বেলুড় মঠ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বেলুড় মঠ
Ramakrishna Belur Math, Howrah.jpg
নাম বেলুড় মঠ
স্রষ্টা রামকৃষ্ণ মিশন
নির্মাণকাল ১৮৯৮
প্রধান দেবতা রামকৃষ্ণ পরমহংস
স্থাপত্য হিন্দু, ইসলামিক, বৌদ্ধ, রাজপুতখ্রিস্টান স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ
স্থান বেলুড়, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

বেলুড় মঠ রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কার্যালয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে হাওড়া শহরের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত বেলুড়ে গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে এই মঠ অবস্থিত। মঠের রামকৃষ্ণ মন্দিরটির স্থাপত্যে হিন্দু, ইসলামখ্রিস্টীয় ধর্মচেতনার সংমিশ্রণ লক্ষিত হয়।[১]

৪০ একর জমির উপর অবস্থিত মূল মঠপ্রাঙ্গনে রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবশেষের উপর অবস্থিত মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনের সদর কার্যালয় অবস্থিত। এছাড়াও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ইতিহাসকে তুলে ধরার লক্ষ্যে একটি সংগ্রহশালাও এখানে স্থাপিত হয়েছে। বেলুড় মঠ-সন্নিহিত একটি প্রাঙ্গনে গড়ে উঠেছে রামকৃষ্ণ মিশন অনুমোদিত বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র।[২] স্বামী বিবেকানন্দের পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে মন্দিরের নকশা নির্মাণ করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের অপর সাক্ষাতশিষ্য স্বামী বিজ্ঞানানন্দ। বেলুড় মঠ ভারতের একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ এবং ভক্তদের নিকট একটি পবিত্র তীর্থ।

বেলুড় মঠ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, নারীকল্যাণ, শ্রমিক ও অনগ্রসর শ্রেণীর স্বার্থে গ্রামোন্নয়ন, ত্রাণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।[৩] রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ও প্রয়াণতিথি, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বড়দিন উৎসব উদযাপন করে এই কেন্দ্র। দুর্গাপূজা, বিশেষত মহাষ্টমীর কুমারীপূজা দেখতে এখানে প্রতি বছর প্রচুর জনসমাগম হয়।[৪]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বেলুড় মঠের মূল মন্দিরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের মর্মরমূর্তি

১৮৯৭ সালে পাশ্চাত্য থেকে কয়েকজন অনুগামী সংগ্রহ করে কলম্বো প্রত্যাবর্তন করেন স্বামী বিবেকানন্দ। এরপর ভারতে ফিরেই তিনি দুটি মঠের গোড়াপত্তন করেন। একটি আলমোড়ার নিকট হিমালয়ে অবস্থিত মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম ও অপরটি কলকাতার সন্নিকটস্থ বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশন[৫][৬] এই মঠদুটি স্থাপনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রামকৃষ্ণ মিশনে যোগদানে ইচ্ছুক যুবকদের গ্রহণ ও প্রশিক্ষণ এবং তাদের মিশনের কাজকর্মের উপযুক্ত করে তোলা। এই বছরেই দুর্ভিক্ষের সময় জনসেবার মাধ্যমে মিশনের কাজের সূচনা হয়।[৬]

বিশ্বধর্ম মহাসভায় ভাষণদানের আগে পরিব্রাজক জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যটন করেছিলেন। এই সময় তাজমহল, ফতেপুর সিক্রি, দেওয়ান-ই-খাস, রাজপুতানার প্রাসাদ এবং মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরগুলি দর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্রইউরোপ ভ্রমণকালে সেই অঞ্চলের আধুনিক, মধ্যযুগীয়, গথিক ও রেনেসাঁ স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যগুলিও অবগত হন। কথিত আছে, এই সকল স্থাপত্যের সংমিশ্রণে স্বামী বিবেকানন্দই বেলুড় মঠ স্থাপত্যের পূর্বপরিকল্পনা রচনা করেছিলেন।.[৭]

স্বামী বিবেকানন্দের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর সন্ন্যাসী-ভ্রাতা ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের অপর সাক্ষাতশিষ্য স্বামী বিজ্ঞানানন্দ মন্দিরের নকশা প্রস্তুত করেন। বিজ্ঞানানন্দ পূর্বাশ্রমে ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ১৬ মার্চ, ১৯৩৫ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। মার্টিন বার্ন অ্যান্ড কোম্পানি এই বিরাট মন্দিরটি নির্মাণ করেন। রামকৃষ্ণ মিশন এই মন্দিরের বর্ণনা দেন “স্থাপত্যের ঐকতান” রূপে।[৮]

স্থাপত্য[সম্পাদনা]

আধুনিক ধর্মস্থান বেলুড় মঠ মন্দির, মসজিদগির্জার স্থাপত্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণে নির্মিত।[৯] রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের বিশ্বাস অনুসারে বিশ্বধর্মের আদর্শকে তুলে ধরার জন্য একাধিক ধর্মের স্থাপত্য ও প্রতীকতত্ত্ব থেকে মন্দিরের এই স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সংকলিত হয়েছে।[১০][১১] ধর্মের রূপতাত্ত্বিক দিকটিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই মন্দির।[১০]

মন্দিরের মূল প্রবেশপথটি বৌদ্ধ আদর্শে নির্মিত। মূল প্রবেশপথের উপরের অংশটি উচ্চ স্তম্ভযুক্ত দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের আদর্শে নির্মিত। মন্দিরের ভিতরের জানালা ও অলিন্দ উত্তর ভারতের রাজপুত ও মুঘল স্থাপত্যের আদর্শে তৈরি। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যের নিদর্শন। আবার ভিতরের মেঝেটি কতটা খ্রিস্টান ক্রসের আকারে বিন্যস্ত।[১০]

মঠ প্রাঙ্গন[সম্পাদনা]

বেলুড় মঠের অভ্যন্তরে দ্রষ্টব্য স্থানগুলি হল শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির, পুরনো ঠাকুরঘর, স্বামী বিবেকানন্দের বাসকক্ষ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ মন্দির, শ্রীমা সারদাদেবী মন্দির, স্বামী বিবেকানন্দ মন্দির, সমাধি পীঠ, পুরনো মঠ, রামকৃষ্ণ মিউজিয়াম ইত্যাদি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহিরাগত দর্শক ও পূণ্যার্থীদের দর্শনের নিমিত্ত মঠ ও মন্দিরের দ্বার খোলা রাখা হয়। দেশ ও বিদেশ থেকে বহু মানুষ প্রতিদিন এই মন্দিরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন।

রামকৃষ্ণ সংগ্রহালয়[সম্পাদনা]

দ্বিতল রামকৃষ্ণ সংগ্রহালয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্য কয়েকজন বিশিষ্ট শিষ্যের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে পাশ্চাত্যে স্বামী বিবেকানন্দ পরিহিত লং কোট, ভগিনী নিবেদিতার টেবিল, ও মিসেস সেভিয়ারের একটি অর্গান।[১২][১৩] সংগ্রহালয়ে রামকৃষ্ণ আন্দোলন ও সমসাময়িক বাংলার ইতিহাস চিত্রের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।[১৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Sarina Singh; Joe Bindloss, Paul Clammer, Janine Eberle। India। পৃ: p.452।  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  2. "Belur Math"। সংগৃহীত 2008-10-10 
  3. Cyrus R. Pangborn। "The Ramakrishna Math and Mission"। Hinduism: New Essays in the History of Religions। পৃ: p.118। 
  4. "Day of anjali & attraction"। The Telegraph। October 7 , 2008। সংগৃহীত 2008-10-10 
  5. By Hendrik Kraemer। World Cultures and World Religions। পৃ: p.151। 
  6. ৬.০ ৬.১ J. N. Farquhar। Modern Religious Movements in India। পৃ: p.202। 
  7. Swami Tattwajnanananda। "prelude"A Symphony in Architecture Ramakrishna Temple Belur Math 
  8. Swami Tattwajnanananda। A Symphony in Architecture Ramakrishna Temple Belur Math 
  9. Pilgrimage Centers of India। পৃ: p.167। 
  10. ১০.০ ১০.১ ১০.২ Open University Course Team। Introduction to the Humanities। পৃ: p.75। 
  11. Pilgrimage Centers of India। পৃ: p.167। "This symbolises the main message of the master that all religions and men are essentially one and united." 
  12. "Oasis of peace"। The Statesman। 01 March, 2005। সংগৃহীত 2009-05-06 
  13. ১৩.০ ১৩.১ Dutta, Indrani (01 April, 2005)। "Evolution of a spiritual movement on display"The Hindu। সংগৃহীত 2009-05-06 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

উইকিভ্রমণে Kolkata সম্পর্কিত ভ্রমণ নির্দেশিকা রয়েছে।