জয় বাংলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জয় বাংলা

জয় বাংলা এমন একটি স্লোগান যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণকে তাদের মুক্তিসংগ্রামে প্রবলভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিল। ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, বরাক উপত্যকার লোকেরাও বাঙালির ঐক্য বোঝাতে এর ব্যবহার করে থাকে। এর আগে বাঙালি কখনো এত তীব্র, সংহত ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয় নি, যাতে একটি পদেই প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতি, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষার সৌন্দর্য ও জাতীয় আবেগ [১] । জয় বাংলা স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রেরণার উৎস। সফল অপারেশন শেষে বা যুদ্ধ জয়ের পর অবধারিত ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে জয় উদযাপন করত।[২]

উদ্ভব[সম্পাদনা]

জয় বাংলার উৎপত্তি সম্বন্ধে জানা যায় যে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন মাদারীপুরের স্কুল শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এর জন্য জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তার আত্মত্যাগ, তার স্বজাত্যবোধে মুগ্ধ হয়ে পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি উপলক্ষে কালিপদ রায়চৌধুরীর অনুরোধে কবি নজরুল রচনা করেন ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতাটি।[৩][৪] এই কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন।[৫][৬][৭]তার রচিত ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধেও জয় বাংলা পাওয়া যায়। নিচে ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কাব্য থেকে উদ্ধৃত হল:

বাঙালির বাঙলা
বাঙলা বাঙালির হোক; বাঙলার জয় হোক, “জয় বাঙলা”

কাজী নজরুল ইসলাম, ‘বাঙালির বাঙলা’

একসূত্রে বলা হয়েছে যে ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর মধুর ক্যান্টিনে শিক্ষা দিবস (১৭ মার্চ) যৌথভাবে পালনের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-এর আহুত সভায় তৎকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমেদ ও চিশতী হেলালুর রহমান "জয় বাংলা" স্লোগানটি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন।[৮] তবে ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০-এ ঢাকা শহরের পল্টনের এক জনসভায় ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান তার ভাষণে সর্বপ্রথম "জয় বাংলা" স্লোগানটি উচ্চারণ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে।[৯] বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রথম "জয় বাংলা" স্লোগানটি উচ্চারণ করেন ৭ মার্চ ১৯৭০-এ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভার ভাষণে।[১০]

আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রদত্ত তার বিখ্যাত সাতই মার্চের ভাষণ সমাপ্ত করেছিলেন "জয় বাংলা" উচ্চারণ করে। এই ভাষণের পর থেকে এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। এর কাছাকাছি শব্দ ছিল ফার্সি "জিন্দাবাদ"। তৎকালীন বর্ষীয়ান জননেতা মাওলানা ভাসানী ১৯৭১-এর শুরু থেকে "স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ", "আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ" প্রভৃতি স্লোগান ব্যবহার করতেন। ১৯৭১-এর মার্চ থেকে জনসভা, মিছিলে এবং প্রচারণার সময় "জয় বাংলা" স্লোগানটি ব্যবহৃত হতে থাকে। ২৭ মার্চ ১৯৭১ মেজর জিয়াউর রহমান অস্থায়ী কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন তার শেষেও তিনি "জয় বাংলা" উচ্চারণ করেন।[১১] মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় "জয় বাংলা" ব্যবহার করা হতো। এই বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসঙ্গীত ছিল জয় বাংলা, বাংলার জয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহ্‌মদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল‍ "জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ‍" স্লোগান দিয়ে। আজও স্লোগানটি সমান ভাবে রাজনৈতিক স্লোগান হিসাবে ব্যবহার হয় ৷[১২]

২০১১ ও ২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান যে, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা থেকেই বঙ্গবন্ধু এই "জয় বাংলা" স্লোগানটি নিয়েছিলেন।[৬][৭]

জাতীয় স্লোগান ঘোষণা[সম্পাদনা]

২০২০ সালের ১০ মার্চ জয় বাংলা স্লোগানকে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণের জন্য হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন। বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন।[১৩]

জয় বাংলা কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার পর জাতীয় দিবসগুলোতে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারী ও রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকর্তা সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান যাতে উচ্চারণ এবং সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ যাতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেন সেই আদেশ প্রদান এবং তা আগামী তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়।[১৪]

উল্লেখ্য, জয় বাংলা কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা প্রদান চেয়ে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. বশির আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন।[১৩]

মেহেরপুরে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে অবস্থিত " জয় বাংলা" ভাস্কর্য।

পশ্চিমবঙ্গে জয় বাংলা[সম্পাদনা]

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে, বিজেপির স্লোগান জয় শ্রীরাম স্লোগানের পরবিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেস জয় বাংলা স্লোগানটি ব্যবহার শুরু করে।[১৫] নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি এই স্লোগান জয়ে সাহায্য করেছে বলে কৃতিত্বও দেন।[১৬]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম - হুমায়ুন আজাদ, দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৬, আগামী প্রকাশনী
  2. মুনতাসির মামুন সম্পাদিত। কিশোর মুক্তিযুদ্ধ কোষ। সময় প্রকাশন। পৃষ্ঠা ১৭১। আইএসবিএন 984-458-70114-0070-9 |আইএসবিএন= এর মান পরীক্ষা করুন: length (সাহায্য) 
  3. "যেভাবে লেখা হলো নজরুলের 'পূর্ণ-অভিনন্দন' কবিতাটি"kalerkantho.comদৈনিক কালের কণ্ঠ। ২৮ আগস্ট ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২১ 
  4. "মমতার 'জয় বাংলা' স্লোগান কি আদৌ 'বাংলার স্লোগান'?"। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ৩০ জানুয়ারি ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২১ 
  5. হুদা, মুহম্মদ নূরুল (২৭ আগস্ট ২০১৫)। "নজরুলের 'জয় বাংলা'"bdnews24.comবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২১ 
  6. "Joy Bangla was inspired by Nazrul's poetry: PM"dhakatribune.comঢাকা ট্রিবিউন। ১৩ এপ্রিল ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২১ 
  7. "'জয় বাংলা'র সুলুকসন্ধান"rodoshee.com। ১০ মার্চ ২০২০। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২১ 
  8. নুরুজ্জামান মানিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের অপর নায়কেরা, ২০০৯, শুদ্ধস্বর, পৃষ্ঠা ৫৫
  9. "সাক্ষাৎকার: আ স ম আবদুর রব"। ৮ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০০৯ 
  10. "আ স ম আব্দুর রবের সাক্ষাৎকার"। ৮ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ নভেম্বর ২০০৯ 
  11. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
  12. দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা, মুহাম্মদ নূরুল কাদির, ১৯৯৭, আইএসবিএন ৯৮৪-৩০-০২২৯-৬
  13. "'জয় বাংলা' বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হবে"। প্রথম আলো। ১০ মার্চ ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১০ মার্চ ২০২০ 
  14. "জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণার রায়"। bdnews24। ১০ মার্চ ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১০ মার্চ ২০২০ 
  15. "পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: প্রচারে, স্লোগানে বাংলাদেশ"। ডেইলি স্টার। ১৪ এপ্রিল ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২১ 
  16. "Mamata Banerjee on Victory: 'খেলা হবে', 'জয় বাংলা'- বিপুল জয়ে দুই স্লোগানকে কৃতিত্ব দিলেন মমতা"। নিউজ ১৮। ২ মে ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২১