তর্পণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পিতৃপক্ষের শেষে কলকাতার জগন্নাথ ঘাটে তর্পণ (পিতৃপুরুষের আত্মার প্রতি পবিত্র জল নিবেদন) করা হচ্ছে।

তর্পণ (সংস্কৃত: तर्पण, কন্নড়: ತರ್ಪಣ, তামিল: தர்ப்பணம்) বৈদিক অনুশীলনের একটি শব্দ যা ঐশ্বরিক সত্তার প্রতি কোন কিছু নিবেদন করাকে বোজায়।

তর্পণ শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত 'তৃপ্' (অর্থাৎ সন্তুষ্ট করা) থেকে। হিন্দুধর্মে দেবতা, ঋষি ও মৃত পূর্বপুরুষদের (পিতৃকুল ও মাতৃকুল) উদ্দেশ্যে জল নিবেদন করে তাঁদের সন্তুষ্ট করার পদ্ধতিকে তর্পণ বলা হয়। বংশের যে সকল‌ পিতৃপুরুষ পরলোক গমন করেছেন, তাঁদের প্রীতির উদ্দেশ্যে মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক স-তিল জল (তিল মেশানো জল) দান করে  সাধারণত পুত্রসন্তানেরা পিতৃতর্পণ করে থাকেন। এভাবে তর্পণ করাকে আবার তিল তর্পণও বলে।

কোশা-কুশী পুজোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কোশা-কুশীটি খাঁটি তামা দিয়ে তৈরি। কোশা-কুশী দেব ও দেবীর প্রতি পবিত্র জল নিবেদন এবং শ্রদ্ধ তর্পণ পূজার জন্য ব্যবহৃত হয়। কোশা-কুশী, ঐশ্বশী মাতার তান্ত্রিক পূজার জন্য ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু।

ধরন[সম্পাদনা]

হিন্দুশাস্ত্রে নানারকম তর্পণের কথা বলা হয়েছে, যেমন, দেব তর্পণ, মনুষ্য তর্পন, ঋষি তর্পণ, দিব্যপিতৃ তর্পন, যম তর্পণ, ভীষ্ম তর্পণ, পিতৃ তর্পণ, মাতৃ তর্পণ, অগ্নিদগ্ধাদি তর্পন, রাম তর্পন ও লক্ষণ তর্পণ ইত্যাদি। এর মধ্যে পিতৃতর্পণ রীতিই সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিক প্রচলিত। এর অপর নাম পিতৃযজ্ঞ। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে পিতৃতর্পণ পালিত হয়। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা (ভাদ্র পূর্ণিমা) তিথিতে পিতৃপক্ষ শুরু হয়।  আবার উত্তর ভারত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, নেপাল ও বাংলাদেশে ভাদ্রের পরিবর্তে দুর্গাপূজার পূর্বে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলে। এসব স্থানে মহালয়া অমাবস্যায় বা পিতৃপক্ষ অমাবস্যায় পিতৃতর্পণ করা হয়। তবে দুর্গাপূজার সাথে পিতৃতর্পণের সরাসরি কোন যোগ নেই। হিন্দুধর্মে পিতৃতর্পণের দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এইদিন তিথিনিয়মের বাইরে সব পূর্বপুরুষের শ্রাদ্ধ করা যায়। এজন্য যে সব ব্যক্তি কোন কারণে পূর্বপুরুষের সাংবাৎসরিক শ্রাদ্ধ করতে পারেন না, তাঁরা এই দিনে পিতৃতর্পণ করে থাকেন।

লোককাহিনী[সম্পাদনা]

পিতৃতর্পণের সাথে রামায়ণের রামচন্দ্র এবং মহাভারতের মহাবীর কর্ণ সম্বন্ধীয় দুটো কাহিনী প্রচলিত আছে। রামায়ণের রামচন্দ্র মহালয়ার দিন  পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেছিলেন। অনেকের ধারণা তখন থেকেই পিতৃতর্পণের প্রচলন হয়েছে। কর্ণ সম্বন্ধীয় কাহিনীতে বলা হয় যে, কর্ণ চিরকাল মানুষকে স্বর্ণ, রত্ন ইত্যাদি দান করে গেছেন কিন্তু  তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে কখনো জল বা খাদ্য দান করেননি। কারণ তিনি নিজের পিতৃপুরুষের পরিচয় জানতেন না। তবে এটা ছিল কর্ণের অনিচ্ছাকৃত একটা ভুল। তবুও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেয়া হয় শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। তখন কর্ণ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন দেবরাজ ইন্দ্রকে। এর উত্তরে ইন্দ্র কর্ণকে বললেন যে, কর্ণ সারাজীবন মানুষকে সোনাদানাই দান করেছেন, পিতৃপুরুষকে কখনো জল দেননি, তাই  তাঁর সাথে এমনটা করা হয়েছে। তখন কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে তাঁর  অনিচ্ছকৃত ভুলের কথা জানালে ইন্দ্র কর্ণকে এক পক্ষকালের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দিলেন। ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ মর্ত্যে অবস্থান করে তাঁর পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন। এর ফলে কর্ণের পাপ স্খলন হলো এবং যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দিলেন সেই পক্ষটি পরিচিত হলো পিতৃপক্ষ নামে।