ভজন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভজন গায়ক হিসেবে শ্রীরামচন্দ্রের প্রধান ভক্ত পবন তনয় হনুমান

ভজন (ইংরেজি: Bhajan) হচ্ছে ভারতীয় আধ্যাত্মিক গান বিশেষতঃ হিন্দুয়ানী ঘরাণার গানেরই একটি ধারা। এটির নির্দিষ্ট কোন ধাঁচ নেই। ভজন মন্ত্র কিংবা কীর্তনের চেয়েও সহজ হতে পারে, আবার শাস্ত্রীয় রাগপ্রধান এবং তাল সমৃদ্ধ গান হিসেবে ধ্রুপদ বা কৃতীর মতো হতে পারে।[১] সাধারণতঃ সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালবাসার সুগভীর মহিমা প্রকাশের জন্য সুর করে ভজন গাওয়া হয়। মোঘল যুগে ভক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশে এর বিস্তৃতি ঘটে। ভজনের স্বগোত্রীয়ই হচ্ছে ভক্তি। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা, ধর্মের উপযোগিতা এবং প্রয়োজনীয়তা ভজনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। গ্রন্থের অধ্যায়, সাধু-পুরোহিতদের শিক্ষা এবং ঈশ্বরের অপার মহিমা বর্ণনা - এগুলো সবই ভজনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ধ্রুপদী পদ্ধতি, সুফি কাওয়ালী[২] এবং কীর্তন কিংবা হরিদাসী সংস্কারের গানগুলোও ভজনের সাথে সম্পর্কীয়।

শাস্ত্রীয় ভজন[সম্পাদনা]

কবীর, মীরাবাঈ, সুরদাস, তুলসীদাস প্রমূখ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বদের ভজন শাস্ত্রীয় ঘরাণা ধরণের। তাদের লিখিত ভজনগুলো বিভিন্নভাবে বিশ্বের অন্যতম ভাষা হিন্দী ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এ ধরণের ভজনগুলো হিন্দীভাষী ছাড়াও বিশ্বজনীন সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে উপভোগ্য ও সমাদৃত হয়েছে। এখানে কয়েকজন জনপ্রিয় ভজন লেখকদের লেখার ধরণ তুলে ধরা হলো।

কবীর: চাদরীয়া ঝিনি রে ঝিনি[সম্পাদনা]

কবীর লিখিত চাদরীয়া ঝিনি রে ঝিনি শিরোনামীয় ভজনটি জনপ্রিয় গায়কদের দ্বারা বহুবার রেকর্ড করা হয়েছে। কবীর তার নিজ শরীরকে চাদর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নির্গুণী ভজনের পুরোধা কবীর স্বর্গের নির্গুণ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছেন। এ ভজন শুনে সঙ্গীতবোদ্ধা ও শ্রোতারা ধর্মের ছায়াতলে আসতে উৎসাহী হয় এবং এর বাস্তবতা দেখতে পায়। বাবা বুল্লে শাহ্‌ হচ্ছেন তাদেরই একজন এবং অদ্যাবধি বাংলার বাউলেরা এ ধারাকে আরো উন্নত করে যাচ্ছেন। গুরু গ্রন্থ সাহিবে শিখ গুরু নানক এ ধরণের অনেকগুলো ভজনের কথকতা উল্লেখ করেছেন।

এ সুন্দর, এ সুন্দর কাপড়।

রাম নামে রঙকৃত, প্রভুর নাম স্মরণে,

যেন এটি অষ্ট-পুষ্প পাপড়ি পদ্মের ন্যায় ঘূর্ণায়মান চাকা,

পাঁচ উপাদান এবং তিন গুণ স্তরের সমষ্টি।

দর্জি হয়ে প্রভু দশটি চাঁদকে নিয়ে আছেন,

সুঁইয়ে চাপ দিয়ে শক্ত করে যাচ্ছেন।

ভগবান, মানুষ এবং বিজ্ঞজনেরা এটি পড়ছেন:

ব্যবহার করে তারা মলিনও করছেন।

কবীর বলেন; আমি নিজেকে এ কাপড়ে সযতনে ঢেকে রাখছি,

এবং সবশেষে এটি ত্যাগ করব, যেমনটি পূর্বে ছিল।

মীরা: মনে চকর রাখো জি[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে হিন্দী চলচ্চিত্র মীরাবাঈয়ে মনে চকর রাখো জি ভজনগীতিটি প্রকাশ পেয়েছে। রাজস্থানে বসবাসরত মীরাবাঈ এবং তার হিন্দী বাচনভঙ্গীমা রাজস্থানী ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে। কারণ রাজস্থানের পাশেই গুজরাট। ফলে রাজস্থানী এবং গুজরাটি ভাষায় বেশ মিল লক্ষণীয়। মীরাবাঈকে উভয় ভাষায় সমানতালে কথা বলেতে দেখা যায়।

হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে তোমার দাসী কর।

তোমার দাসী হিসেবে আমি একটি বাগান করব এবং তোমাকে নিত্য দেখব। বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে ও পথে আমি তোমার মহিমা গানের মাধ্যমে প্রচার করব।

তুলসীদাস: শ্রী রামচন্দ্র কৃপালু ভজ মন[সম্পাদনা]

শ্রী রামচন্দ্র কৃপালু ভজ মন ভজনটি মহামতি তুলসীদাস লিখিত। এতে -

হে আমার হৃদয়! শ্রীরামের স্মরণে পুণর্জন্মের ভয় দূর কর,

যার পদ্মের ন্যায় চক্ষু, পদ্মের ন্যায় মুখমণ্ডল এবং পদ্মের ন্যায় হাত, পদ্মের ন্যায় পদযুগল, সূর্যের ন্যায় লোহিত বর্ণ।

সুরদাস: মে নেহি মাখন খাইয়ো[সম্পাদনা]

রাগ রামকলি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ হিসেবে বিবেচিত। সুরদাসের লেখা মে নেহি মাখন খাইয়ো ভজনে দুষ্ট বালক হিসেবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার মা যশোদা'র হাতে মাখন খাওয়া অবস্থায় ধরা পড়া সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে দুষ্ট বালক হিসেবে তিনি অর্থাৎ স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার মা যশোদাকে বলছেন:

আমি মাখন খাইনি, মা।

আমি মনে করেছি সখারা আমার মুখে কোন কিছু মেখে দিয়েছে!

সম্প্রদায় ভজন[সম্পাদনা]

সম্প্রদায় ভজন বা দক্ষিণা ভারত সম্প্রদায় ভজন প্রচলিত ভারতীয় লোকধারার ভজনের আরেক রূপ যা দক্ষিণ ভারতে দেখা যায়। সংস্কৃত ভাষায় "দক্ষিণা" হচ্ছে দক্ষিণ। "সম্প্রদায়" হচ্ছে কোন একজনের অনুসারী। সম্প্রদায় ভজন হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ধারায় একগুচ্ছ কীর্তন বা গান এবং নামাবলীর সংমিশ্রণ যা হিন্দু দেবতা শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণের নাম সহকারে গান রচনা করা হয়। কাঁচী কামাকটি পেটামের জগদ্বন্ধু বোধেন্দ্র স্বামীগল, শ্রী মরুধানাল্লুর সদ্‌গুরু স্বামীগল, শ্রী পুডুকট্টাই গোপাল কৃষ্ণ ভগবতার কীর্তন এবং নামাবলীর জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন যারা যে-কোন ভজন এবং ভজন সম্পর্কীয় গানে গাওয়া হয়ে থাকে। বোধেন্দ্র স্বামীগল, শ্রীধর আয়াভাল এবং মরুধানাল্লুর সদ্‌গুরু স্বামীগল ভজন গুরু হিসেবে আদর্শস্থানীয়। সম্প্রদায় ভজন পদ্ধতি প্রধানত মরুধানাল্লুর সদ্‌গুরু স্বামীগলের অনুসরণ করে থাকে।

সম্প্রদায় ভজনগুলোকে নিম্নবর্ণিত ধারায় বিভাজন করা হয়েছে :-

  • ধ্যান শ্লোকম
  • সংগ্রহ দোদয়া মঙ্গলম (দোতকম - প্রার্থনা দিয়ে শুরু, মঙ্গলম দিয়ে শেষ)। দোদয়া মঙ্গলম আদি শঙ্করের দোতকা অষ্টকম থেকে ভিন্ন।
  • গুরু ধ্যানম
  • গুরু অভংস
  • সাধু কীর্তন
  • জয়দেব অষ্টপদী (গীত গোবিন্দম)
  • নারায়ণ তীর্থ কৃষ্ণলীলা দারঙ্গীনি

তেলেগু (ভদ্রচলা ভক্ত রামদাস), কানাড়া (শ্রী পুরান্দ্র দাস), সংস্কৃত (শ্রী সদাশিব ব্রহ্মেন্দ্র), তামিল (শ্রী গোপালকৃষ্ণ ভারতী) এবং শ্রী তৈগর্জ - এই লেখকপঞ্চদ্বয় পঞ্চপতি নামে ভজন রচনা করে গেছেন।

এবং যদি সময়কালকে অনুসরণ করা হয় তাহলে উত্তর ভারতের ভজন গীতিকারেরা হলেন - কবীর দাস, মীরা বাঈ, তুলসীদাস অথবা সুরদাস, প্রভু পাণ্ডুরাঙ্গ।

উল্লেখযোগ্য ভজন ও শিল্পীদের তালিকা[সম্পাদনা]

  • এ্যাইসি লাগি লগন
  • গগনো মে থাল রবিচন্দ্র দীপক
  • জয় গণেশ
  • দো দিন কা জগ
  • নাম জপন কিয়ো
  • নাম হরি জপলে
  • মন মে বসে মে
  • মে নেহি মাখন খাইয়ো
  • মাত করতো অভিমান
  • মাটি কহে তো
  • হরি নাম সুমার

জনপ্রিয় ভজন সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে - মান্না দে,[৩] অনুরাধা পারুয়াল,[৪] অনুপ জালোটা,[৫] গীতা দত্ত, ভীমসেন জোশী অন্যতম।

আধুনিক পর্যায়[সম্পাদনা]

ভি. ডি. পালুস্কর এবং ভি. এন. ভাতখণ্ডে যৌথভাবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ভজনের উপর কাজ করে চলছেন। নৃত্যশিল্পী মল্লিকা সরাভাই ভজনভিত্তিক নৃত্য প্রযোজনা করছেন। যোগ ব্যায়াম বা সাধনা সহযোগে সুরত শব্দযোগের মাধ্যমে মন্ত্র পাঠ এবং ভজনের সাহায্যে পাঠ বিশেষত নীরব পাঠের আয়োজন করা হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. David Courtney: http://www.chandrakantha.com/articles/indian_music/bhajan.html
  2. Anna King, John Brockington, The Intimate Other: Love Divine in Indic Religions, Orient Longman 2005, p 359.
  3. Kinnear, M. 1985. A discography of Hindustani and Karnatic music. Greenwood Press.
  4. Video Keertans by Shri Kripalu Ji Maharaj. Retrieved 15th December 2011.
  5. Rang De with Anup Jalota at Radha Madhav Dham, Austin. Oct 20 2011. Indo-American News. Retrieved 15th December 2011.

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]