ভদ্রলোক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ভদ্রলোক[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ( বাংলা: ভদ্রলোক bhôdrôlok , আক্ষরিক অর্থেই 'ভালো মানুষ', 'ভদ্র আচরণের ব্যক্তি') বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়কালে (আনুমানিক ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) গড়ে ওঠা 'ভদ্র সম্প্রদায়' হল নতুন শ্রেণির বাঙালি

বর্ণ এবং শ্রেণি গঠন[সম্পাদনা]

ভদ্রলোক শ্রেণির সদস্যরা সব্বাই না-হলেও বেশির ভাগই উচ্চবর্ণের হয়, যেমন, বৈদ্য, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, এবং মাহিষ্য[১] ইংরেজিতে ভদ্রলোক শব্দের যথাযথ কোনো অনুবাদ নেই, কেননা এটা অর্থনৈতিক ও শ্রেণি সুবিধের ওপর সম্প্রদায়ের প্রভাব ফেলে। উনিশ শতকে অনেক ভদ্রলোক সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত সম্প্রদায় কিংবা মধ্য স্তরের বণিক শ্রেণি থেকে এসেছিলেন।[২] যে কেউ যথাযথ পরিমাণে সম্পদ দেখাতে এবং সমাজে দাঁড়াতে পারে সেরকম মানুষ ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল।[৩]

ভদ্রলোকসমূহ, যাদের মধ্যে রয়েছে বাঙালি সমাজের উচ্চিবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত অংশের কিছু শ্রেণির ভদ্র মানুষ। মোটের ওপর উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিগুলোর মধ্যে একজন জমিদার অথবা ভূস্বামী যারা সাধারণভাবে নামের শুরুতে বাবু ধারণ করতেন তাদের ভদ্রলোক হিসেবে মনে করা হত। রাজা অথবা মহারাজা উপাধিধারী একজন জমিদারকে মধ্যবিত্তের তুলনায় উচ্চতর হিসেবে মনে করা হত, তবে তখনো তিনি ভদ্রজনোচিত ভদ্রলোক হিসাবে বিবেচিত হত। সকল পেশাদার শ্রেণির সদস্য, অর্থাৎ যারা নতুনভাবে উদীয়মান পেশায় যুক্ত, যেমন, ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং উচ্চতর সরকারি কর্মচারী ছিলেন তারা ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। যাইহোক, নামের শেষে নাইটের ঠিক নিচের অবস্থানটা চিহ্নিত করে কোনো ব্যক্তিকে নামের শেষে এসকয়ার উপাধি দেওয়াটা ভদ্রলোকের চেয়ে উচ্চতর বলে বিবেচিত হত। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

ঔপনিবেশিক কারণসমূহ[সম্পাদনা]

ভদ্রলোক গড়ে ওঠার দুটো বৃহত্তর কারণই ছিল ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঙ্গা অববাহিকায় বাণিজ্য ও পশ্চিমা ধারার শিক্ষার সাহচর্যে (ঔপনিবেশিক শাসক এবং মিশনারিদের হাত ধরে) অনেক বাণিজ্য সংস্থার ব্যাপক ভাগ্য ফেরা এবং উত্থান। কলকাতায় ভূসম্পত্তির দামের তীব্র বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলে কিছু সামান্য জমিদার রাতারাতি সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। প্রথম শনাক্তযোগ্য ভদ্রলোকের প্রতীক হলেন নিঃসন্দেহে রামমোহন রায়, যিনি বাংলায় সুলতানি যুগের পারস্যীয় আভিজাত্য এবং নতুন, পাশ্চাত্য-শিক্ষিত, নব্য ধনী সমৃদ্ধশ্রেণীর শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়েছিলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বাংলার নবজাগরণ[সম্পাদনা]

বাংলার নবজাগরণে প্রধানত অংশ নিয়েছিল ভদ্রলোকেরা এবং তাদের দ্বারাই এটা পরিচালিত হয়েছিল। এছাড়াও, ব্রাহ্মসমাজ এবং অন্যান্য বিভিন্ন সমাজের উদ্ভবও ('সমাজ' এবং 'সম্প্রদায়' এই দুয়ের মাঝখানে একটা বিভাগ) ছিল এক ভদ্রলোক ঘটিত ব্যাপার। ভদ্রলোক হওয়াটা ছিল কিছু পশ্চিমি এবং উত্তর ইউরোপীয় মূল্যবোধকে সাগ্রহে গ্রহণ করা (যদিও প্রত্যেক বিষয় সব সময় একই থাকেনা); সামান্যতম শিক্ষা থাকতে হবে এবং আনুকূল্য পাওয়ার হকদার (এবং ফলস্বরূপ বিরুদ্ধে অভিযোগ) হওয়ার বোধ অথবা ঔপনিবেশিক সরকারের পক্ষ থেকে চাকরি পাওয়া। যখন ভদ্রলোকরা পশ্চিম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন (তাদের নৈতিকতা, পোশাক এবং খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির দিক থেকে), তারাও ছিলেন সেই জনতা যাঁরা পশ্চিমের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, এবং ভদ্রলোক লেখক দ্বারা সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করার পাশাপাশি পশ্চিমিকরণের বিরুদ্ধে খুব প্রবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বাবুগণ[সম্পাদনা]

বাবু শব্দের অর্থ একজন ব্যক্তির পদমর্যাদা এবং সম্মান। এটা অত্যন্ত সাধারণভাবে এক ভদ্রজনকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু এটা এমন কোনো এক ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যিনি সরাসরি সামাজিক বৃত্তে তার কর্তৃত্বের অবস্থান উপভোগ করেন। ভারতের একজন জমিদার এবং উচ্চতর সরকারি কর্মী সদস্যকে বাবু হিসেবে উল্লেখ করা হোত। আগেকার বেঙ্গল প্রেসিডন্সি, মূলত বাংলা ও বিহারে ভূস্বামীদের মধ্যে একজন বাবু ছিলেন সাধারণভাবে ঠাকুর বা মির্জার সমপর্যায়ভুক্ত ও অত্যন্ত সম্পদশালী জমিদার এবং একজন রাজার নিচে তার অবস্থান ছিল। বাবু শব্দটা ঐতিহাসিকভাবে শাসক শ্রেণি সমেত ভারতীয় সমাজের উচ্চ বর্গে থাকা ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হোত।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

আঠারো শতকের শেষে এবং উনিশ শতকের গোড়ায় ঔপনিবেশিক সময়কালে এই বাবু শব্দটা ক্ষতিকরভাবে দেশীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের, বিশেষ করে আইনি বিচারালয় ও রাজস্ব সংস্থায় ব্যবহার করা হয়েছিল, যে সমস্ত জায়গায় অধিকাংশ সদস্যকে সম্মাননীয় পরিবার অথবা জমিদার বড়ি থেকে মুন্সেফ হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

জনপ্রিয় সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ও গল্পসহ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে বহুলভাবে এই ভদ্রলোক শ্রেণির উল্লেখ পাওয়া যায়। উনিশ শতকে কালীপ্রসন্ন সিংহ তার বিখ্যাত বই হুতোম প্যাঁচার নকশায় তৎকালীন ভদ্রলোক শ্রেণির সর্বাধিক পরিচিত ভণ্ডামি ও সামাজিক ধারণাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন। বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দু ১৯৯০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের দশকে তাদের 'সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি', 'অমর মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম', 'আমরা বাঙালি জাতি' এবং অন্যান্য বিভিন্ন গানে ভদ্রলোক সমাজের কপট আচরণগুলো তুলে এনেছিল।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

কেম্ব্রিজের দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক তথা ট্রিনিটি কলেজের ফেলো জয়া চ্যাটার্জিও অন্যান্যদের মধ্যে ভদ্রলোক শ্রেণির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন যে, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের স্বাধীনোত্তরকালে পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের জন্যে তারা-ই দায়ী।[৪] তিনি তার 'দ্য স্পইলস অফ পার্টিশন' [৫] বইতে লিখেছেন:

ব্যাপারটা এরকম যে, বঙ্গদেশ ভাগ তাদের হতাশ করেছিল, যেসব গোষ্ঠীগুলো তাঁদের পরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্য অনুযায়ী এটা দাবি করে। কী কারণে তাদের কৌশল এরকম সর্বনাশাভাবে বিফল হয়েছে যা নিঃসন্দেহে এর প্রভাবের শেষ কণাগুলি মুছে যাওয়ার অনেক পর থেকেই বঙ্গ ভদ্রলোক দ্বারা বিতর্ক তৈরি করবে। এর মধ্যেই বহু অজুহাত খাড়া করা হয়েছে এবং নানাভাবে অন্যের জন্যে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং পরিষ্কার হওয়া দরকার। কিন্তু আংশিক ব্যাখ্যাটা ছিল সম্ভবত এরকম: তাদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বে নিজেদের আত্মবিশ্বাস এবং রাজনীতির জন্যে তাদের অনুমিত প্রতিভায় বঙ্গ ভদ্রলোক নেতারা বঘোরে বিষয়গুলির ভুল বিচার করেছিলেন কারণ, সত্যি বলতে কী, তাঁরা একটা রাজনৈতিক শ্রেণি হিসেবে গভীরভাবে অনভিজ্ঞ ছিলেন। একমত হওয়া যায় যে, তাঁরা উচ্চ শিক্ষিত এবং কোনোক্রমে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন হলেও কিন্তু তাঁরা বঙ্গ রাজনীতি কিংবা এখানকার অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ায় মতো অবস্থান কখনোই দখল পারেননি। তাঁদেরকে নীতি তৈরি করতে নয় তা কার্যকর করার জন্য বলা হয়েছিল। তাঁরা জমিতে ব্যয় করে উপার্জন করত, কিন্তু কৃষিকাজে কোন ব্যবসায়ের সংগঠন করেননি। তত্ত্ববিশারদ অথবা ব্যবহারজীবী হিসেবেই হোক কিংবা দোকানদানি বা খেতখামারই হোক, তাঁরা উৎপাদন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে সামান্য বুঝতেন। সবার ওপর, জনগণের শাসন ও কর নেওয়ার সূক্ষ্ম পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিলনা বা কম ছিল। তাঁরা যেমন বিশ্বাস করতে পছন্দ করত সেই অগ্রগামী থাকার চেয়েও অনেক দূরে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বঙ্গের ভদ্রলোক পিছনে-তাকানো অতীত আঁকড়ে থাকা গোষ্ঠী, পুরোনো অনুমানের চক্করে আটকা পড়েছিল এবং এজন্যে তাঁরা একক মনোভাবে নিজের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে মন দিয়েছিল যে, বৃহত্তর ছবি এবং তাঁদের চারপাশে যে বড়ো পরিবর্তনগুলি ঘটেছিল তাতে তাঁরা অন্ধ ছিল।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্রসমূহ[সম্পাদনা]

  1. Chatterjee, Gouripada (১৯৮৬)। Midnapore, the Forerunner of India's Freedom Struggle (ইংরেজি ভাষায়)। Mittal Publications। পৃষ্ঠা 3। 
  2. Bandyopadhyay, Sekhar (২০০৪-০৮-১৯)। Caste, Culture and Hegemony: Social Dominance in Colonial Bengal (ইংরেজি ভাষায়)। SAGE। পৃষ্ঠা 154। আইএসবিএন 978-0-7619-9849-5 
  3. Readings in Indian Sociology: Volume II: Sociological Probings in Rural Society। Sage Publications। ২০১৩। 
  4. "Bengal's sorrow"frontline.thehindu.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৮-০৮ 
  5. Chatterji, Joya.। The spoils of partition : Bengal and India, 1947-1967। পৃষ্ঠা 317। আইএসবিএন 9780521188067ওসিএলসি 816808562 
  • সুবো বসু এবং সিকাতা বন্দ্যোপাধ্যায়, 'দ্য কোয়েস্ট ফর ম্যানহুড: ম্যাসকুলাইন হিন্দুইজম অ্যান্ড নেশন ইন বেঙ্গল ইন কম্পারেটিভ স্টাডিজ অফ সাউথ এশিয়া, আফ্রিকা অ্যান্ড দ্য মিডল ইস্ট
  • বাংলাপিডিয়ায় ভদ্রলোক
  • ইন্দিরা চৌধুরী, দ্য ফ্রেজিলে হিরো অ্যান্ড ভাইরাইল ইতিহাস: জেন্ডার অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অফ কালচার, (নয়াদিল্লি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৮)।
  • তিথি ভট্টাচার্য, দ্য সেন্টিনেলস অফ কালচার: ক্লাস, এডুকেশন অ্যান্ড দ্য কলোনিয়াল ইন্টেলেকচুয়াল ইন বেঙ্গল, (নিউ ইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৭)।