গণবাহিনী (মুক্তিবাহিনী)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
গণবাহিনী
অংশগ্রহণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক.svg
Flag of the Mukti Bahini-DeFacto.png
মুক্তি বাহিনীর অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক ও পতাকা
সক্রিয়মার্চ - ডিসেম্বর ১৯৭১
মতবাদবাঙালি জাতীয়তাবাদ

সমাজতন্ত্র

১৯৭১ বাংলাদেশে গণহত্যা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করা[১]
দল(সমূহ)বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
 ∟ কে ফোর্স
 ∟ এস ফোর্স
 ∟ জেড ফোর্স
বাংলাদেশ নৌবাহিনী
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী
বাংলাদেশ রাইফেলস
বাংলাদেশ আনসার
বাংলাদেশ পুলিশ

বিশেষ গেরিলা বাহিনীসমূহ
  ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী
 

গণ বাহিনী
 ∟ মুজিব বাহিনী
 ∟ কাদেরিয়া বাহিনী
 ∟ হেমায়েত বাহিনী
 ∟ আফসার বাহিনী
ক্র্যাক প্লাটুন
নেতৃবৃন্দমহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, প্রধান সেনাপতি
মোহাম্মদ আবদুর রব, সেনাপ্রধান
আবদুল করিম খন্দকার, উপ-সেনা প্রধান
অপারেশনের এলাকাবাংলাদেশ
আকার১৫০,০০০
অংশ১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার[২]
মিত্রপক্ষ ভারত
প্রতিপক্ষ(সমূহ)পাকিস্তান
লড়াই ও যুদ্ধ (সমূহ)Battle of Gazipur, Battle of Goalhati, Battle of Garibpur, Battle of Dhalai, Battle of Rangamati, Battle of Kushtia, Battle of Daruin, Operation Barisal, Operation Jackpot

গণবাহিনী মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা গেরিলা বাহিনী। গণবাহিনী একচেটিয়াভাবে বেসামরিক লোকদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীনতার পক্ষে গঠিত একটি সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী।[৩][৪]

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরবিন্যাস[সম্পাদনা]

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের পরপরই তা পাকবাহিনীর সাথে লড়াইয়ের দিকে মনোনিবেশ করে। ১১ই জুলাই ১৯৭১ মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রবকে সেনা বাহিনী প্রধান ও ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে বিমানবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

এই বৈঠকে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে  ভাগ করা হয় এবং প্রত্যেকটি সেক্টরের জন্য একজন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেয়া হয়। ১০নং সেক্টরকে সর্বাধিনায়কের সরাসরি তত্ত্বাবধানে দেয়া হয় এবং এতে নৌ-সেনা ও সর্বাধিনায়কের নিজস্ব বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পাকিস্তান আর্মি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সেক্টরের দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। এইসব প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তারা গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অপ্রশিক্ষিতদের প্রশিক্ষণ দিতেন। এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় ছিলো এবং ভারত সরকারের সরাসরি সহায়তায় পরিচালিত হতো।

যুদ্ধে সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য প্রতিটি সেক্টরকে আবার কয়েকটি উপ-সেক্টরে ভাগ করা হয়। নিচের ছকে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলোকে তাদের সেক্টর কমান্ডারের নামসহ তালিকাভুক্ত করা হলোঃ

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরসমূহ
সেক্টর এলাকা সেক্টর কমান্ডার
চট্টগ্রাম জেলা, চট্টগ্রাম পাহাড়ি এলাকা, এবং মুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকার নোয়াখালির পূর্বাঞ্চল। মেজর জিয়াউর রহমান, পরবর্তীতে মেজর রফিকুল ইসলাম দ্বারা প্রতিস্থাপিত
ঢাকা জেলা, কুমিল্লা জেলা, ফরিদপুর জেলা, এবং নোয়াখালি জেলার অংশবিশেষ। মেজর খালেদ মোশাররফ, পরবর্তীতে মেজর এ টি এম হায়দার দ্বারা প্রতিস্থাপিত।
উত্তরে শ্রীমঙ্গলের কাছে চুরামন কাঠি থেকে সিলেট জেলা থেকে শুরু করে দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিংগারবিল পর্যন্ত। মেজর কে এম সফিউল্লাহ, পরবর্তীতে মেজর এ এন এম নুরুজ্জামান দ্বারা প্রতিস্থাপিত
উত্তরে হবিগঞ্জ জেলার কিছু এলাকা থেকে শুরু করে দক্ষিণে ১০০ কিলোমিটার ভারত সীমান্ত বরাবর কানাইঘাট পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত। মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত, পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন এ রব দ্বারা প্রতিস্থাপিত
দুর্গাপুর থেকে তামাবিল (সিলেট জেলা) এবং সিলেট জেলার পূর্ব সীমান্তের সমগ্র এলাকা। মেজর মীর শাখাওয়াত আলী
রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর অংশবিশেষ। উইং কমাণ্ডার এম খাদেমুল বাশার
রাজশাহী জেলা, পাবনা জেলা, বগুড়া জেলা এবং দিনাজপুর অংশবিশেষ। মেজর নাজমুল হক, পরবর্তীতে সুবেদার মেজর এ রব এবং কাজী নুরুজ্জামান দ্বারা প্রতিস্থাপিত।
১৯৭১ এর এপ্রিলে, এই সেক্টরের এলাকা ছিলো কুষ্টিয়া জেলা, যশোর জেলা, খুলনাজেলা, বরিশাল জেলা, ফরিদপুর জেলা এবং পটুয়াখালী জেলা. মে মাসের শেষের দিকে একে কুষ্টিয়া জেলা, যশোর জেলা, খুলনা জেলা, সাতক্ষীরা জেলা এবং ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে পুনর্বিন্যাস করা হয়। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, পরবর্তীতে মেজর এম এ মঞ্জুর দ্বারা প্রতিস্থাপিত।
বরিশাল জেলা, পটুয়াখালি জেলা, এবং খুলনাফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ। মেজর এম এ জলিল, পরবর্তীতে মেজর এম এ মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদিন দ্বারা প্রতিস্থাপিত।
১০ নৌ-সেনাদের নিয়ে এই সেক্টরটি গঠন করা হয় ভারতীয় কমাণ্ডার এম এন সুমন্ত।
১১ ময়মনসিংহ জেলা এবং টাঙ্গাইল জেলা। মেজর জিয়াউর রহমান, পরবর্তীতে মেজর এম আবু তাহের, স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ দ্বারা প্রতিস্থাপিত।
সূত্র: সেক্টরসমূহের তালিকা

নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী[সম্পাদনা]

মুক্তিবাহিনীর "নিয়মিত বাহিনী" গঠন করা হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (EBR), ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাইফেলস বা BDR), পুলিশ, অন্যান্য আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ জনগণ নিয়ে। এই বাহিনী বাংলাদেশব্যাপী ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল এবং নিয়ন্ত্রণ ছিলো সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে নিয়ন্ত্রিত এবং সংঘবদ্ধ আক্রমণের জন্য তিনটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করা হয় - মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জেড-ফোর্স, মেজর (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার) খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে কে-ফোর্স এবং মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) কে. এম. শফিউল্লাহের নেতৃত্বে এস-ফোর্স.

অনিয়মিত বাহিনী, যাকে "গণ বাহিনী" নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে, গঠন করা হয়েছিলো গেরিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়ে। এই বাহিনীর সদস্যরা ছিলো মূলত ছাত্র, কৃষক, শ্রমজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীরা। তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন সেক্টরে বিন্যস্ত করা হয়েছিলো। তাদের মূল দায়িত্ব ছিলো বাংলাদেশের ভেতরে পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে গেরিলা কায়দায় চকিত আক্রমণ চালানো এবং যথাসম্ভব ক্ষতিসাধন। নিয়মিত বাহিনী গতানুগতিক সম্মুখযুদ্ধে নিয়োজিত ছিলো।

মুক্তিবাহিনী মূলত দু'টি উৎস থেকে গড়ে উঠেছিলো - তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যগণ এবং শহর ও গ্রামের স্বেচ্ছাসেবক তরুণ ও যুবকেরা। এছাড়াও সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, বামপন্থী-সমাজতান্ত্রিক দল ও উগ্রপন্থী কিছু দলের যুব ও ছাত্র সংগঠন সমূহও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকটি ভাগ ছিলো। প্রথমত, একটি ভাগ ছিলো নিয়মিত সেনাসদস্যদের সংগঠিত করে তৈরি করা অংশ, যাদের "মুক্তিযোদ্ধা" বলা হয়ে থাকে। অপর একটি ভাগ ছিলো বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস (Bangladesh Liberation Forces - BLF) (বাংলা:বাংলাদেশ স্বাধীনতা বাহিনী) নামে, যারা ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আওয়ামী লীগের চার যুবনেতার দ্বারা সংগঠিত ছিলো। এর চলতি নাম ছিল মুজিব বাহিনী৤ আরেকটি ভাগের নাম ছিলো "বিশেষ গেরিলা বাহিনী" (Special Guerrilla Forces (SGF)), যা বামপন্থী দলসমূহের (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party of Bangladesh), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (National Awami Party), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (Bangladesh Students Union)) দ্বারা সংগঠিত হয়েছিলো। এই গেরিলা বাহিনী একত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ গেরিলা আক্রমণ চালাতো, তাদের উদ্দেশ্য ছিলো চকিত আক্রমণ দ্বারা পাকবাহিনীর যথাসম্ভব ক্ষতিসাধন করা। এই বাহিনীর কার্যক্রম সামাল দেওয়ার জন্য পাকবাহিনী কিছু সমান্তরাল আধা-সামরিক বাহিনী তৈরি করে, যেমন রাজাকার বাহিনী, আল-বদর বাহিনী, আল-শামস(মূলত তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী|জামাত-ই-ইসলামী]] ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলের সদস্যদের নিয়ে) বাহিনী। এছাড়াও তারা স্বাধীনতা-বিরোধী বাঙালি ও বিহারীদেরকেও কাজে লাগায়। এই বিহারীরা ৪৭ এর দেশবিভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে বসত গড়েছিলো। এই সব আধা-সামরিক বাহিনীগুলো জুন-জুলাইয়ে বর্ষার সময় পাকিস্তান বাহিনীর উপর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ কিছুটা হলেও ঠেকাতে পেরেছিলো।

বাংলাদেশ নৌ বাহিনী[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে, দু'টি জাহাজ ও ৪৫ জন নৌ-সেনা নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই বাহিনী। এই দু'টি জাহাজ পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের উপরে অনেক সফল আক্রমণ চালায়। ১০ই ডিসেম্বর জাহাজ দু'টি মংলা বন্দর আক্রমণের জন্য অগ্রসর হচ্ছিলো, কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভারতীয় যুদ্ধবিমান এই দু'টি জাহাজকে পাকিস্তানী যুদ্ধজাহাজ মনে করে ধ্বংস করে দেয়।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী[সম্পাদনা]

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে সেপ্টেম্বর, ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন এয়ার কমোডর এ.কে. খন্দকার। প্রাথমিকভাবে, ১৭ জন অফিসার, ৫০ জন টেকনিশিয়ান, ২টি বিমান ও ১টি হেলিকপ্টার দিয়ে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। বিমান বাহিনী পাকিস্তানী লক্ষ্যের উপর বারোটিরও বেশি সফল আক্রমণ চালায় এবং ডিসেম্বরের শুরুর দিকে অত্যন্ত সফলতার সাথে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণের সাথে সমন্বয় রাখে।

স্বতন্ত্র বাহিনীসমূহ[সম্পাদনা]

মুক্তিবাহিনীর সাথে সাথে কিছু স্বতন্ত্র বাহিনীও বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং কিছু এলাকা দখলমুক্ত করে। এদের মধ্যে একটি ছিলো ভারতে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনীভারতীয় সেনা বাহিনীর মেজর জেনারেল ওবান এবং ছাত্রলীগ নেতা সেরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, কাজী আরিফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ. স. ম. আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুর-এ-আলম সিদ্দিকীআব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমূখ এই বাহিনী গড়ে তোলেন। এছাড়া টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে "কাদেরিয়া বাহিনী", ময়মনসিংহের আফসার বাহিনীআফতাব বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, মাগুরার আকবর হোসেইন বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা ও গফুর বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে হেমায়েত বাহিনী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও কিছু সমাজতান্ত্রিক/বামপন্থী দলও পাকিস্তান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে এবং কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে।

বামপন্থী দলসমূহ[সম্পাদনা]

উল্লেখিত স্বতন্ত্র বাহিনীগুলোর সাথে সাথে ন্যাপ ও কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু বাহিনী গড়ে উঠে। তাদের মধ্যে সিরাজ শিকদার একটি শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেন যা বরিশালের পায়ারাবাগানে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যদিও এই বামপন্থী দলগুলোর মাঝে বাংলাদেশের স্বাধীনতার গতিপ্রকৃতি এবং করণীয় নিয়ে আদর্শগতভাবে বিপুল মতপার্থক্য ছিলো (তার মধ্যে সোভিয়েতপন্থী ও চীনপন্থী ফারাক এবং চীনপন্থীদের আন্তঃদল মতবিভেদ), মুক্তিবাহিনীর সাধারণ সদস্য ও নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই বামপন্থী ভাবধারায় গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। যে কারণে, ভারতীয় সরকার ও আওয়ামী লীগের সদস্যরা এই বামপন্থী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। যাই হোক না কেন, পরবর্তীতে বামপন্থী দলগুলো নিজেদের মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হন এবং মুক্তিবাহিনীর মূল অংশটিকে কেন্দ্র করে তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যান।

সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা[সম্পাদনা]

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলাকুশলীরা (এম আর আখতার মুকুল, আপেল মাহমুদ (সংগীতশিল্পী), আব্দুল জব্বার (সংগীতশিল্পী), মোহাম্মদ শাহ প্রমুখ) মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার বিপুল উৎস ছিলেন। তাদের "সাংস্কৃতিক যোদ্ধা" বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

যুদ্ধের পর কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর অস্ত্রজমাদান

কাদেরিয়া বাহিনী[সম্পাদনা]

কাদেরিয়া বাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীনতার পক্ষে গঠিত একটি সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী। এ বাহিনীর নেতা ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। যুদ্ধকালীন সময়ে এই ক্ষুদ্র অথচ লড়াকু বাহিনীটি সাহসিকতার জন্য স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের কাছে সুপরিচিতি লাভ করে এবং নেতার নামানুসারে কাদেরিয়া বাহিনী নামে খ্যাতি লাভ করে। [৫] সে সময় কাদের সিদ্দিকী "বঙ্গবীর" এবং "বাঘা সিদ্দিকী" নামে পরিচিত হন।

কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) বর্তমান বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে ৫০,০০০ বেসামরিক ব্যক্তি নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীটি টাঙ্গাইল অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বহু গেরিলা যুদ্ধে জয়লাভ করে। কাদের সিদ্দিকী বাল্লা গ্রামের কাছে মাকরার যুদ্ধে আহত হন। কাদেরিয়া বাহিনী ভূঞাপুর উপজেলার সিরাজকান্দী গ্রামে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ একটি পাকিস্তানী জাহাজ নিজেদের অধিকারে নিতে সক্ষম হয়। বাহিনীটি বেশ কিছু সাঁজোয়া ও বুলেটপ্রতিরোধী যুদ্ধযানও আটক করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এর সদর দপ্তর ছিল টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার মহানন্দপুর গ্রামের একটি ভবনে যেখানে বর্তমানে মহানন্দপুর বিজয় স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে কাদেরিয়া বাহিনী ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সাথে ঢাকায় প্রবেশ করে।[৫]

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী[সম্পাদনা]

১৯৭১ এর অক্টোবর থেকে মুক্তিবাহিনী পাক হানাদার বাহিনীর উপর তীব্র আঘাত হানতে থাকে। আগস্ট মাসে ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি পর ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উত্তরোত্তর আগ্রহ দেখাতে থাকে। পশ্চিম সীমান্তের কিছু শহরে পাকিস্তানের স্বতঃপ্রণোদিত বিমান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে নিয়োজিত হয় (Indo-Pakistani War of 1971) ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে। বস্তুত, ভারতীয় সৈন্যরা নভেম্বর থেকেই ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বেলোনিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিকল্পনা করে যুদ্ধ এড়িয়ে সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে ঢাকা দখল করতে। মুক্তিবাহিনী দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাকবাহিনীকে যুদ্ধে আটকে রেখে ভারতীয় বাহিনীর জন্য কাজটি অনেক সহজ করে দেয়।

বাংলাদেশের কঠিন ভূ-প্রকৃতি সত্ত্বেও যুদ্ধজয় তুলনামূলকভাবে অনেক তাড়াতাড়িই হয়। মাত্র দুই সপ্তাহ সময়ের ব্যবধানে ঢাকা মুক্ত হয়। ভারতীয় বাহিনীর এই জয়ের পিছনে মুক্তিবাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদানই ছিলো অন্যতম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে বেশ কয়েকটি সফল আক্রমণ এবং পাকিস্তানপন্থী, বাঙালি-বিরোধী ও পূর্ব-পাকিস্তানের ভূতপূর্ব গভর্নর মোনায়েম খান নিধন মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের কার্যকারিতা ও সক্ষমতার প্রমাণ রাখে।

১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর মিরপুর ব্রিজের কাছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের মেজর জেনারেল জামশেদ ভারতীয় জেনারেল নাগরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। বেলা ১০টা ৪০ মিনিটে ভারতীয় বাহিনী এবং কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান হয়। কিন্তু দেশের কিছু কিছু এলাকায় তখনো ছাড়া ছাড়া কিছু সংঘর্ষ চলছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি ভারতীয়-বাংলাদেশি যৌথবাহিনীর কমান্ডার ও ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পক্ষে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. https://books.google.com.bd/books?id=dQ_lAAAAQBAJ&printsec=frontcover#v=onepage&q&f=false
  2. Jamal, Ahmed Abdullah (৫ অক্টোবর ২০০৮)। "MUKTI BAHINI AND THE LIBERATION WAR OF BANGLADESH : A REVIEW OF CONFLICTING VIEWS" (PDF): 6। সংগ্রহের তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 
  3. "মুক্তিযুদ্ধ - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-০৫ 
  4. সখীপুর এবং কাদেরিয়া বাহিনী