মুহাম্মাদের সামরিক জীবন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৬ শতকে আকা উহুদ যুদ্ধের চিত্র যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন মুহম্মদ স। (ছবিতে তাকে ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকা এবং আগুন দিয়ে ঘিরে রাখা অবস্থায় আকানো হয়েছে)

ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সফল সামরিক পেশাজীবন ৬২২ থেকে ৬৩২ অবধি তার জীবনের শেষ দশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। শক্তিশালী কুরাইশ গোত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পবিত্র মক্কা নগরী থেকে তাকে এবং তার অনুসারীদের বিতাড়িত করা হয়। তিনি মক্কার কাফেলাগুলিকে বাধা দিতে শুরু করেছিলেন। ৬২৪-এ বদর যুদ্ধের প্রথম লড়াইয়ের পরে তাঁর শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং কূটনীতি বা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি অন্যান্য গোত্রগুলিকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন। ৬৩০ সালে তিনি অবশেষে মক্কা এবং কাবা জয়ের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জন করেছিলেন। ৬৩২ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়ে মুহাম্মদ আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চলকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ইসলামিক বিস্তারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

সশস্ত্র সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়া[সম্পাদনা]

মুহাম্মদের সময় আরব

৬১৯ সান চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পরে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এমন একজনের অভাব বোধ করছিলেন যিনি মক্কার ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল পরিবেশে তাকে সুরক্ষা সরবরাহ করবেন। মক্কার বাইরের গোত্রসমূহের কাছে পৌঁছানোর বেশ কয়েকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পরে, তিনি মদিনার (তত্কালীন ইয়াসরিব) বানু খাজরাজের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে ছয়জনকে ইসলামে আনতে সক্ষম হন। মদীনায় মুহাম্মদ ও ইসলামের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং ৬১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নতুন প্রতিনিধি দল মক্কায় পৌঁছে। তাদের মধ্যে বনু আউজের দুই সদস্য ছিলো। বনু খাজরাজ এবং বানু আউস এই সময় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র ছিলো। তারা মদীনা নগরীর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার জন্য লড়াই করছিলো। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেন এবং একজন কুরআন তেলাওয়াতকারী সহ তাদেরকে মদীনায় ফেরত পাঠান। ৬২২ সালের মার্চ মাসে মদিনায় ধীরে ধীরে ইসলামের বৃদ্ধি ঘটে। এই সময় ৭২ জনের একটি নতুন প্রতিনিধি দল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে পরামর্শ করে। তারা মুহাম্মদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের প্রস্তুতির প্রতিশ্রুতি দেয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মদীনার ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার প্রস্তুতির কথা জানান। [ক] মক্কাবাসীরা, যারা এই সভার গুজব শুনেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে এটি যুদ্ধের আহ্বান। তারা ৬২২ সালের জুনে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে হত্যার প্রয়াসে ব্যর্থ হয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তার সহযোগী আবু বকরকে সাথে নিয়ে মদিনায় পালিয়ে যান তা ইসলামে হিজরত হিসাবে পরিচিত। [২]

মদীনা পাঁচটি গোত্রে বিভক্ত ছিল: তাদের মধ্যে দুটি গোত্র বনু খাজরাজ এবং বনু আওস। ইহুদিদের গোত্রগুলো (ছোট থেকে বৃহত্তম) বনু কায়নূকা, বানু আল-নাদির এবং বনু কুরাইজা[২] মদিনায় পৌঁছে তিনি নগর পরিচালনার বিষয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মদিনার সনদ হিসাবে পরিচিত একটি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এতে স্বাক্ষর করে মুসলিম, আনসার এবং মদিনার বিভিন্ন ইহুদি গোত্র। [৩]

সনদের তাৎপর্যপূর্ণ ধারাগুলির মধ্যে হ'ল যদি একজন স্বাক্ষরকারী তৃতীয় পক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে এই সিদ্ধান্ত যে মুসলমানরা তাদের ধর্ম এবং ইহুদিদের তাদের ধর্ম অনুসরণ করবে, পাশাপাশি হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে নেতা হিসাবে নিয়োগের প্রস্তাব ছিল। [৪]

প্রথম কাফেলা অভিযান[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবীগণ শীঘ্রই একটি ধারাবাহিক কাফেলা অভিযানে লিপ্ত হন। এই অভিযানগুলি সাধারণত আক্রমণাত্মক ছিল [৫] এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা কুরাইশের ব্যবসায়ের জিনিসপত্র জব্দ করার জন্য পরিচালিত হয়।[৬] মুসলমানরা ঘোষণা করেছিল যে এই আক্রমণগুলি ন্যায়সঙ্গত ছিল এবং আল্লাহ তাদেরকে মক্কাবাসীদের দ্বারা মুসলমানদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রক্ষা করার অনুমতি দিয়েছেন।[৭] [৮] এই অভিযানের আরেকটি কারণ অর্থনৈতিক চাপ বলে মনে হয়। কারণ মদীনা মুহাজির মুসলিম রসদ সরবরাহে খুববেশী সক্ষম ছিল না। তাই টিকে থাকার জন্যে বাইরে থেকে খাবার সংগ্রহ করতে তারা বাধ্য হয়।[২]

প্রথম পিচ যুদ্ধ[সম্পাদনা]

বদরের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

মানচিত্র মক্কার কাফেলা, মুসলিম সেনাবাহিনী এবং মক্কা ত্রাণ সেনাবাহিনীর গতিবিধি প্রদর্শন করে

বদরের যুদ্ধ মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম প্রধান যুদ্ধ। এতে জয়ের ফলে মুসলিমদের ক্ষমতা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায়।

যুদ্ধের পূর্বে ৬২৩ থেকে ৬২৪ সালের মধ্যে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে বেশ কিছু খন্ডযুদ্ধ হয়। বদর ছিল দুই বাহিনীর মধ্যে প্রথম বড় আকারের যুদ্ধ। যুদ্ধে সুসংগঠিত মুসলিমরা মক্কার সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। যুদ্ধে মুসলিমদের প্রধান প্রতিপক্ষ আবু জাহল নিহত হয়। মুসলিমদের বিজয়ের অন্যদের কাছে বার্তা পৌছায় যে মুসলিমরা আরবে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং এর ফলে নেতা হিসেবে মুহাম্মাদ এর অবস্থান দৃঢ় হয়। যুদ্ধের পর মুসলিমরা মদিনায় ফিরে আসে। এতে কয়েকজন কুরাইশ নেতাসহ ৭০জন বন্দী হয়। বন্দীদের সাথে সদ্বব্যবহার করা হয়েছিল। মুসলিমরা নিজেরা খেজুর খেয়ে বন্দীদের রুটি খেতে দেয়।

উহুদের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

উহুদের যুদ্ধ উহুদ পর্বতের সংলগ্ন স্থানে সংঘটিত হয়।মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই দুই পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে মুহাম্মাদ ও আবু সুফিয়ান। ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত প্রধান যুদ্ধসমূহের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। এর পূর্বে ৬২৪ সালে এই দুইপক্ষের মধ্যে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মক্কার পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের সূচনা করা হয়েছিল। যুদ্ধযাত্রার খবর পাওয়ার পর মুসলিমরাও তৈরী হয় এবং উহুদ পর্বত সংলগ্ন প্রান্তরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা প্রথমদিকে সাফল্য লাভ করেছিল এবং মক্কার সৈনিকরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিজয়ের খুব কাছাকাছি থাকা অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর কিছু অংশের ভুল পদক্ষেপের কারণে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। মুহাম্মাদ মুসলিম তীরন্দাজদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে ফলাফল যাই হোক তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে না আসে। কিন্তু তারা অবস্থান ত্যাগ করার পর মক্কার বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলিমদের উপর আক্রমণের সুযোগ পান ফলে মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরী হয়। এসময় অনেক মুসলিম নিহত হয়। মুহাম্মাদ নিজেও আহত হয়েছিলেন। মুসলিমরা উহুদ পর্বতের দিকে পিছু হটে আসে। মক্কার বাহিনীকে এরপর মক্কায় ফিরে আসে।

এই যুদ্ধে সংঘটিত হওয়ার পর ৬২৭ সালে দুই বাহিনী পুনরায় খন্দকের যুদ্ধে মুখোমুখি হয়।

খন্দকের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ ৫ হিজরিতে (৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ) সংঘটিত হয়। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। জোট বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০ এবং সেসাথে তাদের ৬০০ ঘোড়া ও কিছু উট ছিল। অন্যদিকে মদিনার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ৩,০০০।

পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে মুহাম্মাদ মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণকারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কুরাইজা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসলাম পূর্বের চেয়ে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠে।

খায়বারের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

খায়বারের যুদ্ধ ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন আরবের মদিনা নগরী থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মা) দুরে অবস্থিত খায়বার নামক মরুভূমিতে বসবাসরত ইহুদিগণের সাথে মুসলিমগণের সঙ্ঘটিত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের ইতিহাস অনুসারে, মুসলিমগণ সেখানে দুর্গে আশ্রয় নেয়া ইহুদিদেরকে আক্রমণ করেছিল।

৭ম হিজরিতে মদীনা আক্রমণ করার ব্যাপারে খায়বারের ইহুদীদের নতুন ষড়যন্ত্রের কারণে খায়বার যুদ্ধ হয়। খায়বার ছিল মদীনা থেকে ৮০ মাইল দূরের একটি বড় শহর। এখানে ইহুদীদের অনেক গুলি দুর্গ ও ক্ষেত খামার ছিল। মূলত খায়বার ছিল ইহুদীদের একটি নতুন উপনিবেশ। খায়বারের ইহুদীরা বনু কোরাইজা গোত্রের ইহুদীদের কে বিশ্বাসঘাতকায় উদ্দীপিত করেছিল। এছাড়া মুহাম্মাদ কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র এই খায়বার থেকে হত। খায়বারের ইহুদীরা গাতাফান গোত্র ও বেদুঈনদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করছিল। খায়বার যুদ্ধে পরাজিত ইহুদীদের কে মুহাম্মাদ কোন নির্বাসন দেন নি। প্রতি বছর তাদের উৎপাদিত ফল ফসলের অর্ধেক ইহুদীরা মুসলমানদের কে দিবে এই শর্তে খায়বারের ইহুদীরা খায়বারে থাকার অনুমতি পায়। কিন্তু এই খায়বার যুদ্ধের পর পর এক ইহুদী মহিলা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ করে ছাগলের মাংসের ভিতরে বিষ মিশিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এই ঘটনার পরেও মুহাম্মাদ খায়বারের সকল ইহুদীদের কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

আক্রমণের কারণ প্রসঙ্গে, স্কটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট খায়বার যুদ্ধে বনু নাদির গোত্রের উপস্থিতি উদ্ধৃত করেন, যারা মদিনার ইসলামী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা জাগিয়ে তুলছিল। ইতালীয় প্রাচ্যবিদ লরা ভেক্সিয়া ভ্যাগ্লিয়েরি ওয়াটের তত্ত্বের সাথে ঐকমত্য্য পোষণ করে দাবী করেন যে, যুদ্ধের পেছনে আরও কারণ থাকতে পারে, যেগুলো হল, ইহুদিদের উক্ত দুরভিসন্ধির প্রতিক্রিয়া মুহাম্মাদের সাহাবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধ অভিযানসমূহের রসদ হিসেবে যুদ্ধলব্ধ মালামালসমূহ লুণ্ঠনের উপযোগিতা।

পরিশেষে খায়বারের ইহুদিগণকে অবরোধ করা হয় এবং উক্ত উপত্যকায় তাদেরকে থাকার অনুমতি দেয়া হয় এই শর্তে যে, তারা মুসলিমগণকে তাদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক বাৎসরিকভাবে প্রদান করবে। খলিফা ওমররের সময়ে ওমর কর্তৃক বহিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওখানেই তাদের বসবাস অব্যাহত ছিল। এই বিজয়ের ফলাফলস্বরূপ বিজিত ইহুদিদের উপর ইসলামের বিধান অনুযায়ী জিজিয়া কর আরোপ করা হয় এবং তাদের অধিভুক্ত জমিসমূহ মুসলিমদের প্রশাসনিক দখলের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিনিময়ে, ইহুদিগণ তাদের ধর্মপালনের অনুমতি পায়, বৃহৎ পরিসরে নিজ সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করে, মুসলিমদের কাছ থেকে বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা লাভের প্রতিশ্রুতি লাভ করে এবং তাদেরকে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এবং যাকাত প্রদানের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়, যেগুলো মুসলিম নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক।

হুদাইবিয়া[সম্পাদনা]

হিজরি ৬ষ্ঠ সনের জ্বিলকদ মাসে হুদাইবিয়ার অভিযান সংঘটিত হয়। এই সনে নবী করীম একদা স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মদীনা থেকে মক্কায় চলে গেলেন এবং সেখানে উমরা পালন করলেন। নবীর স্বপ্ন নিছক একটি স্বপ্ন নয়, বরং সেটিও একধরনের ওহী। সুতরাং এরপর তিনি চৌদ্দশ সাহাবীসহ উমরা পালন করার জন্য মক্কা রওনা হলেন। কিন্তু জ়েদ্দা থেকে মক্কাগামী পথের পাশে হুদাইবিয়া নামক স্থানে মক্কার মুশরিকদের দ্বারা তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। ফলে, মক্কায় পৌছে উমরা পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। পথিমধ্যে হুদাইবিয়া নামক স্থানে উনি তীব্র বাধার সম্মুখীন হন। এই স্থানের সানিয়াতুল মিরার নামক স্থানে উনার উটনী বসে যায়। অপরদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযানের হুমকি আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহায়ল ইবনে আমরকে দূত হিসাবে পাঠান হয়। সেখানে সাক্ষরিত সমঝোতা গুলিই হুদাইবার সন্ধি হিসাবে পরিচিত হয়। নবী করীম উমরার জন্য নিয়ে আসা পশুগুলো সেখানে কোরবানী করে মদীনায় ফিরে যান। অতঃপর পবিত্র ক্বোরআনে সুরা ফাতেহ তে ইহাকে প্রকাশ্য বিজয় হিসাবে অভিহিত করা হয়।

মুসলিম জোট সম্প্রসারণ[সম্পাদনা]

মক্কার হুমকীমুক্ত মুসলমানরা অন্যান্য ওয়াসিস ও গোত্রের বিরুদ্ধে তাদের কার্যক্রম প্রসারিত কর। তারা খায়বারের সমৃদ্ধ ওসিসকে জয় করে (খায়বারের যুদ্ধ দেখুন) এবং ঘাটাফান, মুররাহ, সুলাইম এবং হাওয়াইজিন এর বিরুদ্ধে অভিযানকারী দল পাঠিয়েছিল।

মক্কা বিজয়[সম্পাদনা]

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে পাণ্ডুলিপিটিতে মুসলিম সেনাবাহিনী মক্কার দিকে যাত্রা দেখানো হয়েছে।

নবী মুহাম্মাদ খ্রিস্টীয় ৬৩০ অব্দে রক্তপাতহীনভাবে মক্কা নগরী দখল করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা মক্কা বিজয় নামে খ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় যদিও আল কুরআনে হুদাইবিয়ার সন্ধিকেই প্রকাশ্য বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত প্রকৃতপক্ষে হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয় দুটিই মুহাম্মদ (সাঃ) -এর অতুলনীয় দূরদর্শীতার ফল। হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে যে বিজয়ের সূত্রপাত হয়েছিল তার চূড়ান্ত রূপই ছিল মক্কা বিজয়। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পক্ষে আরবের অন্যান্য এলাকা বিজয় করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে। হুদাইবিয়ার সন্ধি মোতাবেক সন্ধির পরবর্তী বছর মুহাম্মদ (সাঃ) ২০০০ সাহাবা নিয়ে মক্কায় উমরাতুল ক্বাযা পালন করতে আসেন এবং এ সময়ই তিনি মক্কার কুরাইশদের মধ্যে নেতৃত্বের শুন্যতা লক্ষ্য করেন। তাদের ক্ষাত্রশক্তির সঠিক পরিমাপ করতে পেরেছিলেন তিনি এবং এজন্যই অধীর ছিলেন মক্কা বিজয়ের জন্য। এর ১ বছরের মাথায়ই তিনি তা সম্পন্ন করার জন্য মনস্থির করেন।

পরিসংখ্যান[সম্পাদনা]

ক্ষয়ক্ষতি[সম্পাদনা]

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর পরিচালিত সমস্ত যুদ্ধে মোট হতাহতের সংখ্যা কম-বেশি ১০০০ হতে পারে। সমসাময়িক ইসলামী পন্ডিত মাওলানা ওয়াহিদউদ্দীন খান বলেছেন যে "২৩ বছর যাবত এই বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল, ৮০ টি সামরিক অভিযান হয়েছিল। ২০ টিরও কম অভিযানে লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়। এই যুদ্ধগুলিতে ২৫৯ জন মুসলমান এবং ৭৫৯ জন অমুসলিম মারা গিয়েছিল - মোট ১০১৮ জন মারা যায়। " [৯]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

মন্তব্য[সম্পাদনা]

  1. Rodgers 2012, পৃ. 48।
  2. Rodgers 2012
  3. Ibn Hisham, as-Seerat an-Nabawiyyah, Vol. I p. 501.
  4. al-Mubarakpuri (2002) p.230
  5. Montgomery Watt, William (২১ জানুয়ারি ২০১০)। Muhammad: prophet and statesman। Oxford University Press, 1974। পৃষ্ঠা 105। আইএসবিএন 978-0-19-881078-0 
  6. Mubarakpuri, When the Moon Split, p. 146.
  7. Welch, Muhammad, Encyclopedia of Islam
  8. See:
  9. Maulana Wahiduddin Khan, Muhammad: A Prophet for All Humanity, goodword (2000), p. 132

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Abdel-Samad, Hamed (২০১৬)। "Der Koran. Botschaft der Liebe. Botschaft des Hasses" (German ভাষায়)। Droemer। আইএসবিএন 3426277018 
  • Donner, Fred (১৯৮১)। The Early Islamic Conquests। Princeton University Press। আইএসবিএন 9780691101828 
  • Mikaberidze, Alexander (২০১১)। "Badr, Battle of"। Conflict and Conquest in the Islamic World: A Historical Encyclopedia। ABC–CLIO। পৃষ্ঠা 165–166। আইএসবিএন 1598843362 
  • Pickthall, Muhammad M. (১৯৩০)। The Quran। ২০১৮-১২-১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  • Rodgers, Russ (২০১২)। The Generalship of Muhammad: Battles and Campaigns of the Prophet of Allah। University Press of Florida। আইএসবিএন 9780813042718 
  • Watt, Montogomery (১৯৫৬)। Muhammad at Medina। Oxford University Press। 
  • Watt, Montogomery (১৯৭৪)। Muhammad: prophet and statesman। Oxford University Press। 
  • al-Mubarakpuri, Saif-ur-Rahman (২০০২)। The Sealed Nectar: Biography of the Noble Prophet। Darussalam। আইএসবিএন 1-59144-071-8 
  1. "Its declaration to wage war against Muhammad's enemies was one crucial aspect of the Second Pledge of al-Aqaba. (....) During the negotiations before the pledge was made, one of the members of the Madinah delegation asked the Prophet about previous alliances they had made with the Jews [of Medina], expressing his concern that once Muhammad was victiorious, he might leave them to face the defeated Jews alone. To this the Prophet declared that "I will war against them that war against you and be at peace with those at peace with you." The implication was clear: The Second Pledge of al-Aqaba was against any who opposed Islam, and this pledge would invalidate previous treaties–principally those with the Jews of Madinah."[১]

আরও পড়া[সম্পাদনা]