বাংলাদেশী সমাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

বাংলাদেশ, স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এর পৃথক কোন একক ভৌগলিক ও জাতিগত ঐক্য হিসাবে পরিচয় ছিলনা। এই অঞ্চলকে ধারাবাহিক ভারত সাম্রাজ্য এর একটি অংশ হিসাবে ধরা হয়েছে, এবং ব্রিটিশ সময় থেকে একে সমগ্র বেঙ্গল এর পূর্ব অংশ হিসাবে গঠন করা হয়, যা প্রভাবিত হতো ব্রিটিশ শাসক ও হিন্দু সমাজপতি, বণিক, এবং জমিদার দ্বারা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে, বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃত্ব অমুসলিম কর্তৃত্ব থেকে পাকিস্তানের পশ্চিমা অ-বাঙ্গালী মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর দখলে আসে। অতঃপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরই একটি নতুন জাতি এবং নতুন সামাজিক কাঠামো হিসাবে জন্ম হয়।

সামাজিক ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারত বিভাজন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব বাংলার শতকরা ৮০ ভাগ বড় গ্রাম অঞ্চলগুলিতে, শহুরে ভূসম্পত্তি, এবং সরকারি চাকরিতে এবং অর্থ, বাণিজ্য এবং জীবিকায় হিন্দু নিয়ন্ত্রিত ছিল। ভাগের পরবর্তীতে পূর্ববাংলা কাঠামোতে আমুল পরিবর্তন আসে, হিন্দু রাজনৈতিক ও অভিজাত পরিবারেরা তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো গুটিয়ে কলকাতা এর মধ্যে সীমিত করে নেয়। পরবর্তীতে হিন্দু কুলীনদের এই শুন্যস্থান দ্রুত মুসলিম হাতে চলে আসে এবং পূর্ব বাংলা অর্থনীতি ও সরকার-প্রধান প্রথমবারের মতো মুসলিম দখলে আসে। এটা অতিদ্রুত সুযোগ তৈরি করে, বিশেষভাবে সরকারী চাকুরী ও বিভিন্ন জীবিকায়, যদিও খুব দ্রুত এটা পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক অভিজাত পরিবারের (যে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সরকারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে) নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭১ এর স্বাধীনতার পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানের খালি করে দেওয়া স্থান সমূহ কিছু সুযোগসন্ধানী অসৎ অভিজাত শ্রেণীর দখলে চলে যায়। সামান্য কিছু অবাঙ্গালী মুসলিম সদস্য যারা "বনিক সমাজ" নামে পরিচিত ব্যতীত সকল ছোট-বড় সব ধরনের বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বাঙালী মুসলিমের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের অবাঙ্গালীদের জাতীয়করণের ফলে সকল বৃহৎ কারখানাগুলির উপরও দেশীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা দ্রুততর হয়।[১]

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অপ্রত্যাশিত উত্থান এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিকতার বিস্তার শহুরে এবং গ্রামীণ উভয়খাতের ভারসাম্য বিপর্যস্ত করে তোলে। দ্রুত এগিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীতে অথবা শিল্প প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের স্থানে প্রবেশের প্রধান পূর্বশর্ত হয়ে উঠে দলীয়করণ, রাজনৈতিক পরিচিতি অথবা যুগান্তকারি কাগুজে ব্যবস্থা; মধ্যবিত্তের কর্মদক্ষতার খুব সামান্যই প্রতিফলন ঘটে। নব্য অভিজাত শ্রেণী তাদের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্যে গ্রামের দিকে সম্পদ কুক্ষিগত করতে থাকে। গ্রামের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণী ফসলের এবং গ্রাম-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের অর্জিত ভাগ্যের উপর সুবিধা নিতে থাকে, ফলস্রুতিতে গ্রামের প্রতিষ্ঠিত অনেক সচ্ছল কৃষককে (স্থানীয়ভাবে জোয়ার্দ্দার নামে পরিচিত) প্রতিস্থাপিত করে এক নূতন ভুমিভিত্তিক অভিজাত শ্রেণী গড়ে উঠে। [১]

গ্রামীণ সমাজ[সম্পাদনা]

গ্রামীণ সমাজের মৌলিক একক পরিবার বা গোষ্ঠী, সাধারণত গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ অথবা আংশিক বর্ধিত পিতৃপ্রধান পরিবার ব্যবস্থা/শৃঙ্খলা (একক চুলা) বা পারিবারিক অবস্থান (বাড়ি) অনুসারে। কখনো কয়েকটি একক পরিবার আংশিক ভাবে সংযুক্ত থেকে বৃহৎ এককে বসবাস করে একে ঘর বলে। আবার বাড়ী পর্যায়ে, পিতৃপ্রধান আত্মীয়তার সংযোগে/ভিত্তিতে ক্রমানুসারে কিছুটা সাজানো বা মেনে নেওয়া আত্মীয়তার বন্ধনে ক্রমানুসারে যৌথ পরিবারে বসবাস করে।[২] একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংঘবদ্ধতা যা নিকট আত্মীয়তার চাইতে বড় পরিসর যেমন ধর্মীয় আচার, পারস্পরিক সুযোগ সুবিধার ভিত্তিতে গড়ে উঠে সমাজ। সামাজিক বিধান ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত হয় স্থানীয় মসজিদ ও মোল্লা দ্বারা। সমাজের সমস্যাগুলি বয়জোষ্ঠদের (মাতব্বর বা সর্দার) নিয়ে গঠিত এক অনানুষ্ঠানিক পরিষদ দ্বারা সমাধান করা হয়। গ্রাম মাতব্বরদের কার্যকরী কর্ম প্রতিযোগিতাই গ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন।[২] কিছু একত্রিত বাড়িকে পাড়া বলে, প্রতিটি পাড়ার পৃথক নাম থাকে। কিছু পাড়ার সমন্বয়ে গড়ে উঠে মৌজা যা মৌলিক রাজস্ব এবং আদমশুমারির একক হিসাবে ধরা হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে খড় ও বাঁশের কুঁড়েঘরের বদলে একক অথবা বহুতল ইটের বাড়ি (স্থানীয়ভাবে পাকাবাড়ি নামে পরিচিত) চিরাচরিত গ্রাম্য পরিবেশের পরিবর্তন আনতে থাকে।[২]

ঐতিহ্যগতভাবে চাষাবাদ সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত পেশা হওয়া সত্ত্বেও ১৯৮০ হতে গ্রামবাসী তাদের সন্তানদের এই পেশা পরিবর্তন ও শহরের জনবহুল জনপদে নিরাপদ চাকুরীর প্রতি উৎসাহ দেওয়া শুরু করে। সামাজিক সন্মানের ভিত্তি দীর্ঘদিনের চলে আসা জমিদারী, উচ্চবংশ, ধর্মীয় ভক্তি এর পরিবর্তে উচ্চশিক্ষা, উচ্চ-বেতন ও নিশ্চিত আয় দ্বারা পরিমাপ হতে থাকে। তবে এই পরিবর্তন গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয় না। ১৯৮৬ সালের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের করা পরিবারের ব্যয়ের জরিপে পাওয়া যায় গ্রাম্য জনপদের ৪৭ শতাংশই দারিদ্যসীমার নিচে অবস্থান করে এবং তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ চরম দারিদ্রসীমায় অবস্থান করছে। ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, ১৯৭০ সালে যা ২৫ শতাংশ ছিল ১৯৮৭ সালে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়।[২]

শহুরে সমাজ[সম্পাদনা]

১৯৮৮ সালে প্রায় ১৮ শতাংশ অধিবাসী শহরে বসবাস করে যার অধিকাংশই গ্রাম ও বাণিজ্য কেন্দ্র নির্ভর। ১৯৮০ এর সময়ে শহরতলী ও শহর কেন্দ্রিক জনবসতি বাড়তে থাকে ফলশ্রুতিতে প্রশাসনিক ভাবে বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ হিসাবে উপজেলা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাহ্যিকভাবে এই শহুরে এলাকাগুলি খুবই জীর্ণ ছিল। অধিকাংশ শহুরে জনপদ ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এবং শহরে জনসংখ্যা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে দায়সারা গোছের জীর্ণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায়ের মাঝে। শহরের প্রধান বাসিন্দা সরকারী কর্মচারী, ব্যবসায়ী, এবং ব্যবসাকাজে কর্মরত কর্মচারিবৃন্দ। অধিকাংশই একক পরিবার এবং সামান্য কিছু বর্ধিত পরিবারে বসবাস করে। কিছু বসতবাড়ি নিয়ে গঠিত হয় পাড়া যেখানে সামান্য নির্ভরশীলতা/সংসক্তিপ্রবণতা গড়ে উঠে কিন্তু কোন আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব গঠন হয় না। কিছু অস্থায়ী বাসিন্দাদের ব্যতিক্রম ব্যতীত প্রায় সকল অধিবাসী শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং একই সাথে গ্রামের সম্পদ ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ অক্ষুন্ন রাখে। আধিকাংশ শহরে সামাজিক ও খেলাধুলার সংঘ এবং পাঠাগার থাকে। শহরের অধিবাসিদের মাঝে হৃদ্যতা গ্রাম্য সমাজের তুলনায় অনেক সীমিত ও অস্থায়ী।[৩]

পরিবার, গৃহস্থালি, এবং আত্মীয়তা[সম্পাদনা]

পরিবার এবং আত্মীয়তা বাংলাদেশের সামাজিক জীবনের মূলভিত্তি। পরিবারভুক্ত সকল সদস্য যারা একই বাড়িতে থাকে মৌলিক ভাবে একই অর্থনৈতিক, গৃহ-মালিকানা ও সামাজিক পরিচয়ের অংশিদার হয়ে থাকে। সাধারন দৃষ্টিতে চুলা কার্যকর পরিবারের সংজ্ঞার অন্যতম উপাদান, বর্ধিত পরিবারের সদস্যরা যৌথভাবে গৃহস্থ সম্পদ বন্টন করে নেয় এবং মিলিতভাবে রান্নাঘর নিয়ন্ত্রণ করে। আজটি বাড়িতে একাধিক কার্যকর গৃহসামগ্রী থাকতে পারে, এটা নির্ভর করে পরিবারের অন্তরঙ্গতা পরিস্থিতির উপর। সাধারণত বিবাহিত সন্তান পিতা বেঁচে থাকাকালীন সময়ে একই বাড়িতে অবস্থান করে। যদিও একক পরিবার হিসাবে পৃথক বাড়ি নির্মাণ করে তবুও তাদের কর্তৃত্ব পিতার নিয়ন্ত্রণে এবং স্ত্রী শাশুড়ির অনুগামী হয়ে থাকে। পিতার মৃত্যুর সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নিজ পরিবার পৃথক করার গতি ত্বরন্বিতকরে। এধরনের বিচ্ছেদে সাধারণত বাড়ির গঠনগত কাঠামোতে সামান্যই পরিবর্তন আনে, যদিও পরিবার জীবনপ্রবাহের বিভিন্ন ধাপে সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ করে।[৪]
পিতৃকুলভিত্তিক ব্যবস্থাই পারিবারিক কাঠামোর মূলধারা, তবে মাতৃকুলভিত্তিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত। বিবাহিত মহিলারা বিবাহ পরবর্তী জীবনে স্বামীর ভাই ও তার পরিবারভুক্তদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রয়াত বাবার বসতভিটায় যে ভাই অবস্থান করে তার বাসায় সব ভাই বোনেরা প্রায়শ যাতায়াত করে থাকে। ইসলামিক আইন অনুসারে, মহিলারা উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার সম্পতির অংশীদার হয়ে থাকেন এবং ভাইদের ব্যবহৃত ক্ষুদ্রতম জমিরও ভাগের দাবীদার। যদিও এ দাবী খুব বেশী উঠেনা বরং পিতৃভাগের জমি ভাইদের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্থায়ীভাবে ভাইদের বসতভিটায় উষ্ণ অভ্যর্থনার পথ খোলা রাখে।[৪]
একজন মহিলা প্রকৃতপক্ষে মা হবার পরই স্বামী অথবা শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রত্যাশিত সম্মান ও নিরাপত্তা পেয়ে থাকে। মায়েরাই ছেলেদের লালনপালন ও ইচ্ছাপূরণ করে থাকেন আবার একইসাথে মেয়েদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় কঠোর নিয়মের মধ্যে থাকতে হয় এবং সংসারের ভারী ও টুকিটাকি কাজে ছোটবেলা থেকেই যুক্তকরা হয়। বেশীরভাগ পরিবারেই মা এবং সন্তানের সর্ম্পক্য সবচাইতে আপন, অন্তরঙ্গ এবং আদর ও আবেগের। পিতা হচ্ছেন একটু গম্ভীর, সমীহ ও ভক্তির ব্যক্তিত্ব এবং ছেলের বৌ বিয়ের পর বহুদিন পর্যন্ত অনাহূত আগন্তক হিসাবেই থাকে।[৪]

বিবাহ[সম্পাদনা]

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবাহ কোন ধর্মীয় বিধি বা সংস্কার থেকে অধিক একটি নাগরিক বন্ধন (দেখুন কাবিননামা), এবং উভয় পক্ষের আলোচনা চুক্তির মাঝে ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রীর চাইতে পরিবারের স্বার্থের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশে, যদিও পুরুষেরা কনে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব বা পছন্দ প্রকাশ করে থাকে তথাপি পিতা-মাতাই সাধারণত আনুষ্ঠানিক বিবাহ আয়োজন করে থাকেন। শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে পুরুষেরাই নিজ বিবাহের মধ্যস্থতা করে থাকেন। শুধুমাত্র সামান্য কিছু সুরুচিসম্পন্ন সম্ভান্ত পরিবারের নারীরাই তাদের নিজ বিবাহের আলোচনায় অংশীদার হতে পারেন। বিবাহ সাধারণত সম-সামাজিক মর্যাদার দুই পরিবারের মাঝেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে একজন মহিলার সাথে উচ্চ মর্যাদার পুরুষের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বিবাহ সম্পন্ন সম্ভব। বিংশশতাব্দীর শেষভাগে কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থা পারিবারিক মর্যাদার অপেক্ষা অধিক গুরুত্ব পেতে থাকে। প্রায়শ মধ্যপ্রাচ্যে ভাল চাকুরীজীবী পাত্র উচ্চ বংশের পাত্রের চাইতে অগ্রগণ্য বিবেচ্য হয়।[৪]

বিবাহের পূর্বে সাধারণত বর ও কনের উভয় পরিবারের মাঝে ব্যাপক আলোচনা হয়ে থাকে। সামাজিক অবস্থানের তারতম্য আর্থিক বন্দোবস্ত দ্বারা মীমাংসা বিবাহ আলোচনার একটি বড় অংশ।বরের পরিবার সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে অঙ্গিকার করে থাকে যা নগদ টাকায়, অথবা কনে মুল্যে; অংশ বা সম্পূর্ণ পরবর্তীতে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দোয়া থাকে যা অকার্যকর হলে স্বামী দ্বারা বা কখনো চুক্তির ভঙ্গ হিসাবে দেখিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। অন্যান্য মুসলিম দেশের ন্যয়, ইসলামিক আইন অনুসারে বিবাহ বিচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে নারীরা নিরাপত্তার স্বার্থে নগদ অর্থ পেয়ে থাকে। কিছু পরিবার অবশ্য হিন্দু রীতি অনুসারে কনেকে যৌতুক প্রদানের রীতি মেনে চলে।[৪]

১৯৮১ সালের শুমারি অনুসারে, আনুমানিক ৩.৪ কোটি বিবাহিত, ১.৯ কোটি বিবাহযোগ্য বা অবিবাহিত, ৩০ লক্ষ বিধবা বা বিপত্নীক ৩.২ লক্ষ তালাকপ্রাপ্ত। যদিও ৫.৮ লক্ষ বসতবাড়িতে অবস্থানরত অধিকাংশ বিবাহিত পুরুষ (১ কোটি) একক স্ত্রী নিয়ে বসবাস করে তথাপি এর মাঝের ৬-১০ শতাংশ পুরুষের দুই অথবা তার অধিক স্ত্রী বর্তমান।[৪]

যদিও ১৯৮০ সালে বিবাহের বয়সসীমা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়, বাল্যবিবাহ আধিপত্য বজায় রাখে শিক্ষিত সমাজের মাঝেও, এবং নারীরাই মূল ভুক্তভুগি। ১৯৮১ সালে বিবাহের নুন্যতম বয়স নির্ধারণ করা হয় ছেলেদের ২৩.৯ এবং মেয়েদের ১৬.৭। মেয়েরা ছাত্রী অবস্থায় প্রায়শই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ত কিশোরী বয়স পার হবার আগেই এবং পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম শ্বশুর বাড়িতে করতে হত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সন্তানহীন নবীন দম্পতির মাঝে বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এটা এতটা স্বাভাবিকভাবে গৃহীত ছিল যে ১৯৮০ সালে প্রতি ৬টি বিবাহবিচ্ছেদের ১টির রেত্তয়াজ ছিল নিঃসন্তান।[৪]

একজন প্রতীকী জীবন-সঙ্গী বিবাহের পূর্বে একে অপরের বিষয়ে খুব সামান্যই জানতে। চাচাতো-মামাতো ভাই এবং অন্যান্য দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মাঝে প্রায়শ বিবাহ সংঘটিত হলেও তারা নারী ও পুরুষের গৃহে পৃথক অবস্থানের রীতির জন্যে এক অন্যকে খুব বাশি জানার সুযোগ পেত না। পরিবারের সুষম গতি নিশ্চিত করাই ছিল বিবাহ ব্যবস্থার মূল দায়িত্ব, ব্যক্তি সাহচর্য্যের তুলনায় এবং নতুন কনের তার স্বামীর চাইতে শ্বাশুরীর সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বজায় রাখা ছিল বেশী জরুরী।[৪]

পর্দা[সম্পাদনা]

১৯৮৮ সালে, সামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় নারীদের পর্দার ব্যবহার (নারীর গতানুগতিক স্বাতন্ত্র্যতা তুলে ধরা) বৈচিত্রময় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, এমনকি আপাত রুচিশীল শিক্ষাকেন্দ্রীক শহুরে পরিবারেও নারী ও পুরুষ পৃথক অবস্থানের রীতি বজায় রাখত। ঐতিহ্যগত পরিবেষ্টনী ছিল, একজন পূর্ণবয়স্ক মহিলা সম্পূর্ণভাবে পর্দা মেনে চলবে যা তার বয়ঃসন্ধি হতে শুরু হয়। গৃহে থাকা অবস্থায়, মহিলারা নিজস্ব ঘরে বসবাস করবে যেখানে শুধুমাত্র পুরুষ আত্মীয় অথবা গৃহকর্মীদের প্রবেশাধিকার থাকবে, এবং একজন মহিলা এমনকি তার শ্বশুর অথবা স্বামীর বড় ভাইদের এড়িয়ে চলবে অথবা প্রথানুযায়ী সন্মান দেখিয়ে চলবে। গৃহের বাইরের ক্ষেত্রে, একজন মহিলা পর্দা হিসাবে ঘোমটা ব্যবহার করবে অথবা সম্পূর্ণ ঢেকে নেবে যাতে বাইরে থেকে পরিদেহ বস্ত্র দেখা না যায়।[৪] পূর্ণ পর্দা প্রথা বজায় রাখার জন্যে মহিলাদের ঐতিহ্যগত নিয়মের প্রতি ভক্তি ও নিজ কর্মক্ষেত্রে এর প্রয়োগের স্বদিচ্ছা উভয়ের সংমিশ্রণ থাকতে হবে। অধিকাংশ গ্রামীণ পরিবারের ক্ষেত্রে মহিলাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রয়োজনীয়তার সাথে পূর্ণ পর্দা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাড়ায়, যদিও প্রথা বলবত থাকে। কিছু এলাকায়, উদাহারনসরূপ বলা যায়, মহিলারা ঘোমটা ব্যতীত নিদৃষ্ট "পাড়া" অথবা গ্রামের মধ্যে অবস্থান করত কিন্তু ঘোমটা বা পৃথক কাপড় ব্যবহার করত নিজের এলাকার বাইরে যাবার জন্যে। কোন পরিস্থিতিতে পরিবারে বাইরের কোন পুরুষের সাথে দেখা হলে সাথে সাথে এড়িয়ে চলত।[৪]

নারী ও পুরুষের পৃথক অবস্থানের প্রভাব সামাজিক গোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে পূর্ণ পর্দাকে তারা প্রত্যাখ্যাত করেছিল। যদিও শহুরে মহিলারা গতানুগতিক ধারার থেকে বাহ্যিকভাবে বেশী স্বাধীনতা উপভোগ করত এবং একটি পেশাদারী জীবিকা বাছাইয়ের সুযোগ পেত, তারা স্বামী থেকে পৃথক একটি সামাজিক ধারায় প্রবেশের সুযোগ পেত এবং প্রায়শ নারীসুলভ পারিপার্শ্বিকতায় জীবিকা চালাত।[৪]

সমাজে নারীর ভূমিকা[সম্পাদনা]

স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রাপ্ততথ্য ইঙ্গিত দিয়ে যে, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নারীরা পুরুষ থেকে অধস্তন হিসাবে বিবেচিত হতো। নারীরা, নিয়ম ও অভ্যাসগতভাবেই স্বায়ত্বশাসনের ধারায় ধনী থেকে দরিদ্রশ্রেণীর সকল ক্ষেত্রেই পুরুষের অনুগত হিসাবে বিবেচিত ছিল। অধিকাংশ নারীই তাদের গতানুগতিক ভূমিকাগুলিতেই কেন্দ্রীভূত ছিল এবং তাদের কেনাবেচা, উৎপাদনশীল কাজে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় খুবই সীমিত বিচরণ সুবিধা ছিল। এই উন্নত উন্নয়নশীল ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত আচরণের প্রভাব ছিল পরিবারের ভালমন্দের ঘাটতি, অপুষ্টি ও শিশুদের দুর্বল স্বাস্থ্য এবং হতাসাগ্রস্থ শিক্ষা ও অন্যান্য জাতীয় উন্নয়ন লক্ষে স্থবিরতা। প্রকৃতপক্ষে, তীব্র দারিদ্র্যমাত্রা নারীদের আঘাতে জর্জরিত করে তুলত। যতদিন পর্যন্ত নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, এবং প্রশিক্ষণ সেবা সীমিত থাকবে মহিলা জনগোষ্ঠীর মধ্যের উন্নয়নশীল উৎপাদনশীলতা দুর্বল থেকে যাবে।[৫]

সামাজিক শ্রেণিবিভেদ এবং স্তরবিন্যাস[সম্পাদনা]

১৯৮০ সালের বাংলাদেশের সমাজে, কিছু হিন্দু বর্ণ বৈষম্য ব্যতীত কট্টর শ্রেনিবিভেদ ছিলনা; বরং কোনপ্রকার সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো ছাড়াই এটা ছিল মুক্তমনা, নরম এবং বিস্তৃত। অবশ্য সামাজিক শ্রেনিবিভেদ বেশিরভাগক্ষেত্রে কর্মনির্ভর এবং ভিন্ন শ্রেণীর মাঝে যথেষ্ট নমনীয়তা ছিল। এমনকি হিন্দুদের বর্ণ বৈষম্যের কাঠামোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে তুলনামূলক শিথিল ছিল কারন অধিকাংশ হিন্দুই এখানে নিন্ম সামাজিক শ্রেণীর।[৬]

বাহ্যত, ইসলামের সমাধিকার নীতিই সামাজিক কাঠামোর মূলমন্ত্র ছিল। দক্ষিন এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মতো হিন্দু বর্ণ বৈষম্যের সামাজিক কাঠামো বাংলাদেশের মুসলিমভিত্তিক সামাজিক সংস্কৃতির উপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলতে পেরেছিল। এমনকি সবচাইতে নিন্ম সামাজিক শ্রেণী জোলা(তাঁতি) তাদের সামাজিক মর্যাদা ১৯৭১ সাল হতে উন্নীত করে নেয়। যদিও বিভিন্ন কাঠামোগত ভাবে গোত্রের সূত্রপাত হয়- যেমন সৈয়দ (আভিজাত বংশজাত) এবং একইসাথে শেখ অথবা শাইখ (ও আভিজাত বংশজাত) -- হিসাবে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে সন্মানিত ছিলেন, সেখানে বংশগতভাবে কোনপ্রকার কঠোর প্রভাব ছিল না। বরং শহরে ও গ্রামে উভয় অংশেই নিরপেক্ষভাবে আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বারা শ্রেনিবিভেদ করা হতো।[৬]

প্রথাগত মুসলিম শ্রেণি প্রভেদ বাংলাদেশে খুব সামান্যই গুরুত্ব বহন করত। সামাজিক শ্রেনিবিভেদের সূচক, জন্মগতভাবে উচ্চ ও নিন্ম বংশের পরিবারের মাঝে বিবাহের জন্যে সমাজচ্যুত হওয়া, অনেক আগেই উঠে গিয়েছিল। বেশীরভাগ বিবাহ সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ভিত্তি থাকে পরিবারগত পার্থক্যের পরিবর্তে আর্থিক ও প্রতিপত্তিগত অবস্থান। আবার, অনেক তথাকথিত উচ্চশ্রেণীর পরিবার বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাদের ঐতিহ্যগতভাবে উর্দু ভাষা ব্যবহার করার জন্যে।[৬]

যদিও হিন্দু সমাজ অভ্যাসগত ভাবেই ভিন্ন বর্ণের আনুষ্ঠানিক সামাজিক শ্রেণী বিভেদ মেনে নিয়েছিল [৭], বাংলাদেশি হিন্দু পরিষদ সামাজিক শ্রেণীকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশে অবস্থানকারী প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ হিন্দু নিন্ম সামাজিক শ্রেনির অন্তর্ভুক্ত, লক্ষণীয়ভাবে নমশূদ্র (ক্ষুদ্র কৃষক) এবং অবশিষ্টরা প্রাথমিকভাবেই বঞ্চিত ছিল বা অস্পৃশ্য গোত্রের। কিছু উচ্চ শ্রেণীর সদস্যরা মধ্যবিত্ত বা পেশাদারী শ্রেণি এর আওতায় চলে আসে, কিন্তু কোন উচ্চ হিন্দু বংশ ছিলনা। পেশাগত প্রয়োজনে হিন্দুদের ঐতিহ্যগত পেশার বাইরে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ভিন্নভিন্ন পেশাদার শ্রেণীর সংযোগ ও সংমিশ্রণ এর ফলে সামাজিক সচেতনতায় শ্রেণী বিভেদ ভেঙ্গে পড়ে। যদিও এর ফলে হিন্দু শ্রেনিবিভেদ দূর হয়নি কিন্তু এটা বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতনা যেমনটা হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত ভারতের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় ছিল। বাংলাদেশি হিন্দুরা যেন ঐতিহ্যের প্রধানধারার অংশ হিসাবে থেকেছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে স্বাতন্ত্র্য রেখে।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bangladesh Country Study Guide (ইংরেজি ভাষায়) (Volume 1 Strategic Information and Developments সংস্করণ)। International Business Publication। পৃ: ৮২–১০৯। আইএসবিএন 1-4387-7389-7 
  2. Rahim, Enayetur. "Rural Society". In Heitzman & Worden.
  3. Rahim, Enayetur. "Urban Society". In Heitzman & Worden.
  4. Rahim, Enayetur. "Family, Household, and Kinship". In Heitzman & Worden.
  5. Rahim, Enayetur. "Women's role in society". In Heitzman & Worden.
  6. Rahim, Enayetur. "Social Classes and Stratification". In Heitzman & Worden.
  7. Excerpts from The Constitution of India। Left Justified। ১৯৯৭।