প্রাক্-ইসলামি আরবে ধর্মবিশ্বাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইয়েমেন থেকে প্রাপ্ত অ্যালাবাস্টার-নির্মিত ও মানতসূত্রে প্রদত্ত পুত্তলিকা, অধুনা রোমের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ওরিয়েন্টাল আর্টে সংরক্ষিত

প্রাক্-ইসলামি আরবে ধর্মবিশ্বাসগুলির মধ্যে ছিল স্থানীয় আরব বহুদেববাদ, প্রাচীন সেমিটিক ধর্মসমূহ, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম এবং জরথুস্ট্রবাদ, মিথ্রীয় ধর্ম, মানি ধর্ম সহ বিভিন্ন ইরানীয় ধর্ম

প্রাক্-ইসলামি আরবের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ধর্মবিশ্বাসটি ছিল আরব বহুদেববাদ। এই ধর্মের ভিত্তি ছিল বিভিন্ন দেবদেবী ও অতিলৌকিক সত্ত্বার পূজা। হুবাল ও দেবী আল-লাত, আল-‘উজ্জামানাত সহ বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করা হত মক্কার কাবা বিভিন্ন স্থানীয় উপাসনাস্থল ও মন্দিরে। তীর্থযাত্রা, ভবিষ্যৎ কথন ও আনুষ্ঠানিক বলিদান প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবদেবীদের শ্রদ্ধা নিবেদন ও আবাহনের প্রথা ছিল। মক্কানগরীয় ধর্মে আল্লাহের কী ভূমিকা ছিল তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছেপ্রাক্-ইসলামি দেবদেবীদের অবয়ব কেমন ছিল তা অনেকটা জানা যায় আবিষ্কৃত মূর্তিগুলি থেকে। এই ক্ষেত্রে কাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত মূর্তিগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে কাবায় এই ধরনের ৩৬০টি মূর্তি ছিল।

এছাড়াও প্রাক্-ইসলামি আরবে অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসগুলি ভিন্ন রূপে এবং তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিসরে অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। প্রতিবেশী রোমানআকসুমীয় সভ্যতার প্রভাবে আরবের উত্তরপশ্চিম, উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছিল। আরব উপদ্বীপের অবশিষ্টাংশে খ্রিস্টধর্ম বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মান্তরণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এই দেশে খ্রিস্টধর্মের পধান রূপটি ছিল মিয়াফিসিটবাদ, যার ব্যতিক্রম শুধুমাত্র উত্তরপূর্ব আরব ও পারস্য উপসাগর-সংলগ্ন অঞ্চলে প্রচলিত নেস্টরিয়ানবাদ। রোমান রাজত্বকাল থেকেই আরব উপদ্বীপ ইহুদি অনুপ্রবেশকারীদের একটি গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। যার দলে গড়ে উঠেছিল একটি অভিবাসী ইহুদি সম্প্রদায় এবং তার সম্পূরক হয়েছিল ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত স্থানীয়রা। সেই সঙ্গে সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রভাবে ইরানীয় ধর্মগুলি আরব উপদ্বীপে প্রভাব বিস্তার করেছিল। জরথুস্ট্রবাদের অস্তিত্ব ছিল উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে, অন্যদিকে মক্কাতেও যে মানি ধর্ম বা সম্ভবত মাজদাকবাদ অনুশীলন করা হত তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রেক্ষাপট ও উৎসসূত্র[সম্পাদনা]

মোটামুটি খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত আরবের প্রায় সকল অধিবাসীই বহুদেববাদী ধর্মগুলির অনুগামী ছিল।[১] প্রাক্-ইসলামি আরবে গুরুত্বপূর্ণ আকারে ইহুদিখ্রিস্টান সংখ্যালঘু সমাজ গড়ে উঠলেও বহুদেববাদই সেই সময় ছিল সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ধর্মমত।[২][৩]

প্রাক্-ইসলামি ধর্ম ও দেবমণ্ডলী-সংক্রান্ত সমসাময়িক তথ্যের উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে অল্পসংখ্যক অভিলেখ ও খোদাইচিত্র,[৩] প্রাক্-ইসলামি কবিতা, ইহুদি ও গ্রিক বিবরণীর মতো বাহ্য উৎসসূত্রগুলি এবং সেই সঙ্গে কুরআন ও ইসলামি সাহিত্যের মতো ইসলামি প্রথায় প্রচলিত সূত্রগুলি। তা সত্ত্বেও এই বিষয়ে খুব অল্প তথ্যই পাওয়া যায়।[৩]

আরব্য বহুদেববাদের একটি প্রাচীন সাক্ষ্য পাওয়া যায় এসারহাদোনের বর্ষপঞ্জিতে। এখানে আতারসামাইন, নুখায়, রুলদাইউ ও আতারকুরুমার কথা উল্লিখিত হয়েছে।[৪] হেরোডোটাসের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, আরবরা ওরোটাল্ট (ডায়োনিসাস হিসেবে চিহ্নিত) এবং আলিলাতের (আফ্রোদিতি হিসেবে চিহ্নিত) পূজা করত।[৫][৬] স্ট্রাবো বলেছেন যে, আরবরা ডায়োনিসাস ও জিউসের পূজা করত। ওরিগেন বলেছেন যে, তারা ডায়োনিসাস ও ইউরেনিয়ার পূজা করত।[৬]

আরব বহুদেববাদ সম্পর্কে ইসলামি উৎসসূত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অষ্টম শতাব্দীতে হিশাম ইবন আল-কালবি কর্তৃক রচিত কিতাব আল আশনাম (মূর্তিসমূহের পুস্তক)। এফ. ই. পিটারস এই বইটিকে প্রাক্-ইসলামি আরবের ধর্মীয় রীতিনীতি-সংক্রান্ত সর্বাপেক্ষা তথ্যবহুল বই বলে উল্লেখ করেছেন।[৭] অন্যান্য রচনাগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইয়েমেনি ইতিহাসবিদ আল-হাসান আল-হামদানির দক্ষিণ আরব্য ধর্মবিশ্বাস-সংক্রান্ত রচনাগুলি।[৮]

কিতাব আল আশনাম অনুযায়ী, ইব্রাহিমের পুত্রের (ইসমাইল) উত্তরসূরিরা, যারা মক্কায় বসতিস্থাপন করেছিল, তারা অন্যান্য দেশে চলে যান। সঙ্গে করে তারা নিয়ে গিয়েছিল কাবার পবিত্র পাথরগুলিকে। যেখানে তারা যায় সেখানে তারা সেই সব পাথর প্রতিষ্ঠা করে এবং কাবার মতো করে সেগুলিকে প্রদক্ষিণ করার রীতির প্রবর্তন ঘটায়।[৯] আল-কালবির মতে, এইভাবেই মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটে।[৯] এই তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা অনুমান করেন প্রথম দিকে আরবেরা হয়তো পাথর পূজা করত, পরে বিদেশিদের প্রভাবে তাদের মধ্যে মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটে।[৯] এক দেবতা ও সেই দেবতার প্রতিনিধি রূপে একটি পাথরের সম্পর্কটি ছদ্ম-মেলিটনের হোমিলি নামে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর একটি সিরিয়াক রচনাতেও পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে উত্তর মেসোপটেমিয়ার যে সিরিয়াক-ভাষীদের পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাসের বিবরণ দেওয়া হয়েছে তারা প্রধানত ছিল আরবদেশীয়।[৯]

পূজা[সম্পাদনা]

দেবদেবী[সম্পাদনা]

নাবাতীয় পবিত্র প্রস্তরে এক দেবীর মুখ, সম্ভবত আল-উজ্জা

প্রাক্-ইসলামি আরবের ধর্মগুলি ছিল বহুদেববাদী। এই ধর্মাবলম্বীদের পূজিত অনেক দেবদেবীর নামই জানা যায়।[১] ভিন্ন ভিন্ন আকারের আনুষ্ঠানিক দেবমণ্ডলী অধিকতর লক্ষণীয় ছিল সাধারণ নগর-রাষ্ট্র থেকে উপজাতীয় সমষ্টির রাজ্যগুলির স্তরে।[১০] বিভিন্ন উপজাতি, শহর, গোষ্ঠী, বংশ ও পরিবারগুলির তাদের নিজস্ব কাল্টও ছিল।[১০] ক্রিস্টিয়ান জুলিয়েন রবিনের মতে, দিব্য জগতের এই গঠন সমসাময়িক কালের সমাজটিকে প্রতিফলিত করে।[১০] উষ্ট্রারোহী বণিকদল বিদেশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও বহন করে এনেছিল।[১১]

বহু সংখ্যক দেবদেবীরই কোনও নির্দিষ্ট নাম ছিল না, তাদের অভিহিত করা হত গুণবাচক কোনও উপাধি, কোনও পারিবারিক সম্পর্ক বা ‘তিনি (পুরুষ দেবতার ক্ষেত্রে ধু ও দেবীর ক্ষেত্রে ধাত) যিনি অমুক কাজ করেছেন’ – এইভাবে।[১০]

মক্কা প্রভৃতি শহরে বসবাসকারী উপজাতিগুলির থেকে যাযাবর বেদুইনদের ধর্মবিশ্বাস ও রীতিনীতি স্বতন্ত্র ছিল।[১২] মনে করা হয় যে, ফেটিশবাদ, টোটেমবাদপূর্বপুরুষ পূজা ইত্যাদি যাযাবরদের ধর্মবিশ্বাস ও রীতিনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু এই বিশ্বাস ও রীতিনীতি প্রধানত তাৎক্ষণিক গুরুত্ববহ বিষয় ও সমস্যাগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, পরলোক ইত্যাদি বৃহত্তর দার্শনিক প্রশ্নগুলি এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হত না।[১২] সেই সঙ্গে এও মনে করা হয় যে, এক স্থানে বসবাসকারী আরবরা অপর দিকে একটি অধিকতর জটিল দেবমণ্ডলীতে বিশ্বাস করত।[১২] মক্কাবাসীরা এবং হেজাজের অন্যান্য অধিবাসীরা দেবদেবীদের পূজার জন্য শহরে ও মরুদ্যানগুলিতে স্থায়ী উপাসনালয় গড়ে তুলেছিল, কিন্তু বেদুইনরা ধর্মানুশীলন করত তাদের চলার পথেই।[১৩]

উপদেবতা[সম্পাদনা]

দক্ষিণ আরবে ‘মানাধাত’-রা ছিল সম্প্রদায়ের নামহীন রক্ষাকর্তা উপদেবতা এবং পরিবারের পূর্বপুরুষের প্রেত[১৪] এদের বলা হত ‘তাদের পূর্বপুরুষদের সূর্য (শামস)’।[১৪]

উত্তর আরবে জিন্নায়ে-দের কথা জানা যায় পালমিরার অভিলেখগুলি থেকে। এই অভিলেখগুলিতে এদের “ভালো ও পুরস্কারদাতা দেবতা” বলে উল্লেখ করা হয়। সম্ভবত এদের সঙ্গে পশ্চিম ও মধ্য আরবের জিন-দের সম্পর্ক ছিল।[১৫] জিনরা মানুষকে আঘাত করতে বা মানুষের উপর ভর করতে সক্ষম হলেও জিন্নায়েরা সেই ক্ষমতার অধিকারী ছিল না। এরা ছিল অনেকটা রোমান জিনিয়াসদের অনুরূপ।[১৬] সাধারণ আরবদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ভবিষ্যকথক, প্রাক্-ইসলামি দার্শনিক ও কবিরা অনুপ্রেরণা লাভ করতেন জিনদের থেকে।[১৭] যদিও সাধারণ মানুষ জিনদের ভয়ও পেত। কারণ মনে করা হত বিভিন্ন ধরনের রোগ ও মানসিক ব্যাধির কারণ এই জিনেরাই।[১৮]

অপদেবতা[সম্পাদনা]

মঙ্গলকারী দেবতা ও উপদেবতা ছাড়াও অপকারকারী অপদেবতাদের কথাও কল্পনা করা হত।[১৫] অভিলেখগুলিতে এই অপদেবতাদের কথা উল্লিখিত না হলেও প্রাক্-ইসলামি আরবি কবিতায় এদের পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং এদের কিংবদন্তি পরবর্তীকালের মুসলমান লেখকদের দ্বারা সংগৃহীত হয়েছিল।[১৫]

সাধারণত গুলদের উল্লেখ পাওয়া যায়।[১৫] শব্দ-ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে, ইংরেজি "ghoul" শব্দটি এসেছে আরবি গুল বা গালা (অর্থাৎ ‘ভর করা’) থেকে,[১৯] যার সঙ্গে সুমেরীয় গাল্লা-র একটি সম্পর্ক রয়েছে।[২০] মনে করা হত, এদের চেহারা অতি কদাকার ও পা দু’টি গাধার মতো।[১৫] কথিত আছিল, এদের সম্মুখীন হলে আরবেরা একটি দোহা উচ্চারণ করত যার অর্থ, “হে গর্দভপদী, শুধু গাধার ডাক ডেকে চলে যায়, আমরা মরু সমভূমি ত্যাগ করব না বা কখনও উচ্ছনে যাব না।”[১৫]

ক্রিস্টিয়ান জুলিয়েন রবিন বলেছেন যে, দক্ষিণ আরবের সকল জ্ঞাত দেবতারই একটি ইতিবাচক ও রক্ষাকারী ভূমিকা ছিল এবং অমঙ্গলকারী শক্তিগুলির ইঙ্গিত শুধু পরোক্ষেই করা হয়, সেগুলিকে মূর্ত আকারে কল্পনা করা হত না।[২১]

দেবদেবীর ভূমিকা[সম্পাদনা]

আল্লাহের ভূমিকা[সম্পাদনা]

কোনও কোনও গবেষক অনুমান করেন যে মক্কা সহ প্রাক্-ইসলামি আরবের সর্বত্র[২২] আল্লাহ্কে একজন দেবতা হিসেবে গণ্য করা হত।[২২] সম্ভবত তিনি ছিলেন এক বহুদেববাদী দেবমণ্ডলীর এক সৃষ্টিকর্তা দেবতা বা এক সর্বোচ্চ দেবতা[২৩][২৪] ‘আল্লাহ্’ শব্দটি (আরবি আল-ইলাহ্ অর্থাৎ ‘ঈশ্বর’ থেকে উৎসারিত)[২৫] সম্ভবত নাম হিসেবে নয়, বরং একটি উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হত।[২৬][২৭][২৮] মক্কার ধর্মে আল্লাহের ধারণাটি সম্ভবত অস্পষ্ট ছিল।[২৯] ইসলামি সূত্রের মতে, মক্কাবাসীরা ও তাদের প্রতিবেশীরা মনে করত যে দেবী আল-লাত, আল-‘উজ্জামানাত ছিলেন আল্লাহের কন্যা।[২][২৪][২৬][২৭][৩০]

‘আল্লাহ্’ শব্দের আঞ্চলিক রূপভেদগুলি পাওয়া যায় পৌত্তলিক ও খ্রিস্টান উভয় প্রকারের প্রাক্-ইসলামি অভিলেখগুলিতেই।[৩১][৩২] ‘আল্লাহ্’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায় মুহাম্মদের এক প্রজন্ম পূর্বের প্রাক্-ইসলামি আরব কবি জুহায়ের বিন আবি সুলমার কবিতায় এবং সেই সঙ্গে প্রাক্-ইসলামি ব্যক্তিনামগুলিতেও।[৩৩] মুহাম্মদের বাবার নাম ছিল “আবদ্-আল্লাহ্”, যার অর্থ “আল্লাহের দাস”।[২৯]

চার্লস রাসেল কল্টার ও প্যাট্রিশিয়া টার্নার মনে করেন যে, আল্লাহের নামটি সম্ভবত ‘আইলিয়াহ্’ নামক কোনও প্রাক্-ইসলামি দেবতার নাম থেকে উৎসারিত এবং এটি এল, ইল, ইলাহ্জেহোবা নামের অনুরূপ একটি নাম। এই শেষোক্ত দেবতাদের উপরেও প্রাক্-ইসলামি আল্লাহের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আরোপিত হয়েছিল, আপাতদৃষ্টিতে যার ভিত্তি মনে করা হয় আলমাকাহ্, কাহ্ল, শাকের, ওয়াদ্ ও ওয়ারাখের মতো চান্দ্র দেবতারা।[৩৪] অ্যালফ্রেডের গিলামের মতে, যে ইলাহ্ থেকে আল্লাহ্ শব্দের উৎপত্তি তার সঙ্গে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ‘ইল’ বা প্রাচীন ইজরায়েলের ‘এল’ শব্দের যোগসূত্রটি স্পষ্ট নয়। ওয়েলহসেন বলেছেন যে, ‘আল্লাহ্’ শব্দটির কথা ইহুদি ও খ্রিস্টান সূত্র থেকেও জানা যায় এবং পৌত্তলিক আরবদের কাছে আল্লাহ্ সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।[৩৫] উইনফ্রেড কর্ডুয়ান ইসলামের আল্লাহের সঙ্গে এক চন্দ্রদেবতার সংযোগের তত্ত্বটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, ‘আল্লাহ্’ শব্দটি একটি অভিধার কাজ করত, ঠিক যেমন দেবতা সিনের উপাধি হিসেবে এল-এলিয়ন শব্দটি ব্যবহার করা হত।[৩৬]

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে উৎকীর্ণ দক্ষিণ আরব অভিলেখগুলিতে রাহমান (“দয়ালু”) নামে এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। রাহমানের একটি একেশ্বরবাদী কাল্ট ছিল এবং এই দেবতাকে “স্বর্গ ও পৃথিবীর প্রভু” বলে উল্লেখ করা হত।[২৪] অ্যারোন ডব্লিউ. হিউজেস বলেছেন যে, রাহমানের কাল্ট কোনও পূর্বতন বহুদেববাদী ধারা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল নাকি খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়গুলির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ফলের বিকাশ লাভ করেছিল সেই বিষয়ে গবেষকেরা নিশ্চিত নন। সেই সঙ্গে হিউজেস আরও বলেছেন যে, আল্লাহের সঙ্গে রাহমানের কোনও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন।[২৪] ম্যাক্সিম রডিনসন যদিও মনে করেন যে, আল্লাহের অপর নাম ‘আর-রাহমান’ পূর্বে আহমানান রূপেও ব্যবহৃত হত।[৩৭]

মক্কার দেবদেবীরা[সম্পাদনা]

মক্কার আরব্য পুরাণে তিন প্রধান দেবী ছিলেন লাত, উজ্জামানাত। এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ক্ষেত্র ছিল এবং তাইফের কাছে মূর্তি সহ মন্দিরও ছিল।[৩৮] এটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।[৩৯] আল-লাত (আরবি: اللات‎‎) বা আল্লাত ছিলেন পাতালের দেবী।[৪০] আল-উজ্জা (আরবি: العزى‎‎, অর্থাৎ ‘সর্বশক্তিময়ী’) ছিলেন আরবের উর্বরতার দেবী। যুদ্ধে রক্ষা ও জয়ের জন্য তার কাছে প্রার্থনা করা হত।[৪১] মনাত (আরবি: مناة‎‎) ছিলেন ভাগ্যের দেবী। কিতাব আল আশনাম অনুসারে, তিনিই ছিলেন দেবীত্রয়ীর মধ্যে প্রাচীনতমা। মনাতের একটি মূর্তি মদিনা ও মক্কার মাঝে কাদাদের আল-মুশাল্লালের কাছে সমুদ্রতীরে নির্মিত হয়েছিল। বনু আউসবনু খাজরাজ এবং মক্কা ও মদিনা সহ উক্ত অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এলাকার সবাই মনাতকে শ্রদ্ধা জানাত এবং নিজেদের শিশুসন্তান বলি দিত। আউস, খাজরাজ, ইয়াথরিব ও অন্যান্য সব আরবরা মনাতকে দর্শন না করলে এবং মস্তক মুণ্ডন না করলে তীর্থযাত্রা সম্পূর্ণ হয় না বলে মনে করত।[৪২]

মক্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের অন্যতম ছিলেন হুবাল। কাবায় তার একটি মূর্তি পূজা করা হত। কাবা তার প্রতি উৎসর্গিত ছিল। এখানকার ৩৬০টি দেবমূর্তির মধ্যে তার মূর্তিটিই ছিল শ্রেষ্ঠ। সম্ভবত এই ৩৬০ জন দেবতা বছরের প্রত্যেকটি দিনের প্রতিনিধি ছিলেন।[৪৩] কাবার কাছে হুবালের একটি মূর্তি ছিল। কথিত আছে, এটি একটি মানুষের আকৃতিবিশিষ্ট মূর্তি এবং এর ডান হাতটা ছিল কাটা। সেই ডান হাতের জায়গায় ছিল একটি সোনার হাত।[৪৪] মক্কাবাসীদের অন্যতম দেবতা ছিলেন মানাফ (আরবি: مناف‎‎)। তিনি ছিলেন নারী ও ঋতুস্রাবের দেবতা।[৩৮]

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেবতা[সম্পাদনা]

  • ওয়াদ (আরবি: ود‎‎) ছিলেন প্রেম ও বন্ধুত্বের দেবতা। মনে করা হত, ওয়াদের কাছে সাপেরা পবিত্র।[৩৮]
  • আম (আরবি: أم‎‎) ছিলেন চাঁদের দেবতা। আবহাওয়ার (বিশেষত বজ্রপাত) সঙ্গে তার যোগের জন্য তাকে পূজা করা হত।
  • তালাব (আরবি: تألب‎‎) ছিলেন দক্ষিণ আরবে পূজিত এক দেবতা। বিশেষত শেবা অঞ্চলে তার পূজা হত। তিনিও ছিলেন চন্দ্রদেবতা। তার কল থেকে পরামর্শ নেওয়া হত।
  • ধুল-বালাসা (আরবি: ذو الحلاس‎‎) ছিলেন দক্ষিণ আরবের এক ওর্যাদকল দেবতা। তাকে শ্বেতপাথরের মূর্তিতে পূজা করা হত।
  • আল-কায়ুম (আরবি: القوم‎‎) ছিলেন নাবাতিয়ান যুদ্ধ ও রাত্রি দেবতা। এছাড়া তিনি ছিলেন ক্যারাভানের রক্ষক।
  • দুশারা (আরবি: ذو الشرى‎‎) ছিলেন নাবাতিয়ান পর্বতদেবতা।

অতিলৌকিক সত্ত্বা[সম্পাদনা]

পরি[সম্পাদনা]

  • জিন (বা জিনি, আরবি: جن‎‎ jinn) হল এমন এক অতিলৌকিক সত্ত্বা যাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। এরা ভাল বা খারাপ হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খারাপ জিনরা মানুষদের কুপথে চালনা করে বিনষ্ট করত।[৪৫]
  • মারিদ (আরবি: مارد‎‎ mārid) হল সবচেয়ে শক্তিশালী জিন। এদের শক্তি অনেক। এরা খুবই উদ্ধত ও অহংকারী। অন্যান্য জিনের মতো এদের ইচ্ছাশক্তি আছে। কিন্তু এদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা যায়। এরা নশ্বরদের ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারে। তবে যুদ্ধ করে, শাস্তি দিয়ে, অনুষ্ঠান পালন করে বা সহজভাবে তুষ্ট করে এদের ব্যবহার করতে হয়।
  • ইফ্রিত (আরবি: عفريت‎‎ ‘ifrīt) হল নরকের জিন। এদের স্থান দেবদূত ও শয়তানদের নিচে। এরা শক্তিমত্তা ও চাতুর্যের জন্য কুখ্যাত। এরা অগ্নিময় ডানাওয়ালা জীব। এরা পুরুষ বা নারী হয়। মাটির তলায় বা ধ্বংসাবশেষে এদের বাস। প্রাচীন আরব উপজাতীয় ক্ষেত্রে রাজা, উপজাতি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ইলফ্রিতরা বাস করত। তারা একে অপরকে বিয়ে করত। তবে তারা মানুষকেও বিয়ে করতে পারত। সাধারণ অস্ত্র বা শক্তি প্রয়োগ করে তাদের ক্ষতি করা যেত না। জাদুর সাহায্যেই মানুষ তাদের হত্যা বা বন্দী করতে পারত। জিনের মতো, ইলফ্রিতরাও বিশ্বাসী নয় অবিশ্বাসী,ভাল নয় মন্দ হত। তবে সাধারনত তাদের খারাপ ও নিষ্ঠুর আকারেই চিত্রিত করা হত।

দৈত্য[সম্পাদনা]

  • নাসনাস (আরবি: نسناس‎‎ nasnās) অর্ধেক মানুষ। এদের অর্ধেক মাথা, অর্ধেক দেহ, একটি হাত, একটি পা থাকত। এর সাহায্যে তারা সহজে চলাফেরা করতে পারত। মনে করা হয়, নাসনাসরা শিক নামে এক দানব ও এক মানুষের বংশধর।[৪৬]
  • ঘোউল (আরবি: غول‎‎ ghūl) হল মরুভূমিতে বসবাসকারী রূপান্তরের ক্ষমতাশালী দৈত্য। এরা জন্তু-জানোয়ারের রূপ ধারণ করতে পারে। বিশেষত হায়নার রূপ ধারণকরে এরা। অসাবধানী পথিকদের মরুভূমিতে পথভ্রষ্ট করে এরা খেয়ে ফেলে। এই দৈত্যরা ছোটো ছেলেমেয়েদের খায়, কবরখানায় হানা দেয়, রক্ত পান করেন, মৃতদেহ খায় আর যাকে খেয়েছে তার রূপ ধরে। শেষোক্ত অভ্যাসটির জন্য কবরখানায় হানাদার বা নৃশংস কাজে আনন্দ পাওয়া মানুষদেরও অনেক সময় ঘোউল বলা হয়।[৪৭]
  • বাহামুত (আরবি: بهموت‎‎ Bahamūt) হল একটি বিশাল মাছ। এটি পৃথিবীকে ধরে রাখে। কোনো কোনো মূর্তিতে এটির মাথা জলহস্তি বা হাতির মতো।[৪৮]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. হয়ল্যান্ড ২০০২, পৃ. ১৩৯।
  2. বার্কে ২০০৩, পৃ. ৪২।
  3. নিকোল ২০১২, পৃ. ১৯।
  4. ডনিগার ১৯৯৯, পৃ. ৭০।
  5. মউটন ও শ্মিড ২০১৪, পৃ. ৩৩৮।
  6. টেইজিডোর ২০১৫, পৃ. ৭০।
  7. পিটারস ১৯৯৪এ, পৃ. ৬।
  8. রবিন, ক্রিস্টিয়ান জুলিয়েন, "সাউথ আরাবিয়া, রিলিজিয়নস ইন প্রি-ইসলামিক",ম্যাকঅলিফ ২০০৫, পৃ. ৯২-এ
  9. টেইজিডোর ২০১৫, পৃ. ৭৩-৭৪।
  10. রবিন, ক্রিস্টিয়ান জুলিয়েন, "সাউথ আরাবিয়া, রিলিজিয়নস ইন প্রি-ইসলামিক", ম্যাকঅলিফ ২০০৫, পৃ. ৮৭-এ
  11. মেয়ার-হুবার্ট ২০১৬, পৃ. ৭২।
  12. আসলান ২০০৮, পৃ. ৬।
  13. পিটারস ১৯৯৪বি, পৃ. ১০৫।
  14. হয়ল্যান্ড ২০০২, পৃ. ১৪৪।
  15. হয়ল্যান্ড ২০০২, পৃ. ১৪৫।
  16. টেইজিডোর ১৯৭৯, পৃ. ৭৭।
  17. এল-জেইন ২০০৯, পৃ. ৩৪।
  18. এল-জেইন ২০০৯, পৃ. ১২২।
  19. লেবলিং ২০১০, পৃ. ৯৬।
  20. ক্রেমার ১৯৭৯, পৃ. ১০৪।
  21. রবিন, ক্রিস্টিয়ান জুলিয়েন, "সাউথ আরাবিয়া, রিলিজিয়নস ইন প্রি-ইসলামিক", ম্যাকঅলিফ ২০০৫, পৃ. ৮৮
  22. ওয়ার্ডেনবার্গ ২০০৩, পৃ. ৮৯।
  23. ক্যাম্পো ২০০৯, পৃ. ৩৪।
  24. হিউজেস ২০১৩, পৃ. ২৫।
  25. পিটারস ১৯৯৪বি, পৃ. ১০৭।
  26. রবিনসন ২০১৩, পৃ. ৭৫।
  27. পিটারস ১৯৯৪বি, পৃ. ১১০।
  28. পিটারসন ২০০৭, পৃ. ২১।
  29. বোয়ারিং, গারহার্ড, "গড অ্যান্ড হিজ অ্যাট্রিবিউটস", ম্যাকঅলিফ ২০০৫-এ
  30. পিটারসন ২০০৭, পৃ. ৪৬।
  31. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; :3 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  32. হিট্টি ১৯৭০, পৃ. ১০০-১০১।
  33. ফিপস ১৯৯৯, পৃ. ২১।
  34. কল্টার ও টার্নার ২০১৩, পৃ. ৩৭।
  35. গিলাম ১৯৬৩, পৃ. ৭।
  36. কর্ডুয়ান ২০১৩, পৃ. ১১২, ১১৩।
  37. রডিনসন ২০০২, পৃ. ১১৯।
  38. Book of Idols
  39. Ibn Ishaq - Sīratu Rasūlu l-LāhHawting 
  40. The Dawn of Civilisation, by: Gaston Maspero
  41. Tawil 1993
  42. "Hommel, First Encyclopaedia of Islam, Vol. 1. p. 380"। ২ আগস্ট ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ জুলাই ২০১৫ 
  43. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; armstrong নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  44. The Book of Idols (Kitāb al-Asnām) by Hishām Ibn al-Kalbī
  45. কুরআন ৭:১১–১২
  46. Robert Irwin The Arabian Nights: a Companion (Penguin, 1994)
  47. "ghoul"Merriam-Webster Online Dictionary। সেপ্টেম্বর ৩০, ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জানুয়ারি ২২, ২০০৬ 
  48. Borges, Jorge Luis (২০০২)। The Book of Imaginary Beings। London: Vintage। পৃষ্ঠা 25–26। আইএসবিএন 0-09-944263-9  অজানা প্যারামিটার |coauthors= উপেক্ষা করা হয়েছে (|author= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • কিতাব আল আশনাম, হিশাম ইবনে আল কালবি

সূত্র[সম্পাদনা]