হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(হিন্দুধর্ম ও ইসলাম থেকে পুনর্নির্দেশিত)

হিন্দু–মুসলিম সম্পর্ক অনুসন্ধান ও গবেষণা শুরু হয় ৭ম শতকের প্রথম দিকে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামিক প্রভাব বিস্তারের সূচনা লগ্ন থেকে। বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম ধর্মের দুটি হলো হিন্দুধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম[১]। হিন্দুধর্ম, ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু মানুষের জীবনের সামাজিক-ধর্মীয় উপায়। হিন্দু ধর্ম প্রকৃতপক্ষে একেশ্বরবাদী হলেও এখানে বহু দেবদেবীর উপাসনা রয়েছে। এই দেবদেবী এক ঈশ্বরের বিভিন্নরূপ বা গুণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ধর্মে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ নাম ”ও৩ম” (সংস্কৃত: ॐ) ‍বলা হয়। ইসলাম ধর্ম যথাযথভাবে একেশ্বরবাদী ধর্ম যেখানে একমাত্র উপাস্য হলেন আল্লাহ (আরবি: الله "ঈশ্বর": দেখুন ইসলাম ধর্মে ঈশ্বর)। সর্বশেষ ইসলামি নবী মুহাম্মাদ, যিনি কুরআনের মাধ্যমে মুসলমানদের ইসলামি রীতি-নীতি শিক্ষা দেন।

তুলনামুলক সাদৃশ্য ও পার্থক্য চিহ্নিতকরণ[সম্পাদনা]

ঈশ্বর সম্পর্কিত ধর্মতত্ত্ব ও ধারণা[সম্পাদনা]

ইসলামে কঠিনভাবে একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করা হয় এবং ঈশ্বরের (আল্লাহর) একক অস্তিত্ব ও পূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্বাস করা ইসলামের একটি মৌলিক শর্ত যাকে তাওহিদ বা একত্ববাদ বলে।

অপরদিকে, হিন্দুধর্ম ঈশ্বরকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। বহুদেবতার মাঝে একাত্ববাদের ধারণাটি ঈশ্বর সম্বন্ধে হিন্দুধর্মে একটি প্রাচীন দর্শন। হিন্দু শাস্ত্রগুলোতে (যেমন: বেদ, উপনিষদে) ঈশ্বরের একক অস্তিত্বের কথাই বলা হয়েছে।

ফেরেশতাগণ - দেবদেবীগণ[সম্পাদনা]

অন্যান্য ইব্রাহিমীয় ধর্মের মতই ইসলাম ধর্মও ফেরেশতার অস্তিত্বে বিশ্বাসী যারা হলেন আল্লাহর সৃষ্ট স্বর্গীয় দূত। ইসলাম ধর্মে আল্লাহ ব্যতিত কোন কিছুর উপাসনা করা নিষিদ্ধ। ইসলাম ধর্মে ইবলিশ হল জ্বিন প্রজাতি হতে জন্ম নেয়া, মানুষের মনে কুমন্ত্রণা প্রদানকারী শয়তান শ্রেণীর নেতা।

অপরদিকে হিন্দুধর্মে ঈশ্বরের ধারণা আব্রাহামীয় ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক নয়। ব্রড বলেন যে আব্রাহামীয় ধর্মে “স্রষ্টা, জীব- অস্তিত্বের থেকে একটি পৃথক সত্ত্বা”। কিন্তু হিন্দুমতে ঈশ্বর, ব্রহ্মাণ্ড, মানুষ ও অন্যান্য জীবজগৎ একই সূত্রে গ্রথিত। ঈশ্বর আত্মারূপে সকল জীবের মাঝেই অবস্থান করেন। এই আত্মা শাশ্বত ও পরম সত্তা।[২][৩] সেই ঈশ্বরের শক্তির বিভিন্ন প্রকাশকে দেবতা বলা হয়। হিন্দুধর্মে দেবতা পূজার দ্বারা সমস্ত শক্তির রূপক সাধানাকে আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ সমস্ত শক্তি এক ঈশ্বর হতে প্রকাশিত।

ইসলামে শয়তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসের মতই হিন্দুধর্মেও অসুরে বিশ্বাস করা হয়। শ্রীমদ্ভাগবতগীতার মতে জীবজগতের সকল প্রাণীর মধ্যেই সাত্ত্বিক প্রবৃত্তি ও আসুরিক প্রবৃত্তি বিদ্যমান।[৪][৫] গীতার ষোড়শ পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে যে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও সম্পূর্ণ তামসিক এই দুই চরিত্রই বিরল। অধিকাংশ মানুষই আসলে বহু গুণাদোষের সন্নিবেশ।.[৪] জিনি ফাউলারের মতে কামনা বাসনা লোভ আবেগকে গীতায় সাধারণ জীবনের অঙ্গ বলেই ধরা হয়েছে। কিন্তু যখন তারা কাম ক্রোধ হিংসা মাৎসর্য ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিতে বদলে যায় তখন সাধারণ মানবিক প্রবৃত্তিগুলোর আসুরিকতায় উত্তরণ ঘটে।[৪][৫]

মনীষীগণ - নবীগণ[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্মে নবী হলেন পৃথিবীতে বিভিন্ন যুগে এবং স্থানে কোন জাতির জন্য সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মনোনীত পথপ্রদর্শক যিনি উক্ত জাতিকে সৃষ্টিকর্তা মনোনীত নির্দেশ ও বিধিবিধান প্রদানের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ধর্মীয় উৎস অনুসারে সৃষ্টিকর্তা মোট এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীরাসূল পাঠিয়েছেন যাদের মাঝে প্রথম নবী হলেন আদম এবং সর্বশেষ নবী ও রাসূল হলেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম), যাকে তার সময়কাল থেকে পরবর্তী সকল যুগের ও স্থানের মানুষের জন্য চূড়ান্ত নবী ও রাসূল হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।

মহাপুরুষদের মত হিন্দু ধর্মেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্কারক এসেছে যাদের মাধ্যমে হিন্দুধর্ম ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। এদেরকে মনীষী বা মুনি বলা হয়।

গ্রন্থাবলি[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মের মূল ও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে বেদ। বেদকে ঈশ্বরীয় বাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। সনাতনীরা বেদকে "অপৌরুষেয়" ("পুরুষ" দ্বারা কৃত নয়, অলৌকিক) এবং "নৈর্বক্তিক ও রচয়িতা-শূন্য" (যা সাকার নির্গুণ ঈশ্বর-সম্বন্ধীয় এবং যার কোনও রচয়িতা নেই) মনে করেন। সৃষ্টির আদিতে ঈশ্বর চারজন ঋষির হৃদয়ে বেদ প্রকাশ করেন। বেদকে শ্রুতি (যা শ্রুত হয়েছে) সাহিত্যও বলা হয় কারণ পূর্বে বেদ লিখিত কোনো বই বা পুস্তক আকারে ছিল না, তা বৈদিক ঋষিরা মুখে মুখে মন্ত্র উচ্চারণ করে তাদের শিষ্যদের শোনাতেন আর শিষ্যরা শুনে শুনেই বেদ অধ্যায়ন করতেন। উপনিষদ, গীতা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থগুলোর মাঝে অন্যতম। আর মহামনীষীদের বাণীগুলোকে যে গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সেগুলোকে স্মৃতি বলা হয়।[৬][৭][৮]

ইসলামধর্মে কুরআন হল প্রধান ধর্মগ্রন্থ যাকে ঈশ্বরের বাণী হিসেবে গণ্য করা হয়[৯], যেটি ঈশ্বরের কাছ থেকে স্বর্গীয় দুত বা ফেরেশতা জিবরাঈল এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রধান নবী মুহাম্মাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর (ইসলাম ধর্মে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নাম) বাণী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়া, হিন্দুধর্মের স্মৃতির মত ইসলাম ধর্মেও নবী মুহাম্মাদ এর বাণীসমূহ যা হাদীস নামে পরিচিত, তা প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিবরণ অনুযায়ী মুহাম্মাদ -এর মৃত্যূর পর বিভিন্ন গ্রন্থ আকারে উৎসসহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই গ্রন্থগুলোও ইসলামি বিধিবিধানের উৎস।

স্থাপত্য এবং নামকরণ[সম্পাদনা]

আদর্শ ও নৈতিক গুনাবলি[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মে মানবজীবনের উদ্দেশ্য চারটি। এই চারটি উদ্দেশ্যই পুরুষার্থ নামে পরিচিত।[১০] চারটি পুরুষার্থের নাম হল:

  • ধর্ম: "(ধর্মীয় ও সামাজিক) নীতিবোধ, আধ্যাত্মিক ও আনুষ্ঠানিক কর্তব্যকর্ম।
  • অর্থ: "(জাগতিক ও অর্থনৈতিক) প্রগতি।"
  • কাম: "(পার্থিব) সুখ।"
  • মোক্ষ: "(আধ্যাত্মিক) মুক্তি।"

ধর্মীয় আচার-রীতিনীতি, প্রার্থনা ও উপবাস পদ্ধতি[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মের অনুসারীগণ দৈনিক নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে তাদের উপাস্য দেব-দেবীগণের প্রতিমূর্তির মাধ্যমে অথবা প্রতিমাবিহীন উপাসনা ও ভক্তিমূলক পূজা করে থাকে। তাদের দৈনন্দিন উপাসনার মধ্যে আরেকটি প্রচলিত রীতি হল অগ্নির মাধ্যমে উপাসনা, এতে অগ্নিবেদীতে ঘি তুষ প্রভৃতি আহুতি দিয়ে স্রষ্টার নিকট দেহ ও মনের আত্মিক মুক্তি সন্ধান করা হয়। এছাড়াও নিত্য তিনবার, কারো মতে দ্বিসন্ধ্যায় ঈশ্বর এর কাছে পার্থনা ও ধ্যান করা আবশ্যক॥ অন্যদিকে ইসলাম ধর্মে সালাত বা নামাজের মাধ্যমে প্রতিদিন পর্যায়ক্রমিকভাবে পাঁচবার আল্লাহ বা ঈশ্বরকে স্মরণ করা হয়।

খাবার[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্ম শূকর ছাড়া[১১] অন্যান্য চারণপশুর মাংস খাওয়া অনুমোদন করে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পুরণ হতে হবে যা সুরা মায়েদাহতে দেওয়া আছে, প্রাণীটি চতুষ্পদী ও তৃণভোজী হতে হবে এবং তা আল্লাহর নামে জবাই হতে হবে জবাইয়ের সময় কণ্ঠস্থ রগ (শিরা,রক্তনালিকা) বিচ্ছিন্ন করে রক্ত প্রবাহিত করতে হবে, তবেই তা হালাল হবে।

বৈদিক সনাতন ধর্মের অনুসারীদের সাত্ত্বিক আহারী হতে বলা হয়েছে। বৈদিক সনাতন মতে প্রাণীহত্যা ও প্রাণীজ মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। যদিও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শ্রেণীতে এটি নিয়ে দ্বিমত থাকার কারণে অনেকেই প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণ করে, বিশেষত ভারতের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে। পদ্মপুরাণে "সুরাপান"-কে দ্বিতীয় মহাপাপ হিসেবে ধরা হয়। ইসলামেও মদ্যপান স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। গো মাংস ইসলামে বৈধ হলেও সনাতনধর্মাবলম্বীদের কাছে গোমাংস ভক্ষণ একটি অতি গর্হিত অপরাধ। কারণ সনাতন ধর্মে গরুকে সমৃদ্ধির প্রতীক এবং দুগ্ধদানের কারণে দুগ্ধদাত্রী মায়ের সমতুল্য মনে করা হয়। ইসলামে মানবীয় সম্পর্কের সাথে অন্যান্য জীবের সম্পর্কের স্পষ্ট পার্থক্য করা হলেও হিন্দুধর্মে মানব, প্রাণী ও উদ্ভিদ সহ সকল জীবকে ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়।

একজীবন - পুনরায় দেহ ধারণ(পুনর্জন্ম)[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্মমতে মানবজীবন একটাই ও একবারই আসে। এতে পুনরায় দেহ ধারণ বলে কিছু নেই। শুধু কিয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে ও বিচার করা হবে। জীবিত থাকা অবস্থায় কৃতকর্মের উপর ভিত্তি করে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে প্রতিদান দেওয়া হবে যা অনন্তকালের জন্য প্রাপ্য হবে।

অন্যদিকে হিন্দুধর্মমতে, মানুষ মৃত্যুর পর কর্মফল ভোগের জন্য পুনরায় দেহ ধারণ করে পৃথিবীতে আসে। এই ধারণা পুনর্জন্ম নামে পরিচিত। মানুষ বা প্রাণীর শুধু দেহের মৃত‍্যু হয়, আত্মার নয় কারণ সনাতন বা হিন্দুধর্মানুযায়ী জীবের আত্মা চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর বা নিত্য পদার্থ। এবং মোক্ষ প্রাপ্তির মাধ্যমে জন্মচক্রের অত্যন্ত(অতি+অন্ত) সমাপ্তি ঘটে।

সুফিবাদ ও হিন্দুধর্ম[সম্পাদনা]

আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া তার হিন্দুসিয়াত ওয়া তাসুর বইতে বলেন, আরব ও পাশ্চাত্য বহু একাডেমিকের মতে, ইবনে আরাবী, জালালুদ্দিন রুমি, বায়োজিদ বোস্তামি, আব্দুল কাদির জিলানি, মনসুর হাল্লাজ সহ আরও বহু প্রাথমিক সময়ের সুফি সাধক ইন্দো-ইউরোপীয় অর্থাৎ ভারতীয়, ইরানীয় ও পাশাপাশি গ্রিক ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মদর্শনের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত ছিলেন, এই দাবির পক্ষে যেসব একাডেমিক, তারা হলেন, আল বিরুনি, ইহসান ইলাহী জহির, আনওয়ার আল-জুন্দি, উইলিয়াম জোন্স, আলফ্রেড ক্র্যামার, রোজেন, গোল্ডজিহার, মোরেনো, রবিন হর্টন, মনিকা হর্স্টমান, রেনোল্ড নিকোলসন, রবার্ট চার্লস জাহনার, ইবনে তাইমিয়া, মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান আজমী ও আলি জায়ুর।[১২]

আল বিরুনি তার তাহক্বীক মা লিলহিন্দ মিন মাকুলাত মাকুলাত ফী আলিয়াক্বল'আম মারযুলা (ভারতের বক্তব্য নিয়ে সমালোচক গবেষণাঃ যৌক্তিকভাবে গ্রহণীয় নাকি বর্জনীয়) বইয়ে হিন্দুধর্মের কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে সুফিবাদের মিল দেখিয়েছেন, আত্মা]র সাথে রুহ, তানাসুখের সাথে পুনর্জন্ম, ফানাফিল্লাহর সঙ্গে মোক্ষ, ইত্তিহাদের সাথে জীবাত্মায় পরমাত্মায় মিলন, হুলুলের সাথে নির্বাণ, ওয়াহদাতুল উজুদের সাথে বেদান্ত, সাধনার সঙ্গে মুজাহাদা।[১২]

সুফি ধর্মবিদ মার্টিন লিংস বলেছেন,

রাজকুমার দারা শিকো (মৃত্যু ১৬১৯) ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সুফি মতাবলম্বী পুত্র। তিনি বলেছিলেন, সুফিবাদ ও হিন্দুদের অদ্বৈত বেদান্তের মধ্যে শুধু পারিভাষিক পার্থক্য ছাড়া বাকি সবই এক।[web ১]


জার্মান বংশোদ্ভূত ভারতবিদ মনিকা বোহ'ম-তেতেলবাখ বা মনিকা হর্স্টম্যান দাবি করেন যে, পাচটি যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করা যায় যে সুফিবাদের উৎস হল ভারত ও হিন্দুধর্ম, যেগুলো হলোঃ প্রথমত, অধিকাংশ প্রাথমিক সুফি ছিল অনারব, যেমন ইব্রাহিম বিন আদহাম, ও শাকিক আল বলখি, বায়েজিদ বোস্তামি, ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায আল-রাযী, দ্বিতীয়ত, সুফিবাদ প্রথম উৎপত্তি ও বিকাশ লাভ করে ভারতের নিকটবর্তী ইরানের বর্তমান খোরাসান (পূর্বনাম পার্থিয়া, যাকে গ্রিকরা ডাকতো আরিয়ানা বা আর্যদের অঞ্চল নামে) প্রদেশে, তৃতীয়ত, ইসলাম আগমনের পূর্বে ইরানের পার্শ্ববর্তী বর্তমান তুর্কিস্তান ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধর্ম ও সংষ্কৃতির মিলনকেন্দ্র, চতূর্থত, মুসলিমরা নিজেরাই তাদের ধর্মে ভারতীয় প্রভাবের কথা স্বীকার করে, পঞ্চমত, প্রথম সুফিবাদ বা ইসলামী রহস্যবাদ এর অভ্যাস ও পদ্ধতির দিক থেকে ভারতীয় ছিল, কোন কারণ ছাড়াই নিজেকে পূর্ণরূপে সপে দেওয়া এবং নিজেদের সফরকে নির্জনতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য রহস্যবাদকে ব্যবহার করা এবং একে মহিমান্বিত করে তাকে ব্যবহার করা হল মূলত ভারতীয় মতবাদ হতে উৎপন্ন।[১২]

ওয়াহদাত আল-উজুদের সূফী ধারণা অদ্বৈত বেদান্তে দাবি করা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছাকাছি।[১৩] জিয়াউর রহমান আজমি দাবি করেন, ওয়াহাদাতুল উজুদের উৎপত্তি হিন্দুধর্মের বেদান্ত দর্শন থেকে, যা ইবনে আরাবি ভারত সফরের পর তার মক্কা বিজয় গ্রন্থে লিখেছেন, যা খলীফা আল মামুনের শাসনামলে আরবিতে অনূদিত হয় এবং মনসুর হাল্লাজ অসংখ্যবার ভারত সফরের সময় বিভিন্ন গ্রন্থে এই ধারণার কথা লিখেছেন।[১২] ধ্যানরত অবস্থায়, হাল্লাজ উচ্চারণ করতেন "أنا الحق" ("আনাল্ হাক্ক") "আমিই পরম সত্য", যা তিনি নিয়েছিলেন ভারত ভ্রমণের সময় মহাবাক্য দর্শনের একটি বাক্য "অহম ব্রহ্মাস্মি" (अहम् ब्रह्मास्मि) বা "আমিই ব্রাহ্মণ বা পরমাত্মা" থেকে।[১৪]

হিন্দুধর্মের ভক্তিবাদ, ইন্দো-ইউরোপীয় বৈরাগ্যবাদ ও আঞ্চলিক মুনি, ঋষি, ফকির তথা বাউল দর্শন সুফি মতবাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট।

সুফি ইসলামে ফানার ধারণাকে হিন্দুধর্মের সমাধির সাথে তুলনা করা হয়েছে।[১৫]

বায়েজিদ বোস্তামী ইসলামের সুফি সংস্করণে মোক্ষনির্বাণ তত্ত্বকে বাক্বা নামে আমদানি করেছেন।[১৬]

সুফিবাদের মুরাকাবাকে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের ধ্যানের সাথে তুলনা করা হয়।[১৭] গোল্ডজিহার ও নিকোলসন মনে করেন যে, সুফিরা তাদের জুব্বা পরার রীতি বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে, যাকে সুফিরা ইসলামী নবী মুহাম্মাদের আদর্শ বলে দাবি করে থাকে।[১৭]

হিন্দুধর্মের মতো সুফিগণও পুনর্জন্মকে সমর্থন করে থাকে।

ভারতে মুসলিম সুফির পাশাপাশি হিন্দু সুফি সাধকগণও বিদ্যমান রয়েছে।

বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের অভিমত[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্ম সম্পর্কে মুসলিম বিজ্ঞ ব্যক্তিগণের অভিমত[সম্পাদনা]

জিয়াউর রহমান আজমী তার ফুসুলুন ফি আদিয়ানিল হিন্দি, আল-হিনদুসিয়াতু, ওয়াল বুজিয়াতু, ওয়াল জাইনিয়াতু, ওয়াস সিখিয়াতু ও আলাকাতুত তাসাওউফি বিহা (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্ম তথা ভারতীয় ধর্মসমূহের সমীক্ষা ও সুফিবাদের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক') গ্রন্থে বলেন, ভারতে মহেঞ্জোদারোতে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কোল জাতি বাস করতো, তুরানিরা এসে তাদের পরাভূত করে তাদের সাথে মিশ্রিত হলে দ্রাবিড় জাতির উদ্ভব হয়, যারা সিন্ধুতে মহেঞ্জোদারোহরপ্পা শহরে নিবাস তৈরি করে এবং এরপর তা থেকে দক্ষিণ ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, এবং তারা তাদের ভাষা অনুযায়ী কন্নড় মালয়ে তামিল ও তেলেগু এই চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় কয়েক শতক ধরে তারা সিন্ধুনদের পূর্বদিক থেকে আসা আর্যদের সাথে সংঘর্ষ চালিয়ে যায়। একপর্যায়ে আর্যরা বিজয় লাভ করলে দ্রাবিড়সহ স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের আনুগত্য গ্রহণ করে এরপর আর্যরা সমাজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো শুরু করে এবং ভারতবর্ষের অধিবাসীরা বৈদিক সমাজে প্রবেশ করে। আজমি প্রত্নতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের পাশাপাশি সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষার ভাষা তাত্ত্বিক মিলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আর্যরা ইউরোপিয়ান তথা পারস্য বংশোদ্ভূত ছিল এবং তিনি ভাষাবিজ্ঞানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সংস্কৃত ভাষাভাষী আর্য ও ফারসি ভাষাভাষীরা একই ভূখণ্ডের বাসিন্দা ছিল, এবং তারা পারস্য থেকে এসেছিল। এরপর আর্যরা ভারতের স্থানীয় অধিবাসীদের মর্যাদার ক্রমানুসারে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে, এগুলো হলো ব্রাহ্মণ (আর্য পুরোহিত বা ধর্মগুরু), ক্ষত্রিয় (রাজপুত যোদ্ধা বা মারাঠা), বৈশ্য (তুরানি দ্রাবিড় ব্যাপারী বা ব্যবসায়ী ও কৃষক) ও শূদ্র (তুরানি দ্রাবিড় মজদুর বা শ্রমিক), যার প্রথম দুটি ছিল আর্য উচু শ্রেণী ও শেষ দুটি ছিল দ্রাবিড় নিচু শ্রেণী। আজমির মতে, এদের মধ্যে শূদ্ররা আর্যদের কাছে প্রবল নির্যাতন ও অসম্মানের পাত্র হওয়ার ফলে বিংশ শতাব্দীর দিকে তারা ব্যাপকহারে ধর্মান্তরিত হয় এবং একটি বড় সংখ্যার জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহণ করে, বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায়, যাদের ইসলাম ধর্মে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরের বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হতে প্রাপ্ত বহুসংখ্যক তথ্যসূত্র আজমি উল্লেখ করেন। এরপর হিন্দুগণ গ্রন্থ রচনা মনোনিবেশ করে যা পাঁচটি যুগে বিভক্ত ছিল। যথাক্রমেঃ[১৮]

  1. প্রথম যুগে চারটি বেদ রচনা করা হয়।
  2. দ্বিতীয় যুগে হিন্দু দার্শনিক গণ উপনিষদ রচনা করেন, উপনিষদসমূহে সুফিবাদ তথা তাসাউফের প্রাথমিক ধারণাগুলো সন্নিবেশ করা হয়, যার সাথে সম্পৃক্ত ছিল মনসুর হাল্লাজ, ইবনে আরাবী ও সারমাদ কাশানি, যারা নির্বাণওমের সাথে মিলিয়ে ওয়াহদাতুল ওজুদ রচনা করে, এছাড়াও ইবনে হাবিত, আহমদ ইবনে নামুস, আবু মুসলিম খোরাসানিমুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া রাজি হিন্দুধর্মে বর্ণিত পুনর্জন্মের ধারণা ইসলামের নামে প্রচার করেন। এছাড়াও এ সময় ভারতের সম্রাট জালাল উদ্দিন আকবরের শাসনামলে আল্লাহ উপনিষদ নামে একটি উপনিষদ রচনা করা হয়, যেখানে ইসলামে স্রষ্টার ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
  3. তৃতীয় যুগে ধর্মীয় রীতি নীতির সংকলন প্রস্তুত করা হয়। এসময় স্মৃতি গ্রন্থ সমূহ লেখা হয়, যার মধ্যে মনুস্মৃতি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
  4. চতুর্থ যুগে ভারত বর্ষের অধিবাসীদের সঙ্গে আর্যদের সংমিশ্রণের ফলে আর্য দেবতারা হারিয়ে যেতে থাকে। আর্যরা ইন্দ্রকে বজ্রের দেবতা, অগ্নিকে আগুনের দেবতা, অরুণকে আকাশের দেবতা এবং ঊষাকে সকালে দেবতা হিসেবে উপাসনা করত। কিন্তু পরে বিষ্ণু প্রতিপালনের দেবতা ও শিব ধ্বংসের দেবতা হিসেবে এসবের স্থান দখল করে এবং এসব দেবতার গুণকীর্তন করে পুরাণ গ্রন্থসমূহ রচনা করা হয়। গ্রন্থগুলোর বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টির উপাখ্যান, পুনরুত্থান ও দুই মনুর মধ্যকার কাল তথা সৃষ্টিজগতের দুই ধ্বংসের মধ্যবর্তী সময়ের বিবরণ দেয়া হয়েছে হিন্দু বিশ্বাস মতে এই মহাবিশ্ব অবিনশ্বর। অসংখ্যবার এর বিনাশ হয়ে আবার তা নতুনভাবে সৃষ্টি হয়।
  5. পঞ্চম যুগে যুদ্ধবিগ্রহের বিবরণ সম্বলিত মহাভারত, গীতারামায়ণ রচনা করা হয় যেগুলোতে আর্য নেতাদের যুদ্ধবিগ্রহের আলোচনা এবং যুদ্ধে তাদের অর্জিত বিজয়ের বিবরণ তুলে ধরা হয়।[১৮]

এছাড়াও হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সমূহে ইসলামী নবী মুহাম্মাদের আগমনের কথাসহ বিভিন্ন ইসলামী সুসংবাদসমূহের যে বর্ণনা আছে বলে প্রচলিত আছে, সে ব্যাপারে আজমী বলেন, মুসলিমদের সর্বসম্মত মতানুসারে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সমূহ আসমানী কিতাব না হলেও হতে পারে যে, আর্যরা নিজেদের আদিভূমি ত্যাগ করার সময় ইরাকে ঈব্রাহিম নবীর ধর্মের আবির্ভাব ঘটে এবং তখন আর্যরা এই অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার সময় তাওরাত ও ইব্রাহিমের সহিফাসমূহ হতে এসব গ্রহণ করে, অথবা হিন্দুরা তাদের গ্রন্থ পরিমার্জনের সময়, ইসলামী শাসনামলে মুসলিম শাসকদের সন্তুষ্ট করতে এগুলো প্রবিষ্ট করে, দ্বিতীয় মতটির ব্যাপারে আজমি তার অধিক সমর্থন দাবি করেন।[১৮]

আজমী হিন্দুধর্মের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন,

পৃথিবীর আধুনিক ও প্রাচীন প্রতিটি জাতি ও ধর্মের মৌলিক কিছু বিশ্বাস ও দর্শন থাকে, যার ওপর সে ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস স্থাপন করে। এর আলোকে তারা নিজেদের সমস্যাবলির সমাধান করে। নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের উৎকর্ষ সাধন করে। গবেষকগণ এসব মূলনীতি অধ্যয়নের মাধ্যমে কোনো সংগঠন বা ধর্মের বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারেন। কোনো সংগঠন বা ধর্ম যদি এমন মৌলিক নীতিমালা বা আকিদা সংরক্ষণ না করে, তাহলে এটিকে নিষ্প্রাণ দেহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এ দিক বিবেচনায় হিন্দুধর্মের ব্যাপারে বলা যায়, এই ধর্মের নিজস্ব কোনো মৌলিক নীতিমালা বা ধর্মবিশ্বাস নেই। হিন্দু ধর্মবেত্তাগণও তাদের ধর্মের মৌলিক আকিদা না থাকার বিষয়টি অনুধাবন করেন। এমনকি তারা এ নিয়ে গর্ববোধও করেন। হিন্দু ধর্মগুরু গান্ধি বলেন, “হিন্দুধর্মের মৌলিক আকিদা না থাকা এর মহান হওয়ার একটি প্রমাণ। যদি এ ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আমি বলব—গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হয়ে সত্যের অন্বেষণ করে বেড়ানোই এ ধর্মের মৌলিক নীতি। এ ক্ষেত্রে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা বা না-করা উভয়টিই সমান। কোনো হিন্দুধর্মাবলম্বীর জন্য স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা আবশ্যক নয়। কেউ এতে বিশ্বাস করুক বা না করুক, সে হিন্দু হিসেবেই গণ্য হবে।' তিনি তার হিন্দুধর্ম নামক গ্রন্থে বলেন, 'হিন্দুধর্মের বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি কোনো বিশেষ ধর্মবিশ্বাস লালন করে না। তবে অন্যান্য ধর্মের বিশ্বাস ও মৌলিক ধারণাগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।' এ কারণেই হিন্দু পণ্ডিতগণ সব নতুন বিষয়কে পবিত্র জ্ঞান করেন। একেই নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মনে করেন। তারা সব সাধককেই আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ—মানবরূপী স্রষ্টা বলে ধারণা করেন। এমনকি হিন্দুত্ব লালন করে কিছু বিশ্বাসে তাদের বিরোধিতা করলেও তাকে অবতার মনে করতে দ্বিধা করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে হিন্দুত্ব ত্যাগ করে নিজেকে মুসলমান বা খ্রিষ্টান বলে দাবি না করে। এর মূল কারণ এটাই যে, হিন্দুধর্মের অনুসারীদের ধর্মবিশ্বাসের আলাদা কোনো পরিমাপক নেই— যে হিন্দুধর্মের অনুসারী, সে চিরদিনের জন্যই হিন্দুত্বের ধারক বলে বিবেচিত হয়।[১৮]

আজমী ইসলাম সম্পর্কে হিন্দুদের নেতিবাচক ধারণার কারণ হিসেবে বলেন,

আমার দৃষ্টিতে হিন্দুরা রিসালাতের বাস্তবতা ও তাওহিদের মর্মবাণী না বোঝাটাই মুসলমানদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষের মূল কারণ। কেননা, মুসলমানদের মধ্যে যারা হিন্দুত্ব-প্রভাবিত সুফিবাদের সাধনা করেছে, তারা ইসলামের সঠিক আকিদা বিকৃত করে ছেড়েছে—যেসব আকিদা কুরআন সুন্নাহের আলোকে সাহাবি ও তাবেয়িগণ লালন করতেন। আর যে আকিদা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল আর তাঁর পথেই চলেছিলেন শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া ও তাঁর পরবর্তী আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ। উপরন্তু এ সুফিগণ ইসলামি আকিদার সঙ্গে মূর্তিপূজার বিশ্বাসের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। এর বড় প্রমাণ, ভারতজুড়ে বহু কবরের ওপর নির্মিত সমাধিসমূহ ও এসবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত তাওয়াফ, সিজদা ও সাহায্যপ্রার্থনার মতো কুফরি কর্মকাণ্ড। এসব কাজ মূলত হিন্দুরা করে থাকে তাদের মন্দিরকে কেন্দ্র করে। এর পাশাপাশি হিন্দু লেখকদের ইসলাম ও ইসলামি ধর্মবিশ্বাস নিয়ে রটানো মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডাসমূহও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। তারা ব্যাপক মিথ্যাচার ছড়িয়েছে আমাদের ইতিহাস ও রাসুল ﷺ -এর জীবনচরিত নিয়ে। হিন্দু শাস্ত্রের প্রাথমিক একজন শিক্ষার্থী ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিরূপ ধারণা নিত্রেই তার অধ্যয়ন শুরু করে। তাই ভারতের মুসলমানদের জন্য উচিত, তাঁদের ধর্মীয় মৌলিক গ্রন্থগুলো স্থানীয় ভাষায় ব্যাপক অনুবাদে প্রয়াসী হওয়া। অন্যদিকে মুসলমানরা প্রায় আট শতক ধরে ভারতবর্ষ শাসন করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে আল্লাহর বিশেষ তাওফিকপ্রাপ্তদের ছাড়া সাধারণত এমন খুব বেশি শাসকের দেখা মেলেনি, যারা তাদের অধীন হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বরং পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে দাড়িয়েছিল যখন তাদের উদ্যোগে বেদ, গীতা ও রামায়ণের মতো হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো আরবি ও ফারসিভাষায় অনূদিত হয়েছিল; যেখানে তারা কুরআন,হাদিস, সিরাত ও ইসলামি ধর্মবিশ্বাসের বিবরণ সংবলিত মৌলিক ও বিশুদ্ধ গ্রন্থাবলি সংস্কৃতসহ অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় অনুবাদের ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। এমনকি আজ অবধি হিন্দি ভাষায় কুরআনের নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ কোনো অনুবাদ রচিত হয়নি। আমি কয়েকটি গ্রন্থাগারে কুরআনের হিন্দি অনুবাদের তথ্য পেয়ে তা পড়ে দেখেছি, যা ততটা সূক্ষ্মতার সঙ্গে। অনুবাদ করা হয়নি। তাই এসবের পুনঃনিরীক্ষণ করা উচিত। সবচেয়ে ভালো হবে আকিদা ও আত্মশুদ্ধির অঙ্গনে সুপরিচিত কোনো আলিমের তত্ত্বাবধানে নতুনভাবে এর অনুবাদ সম্পন্ন করা।[১৮]

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে হিন্দু বিজ্ঞ ব্যক্তিগণের অভিমত[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্ম রক্ষার্থে নবী মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীদের অর্থাৎ সাহাবীদের অনেক সংঘর্ষ তথা যুদ্ধ করতে হয়েছে।

তথাপি হিন্দুধর্মে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কুরুক্ষেত্র-এর মতো মহাযুদ্ধ করতে হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে যা বলেছেন:

ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে- ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল; আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল। এক পক্ষের যে দিকে দ্বার খোলা, অন্য পক্ষের সে দিকে দ্বার রুদ্ধ। এরা কী করে মিলবে?

...

মনের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে। য়ুরোপ সত্যসাধনা ও জ্ঞানের ব্যাপ্তির ভিতর দিয়ে যেমন ক’রে মধ্যযুগের ভিতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁচেছে, হিন্দুকে মুসলমানকেও তেমনি গণ্ডির বাইরে যাত্রা করতে হবে। ধর্মকে কবরের মতো তৈরি করে তারই মধ্যে সমগ্র জাতিকে ভূতকালের মধ্যে সর্বতোভাবে নিহিত করে রাখলে উন্নতির পথে চলবার উপায় নেই, কারও সঙ্গে কারও মেলবার উপায় নেই। আমাদের মানসপ্রকৃতির মধ্যে যে অবরোধ রয়েছে তাকে ঘোচাতে না পারলে আমরা কোনো রকমের স্বাধীনতাই পাব না। শিক্ষার দ্বারা, সাধনার দ্বারা সেই মূলের পরিবর্তন ঘটাতে হবে- ডানার চেয়ে খাঁচা বড়ো এই সংস্কারটাকেই বদলে ফেলতে হবে- তার পরে আমাদের কল্যাণ হতে পারবে। হিন্দু-মুসলমানের মিলন যুগপরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এ কথা শুনে ভয় পাবার কারণ নেই, কারণ অন্য দেশে মানুষ সাধনার দ্বারা যুগপরিবর্তন ঘটিয়েছে, গুটির যুগ থেকে ডানা মেলার যুগে বেরিয়ে এসেছে। আমরাও মানসিক অবরোধ কেটে বেরিয়ে আসব; যদি না আসি তবে, নন্যঃপন্থা বিদ্যতে অয়নায়।

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর

হিন্দুধর্ম ও ইসলামধর্মের সমাজ-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

শহরগুলোতে বৃদ্ধির হার[সম্পাদনা]

ভারত প্রধানত হিন্দু ধর্মপ্রধান দেশ হলেও বিভিন্ন শহরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নে ১.৩% (দিল্লি) থেকে সর্বোচ্চ ১০% (ভুপাল) পর্যন্ত রয়েছে| পাশাপাশি এক লক্ষের অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট বেশ কিছু শহর রয়েছে যেখান ৫% বেশি মুসলিম বসবাস করে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Table: Religious Composition by Country, in Numbers"। Pew Research Center's Religion & Public Life Project (Washington DC)। ১৮ ডিসেম্বর ২০১২। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৯ মে ২০১৫ 
  2. Jeffrey Brodd (2003), World Religions: A Voyage of Discovery, Saint Mary's Press, আইএসবিএন ৯৭৮-০৮৮৪৮৯৭২৫৫, page 43
  3. Christopher John Fuller (2004), The Camphor Flame: Popular Hinduism and Society in India, Princeton University Press, আইএসবিএন ৯৭৮-০৬৯১১২০৪৮৫, pages 30-31, Quote: "Crucial in Hindu polytheism is the relationship between the deities and humanity. Unlike Jewish, Christian and Islamic monotheism, predicated on the otherness of God and either his total separation from man and his singular incarnation, Hinduism postulates no absolute distinction between deities and human beings. The idea that all deities are truly one is, moreover, easily extended to proclaim that all human beings are in reality also forms of one supreme deity - Brahman, the Absolute of philosophical Hinduism. In practice, this abstract monist doctrine rarely belongs to an ordinary Hindu's statements, but examples of permeability between the divine and human can be easily found in popular Hinduism in many unremarkable contexts".
  4. Jeaneane D Fowler (2012), The Bhagavad Gita, Sussex Academic Press, আইএসবিএন ৯৭৮-১৮৪৫১৯৩৪৬১, pages 253-262
  5. Christopher K Chapple (2010), The Bhagavad Gita: Twenty-fifth–Anniversary Edition, State University of New York Press, আইএসবিএন ৯৭৮-১৪৩৮৪২৮৪২০, pages 610-629
  6. Klostermaier, Klaus K. (২০০৭)। A Survey of Hinduism. (3. ed. সংস্করণ)। Albany, N.Y.: State University of New York Press। পৃষ্ঠা 46–49। আইএসবিএন 0-7914-7082-2 
  7. William Duiker, Jackson Spielvogel (২০১২)। World History। Cengage learning। পৃষ্ঠা 90। 
  8. James M. Nelson (২০০৯)। Psychology, Religion, and Spirituality। Springer। পৃষ্ঠা 77 
  9. Neal Robinson (2013), Islam: A Concise Introduction, Routledge, আইএসবিএন ৯৭৮-০৮৭৮৪০২২৪৩, Chapter 7
  10. For kāma, artha, and dharma as "brahmanic householder values", see Flood (1996:17). Cf. also Apte (1965:626); Hopkins (1971:78)
  11. Quran 2:173
  12. الهندوسية وتأثر بعض الفرق الاسلامية بها (আরবি ভাষায়)। Dār al-Awrāq al-Thaqāfīyah। ২০১৬। পৃষ্ঠা 1240–1250। আইএসবিএন 978-603-90755-6-1। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০২২ 
  13. Malika Mohammada The Foundations of the Composite Culture in India Aakar Books 2007 আইএসবিএন ৯৭৮-৮-১৮৯-৮৩৩১৮-৩ page 141
  14. "সদগুরুর মুখ থেকে অলৌকিক সুফি সাধক মনসুর অল-হল্লাজের কাহিনি"isha.sadhguru.org। সংগ্রহের তারিখ ৮ জানুয়ারি ২০২২ 
  15. Clinton Bennett, Charles M. Ramsey South Asian Sufis: Devotion, Deviation, and Destiny A&C Black আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৪১-১৫১২৭-৮ page 23
  16. Siddiqui, Ataullah; Waugh, Earle H.। American Journal of Islamic Social Sciences 16:3 (ইংরেজি ভাষায়)। International Institute of Islamic Thought (IIIT)। পৃষ্ঠা 12। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ 
  17. Mohammada, Malika (২০০৭)। The Foundations of the Composite Culture in India (ইংরেজি ভাষায়)। Aakar Books। পৃষ্ঠা 90। আইএসবিএন 978-81-89833-18-3। সংগ্রহের তারিখ ৫ জানুয়ারি ২০২২ 
  18. আজমি, জিয়াউর রহমান; মহিউদ্দিন কাসেমী (অনুবাদক) (৫ জুন ২০২১)। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ধর্মের ইতিহাস। কালান্তর প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ২০, ২১–৩০, ৩৬–৩৯, ১০১–১০২, ১০৫–১০৬, ১৭৩–১৭৪। আইএসবিএন 978-984-95932-8-7 
  1. "Sufism:The Mystical side of islam"। Rim.org। ১৯ মার্চ ১৯৯৬। ২০১২-১০-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-০৯-১০ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

  • আজমি, জিয়াউর রহমান (২০২১), হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ধর্মের ইতিহাস, কালান্তর প্রকাশনী, আইএসবিএন 978-984-95932-8-7 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]