মেঘনাদ সাহা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মেঘনাথ সাহা
Dr-Meghnad-Saha.jpg
মেঘনাথ সাহা
জন্ম(১৮৯৩-১০-০৬)৬ অক্টোবর ১৮৯৩
শ্যাওড়াতলী, ঢাকা, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬(1956-02-16) (বয়স ৬২)
দিল্লি, ভারত
বাসস্থানভারত
জাতীয়তাভারতীয়
কর্মক্ষেত্রপদার্থবিদ্যা এবং গণিত
প্রতিষ্ঠানএলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন
ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স
প্রাক্তন ছাত্রঢাকা কলেজ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষায়তনিক উপদেষ্টারাজগদীশ চন্দ্র বসু
প্রফুল্ল চন্দ্র রায়
পিএইচডি ছাত্ররাদৌলত সিং কোঠারি
পরিচিতির কারণথার্মাল আয়ানসেশন
সাহা আয়নিজেশন ইকুয়েশন
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারফেলো অফ দ্যা রয়্যাল সোসায়িটি

মেঘনাদ সাহা FRS (অক্টোবর ৬, ১৮৯৩ফেব্রুয়ারি ১৬, ১৯৫৬) ছিলেন একজন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী যিনি পদার্থবিজ্ঞানে থার্মাল আয়নাইজেসন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিখ্যাত। তার আবিষ্কৃত সাহা আয়োনাইজেসন সমীকরণ নক্ষত্রের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মাবলী ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়।

শৈশব ও শিক্ষা[সম্পাদনা]

প্রাথমিক শিক্ষা[সম্পাদনা]

বার্লিনে তরুণ মেঘনাদ সাহা।

মেঘনাদ সাহার জন্ম ০৬ অক্টোবর ১৮৯৩ খ্রিঃ গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার শেওড়াপাড়া গ্রামে। তার পিতার নাম জগন্নাথ সাহা ও মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী।[১] মেঘনাদ তাদের পঞ্চম সন্তান ছিল। জগন্নাথ সাহা ছিলেন একজন মুদি। ছোট বেলা থেকেই তাই টানাটানির সংসারে তাকে মানুষ হতে হয়েছিল। গ্রামের টোলে মেঘনাদের পড়ালেখার সূচনা হয়। গ্রামটিতে তৃতীয় শ্রেণির উপরে পড়ালেখার কোনো স্কুল ছিল না। কিন্তু মেঘনাদের ইতিহাস আর গণিতের সাফল্যে তাঁর শিক্ষকেরা তাঁকে একটি ইংরেজি স্কুলে পাঠানোর সুপারিশ করেন।

তাদের গ্রাম থেকে কাছের মিডল স্কুল (ব্রিটিশ আমলে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পড়ার স্কুল) ১০ মাইল দূরে শিমুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ছিল। এত দূরে প্রতিদিন যাওয়া আসা করে মেঘনাদের পক্ষে পড়াশুনা করা দুরূহ হওয়ার পাশাপাশি মেঘনাদের বাবার পক্ষেও আর্থিক সামর্থ্য ছিল না, শিমুলিয়া গ্রামে মেঘনাদকে রেখে পড়ানোর। তখন মেঘনাদের বড় ভাই এবং পাটকল কর্মী জয়নাথ শিমুলিয়া গ্রামের চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসকে মেঘনাদের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করায়, তিনি রাজি হন। তবে শর্ত হিসেবে মেঘনাদকে তার থালাবাসন নিজেই ধৌত করতে বলেন, পাশাপাশি বাড়ির গরুর দেখভালের দায়িত্ব মেঘনাদের উপর চাপিয়ে দেন। সেসময় প্রতি রবিবার তিনি হেঁটেহেঁটে শিমুলিয়া গ্রাম থেকে শেওড়াতলী গ্রামে সকালে গিয়ে, সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন।

তিনি প্রাথমিক পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। সেসময় মাসিক ৪ টাকার সরকারী বৃত্তি পান, বৃত্তির টাকা ও জয়নাথের পাঠানো পাঁচ টাকা নিয়ে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তির উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন এবং ভর্তি হন। এরপর বৈশ্য সমিতির মাসিক দুই টাকা বৃত্তিও তিনি পান।

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা[সম্পাদনা]

সেসময়টিতে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পূর্ব বাংলার গভর্নর স্যার বামফিল্ড ফুলার আসবেন শুনে বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তার সম্মুখে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী মিছিল করবে নির্ধারণ করে। সে মিছিলে মেঘনাদও ছিলেন। ফলে পরদিন তাকে স্বদেশী আন্দোলন এ জড়িত থাকার জন্য ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ছাড়তে বাধ্য করা হয়।[২] পাশাপাশি তার সরকারী বৃত্তিও বাতিল করা হয়। পার্শ্ববর্তী কিশোরীলাল জুবিলি হাই স্কুলের একজন শিক্ষক স্বঃপ্রণোদিত হয়ে মেঘনাদকে তাদের স্কুলে ভর্তি বিনাবেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যয়ন করেন। সহপাঠি হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও উপরের শ্রেণির প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবিশ, আচার্য হিসেবে জগদীশ চন্দ্র বসুআচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯১৩ সালে গণিতে সম্মানসহ বিএসসি করেন এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম হন।

পেশা[সম্পাদনা]

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিজ্ঞান কলেজ চালু করার পর সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ উভয়েই গণিত বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে দুজনেই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে চলে যান। সেখানে চন্দ্রশেখর ভেক্টরামণ পালিত অধ্যাপক হিসেবে পরবর্তীতে যোগ দেন। দুইবছর ধরে দেশের বাইরে গবেষণা করার পর মেঘমাদ সাহা ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো বরাদ্দ সেসময় না থাকায় তিনি ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। এবিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিতবিদ অমীয় চরন ব্যানার্জি এর সান্নিধ্য লাভ করেন। এরপর তিনি মারা যাবার আগে অব্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হিসেবে দ্বায়িত্বপালন করেছেন। ধর্মীয় মতাদর্শে তিনি ছিলেন নাস্তিক[৩][৪]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

মেঘনাদ এবং সত্যেন বোস যুগ্নভাবে সর্বপ্রথম আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সহ তার বিভিন্ন নিবন্ধ ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। মেঘনাদ তার সমস্ত গবেষণা ফলাফল গুলো একত্র করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রির জন্য আবেদন করেন। তার সব গবেষণা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯১৯ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করে। একইবছর মেঘনাদ প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। যার ফলে তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে গবেষণার সুযোগ পান। তিনি প্রথম পাচঁ মাস লণ্ডনে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলারের পরীক্ষাগারে এবং পরবর্তীতে বার্লিনে ওয়াস্টার নার্নস্টের সাথে কাজ করেন। ১৯২১ সালে দেশে ফিরে প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। ১৫ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি বিভাগটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন।

  • ১৯২৭ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি এর ফেলো হন।
  • ১৯৩১ সালে এলাহাবাদে উত্তর প্রদেশ একাডেমী অব সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন, পরের বছর থেকে এ সংগঠনের নামকরণ করা হয় ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স, ইন্ডিয়া। তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতাকালীন সভাপতি।
  • ১৯৩৩ সালে সূচনা করেন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের সংগঠন ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি। এখান থেকে প্রকাশিত হতে থাকে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্স সাময়িকী।
  • ১৯৩৪ সালে ২১ তম অধিবেশনে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস সংস্থা এর সভাপতি হন।
  • তার উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব সায়েন্স যা ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অব টেকনোলজি নামে বর্তমানে পরিচিত।
  • ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্সটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স যা বর্তমানে সাহা ইন্সটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নামে পরিচিত।
  • ১৯৫২ সালে ভারতীয় লোকসভার নির্বাচনে উত্তর পশ্চিম কলকাতা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সাংসদ হন।

গবেষণা[সম্পাদনা]

মেঘনাদ সাহার মূর্তি, রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজ

মেঘনাদ সাহা পরমাণু বিজ্ঞান, আয়ন মণ্ডল, পঞ্জিকা সংস্কার, বন্যা প্রতিরোধ ও নদী পরিকল্পনা বিষয়ে গবেষণা করেন। তাপীয় আয়নবাদ (Thermal Ionaisation) সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবন করে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মেঘনাদ সাহা সম্পর্কে আলবার্ট আইনস্টাইনের উক্তি[৫]:

মেঘনাদ সাহা এর নোবেল না পাওয়া[সম্পাদনা]

১৯৩০ সালে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী দেবেন্দ্র মোহন বসু এবং শিশির কুমার মিত্র পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার এর জন্য মনোনীত করেন। নোবেল কমিটি মেঘনাদ সাহা এর কাজকে একটি পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্ল্যেখযোগ্য প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এটি "আবিস্কার" না বলে তাকে নোবেল সে নোবেল পুরষ্কার পাননি। মেঘনাদ সাহা কে, ১৯৩৭ সালে এবং ১৯৪০ সালে আর্থার কম্পটন এবং ১৯৩৯, ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে Sisir Kumar Mitra আবারো মনোনীত করলেও নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।[৬]

রচিত গ্রন্থাবলী[সম্পাদনা]

  • The Principle of Relativity
  • Treatise on Heat
  • Treatise on Modern Physics
  • Junior Textbook of Heat with Metereology

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি কার্ডিয়াক এরেস্ট এ মারা যান। এসম তিনি তার কর্মস্থল ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভবনের এর প্লানিং কমিশনের দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় পরে যান। হাসপাতালে নেবার পর স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে মারা যান। রিপোর্টে বলা হয় তিনি মারা যাবার ১০ মাস আগে থেকে উচ্চরক্ত চাপ জনিত সমস্যা ভুগছিলেন।[৭] তাকে পরের দিন কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশান এ দাহ করা হয়।[৮]

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. মুনির হাসান (নভেম্বর ২০১৮)। আব্দুল, কাইয়ুম, সম্পাদক। "মেঘনাদ সাহার অন্য ভুবন"। বিজ্ঞানচিন্তা। বর্ষ ৩: ২৭-২৯। 
  2. Madhumita Mazumdar and Masud Hasan Chowdhury (২০১২), "Saha, Meghnad", Sirajul Islam and Ahmed A. Jamal, Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ), Asiatic Society of Bangladesh 
  3. Santimay Chatterjee, Enakshi Chatterjee (১৯৮৪)। Meghnad Saha, scientist with a vision। National Book Trust, India। পৃষ্ঠা 5। Even though he later came to be known as an atheist, Saha was well-versed in all religious texts— though his interest in them was purely academic. 
  4. Robert S. Anderson (২০১০)। Nucleus and Nation: Scientists, International Networks, and Power in India। University of Chicago Press। পৃষ্ঠা 602। আইএসবিএন 9780226019758a self-described atheist, saha loved swimming in the river and his devout wife loved the sanctity of the spot. swimming and walking were among the few things they could do together. 
  5. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, দ্বিতীয় সংস্করণ আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৩৫১০-১
  6. Rajinder Singh, Nobel Prize Nominator Sisir Kumar Mitra - His scientific work in international context, Shaker Publisher Aachen 2016, pp. 107-132. http://www.shaker.de/de/content/catalogue/index.asp?lang=de&ID=8&ISBN=978-3-8440-2654-2
  7. "Nation Mourns Meghnad Saha"। The Indian Express। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬। পৃষ্ঠা 1, 7। 
  8. "Saha's Remains Cremated"। The Indian Express। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬। 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]