অলি আহাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
অলি আহাদ
Oli Ahad.jpg
জন্ম ১৯২৮
মৃত্যু ২০ অক্টোবর, ২০১২
জাতীয়তা বাংলাদেশী
জাতিসত্তা বাঙালি
নাগরিকত্ব বাংলাদেশ Flag of Bangladesh.svg
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
যে জন্য পরিচিত ভাষা সৈনিক, রাজনীতিবিদ
ধর্ম মুসলিম
পুরস্কার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার

অলি আহাদ (জন্ম: ১৯২৮ - মৃত্যু: ২০ অক্টোবর, ২০১২) একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য। ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে ২৯ মার্চ, ১৯৪৮ তারিখে তৎকালীন সরকার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছরের জন্য বহিষ্কার করে।[১]। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।

এছাড়া ১৯৪৭-১৯৭৫ সময়কালীন জাতীয় রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের শেষ ভাগে তিনি ডেমোক্রাটিক লীগ নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা সংবলিত গ্রন্থ জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫ এর প্রণেতা তিনি।

জন্ম[সম্পাদনা]

জনাব অলি আহাদ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুরে ১৯২৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ৷ তার পিতার নাম মরহুম আবদুল ওহাব। তিনি ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার ৷

শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে ম্যট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন ৷ ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণভোটে তিনি ত্রিপুরা জেলার ৪ সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্কাস ক্যাম্পের অন্যতম সদস্য ছিলেন ৷ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের কারণে ১৯৪৬ সালে আই, এস-সি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি ৷ শিক্ষাজীবনের একটি বছর তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে ৷ ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আই, এস- সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়শুনা করেন ৷ কলেজ জীবনেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ৷

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

জনাব অলি আহাদ ছিলেন ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারিতে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৫২ এর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক৷১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের জন্য তিনি প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন । ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. কম পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তত্কালীন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম, কম পড়ার সুযোগ না দিয়ে চিরতরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে।

ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা[সম্পাদনা]

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা: জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শহীদুল্লাহ্‌ পাল্টা বাংলা ভাষার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ‘তমুদ্দুন মজলিস’ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রচারাভিযান শুরু করে। পাকিস্তানের গনপরিষদে বাংলা ভাষার স্থান না হওয়ায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ সভা, সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঐ দিন পুলিশ ছাত্রদের বাধা দেয় এবং বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে। বন্দী নেতাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলি, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ[১]

মার্চ ২৪ তারিখে রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহ্‌র সাথে সাক্ষাৎ করেন ও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমেদ, আবুল কাশেম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল ইসলাম।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা তখন ঢাকায় ছাত্রসমাজ ফেটে পড়ে। প্রতিবাদস্বরুপ ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ, খিলাফতে রব্বানী পার্টির প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদ’ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং স্থির হয় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসরুপে পালিত হবে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধায় নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় ১১৪ ধারা জারি করে। নবাবপুরে আওয়ামী লীগ অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে ১১৪ ধারা না ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১১৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিল। সংগ্রাম পরিষদের সভায় আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও গোলাম মওলা ১১৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে ভোট দেন। ছাত্ররা ১০ জনে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে ১১৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১১৪ ধারা ভাঙ্গা শুরু করলে ছাত্রদের সাথে পুলিশের খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে অনানুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ শফিউর রহমানে পিতা আর ২৬ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম শামসুদ্দিন আনুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেছিলেন। ইতিমধ্যে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করে। নুরুল আমিন সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের ‘ভারতের চর’, ‘হিন্দু’, ‘কমিউনিস্ট’ ইত্যাদি আখ্যা দেয়। [২]

৫২ পরবর্তী ভূমিকা[সম্পাদনা]

তিনি এক সময় আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ৷ ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় তিনি মাওলানা ভাসানীর সাথে প্রগতিশীলদের পক্ষে যোগ দেন ৷ তিনি চিরদিন গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বপক্ষে সংগ্রাম করেন ৷ সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন কালে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী জনমত গঠন করেন ৷ তাঁর রচিত 'জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫' নামক গ্রন্হটি এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল ৷

স্বাধীনতা পরবর্তী ভূমিকা[সম্পাদনা]

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্হান গ্রহণ করেন ৷ মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা বাস্তবায়নের জন্য শাসকদের উপর তিনি চাপ সৃষ্টি করেন ৷ তত্কালীন সরকারের অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নের্তৃত্ব দুঃশাসন বিরোধী এক তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন ৷ সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারি করে সভা সমিতি বন্ধ করার প্রতিবাদে জনাব অলি আহাদ ২৮ জুন ১৯৭৪ তারিখে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ৷ বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ও বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টে বেঞ্চ ৯ অক্টোবর ১৯৭৪ তারিখে ১৪৪ ধারা জারিকে অবৈধ ঘোষণা করেন ৷ কিন্তু ইতিমধ্যে ৩০ জুন ১৯৭৪ তারিখে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে ৷ তিনি ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট একদলীয় স্বৈরশাসন তথা বাকশালী ব্যবস্হার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ান ৷ বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে পরিচালিত সকল সংগ্রামে অকুতোভয় এই লড়াকু জননায়ক আজীবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন । আশির দশকে সামরিক শাসন ব্যবস্হার বিরুদ্ধে আপোসহীন ভূমিকার কারণেও তিনি নিগৃহীত হন ৷[৩] তাঁকে একাধিকবার গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখা হয় ৷ শুধু তাই নয়, তাঁর জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ইত্তেহাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ৷

স্বীকৃতি[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জনাব অলি আহাদকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৪ প্রদান করা হয়৷

মৃত্যু[সম্পাদনা]

অলি আহাদ ২০ অক্টোবর, ২০১২ ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। [৪] তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর; অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম
  2. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর- রফিকুল ইসলাম; পৃষ্ঠা: ১৪১-১৪৫
  3. http://www.cabinet.gov.bd/view_award.php?lang=en&award_person_id=152
  4. "চলে গেলেন অলি আহাদ"দৈনিক প্রথম আলো। অক্টোবর ২০, ২০১২। সংগৃহীত ২৭ জুলাই, ২০১৭ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]