রফিকউদ্দিন আহমদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(রফিক থেকে পুনর্নির্দেশিত)
রফিকউদ্দিন আহমদ
রফিকউদ্দিন আহমেদ.jpg
জন্ম রফিকউদ্দিন আহমদ
অক্টোবর ৩০, ১৯২৬
পারিল বলধারা, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ, বৃটিশ ভারত।
মৃত্যু ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৫২ইং
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা,পূর্ব পাকিস্থান।
পেশা ছাত্র
যে জন্য পরিচিত ভাষা শহীদ

রফিকউদ্দিন আহমদ (জন্মঃ অক্টোবর ৩০, ১৯২৬ পারিল বলধারা গ্রাম, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ; মৃত্যুঃ ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহীদ। তাঁর শহীদস্মৃতি পরবর্তীকালে বাঙালি জাতিকে জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। এ চেতনার বলেই ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

প্রাথমিক জীবন ও পরিবার[সম্পাদনা]

রফিক উদ্দিনের পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মাতার নাম রাফিজা খাতুন। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, কলকাতায় ব্যবসা করতেন।রফিকরা ছিল পাঁচ ভাই ও দুই বোন। ভাইদের মধ্যে রফিক ছিল সবার বড়। চার ভাই, ১.আবদুর রশীদ (১৯৩১-১৯৮৭),২. আবদুল খালেক (১৯৩৪), ৩.বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম (১৯৪৩-১৯৭২), ৪.খোরশেদ আলম (১৯৪৭) এবং বোন ১.আলেয়া বেগম (১৯৩৮) ও ২.জাহানারা বেগম (১৯৪৫)। রফিক ছিল পিতা-মাতার প্রথম সন্তান। শৈশবে গ্রামের স্কুলেই তিনি লেখাপড়া করেন। মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী ও বীরেন্দ্রমোহন দত্তগুপ্ত শিক্ষকদ্বয়ের সুযোগ্য ছাত্র হিসাবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন।

রফিক বাল্যকালে কিছুটা ডানপিটে ছিলেন। তাই গাছ থেকে পড়ে তার হাত ভেঙ্গে চিকিৎসার জন্য কোলকাতা যান। কোলকাতা আবস্থানের সময়মিত্র ইনিস্টিটিউশনে শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেন। এখানে বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে পারিল প্রিন্টিং প্রেস নামে ছাপাখানা চালু করেন। এখানে রফিক বায়রা স্কুলে ভর্তি হয়ে ১৯৪৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বায়রা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে রফিকউদ্দিন মানিকগঞ্জ 'দেবেন্দ্রনাথ কলেজে' বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। আই.কম. ক্লাস পর্যন্ত পড়লেও পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় এসে পিতার সঙ্গে প্রেস পরিচালনা করতে শুরু করেন। পরে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ( বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ) ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের ( বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ) হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

শহীদ রফিক সাহিত্যাঙ্গনে ছড়া রচনায় পটু ছিলেন এবং সেলাই ও সূচী শিল্পেও বেশ দক্ষ ছিলেন। সমাজকল্যানেও তিনি গভীর আগ্রহী ছিলেন। কোলকাতা থাকাকালীন পারিল বলধারা যুবক সমিতি’র কার্যনির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণআন্দোলনে নিজেদের গভীরভাবে যুক্ত করেছেন এবং নিজেদের জীবনকে কখনোই দেশের স্বার্থের চেয়ে বড় মনে করেননি। তাইতো ১৬৬৯ এর গণআন্দোলনেও জীবন দিয়েছেন এই পরিবারের সদস্য জনাব ইসহাক। রফিকের ভাই আবদুস সালাম ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দুর্ভাগ্যের বিষয় তিনি গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। [১]

বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গনে পুলিশ গুলি চালালে সেই গুলি রফিকউদ্দিনের মাথায় লাগে। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয় সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাদের মাঝে ডাঃ মশাররফুর রহমান খান রফিকের গুলিতে ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে নিয়ে যান। [২]

মৃত্যু পরবর্তী[সম্পাদনা]

রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় ঢাকার আজিমপুর গোরস্তানে শহীদ রফিকের লাশ দাফন করা হয়। রফিকউদ্দিন ও অন্যান্য ভাষা শহীদ - সালাম, জব্বার, শফিউরের মহান আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা ভাষা ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে।

তাঁর শহীদ স্মৃতি উত্তরকালে পূর্ববঙ্গবাসীদের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এই চেতনার ভিত্তিতেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ২০০০ সালে একুশে পদক প্রদান করে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ‘ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ’ জীবনী গ্রন্থ
  2. একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস - আহমদ রফিক; পৃষ্ঠা: ৪১