রিবা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

রিবা (আভিধানিক অর্থ বৃদ্ধি, আধিক্য, পরিবর্ধন, বেশি, স্ফীত, বিকাশ ইত্যাদি, যা উশুরি হিসেবেও পরিচিত, তা হল একটি আরবি শব্দ যা ইসলামী পরিভাষায় সুদকে বোঝায়। ইসলামী শরীয়ায় লেনদেনের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তানুযায়ী শরীয়াহ সম্মত কোনরুপ বিনিময় ব্যতীত মূলধনের উপর অতিরিক্ত যা কিছু গ্রহণ করা হয় তাকে সুদ বলে।

তাফসীরবিদ ইবনে-জরীর-মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন, জাহেলিয়াত আমলে প্রচলিত ও কোরআনে নিষিদ্ধ 'রিবা' হলো কাউকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণ দিয়ে মূলধনের অতিরিক্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা। আরবরা তাই করতো এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সুদ বাড়িয়ে দেবার শর্তে মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হতো [১]

রিবার উপর মৌলিক তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

কুরআন ও নিষেধাজ্ঞা[সম্পাদনা]

কুরআনে মত ২০টি আয়াত রয়েছে যাতে রিবার উল্লেখ রয়েছে।[২] ,যদিও এর সবগুলো আয়াতে শব্দগতভাবে এর সরাসরি উল্লেখ নেই। শব্দটি সরাসরি আটবার কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে, — তিনবার সূরা বাকারা(২):২৭৫ আয়াতে , এবং একবার করে বাকারা(২):২৭৬, বাকারা(২):২৭৮, আলে-ইমরান(৩):১৩০, সূরা নিসা(৪):১৬0 ও সূরা আর-রুম(৩০):৩৯ নং আয়াতে।[৩]

সূরা রুমের একটি মাক্কী আয়াতে সর্বপ্রথম বিষয়টি আবির্ভূত হয়:

আর যা-কিছু তোমরা সুদে দিয়ে থাক যেন এটি বাড়তে পারে, -- তা কিন্তু আল্লাহ্‌র সমক্ষে বাড়বে না। আর যা তোমরা দিয়ে থাক যাকাতে আল্লাহ্‌র চেহারা কামনা করে, তাহলে এরাই স্বয়ং বহুগুণিত লাভবান হবে। (কুরআন 30:39)[৪]

অন্যান্য মাদানী আয়াতগুলো হল:

আর গ্রন্থপ্রাপ্তদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে এতে বিশ্বাস করবে না তার মৃত্যুর পূর্বে। আর কিয়ামতের দিনে তিনি হবেন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদাতা।

তারপর যারা ইহুদী মত পোষণ করে তাদের অন্যায় আচরণের ফলে আমরা তাদের জন্য হারাম করলাম কিছু পবিত্র বস্তু যা তাদের জন্য হালাল ছিল, আর তাদের প্রতিরোধ করার জন্যে বহু লোককে আল্লাহ্‌র পথ থেকে, -- আর তাদের সুদ নেবার জন্যে, যদিও তাদের তা নিষেধ করা হয়েছিল, আর লোকের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে তাদের গ্রাস করার জন্যে। আর তাদের মধ্যের অবিশ্বাসীদের জন্য আমরা তৈরি করেছি ব্যথাদায়ক শাস্তি। (সূরা নিসা কুরআন 4:158-160)[৫]

ওহে যারা ঈমান এনেছ! সুদ গলাধঃকরণ করো না তাকে দ্বিগুণ ও বহুগুণিত করে; আর আল্লাহ্‌কে ভয়-শ্রদ্ধা করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (সূরা আলে-ইমরান কুরআন 3:129-130)[৬][Note ১]

পরবর্তী পর্যায়ে সূরা বাকারায় বিস্তারিত আয়াত অবতীর্ণ হয়:

যারা সুদ খায় তারা দাঁড়াতে পারে না তার মতো দাঁড়ানো ছাড়া যাকে শয়তান তার স্পর্শের দ্বারা পাতিত করেছে। এমন হবে কেননা তারা বলে -- ব্যবসা-বাণিজ্য তো সুদী-কারবারের মতোই।’’ কিন্তু আল্লাহ্ বৈধ করেছেন ব্যবসা-বাণিজ্য, অথচ নিষিদ্ধ করেছেন সুদখুরি। অতএব যার কাছে তারা প্রভুর তরফ থেকে এই নির্দেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে তার জন্যে যা গত হয়ে গেছে, আর তার ব্যাপার রইল আল্লাহ্‌র কাছে। আর যে ফিরে যায় তারাই হচ্ছে আগুনের বাসিন্দা, এতে তারা থাকবে দীর্ঘকাল।

আল্লাহ্ সুদখুরিকে নিষ্ফল করেছেন, এবং দান-খয়রাতকে অগ্রগামী করেছেন। আর আল্লাহ্ সকল অবিশ্বাসী পাপীকে ভালোবাসেন না।

নিঃসন্দেহ যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করে, আর নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের জন্যে নিজ নিজ পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রভুর দরবারে, আর তাদের উপরে কোনো ভয় নেই, এবং তারা নিজেরা অনুতাপও করবে না।

ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্‌কে ভয়-শ্রদ্ধা করো, আর সুদের বাবদ বকেয়া যা আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমানদার হও।

কিন্তু যদি তোমরা না করো তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের তরফ থেকে সংগ্রামের ঘোষণা জেনে রেখো। আর যদি তোমরা ফেরো তবে তোমাদের জন্য রইল তোমাদের ধনসম্পত্তির আসলভাগ। অত্যাচার করো না এবং অত্যাচারিতও হয়ো না।

আর যদি সে অসচ্ছল অবস্থায় থাকে তবে মূলতবি রাখো যতক্ষণ না সচ্ছলতা আসে। আর যদি দান করে দাও তবে তা তোমাদের জন্য আরো উত্তম, -- যদি তোমরা জানতে। (কুরআন 2:275-280)[৭][Note ২]

হাদিস ও নিষেধাজ্ঞা[সম্পাদনা]

জাবির,[৮] আব্দুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ,[৯] সহ বহু বর্ণনাকারী বলেছেন

’'মুহাম্মাদ (সাঃ) সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, এর হিসাবরক্ষক এবং এর সাক্ষী সকলের উপরই অভিসম্পাত করেছেন এই বলে যেঃ তারা সকলেই সমান।[৮][১০]


তাকি উসমানী দাবি করেন যে, রিবা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিসগুলো অস্পষ্ট হতে পারে না কারণ আল্লাহ এমন কোন চর্চার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন না, যার প্রকৃত স্বরূপ মুসলিমদের জানা থাকবে না। তার মতে, একমাত্র সেই আয়াতগুলোই অস্পষ্ট হতে পারে, যেগুলোর জন্য কোন ব্যবহারিক সমস্যা এর জ্ঞানের উপর নির্ভর করে না।[১১]

মূলধারার মুসলিমগণ সুদ খাওয়ার পাপের ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য বেশ কিছু হাদিসকে নির্দেশ করেন। আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত হয়েছে যে:

নবী (সাঃ) বলেন, “ছয়টি ধ্বংসাত্মক পাপ (কবিরা গুনাহ) থেকে বেঁচে থাকো।” লোকজন জিজ্ঞেস করলো, “হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)! কি সেগুলো? “তিনি বললেন, “ আল্লাহর সাথে অন্য কাওকে ইবাদতে শরীক করা, জাদুবিদ্যার চর্চা করা, (ইসলামী আইন অনুযায়ী) সৎ কারণ ব্যতিরেকে কাওকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিপের সম্পদ খাওয়া, যুদ্ধের ময়দানে লড়াইয়ের সময় শত্রুর কাছ থেকে পিঠ দেখিয়ে পলায়ন করা, সতী-সাধ্বী নারী - যারা কখনো অশ্লীল কোন কিছু চিন্তাও করে না এবং উত্তম মুমিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করা।" [Note ৩]

সুনান ইবনে মাজাহ অনুযায়ী, ইসলামিক নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) রিবাকে নিজ মায়ের সাথে ব্যাভিচার করার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে ঘোষণা করেন।[১২]


রিবার শর্ত[সম্পাদনা]

১) লেনদেন ঋণ সংক্রান্ত বিষয় হওয়া। ২) মূলধনের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকা। ৩) ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্দিষ্ট থাকা। ৪) ঋণ দানের শর্ত হিসেবে মূলধনের অতিরিক্ত কোনকিছু আদায় করা। ৫) অতিরিক্ত যা কিছু আদায় করা হয় তার শরীয়াহ সম্মত কোন বিনিময় না থাকা। ৬) অতিরিক্ত অংশের পরিমাণ পূর্ব নির্ধারিত হারে আদায় করা। ৭) সময়ের অনুপাতে মূলধনের অতিরিক্ত অংশের পরিমাণ নির্ধারিত হওয়া। ৮) উপরের শর্তগুলোকে লেনদেনের শর্ত হিসেবে গণ্য করা।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ( তফসীরে ইবনে জরীর, ৩য় খন্ড,৬২ পৃষ্ঠা )
  2. Khan, What Is Wrong with Islamic Economics?, 2013: p.132-3
  3. Siddiqi, Riba, Bank Interest, 2004: p.35
  4. Arberry, A. J. (translator)। "30:38"। The Koran Interpreted A Translation by A. J. Arberryarchive.org। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  5. Arberry, A. J. (translator)। "4:159"। The Koran Interpreted A Translation by A. J. Arberryarchive.org। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  6. Arberry, A. J. (translator)। "3:125"। The Koran Interpreted A Translation by A. J. Arberryarchive.org। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  7. Arberry, A. J. (translator)। "2:275-280"। The Koran Interpreted A Translation by A. J. Arberryarchive.org। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  8. Sahih Muslim, Book 010, Number 3881
  9. (Sunan Abi Dawoud: 3543, hadith Hasan1)
  10. "The Book of Prescribed Punishments, no.4176"Sahihmuslim.com। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০১৬ 
  11. Usmani, Historic Judgment on Interest, 1999: para 57
  12. Abod (Sheikh), Ghazali Sheikh; Omar (Syed.) (১৯৯২)। An Introduction to Islamic finance। Quill Publishers,। পৃষ্ঠা 381। আইএসবিএন 9789839640090। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০১৫ 

টীকা[সম্পাদনা]

  1. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (কুরআন 3:129-130)
  2. ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا ۗ وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا (from কুরআন 2:276)
  3. সহীহ মুসলিম: ২৭২, আরবিতে:
    أخرج البخاري ومسلم وأبو داود والنسائي عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اجتنبوا السبع الموبقات , قيل يا رسول الله وما هن ؟ قال الشرك بالله , والسحر , وقتل النفس التي حرم الله إلا بالحق , وأكل مال اليتيم , وأكل الربا , والتولي يوم الزحف , وقذف المحصنات الغافلات المؤمنات