শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
জুলাই ৬, ১৯০১জুন ২৩, ১৯৫৩
Shyamaprosad.jpg

জন্ম তারিখ: জুলাই ৬, ১৯০১
জন্মস্থান: কলকাতা, (ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু তারিখ: ২৩ জুন ১৯৫৩(1953-06-23) (বয়স ৫১)
মৃত্যুস্থান: কাশ্মীর (ভারত)
জীবনকাল: জুলাই ৬, ১৯০১জুন ২৩, ১৯৫৩
আন্দোলন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন
ভারত ছাড় আন্দোলন
প্রধান সংগঠন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
হিন্দু মহাসভা
ভারতীয় জনসঙ্ঘ
পিতামাতা: আশুতোষ মুখোপাধ্যায়(পিতা)

ভারত কেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী (জন্ম জুলাই ৬, ১৯০১- মৃত্যু জুন ২৩, ১৯৫৩) একজন ভারতীয় পন্ডিত ও নেতা। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী প্রথম হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জন সংঘ গঠন করেন। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন। তিনি জওহরলাল নেহেরুর ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন।

শৈশব ও শিক্ষা[সম্পাদনা]

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ১৯০১ সালের ৬ই জুলাই কলকাতায় এক উচ্চ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখার্জী ও মাতা শ্রীমতী যোগমায়া দেবীর কাছ থেকে তিনি কিংবদন্তিতুল্য পাণ্ডিত্য ও ঐকান্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। তাঁরা তাঁকে ‘পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন’-যাপনে অনুপ্রাণিতও করেন। ১৯২১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান দখল করার পর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯২৪ সালে বি.এল পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেন। ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাইস-চ্যান্সেলর পিতাকে শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করেন।

পিতার মত তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (১৯৩৪-১৯৩৮) হন। ১৯৩৭ সালে তদনীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুরোধ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি "বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত" রচনা করে দেওয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ একটির বদলে দুটি গান রচনা করে দেন - "চলো যাই, চলো যাই" ও "শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান"। "চলো যাই, চলো যাই " গানটি গৃহীত হয় এবং ১৯৩৭ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাদিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজে ছাত্রদের দ্বারা প্রথম গীত হয়। ২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত হিসেবে "শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান" গানটি গৃহীত হয়।

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

ড.মুখার্জি ভারত বিভাজনের তীব্র বিরোধী ছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে তিনি বলেন, মুসলিমরা যদি ভারত বর্ষের বিভাজন চায় তবে ভারতের সকল মুসলিমদের উচিত তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া। [১]


ডঃ মুখার্জী ফজলুল হক মন্ত্রীসভায় অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪১ থেকে ২০ নভেম্বর, ১৯৪২ পর্যন্ত কাজ করে যান। এই সময় কাজী নজরুল ইসলাম আর্থিক অনটনের কারণে ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে ডঃ মুখার্জীর শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ডঃ মুখার্জী’র পৈত্রিক বাড়ি মধুপুরে সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা করেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য। কাজী নজরুল ইসলাম মধুপুর থেকে ১৭ জুলাই, ১৯৪২-এ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে একটা চিঠি লেখেন।


শ্রী চরণেষু,

…এই coalition ministry-র একমাত্র আপনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি ও ভালবাসি, আর কাউকে নয়। আমি জানি আমরাই এই ভারতবর্ষকে পূর্ণ স্বাধীন করব। সেদিন বাঙালীর আপনাকে ও সুভাষবাবুকেই সকলের আগে মনে পড়বে-আপনারাই হবেন এদেশের পতাকার নায়ক।

-কাজী নজরুল ইসলাম


১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নেহেরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী শিল্পমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর হিন্দু মহাসভাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।

ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকমটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনার ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত।

১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বেড়ে চলে। হত্যা, লুন্ঠন, নারীর সম্ভ্রমহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল, ১৯৫০ নেহেরু মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হয়েও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা (পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা) ও নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে লোকসভায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ডঃ মুখার্জী। অবশেষে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মৃত্যু হয়। কংগ্রেসের মধ্যে জাতীয়তাবাদী শক্তির ভর কেন্দ্রে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে অনেক চিন্তন ও মন্থন শেষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গুরুজী গোলওয়ালকারের সঙ্গে পরামর্শ ক্রমে নতুন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ভরতীয় জনসংঘ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন লাভ করে।

ডঃ মুখার্জী লোকসভায় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে বিরোধী দলের প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব দান করেন। লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নিজেকে উদাহরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

জনসংঘ ঐ সময় বিধানসভা ভোটে বাংলা প্রদেশে ৮টি আসন ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে। রাজস্থানে জমিদার প্রথা বিলোপ আইনের প্রশ্নে বিধায়করা দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ডঃ মুখার্জী রাজস্থান পরিষদীয় দলের জরুরি বৈঠক ডেকে নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের দায়বদ্ধতার কথা বলেন। ওই সভায় আটজন বিধায়কের মধ্যে মাত্র দু’জন ভৈরব সিং শেখা‍ওয়াত ও জগৎ সিং জালান উপস্থিত ছিলেন। ডঃ মুখার্জী তৎক্ষনাৎ বাকি ছ’জন বিধায়ককে বহিষ্কার করেন। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার স্বীকার করে তিনি নিজের দলকে মাত্র দুই সদদ্যের দলে পরিণত করেন।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে তা তিনি বারবার লোকসভার ভিতরে ও বাইরে ব্যক্ত করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সংবিধানের ৩৭০ ধারায় লেখা হয়। ‘Temporary, Transitional and Special Provision of Article 370’। সংবিধান প্রণেতা সাময়িক, পরিবর্তনমুখী ও বিশেষ কথাগুলির মধ্যে দিয়ে দূরদৃষ্টি প্রতিভাত হয়।

ভারতের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধানের বিশেষ অনুচ্ছেদ ৩৭০ ধারা বিলোপ ও পারমিটরাজ বাতিলের দাবিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কাশ্মীর অভিযান করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ই মে পাঞ্জাবের উধমপুরে শেষ সভা করে কাশ্মীরে প্রবেশের পথে গ্রেফতারি বরণ করেন।


মৃত্যু[সম্পাদনা]

জম্মু-কাশ্মীরের ৩৭০ নং ধারা নিয়ে নেহরু মন্ত্রিসভার সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণপন্থী প্রজা পরিষদ গঠন করে “এক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে আরেকটা প্রজাতন্ত্র থাকতে পারে না” এই দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ই মে[২] শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেপ্তার করে জেলবন্দি করা হলে তিনি বন্দি থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।


তেইশে জুন, ১৯৫৩। গ্রীষ্মের শ্রীনগরে সকাল হতে তখনও বেশ কিছুটা দেরি। হঠাৎ ঠোকা পড়লো উপত্যকার বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ পি এন কোহলির বাড়ির দরজায়। এত ভোরে! হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন কোহলি সাহেবের ছোট মেয়ে কিরণ (পরবর্তীর বিখ্যাত লেখিকা কিরণ নারায়ন)। দরজা খুলতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো দরজার ওপারে দাঁড়ানো নার্স বিদ্যা মলহোত্রা।

“মার দিয়া রে মার দিয়া, বাঙ্গাল কা শের কো মার দিয়া” [‘‘One lion has been killed by Abdullah.’’]

নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না কোহলি সাহেব। সাথে সাথে ফোন করলেন আর্মি ডক্টর মিস্টার রায়কে। ফোনের ওপারে গলা ধরে এল ডাক্তারবাবুর। জানালেন সব শেষ। একটু আগেই রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন উপত্যকায় হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈনের শেষ আশা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

আরও ঘণ্টাখানেক পরের কথা। সবে ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে কলকাতার। ঘড়ির কাঁটায় তখন পৌনে ছ’টা। ৭৭ নং আশুতোষ মুখার্জী রোডের শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক বাড়িতে বেজে উঠলো টেলিফোন। শ্রীনগর থেকে জাস্টিস মুখার্জীর (শ্যামাপ্রসাদের বড়দাদা রমাপ্রসাদ মুখার্জীর ) নামে পার্সোনাল কল। শেষ দেড় মাসে একবারও বাড়িতে ফোন করেননি শ্যামাপ্রসাদ। একে একে তাই সবাই জড়ো হতে শুরু করলো ফোনের কাছে। সবাই একবার কথা বলতে চায় শ্যামাপ্রসাদের সাথে। একতলার ঘরে পুজো করছিলেন বৃদ্ধা যোগমায়া দেবী। তিনিও এলেন ফোনের কাছে – মুখে প্রাণভরা হাসি। নিশ্চয়ই ওরা ছেড়ে দিয়েছে তাঁর আদরের ছেলেকে, ভেবেছিলেন তিনি।

“দাও বাবা, আমি একটু ভোতনের সাথে কথা বলি”

কথা বলা হল না যোগমায়া দেবীর। ফোন রেখে দিলেন জাস্টিস রমাপ্রসাদ। বিস্মিত, স্তম্ভিত, উত্তেজিত, হতবাক। সবাইকে বললেন শরীর ভালো নেই শ্যামাপ্রসাদের। মাকে পাঠিয়ে দিলেন নিচের ঠাকুরঘরে। তারপর একপাশে ডেকে নিয়ে গেলেন ভাই উমাপ্রসাদকে। বললেন ,‘সব শেষ হয়ে গেছে রে’। উপত্যকার বাইরে এই প্রথম খবর এল আর বেঁচে নেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী – সেটাও মৃত্যুর প্রায় দু’ঘণ্টা পর!

কিন্তু কেন মরতে হল শ্যামাপ্রসাদকে! বাহান্ন বছরের প্রাণোচ্ছল এক মানুষ, যে আগের দিনও যথেষ্ট সুস্থ ছিল, কি করে মারা গেল মাত্র এক রাতের মধ্যে! তবে কি এটা স্বাভবিক মৃত্যু নয়? এর পিছনের কি তাহলে লুকিয়ে আছে গুরুতর কোনো চক্রান্ত? বুঝতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে দু’দশক আগের উপত্যকায়।

****

জম্মু-কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের বিরুদ্ধে জনআন্দোলনে তখন উত্তাল উপত্যকার। আশ্চর্যজনকভাবে সেই আন্দোলনের একটা বড় অংশে নেতৃত্ব দিচ্ছিল বছর ছাব্বিশের যে ঝকঝকে যুবক, সে ঠিক আগের বছরই রসায়নে মাস্টার্স করে আলীগড় থেকে পা রেখেছে কাশ্মীরে। যাক, আন্দোলন চলল না বেশিদিন। গুলি আর লাঠির জোরে দমিয়ে দেওয়া হল বিক্ষোভকারীদের। গ্রেপ্তার করা হল সেই 'শিক্ষিত' যুবক শেখ আবদুল্লা আর তাঁর সঙ্গিসাথীদের। তবে ১৯৩১ সালের এই ঘটনায় একটা মারাত্মক বুস্ট পেয়ে গেল আবদুল্লার রাজনৈতিক জীবন। এতদিন জুম্মার নামাজ শেষে লোকজন জুটিয়ে বক্তব্য রেখেছে সে। প্রধান মীরওয়েজ মৌলানা ইউসুফ শাহের ফতোয়া নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছে দিনরাত আর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে লাইব্রেরী শুরু করে চেষ্টা করেছে জনসমর্থন আদায় করতে। আর এখন একটা গ্রেপ্তারি এক ধাক্কায় তাঁকে হিরো করে তুললো উপত্যকার মানুষের চোখে। ফল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯৩২ সালের অক্টোবরে উপত্যকার প্রথম রাজনৈতিক দল ‘মুসলিম কনফারেন্স’, যার প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা স্বয়ং। তবে বেশিদিন নয়। খুব তাড়াতাড়ি মীরওয়েজ মৌলানা ইউসুফ শাহ বুঝলেন তাঁর আদিপত্যে থাবা বসাচ্ছে শেখ। তাই উপত্যকার ধর্মীয় প্রধান শাহ সাহেব তৈরি করলেন নিজের দল। স্বাভাবিক ভাবেই অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আবদুল্লার ‘মুসলিম কনফারেন্স’ হয়ে গেল ‘ন্যাশানাল কনফারেন্স’, ১৯৩৯ সালের মার্চে। আবদুল্লা বুঝেছিলেন দোগড়া রাজা হরি সিংকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করতে গেলে পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লিগের সাথে চললে হবে না। জিন্নার ছায়াতলে তাঁর অস্তিত্ব সঙ্কট অবশ্যম্ভাবী। তাই তিনি ভারতের উদারপন্থী সমাজবাদী নেতা জহরলাল নেহেরুর (বংশসুত্রে নেহেরু ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত) সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করলেন আর নিজের দলের নাম বদলে প্রমান করতে চাইলেন তিনি হিন্দু, শিখ, মুসলিম, বৌদ্ধ সকলের নেতা।

এরপর সাল ১৯৪৪। জমি সংস্কার, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার সমেত একগুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে শেখ সাহেব পেশ করলেন চূড়ান্ত প্রগতিশীল এক ইস্তাহার। নাম ‘নয়া কাশ্মীর’। মুগ্ধ হয়ে গেলেন নেহেরু সমেত কংগ্রেসের একটা বড় অংশের নেতারা। তাই দু’বছর পরেই যখন ‘দোগড়া শাসক কাশ্মীর ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু হল উপত্যকায়, তখন তাতে প্রায় খোলাখুলি সমর্থন জানালেন পণ্ডিতজি। আন্দোলন তীব্রতা পেতেই গ্রেপ্তার করা হল শেখ সাহেবকে। তাতেও প্রতিবাদ করলেন জহরলাল নেহেরু। মনে রাখা দরকার জম্মু-কাশ্মীর তখন এক স্বাধীন রাজ্য। তাই এইসব প্রতিক্রিয়া আবদুল্লার প্রতি নেহেরুর অন্ধ বিশ্বাসেরই ফলশ্রুতি বলে মনে করেন অনেকে।

সাতচল্লিশে স্বাধীন হল দেশ। অধিকাংশ রাজাই নিজেদের পছন্দমতো ভারত বা পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যুক্ত হয়ে গেলেও স্বাধীন থেকে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলেন হরি সিং। বেশিদিন পারলেন না। মারাত্মক চাপ আসতে থাকলো পাকিস্তানের দিক থেকে। প্রথমে বন্ধ করে দেওয়া হল পাকিস্তান হয়ে আসা উপত্যকার সাপ্লাই লাইন আর তারপর বাইশে অক্টোবর অনুপ্রবেশকারীর বেশে জম্মু-কাশ্মীর আক্রমন করে বসলো পাকিস্তান। ইংরেজ সরকারের রক্ষাকবজ চলে গেছিলো আগস্টের পনেরো তারিখেই। তাই বিনা বাধায় মাত্র চারদিনের মধ্যে যখন ‘অনুপ্রবেশকারী’রা চলে এল শ্রীনগরের দোরগোড়ায়, একপ্রকার বাধ্য হয়েই ‘নিঃশর্তভাবে’ আরও ৫৬২ জন দেশীয় রাজার মতো ‘ভারতভুক্তির ঘোষণাপত্রে’ সই করলেন মহারাজা হরি সিং। একশো শতাংশ আইনসম্মতভাবে গোটা জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য হয়ে গেল ভারতবর্ষের অংশ। পরদিনই (২৭.১০.১৯৪৭) ভোরে ভারতীয় সেনা পা রাখল শ্রীনগর বিমানবন্দরে আর তারপর পিছু হঠতে শুরু করলো পাকিস্তানি ‘অনুপ্রবেশকারী’রা। ঠিক এমন সময় যখন একে একে অধিকৃত এলাকা পুনর্দখল করছে ভারতীয় সেনা তখনই সবার আপত্তি অগ্রাহ্য করে আশ্চর্যজনকভাবে কাশ্মীর ইস্যুকে রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিয়ে চলে গেলেন নেহেরু। কিছুদিনের মধ্যেই সিজফায়ার ঘোষণা হল রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফ থেকে আর ভারতীয় সেনা দখলমুক্ত করার আগেই পাকিস্তানের হাতে থেকে গেল মিরপুর, মুজফফরাবাদ সমেত ভারতের একটা বড় অংশ। অদ্ভুত সমাপতন এই যে পুনর্দখল না হওয়া ভারতের ওই অংশে শেখ আবদুল্লার সেরকম প্রভাব ছিলই না। মুসলিম লিগের প্রছন্ন মদতে ওই অংশের অবিসংবাদিত নেতা তখন পূর্বতন মুসলিম কনফারেন্সের চৌধুরী গোলাম আব্বাস-মৌলানা ইউসুফ শাহরা।

এর পরের অবশ্যম্ভাবী ধাপ ছিল মহারাজা হরি সিংয়ের হাত থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শেখ আবদুল্লার হাতে সরানো। প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সমর্থনে সেটাও হল আটচল্লিশের মার্চে। এরপর মহারাজাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করলে একটা লোক দেখানো নির্বাচন দরকার ছিল। ১৯৫১ সালের সে নির্বাচন হল এক মারাত্মক অগনতান্ত্রিক উপায়ে। প্রথমেই নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হল জম্মু-কাশ্মীর সরকারকেই, যার মাথায় তখন শেখ আবদুল্লা নিজে। এরপর ব্যবস্থাপক সভায় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বঞ্ছিত করা হল জম্মু আর লাদাখ অঞ্চলকে। কাশ্মীর উপত্যকায় যেখানে প্রতি ৭৩০০০ জন পিছু একজন করে প্রতিনিধির ব্যবস্থা হল সেখানে জম্মুতে প্রতি ৯০০০০ জনে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হল। কাশ্মীর উপত্যকায় একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও জম্মু আর লাদাখে সেরকম জনপ্রিয়তা ছিল না শেখ আবদুল্লার। তাই ক্ষমতায় থাকা আবদুল্লা সরকার জম্মু প্রজা পরিষদের সমস্ত মনোনয়নই দিল বাতিল করে। লাদাখেও বসানো হল ন্যাশানাল কনফারেন্স মনোনীত প্রতিনিধিদের। ফলে ব্যবস্থাপক সভার পঁচাত্তর জন প্রতিনিধির পঁচাত্তর জনই হলেন আবদুল্লা সাহেবের লোক। যথারীতি এরপর মহারাজা হরি সিংকে নির্বাসনে পাঠাতে কষ্ট করতে হয় নি। এসব কোনো কিছু অজানা থাকার কথা নয় জহরলাল নেহেরুর। কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি চুপ থেকে নিজের প্রছন্ন সমর্থন জানিয়ে গেলেন আবদুল্লাকে।

আর এসবের উর্ধ্বে সম্পূর্ণভাবে নিঃশর্তে ভারতে যোগ দেওয়া কাশ্মীরকে দেওয়া হল এক আশ্চর্য উপহার – ধারা ৩৭০। আলাদা পতাকা, আলাদা সংবিধান, আলাদা প্রধানমন্ত্রী। এ যেন দেশের মধ্যেই আরও একটা অন্য দেশ। প্রতিবাদ করলেন স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকর। তাঁর কথাও শুনলেন না নেহেরু। একগুচ্ছ বিশেষ নিয়মের সাথে সাথে এমন আইন প্রনয়ন করল ভারত সরকার যে অন্য রাজ্যের কাউকে জম্মু-কাশ্মীরে যেতে হলেও সরকারি অনুমতি নিয়ে তবেই যেতে হত। এসবের বিরুদ্ধেই গর্জে উঠলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী।

“এক দেশ মে দো নিশান, দো প্রধান, দো বিধান নাহি চলেগা নাহি চলেগা নাহি চলেগা।”

শ্যামাপ্রসাদ প্রথম নেহেরু মন্ত্রীসভায় শিল্পমন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিরূপে। গোটা মন্ত্রীসভা তথা সংসদের যে দুটো লোককে একটু সমঝে চলতেন জহরলাল তাদের একজন সর্দার প্যাটেল আর অন্যজন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আসলে নেহেরু শর্তহীন আনুগত্য চাইতেন সকলের থেকে। এরা দু’জন নিজেদের মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে রাজনীতি করার পক্ষপাতি ছিলেন না। তাই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের কথা না ভেবে যখন নেহেরু চুক্তি করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলির সাথে, তখন প্রতিবাদে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগই করে দিলেন শ্যামাপ্রসাদ।  পদত্যাগের পর নতুন দল জনসঙ্ঘ আর তারপর মাত্র তিন সদস্য নিয়ে একটা নতুন বিরোধী ব্লক গঠন করে নেহেরুর ভুলগুলো চোখে দেখিয়ে দেওয়া। কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে বরাবরই নেহেরুর নীতির সমালোচক ছিলেন ডঃ মুখার্জী। তিনি বহুবার বলেছিলেন শেখ আবদুল্লা আদতে সেটা নয় যেটা সে দেখাতে চাইছে। জম্মু কাশ্মীরে একাধিপত্য স্থাপন আবদুল্লার উদ্দেশ্য বলে মনে করতেন শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু আবদুল্লার প্রতি নেহেরুর স্নেহ বা ভক্তি তখন দিল্লির দরবারে সর্বজনবিদিত। তাই ধারা ৩৭০, পারমিট প্রথা, আবদুল্লার একনায়কতন্ত্র,নির্বাচনে ব্যাপক রিগিং সহ একাধিক বিষয় এবং জম্মুর প্রজা পরিষদের ক্রমাগত আন্দোলনের পরও যখন চোখ খুললো না জহরলাল নেহেরুর, ১৯৫৩ সালেই নিজেই জম্মু-কাশ্মীর যাওয়ার ব্যাপারে সিধান্ত নিলেন শ্যামাবাবু।


শেষমেশ মে মাসের শুরুর দিকে বেরিয়ে পড়লেন শ্যামাপ্রসাদ। নেহেরুকে আগেই জানিয়েছিলেন পত্র মারফত। সাথে এও জানিয়েছিলেন যে অনুমতিপ্রথার বিরুদ্ধেই তাঁর আন্দোলন হওয়াতে সরকারি অনুমতি তিনি নেবেন না। সারা দেশ উৎসাহিত হয়ে পড়লো এক বাঙালি বাবুর কাশ্মীর যাত্রায়। উৎসাহ এতটাই বেড়ে গেল যে অমৃতসর ষ্টেশনে তাঁকে স্বাগত জানাতেই জমে গেল হাজার কুড়ির ভিড়। এর মধ্যে খবর আসতে লাগলো গ্রেপ্তার করা হবে শ্যামাবাবুকে। প্রত্যাশিত। কিন্তু অমৃতসর ছেড়ে মে মাসের এগারো তারিখ পাঠানকোট পৌঁছে গেলেও গ্রেপ্তারির নামগন্ধ দেখা গেল না। উল্টে পাঠানকোট ষ্টেশনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন গুরুদাসপুরের ডেপুটি কমিশনার। তিনি জানালেন গ্রেপ্তারির কোনো নির্দেশ নেই। তাই নির্দ্বিধায় ‘অল্প কিছু সঙ্গীকে’ নিয়ে তিনি যেতেই পারেন জম্মু-কাশ্মীর। সেই মতো শ্যামাপ্রসাদ এবং তাঁর সঙ্গীরা বিকেল চারটে নাগাদ রাভি সেতুর উপর মাধোপুরা চেকপোস্ট পেরিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে ঢুকলেন। আর প্রবেশ করতেই তাঁকে চিফ সেক্রেটারির পূর্বস্বাক্ষরিত এক আদেশনামা ধরিয়ে গ্রেপ্তার করলেন কাঠুয়ার পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট।   

এগারোই মে গ্রেপ্তারির পর শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর দুই সঙ্গী গুরুদত্ত বৈদ্য এবং টেকচাঁদকে নিয়ে যাওয়া হল শ্রীনগর জেলে। সেখান থেকে নিশাতবাগের এক নির্জন ক্ষুদ্র কুঠিরে। পাহাড়ের ঢালের উপর অবস্থিত সে কুঠিরের বাইরে না ছিল হাঁটা চলার জায়গা আর কুঠিরের ভিতরে না ছিল পা ফেলার জায়গা। কুঠিরের প্রধান কামরার মাপ ছিল দশ বাই বারো ফুট। অন্য ঘর দুটোও এতটাই ছোট ছিল যে উনিশে জুন পণ্ডিত প্রেমনাথ ডোগড়াকে এই নবনির্মিত জেলে নিয়ে এলে তাঁর জন্যে কুঠিরের বাইরে তাঁবু খাটাতে হয়; চতুর্থ খাট ফেলার মতোও জায়গা ছিল না। শুধু তাই নয়। একজন খুনের আসামীর মত তাঁর সাথেও সর্বক্ষণের পুলিশ প্রহরা লাগিয়ে দেওয়া হল এবং কুঠিরের বাইরে সামান্য হাঁটাহাঁটি করারও অনুমতি দেওয়া হল না। এই অবস্থায় তেসরা জুন থেকে তাঁর পায়ে ব্যাথা আরম্ভ হয়। সাথে চোখ-মুখ জ্বালা এবং সন্ধ্যের দিকে জ্বর। বারোই জুন চিঠি মারফত এ খবর কলকাতায় পৌঁছল। রোগীকে না দেখে এটুকু পড়ে বিশেষ কিছু বোঝা যায় না। তাই তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক ডঃ বিধান চন্দ্র রায় চেষ্টা করলেন কাশ্মীরের যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারলেন না।

১৯ তারিখ রাতে বুকের ব্যাথা ও জ্বর খুব বেশ গেল শ্যামাপ্রসাদের। ২০ তারিখ সকাল ১১.৩০ নাগাদ নিশাতবাগের সাব জেলে তাঁকে দেখতে এলেন ডাক্তার আলি মহম্মদ আর ডাক্তার অমরনাথ রায়না। ডাক্তার আলি মহম্মদ জানান কষ্টের কারন প্লুরিসি। বিধানস্বরূপ স্ট্রেপ্টোমাইসিন ইনজেকশন সাজেস্ট করা হল। শ্যামাবাবু জানালেন পেনিসিলিনে অ্যালার্জি সমেত বেশ কিছু অন্য সমস্যার জন্যে তাঁকে এই ধরনের ইনজেকশন নিতে বারন করেছেন ব্যক্তিগত ডাক্তার বিধান রায়। শুনলেন না আলি মহম্মদ। আশ্বস্ত করলেন যে কোনো অসুবিধা হবে না এতে। পরের দিন একুশ তারিখেও অবস্থার উন্নতি হল না। শুধুমাত্র একজন সাব অ্যাসিসটেন্ট সার্জেন ছাড়া কেউ দেখতেও এলেন না তাঁকে। বাইশ তারিখ বেলা দশটা নাগাদ ডঃ মুখার্জীর সাথে দেখা করতে গেলেন তাঁর উকিল ইউ এম ত্রিবেদি। ওনাকে জানানো হল শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শ্যামাপ্রসাদকে নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হবে। কোন নার্সিংহোম সেটা জানানো হল না। একটু পরে ডঃ মুখার্জীর তরুন বন্ধু দেওকি প্রসাদ ত্রিবেদি সাহেবকে জানালেন তাঁকে নিয়ে একটা ছোট্ট জিপ রওনা দিয়েছে এমন এক দিকে যেদিকে কোনো নার্সিংহোমই নেই! বিকেলে ইউ এম ত্রিবেদি কোর্টের কাজ শেষ করে শ্রীনগরের চার-পাঁচটা নার্সিংহোমে খোঁজ করলেন শ্যামাপ্রসাদের। কোথাও পাওয়া গেল না তাঁকে। সন্ধ্যের দিকে জানা গেল ডঃ মুখার্জীকে রাখা হয়েছে সরকারি হাসপাতালের স্ত্রী রোগ সংক্রান্ত ওয়ার্ডের এক নম্বর ঘরে! তিনি তখন অসুস্থ। মুখ ফ্যাকাসে। তবে খাওয়া, রুটিনমাফিক চিঠি পড়া থেকে দরকারি কাগজ ও দুটি চেকলিফে সই করলেন অবলীলায়। ত্রিবেদিকে জানানো হল আশঙ্কার কিছু নেই। ২-৩ দিনে সুস্থ হয়ে যাবেন ভারত কেশরী। অনুরোধ করা হল তাঁর সহবন্দি দুজনকে সঙ্গে থাকতে দেওয়ার। অনুমতি মিলল না।

রাত পৌনে চারটে নাগাদ ত্রিবেদি সাহেবের কাছে খবর এল গুরুতর অসুস্থ শ্যামাপ্রসাদ। অতি দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছলেন উকিলবাবু। পৌঁছে শুনলেন তিনি আসার একটু আগেই, ভোর তিনটে চল্লিশ মিনিটে ইহলোক ছেড়ে ভগবানের দেশে পাড়ি দিয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী।

সেদিন সকাল সাড়ে সাতটার সরকারি খবরে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু সংবাদ শোনানো হল না ঠিকই, তবে বেলা দশটার মধ্যে শহর কলকাতা জেনে গেল এই মর্মান্তিক পরিণতির কথা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অঘোষিত বন্ধের চেহারা নিল কল্লোলিনী। জানা গেল মৃতদেহ নিয়ে ত্রিবেদি সাহেব বিমানে কলকাতা আসছেন দুপুর তিনটে নাগাদ। লাখ লাখ লোকের ভিড় চলল এয়ারপোর্টের দিকে। তিনটে পেরিয়ে চারটে হল, পাঁচটা হল, ছ’টা হল। শেষমেশ রাত ন’টা নাগাদ নিজের মাতৃভূমির মাটি ছুঁল ভারত কেশরীর কফিন। কিন্তু এত দেরি কেন! মিঃ ত্রিবেদি ছিলেন ওই বিশেষ বিমানে। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন ভারত সরকার ইচ্ছা করে বিলম্ব করেছে দিল্লিতে, যাতে রাত আর দেরি হয়ে গেলে উপস্থিত জনতার ভিড় নিজে থেকেই হাল্কা হয়ে যায়। প্রাথমিক সন্দেহের সূত্রপাত এখানেই। তারপর যত ভিতরে যাওয়া যায় ঘটনার, তত প্রশ্ন উঁকি মারতে থাকে মনের গভীরে।

প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে সবাই জানার পরেও এবং গ্রেপ্তারির পূর্বনির্দেশ থাকলে কেন পাঞ্জাবে বিদায় জানিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে ঢুকতে দেওয়া হল তাঁকে? আর কি করেই বা ঢোকার আগেই গ্রেপ্তারির নির্দেশ জারি হয়ে গেল সরকারি মহলে? উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী। ২০০৪ সালে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক কলামে তিনি জানান নেহেরু আর আবদুল্লা সরকারের যোগসাজশের কথা। জানান, অলিখিত নির্দেশ ছিল যে জম্মু-কাশ্মীরে ঢুকতে দেওয়া হবে শ্যামাপ্রসাদকে – কিন্তু বেরোতে দেওয়া হবে না। হয়তো তাই জাতীয় স্তরের এক প্রথম সারির নেতা তথা স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রীকে থাকার জন্যে দেওয়া হয়েছিল এক ছোট্ট কুঠির! নেহেরু পরবর্তীতে জানাবেন যে তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীর জন্য সমস্ত সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছিল আবদুল্লা সরকার – বাস্তবে যা ডাহা মিথ্যে বলে ঐতিহাসিকদের মত। এমনকি ডঃ মুখার্জী বন্দি থাকাকালিন উপত্যকায় ‘হাওয়া বদলাতে’ গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তবু তিনি একবার দেখা করার সৌজন্য দেখান নি মন্ত্রীসভার তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীর সাথে। কেন করেন নি সে প্রশ্নও গৌণ হয়ে যায় যখন শ্যামাপ্রসাদের বাড়ির লোকজনকে শ্রীনগর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় ওনার সাথে দেখা করতে না দিয়েই! অবাক করা তথ্য হল এগারোই মে ডঃ মুখার্জী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরকারি তরফে মুখার্জী বাড়িতে প্রথম ফোন আসে একেবারে মৃত্যুসংবাদ বয়ে নিয়ে। মাঝে বেশ কয়েকবার তিনি অসুস্থ হলেও তাঁর বাড়ির লোককে জানানো দূর অস্ত, তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক তথা তৎকালীন ভারতের অন্যতম বিখ্যাত রাজনেতা বিধান চন্দ্র রায়ের সাথেও কথা বলেনি সরকার – শ্যামাপ্রসাদের তরফে বহুবার অনুরোধ সত্ত্বেও। তাই প্রশ্ন জাগে পেনিসিলিনে অ্যালার্জি সত্ত্বেও দেওয়া স্ট্রেপ্টোমাইসিন ইনজেকশনটাই কি তাঁকে ঠেলে দিল মৃত্যুমুখে। ডাক্তারি মতে অ্যানাফিলেক্সিসের (স্ট্রেপ্টোমাইসিনের অ্যালার্জি) চিকিৎসা খুব জটিল নয়, যদি না চূড়ান্ত অবজ্ঞা করা হয় রোগীকে। সরকারি হাসপাতালের স্ত্রী রোগ বিভাগে ভর্তি করা কি সেই অবজ্ঞারই একটা লক্ষন? দুই সহবন্দিকে সঙ্গে থাকতে না দেওয়াটা কি আসলে পূর্বপরিকল্পিত? উত্তরের খোঁজ নেই। যেমন খোঁজ নেই শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি এবং একাধিক চিঠিপত্রের। জানা যায় বন্দি থাকা অবস্থায় নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন শ্যামাপ্রসাদ। সেটার আর খোঁজ মেলেনি। যেমন খোঁজ মেলেনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চিঠির। মৃত্যুর পর এমন বেশ কয়েকটা চিঠি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে, যার অনেকগুলোই অনেক পুরনো তারিখের। মাঝের একাধিক তারিখের চিঠির সন্ধান নেই। ডায়েরির সন্ধান দিতে না পারলেও নেহেরু পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন যে আবহাওয়া জনিত কারনে অনিয়মিত বিমান পরিবহনই চিঠি পৌঁছোনর দেরির কারন। তবে ঘটনা হল ওই দেড় মাসে দিল্লি-শ্রীনগর রুটে একটাও অনিয়মিত বিমান পরিষেবার অভিযোগ মেলে না বিমান সংস্থার তরফে। অন্যদিকে চিঠি ছাড়াও বেশ কিছু টেলিগ্রাম পাঠাতে দিয়েছিলেন ডঃ মুখোপাধ্যায়। যার অধিকাংশই নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠানো হয় নি বলে অভিযোগ।

এরকম অভিযোগের পাহাড় জমতে শুরু করলে বৃদ্ধ মা চিঠি লেখেন প্রধানমন্ত্রীকে। দাবি করেন যথাযথ তদন্তের। তদন্ত তো হয়ই নি, উল্টে নেহেরু জানান তিনি সঠিক লোকের থেকে ‘খবর নিয়েছেন’ যে মৃত্যু একেবারে স্বাভাবিক - তাই তদন্তের প্রয়োজন নেই।

বলা হয় শাস্ত্রী আর শ্যমাপ্রসাদের ‘মৃত্যু’ স্বাধীন ভারতের দুই ‘মহান’ কলঙ্ক। মিথ্যে নয়। শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর পর কেটে গেছে ছেষট্টিটা বছর। মাঝে সরকার এসেছে গেছে। এমনকি তাঁর প্রতিষ্ঠা করা দলের উত্তরসূরি আজ মহিরুহ। তবু বিচার মেলেনি ডঃ শ্যমাপ্রসাদের। শ্রীনগরের সেই রহস্যময় সকাল আজও প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয় বছর বছর।


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Legislative Council Proceedings [BLCP], 1941, Vol. LIX, No. 6, p 216
  2. http://books.google.co.in/books?id=Ye3VUMLhaz8C&pg=PA49&dq=Syama+prasad+mukherjee+arrested+in+kashmir+by+nehru&hl=en&ei=lTlwTov0BsjorQeJzfXnBg&sa=X&oi=book_result&ct=result&resnum=5&ved=0CD4Q6AEwBA#v=onepage&q=arrested%20kashmir&f=false