বিষয়বস্তুতে চলুন

মোহাম্মদ আকরম খাঁ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
মাওলানা

মোহাম্মদ আকরম খাঁ
জন্মজুন ৭, ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যুআগস্ট ১৮,১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ (বয়স ১০০ বছর)
মাতৃশিক্ষায়তনকলকাতা আলিয়া মাদরাসা
পেশাসাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ইসলামী পণ্ডিত, লেখক
পরিচিতির কারণবাংলা ভাষার সর্বপ্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মোস্তফা-চরিত গ্রন্থের রচয়িতা
পুরস্কারPresident Award (১৯৫৮) স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮১)

মোহাম্মদ আকরম খাঁ (৭ জুন ১৮৬৮ - ১৮ আগস্ট ১৯৬৮) ছিলেন একজন বাঙালি সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, জমিদার, সাহিত্যিক এবং ইসলামী পণ্ডিত। তিনি ছিলেন মুসলিম সাংবাদিকতার জনক। তিনি বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক[] এবং মাসিক মোহাম্মদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন।[]

প্রাথমিক জীবন

[সম্পাদনা]

আকরম খাঁ ১৮৬৮ সালে ৭জুন পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ গাজী আব্দুল বারি খাঁ ও মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন। তাঁর পিতা আব্দুল বারী খাঁ ছিলেন হাকিমপুর গ্রামের অত্যন্ত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। এবং তাঁর মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত বিদুষী নারী। মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন তাঁর ভইবোনদের মধ্যে সবার বড়। তিনি ছোটকাল থেকেই দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি তাঁর অল্প বয়সেই তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়াকে বিয়ে করেন।

শিক্ষা জীবন

[সম্পাদনা]

শৈশবে গ্রামের মক্তবে শিক্ষারম্ভ করেন। তিনি তাঁর পিতার কাছে থেকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা লাভ করেন। মক্তবে থাকাকালীন সময়ে শেখ সাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ গুলিস্তাঁ ও বুঁস্তার বয়াত সমূহ তিনি চর্চা করেন। গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা শেষে পিতার সাথে তিনি কোলকাতা এবং পাটনা যান। সেখানে তিনি নানান পরিবেশ দেখেন ও তাঁর পিতার কল্যাণে অনেক গুণী লোকের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর পিতামাতার মৃত্যুর পরে আকরম খাঁ তাঁর নানার কাছে চলে আসেন এবং তাঁর নানার তত্ত্বাবধানে একটি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। প্রাইমারী শিক্ষা শেষে তিনি বর্ধমানের খুলসোনা মাদরাসায় এক বছর লেখাপড়া করেন। মাদরাসা শিক্ষা শেষে তিনি কোলকাতায় মামার কাছে যান। সেখানে থাকাকালীন সময়ে তিনি কোলকাতার বিখ্যাত জুবিলী স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। সেখান থেকেই তিনি নিজ চেষ্টায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি সেই ইংরেজি স্কুলে বেশিদিন লেখাপড়া করেননি। সেই স্কুল ছেড়ে তিনি কোলকাতা আলিয়া মাদরাসা ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাযেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

রাজনৈতিক জীবন

[সম্পাদনা]
খেলাফত আন্দোলনের সময়

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ করেন। মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগের একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।[] ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি কোলকাতার আলিয়া মাদরাসায় পড়াকালীন সময়ে সেই মাদরাসায় বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্দোলন করেন, যা ছিল রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম পদচারণা। ১৯১২ সালে চট্টগ্রামে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য যুক্তি দেন ও জোর দাবি জানান।এই সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, বাঙালি মোসলমানের মাতৃভাষা বাংলা এবং এটিই তাদের শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ধর্ম ও ভাষা দুটি আলাদা বিষয়। মোসলমান হলেই তার মাতৃভাষা উর্দু হতে হবে - এমন ধারণার কঠোর বিরোধী তিনি ছিলেন। ১৯১৮ সালে কোলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে ঐতিহাসিক যুক্তি ও প্রমাণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "যাহারা বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী ভাষা বলিয়া দূরে ঠেলে দিতে চায়, তাহারা প্রকৃত সত্য জানেন না।" এ বিষয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত ও কালজয়ী বাণী আছে তা হলো,

"দুনিয়াতে অনেক আজব জানোয়ার দেখা যায়, কিন্তু স্বীয় মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষাকে মাতৃভাষা বলিয়া পরিচয় দানকারী জানোয়ার আজ পর্যন্ত আমার নজরে পড়ে নাই।"

বাংলা ভাষার বিষয়ে আরেকটি বিখ্যাত বাণী তাঁর আছে,

"আমরা বঙ্গদেশীয় মোসলমান এবং আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। ইসলাম ও বাংলা ভাষার মধ্যে কোনো বিরোধ নাই।"

তিনিই ছিলেন এই উপমহাদেশে প্রথম যিনি বাঙালি মোসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষার সপক্ষে প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেন।

১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে তিনি নিখিল ভারত খেলাফত আন্দোলন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এবং মওলানা মজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। আকরাম খাঁর দায়িত্ব ছিল তুর্কি খেলাফত থেকে ফান্ড সংগ্রহ করা। ১৯২০-১৯২৩ সময়ের মধ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে জনসভা বা সম্মেলনের আয়োজন করে খেলাফত আন্দোলন এবং  অসহযোগ আন্দোলন গতিশীল করার চেষ্টা করেন। হিন্দু মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রে ১৯২২ সালে আকরম খাঁ চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টির পক্ষ নেন এবং ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট সন্ধির সময়ও তিনি একই পক্ষে ছিলেন। ১৯২৬-১৯২৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে আকরম খাঁ ভারতীয় রাজনীতিতে তার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং তিনি স্বায়ত্তশাসন পার্টি এবং কংগ্রেস থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তিনি পর্জা বা গ্রাম্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালে তিনি গ্রাম্য রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে সক্রিয়ভাবে মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ, প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া হলে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।

আকরাম খান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন।[] তিনি ১৯৬২ সালে গঠিত পাকিস্তান কাউন্সিল অব ইসলামিক আইডোলজির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন।[]

সাংবাদিকতা

[সম্পাদনা]

১৯১০ সালে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীদৈনিক খাদেম প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯২১ সালে উর্দু জামানা ও বাংলা দৈনিক সেবক প্রকাশ করেন। ১৯২৭ সালে পুনরায় মাসিক মোহাম্মদী প্রকাশ করেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল এ পত্রিকা। বর্তমানে পত্রিকার বেশ কিছু সংখ্যা বাংলা একাডেমি, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। মুসলিম সমাজকে জাগাবার জন্য ১৯৩৬ সালে তার সম্পাদনায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করেন।[]

আজাদ পত্রিকা

[সম্পাদনা]

১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা আকরম দৈনিক আজাদ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। সেই সময় এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। মুসলিম লীগের সমর্থন যোগাতে এই বাংলা পত্রিকাটি সেই সময় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে পত্রিকার বহু পুরনো সংখ্যা সংরক্ষিত আছে।

সাহিত্য কর্ম

[সম্পাদনা]
  • সমস্যা ও সমাধান [এই গ্রন্থে লেখকের ইসলামে নারীর মর্যাদা, সুদ সমস্যা, চিত্র (ছবি তোলা) সমস্যা, সঙ্গীত সমস্যা এই চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়]
  • আমপারার বাংলা অনুবাদ
  • মোস্তফা-চরিত (বর্তমানে খোশরোজ কিতাব মহল হতে প্রকাশিত)
  • মোস্তফা-চরিতের বৈশিষ্ট্য
  • বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রীষ্টান ধর্ম
  • মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (ঐতিহ্য হতে প্রকাশিত)
  • তাফসীরুল কোরআন(১-৫ খণ্ড) (খোশরোজ কিতাব মহল হতে প্রকাশিত)
  • মুক্তি ও ইসলাম[]

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

তিনি ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকেশ্বরী রোড লালবাগের নিজ বাসায়, বার্ধক্যজনিত এবং নানাবিধ অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন।[]

সম্মাননা ও পদক

[সম্পাদনা]

এছাড়াও তিনি বৃটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে বহু সম্মাননা ও উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "খাঁ, মোহাম্মদ আকরম"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯
  2. ইসলাম, মুহম্মদ সাইফুল (ফেব্রুয়ারি ২০০৭)। ফজলুল হক, আবুল কাসেম; ইসলাম, মুহম্মদ সাইফুল (সম্পাদকগণ)। মানুষের স্বরূপ (প্রথম সংস্করণ)। ঢাকা: কথাপ্রকাশ। পৃ. ৩৮০। আইএসবিএন ৯৮৪-৮৫২৪৪৮৭
  3. "আড়ালের সূর্য মওলানা আকরম খাঁ"দ্য ডেইলি স্টার Bangla। ১৮ আগস্ট ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০২১
  4. Nation, The New। "Maulana Akram Khan: Pioneer of Bengali Muslim journalism"The New Nation (ইংরেজি ভাষায়)। ৩ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯
  5. Newspaper, From the (৩১ জুলাই ২০১২)। "Advisory body of Islamic ideology set up"DAWN.COM (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯
  6. "STORY OF THE BANGLA PRESS"দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯
  7. সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা- ৩০৯।
  8. "Death anniversary of Maulana Akram Khan Friday"বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৯

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]