই। সাংগ্রাইকে কেন্দ্র করে প্রত্যেক বিহারেই এক নতুন সাজে সেজে যায়।বিহারে বিহারে গিয়ে তারা মোমবাতি জ্বালাতে থাকে। এরপরে তরূণ-তরূণীরা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কাছে একসাথে বসে ধর্মদেশনা শুনে।এছাড়া পরবর্তী দিনের “ড়িলংপোয়ে” এর জন্য একসাথে বসে আলোচনা করে।

“ড়িলংপোয়ে”(জুলকেলি উৎসব)ঃ প্রধান সাংগ্রাইয়ের পরেই বিভিন্ন জায়গায় “ড়িলংপোয়ে” এর আয়োজন করা হয়ে থাকে। এটি শুধু এপ্রিলের ১৫ তারিখেই নই,অনেক জায়গায় ১৬,১৭,১৮ তারিখেও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় যেন সকলেই সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতে পারে। অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে মারমারা তাদের ঐতিহ্যবাহী “থামি(মেয়েরা)” আর লুংগি(ছেলেরা) পরে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে। খুব সকালেই স্থানীয় এলাকার তরূণ-তরূণীরা সাংগ্রাই র‍্যালী করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মারমা তরূণ-তরূণীরা “ সাংগ্রাই মা ঞিঞীই ঞাঞাই, রিগ জাঃং কাঈ পাঃ মেঃ” গান গেয়ে দলে দলে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে।

এরপরে মারমা রাজা কিংবা মারমাদের হেডম্যান(মৌজা প্রধান) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের পরই আনুষ্ঠানিক “ড়ীলং পোয়ে” শুরু হয়। মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, এরপরে তাদের এক অপরের দিকে পানী ছোড়াছুঁড়ি শুরু হয় যথক্ষন পর্যন্ত তাদের সামনে রাখা পানির পাত্রটি শেষ না হয়ে যায়। এভাবে একদলের পর আরেকদল পানী খেলতে থাকে।

মারমা তরুন-তরুণীদের পরস্পরকে পানি ছিটানোর দৃশ্য

এভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পানি খেলা ছাড়াও ওইদিন সবার হাতেই একটা করে পানির বোতল থাকে। যার যাকে মন চায় সে তাকেই পানি ছিটাতে পারবে, এতে কেউ কোন আপত্তি করে না বরং এটিকে আর্শিবাদ আর শুভ লক্ষনের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়।

পানি খেলার পরপরই মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ছেলেদের বলি খেলা, মেয়েদের দড়ি টানাটানি খেলা হয়ে থাকে। আর সবথেকে আকর্ষন হল ছেলেদের বাশঁ উঠানো(“তং তাং”) খেলা। এতে একটা লম্বা ২৫+ ফুট বাশঁ থাকে যার একদম শীর্ষে একটি বড় পরিমাণের টাকা থাকে।মোটামোটিভাবে একজনের কাধেঁ আরেকজন উঠে শীর্ষের টাকাটা নিতে হবে। মোটামোটিভাবে পাঁচজন হলেই টাকার নাগাল পাওয়া যায়।আর যে দল আগে নিতে পারবে সেই দল সেই টাকা পেয়ে যাবে। তবে অততা সহজ নয়, কারণ বাশেঁর উপরে তেল থাকে তাই যতই বাশঁ নাড়ানো হোক না কেন ততই উপর থেকে তেল পরে বাশঁকে পিচ্ছিল করতে থাকে।

বাশেঁর শীর্ষে থাকা টাকা নেওয়ার জন্য কিছু মারমা তরুনের চেষ্টা

দুপুরের পরই এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে মারমাদের ঐতিহ্যগুলোকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়। সাংগ্রাই নৃত্য সহ আরো নানা ধরনের নৃত্য এতে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া মারমা গুনী শিল্পীরা এতে অংশগ্রনণ করে বিভিন্ন মারমা গান পরিবেশন করা হয়। বর্তমান দিনে মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরই কনসার্টের আয়োজন করা হয়। এই মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর কনসার্টকে নিয়ে মারমা তরূণ-তরূণীরা তাদের নতুন “ম্রাইমা সাক্রয়” কে বরন করে নেয়।

মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মারমা তরুণীদের পরিবেশনায় ছাতা নৃত্য

আরও দেখুন[সম্পাদনা]