নবরাত্রি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আক্ষরিক অর্থেই মহালয়ার দিন থেকেই শারদীয় দূর্গোৎসব শুরু হয়।মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ব্যাপি মা দূর্গার নয়টি শক্তির আরাধনা করা হয় সেটাই নবরাত্রি। নবরাত্রির নয়দিনে আরাধ্য দেবীরা হলেনঃ প্রতিপদে শৈলপুত্রী ( পর্বতের কন্যা),দ্বিতীয়াতে ব্রহ্মচারিণী (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান ), তৃতীয়াতে চন্দ্রঘন্টা ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি ),চতুর্থীতে কুষ্মান্ডা ( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি ), পঞ্চমীতে স্কন্দমাতা ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা ),ষষ্ঠীতে কাত্যায়নী ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী ), সপ্তমীতে কালরাত্রি ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত ), অষ্টমীতে মহাগৌরী (তিনি সন্তানবৎসলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং নবমীতে সিদ্ধিদাত্রী ( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন )।[১]

বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা হলেন শঙ্কিত। তখন ব্রহ্মা বললেন, দুর্গাপূজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তাই রামচন্দ্রের মঙ্গলের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা যজমানী করতে রাজি হলেন। তখন শরৎকাল। দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। এতএব ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পরমাসুন্দরী বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধরলেন। ব্রহ্মা বললেন, "রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যতদিন না রাবণ বধ হয়, ততদিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে এইভাবেই।" একথা শুনে চণ্ডিকা বললেন, "সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবেন। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।" হলও তাই। মহাবিপদ কেটে গেল অষ্টমীতে; তাই অষ্টমী হল মহাষ্টমী। রাবণ বধ করে মহাসম্পদ সীতাকে লাভ করলেন রাম; তাই নবমী হল মহানবমী। [২]

বিভিন্নভাবে নবরাত্রি পালিত হয়

1.পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজা -পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে নবরাত্রি দুর্গাপূজার জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করা হয়ে থাকে| পূজা উৎসবের ষষ্ঠ দিনে বোধন (দেবী জাগরণ) দিয়ে শুরু হয় এবং দশম দিন পর্যন্ত চলতে থাকে|এখানে দেবী দুর্গাকে কন্যা হিসেবে গণ্য করা হয় যিনি দীর্ঘ সময় পর বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন|

2. গুজরাটের গর্ভা রাশ- - কিভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন ভাবে নবরাত্রি উদযাপন করে থাকে? গুজরাটে, একটি মাটির পাত্র 'গর্ভা' (গর্ভ) প্রতীক হিসেবে রাখা হয়| মহিলারা নানারকম ঝলমলে পোশাক পরে এই পাত্রের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ করে থাকেন|এছাড়াও গুজরাটের ডান্ডিয়া রাশ আরেকটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য যা নবরাত্রির সময় করতে দেখা যায়|

3. তামিলনাডুর বোম্মাই গলু -এখানে সুন্দর সাজানো গলু পুতুল বিজোড় সংখ্যাযুক্ত 3, 7, বা 9 স্তরে প্রদর্শিত করে দেব দেবী হিসেবে পুজো করা হয়| আলো দিয়ে সাজিয়ে এবং স্তবগান করে এই নয় দিন ব্যাপী উৎসব উদযাপন করা হয়|

5. মহারাষ্ট্রের নবরাত্রি - যদিও গর্ভা অনুষ্ঠান মহারাষ্ট্রেও উদযাপন করা হয়; সেখানে এই উৎসবে কিছু অন্যরকম আচার পালন করতে দেখা যায়| এই সময়ে, বিবাহিত নারীরা একে অপরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সিঁদুর, মিষ্টি, চুড়ি, বিন্দি ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন|

6. কেরলে নবরাত্রি - ভারতের সবচেয়ে সাক্ষর রাজ্য হিসাবে কেরলকে বিবেচনা করা হয়|এখানে, নবরাত্রি শুধুমাত্র তিন দিনের জন্য পালিত হয়|মানুষ দেবী সরস্বতীর সামনে দুই দিনের জন্য তাদের বই রেখে জ্ঞান ও বিদ্যার জন্য প্রার্থনা করে| সাধারণত, এই বিভিন্ন উপায়ে নবরাত্রি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয়|নয় দিন পর দেবী দুর্গার প্রতিমা পবিত্র জলে নিমজ্জিত করা হয়| বিহার ও উত্তরপ্রদেশে উৎসবের দশম দিনে দশেরা উপলক্ষে 'রামলীলা' উদযাপন করা হয়| বাংলার জনগণ, সম্মান ও ভালবাসা বিনিময় করে, 'বিজয়া দশমীর' মিষ্টির মাধ্যমে|প্রকার যাই হোক না কেন, এই উৎসব সব ভারতীয়দের হৃদয় জুড়ে থাকে|[৩]

  1. https://sujonhazarika.wordpress.com/2015/10/22/নবরাত্রি
  2. https://bengali.oneindia.com/astrology/some-unknown-fact-about-nabodurga-navratri-010867.html
  3. http://bengali.boldsky.com/spirituality/different-ways-navratri-is-celebrated