ভাগবত পুরাণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দেবীভাগবত পুরাণ অথবা ভগবদ্গীতা নিবন্ধের সাথে বিভ্রান্ত হবেন না।
কালযবন পরিবেষ্টিত মথুরা (যেখানে কৃষ্ণবলরাম উপবিষ্ট), ভাগবত পুরাণের একটি পুথিচিত্র, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)

টেমপ্লেট:Italics title

ভাগবত পুরাণ (দেবনাগরী: भागवतपुराण; অন্যান্য নাম শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবতম্‌ বা ভাগবত; অর্থাৎ, পরমেশ্বরের পবিত্র কাহিনি) হল একটি হিন্দু মহাপুরাণ। এটি একটি ভক্তিবাদী ধর্মগ্রন্থ। বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার তথা "স্বয়ং ভগবান" কৃষ্ণের প্রতি গভীর ব্যক্তিগত ভক্তিই এই পুরাণের প্রধান আলোচ্য বিষয়।[১] হিন্দু পৌরাণিক সাহিত্যের অনেক কাহিনি তথা বিষ্ণুর চব্বিশ জন অবতারের কাহিনি ভাগবত পুরাণে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ভাগবত পুরাণই প্রথম পুরাণ যেটি কোনো ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়। ১৮৪০ থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে ভাগবত পুরাণের তিনটি ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।[২] পদ্মপুরাণের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে ভাগবত পুরাণ একটি সাত্ত্বিক পুরাণ (অর্থাৎ, এই পুরাণ কল্যাণ ও পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত)।[৩] প্রচলিত হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, ব্যাস এই পুরাণের রচয়িতা।

ভাগবত পুরাণকে পবিত্রতম ও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরাণ মনে করা হয়। কারণ, এটি বিষ্ণু ও তাঁর বিভিন্ন অবতারের (প্রধানত কৃষ্ণের) প্রতি ভক্তির কথা প্রচার করে।[৪] এই পুরাণে জাগতিক কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি, বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের উপায় ও বিষ্ণুভক্তির মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।[৫]

ভাগবত পুরাণে বিষ্ণুকে (নারায়ণ) পরব্রহ্ম বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনিই অসংখ্য বিশ্ব সৃষ্টি করে প্রতিটির মধ্যে ঈশ্বর-রূপে প্রবেশ করেন।[৬] বিষ্ণু রজোগুণ অবলম্বন করে ব্রহ্মা রূপে প্রত্যেক বিশ্বের মধ্যে চোদ্দোটি করে জগৎ সৃষ্টি করেন; সত্ত্বগুণ গ্রহণ করে বিষ্ণু রূপে সেই জগৎগুলি রক্ষা ও প্রতিপালন করেন এবং মহাকল্পের অন্তকালে তমোগুণ অবলম্বন করে রুদ্র রূপে সেই জগৎগুলি ধ্বংস করেন।[৭][৮]

এই পুরাণ প্রথমে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। এর বর্তমান রূপটি খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে লিপিবদ্ধ হয়।[২][৯][১০]

বিষ্ণুর যে মানবরূপ কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ভাগবত পুরাণের আলোচ্য, সেই কৃষ্ণের কাহিনি এই পুরাণের ১০ম স্কন্ধে এককভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই স্কন্ধটি সমগ্র ভাগবত পুরাণের এক-চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে।[২] কৃষ্ণের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল ঘটনা এই স্কন্ধেই সুসংবদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে ভক্তিযোগের আচরণ-পদ্ধতি, ভক্তির ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন ধরনের ভক্তির বর্ণনা।[১১] অনেক বৈষ্ণব এই গ্রন্থটিকে ও কৃষ্ণকে অভিন্ন এবং এই গ্রন্থটিকেই কৃষ্ণের বাণীমূর্তি মনে করেন।

ভাগবত পুরাণের সকল কাহিনি ব্যাসের পুত্র শুকের মুখে বর্ণনাচ্ছলে কথিত হয়েছে। মহাভারতে আছে রাজা পরীক্ষিৎ কৃষ্ণের তৎপরতায় জীবন পেয়েছিলেন। ভাগবত পুরাণে দেখা যায়, মৃত্যুপথযাত্রী পরীক্ষিৎ শুকের মুখে কৃষ্ণের কথা জানতে চান। তাঁর নানা প্রশ্নের উত্তরে সাত দিনে শুক তাঁর কাছে ভাগবত পুরাণের কাহিনি বিবৃত করেন।

গুরুত্ব[সম্পাদনা]

কৃষ্ণ ও তৃণাবর্ত অসুরের যুদ্ধ।
মানাকু (শিল্পী) - ভাগবত পুরাণ পুথিচিত্র, ব্রুকলিন জাদুঘর।

ভাগবত পুরাণ সর্বাধিক পরিচিত ও সর্বাধিক প্রভাবশালী [[পুরাণ। ইতিহাস ও অন্যান্য পুরাণের পাশে এটিকে "পঞ্চম বেদ" বলা হয়ে থাকে।[১২][১৩] ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যে ভাগবত পুরাণ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। কারণ, ভক্তিবাদের উপর এই পুরাণ বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ভগবদ্গীতার তাত্ত্বিক ভক্তির তুলনায় ভাগবত পুরাণের ভক্তি অনেক বেশি ব্যবহারিক। ধর্মের সংজ্ঞা এই পুরাণে পুনরালোচিত হয়েছে এবং ঈশ্বরকে মানবরূপী বলে তাঁর সেই স্বরূপের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।[১১] ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত কৃষ্ণের ছেলেবেলার নানান জনপ্রিয় কাহিনির উৎস এই পুরাণ।[২] ভাগবত পুরাণ নিজেকে বেদান্তের সার বলে ঘোষণা করে থাকে:

"শ্রীমদ্ভাগবতম্‌ হল বেদান্ত সাহিত্যের যথার্থ সারমর্ম। যিনি এই গ্রন্থের রসামৃত পান করেন, তিনি অন্য কিছু কামনা করেন না।" (12.13.15)[১৪]

বৈষ্ণবরা বিষ্ণু পুরাণভগবদ্গীতাকে বিষ্ণুভক্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধান শাস্ত্রীয় উৎস মনে করেন। ভাগবত পুরাণের একটি বহু-উদ্ধৃত শ্লোক উদ্ধৃত করে কৃষ্ণ-উপাসক বৈষ্ণবরা কৃষ্ণকে "স্বয়ং ভগবান" বা সাক্ষাৎ ঈশ্বর হিসেবে দাবি করে থাকেন: "এঁরা [অন্যান্য অবতারগণ] অংশ, বা কলা, অংশাবতার, কিন্তু "কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্‌", কৃষ্ণ নিজেই ভগবান"।(1.3.28).[১৫] কিন্তু কোনো কোনো বৈদিক পণ্ডিত বলে থাকেন, কৃষ্ণকে স্বয়ং ভগবান বলার কারণ, তিনি মহাবিষ্ণুর পূর্ণাবতার। বিষ্ণুপুরাণেও কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার বলা হয়েছে। রাম প্রভৃতি বিষ্ণুর অন্যান্য অবতারগণকেও "ভগবান" বলা হয়ে থাকে।

১৫শ-১৬শ শতকে অসমে একেশ্বরবাদী একশরণ ধর্মের প্রবর্তক শঙ্করদেব ভাগবত পুরাণের একটি অসমীয়া অনুবাদ (শঙ্করদেবের ভাগবত) রচনা করেন। শঙ্করদেবের দশম স্কন্ধের অনুবাদ দশম বিশেষ জনপ্রিয়।

লক্ষ্য[সম্পাদনা]

ভাগবত পুরাণে হিন্দুধর্মের সকল ধর্মগ্রন্থ সহ ভাগবত পুরাণের লক্ষ্য বর্ণিত হয়েছে। এই পুরাণে বলা হয়েছে, অদ্বৈতের রহস্য ভাগবত পুরাণেই নিহিত এবং ভাগবত পুরাণের সত্যকার দর্শণ হল অদ্বৈত দর্শন।

″সর্ববেদান্তসারং যদ্‌ব্রহ্মত্মৈকত্ব লক্ষণং বস্ত্বদ্বৈতিয়ং তন্নিষ্ঠং কৈবলৈকপ্রয়োজনম্‌″(ভাগবত পুরাণ, দ্বাদশ স্কন্ধ, ত্রয়োদশ অধ্যায়, দ্বাদশ শ্লোক।) ″তুমি ইতিমধ্যেই জানো যে বেদান্তের সার হল আত্মাব্রহ্মের অদ্বৈত মিলন। কেবল এটিই হল ভাগবত পুরাণের আলোচ্য বিষয়। [এই পুরাণের] লক্ষ্য হল কেবলমাত্র কৈবল্য মোক্ষ।″[১৬]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Bhagavata Purana Canto 12 Chapter 13 Verse 11
  2. ২.০ ২.১ ২.২ ২.৩ Bryant 2007, পৃ. 111–113
  3. Wilson, H. H. (1840)। The Vishnu Purana: A system of Hindu mythology and tradition। Oriental Translation Fund। পৃ: 12। 
  4. Bhagavata Purana: Canto 12 Chapter 13 Verse 16
  5. Bhagavata Purana Canto 12 Chapter 13 Verse 18
  6. Bhagavata Purana Canto 2 Chapter 10 Verse 10
  7. Bhagavata Purana Canto 2 Chapter 5 Verse 16-18
  8. Bhagavata Purana Canto 11 Chapter 4 Verse 5
  9. "Anthology of World Scriptures", by Robert Van Voorst, p. 28, year = 2007, isbn = 1111810745
  10. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; Blackwell নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  11. ১১.০ ১১.১ Kumar Das 2006, পৃ. 172–173
  12. Sheridan 1986, পৃ. 1–16
  13. Matchett 2001, পৃ. 107
  14. Haberman & Rūpagōsvāmī 2003, পৃ. 65
  15. Bryant 2007, পৃ. 113–114
  16. Bhagavata Purana Canto 12 Chapter 13 Verse 12

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

অতিরিক্ত পাঠ[সম্পাদনা]

  • Mani, Vettam. Puranic Encyclopedia. 1st English ed. New Delhi: Motilal Banarsidass, 1975.
  • Cheever Mackenzie Brown. The triumph of the goddess: the canonical models and theological visions of the Devī-Bhāgavata Purāṇa. SUNY Press, 1990. ISBN 0-7914-0363-7. Excerpts

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

English
Sanskrit
For Children