কুবের

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কুবের
সম্পদের দেবতা
লোকপাল গোষ্ঠীর সদস্য
SAMA Kubera 1.jpg
দশম শতাব্দীর কুবের মূর্তি, সান অ্যান্টোনিও মিউজিয়াম অফ আর্ট
দেবনাগরীकुबेर
সংস্কৃত লিপ্যন্তরKubera
অন্তর্ভুক্তিযক্ষ, দেব, লোকপাল
আবাসলঙ্কা ও পরে অলকা
মন্ত্রওঁ শং কুবেরায় নমঃ
অস্ত্রগদা
বাহনবন্য শূকর, বেজি
ব্যক্তিগত তথ্য
মাতাপিতা
Consortভদ্রা
সন্তাননলকুবের, মণিভদ্র, ময়ূরজা ও মীনাক্ষী

হিন্দুধর্মে কুবের (সংস্কৃত: कुबेर; অপর নাম কুবেরন) হলেন ধনসম্পদের দেবতা ও যক্ষ নামক উপদেবতাদের রাজা।[১] তিনি উত্তর দিকের রক্ষক (দিকপাল)পৃথিবীর অন্যতম রক্ষাকর্তা (লোকপাল) দেবতা হিসেবে পূজিত। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে কুবেরকে বিভিন্ন ধরনের উপদেবতার অধিপতি ও বিশ্বের ধনাধ্যক্ষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, কুবেরের উদর স্ফীত, দেহ নানা অলংকারে শোভিত এবং হাতে একটি রত্ন-পেটিকা ও গদা দেখা যায়।

বেদে কুবেরকে অশুভ আত্মাদের অধিপতি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে রামায়ণ, মহাভারতপৌরাণিক সাহিত্যেই তিনি প্রথম দেবতার মর্যাদা লাভ করেন। পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী, লঙ্কার রাজা কুবের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা রাবণ কর্তৃক রাজ্যচ্যূত হয়ে হিমালয়ের অলকাপুরীতে চলে আসেন। অলকাপুরীর গৌরব ও ঐশ্বর্যের বর্ণনা অনেক শাস্ত্রেই পাওয়া যায়।

বৌদ্ধজৈনরাও কুবেরকে তাদের দেবমণ্ডলীর অন্তর্গত করে নিয়েছিল। বৌদ্ধধর্মে তিনি বৈশ্রবণ নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, হিন্দুধর্মে ঋষি বিশ্রবার পুত্র হিসেবে তিনি বৈশ্রবণ নামে পরিচিত। বৌদ্ধরা কুবের ও পঞ্চিককে একই দেবতা মনে করে। অন্যদিকে জৈনধর্মে তিনি সর্বানুভূতি নামে পরিচিত।

মূর্তিলক্ষণ[সম্পাদনা]

হিন্দুশাস্ত্রে কুবেরের শারীরিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি খর্বাকৃতি, গাত্রবর্ণ পদ্মপাতার ন্যায় এবং উদর স্ফীত। কথিত আছে, কুবেরের তিনটি পা, মাত্র আটটি দাঁত, একটি চক্ষু এবং তিনি নানা অলংকারে ভূষিত। কোনও কোনও মূর্তিতে দেখা যায়, কুবের একটি মানুষের পিঠে আরোহণ করেছেন।[২][৩] অবশ্য ভাঙা দাঁত, তিনটি পা, তিনটি মাথার ন্যায় শারীরিক বিকৃতি ও চতুর্ভূজ রূপের উল্লেখ পরবর্তীকালীন পৌরাণিক সাহিত্যেই শুধু পাওয়া যায়।[৪] কুবেরের হাতে থাকে একটি গদা, একটি ডালিম বা একটি ধনভাণ্ড।[২] অপর বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি হাতে রত্নগুচ্ছ ও সঙ্গে একটি বেজি নিয়ে থাকেন। তিব্বতে মনে করা হয়, বেজি হল কুবের কর্তৃক কোষাগার-রক্ষক নাগ বিজয়ের প্রতীক।[৫] বৌদ্ধ মূর্তিকল্পে কুবেরকে সচরাচর বেজির সঙ্গেই দেখা যায়।[৩]

মাতৃকাগণের ব্রোঞ্জ মূর্তি; বাঁদিকে গণেশ ও ডানদিকে কুবের। পূর্ব ভারত থেকে প্রাপ্ত এই মূর্তিটি রাজা প্রথম মহীপালের রাজত্বের ৪৩তম বর্ষে (আনুমানিক ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দ) উৎসর্গিত হয়েছিল। বর্তমানে মূর্তিটি ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত।

বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে বলা হয়েছে যে, কুবের "অর্থ" (অর্থাৎ সম্পদ, সমৃদ্ধি ও গৌরব) এবং "অর্থশাস্ত্র" উভয়েরই মূর্ত প্রতীক এবং কুবেরের মূর্তিতেও দেবতার এই সত্ত্বাটি প্রতিফলিত হয়। যে মানুষটির পিঠে তিনি আরোহণ করেন, তিনি রাষ্ট্রের নরত্বারোপিত প্রতীক এবং কুবেরের স্বর্ণবেশ ও স্বর্ণালঙ্কারও ঐশ্বর্যেরই প্রতীক। কুবেরের গায়ের রং পদ্মপাতার মতো ও বাঁ চোখটি হলুদ। তিনি একটি বর্ম পরিধান করেন এবং একটি কণ্ঠহার উদর পর্যন্ত দোদুল্যমান থাকে। এই পুরাণে আরও বলা হয়েছে যে, কুবেরের শ্মশ্রু-গুম্ফ-মণ্ডিত মুখটি বাঁ দিকে নত অবস্থায় থাকে এবং ঠোঁটের দুই কোণ থেকে দু'টি ছোটো দাঁত বেরিয়ে থাকে। এই দাঁত দু'টি কুবেরের শাস্তি দেওয়ার ও অনুগ্রহ করার ক্ষমতার প্রতীক। কুবের-পত্নী ঋদ্ধি জীবনের যাত্রাপথের প্রতীক। তিনি বাঁ হাত কুবেরের পিঠে রেখে এবং ডান হাতে একটি রত্নময় পাত্র নিয়ে কুবেরের বাঁ কোলে বসে থাকেন। কুবের চতুর্ভূজ: দুই বামহস্তে তিনি গদা ("দণ্ডনীতি" অর্থাৎ ন্যায়বিচারের প্রতীক) এবং একটি শক্তি (ক্ষমতার প্রতীক) এবং অপর দুই হাতে সিংহ-লাঞ্ছিত পতাকা (অর্থের প্রতীক) ও একটি শিবিকা (পালকি) ধারণ করে থাকেন। "নিধি" (কুবেরের সম্পদ) কুবেরের পিছনে মনুষ্যবেশে পদ্ম ও শঙ্খের রূপে দণ্ডায়মান থাকেন এবং দু'জনের মাথা থেকে যথাক্রমে একটি পদ্ম ও শঙ্খ নির্গত হয়।[৬]

অগ্নিপুরাণে কথিত হয়েছে, মন্দিরে ছাগবাহন ও গদাধারী কুবেরমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা উচিত।[৭] কুবেরের মূর্তি স্বর্ণনির্মিত ও বহুবর্ণ-রঞ্জিত করার বিধানও এই পুরাণে দেওয়া হয়েছে।[৮] জৈন বিবরণ সহ কোনও কোনও সূত্রে বলা হয়েছে যে, কুবেরের হাতে একটি অমৃতপাত্র থাকে এবং তিনি মধুপানরত অবস্থায় থাকেন।[৯]

নাম[সম্পাদনা]

"কুবের" নামটির সঠিক ব্যুৎপত্তি জানা যায় না।[৮] সংস্কৃত ভাষায় এই শব্দটির অর্থ "বিকৃতাঙ্গ বা দৈত্যাকার", যা কুবেরের দৈহিক বিকৃতির দ্যোতক।[৮][১০] অপর এক তত্ত্ব অনুযায়ী, কুবের নামটি সম্ভবত উৎসারিত হয়েছে "কুম্ব" (অর্থাৎ গুপ্ত রাখা) ধাতুমূল থেকে। "কুবের" শব্দটি "কু" (অর্থাৎ পৃথিবী) এবং "বীর" (নায়ক) শব্দ দু'টির মিলিত রূপও হতে পারে।[১১]

বিশ্রবার পুত্র হিসেবে কুবেরকে "বৈশ্রবণ" (পালি ভাষায় "বেস্‌সবণ") এবং ইলবিলার পুত্র রূপে তিনি "ঐলবিল" নামে পরিচিত।[১২] "বিশ্রবা" শব্দটির আক্ষরিক অর্থ "খ্যাতি" হওয়ায় "বৈশ্রবণ" শব্দটির অপর এক অর্থ দাঁড়ায় "খ্যাতির পুত্র"।[৮] সুত্তনিপাতের টীকায় বলা হয়েছে যে, "বেস্‌সবণ" নামটির উৎস কুবের রাজ্য "বিসন"-এর নাম।[১১] একদা কুবের শিবপার্বতীর প্রতি ঈর্ষাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। ফলে কুবেরের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। পার্বতী সেই বিকৃত চোখটিকে হলুদ করে দেন। তাই কুবেরের অপর নাম "একাক্ষীপিঙ্গল" (যার একটি চোখ হলুদ)।[৭] শিবের ন্যায় কুবেরকেও "ভূতেশ" (ভূতেদের অধিপতি) নামে অভিহিত করা হয়। কুবেরের মূর্তিতে প্রায়ই বাহন রূপে প্রেত বা মানুষ দেখা যায় বলে তিনি "নর-বাহন" নামেও অভিহিত হন। হপকিনস "নর" শব্দের অর্থ "জলনিবাসী প্রেত" করলেও, মণির অনুবাদে "নর" শব্দের অর্থ মানুষ।[৭][১৩] লোকপাল রূপে তিনি "সার্বভৌম" নামে একটি হস্তীপৃষ্ঠেও আরোহণ করেন।[১২] কুবেরের বাগানের নাম চিত্ররথ।[১৪]

কুবেরকে "রাজরাজ" (রাজার রাজা), "ধনাধিপতি" (ধনের অধিপতি) ও "ধনদা" (সম্পদদাতা) নামেও অভিহিত করা হয়। কয়েকটি প্রজা-সম্বন্ধীয় উপাধি রয়েছে: "যক্ষরাজন" (যক্ষগণের রাজা), "রাক্ষসাধিপতি" (রাক্ষসগণের অধিপতি), "গুহ্যকাধীপ" (গুহ্যকগণের অধিপতি), "কিন্নররাজ" (কিন্নরগণের রাজা), "ময়ূরজ" (নরাকৃতি পশুগণের রাজা) এবং "নররাজ" (মানুষের রাজা)।[৮][১২][১৩] কুবেরকে "গুহ্যাধীপ" ("গুপ্ত সম্পদের অধিপতি) নামেও অভিহিত করা হয়। অথর্ববেদেও কুবেরকে "গুপ্তকরণের দেবতা" বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[১৩]

মর্যাদার পরিবর্তন ও পরিবার[সম্পাদনা]

কুবের, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী, মথুরা সংগ্রহালয়

আদি বিবরণ ও পিতামাতা[সম্পাদনা]

কুবেরের নাম প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে[৮] এই গ্রন্থ ও শতপথ ব্রাহ্মণে কুবেরকে অশুভ প্রেতাত্মা বা অন্ধকারের প্রেতাত্মাদের অধিপতি ও বৈশ্রবণের পুত্র রূপে উল্লেখ করা হয়েছে।[১০][১৫] শতপথ ব্রাহ্মণে কুবেরকে চোর ও অপরাধীদের প্রভু বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।[১৬] মনুস্মৃতিতে কুবের পরিণত হন এক সম্মানীয় "লোকপাল" (বিশ্ববাসীর রক্ষাকর্তা) ও বণিক সম্প্রদায়ের রক্ষাকর্তায়।[১১] মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, কুবের হলেন প্রজাপতি পুলস্ত্য ও তদীয় পত্নী ইডাবিদার পুত্র এবং ঋষি বিশ্রবার ভ্রাতা এবং এক গাভী হতে জাত। যদিও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি পুলস্ত্যের পৌত্র এবং বিশ্রবা ও বিশ্রবা-পত্নী ইলাবিদার (নামান্তরে ইলিবিলা বা দেববর্ণিনী)। ইলাবিদা হলেন ঋষি ভরদ্বাজ বা তৃণবিন্দুর কন্যা।[৭][৮][১২][১৫]

যদিও এই যুগেও কুবেরকে অসুরই মনে করা হত, তবু সকল যজ্ঞের শেষে কুবেরের প্রতি প্রার্থনা জানানো হত।[১৫] "রাজোত্তম" বা "রাজরাজ" ইত্যাদি যে উপাধিগুলির তিনি অধিকারী (হরিবংশে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কুবেরকে "রাজরাজ" মর্যাদা দান করা হয়েছিল), সেগুলি দেবরাজ ইন্দ্রের "দেবোত্তম" উপাধির ঠিক বিপরীত। এই কারণে পরবর্তীকালে মনে করা হয় যে, কুবের আসলে একজন মানুষ ছিলেন। প্রাচীন যুগের গৌতম ধর্মশাস্ত্র ও অপস্তম্ব গ্রন্থে কুবেরকে মানুষ বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। কেবলমাত্র শঙ্খায়ন ও হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রে কুবেরকে দেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে তিনি মাংস, তিল বীজ ও পুষ্পে তুষ্ট হন।[৬][১৭]

মহাকাব্য ও পুরাণের বর্ণনা: দেবত্ব অর্জন[সম্পাদনা]

রামায়ণ, মহাভারতপৌরাণিক সাহিত্যে কুবেরকে প্রশ্নাতীত দেবত্ব প্রদান করা হয়েছে।[৬] কুবের ধনাধিপতি ও ধনীতম দেবতার মর্যাদা অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি লোকপাল (বিশ্বের রক্ষাকর্তা) ও উত্তর (মতান্তরে পূর্ব) দিকের রক্ষাকর্তার মর্যাদা পান।[১২][১৫] রামায়ণে কুবেরকে লোকপাল ও দিকপাল উভয় মর্যাদা প্রদান করা হলেও মহাভারতের কোনও কোনও তালিকায় কুবেরের নাম পাওয়া যায় না। তাই মনে করা হয় যে, আদি লোকপাল তালিকার দেবতা অগ্নি বা সোমের পরিবর্তে পরবর্তীকালে কুবেরের নাম সংযোজিত হয়েছিল।[১৮] রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী, কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে সৃষ্টিকর্তা দেবতা তথা পুলস্ত্যের পিতা ব্রহ্মা কুবেরকে এই মর্যাদা প্রদান করেছিলেন। ব্রহ্মা কুবেরকে "নিধি" (জগতের ধনসম্পদ), "দেবতার সমমর্যাদা" ও পুষ্পক রথও (দিব্য বিমান) প্রদান করেছিলেন। তারপর কুবের স্বর্ণলঙ্কা (অধুনা যা শ্রীলঙ্কা হিসেবে চিহ্নিত হয়) শাসন করতে থাকেন।[৭][৮][১২] মহাভারতে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মা কুবেরকে ধনের অধিকার, শিবের মিত্রতা, দেবত্ব, লোকপাল মর্যাদা, নলকুবের নামে এক পুত্র, পুষ্পক বিমান ও নৈঋত দৈত্যদের উপর আধিপত্য প্রদান করেছিলেন।[১২]

কুবের, একাদশ শতাব্দী, কর্ণাটক

রামায়ণ ও পুরাণে কুবেরের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা-ভগিনীদের কথাও বলা হয়েছে। কুবেরের পিতা বিশ্রবা রাক্ষস রাজকন্যা কৈকেশীকে বিবাহ করেন। কৈকেশী চার রাক্ষস সন্তানের জন্ম দেন: রাবণ (রামায়ণের প্রধান খলনায়ক), কুম্ভকর্ণ, বিভীষণশূর্পনখা[৭][১৫] মহাভারতে বিশ্রবাকে কুবেরের ভ্রাতা মনে করা হয়েছে। সেই হিসেবে তিনি রাবণ, কুম্ভকর্ণ প্রমুখের খুল্লতাত। মহাভারতের মতে, কুবের ব্রহ্মার তপস্যা করেছিলেন পিতা পুলস্ত্যের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মানসে। সেই কারণে পুলস্ত্য বিশ্রবাকে সৃষ্টি করেন। বিশ্রবার অনুগ্রহ লাভের জন্য কুবের তিনজন নারীকে প্রেরণ করেন। এই তিন নারীর গর্ভেই বিশ্রবার রাক্ষস সন্তানগণের জন্ম হয়।[১২][১৯] ব্রহ্মার নিকট বরলাভ করে রাবণ কুবেরকে লঙ্কা থেকে বিতাড়িত করেন এবং পুষ্পক বিমানটিও দখল করে নেন। এই বিমান রাবণের মৃত্যুর পর আবার কুবেরের হস্তগত হয়। লঙ্কা থেকে বিতাড়িত কুবের হিমালয়ে শিবের বাসভূমি কৈলাস পর্বতের কাছে গন্ধমাদন পর্বতে বাস করতে থাকেন। কোথাও কোথাও কৈলাসকেও কুবেরের বাসস্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যে নগরীতে তিনি থাকতেন সেটি অলকা বা অলকাপুরী নামে পরিচিত। এই নগর প্রভা (উজ্জ্বল), বসুধারা (রত্নখচিত) ও বসুস্থলী (ধনাগার) নামেও পরিচিত।[৭][৮][১২][১৪] চিত্ররথ নামে কুবেরের একটি উপবন আছে, সেখানে গাছের পাতা হল রত্নময় এবং ফল হল স্বর্গকন্যা। সেই উপবনে নলিনী নামে একটি সুন্দর হ্রদও আছে।[১২][১৯] মহাকাব্যে প্রায়ই কুবেরকে শিবের মিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[২] পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে, বহু বছর তপস্যা করে শিবের বরে তিনি যক্ষগণের অধিপতি হয়েছিলেন।[৭]

মহাভারতে ও কালিদাসের মেঘদূত কাব্যে কুবেরের জাঁকজমক-পূর্ণ রাজসভার বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ কুবেরের চিত্তবিনোদন করেন। শিব-পার্বতীও প্রায়ই কুবেরের রাজসভায় যান। এই রাজসভার অন্যান্য সদস্যরা হলেন বিদ্যাধর, কিম্পুরুষ, রাক্ষসপিশাচ প্রভৃতি উপদেবতা এবং সেই সঙ্গে নিধির মানুষ-রূপ পদ্ম ও শঙ্খ এবং কুবেরের প্রধান পার্ষদ তথা সেনাধ্যক্ষ মণিভদ্র। প্রত্যেক লোকপালের মতো কুবেরের বাসভবনেও উত্তরের সাত ভবিষ্যদ্রষ্টা বাস করেন। কথিত আছে, একবার রাবণ এবং আরেকবার পাণ্ডব রাজকুমার ভীম অলকাপুরী আক্রমণ করেছিলেন।[৬][৭][৮][১২][১৩] কুবেরের নৈঋত বাহিনী রাজা মুচুকুন্দকে পরাজিত করেন। মুচুকুন্দও পরে গুরু বশিষ্ঠের পরামর্শক্রমে যুদ্ধ করে এই বাহিনীকে পরাজিত করেন। আরও বলা হয়েছে যে, অসুরদের গুরু শুক্রও একবার কুবেরকে পরাজিত করে অলকাপুরীর সম্পদ লুণ্ঠন করেন।[৪][৭] শাস্ত্রে কুবের-সংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাখ্যান হল, কীভাবে তিনি নিজের প্রাসাদে ঋষি অষ্টাবক্রকে তুষ্ট করেছিলেন।[৪][৭]

কুবের হলেন দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ এবং উপদেবতা যক্ষ, গুহ্যক, কিন্নরগন্ধর্বদের অধিপতি। এরাই কুবেরকে পৃথিবীর ধনসম্পদ ও নিজ শহর রক্ষায় সাহায্য করে। কুবের হলেন পর্যটকদের রক্ষাকর্তা এবং ভক্তকে সম্পদদাতা। রাক্ষসরাও কুবেরের সেবা করে।[২] যদিও রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় কিছু নরখাদক রাক্ষস রাবণের পক্ষ অবলম্বন করেছিল।[১২] কুবেরকে একজন অপ্রধান বিবাহ-দেবতা হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ অনুষ্ঠানে শিবের সঙ্গে কুবেরকেও আবাহন করা হয়।[২০] জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধির দেবতার মর্যাদাও কুবেরকে দেওয়া হয়।[২১]

মহাভারত ও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, কুবের বিবাহ করেছিলেন মুর দানবের কন্যা ভদ্রা বা কুবেরীকে। তিনি যক্ষী ও চর্বী নামেও পরিচিত। কুবের ও ভদ্রার তিন পুত্র: নলকুবের, মণিগ্রীব বা বর্ণকবি ও ময়ূরজ এবং এক কন্যা মীণাক্ষী।[২][৮][১৯]

পূজা[সম্পাদনা]

হিন্দুশাস্ত্রে জগতের কোষাধ্যক্ষ রূপে কুবেরকে পূজা করার বিধান দেওয়া হয়েছে। কথিত আছে, বেঙ্কটেশ্বর (বিষ্ণুর এক রূপ) পদ্মাবতীকে বিবাহ করার জন্য কুবেরের থেকে কিছু ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। এই কথা স্মরণ করে ভক্তেরা তিরুপতি মন্দিরে বেঙ্কটেশ্বরের "হুন্ডি"তে (দানপাত্রে) দান করেন, যাতে বেঙ্কটেশ্বর কুবেরের ঋণ শোধ করতে পারেন।[২২]

কুবের এখনও ধনসম্পদের দেবতা হিসেবে পূজিত হলেও। প্রজ্ঞা, সৌভাগ্য ও বিঘ্নহরণের দেবতা হিসেবে কুবেরের ভূমিকাটি প্রধান গণেশ নিয়ে নিয়েছেন। গণেশের সঙ্গে কুবেরের একটি সম্পর্কের কথাও হিন্দুশাস্ত্রে কথিত হয়।[২][১৫]

ড. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, "কুবের পুরাণ প্রসিদ্ধ দেবতা। যদিও পুরাণের যুগেও কুবের অপ্রধান দেবতা, তাঁর পূজাও সচরাচর দেখা যায় না, তথাপি বাঙ্গালাদেশে অন্নপূর্ণা পূজায় অন্নপূর্ণার সঙ্গে কুবেরের মূর্তিও পূজিত হয়ে থাকে। লক্ষ্মীপূজার সময়েও লক্ষ্মীর সঙ্গে ধনাধিপতি কুবেরের পূজা হয়। ...হিন্দুর নিত্য-নৈমিত্তিক কর্মে দশদিকপালের অন্যতম হিসাবে কুবেরও পূজা পেয়ে থাকেন। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে ধনাধিষ্ঠাতা হিসেবে কুবেরের পূজা প্রচলিত নেই।"[২৩]

অন্যান্য ধর্মে[সম্পাদনা]

কুবেরের বৌদ্ধ প্রতিরূপ জম্ভল
হস্তীপৃষ্ঠে কুবের, ইলোরার জৈন গুহায়

ভারত ও হিন্দুধর্মের বাইরেও কুবেরের স্বীকৃতি আছে। বৌদ্ধ ও জৈন পুরাণে তিনি এক জনপ্রিয় চরিত্র।[৩] প্রাচ্যবিদ ড. নগেন্দ্র কুমার সিংহের মতে, "প্রত্যেক ভারতীয় ধর্মে হিন্দু কুবেরের অনুরূপ একজন কুবের আছেন।"[২৪]

বৌদ্ধধর্ম[সম্পাদনা]

বৌদ্ধধর্মে কুবের হলেন বৈশ্রবণ বা জম্ভল এবং জাপানি বৌদ্ধধর্মে তিনিই বিশামোন। হিন্দু কুবেরের মতোই বৌদ্ধ বৈশ্রবণ উত্তর দিকের লোকপাল ও যক্ষগণের অধিপতি। বৌদ্ধধর্মে তিনি চার প্রধান দিকের অধিপতি চতুর্মহারাজের অন্যতম।[২৫] বৌদ্ধ কিংবদন্তি অনুসারে, কুবের হলেন পঞ্চিক। প্রাচুর্যের প্রতীক হারীতী পঞ্চিককে বিবাহ করেছিলেন।[২৬] এ. গ্রেটি মনে করেন, কুবের ও পঞ্চিকের মূর্তিকল্পনার মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষে এমন সাদৃশ্য দেখা যায় যে উভয়কে পৃথক করা অত্যন্ত কঠিন কাজ হয়ে পড়ে।[৫] জাপানি বিশামোন (নামান্তরে তামোন-তেন[২৭]) জুনি-তেন-এর (十二天) অন্যতম সদস্য। এই জুনি-তেন হল হিন্দুধর্ম থেকে বৌদ্ধধর্মে রক্ষাকর্তা দেবতা (দেব বা তেন) হিসেবে গৃহীত বারো জন দেবতার একটি মণ্ডলী। বৌদ্ধ মন্দিরগুলিতে বা তার আশেপাশে এই দেবতাদের পূজা করা হয়। পূর্ববর্তী হাপপৌ-তেন বা অষ্টদিকপাল দেবমণ্ডলীর সঙ্গে আরও চারজন দেবতাকে যুক্ত করে বারো জনের জুনি-তেন মণ্ডলীটি কল্পিত হয়। হিন্দু কুবেরের মতো বিশামোনও উত্তর দিকের অধিপতি।[২৭][২৮][২৯]

জৈনধর্মে[সম্পাদনা]

জৈনধর্মে কুবের হলেন ঊনবিংশ তীর্থংকর মল্লীনাথের পার্শ্বচর যক্ষ।[২৪] কুবেরকে জৈনধর্মে সাধারণত "সর্বানুভূতি" বা "সর্বহ্ন" বলা হয়। জৈন মূর্তিকল্পে তিনি চারটি মুখ, রামধনুর বর্ণ ও আটটি হাতের অধিকারী। দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে, কুবেরের ছয়টি অস্ত্র ও তিনটি মাথা; অন্যদিকে শ্বেতাম্বর মৃৎপাত্রের চিত্রে দেখা যায় তিনি চতুর্ভূজ বা ষড়ভূজ, অসংখ্য অস্ত্র ধারণ করে আছেন। যদিও কুবেরের হাতে রত্নময় থলি ও লেবু সব মূর্তিতেই দেখা যায়। তিনি নরবাহন বা হস্তীবাহন।[২৪][৩০] তবে বৌদ্ধ কুবেরের সঙ্গে হিন্দু কুবের অপেক্ষা বৌদ্ধ জম্ভলের সাদৃশ্যই বেশি।[৩০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. দ্য পোয়েমস অফ সুরদাস। অভিনব পাবলিকেশন। ১৯৯৯। আইএসবিএন 9788170173694 
  2. ন্যাপ, স্টিফেন (২০০৫)। দ্য হার্ট অফ হিন্দুইজম: দি ইস্টার্ন পাথ টু ফ্রিডম, এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড ইল্যুমিনেশন। আইভার্স। পৃষ্ঠা ১৯২–৯৩। আইএসবিএন 0-595-79779-2 
  3. কুবের। (২০১০)। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিয়া গ্রন্থে। ৮ জুলাই, ২০১০ তারিখে উদ্ধারকৃত: থেকে
  4. হপকিনস ১৯১৫, পৃ. ১৪৭
  5. ডোনাল্ডসন, টমাস ই. (২০০১)। "জম্ভল/পঞ্চিক"। আইকনোগ্রাফি অফ দ্য বুদ্ধিস্ট স্কাল্পচার অফ ওড়িশা। অভিনব পাবলিকেশনস। পৃষ্ঠা ৩২৯–৩০। আইএসবিএন 81-7017-406-6 
  6. প্রকাশ, ওম (২০০০)। "অর্থ অ্যান্ড অর্থশাস্ত্র ইন দ্য পুরাণিক আইকনোগ্রাফি অ্যান্ড দেয়ার সিম্বলিক ইমপ্লিকেশনস"। নগেন্দ্র কুমার সিং। এনসাইক্লোপিডিয়া অফ হিন্দুইজম। ৩১–৪৫। আনমোল পাবলিকেশনস প্রাঃ লিঃ। পৃষ্ঠা ৪১–৪৪। আইএসবিএন 81-7488-168-9 
  7. মণি, বেত্তম (১৯৭৫)। পুরাণিক এনসাইক্লোপিডিয়া: আ কমপ্রিহেনসিভ ডিকশনারি উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দি এপিক অ্যান্ড পুরাণিক লিটারেচার। দিল্লি: মোতিলাল বনারসিদাস। পৃষ্ঠা ৪৩৪–৩৭। আইএসবিএন 0-8426-0822-2 
  8. ড্যানিয়েলো, অ্যালেইন (১৯৬৪)। "কুবের, দ্য লর্ড অফ রিচেস"। দ্য মিথস অ্যান্ড গডস অফ ইন্ডিয়া। ইনার ট্র্যাডিশনস/বিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি। পৃষ্ঠা ১৩৫–৩৭। 
  9. সাদারল্যান্ড ১৯৯১, পৃ. ৬৫
  10. মনিয়ার-উইলিয়ামস অভিধান: কুবের
  11. সাদারল্যান্ড ১৯৯১, পৃ. ৬৩
  12. হপকিনস ১৯১৫, পৃ. ১৪২–৪৩
  13. হপকিনস ১৯১৫, পৃ. ১৪৪–৪৫
  14. গোপাল, মদন (১৯৯০)। কে.এস. গৌতম, সম্পাদক। ইন্ডিয়া থ্রু দি এজেস। প্রকাশন বিভাগ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক, ভারত সরকার। পৃষ্ঠা ৬৫ 
  15. উইলিয়ামস, জর্জ ম্যাসন (২০০৩)। "কুবের"। হ্যান্ডবুক অফ হিন্দু মিথোলজি। এবিসি-ক্লিও। পৃষ্ঠা ১৯০–৯১আইএসবিএন 1-85109-650-7 
  16. "শতপথ ব্রাহ্মণ, পঞ্চম খণ্ড (এসবিই৪৪): ত্রয়োদশ কাণ্ড: তেরো, ৪, ৩। তৃতীয় ব্রাহ্মণ (১৩.৪.৩.১০)"www.sacred-texts.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৬-২৩ 
  17. হপকিনস ১৯১৫, পৃ. ১৪৬
  18. লোকপালের জন্য দেখুন, হপকিনস ১৯১৫, পৃ. ১৪৯–৫২
  19. উইলকিনস, ডব্লিউ. জে. (১৯৯০)। হিন্দু মিথোলজি, বেদিক অ্যান্ড পুরাণিক। সেক্রেড টেক্সটস আর্কাইভ। পৃষ্ঠা ৩৮৮–৯৩। আইএসবিএন 1-4021-9308-4 
  20. হপকিনিস ১৯১৫, পৃ. ১৪৮
  21. সাদারল্যান্ড ১৯৯১, পৃ. ৬১
  22. ফেয়ারস অ্যান্ড ফেস্টিভ্যালস অফ ইন্ডিয়া। পুস্তক মহল। সেপ্টেম্বর ২০০৬। পৃষ্ঠা ৩২। আইএসবিএন 81-223-0951-8 
  23. ড. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য ১৯৮৬, পৃ. ৩৯৩
  24. নগেন্দ্র কুমার সিংহ, সম্পাদক (২০০১)। এনসাইক্লোপিডিয়া অফ জৈনিজম। আনমোল পাবলিকেশনস প্রাঃ লিঃ। পৃষ্ঠা ৭২-৮০। আইএসবিএন 81-261-0691-3 
  25. চৌধুরী, সরোজ কুমার (২০০৩)। "অধ্যায় ২: বৈশ্রবণ, মহারাজ"। হিন্দু গডস অ্যান্ড গডেসেস ইন জাপান। বেদমস ইবুকস (প্রাঃ) লিঃ। আইএসবিএন 81-7936-009-1 
  26. সাদারল্যান্ড, পৃ. ৬৩–৬৪, ৬৬
  27. এস. বিশ্বাস (২০০০), আর্ট অফ জাপান, নর্দার্ন, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭২১১২৬৯১, পৃ. ১৮৪
  28. বারো স্বর্গীয় দেবতা (দেব) নারা জাতীয় জাদুঘর, জাপান
  29. আড্রিয়ান স্নোডগ্রাস (২০০৭), দ্য সিম্বলিজম অফ দ্য স্তূপ, মোতিলাল বনারসিদাস, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১২০৮০৭৮১৫, পৃ. ১২০–১২৪, ২৯৮–৩০০
  30. পেরেইরা, জোস (১৯৭৭)। মনোলিথিক জিনাস দি আইকনোগ্রাফি অফ দ্য জৈন টেম্পলস অফ ইলোরা। মোতলাল বনারসিদাস। পৃষ্ঠা ৬০–১। আইএসবিএন 0-8426-1027-8 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

  • হপকিনস, এডওয়ার্ড ওয়াশবার্ন (১৯১৫)। এপিক মিথোলজি। স্ট্রাসবার্গ কে. জে. ট্রাবনার। আইএসবিএন 0-8426-0560-6 
  • সাদারল্যান্ড, গেইল হিনিচ (১৯৯১)। দ্য ডিসগাইসেস অফ দ্য ডেমন: দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য যক্ষ ইন হিন্দুইজম অ্যান্ড বুদ্ধিজম। সুনি প্রেস। আইএসবিএন 0-7914-0622-9 
  • ভট্টাচার্য, ড. হংসনারায়ণ (১৯৮৬)। হিন্দুদের দেবদেবী: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, তৃতীয় পর্ব। ফার্মা কেএলএম প্রাঃ লিঃ। আইএসবিএন 81-7102-148-4 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]