উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী
Upendra Kishore Ray real.jpg
উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী
জন্মউপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী
(১৮৬৩-০৫-১০)১০ মে ১৮৬৩
মসূয়া, ময়মনসিংহ, পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু১৯১৫ (বয়স ২৭–২৮)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
পেশালেখক
জাতীয়তাভারতীয়
সময়কালবাংলার নবজাগরণ
ধরনশিশুসাহিত্যিক
উল্লেখযোগ্য রচনাবলিছোটদের রামায়ণ, সন্দেশ
সন্তানসুকুমার রায়

উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (১২ই মে, ১৮৬৩ [১] - ২০শে ডিসেম্বর, ১৯১৫) বিখ্যাত বাঙালি শিশুসাহিত্যিক, বাংলা ছাপাখানার অগ্রপথিক। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার। সন্দেশ পত্রিকা তিনিই শুরু করেন যা পরে তাঁর পুত্র সুকুমার রায় ও পৌত্র সত্যজিৎ রায় সম্পাদনা করেন। গুপি-গাইন-বাঘা-বাইন, টুনটুনির বই ইত্যাদি তাঁরই অমর সৃষ্টি।

জন্ম ও পরিবার[সম্পাদনা]

উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৭শে বৈশাখ (১৮৬৩ সালের ১২ই মে)[১] ময়মনসিংহ জেলার বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে, যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। তাঁর পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। তাঁর ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তাঁর পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তাঁর পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাঁকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।তিনি বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধর। ময়মনসিংহের জমিদার শ্রীকৃষ্ণ রায়চৌধুরীর দুই পুত্র দত্তক নিয়েছিলেন মাধবি তথা আলেয়ার গর্ভজাত সিরাজ পুত্রকে। সিরাজ পুত্রের নয়া নামকরণ হয় যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। এভাবেই নতুন করে যাত্রা শুরু করে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশ। যা অনেকেরই অগোচরে ছিল। সেনাপতি মোহনলালের দুই বিশ্বস্ত সঙ্গী বাসুদেব এবং হরনন্দ ছাড়া এই বিষয়ে কেউই কিছু জানতেন না।

শ্রীকৃষ্ণ রায়চৌধুরীর পুত্র কৃষ্ণগোপাল দু’বার বিয়ে করলেও কোনও সন্তান হয়নি। তাঁর পরিবারেই বড় হয়ে ওঠেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। শুধু তাই নয় বেশ দাপটের সঙ্গেই সামাল দিয়েছেন ময়মনসিংহের জমিদারি। যদিও পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণগোপালবাবুর দুই স্ত্রী যুগলকিশোরের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত হন। এবং বিরোধ শুরু হয়। যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

এই সময়েই নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারেন যুগলকিশোর চৌধুরী। জানতে পারেন তিনি আসলে নবাব সিরাজ উদ দৌলার পুত্র। তাঁর দুই পালিত মা তাঁকে ইংরেজদের কাছে ধরিয়ে দিতে পারেন। সেই আশংকাও ছিল যুগলকিশোরের মনে। আর, ইংরেজরা জানতে পারলে কখনই সিরাজ পুত্রকে বাঁচিয়ে রাখতো না। সেই কারণে শ্রীহট্ট জেলায়(বর্তমান সিলেট জেলা)গিয়ে আত্মগোপন করেন যুগলকিশোর।

ফরিদপুর জেলার যাপুর গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবারের রুদ্রাণী দেবীকে বিয়ে করেছিলেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। তাঁর গর্ভেই হরকিশোর এবং শিবকিশোর নামের দুই পুত্রের জন্ম হয়। একইসঙ্গে জন্ম নেয় আরও চার কন্যা। অন্নদা, বরদা, মোক্ষদা এবং মুক্তিদা। পুত্র শিবকিশোর অল্প বয়সেই মারা যান।

শিবকিশোরের আয়ুও খুব বেশি ছিল না। শিব কিশোর রাজশাহী জেলার বৃকুৎসা গ্রামের কাশীনাথ মজুমদারের মেয়ে ভাগীরথী দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁর গর্ভে কৃষ্ণমণি নামে এক কন্যার জন্ম হয়। কৃষ্ণমণির অল্প বয়সেই মৃত্যু হয় পিতা শিবকিশোরের।

রুদ্রাণী দেবীর দুই পুত্র সন্তানের মৃত্যু ঘটলে যুগলকিশোর ফের বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী যমুনার গর্ভে জন্ম নেয় পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী। শেষ জীবনে এই পুত্র সন্তানকে নিজের জন্মের ইতিবৃত্ত বলে গিয়েছিলেন যুগলকিশোর। একইসঙ্গে অবগত করেছিলেন ইংরেজদের থেকে এই নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে। ১৮১১-১২ সালের মধ্যে মৃত্যু হয় যুগলকিশোরের। পিতার ইচ্ছে অনুসারে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে যুগলকিশোরকে সমাধিস্থ করেন প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী।

এরপরে প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে সিরাজ উদ দৌলার বংশ। প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল ১২ বছর বয়সে মারা যায়। দ্বিতীয় পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পরেন। এই বিষয়টি জানতে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়েছিলেন প্রাণকৃষ্ণনাথ।

পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোরকে নিজেদের পারিবারিক পরিচয় সম্পর্ক অবগত করে এই সকল বিশয় থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পিতার পরামর্শে এবং ইংরেজদের থেকে বাঁচতে নাম বদল নড়ে লেখাপড়ায় মন দেন। শৌরীন্দ্রকিশোর নাম বদল করে প্রথমে প্রসন্ন চন্দ্র রায়চৌধুরী এবং পরে প্রসন্ন কুমার দে বলে পরিচিত হন। স্কলারশিপ পেয়ে ১৮৪৮ সালে হিন্দু কলেজে ভরতি হয়েছিলেন। সেই সময়েই হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়।

প্রসন্ন কুমার দে ওরফে প্রসন্ন চন্দ্র চৌধুরী ওরফে শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তিনটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর গর্ভে একটি, দ্বিতীয় স্ত্রী মোহিনীর গর্ভে দু’টি এবং তৃতীয় স্ত্রী হিরন্ময়ীর গর্ভে ছয় পুত্র ও এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রসন্ন কুমার দের সন্তানের নাম হল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্য জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পিতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। যদিও নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশধরদের সঙ্গে বাংলার বিখ্যাত রায় পরিবারের কোনও যোগাযোগ নেই।

তাঁর পিতা কালীনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতে সুপ-িত। তাঁর ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তাঁর পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তাঁর পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরকিশোর রায়চৌধুরী তাঁকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

রায় পরিবার[সম্পাদনা]

 
উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী
 
বিধুমুখি
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সুকুমার রায়
 
সুপ্রভা রায়
 
 
সুখলতা রাও
 
সুবিনয় রায়
 
সুবিমল রায়
 
পূন্যলতা চক্রবর্তী
 
শান্তিলতা
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সত্যজিৎ রায়
 
বিজয়া রায়
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সন্দীপ রায়
 
ললিতা রায়
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সৌরদীপ রায়
 
 
 
 
 
 

শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভাল ফল করলেও ছোটোবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিল বাঁশী, বেহালা ও সঙ্গীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে

সাহিত্যজীবন[সম্পাদনা]

একুশ বছর বয়সে বিএ পাস করে ছবি আঁকা শিখতে আরম্ভ করেন উপেন্দ্রকিশোর। এই সময় তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হওয়ায় তাঁর অনেক আত্মীয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটে। ছাত্র থাকাকালীনই তিনি ছোটোদের জন্যে লিখতে আরম্ভ করেন। সেই সময়কার সখা, সাথী, মুকুল ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত বালক নামে মাসিক পত্রিকাগুলিতে তাঁর লেখা প্রকাশ হতে শুরু হয়। প্রথমদিকের (যেমন সখা, ১৮৮৩) প্রকাশিত লেখাগুলি ছিল জীববিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ।[২] তার পরে চিত্র অলঙ্করণযুক্ত গল্প প্রকাশিত হতে আরম্ভ হয়।

১৮৮৬ সালে ২৩ বছরের উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পক্ষের কন্যা বিধুমুখীর বিবাহ হয়, এবং তখনকার কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরের বিপরীতে লাহাদের বাড়ির দোতলায় কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরেরর সংসার জীবন শুরু হয়। উপেন্দ্রকিশোরের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলেরা হলেন সুকুমার, সুবিনয় ও সুবিমল, এবং মেয়েরা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা। প্রত্যেকেই শিশু সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। জ্যেষ্ঠা কন্যা সুখলতা রাও ও জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমার রায় উল্লেখযোগ্য।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সিটি বুক সোসাইটি থেকে তাঁর প্রথম বই "ছেলেদের রামায়ণ" প্রকাশিত হয়। এই বইটি সমাজে অতি আদরের সঙ্গে সমাদৃত হলেও মুদ্রণ সম্বন্ধে অতৃপ্ত উপেন্দ্রকিশোর ১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে তখনকার দিনের আধুনিকতম মুদ্রণযন্ত্রাংশাদি নিজের খরচায় আমদানি করেন, এবং ৭ নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনে নতুন ভাড়াবাড়ি নিয়ে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স নামে নতুন ছাপাখানা খোলেন। এখানের একটি কামরায় তিনি নিজের আঁকার স্টুডিও খোলেন এবং সেখানে হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করেন। ১৯১১ সালে তিনি বড় ছেলে সুকুমারকে বিলাতে পাঠান ফোটোগ্রাফী ও মুদ্রণ সম্বন্ধে উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্যে।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি পরলোক গমন করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. রায়চৌধুরী, হিতেন্দ্রকিশোর (১৯৮৪)। উপেন্দ্রকিশোর ও মসুয়া রায় পরিবারের গল্পসল্প। ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড। পৃষ্ঠা ১। 
  2. "Roychowdhury, Upendra Kishore"। Banglapedia। 
  • সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ রচিত ভূমিকা, উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র, তুলি কলম প্রকাশন

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]