জে এফ আর জ্যাকব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
জ্যাকব-ফারজ-রাফায়েল জ্যাকব
জন্ম ১৯২৩
কলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু ১৩ জানুয়ারি ২০১৬
আনুগত্য  India
সার্ভিস/শাখা  ভারতীয় সেনাবাহিনী
কার্যকাল ১৯৪২–১৯৭৮
পদমর্যাদা লেফটেন্যান্ট জেনারেল
নেতৃত্বসমূহ
  • ১২তম ইনফেন্ট্রি ডিভিশন
  • চীফ অফ স্টাফ, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড
  • জিওসি-ইন-সি, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড
যুদ্ধ/সংগ্রাম
পুরস্কার
  • কমেন্ডেশন অফ মেরিট
  • পরম বিশিষ্ট সেবা মেডেল
অন্যান্য কাজ

জ্যাকব-ফারজ-রাফায়েল "জেএফআর" জ্যাকব (জন্ম: ১৯২৩ - মৃত্যু: ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬) ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।[১] ১৯৭১ সালে সংগঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল পদ হতে অবসরগ্রহণকারী জেনারেল জ্যাকব ১৯৭১ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৬ বছরের সেনাবাহিনী জীবনে তিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি জে.এফ.আর জ্যাকব এবং জেনারেল জ্যাকব নামেও পরিচিত।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

জ্যাকব ১৯২৩ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। লে. জেনারেল জ্যাকবের পূর্ব-পুরুষেরা ১৮শতকে বাগদাদ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। তারা মূলত ছিলেন ইহুদি ধর্মের অনুসারী।" [২]জ্যাকবের পিতা ইলিয়াস ইমানুয়েল ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। শৈশবে যখন জ্যাকবের পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন, ৯ বছর বয়সে তাঁকে দার্জিলিংয়ের সন্নিকটে কাশিয়াংয়ে ভিক্টোরিয়া বোডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তখন থেকে তাঁর পরিবারের সাথে একটিনারে দুরত্বের সৃষ্টি হয়। তিনি কেবল বন্ধের দিনগুলোতেই পরিবারের সাথে দেখা করতে যেতেন।   জ্যাকব ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হলোকস্ট( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের উপর চালানো গণহত্যা)র নির্মমতা থেকে অনুপ্রাণীত হন এবং ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী তে যোগদান করেন। তাঁর পিতা তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে আপত্তি জানান কিন্তু তাও তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ২০১২ সালে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, "আমি গর্বিত আমি ইহুদি, তার থেকেও বেশি ও অনেক বেশি গর্বিত যে আমি ভারতীয়।"[২]

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে লেফটেনেন্ট জেনারেল থেকে তিনি মেজর জেনারেলে পদোন্নোতি লাভ করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফের দায়িত্বে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি প্রশংসাসূচক অনেক সম্মান লাভ করেছেন। 

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী যখন অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণভয়ে ভারতে আশ্রয়ের খোঁজে আসতে থাকে। চীফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যাকব তখন উক্ত সমস্যা নিরসনের উপায় খুঁজতে থাকেন। কিন্তু অন্যদিকে পাকিস্তানীদের অত্যাচার আরো বাড়তে থাকে।  এসব দেখে জ্যাকব তৎক্ষণাৎ তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এই সমস্যা নিরসনের একমাত্র উপায় হচ্ছে পাকিস্তানীদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর প্রধান শ্যাম মানেকশ’ পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে প্রথমেই চট্টগ্রাম এবং খুলনা শহর দখল করতে নির্দেশ দেন। জাতিসংঘ এবং চীনের প্রবল চাপের মুখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু জ্যাকব সব ধরনের চাপের উর্দ্ধে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সচেষ্ট ছিলেন।

প্রথমেই তিনি ঢাকাকে দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। এর জন্য তিনি সুচারুভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে অগ্রসর হন।

তাঁর পরিকল্পনা অবশেষে সফল হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানীদের ঢাকা থেকে হটাতে সফল হয়। দখলের পর তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সকল যোগাযোগ মাধ্যম ধ্বংস করেন। তিনি তিন সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা দখলের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু তা হয়ে যায় এক রাতের ভিতরেই। তারপর ধীরে ধীরে আরো অনেক স্থান দখল করতে সক্ষম হয় ভারতীয় সেনাবাহিনী

জ্যাকব বুঝতে পারেন যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো ফলাফল লাভ সম্ভব হবে না। তাই তিনি জেনারেল নিয়াজিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বলেন। তিনি নিয়াজির কাছে আত্মসমর্পণের খসরা পাঠিয়ে দেন। উক্ত দিন সকালে জ্যাকব শ্যাম মানকেশর ফোন পান এববং তিনি তাঁকে বলেন ঢাকায় গিয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে। তারপর তিনি আত্মসমর্পণ দলিল হাতে নিয়ে  ঢাকায় পৌঁছান এবং আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান সংগঠিত করতে তিনি জেনারেল নাগরাকে দুটি চেয়ার, একটি টেবিল জোগাড় করতে এবং ঢাকা শহর বিমানবন্দর, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ও একটি যৌথ গার্ড অব অনারের আয়োজন করতে বললেন। তারপর পাকিস্তান বাহিনী ৩০মিনিট সময়ে এক বিনাচুক্তির আত্মসমর্পণ সম্পন্ন করে। 

নিয়াজি পরবর্তীতে দাবি করেন যে, জ্যাকব তাকে ব্লাকমেইলের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে রাজী করেছিলেন। [৩] ৯৩ হাজার সৈন্য সাথে নিয়ে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেন। এখানে আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকায় তখন প্রায় ৩০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য উপস্থিত ছিল, অপরদিকে ভারতীয় সৈন্য ছিল মাত্র ৩ হাজার। অর্থাৎ অনুপাতে ১০:১। এক্ষেত্রে জ্যাকব অনেক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। জেনারেল নিয়াজি এ সম্পর্কে মোটেই অবগত ছিলেন না। জেনারেল জ্যাকব ২০১২সালে ২৭শে মার্চ বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পদক গ্রহণ করেন মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ন অবদান এর জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন।

অবসর[সম্পাদনা]

ভারতীয় সমাজে গ্রহণযোগ্য সামরিক নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি সফলতার সাথে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন বলে জ্যাকব দাবী করেন।[৪] ৩৭ বছর সেবা দেয়ার পর ১৯৭৮ সালে সামরিকবাহিনী থেকে অবসর নেন। ভারত রক্ষক ওয়েবসাইটে জ্যাকব বারংবার উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ যুদ্ধে কেবলমাত্র তাঁর নিজ চেষ্টার মাধ্যমে সফলতা পেয়েছেন। এতে, মানেকশ’ অথবা পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের লেঃ জেঃ জগজিৎ সিং অরোরা’র কৃতিত্ব ছিল না।[৫] ব্যবসায় জগতে প্রবেশের পর ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। দলে তিনি অনেক বছর নিরাপত্তা পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। গোয়া রাজ্যের গভর্নর হন ও পরবর্তীকালে পাঞ্জাবের গভর্নন হন।

দেহাবসান[সম্পাদনা]

দীর্ঘদিন রোগে আক্রান্ত হয়ে নতুন দিল্লির সেনা গবেষণা ও রেফারেল হাসপাতালে দেহাবসান ঘটে তাঁর।[৬] ১ জানুয়ারি, ২০১৬ তারিখে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।[৭]

জ্যাকবের লেখা বই[সম্পাদনা]

চিত্র:Lt. General (Retd.) JFR Jacob presents his books “An Odyssey in War and Peace” and “Surrender at Dacca” to PM Modi.jpg
নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর লেখা বই উপহার দিচ্ছেন জ্যাকব 
  • সারেন্ডার ইন ঢাকা, বার্থ অব এ ন্যাশন (ISBN 984-05-1395-8)
  • এ্যান ওডেসি এন ওয়্যার এন্ড পিস: আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ জে.এফ.আর জেকব (ISBN 978-81-7436-840-9)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "1971 Indo-Pak War Hero, Lieutenant General JFR Jacob Dies"। NDTV। সংগৃহীত ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ 
  2. Ginsburg, Aimee (2 June 2012).
  3. "A victory, and little else".
  4. "The Jewish general who beat Pakistan"। সংগৃহীত ২০১৫-০১-০৫ 
  5. Walia, Sumit। "1971 War: Dhaka or Bust?" 
  6. "Lt Gen JFR Jacob, 1971 Bangladesh war hero passes away"। India Today Group। India Today। ১৩ জানুয়ারি ২০১৬। সংগৃহীত ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ 
  7. "RIP: Lt Gen JFR Jacob, hero of the 1971 war, passes away at 93"। Firstpost। Firstpost। ১৩ জানুয়ারি ২০১৬। সংগৃহীত ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]