বাংলাদেশের ইউনিয়ন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
বর্তমান সময়ের একটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের ছবি
একটি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স

ইউনিয়ন পরিষদ হলো বাংলাদেশে পল্লী অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক একক। গ্রাম চৌকিদারী আইনের ১৮৭০ এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্টি হয়। এ আইনের অধীনে প্রতিটি গ্রামে পাহারা টহল ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে কতগুলো গ্রাম নিয়ে একটি করে ইউনিয়ন গঠিত হয়। ইউনিয়ন গঠনের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা লিপিবদ্ধ রয়েছে বেঙ্গল চৌকিদারী ম্যানুয়েলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে। এই প্রক্রিয়ার বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিটের ধারণার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এর ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী কালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিটের ভিত্তিরূপে গড়ে উঠে।[১] বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫৭১টি ইউনিয়ন আছে।[২]

পটভূমি[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে। অতি প্রাচীন কাল থেকে উপমহাদেশে স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়। সাধারণত স্থানীয় সরকার বলতে এমন জনসংগঠনকে বুঝায় যা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমা রেখায় একটি দেশের অঞ্চল ভিত্তিতে জাতীয় সরকারের অংশ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমম্বয়ে গঠিত সংস্থাকে স্থানীয় সরকার বলা হয়। জাতীয় সরকারের মত স্থানীয় সরকার সার্বভৌম কোন প্রতিষ্ঠান নয়। জাতীয় সরকার বিভিন্ন সার্কুলার ও নির্দেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। স্থানীয় সরকার নির্দিষ্ট এলাকার কর, রেট, ফিস, টোল প্রভৃতি নির্ধারণ ও আদায়ের ব্যাপারে জাতীয় সরকারের নির্দেশ অনুসরণ করে থাকে। ব্রিটিশ শাসন আমলের পূর্বে প্রাচীন ও মধ্য যুগীয় আমলে খ্রীষ্ট পূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দে গ্রাম পরিষদের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া খ্রীষ্ট পূর্ব ৩২৪-১৮৩ অব্দে মৌর্য বা মৌর্য পূর্ব যুগে গ্রাম প্রশাসনের অস্তিত্বের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে তৎকালীন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধিকাংশ গ্রামে পঞ্চায়েত প্রথা প্রচলিত ছিল। পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫ জন। জনগণের মতামতের উপর ভিত্তি করে সামাজিক প্রয়োজনে পঞ্চায়েত প্রথার উদ্ভব ঘটে। তাই এগুলোর আইনগত কোন ভিত্তি ছিল না।

ব্রিটিশ শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে ও ব্রিটিশদের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার জন্য লর্ড মেয়ো ১৮৭০ সালে চৌকিদারী আইন পাশ করেন। এর ফলে প্রথমবারের মত স্থানীয় সরকারের উদ্ভব হয় এবং পঞ্চায়েত প্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। চৌকিদারী পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচ জন এবং জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট পঞ্চায়েতের সকল সদস্যকে তিন বৎসরের জন্য নিয়োগ করতেন। চৌকিদারী পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ইউনিয়ন কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৫-৯ জন এবং গ্রামবাসী কর্তৃক নির্বাচিত হতেন এবং ইউনিয়ন কমিটির পাশাপাশি চৌকিদারী পঞ্চায়েত কাজ করতো। এর ফলে দ্বৈত শাসনের অসুবিধা সমূহ প্রকটভাবে দেখা দেয়। অতঃপর ১৯১৯ সালে চৌকিদারী পঞ্চায়েত ও ইউনিয়ন কমিটি বিলুপ্ত করে ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য ১/৩ অংশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক মনোনয়ন দান করতেন অবশিষ্ট সদস্যগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। সদস্যগণ তাদের মধ্য থেকে প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন। কার্যকাল ছিল ৩ (তিন) বৎসর। তবে ১৯৩৬ সাল হতে ৪ (চার) বৎসর করা হয় এবং মনোনয়ন প্রথা ১৯৪৬ সালে রহিত করা হয়।

মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ,১৯৫৯ এর অধীনে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন করা হয় এবং সদস্য সংখ্যা ছিল ১০-১৫ জন। মোট সদস্যের ২/৩ অংশ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতো এবং অবশিষ্ট ১/৩ অংশ মহুকুমা প্রশাসক সরকারের পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রদান করতেন। ১৯৬২ সালে শাসনতন্ত্র প্রবর্তনের ফলে মনোনয়ন প্রথা রহিত করা হয়। সদস্যগণ তাদের মধ্য থেকে একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন। পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যানের পদটি বিলুপ্ত করা হয়। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেয়াদ ছিল ৫ বছর বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের যে কাঠামো রয়েছে তার সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে প্রণীত কিছু কিছু আইনের মাধ্যমে। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে শহর অঞ্চল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়।

ইতিকথা[সম্পাদনা]

 
 
 
স্থানীয় সরকার
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
জেলা পরিষদ
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
উপজেলা পরিষদ
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
ইউনিয়ন পরিষদ
 

[৩]

বর্তমানে তিন ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে:

  1. ইউনিয়ন পরিষদ
  2. উপজেলা পরিষদ
  3. জেলা পরিষদ

বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৭,১৯৭২ বলে ইউনিয়ন কাউন্সিল বাতিল করে ইউনিয়ন পঞ্চায়েত নামকরণ করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২২, ১৯৭৩ অনুযায়ী ইউনিয়ন পঞ্চায়েতের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যক্ষ ভোটে ৯ জন সদস্য, একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী ভাইস চেয়ারম্যানের পদটি বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া দুজন মনোনীত মহিলা সদস্য এবং ইউনিয়ন পরিষদকে দুজন প্রতিনিধি সদস্য (কৃষকের মধ্য থেকে) পরিষদে অর্ন্তভূক্ত করা হয়। সর্বোপরি ১৯৮৩ ও ১৯৯৩ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ অনুয়ায়ী প্রত্যক্ষ ভোটে একজন চেয়ারম্যান ও ০৯ জন সাধারণ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনে ০৩ জন মহিলা সদস্য নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদকাল- ৫ বছর।

নামকরণ[সম্পাদনা]

ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ:

সাল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নাম সভাপতি
১৮৭০-১৮৮৫ চৌকিদারী পঞ্চায়েত পঞ্চায়েত
১৯১৮ ইউনিয়ন কমিটি পঞ্চায়েত
১৯১৯-১৯৩৫ ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট
১৯৩৬-১৯৫৮ ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট
১৯৫৯-১৯৬১ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান
১৯৬২ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান
১৯৬৩-১৯৭১ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান
১৯৭২ ইউনিয়ন পঞ্চায়েত পঞ্চায়েত
১৯৭৩-১৯৭৫ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান
১৯৭৬-১৯৮২ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান
১৯৮৩-বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান

বিস্তারিত ইতিহাস[সম্পাদনা]

ইউনিয়ন পরিষদ হলো বাংলাদেশে পল্লী অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক একক। গ্রাম চৌকিদারি আইনের ১৮৭০ এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এর ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী কালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিটের ভিত্তিরুপে গড়ে উঠে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, চারিত্রিক সনদপত্র, ভূমিহীন সনদপত্র, ওয়ারিশান সনদপত্র, অবিবাহিত সনদপত্র, প্রত্যয়নপত্র, অস্বচ্ছল প্রত্যয়নপত্র, নাগরিক সনদপত্র, উত্তরাধিকার সনদপত্র ইত্যাদি সেবা প্রদান করা হয়।

ব্রিটিশ আমল[সম্পাদনা]

১৮৬১ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা করেন যে, স্থানীয় এলাকায় উন্নতির জন্য কিছু ক্ষমতা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর অর্পণ করা প্রয়োজন। ১৮৬৯ সালের ১৪ই ডিসেম্বর লর্ড মেয়ো স্থানীয় এলাকার উন্নতির জন্য গুরুত্ব আরোপ করেন। তারপর ১৮৮২ সালে রর্ড রিপনই সর্ব প্রথম এদেশে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জনসাধারণকে অধিকতর রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। লর্ড রিপনের এ প্রস্তাবনার প্রতি তৎকালীন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোনের পূর্ণ সমর্থন ছিল। এরপর লর্ড রিপন ১৮৮২ সালের ১৮ই মে ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা ঘোষণা করেন। তার প্রস্তাবনার ভিত্তিতে ১৮৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলায় বিধান সভায় একটা বিল উত্থাপন করা হয় ও গ্রাম এলাকায় জনসাধারণের কল্যাণের জন্য প্রথম ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়।

১৮৮৫ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের নাম ছিল ইউনিয়ন কমিটি। হাওড়া জেলা প্রশাসক ই কে ওয়েস্টম্যান কোট নামে একজন আই.সি.এস অফিসারকে এ বিষয়ের জন্য বিশেষ দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বর্ধমান ডিভিশন এবং ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার মধ্যে প্রথম ১৮০টি ইউনিয়ন কমিটি গঠন করেন। ১৮৮৪ সালের ৩১শে মার্চ সরকার এক প্রস্তাবনার মাধ্যমে বিষয়টি গ্রহণ করেন। কিন্তু তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেলের বিরোধিতার জন্য আইনটি পাস হতে বিলম্ব ঘটে। অতপর ১৮৮৫ সালের মার্চ মাসে মিস্টার ম্যাকুলে বিলটি পুনঃ উত্থাপন করেন। ঐ বছর ৪ঠা এপ্রিল বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়।

১৮৮৫ সালের আইনে তিনস্তর বিশিষ্ট গ্রাম স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্তরগুলো হলো:

  1. জেলা কমিটি
  2. থানা কমিটি
  3. ইউনিয়ন কমিটি

তখন এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫ থেকে ৯ জন। তারা ইউনিয়নের অধিবাসীদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। প্রথম অবস্থায় ইউনিয়ন কমিটির চেয়ারম্যান পদ ১৮৮৫ সালের বিধানে ছিল না। ১৯০৮ সালে পশ্চিম বাংলায় ১৮৮৫ সালের আইনের সংশোধন কালে চেয়ারম্যান পদের সৃষ্টি করা হয়। সে অনুসারে ১৯১৪ সালে পূর্ব বাংলায় প্রচলিত হয়। তখন সদস্যগণের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রথা ছিল। ইউনিয়ন কমিটির কার্যকাল ছিল মাত্র ২ বছর। ১৮৯৬-৯৭ সালে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন নিয়ে পুনরায় চিন্তাভাবনা করা হয়। সে সময় পূর্ব বাংলায় ছিল প্রবল বন্যা। এই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তখন প্রথম ইউনিয়ন কমিটির হাতে স্থানীয় করারোপ করা ছাড়াও কিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

১৯১৩ সালে মিস্টার লিভিঞ্জের সভাপতিত্বে অন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করতে সক্ষম হয়। উক্ত ইউনিয়ন কমিটি বাতিলের জন্য পরামর্শ দেয়। ১৯১৮ সালের ২৪শে এপ্রিল স্যার সুরেন্দ্র প্রাসানা সিনহা ১৮৭০ সালের গ্রাম পঞ্চায়েতী আইন এবং ১৮৮৫ সালের ইউনিয়ন কমিটি ভেঙ্গে একটি নতুন কমিটি গঠন করার সুপারিশ পেশ করেন। নতুন এই কমিটির নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন বোর্ড। ১৯১৯ সালের ২১শে জানুয়ারি মিস্টার হেনরী হুইলার বিলটি সিলেক্ট কমিটির নিকট পেশ করেন। আলোচনাকালে জনাব শের-ই-বাংলা এ কে এম ফজলুল হক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে ইউনিয়ন বোর্ডকে জেলা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুপারিশ করেন। বিলটির উপর সামান্য আলোচনা-সমালোচনার পর ঐ বছরই গ্রাম স্বায়ত্ত শাসন আইন ১৯১৯ সালে পাস হয়। উক্ত আইনে বলা হয়, সাধারণত গড়ে ১০টি গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন বোর্ড গঠিত হবে। ইউনিয়নের গড় আয়তন ছিল ১০ থেকে ১৫ মাইলের মধ্যে, এর গড় জনসংখ্যা ছিল ১০ হাজার। পিরোজপুর জেলার প্রায় ইউনিয়নই ১৯১৯ সালের আইন অনুযায়ী ১৯২০ সাল থেকেই ইউনিয়ন বোর্ড চালু হয়। উক্ত ইউনিয়ন বোর্ডের কার্যকাল ছিল ৩ বছর। স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি সর্ব প্রথম স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক মন্ত্রী হন। ১৯৩৫ সালে ইউনিয়ন বোর্ডের কার্যকাল ৪ বছর করা হয়। এই আইনে প্রেসিডেন্ট ছাড়াও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

পাকিস্তান আমল[সম্পাদনা]

১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন নং ৩৫, ১৯১৯ সালের আইন সংশোধন করে তৈরী হয়েছে। প্রকাশ্যে ভোটদান বাতিল করে গোপন ব্যালটে ভোট চালু হয়। ইউনিয়নকে ৩টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। এই আইনে সর্বপ্রথম নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র চালু করে। ইউনিয়ন বোর্ডের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন ইউনিয়ন কাউন্সিল। উক্ত ইউনিয়ন কাউন্সিলের কার্যকাল ছিল ৫ বছর। ভাইস চেয়ারম্যান পদ ১৯৬৫ সালে বাতিল করা হয়। ১৯৭১ সালে ইউনিয়ন কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ত্রাণ কমিটি। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি ইউনিয়ন কাউন্সিল ও ত্রাণ কমিটি ভেঙ্গে ইউনিয়ন পঞ্চায়েত নামকরণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদ কর্তৃক বিধি প্রণীত হয়। ইউনিয়ন পঞ্চায়েত-এর নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ইউনিয়ন পরিষদ। জিয়ার সামরিক শাসনামলে ১৯৭৬ সালের ২০ নভেম্বর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের নাম ঠিক রেখেই সব সরকার কাজ চালিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ৩টি ওয়ার্ডের পরিবর্তে ৯টি ওয়ার্ড সৃষ্টি করেন এবং ৩ জন মহিলা সদস্যকে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।

গঠন কাঠামো[সম্পাদনা]

প্রতিটি ইউনিয়নভুক্ত গ্রামগুলোকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে প্রত্যিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন করে সাধারণ সদস্য এবং প্রতি তিনটি ওয়ার্ড হতে ১ জন সংরক্ষিত (মহিলা) সদস্য সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। এছাড়াও পুরো ইউনিয়ন হতে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ফলে, ১ জন চেয়ারম্যান ও ১২ জন সদস্য নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়। এছাড়াও পরিষদের কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য রয়েছে একজন সহকারী সচিব, ০১ জন হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং কয়েকজন গ্রাম পুলিশ প্রভৃতি। [৪]

ইউনিয়ন পরিষদ সচিব[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের প্রশাসন হলো আমলাতান্ত্রিক। প্রশাসনিক কাঠামোর পদসোপান (মন্ত্রী >> সিনিয়র সচিব >> সচিব >> অতিরিক্ত সচিব >> যুগ্ম সচিব >> উপসচিব >> সিনিয়র সহকারী সচিব >> সহকারী সচিব) অনুযায়ী সর্বনিম্নস্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন সহকারী সচিব।

 
 
 
মন্ত্রী
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সিনিয়র সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
অতিরিক্ত সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
যুগ্ম সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
উপ-সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সিনিয়র সহকারী সচিব
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সহকারী সচিব
 

তবে ইউনিয়ন পরিষদ সচিব (ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা) সরকারি রাজস্বভুক্ত ও স্বায়ত্বশাসিত (Autonomous)। এ পদের বেতন সরকারি রাজস্ব খাত থেকে ৭৫ ভাগ এবং বাকি ২৫ ভাগ ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব খাত থেকে দেওয়া হয়। ইউনিয়ন পরিষদ (পরিষদের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলী) বিধিমালা, ২০১১ নামে ইউপি সচিব নিয়োগের একটি স্বতন্ত্র নিয়োগ বিধি আছে। এ পদের পদোন্নতি নেই, তবে গ্রেড ও স্কেল পরিবর্তন হয়। সরকারি সকল সুবিধা পেলেও পেনশন পান না। অবসরে গেলে মূল বেতনের ৮০ মাসের সমপরিমাণ টাকা (এককালীন) দেয় সরকার।

ক্যাশলেস ইউনিয়ন পরিষদ সেবা[সম্পাদনা]

বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, চারিত্রিক সনদপত্র, ভূমিহীন সনদপত্র, ওয়ারিশান সনদপত্র, অবিবাহিত সনদপত্র, প্রত্যয়নপত্র, অস্বচ্ছল প্রত্যয়নপত্র, নাগরিক সনদপত্র, উত্তরাধিকার সনদপত্র ইত্যাদি সেবা প্রদান করা হয়। বহুল প্রচলিত এই সকল সেবাকে জনবান্ধব করার জন্য একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। সে লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদত্ত সেবাসমূহকে জনগণের কাছে স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং হয়রানিমুক্তভাবে প্রদান নিশ্চিত করার জন্য একটি এ্যাপ্লিকেশন থেকে সকল সেবা প্রদানের নিমিত্ত গত ২০১৯-২০ অর্থ-বছরে সম্ভব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে www.uniontax.gov.bd নামক একটি অনলাইন সিস্টেম কার্যক্রম চালু করা হয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Khan, Dr. Mohammad Ibrahim। "Functioning of Local Government (Union Parishad): Legal and Practical Constraints" (পিডিএফ)। Democracywatch। ১৭ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে মূল (পিডিএফ) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১২ 
  2. "বাংলাদেশ | জাতীয় তথ্য বাতায়ন | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার" 
  3. http://www.bangladesh.gov.bd/?q=en
  4. "Local Government (Union Parishads) Act, 2009 (in Bangla)."Bangladesh Code। Ministry of Law, Government of Bangladesh। 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]