মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
Habibur Rahman.jpg
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
অধিকৃত অফিস
১৯৯৬
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম (১৯২৮-১২-০৩)ডিসেম্বর ৩, ১৯২৮
মুর্শিদাবাদ জেলা, ভারত
মৃত্যু জানুয়ারি ১১, ২০১৪(২০১৪-০১-১১) (৮৫ বছর)
ঢাকা, বাংলাদেশ
জাতীয়তা বাঙালি
ধর্ম ইসলাম
পুরস্কার বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (৩ ডিসেম্বর ১৯২৮ - ১১ জানুয়ারি ২০১৪ ) বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তথা দেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একাধারে গবেষক, লেখক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ, ভাষা সৈনিক, অভিধানপ্রণেতা। ১৯৪৯ হতে ৫২ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

জন্ম ও পরিবার[উৎস সম্পাদনা]

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জংগীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে মুহম্মদ হাবিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন আইনজীবী ৷ জহিরউদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। তিনি প্রথমে আঞ্জুমান এবং পরে মুসলিম লীগ আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হাবিবুর রহমানের পিতা জাতীয় যুক্তফ্রন্টের বিভাগীয় নেতা ছিলেন৷ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে গ্রেফতার করে বহরমপুর কারাগারে পাঠায়, অবশ্য কয়েকদিন পরই জহিরউদ্দিন বিশ্বাস মুক্তি লাভ করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মুশির্দাবাদ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পরবর্তীতে রাজশাহীতেস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন৷ হাবিবুর রহমানের পিতা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস বিয়ে করেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরের মিসেস গুল হাবিবাকে। শুধু নানার বাড়ি নয়, বিচারপতি হাবিবুর রহমান নিজেও বিয়ে করেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিববঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে। হাবিবুর রহমানের শৈশবের অনেকখানি কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের এই শ্যামপুরে (নানার বাড়ি)। পরবর্তীতে শ্যামপুর শ্বশুর বাড়ি হওয়ায় এখানে তিনি মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতেন।৷[১]

শিক্ষা[উৎস সম্পাদনা]

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে বি.এ. সম্মান ও ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে এম.এ. পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক ইতিহাসে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বি.এ. সম্মান ও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন[উৎস সম্পাদনা]

লেখক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

হাবিবুর রহমান তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি ইতিহাসের রিডার[২] (১৯৬২-৬৪) ও আইন বিভাগের ডিন (১৯৬১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আইন ব্যবসায়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ঢাকা হাই কোর্ট বারে যোগ দেন। তিনি সহকারী এডভোকেট জেনারেল (১৯৬৯), হাই কোর্ট বার এসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট (১৯৭২) ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেরও (১৯৭২) সদস্য ছিলেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর আপিল বিভাগে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ১৯৯৫ পর্যন্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।। ১৯৯০-৯১ মেয়াদে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

দেশে-বিদেশে বিচারপতি হাবিবুর রহমান অনেক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এগুলোর মধ্যে প্রধান হল - অস্ট্রলিয়ার পার্থে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক দেশসমূহের প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলন (১৯৯১), নাইজেরিয়ার আবুজাতে চতুর্থ কমনওয়েলথ প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলন (১৯৯২), নেপালের কাঠমুন্ডুতে প্রথম সার্ক প্রধান বিচাপতিদের সম্মেলন (১৯৯৫)।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা[উৎস সম্পাদনা]

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হিসেবে তিনি ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তথা দেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

মৃত্যু[উৎস সম্পাদনা]

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।[৩][৪][৫]

সাহিত্যে অবদান[উৎস সম্পাদনা]

একজন গবেষক ও লেখক বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহিত্য ও অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হল:

  • ল' অফ রিকুইজিশন (১৯৬৬)
  • রবীন্দ্র প্রবন্ধে সঞ্জনা ও পার্থক্য বিচার (১৯৬৮)
  • যথা-শব্দ (১৯৭৪)
  • মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩)
  • কোরআন সূত্র (১৯৮৪)
  • বচন ও প্রবচন (১৯৮৫)
  • গঙ্গাঋধি থেকে বাংলাদেশ (১৯৮৫)
  • রবীন্দ্র রচনার রবীন্দ্র ব্যাখ্যা (১৯৮৬)
  • রবীন্দ্র কাব্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য (১৯৮৬)
  • অন রাইট্‌স আন্ড রিমেডিস্‌
  • আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬)
  • ভাষার আপন পর (২০১২)

প্রবন্ধ[উৎস সম্পাদনা]

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রবন্ধ বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০টি৷

  • রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩)
  • রবীন্দ্র প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্য বিচার (১৯৮৩)
  • কোরান সূত্র (১৯৮৪)
  • রবীন্দ্র রচনার রবীন্দ্রব্যাখ্যা (১৯৮৬)
  • রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য (১৯৮৬)
  • বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬)
  • তেরই ভাদ্র শীতের জন্ম (১৯৯৬)
  • কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৬)
  • আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬)
  • বাংলাদেশের সংবিধানের শব্দ ও খণ্ডবাক্য (১৯৯৭)
  • বাংলাদেশের তারিখ (১৯৯৮)
  • বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯)
  • সরকার সংবিধান ও অধিকার (১৯৯৯)
  • মৌসুমী ভাবনা (১৯৯৯)
  • মিত্রাক্ষর (২০০০)
  • কোরান শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ (২০০০)
  • চাওয়া-পাওয়া ও না- পাওয়ার হিসেব (২০০১)
  • স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন ও বোবার স্বপ্ন (২০০২)
  • রবীন্দ্র রচনায় আইনি ভাবনা (২০০২)
  • বিষন্ন বিষয় ও বাংলাদেশ (২০০৩)
  • প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে (২০০৪)
  • রবীন্দ্রনাথ ও সভ্যতার সংকট (২০০৪)
  • সাফদেলের মহড়া (২০০৪)
  • দায়মুক্তি (২০০৫)
  • উন্নত মম শির (২০০৫)
  • এক ভারতীয় বাঙালির আত্মসমালোচনা (২০০৫)
  • কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ (২০০৬)
  • শিক্ষাথী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭)
  • বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭)
  • উদয়ের পথে আমাদের ভাবনা (২০০৭)
  • যার যা ধর্ম (২০০৭)
  • বাংলাদেশের তারিখ ২য় খণ্ড (২০০৭)
  • রাজার চিঠির প্রতীক্ষায় (২০০৭)
  • জাতি ধর্মবর্ণনারীপুরুষ নির্বিশেষে (২০০৭)
  • শিক্ষাথী ও শিক্ষাদাতাদের জয় হোক (২০০৭)
  • বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না (২০০৭) ও স্বাধীনতার দায়ভার (২০০৭)৷

পুরস্কার[উৎস সম্পাদনা]

  • বাংলা একাডেমী পুরস্কার, (১৯৮৪)
  • একুশে পদক, (২০০৭)
  • দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার
  • দক্ষ প্রশাসক পুরস্কার, (১৯৯৬)
  • ইব্রাহিম মেমোরিয়াল পুরস্কার
  • অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার
  • হিউম্যান ডিগনিটি সোসাইটি থেকে সরোজিনী নাইডু পুরস্কার
  • বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার, (২০০৫)
  • স্পেশাল কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান রাইটস পুরস্কার

তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির একজন ফেলো ও লিঙ্ক'স ইন এর বেঞ্চার।

তথ্যসূত্র[উৎস সম্পাদনা]

  1. http://alokito-chapainawabganj.com/specialperson/%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF/
  2. বর্তমানের সহযোগী অধ্যাপক
  3. বিডিনিউজ ২৪ ডট কম
  4. বাংলানিউজ ২৪ ডট কম
  5. দৈনিক প্রথম আলো

বহিঃসংযোগ[উৎস সম্পাদনা]