স্বামী বিবেকানন্দ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অন্য ব্যবহারের জন্য, দেখুন স্বামী বিবেকানন্দ (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
স্বামী বিবেকানন্দ
Swami Vivekananda-1893-09-signed.jpg
শিকাগোয় স্বামী বিবেকানন্দ, সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩। বাঁদিকে বিবেকানন্দ ইংরেজিতে লেখেন: "প্রণাম করি সেই একক, অনন্ত, শুদ্ধ ও পবিত্র –চিন্তা ও গুণের অগম্য (ঈশ্বরকে)।" ("one infinite pure and holy – beyond thought beyond qualities I bow down to thee" )[১]
জন্ম নরেন্দ্রনাথ দত্ত
(১৮৬৩-০১-১২)১২ জানুয়ারি ১৮৬৩
কলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র)
মৃত্যু ৪ জুলাই ১৯০২(১৯০২-০৭-০৪) (৩৯ বছর)
বেলুড় মঠ, হাওড়া, হাওড়া জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা বেলুড় মঠ, হাওড়া, হাওড়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র)
জাতীয়তা ভারতীয়
প্রতিষ্ঠাতা রামকৃষ্ণ মিশন
রামকৃষ্ণ মঠ
গুরু রামকৃষ্ণ
দর্শন অদ্বৈত বেদান্ত, রাজযোগ
সাহিত্য কর্ম রাজযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ, মদীয় আচার্যদেব, ভারতে বিবেকানন্দ
বিশিষ্ট শিষ্য(সমূহ) অশোকানন্দ, বিরজানন্দ, পরমানন্দ, আলাসিঙ্গা পেরুমল, অভয়ানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, সদানন্দ
উদ্ধৃতি "ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না"
(অন্যান্য উদ্ধৃতি দেখুন)
স্বাক্ষর

স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ –৪ জুলাই, ১৯০২) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক ও সংগীতজ্ঞ। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি ছিলেন ১৯শ শতাব্দীর বিখ্যাত হিন্দু ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য। বিবেকানন্দ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্তযোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।[২] অনেকে ১৯শ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতগুলির মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং সেই সঙ্গে হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন।[৩] ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন।[৪] বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠরামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।[২] তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল ১৮৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা[৫] এই বক্তৃতাটির মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার এক উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন। তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ সালের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিকাগো বক্তৃতা, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত, ভারতে বিবেকানন্দ, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, বীরবাণী (কবিতা-সংকলন),মদীয় আচার্যদেব ইত্যাদি। বিবেকানন্দ ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গায়ক। তাঁর রচিত দুটি বিখ্যাত গান হল "খণ্ডন-ভব-বন্ধন" (শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন) ও "নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি"। এছাড়া "নাচুক তাহাতে শ্যামা", "৪ঠা জুলাইয়ের প্রতি", "সন্ন্যাসীর গীতি" ও "সখার প্রতি" তাঁর রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা। "সখার প্রতি" কবিতার অন্তিম চরণদুটি – “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” – বিবেকানন্দের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি উক্তি।

ভারতে বিবেকানন্দকে ‘বীর সন্ন্যাসী’ নামে অভিহিত করা হয় এবং তাঁর জন্মদিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়।

পরিচ্ছেদসমূহ

জীবনী[সম্পাদনা]

বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

A Bengali woman , sitting
Vivekananda as a wandering monk
(বাঁদিকে) ভুবনেশ্বরী দেবী (১৮৪১–১৯১১);"আমার জ্ঞানের প্রস্ফুটনের জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।"[৬][৭] – বিবেকানন্দ
(ডানদিকে) ৩, গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিট, সিমলা, কলকাতা। বিবেকানন্দের জন্মস্থান। এখন এটি একটি সংগ্রহশালা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

স্বামী বিবেকানন্দ উত্তর কলকাতায় এক কায়স্থ দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই দত্ত-পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত দত্ত-ডেরিয়াটোনা বা দত্ত-ডেরেটোনা গ্রাম। মুঘল শাসনকাল থেকেই দত্তরা উক্ত গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। গবেষকরা অনুমান করেন যে তাঁরাই ছিলেন ওই গ্রামের জমিদার। ১৮শ শতাব্দীতে দত্ত-পরিবারের সদস্য রামনিধি দত্ত তাঁর পুত্র রামজীবন দত্ত ও পৌত্র রামসুন্দর দত্তকে নিয়ে গড়-গোবিন্দপুর গ্রামে (অধুনা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামময়দান অঞ্চল) চলে আসেন। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু হলে উক্ত এলাকার অন্যান্য বাসিন্দাদের সঙ্গে দত্তরাও সুতানুটি গ্রামে (অধুনা উত্তর কলকাতা) চলে আসেন। এখানে প্রথমে তাঁরা মধু রায়ের গলিতে একটি বাড়িতে বাস করতেন। ৩ নং গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটের যে বাড়িতে বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই বাড়িটি নির্মাণ করেন রামসুন্দর দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামমোহন দত্ত। রামমোহন দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্গাপ্রসাদ দত্ত ছিলেন বিবেকানন্দের পিতামহ।[৮] তিনি সংস্কৃতফারসি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন।[৯] ২৫ বছর বয়সে একমাত্র পুত্র বিশ্বনাথ দত্তের জন্মের পর তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে গৃহত্যাগ করেন।[১০] বিশ্বনাথ দত্ত দুর্গাপ্রসাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা কালীপ্রসাদ কর্তৃক প্রতিপালিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি।[১১][১২] বিশ্বনাথ দত্ত বাংলা, ফারসি, আরবি, উর্দু, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থ পাঠে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ধর্ম বিষয়ে তিনি উদার ছিলেন। বাইবেলদেওয়ান-ই-হাফিজ ছিল তাঁর প্রিয় বই। তিনি সুলোচনা (১৮৮০) ও শিষ্ঠাচার-পদ্ধতি (বাংলা ও হিন্দি ভাষায়, ১৮৮২) নামে দুটি বইও রচনা করেছিলেন।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ প্রথা প্রবর্তনের সমর্থনে তিনি প্রকাশ্যে মতপ্রকাশ করেছিলেন। দুর্গাপ্রসাদের সংসারত্যাগের পর কালীপ্রসাদের অমিতব্যয়িতায় দত্ত-পরিবারের আর্থিক সাচ্ছল্য নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু অ্যাটর্নিরূপে বিশ্বনাথ দত্তের সুদূর-প্রসারিত খ্যাতি সেই সাচ্ছল্য কিয়দংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। তাঁর স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন সিমলার নন্দলাল বসুর মেয়ে। তিনি বিশেষ ভক্তিমতী নারী ছিলেন।[৯] তাঁর প্রথম কয়েকটি সন্তানের মৃত্যু ও কন্যাসন্তানের জন্মের পর পুত্রসন্তান কামনায় তিনি তাঁর এক কাশীবাসিনী আত্মীয়াকে দিয়ে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে নিত্য পূজা দেওয়ার ব্যবস্থা করান। এরপরই স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হওয়ায় তাঁর বিশ্বাস হয় যে, তিনি শিবের কৃপায় পুত্রলাভ করেছেন।[১৩] পিতার প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মায়ের ধর্মপ্রাণতা বিবেকানন্দের চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।[১৪][১৫]

প্রথম জীবন (১৮৬৩–৮৮)[সম্পাদনা]

জন্ম ও শৈশব[সম্পাদনা]

স্বামী বিবেকানন্দের পিতৃদত্ত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত (ডাকনাম ছিল বীরেশ্বর বা বিলে এবং নরেন্দ্র বা নরেন)।[১৬] ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি উৎসবের দিন উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে ৩ নং গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[১৭] তাঁর নয় জন ভ্রাতা ও ভগিনী ছিল।[১৮] তাঁর মধ্যম ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও বিদেশ ভ্রমণে বিবেকানন্দের সঙ্গী। কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা ও গ্রন্থকার।

ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার দিকে নরেন্দ্রনাথের আগ্রহ ফুটে ওঠে। এই সময় শিব, রামসীতার মূর্তির সামনে তিনি প্রায়শই ধ্যানে বসতেন।[১৯] সাধুসন্ন্যাসীদের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।[১৫] ছেলেবেলায় বিবেকানন্দ অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন। তাঁর পিতামাতার পক্ষে তাঁকে সামলানো মাঝে মাঝেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠত। তাঁর মা বলতেন, “শিবের কাছে ছেলে চাইলুম। তা তিনি নিজে না এসে পাঠালেন তাঁর চেলা এক ভূতকে।”[১০]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

১৮৭১ সালে নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ১৮৭৭ সালে তাঁর পরিবার সাময়িকভাবে রায়পুরে (অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ছত্তীসগঢ় রাজ্যে) স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।[২০] ১৮৭৯ সালে দত্ত পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। নরেন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্সি কলেজের (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা) প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনিই ছিলেন সেইবছর উক্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ একমাত্র ছাত্র।[২০] তিনি প্রচুর বই পড়তেন। [২১] দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্য বিষয়ে বই পড়ায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।[২২] বেদ, উপনিষদ্‌, ভগবদ্গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পাঠেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। এছাড়া তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিতেন[২৩] এবং নিয়মিত ব্যায়াম, খেলাধূলা ও সমাজসেবামূলক কাজকর্মে অংশ নিতেন।[২২]

জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনে (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা) পড়ার সময় নরেন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য যুক্তিবিদ্যা, পাশ্চাত্য দর্শন ও ইউরোপীয় ইতিহাস শিক্ষা করেছিলেন।[২৪] ১৮৮১ সালে তিনি ফাইন আর্স্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।[২৫][২৬] নরেন্দ্রনাথ ডেভিড হিউম, জর্জ। ডব্লিউ. এফ. হেগেল, আর্থার সোফেনহায়ার, অগস্ট কাঁত, জন স্টুয়ার্ট মিলচার্লস ডারউইনের রচনাবলি পাঠ করেছিলেন।[২৭][২৮] হারবার্ট স্পেনসারের বিবর্তনবাদের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। স্পেনসারের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্র বিনিময়ও চলত।[২৯][৩০] স্পেনসারের এডুকেশন (১৮৬১) বইটি তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।[৩১] পাশ্চাত্য দার্শনিকদের রচনাবলি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ ও বাংলা সাহিত্য নিয়েও চর্চা করেন।[২৮] জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনের প্রিন্সিপাল উইলিয়াম হেস্টি লিখেছেন, “নরেন্দ্র সত্যকারের মেধাবী। আমি বহু দেশ দেখেছি, কিন্তু তার মতো প্রতিভা ও সম্ভাবনাময় ছাত্র দেখিনি; এমনকি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দর্শন ছাত্রদের মধ্যেও না।”[২৭] কয়েকটি স্মৃতিকথায় নরেন্দ্রনাথকে ‘শ্রুতিধর’ (অদ্ভুত স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি) হিসেবে উল্লেখ করতেও দেখা যায়।[৩২][৩৩][৩৪]

ধর্মজীবনের সূচনা[সম্পাদনা]

নরেন্দ্রনাথ ফ্রিম্যাসনারি লজের সদস্য হয়েছিলেন। তিনি কেশবচন্দ্র সেনদেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজেরও সদস্য হন।[২৪][৩৫][৩৬] তাঁর প্রারম্ভিক ধর্মবিশ্বাস ব্রাহ্ম ধারণার আদলে গড়ে উঠেছিল। এই সময় তিনি নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী হন এবং পৌত্তলিকতার সমালোচকে পরিণত হন।[১৯][৩৭]

এই সময় নরেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মনেতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন?” এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দেবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তোমার চোখদুটি যোগীর ন্যায়।”[৩৫][৩১] দর্শন সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানে সন্তুষ্ট না হয়ে নরেন্দ্রনাথ ভাবতে থাকেন, ঈশ্বর ও ধর্ম সত্যিই কি মানুষের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার অংশ। তিনি এই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন। কলকাতার অনেক বিশিষ্ট অধিবাসীকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছেন কিনা। কিন্তু কারোর উত্তরই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।[৩৮][২৬]

শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে[সম্পাদনা]

নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসের কথা প্রথম শোনেন জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময়। অধ্যাপক উইলিয়াম হেস্টি একটি সাহিত্যের ক্লাসে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের দ্য এক্সকারশন কবিতাটি পড়ানোর সময় রামকৃষ্ণ পরমহংসের কথা বলেছিলেন।[৩৭] উক্ত কবিতায় ব্যবহৃত ‘trance’ কথাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ছাত্রদের বলেন, ‘trance’ বিষয়টির সত্যিকারের অর্থ বুঝতে হলে ছাত্রদের দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে দেখতে হবে। এই কথা শুনে নরেন্দ্রনাথ সহ কয়েকজন ছাত্র রামকৃষ্ণ পরমহংসকে দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।[৩৯][৪০][৪১]

Image of Ramakrishna, sitting.
বিবেকানন্দের গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংস
Image of Vivekananda, sitting in meditative posture, eyes opened
১৮৮৬ সালে কাশীপুরে বিবেকানন্দ

"ঠাকুরের ঐদিনকার অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তমধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। স্তম্ভিত হইয়া সত্য সত্যই দেখিতে লাগিলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর নাই!... যখন প্রকৃতিস্থ হইলাম, তখন ভাবিলাম উহাই অদ্বৈতবিজ্ঞানের আভাস! তবে তো শাস্ত্রে ঐ বিষয়ে যাহা লেখা আছে, তাহা মিথ্যা নহে! তদবধি অদ্বৈততত্ত্বের উপরে আর কখনও সন্দিহান হইতে পারি নাই।"[৪২][৪৩]

১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে[lower-alpha ১] এফ. এ. পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় রামচন্দ্র দত্ত একবার নরেন্দ্রনাথকে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে ধর্মোপদেশ দানের জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।[৪৫] এই সাক্ষাৎকারে রামকৃষ্ণ পরমহংস তরুণ নরেন্দ্রনাথকে একটি গান গাইতে বলেন। পরে নরেন্দ্রনাথের সংগীতপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে নিমন্ত্রণ করেন।[৪৬] রামকৃষ্ণ পরমহংস বা নরেন্দ্রনাথ কেউই এই সাক্ষাৎকারকে পরবর্তীকালে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ হিসেবে গুরুত্ব দেননি। এমনকি তাঁরা এই সাক্ষাতের কথা উল্লেখও করতেন না।[৩৯]

১৮৮১ সালের শেষদিকে অথবে ১৮৮২ সালের প্রথম দিকে দুজন বন্ধুকে নিয়ে নরেন্দ্রনাথ দক্ষিণেশ্বরে আসেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।[৩৯] এই সাক্ষাৎ নরেন্দ্রনাথের জীবনে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।[৪৭] সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "তাঁহাকে [রামকৃষ্ণ] একজন সাধারণ লোকের মতো বোধ হইল, কিছু অসাধারণত্ব দেখিলাম না। অতি সরল ভাষায় তিনি কথা কহিতেছিলেন, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি কি একজন বড় ধর্মাচার্য হইতে পারেন? আমি সারা জীবন অপরকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তাঁহার নিকটে গিয়া তাঁহাকেও সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম, 'মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন?' তিনি উত্তর দিলেন- 'হাঁ।' 'মহাশয়, আপনি কি তাঁহার অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারেন?' 'হাঁ'। 'কি প্রমাণ? ' 'আমি তোমাকে যেমন আমার সম্মুখে দেখিতেছি, তাঁহাকেও ঠিক সেইরূপ দেখি, বরং আরও স্পষ্টতর, আরও উজ্জ্বলতররূপে দেখি।' আমি একেবারে মুগ্ধ হইলাম। [...] আমি দিনের পর দিন এই ব্যক্তির নিকট যাইতে লাগিলাম। [...] ধর্ম যে দেওয়া যাইতে পারে, তাহা আমি বাস্তবিক প্রত্যক্ষ করিলাম। একবার স্পর্শে, একবার দৃষ্টিতে একটা সমগ্র জীবন পরিবর্তিত হইতে পারে। আমি এইরূপ ব্যাপার বারবার হইতে দেখিয়াছি।"[৪৮][৪৯] প্রথমদিকে অবশ্য নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে গুরু বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এমনকি তাঁর চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসের ব্যক্তিত্বের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্টও হয়েছিলেন। এর ফলে ঘন ঘন তিনি দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত শুরু করেন।[৫০] প্রথমদিকে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভাবাবস্থা ও দেবদেবীর সাক্ষাৎ দর্শনকে ‘কাল্পনিক সৃষ্টি’ [১৪] ও ‘অলীক বস্তুর অস্তিত্বে বিশ্বাস’ [৫১] মনে করতেন। ব্রাহ্মসমাজের সদস্য নরেন্দ্রনাথ সেই সময় মূর্তিপূজা, বহুদেববাদ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের কালীপূজা সমর্থন করতেন না।[৫২] এমনকি অদ্বৈত বেদান্ত মতবাদকেও তিনি ঈশ্বরদ্রোহিতা ও পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়ে সেই মতবাদকে উপহাস করতেন।[৫১] নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসকে পরীক্ষা করতেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসও শান্তভাবে তাঁর যুক্তি শুনে বলতেন, “সত্যকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করবি।”[৫০]

১৮৮৪ সালে নরেন্দ্রনাথের পিতা হঠাৎ মারা যান। এরপর তাঁর পরিবার তীব্র অর্থকষ্টের মধ্যে পড়ে। ঋণদাতারা ঋণশোধের জন্য তাঁদের তাগাদা দিতে শুরু করে এবং আত্মীয়স্বজনরা তাঁদের পৈত্রিক বাসস্থান থেকে উৎখাত করার চেষ্টা শুরু করে। একদা সচ্ছল পরিবারের সন্তান নরেন্দ্রনাথ কলেজের দরিদ্রতম ছাত্রদের অন্যতম ছাত্রে পরিণত হন।[৫৩] তিনি চাকরির অনুসন্ধান শুরু করেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।[৫৪] কিন্তু একই সময়ে দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে তিনি শান্তি পেতে থাকেন।[৫৫]

একদিন নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে অনুরোধ জানান, তিনি যেন কালীর কাছে তাঁর পরিবারের আর্থিক উন্নতির জন্য প্রার্থনা জানান। রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁকে বলেন, তিনি যেন নিজে মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসের পরামর্শ অনুসারে, নরেন্দ্রনাথ তিনবার মন্দিরে যান। কিন্তু জাগতিক প্রয়োজনের জন্য প্রার্থনার পরিবর্তে তিনি জ্ঞান ও বিবেক-বৈরাগ্য প্রার্থনা করেন।[৫৬][৫৭][৫৮] এরপর নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বর-উপলব্ধির জন্য সংসার ত্যাগ করতে মনস্থ করেন এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসকে গুরু বলে মেনে নেন।[৫০]

১৮৮৫ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের গলার ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে প্রথমে উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর ও পরে কাশীপুরের একটি বাগানবাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়। এই সময় নরেন্দ্রনাথ সহ রামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যান্য শিষ্যগণ তাঁর সেবাযত্ন করেন। এই সময়ও নরেন্দ্রনাথের ধর্মশিক্ষা চলএ থাকে। কাশীপুরে নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন।[৫৯] নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য কয়েকজন শিষ্য এই সময় রামকৃষ্ণ পরমহংসের থেকে সন্ন্যাস ও গৈরিক বস্ত্র লাভ করেন। এইভাবে রামকৃষ্ণ শিষ্যমণ্ডলীতে প্রথম সন্ন্যাসী সংঘ স্থাপিত হয়।[৬০] রামকৃষ্ণ পরমহংসকে নরেন্দ্রনাথকে শিক্ষা দেন মানবসেবাই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সাধনা।[১৪][৫৯] তিনি নরেন্দ্রনাথকে তাঁর অন্যান্য সন্ন্যাসী শিষ্যদের দেখভাল করতেও বলেন এবং তাঁকেই সন্ন্যাসী সংঘের নেতা নির্বাচিত করেন।[৬১] কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব নিয়ে বিবেকানন্দের মনে সন্দেহের উদ্রেক হলে শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন, "যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে-ই ইদানীং এ শরীরে রামকৃষ্ণ... "[৬২] ১৮৮৬ সালের ১৬ অগস্ট শেষরাত্রে কাশীপুরেই রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রয়াত হন।[৬১][৬৩]

বরানগর মঠ[সম্পাদনা]

শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর গৃহী শিষ্যদের আর্থিক সহায়তায় বিবেকানন্দের নেতৃত্বে তাঁর তরুণ সন্ন্যাসী শিষ্যরা বরানগরে এক পোড়ো বাড়িতে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ছিল রামকৃষ্ণ সংঘের সদস্যদের দ্বারা স্থাপিত প্রথম মঠ।[৪৮]

বরানগরের এই পোড়ো বাড়িটি মঠ স্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয় মূলত দুটি কারণে। প্রথমত বাড়িটির ভাড়া ছিল কম। দ্বিতীয়ত বাড়িটি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিস্থল কাশীপুর মহাশ্মশানের অত্যন্ত নিকটবর্তী ছিল। নরেন্দ্রনাথ ও মঠের অন্যান্য সদস্যরা এখানে জপধ্যান ও সাধন-ভজনে নিমগ্ন থাকতেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণ, শঙ্করাচার্য, রামানুজ ও যিশু খ্রিষ্ট প্রমুখ ধর্মগুরুদের দর্শন ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতেন।[৬৪] এই মঠের প্রথম দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে নরেন্দ্রনাথ পরে বলেছিলেন, "বরাহনগর মঠে আমরা অনেক ধর্মাচরণ করেছি। রাত তিনটে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে জপধ্যানে মগ্ন হতাম। সেই দিনগুলিতে বৈরাগ্য কি প্রবল ছিল! বাইরের জগৎ আছে কি নেই, সেকথা একবার মনেও হত না।"[৬৪] ১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর আটজন গুরুভ্রাতা আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর নরেন্দ্রনাথ স্বামী বিবেকানন্দ নাম ধারণ করেছিলেন।[৬৫]

পরিব্রাজক বিবেকানন্দ[সম্পাদনা]

পরিব্রাজকরূপে স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম ফটো, জয়পুর।[৬৬]

১৮৮৮ সালে পরিব্রাজক রূপে মঠ ত্যাগ করেন বিবেকানন্দ। পরিব্রাজক হিন্দু সন্ন্যাসীর এক ধর্মীয় জীবন – এই জীবনে তিনি স্বাধীনভাবে পর্যটন করে বেড়ান কোনো স্থায়ী বাসস্থান বা বন্ধন ছাড়াই।[৬৭] পরিব্রাজক জীবনে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গী ছিল একটি কমণ্ডলু, লাঠি, এবং তাঁর প্রিয় দুটি গ্রন্থ - ভগবদ্গীতাইশানুসরণ[৬৮] পাঁচ বছর ধরে ভারতের সর্বত্র ভ্রমণ করেন বিবেকানন্দ – প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্র দর্শন করেন এবং বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও সমাজব্যবস্থার সহিত সুপরিচিত হন।[৬৯][৭০] সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্টের প্রতি তাঁর সহানুভূতি জন্মায় এবং তিনি জাতির উন্নতিকল্পে আত্মনিয়োগ করেন।[৬৯][৭১] এই সময় ভিক্ষোপজীবি হয়ে সারা ভারত পদব্রজেই পর্যটন করেন বিবেকানন্দ। কখনও সখনও তাঁর গুণমুগ্ধেরা তাঁকে ট্রেনের টিকিট কিনে দিতেন। ভারত পর্যটনের সময় তিনি বিভিন্ন পণ্ডিত, দেওয়ান, রাজা, এবং হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান এমনকি নিম্নবর্ণীয় পারিয়া ও সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গেও মেলামেশা ও একত্রবাস করেছিলেন।[৭১]

উত্তর ভারত[সম্পাদনা]

১৮৮৮ সালে তিনি বারাণসী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। বারাণসীতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত হয় বিশিষ্ট বাঙালি লেখক ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিশিষ্ট সন্ত ত্রৈলঙ্গস্বামীর। এইখানেই বিশিষ্ট সংস্কৃত পণ্ডিত বাবু প্রেমদাস মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে, যাঁর সঙ্গে পরবর্তীকালে একাধিক পত্রালাপে তিনি হিন্দু ধর্মশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।[৭২] বারাণসীর পর তিনি একে একে যান অযোধ্যা, লখনউ, আগ্রা, বৃন্দাবন, হথরাসহৃষীকেশে। হথরাসে তাঁর সঙ্গে স্টেশন মাস্টার শরৎচন্দ্র গুপ্তের সাক্ষাত হয়, যিনি পরে বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সদানন্দ নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন বিবেকানন্দের প্রথম যুগের শিষ্য।[৭৩][৭৪] ১৮৮৮-৯০ মধ্যবর্তী সময়ে তিনি বৈদ্যনাথএলাহাবাদ ভ্রমণ করেন। এলাহাবাদ থেকে গাজিপুরে গিয়ে তিনি পওহারি বাবার দর্শন করেন। পওহারি বাবা ছিলেন এক অদ্বৈতবাদী সন্ত, যিনি অধিকাংশ সময়েই ধ্যানমগ্ন থাকতেন।[৭৫] ১৮৮৮-৯০ সময়কালে ভগ্নস্বাস্থ্য এবং মঠের দুই আর্থিক সাহায্যদাতা বলরাম বসু ও সুরেশচন্দ্র মিত্রের মৃত্যুর পর মঠের আর্থিক ব্যবস্থার সুরাহাকল্পে তিনি কয়েকবার বরানগর মঠে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।[৭৪]

হিমালয় ভ্রমণ[সম্পাদনা]

১৮৯০ সালের জুলাই মাসে গুরুভ্রাতা স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে তিনি পুনরায় পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর রূপে দেশভ্রমণে বের হন। মঠে ফেরেন একেবারে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে।[৭৪][৭৬] প্রথমে তিনি যান নৈনিতাল, আলমোড়া, শ্রীনগর, দেরাদুন, ঋষিকেশ, হরিদ্বার এবং হিমালয়ে। কথিত আছে, এই সময় এক দিব্যদর্শনে তিনি বহির্জগৎ ও ক্ষুদ্রব্রহ্মাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে প্রদত্ত তাঁর জ্ঞানযোগ বক্তৃতামালায় এই বহির্জগৎ ও ক্ষুদ্রব্রহ্মাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। এই ভ্রমণের সময় তাঁর অন্যান্য গুরুভ্রাতা স্বামী ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ, তুরীয়ানন্দ, অখণ্ডানন্দ ও অদ্বৈতানন্দের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। মীরাটে কিছুদিন একসঙ্গে তাঁরা জপধ্যান, প্রার্থনা ও শাস্ত্রপাঠে অতিবাহিত করেন। ১৮৯১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে অন্যান্য গুরুভ্রাতাদের ছেড়ে তিনি একাকী দিল্লির পথে অগ্রসর হন।[৭৬][৭৭]

রাজপুতানা[সম্পাদনা]

দিল্লির ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখার পর তিনি চলে যান রাজপুতানার ঐতিহাসিক রাজ্য আলোয়ারে। পরে তিনি যান জয়পুরে। সেখানে এক সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে অধ্যয়ন করেন পাণিনিঅষ্টাধ্যয়ী। তাঁর পরের গন্তব্য ছিল আজমেঢ়। সেখানকার বিখ্যাত দরগা ও আকবরের প্রাসাদ দেখে তিনি চলে যান মাউন্ট আবুতে। মাউন্ট আবুতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় খেতরির মহারাজা অজিত সিংহের। পরে তিনি বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ ভক্ত ও পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। তাঁর আমন্ত্রণে বিবেকানন্দ খেতরিতে আসেন। সেখানে রাজার সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। খেতরিতেই পণ্ডিত নারায়ণদাসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয় এবং তিনি পাণিনির সূত্রের মহাভাষ্য অধ্যয়ন করেন। খেতরিতে আড়াই মাস কাটানোর পর ১৮৯১ সালের অক্টোবরে তিনি রাজস্থানমহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হন।[৭১][৭৮]

পশ্চিম ভারত[সম্পাদনা]

পশ্চিমে যাত্রাপথে তিনি ভ্রমণ করেন আমেদাবাদ, ওয়াধওনলিম্বদি। আমেদাবাদে তিনি ইসলামি ও জৈন সংস্কৃতির পাঠ সমাপ্ত করেন।[৭১] লিম্বদিতে ঠাকোর সাহেব জসওয়ান্ত সিংহের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, যিনি নিজে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন। ঠাকোর সাহেবের থেকেই বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যে বেদান্ত প্রচারে যাওয়ার ধারণাটি প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি যান জুনাগড়, গিরনার, কচ্ছ, পোরবন্দর, দ্বারকা, পালিতানাবরোদা। পোরবন্দরে সন্ন্যাসজীবনের নিয়ম ভেঙে তিনি নয় মাস অবস্থান করেন পণ্ডিতদের থেকে দর্শন ও সংস্কৃত গ্রন্থাবলি অধ্যয়নের জন্য। এই সময় সভাপণ্ডিতের সঙ্গে একযোগে বেদ অনুবাদের কাজও করেন।[৭১]

এরপর তিনি যান মহাবালেশ্বর এবং তারপর যান পুণায়। পুণা থেকে ১৮৯২ সালের জুন মাস নাগাদ তিনি খান্ডোয়াইন্দোর ভ্রমণ করেন। কাথিয়াওয়াড়ে তিনি বিশ্বধর্ম মহাসভার কথা শোনেন। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে সেই সভায় যোগদানের অনুরোধ করতে থাকেন। খান্ডোয়া থেকে তিনি বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৮৯২ সালের জুলাই মাসে তিনি বোম্বাই পৌঁছান। পুণার পথে ট্রেনে বাল গঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।[৭৯] পুণায় কিছুদিন তিলকের সঙ্গে অবস্থান করার পর[৮০] ১৮৯২ সালের অক্টোবরে স্বামী বিবেকানন্দ বেলগাঁও যাত্রা করেন। বেলগাঁওতে তিনি অধ্যাপক জি এস ভাটি ও সাব-ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার হরিপদ মিত্রের আতিথ্য গ্রহণ করেন। বেলগাঁও থেকে তিনি যান গোয়ার পাঞ্জিমমারগাঁওয়ে। গোয়ার প্রাচীনতম ধর্মতত্ত্ব কনভেন্ট-কলেজ রাচোল সেমিনারিতে তিন দিন অবস্থান করেন। এই কনভেন্ট-কলেজে সংরক্ষিত ছিল লাতিনে রচিত দুষ্প্রাপ্য ধর্মীয় সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত রচনাবলি। মনে করা হয়, এখানে তিনি খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।[৮১] মারগাঁও থেকে বিবেকানন্দ রেলপথে যাত্রা করেন ধারওয়াড়ের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে আসেন মহীশূর রাজ্যের ব্যাঙ্গালোরে[৮২]

দক্ষিণ ভারত[সম্পাদনা]

বেঙ্গালুরুতে স্বামীজি মহীশূর রাজ্যের দেওয়ান স্যার কে. শেষাদ্রী আইয়ারের সাথে পরিচিত হন, এবং পরে তিনি মহীশূরের মহারাজা শ্রী চামারাজেন্দ্র ওয়াদিয়ারের অতিথি হিসেবে রাজপ্রাসাদে অবস্থান করেন। বিবরণ অনুসারে স্যার শেষাদ্রী স্বামীজির পান্ডিত্য বিষয়ে মন্তব্য করেন, "এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঐশ্বরিক শক্তি যা তার দেশের ইতিহাসে তাদের চিহ্ন রেখে যেতে নিয়তিনির্ধারিত ছিল।" মহারাজা স্বামীজিকে কোচিনের দেওয়ানের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে একটি পত্র এবং একটি রেলওয়ে টিকিট দেন।[৮৩]

ভারতের কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ শিলায় বিবেকানন্দ রক মেমরিয়ল

বেঙ্গালুরু থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিচুড়, কোদুনগ্যালোর, এরনাকুলাম। এরনাকুলামে ১৮৯২ সালের ডিসেম্বরের প্রথমভাগে তিনি নারায়ণ গুরুর সমসাময়িক ছত্তাম্পি স্বামীকালের দেখা পান।[৮৪] এরনাকুলাম থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিভানদ্রাম, নাগেরকৈল এবং ১৮৯২ সালের বড়দিনের প্রাক্কালে পায়ে হেঁটে কন্যাকুমারী পৌঁছেন।[৮৫] বিবরণ অনুসারে স্বামীজি "ভারতীয় পাহাড়ের শেষ প্রান্তে" তিন দিন ধরে ধ্যান করেন যা পরে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।[৮৬] কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ "এক ভারতের স্বপ্ন" দেখেন, যাকে সচরাচর বলা হয়ে থাকে "১৮৯২ এর কন্যাকুমারী সঙ্কল্প"।[৮৭] তিনি লিখেছিলেন,

"ক্যামোরিন অন্তরীপে মা কুমারীর মন্দিরে বসে ভারতীয় পাহাড়ের শেষ প্রান্তে বসে - আমি এক পরিকল্পনা করি: আমরা এতগুলো সন্ন্যাসী ঘুরে বেড়াচ্ছি এবং মানুষকে অধিবিদ্যা/দর্শনশাস্ত্র শিখাচ্ছি - এ সব কিছুই পাগলামি। আমাদের গুরুদেব কি বলতেন না, 'খালি পেট ধর্মের জন্য ভাল নয়?' জাতি হিসেবে আমরা আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারিয়েছি এবং এটাই ভারতের সকল অনিষ্টের কারণ। আমাদের জনসাধারণকে জাগাতে হবে।"[৮৭][৮৮]

কন্যাকুমারী থেকে তিনি যান মদূরাই যেখানে রামনাদের রাজা ভাস্কর সেতুপতির সাথে দেখা করে তিনি পরিচয়পত্র দেখান। রাজা স্বামীজির শিষ্য হন এবং তাকে শিকাগোতে ধর্ম সম্মেলনে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। মাধুরাই থেকে তিনি যান পন্ডিচেরীর রামেশ্বরম। সেখান থেকে যান মাদ্রাজ এবং এখানে তিনি তার সবচেয়ে অনুগত শিষ্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন যারা স্বামীজির আমেরিকা ভ্রমণের এবং পরে মাদ্রাজে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার তহবিল সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মাদ্রাজের শিষ্যদের এবং মহীশূর, রামনাদ, খেতরির রাজাদের, দেওয়ান এবং অন্যান্য অনুসারীদের সংগৃহীত অর্থের সাহায্য নিয়ে এবং খেতরির মহারাজার পরামর্শকৃত নাম বিবেকানন্দ ধারণ করে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালের ৩১শে মে শিকাগোর উদ্দেশ্যে বোম্বে ত্যাগ করেন।

জাপান ভ্রমণ[সম্পাদনা]

তাঁর শিকাগো যাবার পথে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে জাপান ভ্রমণ করেন। প্রথমে তিনি বন্দর নগরী নাগাসাকি পৌঁছেন এবং তারপর কোবে যাবার জন্য একটি স্টীমারে চড়েন। এখান থেকে তিনি স্থল পথে তিন বড় শহর ওসাকা, কিয়োটো এবং টোকিও ভ্রমণ করে ইয়োকোহামা যান। তিনি জাপানীদের "পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জনগনের অন্যতম" বলে অভিহিত করেন এবং শুধুমাত্র তাদের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের পরিচ্ছন্নতার দ্বারাই চমৎকৃত হননি বরং তাদের কর্মচাঞ্চল্য, মনোভাব ও ভঙ্গি দেখেও চমৎকৃত হন যাদের সকল কিছু্কেই তাঁর মনে হয়েছিল "চিত্রবৎ বা ছবির মত"।[৮৯]

এটি ছিল জাপানে দ্রুত সামরিক সংখ্যা/শক্তি বৃদ্ধির সময়কাল - চীন-জাপান যুদ্ধ এবং রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের পূর্বসূচক। এ সকল প্রস্ত্তুতি বিবেকানন্দের মনোযোগ এড়ায়নি, যিনি লিখেছিলেন -"জাপানীরা এখন মনে হয় বর্তমান সময়ের প্রয়োজনানুসারে নিজেদের সম্পূর্ণ জাগিয়ে তুলেছে। তারা এখন তাদের নিজেদের কর্মকর্তাদের আবিষ্কৃত ও অতুলনীয় বলে কথিত বন্দুক/অস্ত্রসমূহ দ্বারা সজ্জিত এক সম্পূর্ণ সংগঠিত সামরিক বাহিনী। তাছাড়া তারা তাদের নৌ-বাহিনাকে অবিরামভাবে বর্ধিত করছে।" তাঁর পর্যবেক্ষণকৃত শিল্পে অগ্রগতি সম্পর্কে, "দিয়াশলাই কারখানাগুলো একেবারে দেখার মত, এবং তারা যা চায় তার সকল কিছুই তাদের নিজেদের দেশে তৈরী করতে প্রবণ।"[৮৯]

জাপানের দ্রুত অগ্রগতির বিপরীতে ভারতের পরিস্থিতি তুলনা করে তিনি তাগিদ দেন তাঁর দেশের মানুষকে - "কুসংস্কার এবং নিপীড়নের শতাব্দীর সন্তান-সন্ততিদের" - তাদের সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিদেশের দিকে তাকাতে -

শুধু আমি চাই যে আমাদের যুবকেরা প্রতি বছর জাপান এবং চীন ভ্রমণ করুক। বিশেষ করে জাপানীদের নিকট ভারত তারপরও এমন এক স্বপ্নরাজ্য যার সবকিছুই উচ্চস্তরের এবং ভাল। এবং তোমরা, তোমরা কি?...তোমাদের সারা জীবন বাজে বকিতেছো, অনর্থক প্রলাপকারীরা, তোমরা কি? এসো, এ সকল মানুষকে দেখ এবং যাও আর লজ্জায় তোমাদের মুখ ঢাক। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন জাতি, তোমরা তোমাদের প্রাসাদ হারাবে যদি তোমরা বাইরে আসো! শত শত বছর ধরে তোমাদের মাথার উপর দানা বাঁধা কুসংস্কারের ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে বসে আছো, শত শত বছর ধরে এ খাবার সে খাবারের স্পর্শযোগ্যতা বা স্পর্শ-অযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে তোমাদের সকল শক্তি ক্ষয় করছো, যুগ যুগ ধরে অবিরাম সামাজিক পীড়নের দ্বারা তোমাদের সকল মানবিকতা নিষ্পেষিত - তোমরা কি? আর তোমরা এখন কি করছো?...তোমাদের হাতে বই নিয়ে সমুদ্রতীরে ভ্রমণ করছো - ইউরোপিয়ান মস্তিষ্ক-কর্মের অজীর্ণ পথভ্রষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ পুনরাবৃত্তি করছো, আর ত্রিশ রুপীর কেরানীর চাকরির জন্য সমস্ত আত্মা অবনত, অথবা বড়জোর একজন উকিল হওয়া - নবীন ভারতের উচ্চাকাঙ্খার শিখর - আর প্রত্যেক ছাত্রের সাথে তার পায়ে পায়ে ঘুরে একদল ক্ষুদার্ত ছেলেমেয়ের দল রুটি চাচ্ছে! তোমাদের, বইগুলোর, গাউনের, বিশ্ববিদ্যালয় ডিপ্লোমাগুলোর আর সব কিছুর ডোবার জন্য সমুদ্রে যথেষ্ট জল কি নেই?[৮৯]

প্রথম পাশ্চাত্য ভ্রমণ[সম্পাদনা]

চীন, কানাডা হয়ে তিনি আমেরিকার শিকাগো পৌঁছেন ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে।[৯০] কিন্ত্তু তিনি এটা জানতে পেরে হতাশ হলেন যে কোন প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের প্রমাণ-পত্র/প্রশংসাপত্র ছাড়া কোন ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের সংস্পর্শে এলেন।[৯১] তাঁকে হার্ভার্ডে আমন্ত্রণ জানানোর পর এবং ধর্মসভায় বক্তৃতাদানে তাঁর প্রশংসাপত্র না থাকা প্রসঙ্গে রাইটের উদ্ধৃতি, "আপনার কাছে প্রশংসাপত্র চাওয়াটা হচ্ছে স্বর্গে সূর্যের আলো দেয়ার অধিকার চাওয়ার মত অবস্থা।" রাইট তখন প্রতিনিধিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিকট এক চিঠিতে লিখলেন, "আমাদের সকল অধ্যাপক একত্রে যতটা শিক্ষিত ইনি তাদের থেকেও বেশি শিক্ষিত।" অধ্যাপকের ব্যাপারে বিবেকানন্দ নিজে লেখেন, "তিনি আমাকে ধর্মসভায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্বন্ধ সহকারে বোঝান, যেটি তিনি মনে করেছিলেন জাতির নিকট তাঁকে একটি পরিচিতি দেবে।"[৯২]

বিশ্বধর্ম মহাসভা[সম্পাদনা]

ধর্মসভা মঞ্চে স্বামী বিবেকানন্দ

ধর্মসভা ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হয়। এ দিন বিবেকানন্দ তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন।[৯৩] প্রথমদিকে বিচলিত থাকলেও তিনি বিদ্যার দেবী সরস্বতীর নিকট মাথা নোয়ালেন এবং তার বক্তৃতা শুরু করলেন এভাবে, "আমেরিকার ভ্রাতা ও ভগিনীগণ!"[৯১][৯৪] তাঁর এ সম্ভাষণে প্রায় সাত হাজারের মত দর্শক-শ্রোতা দুই মিনিট দাঁড়িয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানান। নীরবতা ফিরে আসার পর তিনি তার বক্তৃতা শুরু করলেন। "যে ধর্ম বিশ্বকে সহিষ্ণুতা ও মহাজাগতিক গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে সে ধর্মের সর্বাধিক প্রাচীন সন্ন্যাসীদের বৈদিক ক্রমানুসারে" তিনি জাতিসমূহের কনিষ্ঠতমকে অভিবাদন জানালেন।[৯৫] এবং তিনি গীতা থেকে এ সম্পর্কে দুটি উদাহরণমূলক পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন-"যেহেতু বিভিন্ন স্রোতধারাগুলির উৎসসমূহ বিভিন্ন জায়গায় থাকে, সেগুলির সবই সমুদ্রের জলে গিয়ে মিশে যায়, সুতরাং, হে প্রভু, বিভিন্ন প্রবণতার মধ্য দিয়ে মানুষ বিভিন্ন যে সকল পথে চলে, সেগুলো বিভিন্ন রকম বাঁকা বা সোজা মনে হলেও, সেগুলি প্রভুর দিকে ধাবিত হয়!" এবং "যে আকারের মধ্য দিয়েই হোক না কেন, যেই আমার নিকট আসে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছাই; সকল মানুষই বিভিন্ন পথে চেষ্টা করছে যা অবশেষে আমার নিকট পৌঁছায়।"[৯৫] সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা হওয়া সত্ত্বেও এটি সভার আত্মা এবং এর বিশ্বজনীন চেতনা ধ্বনিত করে।[৯৫][৯৬]

সভার সভাপতি, ডঃ ব্যারোজ বলেন, "কমলা-সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মসমূহের মাতা ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাঁর শ্রোতাদের উপর সবচাইতে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করেছেন।"[৯৪] প্রেসে তিনি প্রচুর মনোযোগ আকর্ষণ করেন যাতে তিনি "ভারতের সাইক্লোন সন্ন্যাসী" হিসেবে অভিহিত হন। নিউ ইয়র্ক ক্রিটিক লিখেছিল, "ঐশ্বরিক অধিকারবলে তিনি একজন বক্তা এবং হলুদ ও কমলার চিত্রবৎ আধানে তাঁর শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার চেয়ে কম আগ্রহোদ্দীপক ছিল না ঐ সকল সমৃদ্ধ ও ছন্দোময়ভাবে উচ্চারিত শব্দসমূহ। নিউইয়র্ক হেরাল্ড লিখেছিল, "বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে ধর্মসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর বক্তৃতা শুনে আমরা অনুভব করি এ শিক্ষিত জাতির নিকট মিশনারি পাঠানো কি পরিমাণ বোকামি।"[৯৭] আমেরিকার পত্রিকাসমূহ স্বামী বিবেকানন্দকে "ধর্মসভার সবচেয়ে মহান ব্যক্তিত্ব" এবং "সভার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি" হিসেবে প্রতিবেদন লেখে।[৯৮]

তিনি সভায় আরো অনেকবার হিন্দুধর্মবৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত বিষয়ে বলেন। সভা ১৮৯৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়। সভায় তাঁর সকল বক্তৃতার একটি সাধারন বিষয়বস্ত্তু ছিল - সর্বজনীনতা - অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সহিষ্ণুতা।[৯৯]

আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতাদান[সম্পাদনা]

শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধর্মসভা শেষ হবার পর বিবেকানন্দ পুরো দুই বছর পূর্ব ও কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টন এবং নিউইয়র্কে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৫ সালের বসন্তকালের মধ্যে তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর স্বাস্থ্য হয়ে পড়ে দুর্বল।[১০০] তাঁর বক্তৃতাদান সফর স্থগিত করার পর স্বামীজি বেদান্তযোগের উপর বিনা মূল্যে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। ১৮৯৫ সালের জুন থেকে দুই মাসব্যপী তিনি থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড পার্কে তাঁর এক ডজন শিষ্যকে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য ভাষণ দেন। বিবেকানন্দ এটিকে আমেরিকায় তাঁর প্রথম ভ্রমণের সবচেয়ে সুখী অংশ বলে বিবেচনা করতেন। তিনি পরে "নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটি" প্রতিষ্ঠা করেন।[১০০]

আমেরিকায় তাঁর প্রথম পরিদর্শনের সময় তিনি ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করেন দুইবার - ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে। সেখানে তাঁর বক্তৃতাসমূহ সফল ছিল।[১০১] এখানে তিনি সাক্ষাৎ পান এক আইরিশ মহিলা মিস মার্গারেট নোবলের যিনি পরে সিস্টার নিবেদিতা নামে পরিচিত হন।[১০০] ১৮৯৬ সালের মে মাসে তাঁর দ্বিতীয় ভ্রমণের সময় পিমলিকোতে এক গৃহে অবস্থানকালে স্বামীজি দেখা পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিখ্যাত ভারত বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স মুলারের যিনি পাশ্চাত্যে রামকৃষ্ণের প্রথম আত্মজীবনী লেখেন।[৯৬] ইংল্যান্ড থেকে তিনি অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশেও ভ্রমণ করেন। জার্মানীতে তিনি আরেক ভারত বিশেষজ্ঞ পল ডিউসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন।[১০২]

তিনি দুটি শিক্ষায়তনিক প্রস্তাবও পান, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য দর্শনের চেয়ার এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরণের প্রস্তাব। তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি এই ধরণের কাজে স্থিত হতে পারবেন না।[১০০]

তিনি কতিপয় অকৃত্রিম শিষ্যকে আকৃষ্ট করেন। তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের মধ্যে ছিল জোসেফিন ম্যাকলিয়ড, মিস মুলার, মিস নোবল, ই.টি.স্টার্ডি, ক্যাপটেন এবং মিসেস সেভিয়ের-যারা অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জে জে গুডউইন-যিনি তাঁর স্টেনোগ্রাফার হন এবং তাঁর শিক্ষা ও বক্তৃতাসমূহ রেকর্ড করেন।[১০০][১০২] হেল ফ্যামিলি আমেরিকাতে তাঁর উষ্ণতম আতিথ্যকর্তাদের অন্যতম ছিলেন।[১০৩] তাঁর শিষ্যগণ-ফ্রেঞ্চ মহিলা ম্যাডাম লুই হন স্বামী অভয়ানন্দ এবং মিস্টার লিয়ন ল্যান্ডসবার্গ হন স্বামী কৃপানন্দ। তিনি কতিপয় অন্যান্য শিষ্যকে ব্রহ্মচারীতে দীক্ষা দেন।[১০৪]

স্বামী বিবেকানন্দের ধারণাসমূহ বেশ কয়েকজন পন্ডিত ও বিখ্যাত চিন্তাবিদ কর্তৃক প্রশংসিত হয়-উইলিয়াম জেমস, জোসেফ রয়েস, সি.সি. এভারেট, হার্ভার্ড ধর্মশাস্ত্র বিদ্যালয়ের ডিন, রবার্ট জি ইনগারসোল, নিকোলা টেসলা, লর্ড কেলভিন এবং অধ্যাপক হারম্যান লুডউইক ফারডিন্যান্ড ভন হেলমহোলটজ।[১০৫] অন্যান্য ব্যক্তিত্ব যারা তাঁর কথাবার্তায় আকৃষ্ট হন তারা হলেন হ্যারিয়েট মনরো এবং এলা হুইলার উইলকক্স-দুজন বিখ্যাত আমেরিকান কবি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম জেমস; ব্রুকলিন এথিক্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি ডক্টর লুইজ জি জেনস; নরওয়ের পিয়ানোবাদক ওলে বুলের স্ত্রী সারা সি বুল; ফ্রান্সের অভিনেত্রী সারাহ বার্ণহারট এবং ফ্রান্সের অপেরা সঙ্গীতশিল্পী ম্যাডাম এমা ক্যালভি।[১০৬]

পশ্চিম থেকেও তিনি তাঁর ভারতীয় কাজে গতি আনেন। বিবেকানন্দ ভারতে অবস্থানরত তাঁর অনুসারী ও সন্ন্যাসী ভাইদের উপদেশ দিয়ে এবং অর্থ পাঠিয়ে বিরামহীনভাবে চিঠি লেখেন। পাশ্চাত্য থেকে পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহ সে দিনগুলিতে সামাজিক কাজের জন্য তাঁর প্রচারাভিযানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।[১০৭] তিনি ভারতে তাঁর নিকট শিষ্যদের বড় কিছু করার জন্য অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। তাদের নিকট পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহে তাঁর সবচেয়ে কঠিন কিছু শব্দ ছিল।[১০৮] এ রকম একটি চিঠিতে তিনি স্বামী অক্ষরানন্দকে লিখেছিলেন, "খেতরী শহরের দরিদ্র ও নিচু শ্রেণীর ঘরে ঘরে যাও এবং তাদের ধর্মশিক্ষা দাও। ভূগোল এবং অন্যান্য বিষয়েও তাদের মৌখিক শিক্ষা দিও। অলসভাবে বসে থেকে, রাজকীয় খাবার খেয়ে আর "রামকৃষ্ণ, ও প্রভু!" বলে ভাল কিছু হবে না-যদি না তুমি দরিদ্রদের জন্য ভাল কিছু করতে পার।"[১০৯][১১০] পরিণামস্বরুপ ১৮৯৫ সালে বেদান্ত শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দের সরবরাহকৃত অর্থে মাদ্রাজে "ব্রহ্মাবদীন" নামে এক সাময়িকপত্র প্রকাশ করা শুরু হয়েছিল।[১১১] পরবর্তীকালে (১৮৮৯) "ব্রহ্মাবদীনে" "দি ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট" এর প্রথম ছয় অধ্যায়ের বিবেকানন্দকৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।[১১২]

বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্য ক্যাপ্টেন এবং মিসেস সেভিয়ের ও জে জে গুডউইনকে নিয়ে ১৮৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তারা ফ্রান্স ও ইটালী ভ্রমণ করেন এবং লিওনার্ডো দা ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার দর্শন করে ১৮৯৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ভারতের উদ্দেশ্যে ন্যাপলস বন্দর ত্যাগ করেন।[১১৩] পরবর্তীতে মিস মুলার এবং সিস্টার নিবেদিতা ভারতে তাঁকে অনুসরণ করেন। সিস্টার নিবেদিতা তার বাকী জীবন ভারতীয় নারীদের শিক্ষায় এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে নিয়োজিত করেন।[১০০][১১৪]

ভারতে প্রত্যাবর্তন[সম্পাদনা]

চেন্নাইতে স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৯৭)

কলম্বো থেকে আলমোড়া[সম্পাদনা]

বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারী কলম্বো পৌঁছান এবং এক পরমানন্দদায়ক অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। এখানে তিনি প্রাচ্যে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বক্তৃতা (ভারত, পবিত্র ভূমি) করেন। সেখান থেকে কলকাতায় তাঁর ভ্রমণ ছিল এক বিজয়ঘটিত অগ্রগতি। তিনি ভ্রমণ করেন কলম্বো থেকে পাম্বান, রামেস্বরম, রামনাদ, মাধুরাই, কুম্বাকোনাম এবং মাদ্রাজ এবং এ জায়গাগুলোতে বক্তৃতা দেন। জনগণ এবং রাজারা তাঁকে অত্যুৎসাহী অভ্যর্থনা জানান। পাম্বানে মিছিলে রামনাদের রাজা নিজে স্বামীজির ঘোড়ার গাড়ি টানেন। মাদ্রাজে যাওয়ার পথে কতিপয় জাগয়ায় যেখানে ট্রেন থামতো না সেখানে জনগণ রেললাইনে বসে ট্রেন থামাতো এবং স্বামীজির বক্তৃতা শোনার পরই ট্রেনকে যেতে দিত।[১১৫] মাদ্রাজ থেকে তিনি কলকাতায় তাঁর ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন এবং আলমোরা পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতা দেয়া চালিয়ে যান। যেখানে পাশ্চাত্যে তিনি ভারতের মহান আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কথা বলেছিলেন, সেখানে ভারতে ফিরে তাঁর 'কলম্বো থেকে আলমোরা' বক্তৃতা ছিল জনগণের জন্য নৈতিক অনুপ্রেরণা, বর্ণাশ্রম ভাইরাস দূরীকরণ, বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহদান, দেশের শিল্পায়ন, দারিদ্র দূরীকরণ, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। এ সমস্ত বক্তৃতাসমূহ কলম্বো থেকে আলমোরা বক্তৃতা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এ বক্তৃতাসমূহকে জাতীয়তাবাদী ঐকান্তিকতা ও আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শের বলে বিবেচনা করা হয়।[১১৬] তাঁর বক্তৃতাসমূহ মহাত্মা গান্ধী, বিপিন চন্দ্র পাল এবং বালগঙ্গাধর তিলক সহ আরো অনেক ভারতীয় নেতাদের উপর প্রচুর প্রভাব বিস্তার করেছিল।[১১৭][১১৮]

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

অদ্বৈত আশ্রম, মায়াবতী, রামকৃষ্ণ মঠের একটি শাখা, প্রতিষ্ঠাকাল মার্চ ১৯, ১৮৯৯, পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দের অনেক লেখা প্রকাশ করে, বর্তমানে "প্রবুদ্ধ ভারত" সাময়িকী প্রকাশ করে

১৮৯৭ সালের ১লা মে কলকাতায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন ধর্ম প্রচারের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মঠ" এবং সামাজিক কাজের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মিশন"।[১১৯] এটি ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনের প্রারম্ভ।[৯৬] রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শের ভিত্তি হচ্ছে কর্ম যোগ[১২০][১২১] তাঁর দ্বারা দুটি মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার মধ্যে কলকাতার নিকট বেলুড়ের মঠটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের হেডকোয়ার্টার করা হয়েছিল এবং অন্যটি হিমালয়ের মায়াবতীতে আলমোরার নিকটে অদ্বৈত আশ্রম নামে পরিচিত এবং পরে তৃতীয় মঠটি মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ইংরেজীতে প্রবুদ্ধ ভারত ও বাংলায় উদ্বোধন নামে দুটি সাময়িকী চালু করা হয়েছিল।[১২২] একই বছর মুর্শিদাবাদ জেলায় স্বামী দুর্ভিক্ষের জন্য অখন্ডানন্দ কর্তৃক ত্রাণ কাজ চালু করা হয়েছিল।[৯৬][১১৯]

১৮৯৩ সালে পাশ্চাত্যে স্বামীজির প্রথম ভ্রমণের সময় যখন তারা একত্রে ইয়োকাহামা থেকে শিকাগো যাত্রা করেছিলেন তখন বিবেকানন্দ স্যার জামশেদজী টাটাকে একটি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আনুমানিক এ সময়ে স্বামীজি টাটার প্রতিষ্ঠিত "বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান" এর প্রধান হবার অনুরোধ সম্বলিত একটি চিঠি পান। কিন্ত্তু বিবেকানন্দ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে সেটি তাঁর আধ্যাত্মিক আগ্রহের সাথে সংঘাতপূর্ণ।[১২৩][১২৪]

তিনি পরে পুনঃসংস্কারকৃত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষের আর্য সমাজ ও গোঁড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষের সনাতনপন্থীদের মধ্যে ঐক্যতান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাঞ্জাব ভ্রমণ করেন। রাওয়ালপিন্ডীতে তিনি আর্য সমাজবাদী ও মুসলিমদের মধ্যকার সক্রিয় বিরোধ নির্মূল করার পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দেন।[১২৫] তাঁর লাহোর ভ্রমণ স্মরণীয় তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতার জন্য এবং একজন গণিতের অধ্যাপক তীর্থ রাম গোস্বামীর সাথে তাঁর সম্পৃক্ততার জন্য যে অধ্যাপক পরে স্বামী রাম তীর্থ নামে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন এবং ভারতে ও আমেরিকায় বেদান্ত প্রচার করেন।[১১৯] তিনি দিল্লী এবং খেতরীসহ অন্যান্য জায়গায়ও ভ্রমণ করেন এবং ১৮৯৬ সালের জানুয়ারীতে কলকাতায় ফিরে আসেন। পরবর্তী কয়েক মাস তিনি মঠের কাজ সংহত করতে এবং শিষ্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অতিবাহিত করেন।

দ্বিতীয় পাশ্চাত্য ভ্রমণ[সম্পাদনা]

তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সত্ত্বেও তিনি পুনরায় ১৮৯৯ সালের জুন মাসে পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[১২৬] তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা এবং স্বামী তুরিয়ানন্দ। তিনি স্বল্প সময় ইংল্যান্ডে অবস্থান করে তারপর আমেরিকায় যান। তাঁর এ ভ্রমণকালে তিনি সানফ্রান্সিসকো ও নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এক সহৃদয় আমেরিকান ভক্তের নিকট থেকে পাওয়া ১৬০-একর জমিতে (০.৬৫ বর্গকি.মি.) ক্যালিফোর্ণিয়ায় শান্তি আশ্রমও প্রতিষ্ঠা করেন।[১২৭] পরে তিনি ১৯০০ সালে প্যারিসে ধর্ম মহাসভায় যোগ দেন।[১২৮] লিঙ্গ পূজা ও গীতার যথার্থতা সম্পর্কিত বিবেকানন্দের পান্ডিত্যপূর্ণ প্রকাশের জন্য প্যারিস বক্তৃতা স্মরণীয়। প্যারিস থেকে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি ভ্রমণ করেন ব্রিটানি, ভিয়েনা, ইস্তানবুল, এথেন্স এবং মিশর। এ সময়ের বেশীর ভাগ অংশে তিনি ছিলেন বিখ্যাত চিন্তাবিদ জুলস বয়েসের অতিথি।[১২৭] তিনি ১৯০০ সালের ২৪শে অক্টোবর প্যারিস ত্যাগ করেন এবং একই সালের ৯ই ডিসেম্বর বেলুড় মঠে পৌঁছান।[১২৭]

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ মন্দির, বিবেকানন্দকে দাহ করার স্থানে

বিবেকানন্দ কিছু দিন মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমে এবং পরে বেলুড় মঠে অতিবাহিত করেন। অতঃপর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বেলুড় মঠে অবস্থান করে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের কাজ এবং ইংল্যান্ড ও আমেরিকার কাজ দেখাশোনা করে অতিবাহিত করেন। গোয়ালিয়রের মহারাজাসহ এ বছরগুলিতে হাজার হাজার দর্শক তাঁকে দেখতে আসেন। ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে দেখতে আসেন লোকমান্য তিলকসহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়রা। জাপানের ধর্ম মহাসভায় যোগ দেয়ার জন্য তিনি ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্ত্তু তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সেটি অসম্ভব করে তোলে। তাঁর শেষ দিনগুলিতে তিনি বোধগয়াবারাণসী তীর্থ করেন।[১২৯]

তাঁর ভ্রমণসমূহ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতাদান, ব্যক্তিগত আলোচনা এবং চিঠিপত্রের আদান-প্রদান তাঁর স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য শারীরীক অসুখে ভুগছিলেন।[১৩০] তাঁর দেহ ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ষপঞ্জি/পঞ্জিকা পড়তে দেখা যেত। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার তিন দিন পূর্বে তাঁকে দাহ করার স্থান দেখিয়ে দেন-যে স্থানে বর্তমানে তাঁর স্মৃতিতে একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কতিপয় লোকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন না।[১৩০]

তাঁর দেহ ত্যাগ করার দিন তিনি বেলুড় মঠে সকালে কিছু ছাত্রকে শুক্লা-যজুর্বেদ শেখান।[১৩১] তিনি ভ্রাতা-শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দের সাথে হাটেন এবং তাকে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। বিবেকানন্দ ধ্যান করার সময় ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই রাত ৯টা ১০ মিনিটে দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর শিষ্যদের মতে এটা ছিল মহাসমাধি[১৩২] পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যগণ লিপিবদ্ধ করেন যে তারা স্বামীজির নাসারন্ধ্র, তাঁর মুখ এবং চোখে "সামান্য রক্ত" লক্ষ্য করেছেন।[১৩৩] ডাক্তাররা মন্তব্য করেন যে এটি হয়েছে তাঁর মস্তিষ্কে একটি রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে, কিন্ত্তু তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে পারেননি। তাঁর শিষ্যদের মতানুসারে ব্রহ্মরন্ধ্র-মস্তিষ্কের চূড়ার রন্ধ্র-অবশ্যই ফেটে থাকবে যখন তিনি মহাসমাধি অর্জন করেছিলেন। বিবেকানন্দ তাঁর চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বেচে না থাকার তাঁর নিজের ভবিষ্যৎবাণী পূরণ করেছিলেন।[১৩১]

শিক্ষা ও দর্শন[সম্পাদনা]

স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে আদি শঙ্করের ভাষ্যের ভিত্তিতে বেদান্ত দর্শনে হিন্দু ধর্মের সারাংশ সবচেয়ে ভালভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন,[১৩৪]

  • প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরুপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ।[১৩৪]
  • লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো।[১৩৪]
  • কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন - একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর - এবং মুক্ত হ্‌ও।[১৩৪]
  • এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা। মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।[১৩৪]
  • যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যাই করা হোক না কেন তার সবই অধার্মিক।
  • জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।
  • শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ।
  • ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ।
  • মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা।

বিবেকানন্দের মতানুসারে, রামকৃষ্ণ থেকে পাওয়া তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে "জীব হচ্ছে শিব"।[১৩৫] এটি তাঁর মন্ত্রে পরিণত হয়, এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবার ধারণা উদ্ভাবন করেন-(দরিদ্র) মানুষের মধ্যে এবং মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা। "যদি সত্যিই সকল ইন্দ্রিয়গোচর বস্ত্তু বা বিষয়ের নিমিত্তে ব্রহ্মের একতা থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা অন্যদের থেকে আমাদের ভাল বা মন্দ বিবেচনা করব?" - এ প্রশ্ন তিনি নিজেকে করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এ পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্যসমূহ একতা/সমগ্রতার মধ্যস্থিত আলোর শূন্যতায় মিলিয়ে যায় যখন ভক্ত মোক্ষে পৌঁছেন। তখন এ একতা/সমগ্রতা সম্পর্কে অসচেতন "ব্যক্তিদের" জন্য সমবেদনা এবং তাদের সাহায্য করার দৃঢসংকল্প জাগ্রত হয়।

স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের সে শাখার অঙ্গীভূত বলে নিজেকে মনে করতেন যে শাখার মতে কেউই প্রকৃতভাবে মুক্ত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের সকলেই মুক্ত হচ্ছি। এমনকি ব্যক্তিগত পাপমোচনের আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে, এবং শুধুমাত্র অন্যদের পাপমোচনের জন্য ক্লান্তিহীন কর্ম আলোকিত মানুষের প্রকৃত চিহ্ন। আত্মনো মোক্ষার্থম্ জগদ্ধিতায় চ (দেবনাগরী: आत्मनो मोक्षार्थम् जगद्धिताय च) (নিজের মোক্ষলাভ এবং জগতের মঙ্গলের জন্য) - এ নীতিতে তিনি রামকৃষ্ণ মঠমিশন প্রতিষ্ঠা করেন।[১৩৬]

বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যদের পবিত্র, অস্বার্থপর হতে এবং শ্রদ্ধা/বিশ্বাস যাতে থাকে সে উপদেশ দেন। তিনি ব্রহ্মচর্য চর্চা করতে উপদেশ দেন। তাঁর শৈশবের বন্ধু প্রিয় নাথ সিনহার সাথে এক আলোচনায় তিনি তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং বাগ্মিতার উৎস/কারণ হিসেবে ব্রহ্মচর্য চর্চাকে অভিহিত করেন।[১৩৭]

বিবেকানন্দ প্যারাসাইকোলজি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের আবির্ভূত ক্ষেত্রকে সমর্থন করেননি (এর এক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর এ বক্তৃতায় মানুষ নিজেই তাঁর ভাগ্য নির্মাতা, সম্পূর্ণ কর্ম, ভলিউম ৮, নোটস অফ ক্লাস টকস এবং বক্তৃতাসমূহ) এ কারণে যে তাঁর মতে এ ধরণের কৌতুহল আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে সাহায্য করেনা বরং তা ব্যাহত করে।

প্রভাব ও উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

বিবেকানন্দ ভারতে ও ভারতের বাইরে হিন্দুধর্মকে পুনরায় উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। তাঁর জন্যেই পাশ্চাত্য সমাজে যোগ, ধ্যান ও আত্মবিকাশের অন্যান্য ভারতীয় পদ্ধতিগুলি সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছিল।[১৩৮] অগেহানন্দ ভারতী বলেছেন, "...আধুনিক যুগের হিন্দুরা হিন্দুধর্ম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জ্ঞান বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আহরণ করেন।"[১৩৯] বিবেকানন্দ বলেছিলেন, হিন্দুধর্ম (ও অন্যান্য সব ধর্মের) সব কটি শাখাসম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন পথে একই লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছে।[১৪০] যদিও কেউ কেউ তাঁর এই উক্তিকে হিন্দুধর্মের অতিসরলীকরণ বলে সমালোচনা করেছেন।[১৪০]

Statue in a garden
at Shri Ramakrishna Vidyashala, Mysore, India
(বাঁদিকে) মুম্বই শহরে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার কাছে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি।
(ডানদিকে) কর্ণাটকের মহীশূর শহরের শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাশালায় স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি।

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে জাতীয়তাবাদী ধারণার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদী আদর্শটিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারক চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ভাষায়, "স্বামী বিবেকানন্দের নির্ভীয় দেশাত্মবোধ সারা ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ভারতের নবজাগরণে স্বামী বিবেকানন্দের যতটা অবদান রেখেছিলেন, ততটা অন্য কেউ এককভাবে রাখতে পারেননি।"[১৪১] বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে।[১৪২] তাঁর জাতীয়তাবাদী ধারণা ভারতীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করেছিল। শ্রীঅরবিন্দ বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ভারতকে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগরিত করেছিলেন।[১৪৩] মহাত্মা গান্ধীর মতে বিবেকানন্দ ছিলেন সেই অল্প কয়কজন হিন্দু ধর্মসংস্কারকদের একজন "যিনি হিন্দুধর্মের প্রথা ও রীতিনীতির মৃত শাখাপ্রশাখাগুলিকে ছেঁটে ফেলে হিন্দুধর্মের সৌন্দর্য রক্ষা করেছিলেন।"[১৪৪]

স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী বলেছিলেন, "বিবেকানন্দ হিন্দুধর্ম ও ভারতকে রক্ষা করেছিলেন।"[১৪৫] বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ছিলেন "আধুনিক ভারতের স্রষ্টা"।[১৪৬] মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, বিবেকানন্দের রচনা তাঁর "দেশপ্রেম হাজারগুণ" বৃদ্ধি করেছিল। বিবেকানন্দ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিলেন।[১৪৭] নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীঅরবিন্দ, বাল গঙ্গাধর তিলকবাঘা যতীন প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অলডাস হাক্সলি, ক্রিস্টোফার ইশারউড, রোম্যাঁ রোলাঁ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীকে বিবেকানন্দের রচনা অনুপ্রাণিত করেছিল।[১৪৮] বিবেকানন্দের মৃত্যুর বহু বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারবিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক রোম্যাঁ রোলাঁকে লিখেছিলেন,[১৪৯] "ভারতকে জানতে চাইলে বিবেকানন্দের লেখা পড়ো। তাঁর মধ্যে সব কিছুই ইতিবাচক। নেতিবাচক কিছুই নেই।" রোম্যাঁ রোলাঁ লিখেছেন, "তাঁর লেখাগুলি মহান সংগীতের মতো। পংক্তিগুলি বিঠোভেনের শৈলীর মতো। চিত্তাকর্ষক ছন্দগুলি হ্যান্ডেল কোরাসের কুচকাওয়াজের মতো। আজ ত্রিশ বছর পরেও তাঁর বাণীগুলিকে স্পর্শ করলে আমার শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতের মতো শিহরণ জাগে। এই মহানায়কের মুখ থেকে যখন এই জ্বলন্ত শব্দগুলি উচ্চারিত হয়েছিল, তখন নিশ্চয় অনেকে এই শিহরণ অনুভব করেছিলেন!"[১৫০]

বিবেকানন্দের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে জামশেদজি টাটা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। এটি এখন ভারতের একটি প্রথম সারির গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়।[১৫১] বিদেশে বিবেকানন্দ প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মুলার ও বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এঁরা দুজনেই তাঁর বৈদিক শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ভারতে তাঁর জন্মদিন ১২ জানুয়ারি পালিত হয় জাতীয় যুব দিবস (ভারত) হিসেবে। অন্যদিকে, ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে বিবেকানন্দ বিশ্বধর্ম মহাসভায় তাঁর বিখ্যাত "শিকাগো বক্তৃতা" উপস্থাপন করেছিলেন বলে ১১ সেপ্টেম্বর তারিখটি "বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব দিবস" হিসেবে পালিত হয়।[১৫২][১৫৩] ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের অর্থ মন্ত্রক ভারতের আর্থনৈতিক পরিবেশে বিবেকানন্দের শিক্ষা ও মূল্যবোধের গুরুত্বের উপর আলোকপাত করেন। তদনীন্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় ১০০ কোটি টাকার "স্বামী বিবেকানন্দ ভ্যালু এডুকেশন প্রজেক্ট" অনুমোদন করেন। এই প্রকল্পে যুবসমাজকে প্রতিযোগিতা, প্রবন্ধ রচনা, আলোচনা ও পাঠচক্রে যুক্ত করা এবং বিবেকানন্দের রচনাবলি একাধিক ভাষায় প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।[১৫৪] ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ট্রেনিং কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "স্বামী বিবেকানন্দ রাজ্য পুলিশ আকাদেমি"।[১৫৫] ছত্তীসগঢ়ের রাজ্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পালটে রাখা হয়েছে "ছত্তীসগঢ় স্বামী বিবেকানন্দ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়"।[১৫৬] ২০১২ সালে রায়পুরের বিমানবন্দরটির নামও পালটে রাখা হয়েছে "স্বামী বিবেকানন্দ বিমানবন্দর"।[১৫৭]

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম-সার্ধশতবর্ষ ভারত ও ভারতের বাইরে মহাসমারোহে পালিত হয়েছে। ভারতের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ মন্ত্রক বিশেষভাবে ২০১৩ সালটিকে উদযাপন করেছে।[১৫৮] রামকৃষ্ণ মঠরামকৃষ্ণ মিশন, ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি, বিভন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যুব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এই উপলক্ষ্যে বর্ষব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক উৎপল সিংহ বিবেকানন্দের ১৫০ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে দ্য লাইট: স্বামী বিবেকানন্দ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।[১৫৯]

রচনা[সম্পাদনা]

Lectures from Colombo to Almora front cover 1897 edition
Vedanta Philosophy An address before the Graduate Philosophical Society 1901 cover page
(বাঁদিকে)লেকচার্স ফ্রম কলম্বো টু আলমোড়া (বাংলা অনুবাদে ভারতে বিবেকানন্দ) বইটির ১৮৯৭ সংস্করণের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা
(ডানদিকে)বেদান্ত ফিলোজফি: অ্যান অ্যাড্রেস বিফোর দ্য গ্র্যাজুয়েট ফিলোজফিক্যাল সোসাইটি (বাংলা অনুবাদে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত) বইটির ১৯০১ সংস্করণের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা
স্বামী বিবেকানন্দের নিজের হাতের লেখায় "ব্লেসিংস টু নিবেদিতা" কবিতার পাণ্ডুলিপি। [১৬০]

বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই বিবেকানন্দ ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাগ্মী ও লেখক।[১৬১] তাঁর অধিকাংশ বইই হল বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দেওয়া বক্তৃতার সংকলন। তিনি গায়ক ও কবি ছিলেন।[১৬২] "গায়ক, চিত্রশিল্পী, আশ্চর্য ভাষাবিশারদ ও কবি বিবেকানন্দ ছিলেন একজন সম্পূর্ণ শিল্পী"। তিনি অনেকগুলি গান ও কবিতা লিখেছিলেন (তার মধ্যে তাঁর প্রিয় রচনা "মৃত্যুরূপা কালী" কবিতাটি অন্যতম)। বিবেকানন্দ উপদেশগুলির মধ্যে রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁরা ভাষা ছিল সহজ ও সরল। বাংলা রচনার ক্ষেত্রে তিনি মনে করতেন, ভাষা (কথ্য ও লিখিত) এমন হওয়া উচিত যা লেখকে পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের বদলে, লেখকের বক্তব্যের মূল ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারবে।

বর্তমান ভারত হল বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত বাংলা প্রবন্ধ।[১৬৩] ১৮৯৯ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একমাত্র বাংলা মুখপত্র উদ্বোধন পত্রিকার মার্চ সংখ্যায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ সালে প্রবন্ধটি বই আকারে প্রকাশিত হয় এবং পরে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে সংকলিত হয়।[১৬৪] এই প্রবন্ধেই বিবেকানন্দ দরিদ্র ও তথাকথিত হীন বর্ণে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের নিজের ভাই বলে উল্লেখ করেছিলেন।[১৬৫]


জীবদ্দশায় প্রকাশিত[১৬৬]
মরণোত্তর প্রকাশিত

১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা[১৬৬]

  • ভক্তি-প্রসঙ্গে
  • ভক্তিযোগ
  • প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য (১৯০৯)[১৭১]
  • দেববাণী (১৯০৯)
  • নারদ ভক্তিসূত্র – অনুবাদ
  • পরাভক্তি
  • প্র্যাকটিক্যাল বেদান্ত
  • জ্ঞানযোগ
  • রাজযোগ (১৯২০)
  • স্বামী বিবেকানন্দের বাণী সঞ্চয়ন
  • স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (দশ খণ্ড)
  • কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ (নয় খণ্ড)

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "World fair 1893 circulated photo"। vivekananda.net। সংগৃহীত ১১ এপ্রিল ২০১২ 
  2. ২.০ ২.১ Georg 2002, পৃ. 600.
  3. Clarke 2006, পৃ. 209.
  4. Von Dense 1999, পৃ. 191.
  5. Dutt 2005, পৃ. 121.
  6. Virajananda 2006, পৃ. 21.
  7. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 21
  8. যুগনায়ক বিবেকানন্দ (অধ্যায় "বংশ পরিচয়"), প্রথম খণ্ড, স্বামী গম্ভীরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃ. ১১-২৩
  9. ৯.০ ৯.১ Bhuyan 2003, পৃ. 4.
  10. ১০.০ ১০.১ Banhatti 1995, পৃ. 2.
  11. Banhatti 1995, পৃ. 1.
  12. Badrinath 2006, পৃ. 3.
  13. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; losv_11 নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  14. ১৪.০ ১৪.১ ১৪.২ Nikhilananda 1964.
  15. ১৫.০ ১৫.১ Sen 2003, পৃ. 20.
  16. Paul 2003, পৃ. 5.
  17. Badrinath 2006, পৃ. 2.
  18. Mukherji 2011, পৃ. 5.
  19. ১৯.০ ১৯.১ Bhuyan 2003, পৃ. 5.
  20. ২০.০ ২০.১ Banhatti 1995, পৃ. 4.
  21. Sil 1997, পৃ. 32.
  22. ২২.০ ২২.১ Chakrabarti 2001, পৃ. 628–631.
  23. Sen 2003, পৃ. 21.
  24. ২৪.০ ২৪.১ Sen 2006, পৃ. 12–14.
  25. Sen 2003, পৃ. 104–105.
  26. ২৬.০ ২৬.১ Pangborn ও Smith 1976, পৃ. 106.
  27. ২৭.০ ২৭.১ Dhar 1976, পৃ. 53.
  28. ২৮.০ ২৮.১ Malagi ও Naik 2003, পৃ. 36–37.
  29. Prabhananda 2003, পৃ. 233.
  30. Banhatti 1995, পৃ. 7–9.
  31. ৩১.০ ৩১.১ Chattopadhyaya 1999, পৃ. 31.
  32. Sil 1997, পৃ. 30.
  33. Gupta 2003, পৃ. 2.
  34. Dhar 1976, পৃ. 59.
  35. ৩৫.০ ৩৫.১ Banhatti 1995, পৃ. 8.
  36. Badrinath 2006, পৃ. 20.
  37. ৩৭.০ ৩৭.১ Chattopadhyaya 1999, পৃ. 29.
  38. Sen 2006, পৃ. 12–13.
  39. ৩৯.০ ৩৯.১ ৩৯.২ Chattopadhyaya 1999, পৃ. 43.
  40. Ghosh 2003, পৃ. 31.
  41. Badrinath 2006, পৃ. 18.
  42. "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ", দ্বিতীয় ভাগ (ঠাকুরের দিব্যভাব ও নরেন্দ্রনাথ), স্বামী সারদানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৮৩
  43. Mannumel, Thomas। The Advaita of Vivekananda: A Philosophical Appraisal। পৃ: ১৭। 
  44. Chattopadhyaya 1999, পৃ. 30.
  45. Badrinath 2006, পৃ. 21.
  46. Paranjape 2012, পৃ. 132.
  47. Prabhananda 2003, পৃ. 232.
  48. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; Prabha-2003-232 নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  49. Vivekananda, Swami। "My Master"The Complete Works of Swami Vivekananda 4। Advaita Ashrama। পৃ: 178–179। 
  50. ৫০.০ ৫০.১ ৫০.২ Banhatti 1995, পৃ. 10–13.
  51. ৫১.০ ৫১.১ Rolland 1929a, পৃ. 169–193.
  52. Arora 1968, পৃ. 4.
  53. Bhuyan 2003, পৃ. 8.
  54. Sil 1997, পৃ. 38.
  55. Sil 1997, পৃ. 39–40.
  56. Kishore 2001, পৃ. 23-25.
  57. Nikhilananda 1953, পৃ. 25-26.
  58. Sil 1997, পৃ. 27.
  59. ৫৯.০ ৫৯.১ Isherwood 1976, পৃ. 20.
  60. Pangborn ও Smith 1976, পৃ. 98.
  61. ৬১.০ ৬১.১ Rolland 1929b, পৃ. 201–214.
  62. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 183
  63. Banhatti 1995, পৃ. 17.
  64. ৬৪.০ ৬৪.১ God lived with them, p.38
  65. God lived with them, p.39
  66. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 277
  67. Rolland 2008, পৃ. 7
  68. Dhar 1976, পৃ. 243
  69. ৬৯.০ ৬৯.১ Richards, Glyn (১৯৯৬)। "Vivekananda"। A Source-Book of Modern Hinduism। Routledge। পৃ: 77–78। 
  70. P. R. Bhuyan। Swami Vivekananda। পৃ: ১২। 
  71. ৭১.০ ৭১.১ ৭১.২ ৭১.৩ ৭১.৪ Rolland 2008, পৃ. 16-25
  72. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 214-216
  73. Rolland 2008, পৃ. 11-12
  74. ৭৪.০ ৭৪.১ ৭৪.২ Banhatti 1995, পৃ. 19-22
  75. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 227-228
  76. ৭৬.০ ৭৬.১ Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 243-261
  77. Rolland 2008, পৃ. 15
  78. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 262-287
  79. Rolland 2008, পৃ. 25 "It was so at Poona in October, 1892 ; Tilak, the famous savant and Hindu political leader, took him at first for a wandering monk of no importance and began by being ironical; then, struck by his replies revealing his great mind and knowledge, he received him into his house for ten days without ever knowing his real name. It was only later, when the newspapers brought him from America the echoes of Vivekananda's triumph and a description of the conqueror, that he recognised the anonymous guest who had dwelt beneath his roof."
  80. Dhar 1976, পৃ. 1434 "Tilak recoded his impressions as follows, 'When asked about his name he only said he was a Sanyasin ....There was absolutely no money with him. A deerskin, one of two clothes and a Kamandalu were his only possessions.'
  81. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 288-320
  82. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 321-346
  83. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 323–325
  84. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 327–329
  85. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 339–342
  86. This view is supported by the evidence of two eyewitnesses. One of these was Ramasubba Iyer. In 1919, when Swami Virajananda, a disciple of the Swamiji, went on pilgrimage to Kanyakumari, Iyer told him that he had himself seen the Swami meditating on the rock for hours together, for three days consecutively ... Another eye-witness, Sadashivam Pillai, told that the Swami had remained on the rock for three nights and had seen him swim over to the rock. Next morning Pillai went to the rock with food for the Swami. There he found him meditating; and when Pillai asked him to return to the mainland, he refused. When he offered food to the Swami, the latter asked him not to disturb him. See, Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 344–346
  87. ৮৭.০ ৮৭.১ Agarwal, Satya P. (১৯৯৮), The social role of the Gītā: how and why, Motilal Banarsidass, পৃ: 59, আইএসবিএন 9788120815247 
  88. Life and Philosophy of Swami Vivekananda, p.24
  89. ৮৯.০ ৮৯.১ ৮৯.২ Paranjape, Makarand (২০০৫), Penguin Swami Vivekananda Reader, Penguin India, পৃ: 246–248, আইএসবিএন 0143032542 
  90. P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ১৫ 
  91. ৯১.০ ৯১.১ Minor, Robert Neil (১৯৮৬), "Swami Vivekananda's use of the Bhagavad Gita", Modern Indian Interpreters of the Bhagavad Gita, SUNY Press, পৃ: ১৩৩ 
  92. P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ১৬ 
  93. Banhatti 1995, পৃ. 27 "Representatives from several countries, and all religions, were seated on the platform, including Mazoomdar of the Brahmo Samaj, Nagarkar of Prarthana Samaj, Gandhi representing the Jains, and Chakravarti and Mrs. Annie Besant representing Theosophy. None represeted Hinduism, as such, and that mantle fell on Vivekananda."
  94. ৯৪.০ ৯৪.১ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ১৭ 
  95. ৯৫.০ ৯৫.১ ৯৫.২ McRae 1991
  96. ৯৬.০ ৯৬.১ ৯৬.২ ৯৬.৩ Prabhananda 2003, পৃ. 234
  97. J. N. Farquhar, Modern Religious Movements in India, পৃ: ২০২ 
  98. Sharma, Arvind, "Swami Vivekananda's Experiences", Neo-Hindu Views of Christianity, পৃ: ৮৭ 
  99. P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ১৮ 
  100. ১০০.০ ১০০.১ ১০০.২ ১০০.৩ ১০০.৪ ১০০.৫ Adjemian, Robert; Christopher Isherwood, "On Swami Vivekananda", The Wishing Tree, পৃ: 121–122  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  101. Banhatti 1995, পৃ. 30
  102. ১০২.০ ১০২.১ God lived with them, pp.49-50
  103. Life and Philosophy of Swami Vivekananda, p.27
  104. Burke, Marie Louise (১৯৫৮), Swami Vivekananda in America: New Discoveries, পৃ: ৬১৮ 
  105. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; sn নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  106. God lived with them, p.47
  107. Kattackal, Jacob (১৯৮২), Religion and Ethics in Advaita, St. Thomas Apostolic Seminary, পৃ: ২১৯ 
  108. Majumdar, Ramesh Chandra (১৯৬৩), Swami Vivekananda Centenary Memorial Volume, পৃ: ৫৭৭ 
  109. Burke, Marie Louise (১৯৮৩), Swami Vivekananda in the West: New Discoveries, পৃ: ৪১৭ 
  110. Sharma, Benishankar (১৯৬৩), Swami Vivekananda: A Forgotten Chapter of His Life, Oxford Book & Stationary Co., পৃ: ২২৭ 
  111. Sheean, Vincent (২০০৫), "Forerunners of Gandhi", Lead, Kindly Light: Gandhi and the Way to Peace, Kessinger Publishing, পৃ: ৩৪৫ 
  112. Sharma, Arvind, "Swami Vivekananda's Experiences", Neo-Hindu Views of Christianity, পৃ: ৮৩ 
  113. Life and Philosophy of Swami Vivekananda, pp.33-34
  114. A Comprehensive Biography of Swami Vivekananda, p.852
  115. "Return and Consolidation", Life and Philosophy of Swami Vivekananda, পৃ: 33–34 
  116. P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ২০ 
  117. P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, পৃ: ২৭ 
  118. Gokhale, B. G. (Jan., ১৯৬৪), "Swami Vivekananda and Indian Nationalism", Journal of Bible and Religion (Oxford University Press) 32 (1): 35–42, "Vivekananda, Tilak, and Gandhi form parts of one continuous process. Many of Gandhi's ideas on Hinduism and spirituality come close to those of Vivekananda." 
  119. ১১৯.০ ১১৯.১ ১১৯.২ Banhatti 1995, পৃ. 34–35
  120. Thomas, Abraham Vazhayil (১৯৭৪), Christians in Secular India, পৃ: ৪৪, "Vivekananda emphasized Karma Yoga, purposeful action in the world as the thing needful for the regeneration of the political, social and religious life of the Hindus." 
  121. Miller, Timothy, "The Vedanta Movement and Self-Realization fellowship", America's Alternative Religions, পৃ: ১৮১, "Vivekananda was adamant that the social worker should never believe that she or he was actually improving the world, which is, after all, illusory. Service should be performed without attachment to the final results. In this manner, social service becomes karma yoga, the disciple of action, that ultimately brings spiritual benefits to the server, not to those being served." 
  122. Kraemer, Hendrik, "Cultural response of Hindu India", World Cultures and World Religions, পৃ: ১৫১ 
  123. Prabhananda 2003, পৃ. 235
  124. LULLA, ANIL BUDUR (সেপ্টেম্বর ৩, ২০০৭)। "IISc looks to Belur for seeds of birth"। The Telegraph। 
  125. Eastern and Western disciples 2006a, পৃ. 291
  126. Eastern and Western disciples 2006b, পৃ. 450
  127. ১২৭.০ ১২৭.১ ১২৭.২ Banhatti 1995, পৃ. 41–42
  128. "The Paris Congress of the History of Religions", Complete Works of Swami Vivekananda 4, Advaita Ashrama 
  129. Banhatti 1995, পৃ. 43–44
  130. ১৩০.০ ১৩০.১ Banhatti 1995, পৃ. 45–46
  131. ১৩১.০ ১৩১.১ Eastern and Western disciples 2006b, পৃ. 645–662
  132. A.P. Sen (২০০৬), "Editor's Introduction", The Indispensable Vivekananda, পৃ: ২৭ 
  133. M.V. Kamnath (২০০৫), "p.241", Philosophy of Life and Death 
  134. ১৩৪.০ ১৩৪.১ ১৩৪.২ ১৩৪.৩ ১৩৪.৪ Jackson, Carl T (১৯৯৪), "The Founders", Vedanta for the West, Indiana University Press, পৃ: 33–34 
  135. Y. Masih (১৯৯১), "Introduction to Religious Philosophy", Introduction to Religious Philosophy, Motilal Banarsidass, পৃ: ৬৮ 
  136. Agarwal, Satya P. (১৯৯৮), The social role of the Gītā: how and why, Motilal Banarsidass, পৃ: ix 
  137. Priya Nath Sinha, "Conversations and Dialogues : VI - X Shri Priya Nath Sinha", Complete Works of Swami Vivekananda 5 
  138. Dutta 2003, পৃ. 110.
  139. Rambachan 1994, পৃ. 6–8.
  140. ১৪০.০ ১৪০.১ Shattuck 1999, পৃ. 93–94.
  141. Bharathi 1998b, পৃ. 37.
  142. Bharathi 1998b, পৃ. 37–38.
  143. Bhide 2008, পৃ. 69.
  144. Parel 2000, পৃ. 77.
  145. Shetty 2009, পৃ. 517.
  146. "Article on Swami Vivekananda"। সংগৃহীত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ 
  147. "Celebration of anniversaries in 2013"। UNESCO। সংগৃহীত ৮ মার্চ ২০১২ 
  148. Wolffe 2004, পৃ. 158.
  149. "Article on Swami Vivekananda"। সংগৃহীত ২০ আগস্ট ২০১১ 
  150. Nikhilananda 1953, পৃ. 2.
  151. Kapur 2010, পৃ. 142.
  152. "National Youth Day"National Portal of India। Government of India। ১০ জানুয়ারি ২০০৯। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১১ 
  153. "Remembering Swami Vivekananda"। Zee News.India। ১১ জানুয়ারি ২০১১। সংগৃহীত ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ 
  154. "National implementation committee approves funds for Swami Vivekananda values' education project"। Highbeam http://www.highbeam.com/।। সংগৃহীত ১৪ এপ্রিল ২০১২  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  155. "Swami Vivekananda State Police Academy"। Swami Vivekananda State Police Academy। সংগৃহীত ৯ জানুয়ারি ২০১৩ 
  156. "Chhattisgarh Swami Vivekananda Technical University"। Csvtu.ac.in। ১৯ নভেম্বর ২০১২। সংগৃহীত ২০১৩-০২-০৭ 
  157. "Pranab hopes Raipur airport's new terminal will support Chhattisgarh's growth"The Hindu। সংগৃহীত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  158. "2013–14 Declared the Year for Skill Development of the Youth Parliamentary Consultative Committee Attached to Ministry of Youth Affairs & Sports Meets"। PTI। সংগৃহীত ৩ মার্চ ২০১৩ 
  159. "Year-long events to mark Vivekananda's 150th birthday"The Times of India। সংগৃহীত ৩ মার্চ ২০১৩ 
  160. Chakrabarti, Mohit (১৯৯৮)। Swami Vivekananda, poetic visionary। New Delhi: M.D. Publications। পৃ: 80। আইএসবিএন 81-7533-075-9 
  161. Das 1991, পৃ. 530.
  162. Banhatti 1963, পৃ. 276.
  163. Mittra 2001, পৃ. 88.
  164. Chattopadhyaya 1999, পৃ. 118.
  165. Dalal 2011, পৃ. 465.
  166. ১৬৬.০ ১৬৬.১ "Vivekananda Library online"। vivekananda.net। সংগৃহীত ২২ মার্চ ২০১২ 
  167. Chattopadhyaya 1999, পৃ. 33.
  168. Michelis 2005, পৃ. 124.
  169. Kearney 2013, পৃ. 169.
  170. Banhatti 1995, পৃ. 145.
  171. Urban 2007, পৃ. 314.

জীবনীগ্রন্থ[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]


উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামের গ্রুপের <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ দেয়া হয়নি