সৎসঙ্গ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সৎসঙ্গ
Logo of Satsang.jpg
প্রতীকচিহ্ন
নীতিবাক্য"দাদাতু জীবনবৃদ্ধি নিরন্তরং স্মৃতি চিদযুতে" — "আমাকে প্রতিনিয়ত চেতনাবাহী স্মৃতিযুক্ত জীবন দান করো"
গঠিত১৯২৯ (৯০ বছর আগে) (1929)
প্রতিষ্ঠাতাশ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র
ধরণধর্মীয় সংগঠন
আইনি অবস্থাপ্রতিষ্ঠান
উদ্দেশ্যশিক্ষাবিস্তার, মানবসেবা, ধর্মীয় গবেষণা, আধ্যাত্মিকতা
সদর দপ্তরসৎসঙ্গ নগর, দেওঘর, ঝাড়খন্ড, ভারত
অবস্থান
  • বিশ্বব্যাপী
এলাকাগত সেবা
বিশ্বব্যাপী
প্রধান আচার্য্যদেব
শ্রীশ্রীঅশোক চক্রবর্তী
ওয়েবসাইটwww.satsang.org.in
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

সৎসঙ্গ হচ্ছে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র কর্তৃক প্রবর্তিত একটি ধর্মীয় আন্দোলন। এর আদর্শ হচ্ছে - ধর্ম কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয় বরং বিজ্ঞানসিদ্ধ জীবন সূত্র;[১] ভালোবাসাই মহামূল্য, যা দিয়ে শান্তি কেনা যায়।[২]

বর্তমানে ‘সৎসঙ্গ’-এর নূন্যধিক পাঁচ সহস্র কেন্দ্র রয়েছে; এইগুলি সৎসঙ্গ বিহার, সৎসঙ্গ অধিবেশন কেন্দ্র, সৎসঙ্গ উপাসনা কেন্দ্র, সৎসঙ্গ মন্দির, ঠাকুরবাড়ি প্রভৃতি নামে বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত। ভারতবর্ষ ছাড়াও বাংলাদেশ, নেপাল, ব্রহ্মদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমিরিকাতেও ছড়িয়ে আছে কেন্দ্রগুলো। ‘সৎ’-এ সংযুক্তির সহিত তৎগতি সম্পন্ন যারা-তাদের মিলনক্ষেত্র। ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত প্রদেশে গড়ে উঠেছে ‘সৎসঙ্গ বিহার’। চার মহানগরেই ‘সৎসঙ্গ বিহার’ স্থাপিত হয়েছে।[৩]

পরিচ্ছেদসমূহ

মূলনীতি[সম্পাদনা]

এ সংগঠনের পাঁচটি মূলনীতি[২] হচ্ছেঃ যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী এবং সদাচার।

মূলস্তম্ভ[সম্পাদনা]

শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সুবিবাহ।[২]

উদ্দেশ্য[সম্পাদনা]

‘সৎসঙ্গ’-এর উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সৎসঙ্গ কখনো সম্প্রদায়ে বিশ্বাস করে না। ধর্ম কখনও বহু হয় না-ধর্ম এক। সপারিপার্শ্বিক জীবন-বৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলাই ধর্মের প্রধান লক্ষ্য। ধর্ম মূর্ত্ত হয় আদর্শে এবং শ্রীশ্রীঠাকুর হলেন ধর্মের মূর্ত্ত আদর্শ। তিনি কোন সম্প্রদায়-বিশেষের নন, বরং সব সম্প্রদায়ই তার। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন-“একজন মানুষের বিনিময়ে আমি একটি সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু একজন মানুষকে ছাড়তে পারি না।”[৪]

নীতিবাক্য[সম্পাদনা]

'সৎসঙ্গ' এর নীতিবাক্য হচ্ছে: "দাদাতু জীবনবৃদ্ধি নিরন্তরং স্মৃতি চিদযুতে"; এর অর্থ হলোঃ "আমাকে প্রতিনিয়ত চেতনাবাহী স্মৃতিযুক্ত জীবন দান করো"।

কর্মধারা[সম্পাদনা]

দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম[সম্পাদনা]

ভারতের ও বহির্ভারতের সৎসঙ্গ সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডের প্রধান নির্দেশনা মূলত এই আশ্রম থেকেই আসে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র তাঁর নরলীলার ৫৯ বছর বয়সে এখানে এসেছিলেন এবং ২৩ বৎসর এই আশ্রমেই কাটিয়েছিলেন। “দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম” ঝাড়খন্ডের সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত বৈদ্যনাথ পীঠস্থানের সংলগ্ন দেওঘরে অবস্থিত। যসিডি রেলস্টেশনের পর শাখা স্টেশন বৈদ্যনাথ ধাম। সেখান থেকে মাইল কয়েক এগিয়ে গেলেই দেওঘর আর সেখানেই অবস্থিত দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম। [৫]

অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ[সম্পাদনা]

দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম এলাকার পরিবেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। গেরুয়া রংয়ের মাটির বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। শাল, তাল, আম, জাম, হরিতকী প্রভৃতি শ্যামালিমা, অদূরে পাহাড়। অল্প দূরেই কর্মনাশা নদী। গঙ্গা চলে গেছে প্রায় বিশ ক্রোশ উত্তর দিয়ে পূর্বে। বৈদ্যনাথ ধাম পীঠস্থানের বিখ্যাত বৈদ্যনাথ ও পাবর্তী মন্দির ছাড়াও বহু দেব-দেবীর মন্দির রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। তাছাড়া রয়েছে রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠ আর অল্প দূরেই শ্রীশ্রী বালানন্দ স্বামীর আশ্রম! [৫]

দেওঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরের শুভ আগমন[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালে শ্রীশ্রীঠাকুরের ৬৭টি তম জন্মজয়ন্তি উৎসব হওয়ার পরে শ্রীশ্রীঠাকুর হঠাৎ ঘোষণা করলেন তিনি পশ্চিমে যাবেন। বিহারের ভূমিতেই প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীঠাকুরের গুরু সরকার সাহেবের ‘গাজীপুর সৎসঙ্গ আশ্রম’। সরকার সাহেবের পর সন্তমত প্রচারের শক্তিমান সন্ত আর কেউ ছিলেন না বিহার বা যুক্ত প্রদেশে।কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো হিমায়েতপুর সৎসঙ্গ আশ্রম ছেড়ে শ্রীশ্রীঠাকুর যাত্রা করলেন দেওঘরের উদ্দেশ্যে।[৫] ৩০শে আগস্ট, ১৯৪৬ ইংরেজি সালে শ্রীশ্রীঠাকুর বৈদ্যনাথধাম পর্যন্ত রেলগাড়ির বগি রিজার্ভ করার জন্য মার্কিন ভক্ত নরম্যান ডি ফেন, ভোলানাথ সরকার ও রাজেন্দ্রনাথ মজুমদারকে বলেন। সেই সঙ্গে শ্রীশ্রীঠাকুর সুশীলচন্দ্র বসু ও বীরেন্দ্রলাল মিত্রকে দেওঘরে একটি খুব বড় বাড়ি ভাড়া করতে বললেন। রোহিনী রোডস্থিত বড়াল-বাংলো নামে সুবৃহৎ বাড়িটি ঠিক করা হয়েছিল। (দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৩৫) ১৯৪৬ এর ১লা সেপ্টেম্বর শ্রীশ্রীঠাকুর পরিবার ও কতিপয় ভক্তসহ রওনা হন দেওঘর অভিমুখে। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২রা সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় মায়াতীতের মত নিজ জন্মভূমি ও দীর্ঘ ৫৮ বছরের লীলাভূমি পেছনে ফেলে শ্রীশ্রীঠাকুর উপনীত হলেন দেওঘরের বড়াল-বাংলোতে।[৬]

আশ্রমের শুরুর ইতিহাস[সম্পাদনা]

পরম প্রেমময় শ্রীশ্রীঠকুর দেওঘরে আসার পর এখানেও (সৎসঙ্গ আশ্রম দেওঘর) তাঁকে ঘিরে রচিত হয় অমৃতলোভা মধুচক্র। তাঁকে দর্শন করতে, তাঁর সান্নিধ্য পেতে, তাঁর আদর্শবাদ জানতে ও বুঝতে জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের নানা মানুষ আসতে থাকেন। [৭] নিত্য আসতে লাগল দর্শকÑসাধু, সুধী, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ। নানাজনে নানা জিজ্ঞাসা নিয়ে এসে সমাধান পেতে লাগল শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে থেকে। দেশে বিদেশে পাঠানো হলো ঋত্বিক। লক্ষ লক্ষ বেড়ে গেল সৎসঙ্গী। আমেরিকা থেকে হাবার্ট বিশ^বিদ্যালয়ের ডক্টরেট উপাধিপ্রাপ্ত হাউজ্যারম্যান, স্পেনর্স, ল্যুটস্ম্যান প্রমুখ কতিপয় পাশ্চাত্য পন্ডিত শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে রয়ে গেলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের স্থায়ী পার্ষদ রূপে আশ্রমে। দশ-বারোটি বছরের মধ্যেই বিশ^ব্যাপী আদর্শ মানবধর্ম প্রচারের কেন্দ্র রূপে এক আন্তর্জাতিক পীঠস্থানের রূপ গ্রহণ করল দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম।। [৮] দেওঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরের উত্তর-লীলার ২৩ বছরে বিভিন্ন সময়ে দেশের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে যারা আসেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑলালবাহাদুর শাস্ত্রী, অনন্ত শায়নম্, আয়েঙ্গার, গুলজারিলাল নন্দ, ডি. আলগেসান্, পন্ডিত বিনোদানন্দ ঝা প্রমুখ।[৯] অল্পদিনের ভেতরেই বিহার (ঝাড়খন্ড) হয়ে উঠল সমগ্র ভারতের ধ্যানকেন্দ্র। দেশের নানাপ্রান্ত হতে দর্শণার্থীর ভীড় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। পাবনার মতো এখানেও বহু কর্ম প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল। সরকার পক্ষ সৎসঙ্গী-পরিবৃত এলাকাটির নাম রাখেন ‘সৎসঙ্গ নগর’। সেখানে ডাকঘর ও ব্যাঙ্কের শাখাও খোলা হয়। অচিরেই দেওঘরের সৎসঙ্গ নগর ভক্ত ও ভগবানের মিলন তীর্থে পরিণত হলো। (দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৩৮) শতশত হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন আর শতশত আদিবাসী সাঁওতাল এসে যোগ দিলো সৎসঙ্গে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লোক ছাড়াও নেপাল, মিয়ানমার, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা প্রভৃতি দেশের লোক এসে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করতে লাগল। [৮] একে একে স্থাপিত হলো ফিলানথ্রপি অফিস, আনন্দবাজার, তপোবন বিদ্যালয়। গড়া হলো দ্বিতল মাতৃমন্দির ‘মনোমোহিনী ধাম’, শ্রীশ্রীঠাকুরের বাসঘর ‘হোসেনি লজ’, ‘পার্লার’, ‘নিরালা নিবাস’, ভক্ত ও অভ্যাগতদের নিয়ে বসার জন্য ‘গোলঘর’, বড়াল বাংলো। শ্রীশ্রীঠাকুর পরিবারের জন্য ‘ষোড়শী ভবন’, ‘বিবেক বিতান’ প্রভৃতি। ক্রমে স্থাপিত হলো পানীয় জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা, অতিথিশালা, প্রেস, পোস্টঅফিস, টেলিগ্রাম অফিস, হাসপাতাল, কলেজ। বাংলা, হিন্দি ও অনান্য ভাষায় পত্রিকা প্রকাশের জন্য খোলা হলো প্রকাশনী। ঋত্বিকগণের জন্যে তৈরি হলো ঋত্বিক কলোনি ও আদর্শ ঋত্বিকগণের জন্য ‘যতি আশ্রম’। শতশত একর জমি নিয়ে বসবাস করতে লাগল শতশত সৎসঙ্গী পরিবার। এমনিভাবে আশ্রম স্থাপন করে অতঃপর শ্রীশ্রীঠাকুর তৈরি করলেন ধর্মীয় নগর গড়ার এক মহাপ্রকল্প। গড়ে উঠল নগর। তাতে এসে বাস করতে লাগল হাজার হাজার বাস্তুহারা। বেড়ে চলল জ্ঞান, বিজ্ঞান, সেবা ও সত্য সাধনার পরিপোষক বিভিন্ন প্রতিষ্টান। এগুলো হলো ‘অমর দ্যুতি বিদ্যামন্দির’ লাইব্রেরি, ‘দ্যূত দীপ্তি’ হাসপাতাল প্রভৃতি। [৮]

আশ্রমের জায়গার পূর্ব ইতিহাস[সম্পাদনা]

এক সময় সারা সাঁওতাল পরাগণাটি ছিল বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত। ১৯১১ সালে চলে যায় বিহার প্রদেশে। কিন্তু বহু বাঙালি রয়ে গেল দেওঘর। স্থানটি স্বাস্থ্যকর বলে অনেক বিশিষ্ট বাঙালি এখানে এসে নিবাস স্থাপন করেছিলেন। দেশবন্ধু এসেও খুলে দিয়েছিলেন একটি বাঙালি কলোনি। এমনি করে কতগুলো বাঙালি পল্লী গড়ে উঠেছিল দেওঘরে। তার মধ্যে একটি বাঙালি পল্লীর নাম পূরণ দহ। এখানে বাড়ি তৈরি করে স্থানীয়ভাবে বাস করতেন ঋষি অরবিন্দু ও বিপ্লবী নায়ক বারীন ঘোষের মাতাসহ রাজর্ষি রাজ নারায়ণ বসু। সেই বাড়ি ও আরো অনেক বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছিল পূরণ দহে। সেই সব বাড়ি ও আরো কিছু জমি কিনে শ্রীশ্রীঠাকুর স্থাপন করেছিলেন সন্ত মতের ষষ্ঠ কেন্দ্র-দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রম। [৫]

আশ্রমে অনুষ্ঠিত উৎসবগুলি[সম্পাদনা]

দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রমে বছরে বড়দুটি উৎসব পালিত হয়। বাংলা নববর্ষে(এপ্রিল) ‘পুরুষোত্তম স্বস্তিতীর্থ-মহাযজ্ঞ’ এবং শারদীয়া দুর্গোৎসবের পর ‘শ্রীশ্রীঠাকুরের শুভ জন্ম-মহামহোৎসব’। বর্তমানে অনিবার্য কিছু কারণে কয়েক বছর যাবত নববর্ষ উৎসব আশ্রমের বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর, শ্রীশ্রীবড়মা, শ্রীশ্রীবড়দা ও শ্রীশ্রীদাদার জন্মতিথি ও আবির্ভাব দিবসগুলি সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। এছাড়াও উদযাপিত হয় শ্রীশ্রীঠাকুরের-পুণ্যস্নানোৎসব, পাবনা থেকে দেওঘর আগমন স্মরণোৎসব, মানিকপুরে বনভোজন উৎসব, দোল উৎসব। শ্রীশ্রীঠাকুর, শ্রীশ্রীবড়মা ও শ্রীশ্রীবড়দার তিরোধান তিথিগুলি সৎসঙ্গীবৃন্দ সংযম অবলম্বন-পূর্বক হবিষ্যান্ন-গ্রহণ, শ্রীশ্রীঠাকুরের নাম-সংকীর্ত্তন, সৎসঙ্গ ও সদালোচনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেন । [১০]

দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রমের কর্মপ্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর পাবনা থেকে দেওঘর চলে আসার পর থেকেই এখানেও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পাবনার মতো কর্ম-প্রতিষ্ঠান। মানুষের প্রয়োজনেই সেগুলো ক্রমশঃ গড়ে উঠেছে এবং নিরন্তর নিত্য নব কর্ম প্রবাহ সৃষ্টি হয়েই চলেছে এখানে। বর্তমানে দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রমে নিম্নলিখিত কর্ম-প্রতিষ্ঠানগুলি রয়েছে:

সৎসঙ্গ ফিলানথ্রপি[সম্পাদনা]

সৎসঙ্গের মূল কার্য্যালয়। লোককল্যাণের উদ্দেশ্যে শ্রীশ্রীঠাকুর ফিলানথ্রপি নির্মাণ করেছিলেন। এখানে তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভক্ত-অনুরাগীদের স্বতঃস্বেচ্ছ ইষ্টার্ঘ্য(ইষ্টভৃতি সহ অনান্য) গৃহিত হয় এবং উপযুক্ত হিসাব-নিকাশ রক্ষা করা হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের শত-সহস্র কর্মকান্ডের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অর্ঘ্য একমাত্র ফিলানথ্রপিতেই নিবেদিত হয়। ক্রমবর্ধমান কাজের ভার লাঘব তথা তড়িৎগতিতে কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য বর্তমানে ফিলানথ্রপিতে অত্যাধুনিক কম্পিউটিং ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঋত্বিক সংঘের কার্যালয়ও ফিলানথ্রপিতেই রয়েছে। নির্দেশ এবং আশীর্বাদ সম্বলিত পত্রোত্তরের উদ্দেশ্যেও এখানে একটি বিরাট বিভাগ রয়েছে। এছাড়াও অনান্য অগণিত কর্মের সুষ্ঠুতার জন্য আরও বহু বিভাগ রয়েছে। [১১]

আনন্দবাজার[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে আগত ভক্তবৃন্দ যাতে অভুক্ত হয়ে ফিরে না যান, তার জন্য মাতা মনোমোহিনী দেবী সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন এবং তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। কালে কালে তা ‘আনন্দবাজার’ হিসাবে পরিচিত হয়। পরিস্থিতির পরিবর্তনে এখন এটি ব্যাপক রূপ ধারণ করেছে। এখন নিত্য হাজার হাজার ভক্তগণ দুইবেলা নিঃশুল্ক প্রসাদ গ্রহণ করেন। এছাড়াও উৎসব উপলক্ষে আগত লক্ষাধিক ভক্তজন ও নিকটবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীগণ প্রসাদ গ্রহণ করে ধন্য হন। বর্তমানে ডিজেলজালিত চুল্লির সাহায্যে রন্ধন করা হয়। দেওঘরে নির্মিত বিশাল অট্টালিকায় এখন আনন্দবাজারের কার্যাবলি সম্পাদিত হয় যা ‘আনন্দবাজার ভবন’ নামে পরিচিত। । [১২]

সৎসঙ্গ রসৈষণা মন্দির[সম্পাদনা]

যখনই কেউ জটিল রোগগ্রস্ত হয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে উপস্থিত হতো শ্রীশ্রীঠাকুর সেগুলোর ফরমূলা দিতেন। এভাবে তিনি বহু জটিল রোগের ফরমূলা দিয়ে গেছেন। আর তাই নিয়ে গড়ে ওঠে সৎসঙ্গ রসৈষণা মন্দির। অত্যাধুনিক প্রক্রিয়া দ্বারা ভেষজ ঔষধাদি প্রস্তুত ও ঔষধের গুণমান বজায় রাখার জন্য এবং নিত্যনতুন ঔষধের অনুসন্ধানের জন্য অত্যাধুনিক সাজসজ্জাযুক্ত গবেষণাগারও নির্ম্মাণ করা হয়েছে। এখানে মধুমেয় (ডায়াবেটিস), ব্লাড কোলেস্টেরল ইত্যাদি ব্যাধিগুলির থেকে মুক্তির জন্যে ফলপ্রসু গবেষণা সম্পাদিত হয়েছে। শ্রীশ্রীবড়দা (শ্রীশ্রীঅমরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী) বিভিন্ন রোগের নিদানহেতু বহু ফর্মূলা দিয়েছেনÑ সেগুলির সাহায্যেও ঔষধ বানানো হয়। বর্তমানে আশ্রমে আগত নিত্য অসংখ্য যাত্রীদের মধ্যে রোগক্লিষ্ট মানুষের কষ্ট নিবারণের জন্যে শ্রীশ্রীদাদাও (শ্রীশ্রীঅশোক চক্রবর্তী) স্বয়ং বহুবিধ জটিল রোগের অব্যর্থ জীবনদায়ী ঔষধ উদ্ভাবন করেছেন। [১৩]

সৎসঙ্গ ভেষজ উদ্যান[সম্পাদনা]

বহু দুর্লভ গাছ-গাছড়া এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লাগিয়েছিলেন শ্রীশ্রীবড়দা। কঠিন, পাথুরে এবং শুষ্ক মরুপ্রায় এই ভূমিতে তৃণখন্ডের জন্মনোই এক আশ্চর্য ব্যাপার। সেই জমিতে তিনি বহু দূর-দূরান্ত থেকে এনে লাগিয়েছেন মহামূল্যবান বনৌষধি এবং আবিষ্কারও করেছেন বহু বনৌষধি। এছাড়াও এখানে রয়েছে বহু ফলের গাছ এবং সারা বছর ধরেই হয় বিভিন্ন শাক-সবজির চাষ। “উদ্যানটি দেখে এর পূর্ব অবস্থা কল্পনা করাও দুষ্কর হবে” এমনটাই বলেন প্রবীণ আশ্রমিকগণ। [১৪]

সৎসঙ্গ দ্যূতদীপ্তি হাসপাতাল[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল তৈরির কথা বলেছিলেন। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ৪৫টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও বেশি বেডের ব্যবস্থা করার মতো সামগ্রীও মজুদ আছে। বিশেষ প্রয়োজনে দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকগণ এসে তাদের সেবা দান করে থাকেন। এই হাসপাতাল শ্রীশ্রীবড়দা ও শ্রীশ্রীদাদার অনুপ্রেরণা ও নির্দেশনায় এবং শ্রীশ্রীবড়দার মধ্যম পুত্র ডাঃ অলোক কুমার চক্রবর্তী (মেজদা), এম.বি.বি.এস-এর পরিচালনায় আজ এক বিশিষ্ট হাসপাতাল রূপে খ্যাতি লাভ করেছে। হাসপাতালের উন্নতির জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এখানে দেওঘরের ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চিকিৎসকগণ বৎসরে ২বার সমবেত হয়ে দুইটি সেমিনারের আয়োজন করে থাকেন। হাসপাতালের একটি নিজস্ব লাইব্রেরিও রয়েছে। প্রতি বৎসর একটি মেডিকেল বুলেটিন প্রকাশিত হয়। দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদদের আধুনিক গবেষণা বিষয়ক প্রবন্ধ ও রচনায় বুলেটিনটি সমৃদ্ধ থাকে। বর্তমানে সৎসঙ্গ দ্যূতদীপ্তি হাসপাতালে উল্লিখিত বিভাগগুলি খোলা হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত কাজ চলছেÑ(১)আউটডোর (২)চ্যারিটেবল ডিস্পেনসারি (৩)একস্-রে বিভাগ (৪)চক্ষু,কর্ণ ও নাসিকা বিভাগ (৫)দন্ত চিকিৎসা বিভাগ (৬)প্যাথোলজি বিভাগ (৭)আকস্মিক চিকিৎসা বিভাগ (৮ হোমিওপ্যাথি বিভাগ। [১৪]

সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউজ[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুরের বিশ^সমস্যা সমাধানী বাণীগুলি প্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউজ থেকে। বাংলা ও ইংরেজিতে প্রদত্ত মূল বাণীগ্রন্থ ছাড়াও শ্রীশ্রীঠকুরের সাথে কথোপকথন ও প্রশ্নেত্তরমূলক মৌলিক গ্রন্থও বাংলা ও বিভিন্ন ভাষায় মুদ্রিত হয়েছে। মাসিক বিভিন্ন পত্রিকাও এই পাবলিশিং হাউজ থেকেই প্রকাশিত হয়। ইংরেজি, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া, মারাঠী, নেপালী, তামিল, তেলেগু, সাঁওতালী ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষাতেও মূল গ্রন্থ থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউজের পক্ষ থেকে। প্রধান আচার্য্যদেব শ্রীশ্রীদাদা স্বয়ং বেশ কয়েকটি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এবং তাঁর নির্দেশে আরও কয়েকজন ব্যক্তি এই কাজে ব্যাপৃত রয়েছেন। [১৫]

অমরদ্যুতি বিদিমন্দির(সৎসঙ্গ লাইব্রেরি)[সম্পাদনা]

এই পাঠাগারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্যের বহু দুর্লভ প্রাচীন ও আধুনিক পুস্তকের বিপুল সম্ভার আছে। এখানে পাঠকদের একান্ত অধ্যয়নের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। এর সাথে একটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য সম্বৎসর বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। [১৫]

বেদভবন[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুরের অত্যন্ত আগ্রহ ছিল বেদ, উপনিষদ্, শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদির প্রতি। এসবের চর্চার জন্য বেদভবন নির্মাণের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ইচ্ছা। শ্রীশ্রীঠাকুরের এই ইচ্ছাকে সাকার রূপ দিয়েছিলেন শ্রীশ্রীবড়দা ‘বেদভবন’ নির্মাণ করে। এখানে উপযুক্ত আচার্য্যরে তত্ত্বাবধানে চারিবেদের পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া, বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানাদির সময় স্বস্ত্যয়ন-হোমযজ্ঞাদিও এখানে অনুষ্ঠিত হয়। [১৬]

সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়[সম্পাদনা]

এখানে প্রচলিত পাঠ্যক্রম অনুসারে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি চরিত্র গঠন, স্বনির্ভরতা ও ব্যবহারিক শিক্ষাদিও সুযোগ্য শিক্ষকদের দ্বারা দেয়া হয়। কুটির শিল্প, টাইপিং, কম্পিউটার ও অনান্য ব্যবহারিক শিক্ষার সঙ্গে-সঙ্গে শারীরিক গঠন ও আত্মরক্ষা হেতু ড্রিল ও মার্শাল আর্ট শেখানোরও ব্যবস্থা আছে। সুষ্ঠু ও একান্ত বিদ্যাভ্যাসের জন্য বিদ্যালয়ে বিরাট ছাত্রবাসের ব্যবস্থা রয়েছে।[১৭]

সৎসঙ্গ অমরদ্যুতি মহাবিদ্যালয়[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুর ইপ্সিত শান্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক পদক্ষেপরূপে ‘সৎসঙ্গ অমরদ্যুতি মহাবিদ্যালয়’ বর্তমানে দুমকার সিধু-কানুহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক স্তরে কলা, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান এবং স্নাতকোত্তর স্তরে বাণিজ্য শাখায় পঠন-পাঠনের যথেষ্ট মর্যাদা লাভ করেছে। আইন ও অনান্য শিক্ষাক্রমও চালু করার চেষ্টা চলছে। [১৭]

সৎসঙ্গ বীণাপাণি বিদ্যামন্দির[সম্পাদনা]

এখানে বালিকাদের আদর্শানুগ উপযুক্ত শিক্ষা ও শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে।[১৭]

কলা বিভাগ[সম্পাদনা]

আশ্রমস্থ ‘কৃষ্টিবান্ধব নাট্য-শিল্পম্’-এর প্রযোজনায় যাত্রা-থিয়েটার ও অনান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে, যার ফলে মনোরঞ্জনের সাথে-সাথে লোকশিক্ষারও সুযোগ পাওয়া যায়।‘সঙ্গীত-বিভাগ’-এ উচ্চাঙ্গ ও লঘু সঙ্গীত, ভজন-কীর্তানাদির শিক্ষা ও চর্চা হয়ে থাকে। এছাড়া, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও অনান্য শিল্পকলা চর্চাও আশ্রমে হয়ে থাকে। নিয়মিতরূপে চিত্র ও বিভিন্ন শিল্পকলার প্রদর্শনীর আয়োজনও আশ্রমে হয়ে থাকে।[১৭]

অতিথি ভবন[সম্পাদনা]

আশ্রম-আগত ভক্তশিষ্যদের নিশ্চিন্তবাসের জন্য বেশ কয়েকটি অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে। স্থান-সংকুলানের জন্যে কয়েকটি বহুতল ভবন ও বেশ কয়েকটি স্থানে হলঘরের (ডর্মিটরী) সংখ্যাবৃদ্ধি করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান অতিথি-আবাস নির্মাণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা সক্রিয়ভাবে কর্মরত থাকে। [১৮]

মেমোরিয়া[সম্পাদনা]

এখানে শ্রীশ্রীঠাকুর ও শ্রীশ্রীবড়মার ব্যবহৃত জিনিসপত্রাদি অবিকৃত অবস্থায় ও উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে রক্ষিত। শ্রীশ্রীঠাকুর-সন্দর্শনে আগত দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট মানুষের উপস্থিতি, আলোচনা, বিবৃতি ও সাক্ষাৎকারের দুর্লভ মুহূর্ত্তগুলি সাল-তারিখ সন্নিবেশে ছবির মধ্যে বাঁধানো রয়েছে। এছাড়া ‘ষোড়শী- ভবন’ (শ্রীশ্রীবড়দার বাসগৃহ)-এর একটি পৃথক ভবনে ‘স্মারণ-সৌধ’ নামে শ্রীশ্রীবড়দার ব্যবহৃত জিনিসপত্রাদি পরিচ্ছন্ন ও উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে রক্ষিত। পরিবার-পরিজনের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিশিষ্ট মানুষদের সাথে সাক্ষাৎকার ও দেশের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের দুর্লভ মুহূর্ত্তগুলির আলোকচিত্র এখানে প্রদর্শনের জন্য সুসন্নিবেশিত করা হয়েছে। [১৮]

যতি-আশ্রম[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রীঠাকুর চেয়েছিলেন এমন কতকগুলো মানুষ, যাদের মধ্যে ধর্ম ও কৃষ্টি রূপ-পরিগ্রহ করবে। যাদের চরিত্র ও চলন অমৃত জালুস বিকিরণ করে মানুষকে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভাবে ইষ্টে কেন্দ্রায়িত করে তুলবে। এই উদ্দেশ্যেই শ্রীশ্রীঠাকুর ২৬শে আশি^ন, ১৩৩৫, মঙ্গলবার (ইং ১২-১০-১৯৪৮) শুভ বিজয়ার দিন থেকে কতিপয় প্রবীণ কর্মীকে নিয়ে ‘যতি-আশ্রম’-এর সূত্রপাত ঘটান। ঠাকুর-বাংলার মধ্যেই তাদের থাকার পৃথক ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বসে যতিদের নিয়ে বহুদিন বহু আলোচনা ও বাণী প্রদানের মাধ্যমে চলার পথের অমৃত-সঙ্কেতগুলি লিপিবদ্ধ করে দেন। যতি-জীবনে পালনীয় সে-সব বাণী সঙ্কলিত করে পরে ‘যতি-অভিধর্ম্ম’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বর্তমানে যতি-আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুরের ব্যবহৃত শয্যাসহ অনান্য পবিত্র নিদর্শনগুলি সযত্নে রক্ষিত আছে। সংলগ্ন দীক্ষাগৃহগুলি যথাযথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সাথে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আশ্রমে আগত দীক্ষা প্রার্থী ব্যক্তিগণকে ঐ গৃহগুলিতে বসেই দীক্ষাদান করা হয়।[১৯]

সৎসঙ্গ প্রেস[সম্পাদনা]

সৎসঙ্গের নিজস্ব প্রেস এটি। শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী-সংকলন শত শত গ্রন্থরূপে মুদ্রিত হয়েছে এখানে। এই প্রেসের তত্ত্বাবধানে শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবধারা-সম্বলিত নি¤œলিখিত মাসিক পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়Ñআলোচনা (বাংলা), সাত্বতী (হিন্দি), খরমধঃব (ইংরেজি), আগমবাণী (অসমীয়া), ঊর্জ্জনা (ওড়িয়া), আরশাল (সাঁওতালি) ও স্বস্তিসেবক (বাংলা)।[২০]

পশুপালিনী চিড়িয়াখানা[সম্পাদনা]

অনেক সময় দেশ-বিদেশের ভক্তবৃন্দ শ্রীশ্রীঠাকুরকে বিরল প্রজাতির পশুপক্ষী উপহার দিলে তিনি খুশির সঙ্গে সেগুলো গ্রহণ করে সযতেœ রক্ষাবেক্ষণের নির্দেশ দিতেন। ফলে আশ্রমে স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠে এক নাতিবৃহৎ চিড়িয়াখানা। শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই দেখতে যেতেন সেসব পশুপক্ষীদের। পশুপক্ষী সম্বন্ধে শ্রীশ্রীবড়দারও ছিল বিশেষ আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা। তাঁরই অভীপ্সায় এক বিশাল খাঁচা নির্মিত হয়, যেখানে একই সাথে বিভিন্ন প্রজাতির পক্ষীদের রাখা হয়। মূলতঃ তাঁরই তত্ত্বাবধানে পশুপক্ষীগুলো পালিত ও রক্ষিত হতে থাকে এবং এক সময় ভারত সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানার মর্যাদা লাভ করে। নাম হয় ‘পশু-পালিনী’ (সৎসঙ্গ জু ফর চিল্ড্রেন এডুকেশান)। বর্তমানে পশুপক্ষী সংক্রান্ত আইনী জটিলতার দরুণ চিড়িয়াখানাটির সঙ্কোচন ঘটেছে। তথাপি এখনও বহু বিরল-প্রজাতির পক্ষীর সমবায়ে সেটি দর্শনার্থীদের মনোরঞ্জন করে থাকে। আশ্রমের মধ্যে একটি বৃহৎ গোশালাও রয়েছে। সেখানে উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে গো-পালন এবং আশ্রমিকদের দুগ্ধ সরবরাহ করা হয়।[২১]

উপাসনা (মাতৃ-মিলন গৃহ)[সম্পাদনা]

প্রাত্যহিক সাংসারিক কাজ শেষ করে আশ্রমিক মায়েরা এখানে একত্রিত হয়ে ইষ্টদেবতার গুণর্কীতন করে থাকে। এখানে মায়েরা প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবারে মাতৃ-সম্মেলনের আয়োজন করেন। ‘উপাসনা’-র উদ্বোধনের দিনটির স্মরণে বার্ষিক অনুষ্ঠান ছাড়াও বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনে মায়েরা ‘সৎসঙ্গ’, ভজন-কীর্তনাদির আয়োজন করে থাকেন। তাছাড়া, এখানে আশ্রমিক বালিকা ও কিশোরীদের নৃত্য-গীতাদি অনুশীলন করার সুযোগ দেয়া হয়। [২২]

অবকাঠামো[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. গ্রন্থপঞ্জী (পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণী-সম্ভার) এপ্রিল ২০০৩-২০০৪ অনুকূলাব্দ-৫৭-৫৮
  2. হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, ৯ম-১০ম শ্রেণী, পৃষ্ঠা নম্বর-৩৫, ২০১৫ শিক্ষাবর্ষ (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা)
  3. “দয়াল ঠাকুর” (শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তঁৎ প্রবর্তিত সৎসঙ্গের সংক্ষিপ্ত পরিচয়) পৃষ্ঠা নম্বর: ৫৯
  4. “দয়াল ঠাকুর”(শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও তঁৎ প্রবর্তিত সৎসঙ্গের সংক্ষিপ্ত পরিচয়) পৃষ্ঠা নম্বর:৭১-৭২
  5. শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও সৎসঙ্গ বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ৫৯
  6. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৩৬
  7. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৩৭
  8. শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও সৎসঙ্গ বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ৬০
  9. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৩৭,৩৮
  10. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬১
  11. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬২
  12. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬২-৬৩
  13. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৩
  14. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৪
  15. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৫
  16. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৫-৬৬
  17. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৬
  18. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৭
  19. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৭-৬৮
  20. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৮
  21. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৬৮-৬৯
  22. দয়াল ঠাকুর, পৃষ্ঠা:৭০

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]