বিষয়বস্তুতে চলুন

আহলে কুরআন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(কুরানবাদী থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পবিত্র কুরআনের আরবি কপি।

আহলে কুরআন বা কুরআনবাদী হলো ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে যারা শুধুমাত্র কুরআনকে ইসলাম ধর্মের বিধান ও আইন হিসাবে মানে ও বিশ্বাস করে।[] তারা অবশ্য "কুরআন ওনলি" বলেও নিজেদের পরিচয় দেয়। তারা হাদিস, ইজমা ইত্যাদিকে ইসলামের বিধান ও আইন হিসাবে মানে না।[] তাদের যুক্তি হল, কুরআন হলো পুর্নাঙ্গ ও সুবিস্তারিত গ্রন্থ; তাই কুরআনের কোন ব্যাখ্যার দরকার নেই এবং তাদের মতে, ইসলামের নবী কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ করতেন না। তাই কুরআন অনুসরণ করলেই তাকে অনুসরণ করা হয়ে যায়।[][] মূলধারার সকল ইসলামপন্থীদের মতে, এই মতবাদটি একটি ভ্রান্ত মতবাদ এবং এতে বিশ্বাস করা ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে।[]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

ইসলামের প্রাথমিক যুগ

[সম্পাদনা]

কুরআনবাদীরা তাদের বিশ্বাসের সূচনা মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময় থেকে করে বলে দাবি করে, যিনি তাদের মতে হাদিস লেখা নিষিদ্ধ করেছিলেন।[][][] যেহেতু তারা বিশ্বাস করে যে হাদিস ইসলাম ধর্মের নির্ভরযোগ্য উৎস না হলেও ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য এটিকে একটি তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তাই তারা তাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করার জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগের বেশ কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরে। এই বর্ণনাগুলোর মধ্যে একটি অনুসারে, মুহাম্মদ সাঃ সাহাবী এবং দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)(শাসনকাল ৬৩৪-৬৪৪) তার শাসনামলে হাদিস লেখা নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং বিদ্যমান সংকলনগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। অনুরূপ বর্ণনায় দাবি করা হয় যে, উমর রাঃ যখন কুফায় একজন গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তিনি তাকে বলেছিলেন: "তুমি এমন এক শহরের মানুষের কাছে যাবে, যাদের কাছে কুরআনের গুঞ্জন মৌমাছির গুঞ্জনের মতো। অতএব, হাদিস দিয়ে তাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করো না এবং এভাবে তাদের ব্যস্ত রেখো না। কুরআনকে উন্মোচন করো এবং আল্লাহর রাসূলের হাদিসকে রেহাই দাও![][]


খারেজীদের হাদিস অস্বীকারকার

[সম্পাদনা]

হাদিসকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার যে অবস্থান আজকের কুরআনবাদীদের (আহলে কুরআন) মধ্যে দেখা যায়, তার অস্তিত্ব ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেই খারিজিদের মধ্যে পরিচিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আবু আল-কাসিম আল-বালখী (মৃত্যু ৯৩১) তাঁর কিতাব আল-মাকালাত-এ খারিজিদের সম্পর্কে বলেন যে, তারা "তারা হলো সেইসব লোক, যারা সমগ্র বর্ণনাগত ঐতিহ্য (নাকল)কে সম্পূর্ণ বাতিল বলে ঘোষণা করে এবং দাবি করে যে, কেবল কিতাব (কুরআন) স্পষ্টভাবে যা বলেছে, শুধু সেটুকুই জানা আবশ্যক।"[১০][১১]

মুতাযিলি চিন্তাবিদ দিরার ইবন আমর (প্রায় ৮১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন) বর্ণনা করেন যে, খারিজিদের দুটি শাখা—আজারিকাহ (Azraqites) ও বাজীঘিয়াহ (Bazīghites)—এর শিক্ষা অনুযায়ী, "ধর্মীয় জ্ঞান কেবল কুরআন থেকেই অর্জন করা যায়; তারা ইজমা এবং সমস্ত হাদিস-ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করত।" আরও বলা হয়, প্রাথমিক খারিজি নেতা আবদুল্লাহ ইবন ইবাদ হিজরি ৭৬ সালে (৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে) উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে, তাতে কর্তব্য ও নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি হিসেবে হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং মানুষকে কেবল কুরআনের অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়।

আজারিকাহদের একটি উপদল বিদঈয়াহ (Bidʿīya) সূরা ১১:১১৪-এর ভিত্তিতে প্রতিদিন মাত্র দুটি ফরজ নামাজকে স্বীকৃতি দিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[১২]

খারিজিদের একটি অংশ ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড (রজম) প্রত্যাখ্যান করেছিল। যদিও কুরআনে এই শাস্তির উল্লেখ নেই, সুন্নি মতানুসারে কুরআনে এ বিষয়ে একটি আয়াত ছিল, যা পরে নাসখ (বাতিল বা রহিত) হয়ে যায়। উমর রাঃ এর নামে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি কুরআনে এমন একটি আয়াতের অস্তিত্বের কথা বলেছেন। এই খারিজিরা এমন আয়াতের সত্যতা অস্বীকার করেছিল। আবুল হাসান আশআরী এই মতটি খারিজিদের আজারিকাহ (Azariqa) শাখার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আইনগত বিষয়ে তারা কঠোর গ্রন্থনিষ্ঠ (scripturalist) অবস্থান গ্রহণ করত—অর্থাৎ কেবল কুরআন অনুসরণ করত এবং যার কুরআনিক ভিত্তি ছিল না, এমন প্রচলিত মতামত প্রত্যাখ্যান করত। এ কারণেই তারা কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপের ক্ষেত্রে অপবাদদাতার ওপর শরিয়ত-নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করত না।

ইমাম শাফিয়ী (মৃত্যু ৮২০) তাঁর জিমাʿ আল-ইলম গ্রন্থে এমন একদল আলেমের কথাও উল্লেখ করেন, যারা হাদিসের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করতেন। তিনি তাদের যুক্তি এভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরেন: সূরা ১৬:৮৯-এ কুরআনকে "প্রত্যেক বিষয়ের ব্যাখ্যা" (তিবইয়ান লি-কুল্লি শাইʾ) বলা হয়েছে। তাই আইনগত বিধান নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য কুরআনেই বিদ্যমান; ফলে কুরআনের বিধান ব্যাখ্যা করতে হাদিসের প্রয়োজন নেই। যেহেতু কুরআনে নামাজের নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সময় এবং যাকাতের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি, তাই কেউ যদি দিনে মাত্র একবার বা কয়েক দিন পরপর একবার নামাজ পড়ে, অথবা এমন অল্প পরিমাণ দান করে যা সদকা হিসেবে গণ্য হতে পারে, তাহলেও সে তার দায়িত্ব পালন করেছে বলে গণ্য হবে।

আশ-শাফিঈ তাঁর লেখায় কোথাও এই মতাবলম্বী ব্যক্তিদের নাম বা তাদের চিন্তাধারার বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করেননি। Joseph Schacht-এর মতে, এই দলটি ছিল মুতাযিলি। অন্যদিকে, এই মতবাদগুলোর সঙ্গে খারিজিদের সম্পর্কে বর্ণিত মতবাদের সাদৃশ্যের কারণে হুসেইন হানসু ধারণা করেন যে, আশ-শাফিঈ যাদের কথা বলেছেন, তারা মূলত খারিজিই ছিলেন।

যদিও মুতাযিলিদের মধ্যেও হাদিস সম্পর্কে বিভিন্ন সমালোচনামূলক অবস্থান ছিল, তারা কুরআনের বাইরের নববী কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। বরং তারা মত দেন যে, ইসলামী আইনগত বিধানের ভিত্তি কেবল সেই বিষয়ই হতে পারে, যা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। তাই তারা একক সূত্রে বর্ণিত (আহাদ) হাদিস গ্রহণ করতেন না; বরং কেবল সেইসব হাদিস গ্রহণ করতেন, যেগুলো এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে, সেগুলোর অসত্য হওয়া কল্পনাতীত বলে মনে হতো।

তবে নবম শতাব্দীর পর মুতাযিলিরা এই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে এবং একক ব্যক্তির মাধ্যমে বর্ণিত হাদিসকেও নিশ্চিত জ্ঞানের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে আশ-শাফিঈর অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।[১৩][১৪] Joseph Schacht was of the opinion that this group were Muʿtazilites.[১৫]

উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ

[সম্পাদনা]

উমর যে কুফাবাসীদের ধর্মীয় জীবনে কুরআনের কেন্দ্রীয় অবস্থানের কথা বর্ণনা করেছিলেন, তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। কয়েক দশক পরে উমাইয়া খলিফা মালিক ইবনে মারওয়ান (শাসনকাল: ৬৮৫–৭০৫)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে কুফাবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়:

"তারা তাদের প্রতিপালকের বিধান পরিত্যাগ করেছে এবং নিজেদের ধর্ম হিসেবে হাদিস গ্রহণ করেছে। তারা দাবি করে যে, কুরআন ছাড়াও তারা অন্য উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে... তারা এমন একটি গ্রন্থে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়; বরং মানুষের হাতে রচিত, তারপর সেটিকে তারা আল্লাহর রাসূলের প্রতি সমর্পণ করেছে।"

[১৬]

পরবর্তী বছরগুলোতে হাদিস লিখন ও অনুসরণের ওপর যে অনীহা বা নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা এতটাই শিথিল হয়ে যায় যে অষ্টম উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (শাসনকাল: ৭১৭–৭২০) প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে হাদিস সংকলনের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে হাদিস লিপিবদ্ধকারীদের মধ্যে আবু বকর ইবন মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাজম এবং মুহাম্মাদ ইবন শিহাব আয-যুহরী অন্যতম ছিলেন।[১৭][১৮]

যদিও ধীরে ধীরে হাদিসের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তবুও আব্বাসীয় যুগেও হাদিসের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অব্যাহত ছিল। এই প্রবণতা ইমাম মুহাম্মদ ইদ্রিস ইবনে শাফেয়ী রহঃ-এর সময়েও বিদ্যমান ছিল। সে সময় আহলুল কালাম (Ahl al-Kalam) নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী যুক্তি দিত যে, নবী মুহাম্মদের আদর্শ অনুসরণ বলতে বোঝায় শুধু কুরআনের অনুসরণ, হাদিসের নয়।

তাদের মতে, অধিকাংশ হাদিসই ছিল কেবল অনুমান, ধারণা ও বিদআত। অন্যদিকে, আল্লাহর কিতাব (কুরআন) পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ; তাই তাকে সম্পূরক বা ব্যাখ্যা করার জন্য হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই।

এমন কিছু বিশিষ্ট আলেমও ছিলেন, যারা প্রচলিত হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দিরার ইবনে আমর। তিনি "হাদিসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ" (The Contradiction Within Hadith) শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তবে পূর্ববর্তী শতাব্দীর তুলনায় তখন পরিস্থিতি এতটাই বদলে গিয়েছিল যে, দিরারকে প্রহার করা হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়। দিরার ইবন আমরের মতোই আলেম আবু বকর আল-আসামও হাদিসকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না।

আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন (শাসনকাল: ৮১৩–৮৩৩)-এর আমলে কালামপন্থীরা রাষ্ট্রীয় সমর্থন লাভ করেন, আর হাদিসপন্থীদের প্রতি কঠোর আচরণ করা হয়। আল-মামুন ধর্মীয় বিষয়ে যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন, কালামের সমর্থকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং হাদিসপন্থীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন।

তাঁর পরবর্তী দুই উত্তরসূরি—আল মু'তাসিম (শাসনকাল: ৮৩৩–৮৪২) এবং আল ওয়াছিক (শাসনকাল: ৮৪২–৮৪৭)—তাঁর নীতিই অনুসরণ করেন।

তবে তাঁদের তিন পূর্বসূরির বিপরীতে আল মুতাওয়াক্কিল (শাসনকাল: ৮৪৭–৮৬১) ধর্মীয় বিষয়ে যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন না। বরং তিনি সুন্নাহর একটি অপরিহার্য উৎস হিসেবে হাদিসের মর্যাদা ও অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।[১৯][২০]

আধুনিক ভারত উপমহাদেশ ও মিশরে আহলে কুরআনদের উত্থান

[সম্পাদনা]

১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে মুসলিম সংস্কারবাদী চিন্তাবিদরা পুনরায় ইসলামী আইনের উৎসগুলোর কর্তৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তারা তাকলীদ (taqlīd) প্রত্যাখ্যান করেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানান।[২১] একই সঙ্গে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের মুখোমুখি হওয়ার বাস্তবতাও সামনে আসে। মুসলিম আলেমদের তখন নতুন নতুন প্রশ্ন ও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়, যা মিশনারি ও প্রাচ্যবিদদের (Orientalists) মাধ্যমে পশ্চিমা চিন্তার প্রভাব বিস্তারের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল।[২২] পাশাপাশি তারা পশ্চিমা দেশগুলোর অগ্রগতির তুলনায় মুসলিমদের পশ্চাৎপদতার কারণও খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।[২২]

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া, ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দেওয়া এবং ইসলামকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাতে তা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়—এই উদ্দেশ্যে কিছু আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ ধর্মের মৌলিক ভিত্তিকে ইতিহাসের প্রভাব ও ঐতিহ্য থেকে পৃথক করার চেষ্টা করেন। এ লক্ষ্যে তারা ইসলামী আইনের চারটি ঐতিহ্যগত উৎস—কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা (Ijmāʿ) এবং কিয়াস (Qiyās)—সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করেন।[২৩]

এই প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে, এমন একদল চিন্তাবিদ ও আলেমের আবির্ভাব ঘটে যারা হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করে কুরআনকে একমাত্র প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। স্যার সৈয়দ আহমদ খান (মৃত্যু ১৮৯৮), যিনি আলিগড় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা,[২৪] তিনি যুক্তি দেন যে কুরআনই ইসলামের একমাত্র কর্তৃত্বপূর্ণ উৎস। তাঁর মতে, প্রচলিত হাদিসসম্ভার নির্ভরযোগ্য নয়, কারণ ঐতিহ্যগত হাদিস সমালোচনায় হাদিসের সত্যতা নির্ধারণে কেবল বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।[২৫]

তবে তাঁর মতে, হাদিসের মাতন (matn)-কেও সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত এবং তা কুরআন ও যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা যাচাই করা উচিত।[২৬] এই ভিত্তিতে তিনি মনে করেন, কিছু ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ ও আইনগত বিধানকে যুক্তির ভিত্তিতে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে[২৭] এবং ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর না করে যুক্তির মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে।[২৮]

স্যার সৈয়দ আহমদ খানের চিন্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রকৃতির সংজ্ঞা। তিনি প্রকৃতির নিয়মকে—যাকে তিনি "আল্লাহর কর্ম (Work of God)" বলতেন—ওহির সঙ্গে—যাকে তিনি "আল্লাহর বাণী (Word of God)" বলতেন—সমতুল্য মনে করতেন।[২৯] এর ফলে অন্যান্য আলেমদের কেউ কেউ তাঁকে "প্রকৃতিবাদী"বা "ন্যাচারী"(Naychirī) বলে অভিহিত করেন,[২২] এবং তাঁর চিন্তাধারা বহু সমসাময়িক আলেমের সমালোচনার মুখে পড়ে।[৩০]

চেরাগ আলী (মৃত্যু ১৮৯৫) সৈয়দ আহমদ খানের চিন্তাধারাকে আরও বিকশিত করেন এবং হাদিসকে কর্তৃত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মুসলিম আলেমদের ইসনাদ (isnād)-কেন্দ্রিক সমালোচনারও সমালোচনা করেন এবং উল্লেখ করেন যে নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর বহু দশক পর পর্যন্ত হাদিস সংকলিত হয়নি।[৩১] এ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে প্রায় সব হাদিসই নির্ভরযোগ্য নয়। এই ধারণার ভিত্তিতে তিনি হাদিসভিত্তিক সব বিধান ও প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেন।[৩২]

তবে চেরাগ আলীর মূল উদ্দেশ্য হাদিসের সমালোচনা করা ছিল না; বরং আধুনিক যুগে ইসলামের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করা এবং ঐতিহ্যবাদী মুসলিমদের ধারণা ও পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের অভিযোগ থেকে দূরে থেকে "প্রকৃত ইসলাম" অনুসন্ধান করা ছিল তাঁর লক্ষ্য।[৩৩]

স্যার সৈয়দ আহমদ খানের সমসাময়িক সময়েই মিশরে মুহাম্মদ আবদুহ (মৃত্যু ১৯০৫) সতর্কতার সঙ্গে হাদিসের সমালোচনা শুরু করেন।[৩৪] তিনি কেবল মুতাওয়াতির (mutawātir) হাদিসকে চূড়ান্তভাবে বাধ্যতামূলক বলে মনে করতেন; অর্থাৎ যে হাদিস বহু মানুষের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।[৩৫] অন্যদিকে আহাদ (aḥād) হাদিস—যা সীমিত সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে এসেছে—শুধুমাত্র তখনই অনুসরণযোগ্য, যখন তা পাঠককে সন্তুষ্ট বা আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়।[৩৫]

এভাবে তিনি হাদিসকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান না করেই তার বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়ে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেন।[৩৪] তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ববর্তী মাযহাব ও উলামাদের অন্ধ অনুকরণ (তাকলীদ) প্রত্যাখ্যান করা, যা তাঁর মতে তাঁর দেশের মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।[৩৬]

১৯০৬ সালে মিশরীয় চিকিৎসক মোহাম্মদ তাওফিক সিদকী (মৃত্যু ১৯২০) রশিদ রিদা-এর সম্পাদিত আল-মানার (Al-Manār) পত্রিকায় "ইসলাম কেবল কুরআন" (Al-Islām huwa l-Qurʾān Waḥda-hū) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।[৩৭]

প্রবন্ধের শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় যে, সিদকী কেবল কুরআনকেই কর্তৃত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে এতে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নির্দেশনা বিদ্যমান।[৩৮] তাঁর মতে, নবীর সুন্নাহ ছিল মূলত তাঁর সমসাময়িকদের জন্য একটি আদর্শ। যদি নবী চাইতেন যে হাদিস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও অপরিহার্যভাবে পৌঁছাক, তবে তিনি কুরআনের মতোই সেগুলো লিখিয়ে রাখতেন।[৩৯]

অতএব, আজকের মুসলমানরা স্বাধীন যে তারা কুরআনে নেই কিন্তু নবীর নামে বর্ণিত কোনো বিষয় অনুসরণ করবে কি করবে না।[৪০]

সিদকীর এই প্রবন্ধ দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়[৪১] এবং এর বিরুদ্ধে একাধিক খণ্ডনমূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যা তাঁর জবাবসহ একই সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।[৪২]

মানুষের ওপর যা বাধ্যতামূলক, তা আল্লাহর কিতাবের বাইরে যায় না। ধর্মের জন্য যদি কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন হতো, তবে নবী অবশ্যই তা লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন এবং আল্লাহ নিজেই তার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিতেন।

— মুহাম্মদ তাওফীক সিদকী

সমালোচনা

[সম্পাদনা]

প্রধানত সুন্নীরা কুরআনবাদীদের সমালোচনা করে থাকে। তাদের বিপক্ষে সুন্নী মুসলিমরা একটি হাদীস উল্লেখ করে যেখানে বলা হয়েছে,

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, অচিরেই কোনো ব্যক্তি তার আসনে হেলান দেয়া অবস্থায় বসে থাকবে এবং তার সামনে আমার হাদীস থেকে বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে, আমাদের ও তোমাদের মাঝে মহামহিম আল্লাহ্-র কিতাবই যথেষ্ট। আমরা তাতে যা হালাল পাব তাকেই হালাল মানবো এবং তাতে যা হারাম পাবো তাকেই হারাম মানবো। (নবী বলেন) সাবধান! নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তার অনুরূপ।[৪৩][৪৪]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "quranresearchbd.org"। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩
  2. হাদিসের প্রামাণিকতা
  3. http://www.quran-islam.org
  4. দ্বীনের দলিল কয়টি? লেখক: তৈয়াবুর রহমান গোপালগঞ্জী
  5. "'নব্য আহলে কুরআনের' মূল অপরাধ রাসূল অবমাননা - মাসিক আলকাউসার"www.alkawsar.com। সংগ্রহের তারিখ ২৩ আগস্ট ২০২৩
  6. Usool Al-Hadeeth Islam Future December 2009.
  7. Musa, Aisha Y. (২০০৮)। Hadith as Scripture: Discussions on The Authority of Prophetic Traditions in Islam। Palgrave। আইএসবিএন ৯৭৮-০-২৩০-৬০৫৩৫-০
  8. 1 2 Aisha Y. Musa, Hadith as Scripture: Discussions on the Authority of Prophetic Traditions in Islam, Palgrave Macmillan, 2008, pp. 25–29.
  9. "Hadith Authority" (পিডিএফ)। পৃ. ৪৭।
  10. Brown, Qurʾānists, 2018, p. 328.
  11. Hansu, Debates on the Authority of Hadith in Early Islamic Intellectual History, 2016, p. 521f.
  12. An-Nāšiʾ al-Akbar: Kitāb Uṣūl an-Niḥal in Josef van Ess (ed.): Frühe Muʿtazilitische Häresiographie: Zwei Werke des Nāšiʾ al-Akbar (gest. 293 H.) F. Steiner, Beirut/Wiesbaden 1970. p. 69. Digitalised.
  13. Hansu, Debates on the Authority of Hadith in Early Islamic Intellectual History, 2016, p. 521.
  14. Hansu, Debates on the Authority of Hadith in Early Islamic Intellectual History, 2016, p. 515.
  15. Hansu, Debates on the Authority of Hadith in Early Islamic Intellectual History, 2016, p. 518.
  16. Aisha Y. Musa, Hadith as Scripture: Discussions on the Authority of Prophetic Traditions in Islam, Palgrave Macmillan, 2008, pp. 37–38.
  17. Brown, Rethinking Tradition in Modern Islamic Thought, 1996, pp. 15–16.
  18. See Abdur Rab, ibid, pp. 199–200.
  19. Azami, M. A., Studies in Hadith Methodology and Literature, Islamic Book Trust, Kuala Lumpur, 92; cited in Akbarally Meherally, Myths and Realities of Hadith – A Critical Study, (published by Mostmerciful.com Publishers), Burnaby, BC, Canada, 6. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৩ মার্চ ২০১৬ তারিখে. Excerpted from Abdur Rab, ibid, p. 200.
  20. Musa, A. (১২ মে ২০০৮)। Hadith as Scripture: Discussions on the Authority of Prophetic Traditions in Islam। Springer। আইএসবিএন ৯৭৮-০-২৩০-৬১১৯৭-৯
  21. Brown, Rethinking Tradition, 1996, pp. 21–22.
  22. 1 2 3 Birışık, „Kurʾâniyyûn“ in Türkiye Diyanet Vakfı İslâm Ansiklopedisi, 2002, Vol. 26, p. 428.
  23. Rahman, Modernist Muslim's Approach to Ḥadīth, 1993, p. 15.
  24. Qasmi, Questioning the Authority of the Past, 2012, p. 55.
  25. Ahmad, Islamic Modernism, 1967, pp. 49–50.
  26. Ahmad, Islamic Modernism, 1967, p. 50.
  27. Hasan, The Aligarh Movement, 2006, p. 48.
  28. Ahmad, Islamic Modernism, 1967, p. 42.
  29. Johannes M. S. Baljon, „Aḥmad K̲h̲ān.“ In: Encyclopaedia of Islam. New Edition Vol. I, pp. 287b–288b.
  30. Hasan, The Aligarh Movement, 2006, p. 47.
  31. Rahman, Modernist Muslim's Approach to Ḥadīth, 1993, p. 18.
  32. Rahman, Modernist Muslim's Approach to Ḥadīth, 1993, p. 20.
  33. Rahman, Modernist Muslim's Approach to Ḥadīth, 1993, pp. 19–20.
  34. 1 2 Brown, Rethinking Tradition in Modern Islamic Thought, 1996, p. 37.
  35. 1 2 Juynboll, The Authenticity of the Tradition Literature, 1969, p. 18.
  36. Juynboll: The Authenticity of the Tradition Literature. 1969, p. 15.
  37. The text can be viewed here.
  38. Juynboll: The Authenticity of the Tradition Literature. 1969, p. 24.
  39. Ṣidqī, Al-Islām huwa l-Qurʾān Waḥda-hū 1906, p. 515.
  40. Ṣidqī, Al-Islām huwa l-Qurʾān Waḥda-hū 1906, p. 522.
  41. Brown, Rethinking Tradition in Modern Islamic Thought, 1996, p. 40.
  42. Juynboll, The Authenticity of the Tradition Literature, 1969, pp. 23–30.
  43. "সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১২"hadithbd.com
  44. "সুনান আবূ দাউদ, হাদিস নং ৪৬০৪"hadithbd.com

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]