শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

স্থানাঙ্ক: ২৩°৪৫′০৬″ উত্তর ৯০°২২′৩৬″ পূর্ব / ২৩.৭৫১৭° উত্তর ৯০.৩৭৬৭° পূর্ব / 23.7517; 90.3767

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড
The Father of The Nation places in gopalganj.JPG
গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থল
স্থানঢাকা, বাংলাদেশ
তারিখ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
ভোর ৫:৩০–৭:০০
লক্ষ্যশেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবার
হামলার ধরনসামরিক অভ্যূত্থান
নিহত২০ জন (শেখ মুজিব, তার স্ত্রী ও তিন পুত্রসহ)[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
আহত২ জন
হামলাকারী দলসৈয়দ ফারুক রহমান, খন্দকার আব্দুর রশীদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, মহিউদ্দিন আহমেদ, এ.কে.এম মহিউদ্দিন আহমেদ, শরীফুল হক ডালিম

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার একটি ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল সদস্য সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবনে হত্যা করে। পরে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১]

পটভূমি[সম্পাদনা]

শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতিত্ব[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। পরে তিনি যুক্তরাজ্য এর লন্ডন ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর মুজিব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী তিন বছর উক্ত পদে আসীন থাকেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন।

রক্ষীবাহিনী বিতর্ক ও সেনাবাহিনীর অসন্তোষ[সম্পাদনা]

জাতীয় রক্ষীবাহিনী ছিল ১৯৭২ সালে গঠিত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রাজনৈতিক মিলিশিয়া বাহিনী যা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনুগত ছিল।[২] এটি বেসামরিক জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য গঠিত হলেও প্রকৃতপক্ষে মুজিবের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে।[৩] এর ৩০,০০০ কর্মী জনসাধারণ ও আওয়ামী লীগ বিরোধীদেরকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতো ও তাদের উপর নির্যাতন চালাতো। ১৯৭৫-৭৬ সালের বাজেটে মুজিব সরকার রক্ষীবাহিনীর জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে সেনাবাহিনীর বরাদ্দ ১৩%-এ নামিয়ে আনে, যা পাকিস্তান আমলে ছিল ৫০-৬০ শতাংশ।[৪][৫] এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।[৬] এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক সেনাকে তাদের আশানুরূপ পদোন্নতি না দেওয়ায় তারা মুজিব সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হন।[৭] এ সকল কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ঘনীভূত অসন্তোষও মুজিবুরের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বজনপ্রীতি ও পারিবারিক দুর্নীতির অভিযোগ[সম্পাদনা]

শেখ ফজলুল হক মনিকে মুজিব সরকারের আমলে সুবিধাবাদী পদমর্যাদা দেওয়া হয়। যখন ভারতের সঙ্গে বেসরকারি বাণিজ্যকে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ করা হয়, ফজলুল তখন শেখ মুজিবের পৃষ্ঠপোষকতায় সক্রিয়ভাবে উক্ত পেশায় জড়িত ছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ তাকে শেখ মুজিবের বংশতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একটি অংশ বলে মনে করেন।[৮]

১৯৭৩ এর শেষের দিকে শেখ কামাল একটি গুলিবর্ষণে জড়িয়ে পড়েন যাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। গুলিবর্ষণ কীভাবে ঘটে সে সম্পর্কে একাধিক দাবি রয়েছে। অনেকের দাবি, শেখ কামাল এবং তার বন্ধুরা একটি ব্যাংকের ডাকাতির চেষ্টা করার সময় এই গুলিবর্ষণ হয়েছিল। তবে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দাবি করেছেন যে এটি আসলে বন্ধুত্বপূর্ণ গুলিবর্ষণের ঘটনা। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে, বাংলাদেশী সুরক্ষা বাহিনী গোপনে সংবাদ পেয়েছিল যে, বামপন্থী বিপ্লবী কর্মী সিরাজ সিকদার এবং তার বিদ্রোহীরা ঢাকার আশেপাশে সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাগণ পূর্ণ সতর্ক ছিলেন এবং ঢাকার রাস্তায় সাধারণ পোশাকে টহল দিচ্ছিলেন। শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা সশস্ত্র অবস্থায় সিরাজ সিকদারকে খুঁজছিল, এবং একটি মাইক্রোবাসে শহরটিতে টহল দিচ্ছিল। যখন মাইক্রোবাসটি ধানমন্ডিতে ছিল তখন পুলিশ শেখ কামাল ও তার বন্ধুদের বিদ্রোহী বলে মনে করে এবং তাদের উপর গুলি চালিয়ে দেয়, ফলে শেখ কামাল আহত হয়।[৯] তবে, এটিও দাবি করা হয় যে শেখ কামাল এবং তার বন্ধুরা ধানমন্ডিতে গিয়েছিল তার বন্ধু ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সম্প্রতি কেনা একটি নতুন গাড়ি চালানোর পরীক্ষা করতে।[১০] ঢাকায় যেহেতু পুলিশ ভারী টহল দিচ্ছিল, তাই তৎকালীন শহরের এসপি মহামুদ্দিন বীর বিক্রমের কমান্ডের অধীনে পুলিশ বিশেষ বাহিনী যাত্রীদেরকে দুর্বৃত্ত বলে ভেবে গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল।[১১]

বামপন্থী বিদ্রোহের উত্থান[সম্পাদনা]

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে উদীয়মান বামপন্থী শক্তি মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অনেকটা দায়ী।[১২][১৩][১৪] বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে বিভক্ত হয়ে একটি অংশ নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়।[১৫]

কর্নেল আবু তাহেরহাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদের সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী, সরকারের সমর্থক, আওয়ামী লীগের সদস্য ও পুলিশদের হত্যার মাধ্যমে অভ্যুত্থানে লিপ্ত হয়।[১৬][১৭] এর ফলে দেশের আইন শৃঙ্খলায় সম্পূর্ণ ভাঙন ধরে[১৬] এবং মুজিব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়।[১৮]

ডালিম-মোস্তফা সংঘর্ষ[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গাজী গোলাম মোস্তফা মেজর শরিফুল হক ডালিম ও তার স্ত্রীকে ঢাকা লেডিজ ক্লাব থেকে একটি তর্ক করার পরে অপহরণ করে। মেজর ডালিমের আত্মীয় তাহমিনার সাথে কর্ণেল রেজার বিয়ে হচ্ছিল, সেখানে এই ঘটনা ঘটে। তর্কের বিষয়ে অন্তত ২টি সংস্করণ চালু আছে। একটিতে বলা হয় যে মোস্তফার ভাই নিম্মির প্রতি অশালীন মন্তব্য করায় বচসার সূত্রপাত হয়। এতে মোস্তফার দুই ছেলেও জড়িয়ে পড়েন।[১৯] আরেক সংস্করণে বলা হয় এই বিয়েতে ডালিমের স্ত্রী নিম্মি'র ভাই বাপ্পী এসেছিলেন কানাডা থেকে অতিথি হিসেবে। বিয়ের অনুষ্ঠানটি হচ্ছিল লেডিজ ক্লাবে। গাজী গোলাম মোশ্তফার ছেলে বসেছিলেন বাপ্পীর ঠিক পেছনের সারিতে এবং তিনি বাপ্পীর চুল ধরে টান দেন। এতে বাপ্পী ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে তার পেছনের সারি থেকে সরে যেতে বলেন। মোস্তফার দুই ছেলে ছিলেন শেখ মুজিবর রহমানের ছেলে শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা আরও কয়েকজন সহ তখন মেজর ডালিম তার স্ত্রী নিম্মি, কর্ণেল রেজার মা এবং ডালিমের আরও ২জন বন্ধুকে উঠিয়ে একটি রেড ক্রিসেন্টের মাইক্রবাসে করে অপহরণ করেন। [২০] গাজী মোশ্তফা এবং তার ছেলেরা প্রথমে তাদেরকে রক্ষ্মীবাহিনী সদর দফতরে নিয়ে যান। এরপর সবাইকে শেখ মুজিবর রহমানের বাসায় নিয়ে যান। তবে ইতোমধ্যে ডালিমকে অপহরণের খবরে বেঙ্গল ল্যান্সার্স মোস্তফার বাড়ীটি আক্রমণ করে এবং সবাইকে জিম্মি করে। সারা শহরে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট বসানো হয় প্রতিটা গাড়ীতে ডালিমদেরকে খুঁজে উদ্ধারের জন্য। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানকে ডাকিয়ে, তার সামনে সেখানে শেখ মুজিবর রহমান বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।[২১] তবে পরবর্তীতে এর বিচারে কিছু বেঙ্গল ল্যান্সার্স সেনা কর্মকর্তা সাময়িক বা সম্পূর্ণ চাকরি হারান। মেজর ডালিমের পরে পোস্টিং হয় ঢাকার বাইরে, যেটাকেও তিনি শাস্তি হিসেবে দেখেছিলেন।[২২] বেঙ্গল ল্যান্সারস এবং মেজর শরিফুল হক সহ জড়িত অফিসাররা অনেকেই পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আগস্ট অভ্যুত্থানের অংশ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন। [২৩][২৪]

সিরাজ শিকদার হত্যা[সম্পাদনা]

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে আলোচিত মাওবাদী নেতা সিরাজ শিকদার আত্মগোপন করেন।[২৫] কী অবস্থায় সিরাজ সিকদার পুলিশের হাতে শেষপর্যন্ত আটক হন, এবং ঠিক কখন কোথায় কীভাবে তাকে নির্বিচার হত্যা করা হয়-সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা রয়েছে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ গ্রন্থে বলেছেন, সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা (টেকনাফ) থেকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন।[২৬] অনেকের মতে ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে গ্রেপ্তার করেন। আবার অন্য তথ্যমতে তিনি চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেফতারকারী জানতেন না যে তিনি সিরাজ সিকদার। সেই দিনই তাকে বিমানে ঢাকায় আনা হয়। পরদিন শেরেবাংলা নগর থেকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে হত্যা করে।।[২৭][২৮] আবার জাকারিয়া চৌধুরীর[২৯] বলেন, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখবাঁধা অবস্থায় ঢাকাস্থ রমনা রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।[৩০] অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস বলেন, সিরাজের ছোট বোন শামীম শিকদার তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করেছিলেন।[৩০]

দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও বাকশাল[সম্পাদনা]

১৯৭৫ সালের ৭ জুন শেখ মুজিব অবিলম্বে সকল রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লব নামে আখ্যা দেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে তার এক দলের শাসনের ঘোষণার পর সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও সকল রাজনৈতিক দল বিরোধিতা করে। দেশের চলমান অনৈক্য অস্থিতিশীলতা দুর করতে বাকশাল গঠন করা হলেও, বাস্তবে তা আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী আর প্রশাসনের লোকজনের মাঝে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও তখন দেশে চরম দুরবস্থা বিরাজ করছিল। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট শেখ মুজিবের গোচরে ও অগোচরে ক্রমান্বয়ে অধিক থেকে অধিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। শিল্পকারখানাগুলোর রাষ্ট্রীয়করণও চলমান অর্থনীতিতে লক্ষণীয় উন্নতি আনয়নে ব্যর্থ হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় অব্যবস্থপনার ফলে দেশে একটি বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ ব্যাপারে ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউ পত্রিকায়, ১৯৭৪ সালে লরেন্স লিফশুলতজ লেখেন যে, সে সময় বাংলাদেশে "দুর্নীতি ও অনাচার এবং জাতীয় সম্পদের লুণ্ঠন" বিগত সময়ের সকল দুর্নীতির "সীমা অতিক্রম করেছিল"।[৩১]

ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিরুদ্ধে দলীয় প্রাধান্য[সম্পাদনা]

রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে বৈষম্যের কারণে সেনাবাহিনী পূর্ব থেকেই শেখ মুজিবের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। তবে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ গ্রন্থে বলেন, শেখ মুজিবের প্রতি চূড়ান্ত অসন্তোষের পেছনে একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে তিনি প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করেন, যে ঘটনাটি মেজর ফারুক রহমান কর্তৃক বর্ণিত, তা হলঃ টঙ্গীর মোজাম্মেল নামক এক সমসাময়িক আওয়ামী লীগ তরুণ নেতা, যিনি সে সময় টঙ্গী আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি এক নববিবাহিত গৃহবধুকে গাড়ী থেকে তুলে নিয়ে তার ড্রাইভার ও স্বামীকে হত্যা করার পর তাকে অপহরণপূর্বক গণধর্ষণ করে তিনদিন পর তার রক্তাক্ত লাশ রাস্তায় ফেলে যায়। এতে মেজর নাসের নামে ব্যাঙ্গল ল্যান্সারের একটি স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক মোজাম্মেলকে আটক করে পুলিশের হাতে সোর্পদ করলে অনতিবিলম্বে তিনি ছাড়া পান। তখন অনেকেই মনে করেন, শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপেই তিনি অপরাধের শাস্তি হতে মুক্তি পেয়েছিলেন। এ ঘটনা সেনাবাহিনীতে, বিশেষত কর্নেল ফারুকের ভেতরে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে তাকে হত্যার পেছনে শেষ মুহূর্তের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।[৩২][৩৩][৩৪]

চক্রান্তকারীগণ[সম্পাদনা]

কর্নেল (সেই সময়ে মেজর) সৈয়দ ফারুক রহমান, খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী এবং রাশেদ চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেজর ছিলেন। বিদেশি গোয়েন্দাদের থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তারা সরকারকে উৎখাত করে নিজেদের সামরিক সরকারের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। এন্থনি ম্যাসকারেন্হাস বলেন, ফারুক মেজর জিয়াউর রহমানকে ইঙ্গিতে এ পরিকল্পনায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব করেন, কিন্তু জিয়া কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফারুকের মতে, জিয়ার ইঙ্গিতের অর্থ ছিলঃ "আমি দুঃখিত, আমি এ ধরনের কাজে নিজেকে জড়াতে চাই না, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি কিছু একটা করতে চাও, তাহলে তোমাদের নিজেদেরই তা করা উচিত, আমাকে এসবের মধ্যে টেনো না।"[৩২][৩৩] তবে ঘাতক লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদের স্ত্রী ও আসামি জোবায়দা রশীদ জবানবন্দিতে বলেন, "সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রক্ষীবাহিনী গঠন করে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়াতেও আর্মির অফিসারদের মধ্যে সমালোচনা হয়। এসব বিষয় ফারুকের কাছে শুনি। মেজর ফারুক জেনারেল জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করত ছোটবেলা থেকেই। তিনি জিয়ার পূর্বপরিচিত ছিলেন। একদিন রাতে মেজর ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে আমার স্বামীকে জানায় যে, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। জিয়া নাকি বলে, “ইট ইজ এ সাকসেস দেন কাম টু মি। ইফ ইট ইজ অ্যা ফেইলার দেন ডু নট ইনভলব মি। শেখ মুজিবকে জীবিত রেখে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়।” এর কদিন পর মেজর ফারুক আমার বাসায় এসে রশীদকে বলে যে, জিয়া বলেছে, “রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজতে হবে যে দায়িত্ব নিতে পারবে।” সে মোতাবেক রশীদ খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামসি লেনের বাসায়। ১৫ আগস্ট বিকেলে বঙ্গভবনে জেনারেল জিয়াউর রহমান রশীদের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল যাতে তাঁকে চিফ অব আর্মি করা হয়। ১৬ অথবা ১৭ তারিখ প্রাক্তন মন্ত্রী সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, আমার স্বামী ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করার বিষয় ঠিক হয়।"[৩৫] মেজর জেনারেল (অব.) এম খলিলুর রহমান (তৎকালীন বিডিআরের পরিচালক) তার সাক্ষ্যে বলেন,"জেনারেল জিয়া নম্বরের ভিত্তিতে জেনারেল সফিউল্লাহর সিনিয়র থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সেনাপ্রধান না করায় কিছু আর্মি অফিসার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তখন এই সমস্যা দূর করার জন্য শুনিয়াছি, জেনারেল জিয়াকে আর্মি হতে অবসর দিয়ে অ্যাম্বাসেডর (রাষ্ট্রদূত) হিসেবে বিদেশে পাঠাই দেবে।" মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের পর একপর্যায়ে মেজর রশিদ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার মনে হলো, মেজর রশিদ একটু গর্ব করে বলেন, “ইনি আমার স্ত্রী। আমরা যা করেছি তার প্রধান প্ল্যানার আমার স্ত্রী।”’[৩৫] ঘাতকদল সম্ভাব্য ব্যার্থতার কারণগুলো কী হতে পারে তা বিবেচনা করে এবং মুজিব হত্যার পর তাদের অনুমান অনুযায়ী সম্ভাব্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ, আওয়ামী লীগের প্রতিশোধমূলক সশস্ত্র বিরোধিতা ও আওয়ামী লীগ-বিরোধীদের বাড়তি স্বেচ্ছাচারী-বিশৃঙ্খলা দমন এবং সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মুজিবের দল আওয়ামী লীগ থেকে তাদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী এবং চাইলে সময়মত সরিয়ে দেয়া যাবে এমন ব্যক্তিকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কিছুকাল অনুসন্ধানের পর মুজিবের মন্ত্রিপরিষদের আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণে সম্মত হন। তবে মোশতাক ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি চক্রান্তে জড়িত ছিল বলে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ দাবি করেন।[৩৬] কথিত আছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স এবং এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল ইসলাম খান মুজিব হত্যার চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।[৩৭] অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে মেজর ফারুক বলেন, তিনি চট্টগ্রামের আন্ধা হাফিজ নামক এক জন্মান্ধ পীরের দিকনির্দেশনা নিয়ে এই হত্যাকান্ড সম্পন্ন করেন, যার ভবিষ্যৎ বলার অতিন্দ্রিয় ক্ষমতা ছিল বলে লোকমুখে প্রচলিত ছিল এবং তার স্ত্রী ফরিদা তাকে উক্ত পীরের সাথে যোগাযোগে সহায়তা করেন। সে পীর তাকে ইসলামের স্বার্থে উক্ত হত্যাকাণ্ড করতে বলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ পরিত্যাগ ও সঠিক সময়ে সে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরামর্শ দেয়।[৩২][৩৩][৩৮] যদিও সাপ্তাহিক বিচিন্তার এক সাক্ষাৎকারে আন্ধা হাফিজ উক্ত দাবি অস্বীকার করেন।[৩৯]

ঘটনাপ্রবাহ[সম্পাদনা]

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে ষড়যন্ত্রকারীরা চারটি দলে বিভক্ত হয়। এদের একদল ছিল মেজর হুদার অধীনে বেঙ্গল ল্যান্সারের ফার্স্ট আর্মড ডিভিশন ও ৫৩৫ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা যারা মুজিবের বাসভবন আক্রমণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানরত আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদদাতা সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তার "মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা" বইয়ে লিখেন যে, মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বর্ণনা সবসময় রহস্যে ঘনীভূত থাকবে।[৪০] তিনি আরও লিখেন যে, মুজিবের বাসভবনের রক্ষায় নিয়োজিত আর্মি প্লাটুন প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করে না। মুজিবের পুত্র, শেখ কামালকে নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় গুলি করা হয়।[৪১] মুজিবকে পদত্যাগ করা ও তাকে এ বিষয়ে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। মুজিব সামরিক বাহিনীর প্রধান, কর্নেল জামিলকে টেলিফোন করে সাহায্য চান।[৪০] জামিল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৈন্যদের সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলে তাকে সেখানে গুলি করে মারা হয়। মুজিবকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুজিবের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (উপরের তলায় হত্যা করা হয়), মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসের, দুইজন চাকর (শৌচাগারে হত্যা করা হয়); শেখ জামাল, ১০ বছর বয়সী শেখ রাসেল এবং মুজিবের দুই পুত্রবধুকে হত্যা করা হয়।[৪২] সেসময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন।[৪৩] তারা ভারত সরকারের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে ভারতে চলে আসেন। তিনি নির্বাসিত অবস্থায় দিল্লীতে বসবাস করতে থাকেন। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ই মে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন করেন।[৪৪]

দুটি সৈনিক দল মুজিবের ভাগ্নে ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হককে (মনি) তার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীর সাথে ১৩/১, ধানমন্ডিতে এবং মুজিবের ভগ্নিপতি ও সরকারের একজন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে তার পরিবারের ১৩ জন সদস্যসহ মিন্টু রোডে হত্যা করে।[৪৫][৪৬]

চতুর্থ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিকে সাভারে সংস্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত প্রত্যাশিত বিরোধী আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাঠানো হয়। একটি সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর এগারজনের মৃত্যু হলে সরকারের অনুগতরা আত্মসমর্পণ করে।[৪৭]

আওয়ামী লীগের চারজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আ হ ম কামারুজ্জামানকে আটক করা হয়। তিন মাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরে তাদের সকলকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়।[৪৮]

হত্যার দিন সকালে সে সময়ের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ঢোকার সময় রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন যে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি ঘটনার বর্ননায় বলেন, "জেনারেল জিয়া একদিকে শেভ করছেন একদিকে শেভ করে নাই। স্লিপিং স্যুটে দৌড়ে আসলেন। শাফায়াত জামিলকে জিজ্ঞেস করলেন, 'শাফায়াত কী হয়েছে?' শাফায়াত বললেন, 'অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। (খুবসম্ভব দুটি সেনাদল একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।) বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।' তখন জেনারেল জিয়া বললেন, সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স। গেট ইয়োর ট্রুপ্স রেডি। আপহোল্ড দ্য কন্সটিটিউশন। (তাতে কী? ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা নিতে দাও। রাজনীতি নিয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। তোমার সেনাদল প্রস্তুত কর। সংবিধান বহাল রাখো।)"[৪৯]

শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা প্রদানের জন্য বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ হাইকোর্ট

প্রতিবাদ[সম্পাদনা]

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর বরগুনায় এর প্রথম প্রতিবাদ হয়। মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব মৃধা বরগুনা এসডিও সিরাজ উদ্দিন আহমেদের সহায়তায় ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির এর নেতৃত্বে ১০-১৫ জন ছাত্রলীগ কর্মীর ঝটিকা মিছিল বের করেন। পরবর্তীতে এতে বরগুনার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা যোগ দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, খুলনা, যশোর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ বিভিন্ন জায়গায় ১৫ই আগস্ট সকালে প্রতিবাদ হয়।[৫০][৫১]

পরবর্তীতে আবদুল কাদের সিদ্দিকী ১৭ হাজার মুজিব ভক্তকে ৭টি ফ্রন্টে ভাগ করে ২২ মাস প্রতিরোধ যুদ্ধ করেন। এতে ১০৪ জন যোদ্ধা নিহত এবং কয়েকশ আহত হয়। এর মাঝে শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলার ৫০০ তরুণের ‘শেরপুরের ৫০০ প্রতিবাদী’র বিদ্রোহ ও লড়াই আলোচিত ছিল।[৫০][৫২]

মুফতি নূরুল্লাহ পরদিন জুমার নামাজের খুতবায় এর প্রতিবাদ করেন।[৫৩]

আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভী সৈয়দ, ছাত্রনেতা এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা এস.এম. ইউসুফ প্রতিরোধ করতে শুরু করেন।[৫৪]

১৮ই অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টার ও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। ২০ অক্টোবর প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।[৫০][৫৫]

প্রতিবাদ করায় ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট মুক্তাগাছার প্রতিবাদী ৫ মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী, নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিনকে সেনা অভিযানে হত্যা করা হয়। বেঁচে যাওয়া বিশ্বজিৎ নন্দী নামে কিশোর যোদ্ধাকে আটক করে ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালতে ফাঁসি দেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীসহ প্রভাবশালী বিশ্বনেতার প্রভাবে তাকে যাবজ্জীবন দেয়া হয় এবং তিনি ১৯৮৯ সালে মুক্তি পান।[৫০]

হত্যাকাণ্ডের বিচার[সম্পাদনা]

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যগণকে হত্যার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ১ মার্চ ১৯৯৭ সালে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। ৮ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে জেলা ও দায়রা জজ কাজী গােলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় ঘােষণায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারক বিচারপতি মােঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি এ.বি.এম খায়রুল হক দ্বিমতে বিভক্ত রায় ঘােষণা করেন। এরপর তৃতীয় বিচারপতি মােঃ ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। এরপর পাঁচজন আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানীর পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷[৫৬][৫৭] ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে ২৯ দিন শুনানির পর ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘােষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন[৫৭]। ২০১০ সালের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারি চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশনও খারিজ করেন। এদিনই মধ্যরাতের পর ২৮ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা যায় এবং ছয়জন বিদেশে পলাতক রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর বাস্তবায়িত হয়।

রায় কার্যকর[সম্পাদনা]

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।[৫৮] তারা হলেন:

  • লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান
  • লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান
  • মেজর বজলুল হুদা
  • লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি)
  • লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)[৫৭][৫৮]

২০২০ সালের ৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয়[৫৯] এবং ১২ এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।[৬০]

২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতে গ্রেফতার হন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন । [৬১]

২০০১ সালের ২ জুন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল আজিজ জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে কথিত আছে। তবে তার মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।[৬২]

এছাড়াও এখনো ১২ জনের মধ্যে চারজন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হলেন,

  • কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ
  • লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম
  • লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী
  • লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী[৬৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "১৫ অগাস্ট: কী ছিল সেদিনের পত্রিকায়"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ২০১৭-০৮-১৪। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০১৮ 
  2. Pike, Francis. (২০১০)। Empires at war : a short history of modern Asia since World War II। London: I.B. Tauris। আইএসবিএন 978-1-4416-5744-2ওসিএলসি 656823453 
  3. Schottli, Jivanta; Mitra, Subrata K.; Wolf, Siegried। A Political and Economic Dictionary of South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃষ্ঠা 337। আইএসবিএন 978-1-135-35576-0। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  4. Braithwaite, John; D'Costa, Bina (২০১৮)। Cascades of Violence: War, Crime and Peacebuilding Across South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। ANU Press। পৃষ্ঠা 337। আইএসবিএন 978-1-76046-190-4। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  5. Nyrop, Richard F. (১৯৭৫)। Area Handbook for Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। U.S. Government Printing Office। পৃষ্ঠা 200। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  6. Gandhi, Rajmohan (১৯৯৯)। Revenge and Reconciliation (ইংরেজি ভাষায়)। Penguin Books India। পৃষ্ঠা 346। আইএসবিএন 978-0-14-029045-5। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  7. Ahmed, Salahuddin (২০০৪)। Bangladesh: Past and Present (ইংরেজি ভাষায়)। New Delhi: APH Publishing। পৃষ্ঠা 208। আইএসবিএন 978-81-7648-469-5। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  8. Ahmed, Salahuddin (২০০৩)। Bangladesh : past and present। New Delhi: A.P.H. Publishing Corporation। পৃষ্ঠা 258। আইএসবিএন 9788176484695। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০১৫ 
  9. Askari, Rashid (৫ আগস্ট ২০১৬)। "The story of an unsung hero"The Daily Observer। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুন ২০২০ 
  10. "শেখ কামালের পাশে সেদিন ছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু | বাংলাদেশ প্রতিদিন"বাংলাদেশ প্রতিদিন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৩ আগস্ট ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২ অক্টোবর ২০২০ 
  11. "Sheikh Kamal the person I knew | banglanews24.com"banglanews24 (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৫-০৯-০৯। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-২৩ 
  12. "Awami League will have to atone for making a JaSoD leader minister, says Syed Ashraf"bdnews24.com। জুন ১৩, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  13. "Clarify your role in Bangabandhu killing, BNP to Inu"Prothom Alo। আগস্ট ২৪, ২০১৫। ১২ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  14. "No law of 'illegitimate govt' will last, says Khaleda"bdnews24.com। আগস্ট ২৫, ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  15. Hossain, Kazi Mobarak (মার্চ ১৩, ২০১৬)। "Hasanul Haq Inu's JaSoD splits as he names Shirin general secretary"bdnews24.com। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  16. Staff Correspondent। "JS sees debate over role of Gono Bahini"The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ৯, ২০১৫ 
  17. "Inu, Khairul to be tried in people's court: BNP"। The News Today। UNB। জুন ১৫, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১১, ২০১৬ 
  18. "JSD, NAP, left parties also behind the killing of Bangabandhu"The New Nation। আগস্ট ২৬, ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ১৩, ২০১৬ 
  19. "Bangladesh a Legacy of Blood"Scribd (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১৯ 
  20. "Assassination of Sheikh Mujibur Rahman (1975) - Dalim incident proves a sore point for young army officers - History of Bangladesh"Londoni (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১৯ 
  21. Riaz, Ali। Unfolding State: The Transformation of Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। de Sitter Publications। পৃষ্ঠা 239। আইএসবিএন 9781897160107। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  22. Karsten, Peter (১৯৯৮)। Civil-military Relations (ইংরেজি ভাষায়)। New York: Taylor & Francis, Garland Pub। পৃষ্ঠা 318। আইএসবিএন 978-0-8153-2978-7। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  23. "Shahriar's confession"thedailystar.net। The Daily Star। ১৯ নভেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  24. "Farooq's confession"thedailystar.net। The Daily Star। ১৯ নভেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০১৬ 
  25. বসু, অঞ্জলি (নভেম্বর ২০১৩)। বসু, অঞ্জলি; সেনগুপ্ত, সুবোধচন্দ্র, সম্পাদকগণ। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (পঞ্চম সংস্করণ, দ্বিতীয় মুদ্রণ সংস্করণ)। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ। পৃষ্ঠা ৭৮০। আইএসবিএন 978-8179551356 
  26. মাস্কারেনহাস, এন্থনি; শাহজাহান, মোহাম্মদ (১৯৮৮)। বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ। হাক্কানি পাবলিশার্স। পৃষ্ঠা ৫২। আইএসবিএন 984-433-066-1। সংগ্রহের তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  27. Islam, Sirajul (২০১২)। "Sikder, Siraj"Islam, Sirajul; Khan, Muazzam H.। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh 
  28. "NetNewsLedger - Thunder Bay News - January 2 - This Day in History"NetNewsLedger - Thunder Bay News। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৪-১২ 
  29. জাকারিয়া চৌধুরী হলেন সিরাজ সিকদারের ছোটবোন ভাস্কর শামীম সিকদারের স্বামী
  30. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ, অ্যান্থনী মাসকারেনহাস, অনুবাদ- মোহাম্মাদ শাজাহান, হাক্কানী পাবলিশার্স, চতুর্থ মূদ্রণ-জুলাই ২০০৬।
  31. Datta-Ray, Sunanda K. (৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০)। "Tread Warily to the Dream"The Telegraph (Opinion)। Calcutta, India। 
  32. Mascarenhas, Anthony (১৯৮৬)। Bangladesh: A Legacy of Blood (ইংরেজি ভাষায়)। Hodder and Stoughton। পৃষ্ঠা ৪৮–৫৫। আইএসবিএন 978-0-340-39420-5। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০২০একদিন ঢাকার উত্তরে টঙ্গী অঞ্চলে একটি চিরুনী অভিযানের সময় মেজর নাসের যিনি বেঙ্গল ল্যান্সার্সের আরেকটি স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক ছিলেন, তিনি তিনজন উঠতি কমবয়সী দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন লোক ভেঙে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বিশেষত ভয়াবহ ত্রিভুজ হত্যার গল্প বলে যা আগের বছরের শীতকালের সময়টিতে টঙ্গিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটি ছিল, সদ্য বিবাহিত দম্পতি একটি ট্যাক্সিতে তাদের বাড়িতে যাওয়ার পথে শহরের উপকণ্ঠে পথিমধ্যে আটক হয়। বর ও ট্যাক্সি চালককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদের লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন কটেজে নিয়ে গিয়ে কনেটিকে বারবার তার অপহরণকারীরা ধর্ষণ করে। তিন দিন পরে তার বিকৃত লাশটি একটি ব্রিজের কাছে রাস্তায় পাওয়া যায়। অপরাধে তার নিজের অংশের কথা স্বীকার করে, দুর্বৃত্তটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বলেছিল যে, এই ঘটনাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়, যখন তারা (পুলিশেরা) জানতে পেরেছিল যে এই গ্যাংয়ের রিং-লিডার ছিলেন তার বস মুজাম্মিল, টঙ্গী আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান। ফারুকের মতে, এই স্বীকারোক্তিটি জিজ্ঞাসাবাদকারীকে তীব্র রাগিয়ে দিয়েছিল, যে ছিল ইশতিয়াক নামে একজন কমবয়সী লেফটেন্যান্ট যিনি তখন থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, "তিনি এই ছোকরাটিকে (দুর্বৃত্ত) এতটাই মারতে শুরু করেছিলেন যে, অভ্যন্তরীণ আঘাতের কারণে সে মারা যায়।" মুজাম্মিলকে মেজর নাসের নিজেই ধরে ঢাকায় নিয়ে আসেন যখন পুলিশ রেকর্ড থেকে নিশ্চিত হন যে, দুর্বৃত্তটি সত্য কথা বলছিল। ফারুকের মতে মুজাম্মিল নাসেরকে তার মুক্তির জন্য ৩০০,০০০ টাকা প্রস্তাব করেছিলেন। আওয়ামী লিগার (মুজাম্মিল) তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, "বিষয়টিকে সরকারি পর্যায়ে নেবেন না"। “আজ হোক বা আগামীকাল হোক, আমাকে আপনার ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে কেন টাকা নিয়ে তা ভুলে যাচ্ছেন না?” তাকে ঘুষ দেওয়ার এই নির্লজ্জ প্রয়াসের শিকার নাসের শপথ করেছিলেন যে, তিনি মুজাম্মিলকে বিচারের মুখোমুখি করবেন এবং তাকে তার অপরাধের জন্য ফাঁসিতে দেবেন। তিনি তাকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। ফারুক বলেছিলেন যে শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপে কিছুদিন পর মুজাম্মিলকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে পেরে তারা অবাক হয়ে গেলেন। "আমি আপনাকে টাকা নেওয়ার কথা বলেছিলাম", মুজাম্মিল হুঙ্কার দিয়ে বললেন। “আপনি এতে লাভবান হতেন। এখন আমাকে ঠিকই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আর আপনি কিছুই পেলেন না।” এই ঘটনা ফারুক ও তার সহকর্মীদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। টঙ্গি তাদের জন্য মোর ঘুড়িয়ে দেওয়া ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়। “দেখে মনে হচ্ছিল আমরা কোন অপরাধী সংগঠনের নেতৃত্বাধীন সমাজে বাস করছি। যেন মাফিয়া বাংলাদেশকে দখল করে নিয়েছে। আমরা পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এখানে সরকারপ্রধান নিজেই হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য চরমপন্থি বিষয়কে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, যা থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করার কথা ছিল। এটি মেনে নেওয়ার মত বিষয় ছিল না। আমরা ঠিক করেছিলাম তাকে চলে যেতেই হবে। " "... যখন আশা নিভে যায়, জবাবদিহিতা অস্বীকার করা হয় এবং জনগণের কাছে হারাবার মতো আর কিছুই থাকে না, তখন তারা তাদের অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য সহিংসতার দিকে ফিরে যায়।" 
  33. বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ, এন্থনী ম্যাসকারেনহাস, হাক্কানী পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ৫৪-৬৫
  34. Obaidullah, A. T. M. (২০১৮)। Institutionalization of the Parliament in Bangladesh: A Study of Donor Intervention for Reorganization and Development (ইংরেজি ভাষায়)। Springer। পৃষ্ঠা 32। আইএসবিএন 978-981-10-5317-7। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২০ 
  35. আসাদুজ্জামান। "বস সবকিছুর ব্যবস্থা নিচ্ছেন"Prothomalo। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১০-০৮ 
  36. Nagarajan, K. V. (সেপ্টেম্বর ১৯৮২)। "Review: Bangladesh: The Unfinished Revolution by Lawrence Lifschultz"। The Annals of the American Academy of Political and Social Science। Sage Publications। 463: 169–170। জেস্টোর 1043636 
  37. "Ziaur Rahman informed Sheikh Mujibur Rahman earlier about coup threat"। ৫ জুন ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ মার্চ ২০১৭ 
  38. Singh, Ajay; Murtaza Ali, Syed। "CLOSING A BLOODY CHAPTER: A landmark ruling convicts Mujib's assassins"edition.cnn.com। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২০ 
  39. দেওয়ান, অম্লান (২০২০)। আন্ধা হাফিজের সাক্ষাৎকার - অম্লান দেওয়ান। liberationwarbangladesh.org। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২০ 
  40. Dasgupta 1978, p. 64, para 2: "Reports reveal that they did not kill Sheikh Mujib at once. Mujib was asked to step down from power and he was given some time to decide. Mujib summoned Colonel Jamil, the new chief of the Military Intelligence over the phone. Colonel Jamil arrived fast, and ordered the army to return to the barracks ... Then a rapid burst from machine guns mowed down Jamil right in front of the gate."
  41. Dasgupta 1978, পৃ. 65–66: "[soldiers] quickly surrounded Mujib's residence. A couple of rounds were fired. No resistance came from the army platoon guarding the President's house ... The first round of fire had brought Sheikh Kamal hurrying down to the reception on the ground floor ... A short burst, and his body, riddled with bullets sank to the floor."
  42. Dasgupta 1978, পৃ. 67: "The murderers rushed upstairs ... they came across Begum Lutfunnessa Mujib ... Shots rang out again. Begum Mujib lay on the floor, dead ... A group searched the ground floor. In the lavatories they found Sheikh Nasser and a couple of servants and gunned them down. The other group charged into Mujib's bedroom. There they found the two daughters-in-law of Mujib along with Sheikh Jamal and Sheikh Russel ... they, too, were not spared by these butchers."
  43. "Bangladeshi PM Sheikh Hasina requests extradition of Bangabandhu killers from US"Business Standard। Press Trust of India। আগস্ট ৩০, ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ জানুয়ারি ২, ২০১৭ 
  44. Ahmed, Helal Uddin (২০১২)। "Hasina, Sheikh"Islam, Sirajul; Jamal, Ahmed A.। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh 
  45. Dasgupta 1978, পৃ. 65: "Lieutenant Moalemuddin sped for the residence of Sheikh Mani with three trucks full of soldiers ... while Major Shahriar and Captain Huda went out with some soldiers to get rid of Minister Abdur Rab Sarniabat."
  46. Dasgupta 1978, p. 64, para 3: "At the same time at 13/1 Dhanmandi Sheikh Fazlul Haq and his pregnant wife, and on Mineta Road, Abdur Rab Sarniabat with the 13 members of his family, were butchered ..."
  47. Dasgupta 1978, p. 64, para 1: "[The] fourth group, the most powerful of the lot, proceeded towards Savar, near Dacca, to repel the anticipated counter-attack by the Security Forces. It did run against some resistance at Savar. But once the shelling took toll of eleven people the leaderless Security Force surrendered"
  48. Dasgupta 1978, পৃ. 77–78: "3 November ... Khondakar also knew that the situation was bound to be grave once Nazrul Islam, Tajuddin Ahmed, Kamaruzzaman and Mansur Ali were released ... Khondakar had had them arrested under various pretexts shortly after Mujib's assassination, and they were still rotting in Dacca Jail. So, Khondakar ... managed to allow the associates of the "killers" [the seven Majors who assassinated Sheikh Mujibur Rahman] inside the jail to brutally kill these four leaders."
  49. "শেখ মুজিব হত্যার পর জেনারেল জিয়া যে মন্তব্য করেছিলেন"BBC News বাংলা। ১৫ আগস্ট ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২১ আগস্ট ২০২০ 
  50. "শোকাবহ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  51. "বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয় বরগুনায়"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  52. "শেরপুরের ৫০০ প্রতিবাদীর লড়াই"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  53. "মুজিববর্ষে কোনও আয়োজন নেই কওমি মাদ্রাসায়"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  54. "মুজিব হত্যার প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা 'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র' মামলার কী হয়েছিল?"। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০২০ 
  55. "বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলন"চ্যানেল আই অনলাইন (ইংরেজি ভাষায়)। ৫ আগস্ট ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০ 
  56. "News Details" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  57. "বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ 
  58. Pratidin, Bangladesh। "বঙ্গবন্ধুর ৫ খুনির ফাঁসি"Bangladesh Pratidin। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫ 
  59. "কে এই ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ?"jagonews24.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৯ 
  60. "বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ফাঁসিতে ঝুললো"। bdnews24। ১২ এপ্রিল ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২০ 
  61. "বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি মোসলেম উদ্দিন ভারতে"risingbd.com। ২০ এপ্রিল ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ 
  62. "6 killers still out of reach"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ আগস্ট ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১৭ 
  63. Titastelegraph.com। "বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরীর আবেদন নাকচ, বহিষ্কারের নির্দেশ"। ২০১৮-০৮-১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-১৫