নাচুক তাহাতে শ্যামা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নাচুক তাহাতে শ্যামা 
স্বামী বিবেকানন্দ
Maa Bhavatarini at Dakshineshwar Temple (Photo Frame Type).JPG
এই কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিন্দু দেবী কালী বা শ্যামা
দেশ ভারত
ভাষা বাংলা
প্রকাশক বিবেকোদয়ম্‌
প্রকাশনার তারিখ ১৯০৪

নাচুক তাহাতে শ্যামা হল স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বাংলা কবিতা।[১] ১৯০৪ সালে বিবেকোদয়ম্‌ পত্রিকায় দুই পর্বে এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে দ্য কমপ্লিট ওয়ার্কস ওফ স্বামী বিবেকানন্দ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে এই কবিতার ইংরেজি অনুবাদটি এবং স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে মূল বাংলা কবিতাটি প্রকাশিত হয়।[২] এই কবিতাটিতে হিন্দু দেবী শ্যামার (কালী) প্রতি আত্মনিবেদনের কথা বলা হয়েছে।[৩] মূল কবিতাটিও কালীর প্রতি উৎসর্গিত।[৪]

কথা[সম্পাদনা]

কবিতার মূল বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদটি নিচে দেওয়া হল:

ফুল্ল ফুল সৌরভে আকুল, মত্ত অলিকুল গুঞ্জরিছে আশে পাশে।
শুভ্র শশী যেন হাসিরাশি, যত স্বর্গবাসী বিতরিছে ধরাবাসে॥
মৃদুমন্দ মলয়পবন, যার পরশন, স্মৃতিপট দেয় খুলে।
নদী, নদ, সরসী-হিল্লোল, ভ্রমর চঞ্চল, কত বা কমল দোলে॥
ফেনময়ী ঝরে নির্ঝরিণী—তানতরঙ্গিণী—গুহা দেয় প্রতিধ্বনি।
স্বরময় পতত্রিনিচয়, লুকায়ে পাতায়, শুনায় সোহাগবাণী॥
চিত্রকর, তরুণ ভাস্কর, স্বর্ণতুলিকর, ছোঁয় মাত্র ধরাপটে।
বর্ণখেলা ধরাতল ছায়, রাগপরিচয় ভাবরাশি জেগে ওঠে॥

মেঘমন্দ্র কুলিশ-নিস্বন, মহারণ, ভুলোক-দ্যুলোক-ব্যাপী।
অন্ধকার উগরে আঁধার, হুহুঙ্কার শ্বসিছে প্রলয়বায়ু॥
ঝলকি ঝলকি তাহে ভায়, রক্তকায় করাল বিজলীজ্বালা।
ফেনময় গর্জি মহাকায়, ঊর্মি ধায় লঙ্ঘিতে পর্বতচূড়া॥
ঘোষে ভীম গম্ভীর ভূতল, টলমল রসাতল যায় ধরা।
পৃথ্বীচ্ছেদি উঠিছে অনল, মহাচল চূর্ণ হয়ে যায় বেগে॥

শোভাময় মন্দির-আলয়, হ্রদে নীল পয়, তাহে কুবলয়শ্রেণী।
দ্রাক্ষাফল-হৃদয়-রুধির, ফেনশুভ্রশির, বলে মৃদু মৃদু বাণী॥
শ্রুতিপথে বীণার ঝঙ্কার, বাসনা বিস্তার, রাগ তাল মান লয়ে।
কতমত ব্রজের উচ্ছ্বাস, গোপী-তপ্তশ্বাস, অশ্রুরাশি পড়ে বয়ে॥
বিম্বফল যুবতী-অধর, ভাবের সাগর—নীলোৎপল দুটি আঁখি।
দুটি কর—বাঞ্ছাঅগ্রসর, প্রেমের পিঞ্জর, তাহে বাঁধা প্রাণপাখী॥

ডাকে ভেরী, বাজে ঝর‍্‍র্ ঝর‍্‍র্ দামামা নক্কাড়, বীর দাপে কাঁপে ধরা।
ঘোষে তোপ বব-বব-বম্, বব-বব-বম্ বন্দুকের কড়কড়া॥
ধূমে ধূমে ভীম রণস্থল, গরজি অনল বমে শত জ্বালামুখী।
ফাটে গোলা লাগে বুকে গায়, কোথা উড়ে যায় আসোয়ার ঘোড়া হাতী॥
পৃথ্বীতল কাঁপে থরথর, লক্ষ অশ্ববরপৃষ্ঠে বীর ঝাঁকে রণে।
ভেদি ধূম গোলাবরিষণ গুলি স্বন্ স্বন্, শত্রুতোপ আনে ছিনে॥
আগে যায় বীর্য-পরিচয় পতাকা-নিচয়, দণ্ডে ঝরে রক্তধারা।
সঙ্গে সঙ্গে পদাতিকদল, বন্দুক প্রবল, বীরমদে মাতোয়ারা॥
ঐ পড়ে বীর ধ্বজাধারী, অন্য বীর তারি ধ্বজা লয়ে আগে চলে।
তলে তার ঢের হয়ে যায় মৃত বীরকায়, তবু পিছে নাহি টলে॥
দেহ চায় সুখের সঙ্গম, চিত্ত-বিহঙ্গম সঙ্গীত-সুধার ধার।
মন চায় হাসির হিন্দোল, প্রাণ সদা লোল যাইতে দুঃখের পার॥
ছাড়ি হিম শশাঙ্কচ্ছটায়, কেবা বল চায়, মধ্যাহ্নপতন-জ্বালা।
প্রাণ যার চণ্ড দিবাকর, স্নিগ্ধ শশধর, সেও তবু লাগে ভাল॥
সুখতরে সবাই কাতর, কেবা সে পামর দুঃখে যার ভালবাসা?
সুখে দুঃখ, অমৃতে গরল, কণ্ঠে হলাহল, তবু নাহি ছাড়ে আশা॥
রুদ্রমুখে সবাই ডরায়, কেহ নাহি চায় মৃত্যুরূপা এলোকেশী।
উষ্ণধার, রুধির-উদ্গার, ভীম তরবার খসাইয়ে দেয় বাঁশী॥
সত্য তুমি মৃত্যরূপা কালী, সুখবনমালী তোমার মায়ার ছায়া।
করালিনি, কর মর্মচ্ছেদ, হোক মায়াভেদ, সুখস্বপ্ন দেহে দয়া॥
মুণ্ডমালা পরায়ে তোমায়, ভয়ে ফিরে চায়, নাম দেয় দয়াময়ী।
প্রাণ কাঁপে, ভীম অট্টহাস, নগ্ন দিক‍্‍বাস, বলে মা দানবজয়ী॥
মুখে বলে দেখিবে তোমায়, আসিলে সময় কোথা যায় কেবা জানে।
মৃত্যু তুমি, রোগ মহামারী বিষকুম্ভ ভরি, বিতরিছ জনে জনে॥

হে উন্মাদ, আপনা ভুলাও, ফিরে নাহি চাও, পাছে দেখ ভয়ঙ্করা।
দুখ চাও, সুখ হবে বলে, ভক্তিপূজাছলে স্বার্থ-সিদ্ধি মনে ভরা॥
ছাগকণ্ঠ রুধিরের ধার, ভয়ের সঞ্চার, দেখে তোর হিয়া কাঁপে।
কাপুরুষ! দয়ার আধার! ধন্য ব্যবহার! মর্মকথা বলি কাকে?
ভাঙ্গ বীণা—প্রেমসুধাপান, মহা আকর্ষণ—দূর কর নারীমায়া।
আগুয়ান, সিন্ধুরোলে গান, অশ্রুজলপান, প্রাণপণ, যাক্ কায়া॥
জাগো বীর, ঘুচায়ে স্বপন, শিয়রে শমন, ভয় কি তোমার সাজে?
দুঃখভার, এ ভব-ঈশ্বর, মন্দির তাহার প্রেতভূমি চিতামাঝে॥
পূজা তাঁর সংগ্রাম অপার, সদা পরাজয় তাহা না ডরাক তোমা।
চূর্ণ হোক স্বার্থ সাধ মান, হৃদয় শ্মশান, নাচুক তাহাতে শ্যামা॥ [৫]


Beaut'ous blossoms ravishing with perfume,
Swarms of maddened bees buzzing all around;
The silver moon — a shower of sweet smile,
Which all the dwellers of heaven above
Shed lavishly upon the homes of earth;
The soft Malaya breeze, whose magic touch
Opens to view distant memory's folds;
Murmuring rivers and brooks, rippling lakes
With restless Bhramaras wheeling over
Gently waving lotuses unnumbered;
Foaming flow cascades — a streaming music —
To which echo mountain caves in return;
Warblers, full of sweet-flowing melody,
Hidden in leaves, pour hearts out — love discourse;
The rising orb of day, the painter divine,
With his golden brush but lightly touches
The canvas earth and a wealth of colours
Floods at once o'er the bosom of nature,
— Truly a museum of lovely hues —
Waking up a whole sea of sentiments.

The roll of thunder, the crashing of clouds,
War of elements spreading earth and sky;
Darkness vomiting forth blinding darkness,
The Pralaya wind angrily roaring;
In quick bursts of dazzling splendour flashes
Blood-red terrific lightning, dealing death;
Monster waves roaring like thunder, foaming,
Rush impetuous to leap mountain peaks;
The earth booms furious, reels and totters,
Sinks down to its ruin, hurled from its place;
Piercing the ground, stream forth tremendous flames.
Mighty ranges blow up into atoms.

A lovely villa, on a lake of blue —
Festooned with dusters of water-lilies;
The heart-blood of ripe grapes capped with white foam
Whispering softly tells tale of passion;
The melody of the harp floods the ears,
And by its air, time, and harmony rich,
Enhances desire in the breast of man;
What stirring of emotions! How many
Hot sighs of Love! And warm tears coursing down!
The Bimba-red lips of the youthful fair,
The two blue eyes — two oceans of feelings;
The two hands eager to advance — love's cage —
In which the heart, like a bird, lies captive.
The martial music bursts, the trumpets blow,
The ground shakes under the warriors' tread;
The roar of cannon, the rattle of guns,
Volumes of smoke, the gruesome battlefield,
The thundering artillery vomits fire
In thousand directions; shells burst and strike
Vital parts of the body; elephants
And horses mounted are blown up in space;
The earth trembles under this infernal dance;
A million heroes mounted on steeds
Charge and capture the enemy's ordnance,
Piercing through the smoke and shower of shells
And rain of bullets; forward goes the flag,
The emblem of victory, of heroism
With the blood, yet hot, streaming down the staff,
Followed by the rifles, drunk with war-spirit;
Lo! the ensign falls, but the flag proceeds
Onwards on the shoulder of another;
Under his feet swell heaps of warriors
Perished in battle; but he falters not.
The flesh hankers for contacts of pleasure,
The senses for enchanting strains of song,
The mind hungers for peals of laughter sweet,
The heart pants to reach realms beyond sorrow;
Say, who cares exchange the soothing moonlight
For the burning rays of the noontide sun?
The wretch whose heart is like the scorching sun,
— Even he fondly loves the balmy moon;
Indeed, all thirst for joy. Breathes there the wretch
Who hugs pain and sorrow to his bosom?
Misery in his cup of happiness,
Deadly venom in his drink of nectar,
Poison in his throat — yet he clings to hope!
Lo! how all are scared by the Terrific,
None seek Elokeshi whose form is Death.
The deadly frightful sword, reeking with blood,
They take from Her hand, and put a lute instead!
Thou dreaded Kâli, the All-destroyer,
Thou alone art true; Thy shadow's shadow
Is indeed the pleasant Vanamâli.
O Terrible Mother, cut quick the core,
Illusion dispel — the dream of happiness,
Rend asunder the fondness for the flesh.

   True, they garland Thee with skulls, but shrink back
In fright and call Thee, "O All-merciful!"
At Thy thunder peal of awful laughter,
At Thy nudeness — for space is thy garment —
Their hearts sink down with terror, but they say,
"It is the demons that the Mother kills!"
They only pretend they wish to see Thee,
But when the time comes, at Thy sight they flee.
Thou art Death! To each and all in the world
Thou distributest the plague and disease
— Vessels of venom filled by Thine own hands.
O thou insane! Thou but cheatest thyself,
Thou cost not turn thy head lest thou behold.
Ay, the form terrible of the Mother.
Thou courtest hardship hoping happiness,
Thou wearest cloak of Bhakti and worship,
With mind full of achieving selfish ends.
The blood from the severed head of a kid
Fills thee with fear — thy heart throbs at the sight —
Verily a coward! Compassionate?
Bless my soul! A strange state of things indeed!
To whom shall I tell the truth? — Who will see?
Free thyself from the mighty attraction —
The maddening wine of love, the charm of sex.
Break the harp! Forward, with the ocean's cry!
Drink tears, pledge even life — let the body fall.
Awake, O hero! Shake off thy vain dreams,
Death stands at thy head — does fear become thee?
A load of misery, true though it is —
This Becoming — know this to be thy God!
His temple — the Shmashân among corpses
And funeral pyres; unending battle —
That verily is His sacred worship;
Constant defeat — let that not unnerve thee;
Shattered be little self, hope, name, and fame;
Set up a pyre of them and make thy heart
A burning-ground.
       And let Shyâmâ dance there.[৬]

বিষয়বস্তু[সম্পাদনা]

এই কবিতায় বিবেকানন্দ আধ্যাত্মিক চৈতন্যের জগৎ নিয়ে কথা বলেছেন।[৭] সহজ জীবনের আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করে জীবনের কঠিন সমস্যাগুলির মুখোমুখি হয়ে সেগুলির সমাধানের মাধ্যমে জীবনে সুখ ও শান্তি আনার কথা বলা হয়েছে এই কবিতায়।[৩] বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সাহিত্যের মতো এই কবিতাতেও "ব্যক্তি আত্মা থেকে দিব্য প্রেম এবং কালী থেকে ব্রহ্মের" অনুসন্ধান করা হয়েছে।[৮]

ভারতীয় ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি "যৌনতার আকর্ষণ" ও "প্রেমের মাদকতা" থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে এই কবিতায়।[৯] স্বামী বিবেকানন্দ ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় এই কবিতাটির ইংরেজি নাম রেখেছিলেন And Let Shyama Dance There (অ্যান্ড লেট শ্যামা ড্যান্স দেয়ার)। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, ইংরেজি অনুবাদটিতে, "প্রকৃতির মধুর ও কঠিন দিকগুলিকে যুগপৎ বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনা শিল্পীর কল্পনাশক্তির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং একটি অনন্য কাব্যচিত্র।"[৯]

স্বামী বিবেকানন্দ, পোয়েটিক ভিশনারি গ্রন্থের রচয়িতা মোহিত চক্রবর্তী লিখেছেন যে কোন ভয়ংকর পরিবেশে শ্যামা তাঁর প্রলয়ঙ্করী নাচটি নাচেন, সেই বিষয়ে একটি দৃশ্যময় বর্ণনা ও সাংকেতিক প্রতীকের সাহায্যে কবি আমাদের প্রস্তুত করেছেন।[৭] তিনি আরও লিখেছেন যে হৃদয়ের সঙ্গে ঠোঁট ও চোখের কল্পনা "সব রকম চৈতন্যের সীমার বাইরে অসামান্য বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামগ্রিক পরিস্থিতে সকল অবস্থার নিয়ন্তক শ্যামার যথার্থ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।"[৭]

প্রভাব[সম্পাদনা]

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ফ্রিডম স্ট্রাগল: সুভাষচন্দ্র বসু: হিজ আইডিয়াস অ্যান্ড ভিশন গ্রন্থের রচয়িতা রত্না ঘোষ বলেছেন, এই কবিতাটি "সুভাষচন্দ্র বসুর মনে অজানার প্রতি আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে এবং তিনি মাঝে মাঝেই এমনভাবে এই কবিতাটি পাঠ করতেন যে শুনে মনে হত যে তিনি নিজের আদর্শটি এই কবিতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন।[১০]

এই কবিতায় বর্ণিত আধ্যাত্মিক বা অজানার প্রতি আকর্ষণের দিকটির বর্ণনা সুভাষচন্দ্র বসুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি নিজের ভাবনা অনুসারে আনন্দময় "সীমাহীন দ্রুততা"র সঙ্গে এই কবিতাটি আওড়াতেন।[১১]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Vivekananda 2004, পৃ. 602
  2. Vivekananda 1989, পৃ. 103
  3. ৩.০ ৩.১ Macphail 2010, পৃ. 366।
  4. Nivedita 1968, পৃ. 93।
  5. "নাচুক তাহাতে শ্যামা" 
  6. "And let Shyama dance there" 
  7. ৭.০ ৭.১ ৭.২ Chakrabarti 1998, পৃ. 164
  8. Majumdar 1963, পৃ. 561, 565।
  9. ৯.০ ৯.১ Majumdar 1963, পৃ. 553
  10. Ghosh2006, পৃ. 12
  11. Ghosh 2006, পৃ. 12।
Bibliography