গঙ্গাঋদ্ধি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
টলেমির মানচিত্রে গঙ্গাঋদ্ধি (Gangaridai)

গঙ্গাঋদ্ধি বা গঙ্গাহৃদি বা গঙ্গারাঢ়ী (ইংরেজি: Gangaridai; গ্রিক: Γανγαρίδαι Gangaridae; অর্থ "গঙ্গার সম্পদ" ; সংস্কৃত: Ganga Rashtra, অর্থ "Nation on the River Ganges") খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ শতকের একটি রাজ্য। ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ অঞ্চল বা বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এ রাজ্য বিস্তৃত ছিল। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তার ইন্ডিকা নামক গ্রন্থে এই রাজ্যের উল্লেখ করেন। গ্রিক ও লাতিন ঐতিহাসিকদের মতে, আলেকজান্ডার তার ভারতবর্ষ অভিযান থেকে সরে এসেছিলেন কারণ তাহলে তাকে গঙ্গাঋদ্ধি আক্রমণ করতে হতো। আলেকজান্ডার আশঙ্কা করছিলেন গঙ্গাঋদ্ধি সাম্রাজ্য আক্রমণ করার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তবে এখন পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রত্নস্থল চন্দ্রকেতুগড় সম্ভবত উল্লিখিত বিখ্যাত প্রাচীন বন্দর-রাজ্য 'গঙ্গারিডাই'-এর রাজধানী বা 'গাঙ্গে' বন্দর। বিদ্যাধরী নদী সংলগ্ন এই প্রত্নস্থলটির সঙ্গে জলপথে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত রোমের বাণিজ্যিক যোগসূত্রের সুনিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে। [১]

গঙ্গাঋদ্ধির অবস্থান[সম্পাদনা]

৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বের এশিয়ার মানচিত্র যাতে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য ও প্রতিবেশী রাজ্য সহ নন্দ রাজ্য ও গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য দেখানো হয়েছে।

ধ্রুপদী গ্রিকও ল্যাটিন ঐতিহাসিকগণ গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্যের বিবরণ দিয়েছেন।

গঙ্গা নদী উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এবং গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্ব সীমানায় সমুদ্রে মিলিত হইয়াছে।’ - মেগাস্থিনিস

‘গঙ্গা নদীর মোহনায় সমুদয় এলাকা জুড়িয়া গঙ্গারিডাই রাজ্য’ - টলেমি

‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভিতর দিয়া গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হইয়াছে’- প্লিনি

টলেমি (২য় খ্রিস্টাব্দে) গঙ্গারিডাই এর অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যে, গঙ্গার পাঁচটি মুখ সংলগ্ন প্রায় সমুদয় এলাকা গঙ্গারিডাইগণ দখল করে রেখেছিল, ‘গাঙ্গে’ নগর ছিল এর রাজধানী। তার বর্ণনাকৃত চারটি দ্রাঘিমা ডিগ্রি সমুদ্র উপকূলের সবচেয়ে পশ্চিম থেকে সবচেয়ে পূর্ব নদীমুখ পর্যন্ত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করছে। কার্যত এর অর্থ হলো ‘গঙ্গারিডাই’ বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী গঙ্গার সবচেয়ে পশ্চিম এবং সবচেয়ে পূর্ব নদীমুখ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে, ভাগীরথীর (তমলুক এর নিকটে) এবং পদ্মার (চট্টগ্রামের নিকটে) নদীমুখের দ্রাঘিমা রেখার পার্থক্য ৩৫ ডিগ্রির সামান্য কিছু বেশি। তাই টলেমির তথ্যানুযায়ী গঙ্গারিডাই-কে শনাক্ত করা যায় বর্তমান ভারতের পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশে গঙ্গার প্রধান দুটি শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলটিতে।

‘গঙ্গারিডাই' রাজ্য ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশের বাঙলা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তাঁর 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন। ধ্রুপদী গ্রিক এবং ল্যাটিন ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী আলেকজান্ডার দি গ্রেট বাংলায় অবস্থিত এই গঙ্গারিডির লোকেদের পরাক্রমের কাহিনী শুনে শঙ্কিত হয়ে যমুনার পশ্চিম পাড় থেকেই ফেরৎ চলে যান।

একজন গ্রিক নাবিক তাঁর Periplous tes Erythras Thalasses (Periplus Maris Erythraei) গ্রন্থে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উড়িষ্যা উপকূলের পূর্বে অবস্থিত গাঙ্গে দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। নদী তীরে নদীর নামে গাঙ্গে ছিল একটি বাণিজ্য শহর। এটা স্পষ্ট যে টলেমির ‘গঙ্গারিডাই’ এবং পেরিপ্লাস গ্রন্থের লেখকের ‘গাঙ্গে দেশ’ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত একই এলাকাকে ইঙ্গিত করছে। কালিদাসের 'রঘুবংশম্'-এ বঙ্গের যে বিবরণ পাওয়া যায় তাও অভিন্ন অর্থ বহন করে।

'গঙ্গারিডাই' শব্দের উৎপত্তি 'গঙ্গারিড' থেকে। ধারণা করা হয় গঙ্গারিড ভারতের গঙ্গাহৃদ বা গঙ্গাহৃদি শব্দের গ্রিক রূপ। অর্থাৎ গঙ্গা হৃদয়ে যার - যে ভূমির বক্ষে গঙ্গা প্রবাহিত। ঐতিহাসিক অতুল সুরের মতে, গঙ্গাহৃদ থেকে গঙ্গারিডি তার থেকে গঙ্গারাঢ়ি ও তার থেকে 'রাঢ়' শব্দটি এসে থাকতে পারে।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন রায় তাঁর বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে লিখেছেন-

গঙ্গারিডাই-রা যে গাঙ্গেয় প্রদেশের লোক এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই, কারণ গ্রিক লাতিন লেখকরা এ সম্বন্ধে একমত। দিয়োদারাস-কার্টিয়াস-প্লুতার্ক-সলিনাস-প্লিনি-টলেমি-স্ট্ট্যাবো প্রভৃতি লেখকদের প্রাসঙ্গিক মতামতের তুলানামূলক বিস্তৃত আলোচনা করিয়া হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী মহাশয় দেখাইয়াছেন যে গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারাষ্ট্র গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীরে অবস্থিত ও বিস্তৃত ছিল।

গ্রিক/রোমান/মিশরীয়দের বর্ণনায় গঙ্গাঋদ্ধি[সম্পাদনা]

আলেকজান্ডার ভারত অভিযান[সম্পাদনা]

আলেকজান্ডার ও তাঁর সৈন্যবাহিনীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ডিওডোরাস (৬৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ-১৬ খ্রিস্টাব্দ) সিন্ধু পরবর্তী দেশ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, গঙ্গা পেরিয়ে যে অঞ্চল সেখানে ‘প্রাসিয়ই' ও গঙ্গারিডাই-দের আধিপত্য। তবে একথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বে অথবা অব্যবহিত পরে কয়েক শতকে গ্রিক ও ল্যাটিন ক্লাসিক্যাল লেখকদের বর্ণনার সাথে মিলে এমন কোন সামরিক শক্তিসম্পন্ন রাজ্যের সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব স্থানীয় কোন উৎসের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। উল্লেখ করা হয়েছে যে, চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গঙ্গারিডাইর রাজা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাঁর ৬০ হাজার পদাতিক, ১ হাজার অশ্বারোহী ও ৭ শত হস্তি বাহিনী ছিল। প্রাপ্ত তথ্য এ বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় যে, পাশ্চাত্যের দূরবর্তী দেশগুলি পরবর্তী ৫০০ বছর তাদের নাম ও যশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সময়[সম্পাদনা]

প্লিনির মতে ‘গঙ্গারিডাই' রাজ্যের ভিতর দিয়ে গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হয়েছে। গঙ্গার দক্ষিণ অংশের অধিবাসীদের গাত্রবর্ণ ছিলো কালো এবং রৌদ্রে পোড়া, কিন্তু তারা ইথিওপিয়ানদের মতো কালো ছিলনা।

গঙ্গার শেষ অংশের প্রস্থ ৮ মাইল, এবং যেখানে এটি সবথেকে কম প্রস্থের সেই স্থানে এর গভীরতা প্রায় ১০০ ফুট। সেই মানুষরা যারা সেই সুদুর প্রান্তে থাকেন তারা হলেন গঙ্গারিডাই। এদের রাজার ১০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হস্তি এবং ৬০০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আছে। --- মেগাস্থিনিস

উৎস[সম্পাদনা]

  1. Dr. Gaurishankar de & Prof. Subhradip de, Prasanga: Pratna-Prantar Chandraketugarh, First Edition: 2013, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৮২৪৩৫-০০-৬
  • বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব) - নীহারঞ্জন রায়। দে’জ পাবলিশিং - কলিকাতা
  • ভারতবর্ষের ইতিহাস (প্রাচীন ভারত) - গ্রিগোরি বোন্‌গার্দ লেভিন। প্রগতি প্রকাশন, মস্কো,
  • ইন্ডিকা - মেগাস্থিনিস
  • বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত বই "গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ" লেখক ধ্যারপতি মোঃ হাবিবুর রহমান

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]