চাঁটগাঁইয়া ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চাঁটগাঁইয়া
চাঁটগাঁইয়া: চিটাইঙ্গে, চাটগাঁইয়া বুলি
চাঁটগাঁইয়া.svg
উচ্চারণ[siʈaiŋga]
[saʈgaiyaŋ buli]
দেশোদ্ভববাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার
অঞ্চলচট্টগ্রাম অঞ্চল
জাতিতত্ত্বচাটগাঁইয়া জাতি, চাটগাঁমী জাতি, চাটগাঁইয়া বাঙালী
মাতৃভাষী
১ কোটি ৩০ লাখ (২০২০)[১]
বাংলা লিপি
লাতিন লিপি
আরবী হরফ
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩ctg
ভাষাবিদ তালিকা
ctg
গ্লোটোলগchit1275[২]
লিঙ্গুয়াস্ফেরা73-DEE-aa
এই নিবন্ধটিতে আইপিএ ফনেটিক চিহ্নসমূহ রয়েছে। সঠিক পরিবেশনার সমর্থন ছাড়া, আপনি প্রশ্ন বোধক চিহ্ন, বক্স, অথবা অন্যান্য চিহ্ন ইউনিকোড অক্ষরের পরিবর্তে দেখতে পারেন।
  চাঁটগাঁইয়া ভাষা ব্যবহারকারী এলাকা

চাঁটগাঁইয়া বা চাঁটগাঁইয়া বুলি বা চিটাইঙ্গা হল ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠির একটি সদস্য ভাষা এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ভাষা। বাংলা ভাষার সাথে চাঁটগাঁইয়ার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকায় একে প্রায়ই বাংলা প্রমিত ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও ভাষাদ্বয় পারস্পরিক একই অর্থে বোধগম্য হয় না।[৩] বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। ২০২০ সালে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টে প্রকাশিত বিশ্বের ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় স্থান পায় চাঁটগাঁইয়া ভাষা। যেটি ১ কোটি ৩০ লাখ কথ্য ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে পৃথিবীর ৮৮ তম বৃহত্তম ভাষা ও বাংলাদেশে কথ্য ভাষার দিক দিয়ে ১ম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।[১] একই তালিকায় বিশ্বে ৯৭তম স্থানে রয়েছে সিলেটি ভাষা, যেটি বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার দিক দিয়ে ২য় বৃহত্তম ভাষা। চাটগাঁইয়া বুলির নিজস্ব কোন অক্ষর না থাকায় এ ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে বাংলা অক্ষরে এ ভাষা লিখতে দেখা যায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে।[১]

শ্রেণীবিন্যাস[সম্পাদনা]

চাঁটগাঁইয়া ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের ইন্দো-আর্য শাখার পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্যের উপশাখা বাংলা-অসমীয়ের সদস্য। সমগোত্রীয় অন্যান্য ভাষাসমূহ হল সিলেটি, রোহিঙ্গা, বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া এবং বিহারি ভাষা তাছাড়া ইন্দো-আর্যের হিন্দির সাথে চাঁটগাঁইয়ার পরোক্ষ মিল রয়েছে। অন্যান্য বাংলা-অসমীয়া ভাষাসমূহের মত চাঁটগাঁইয়া পালি ভাষা থেকে এসেছে যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহের একটি কল্পিত পূর্বসূরী প্রত্ন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা এর উত্তরসূরী।.[৪]

ভৌগোলিক বিস্তার[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল প্রধানত চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম জেলা এবং কক্সবাজার জেলার মানুষেরা চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। এছাড়া রাঙামাটি, বান্দরবানখাগড়াছড়ি জেলার অধিকাংশ মানুষ এ ভাষায় কথা বলে থাকে। ২০২০ সালে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলা লোকের প্রায় সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ, যেটি সারাবিশ্বে ১০০টি কথ্য ভাষার মধ্যে ৮৮তম বৃহত্তম ভাষা।

ব্যাকরণ[সম্পাদনা]

চাঁটগাঁইয়া ভাষায় ব্যাকরণের ব্যবহার বাংলা ভাষার অনুরুপ তবে উপসর্গ, অনুসর্গ এবং অন্যান্য উপায়ে শব্দের কলেবর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য রয়েছে।

কাজটি গতকাল করেছি >হাম ইয়েন গেলদে হালিয়ে গইজ্জি/গইরগি

কাজটি এখন করছি >হাম ইয়েন ইয়া/এহন গরির

কাজটি আগামিকাল করব >হাম ইয়েন আইয়েদ্যে হালিয়ে গইজ্জুম/গইরগুম

শব্দ বিন্যাস[সম্পাদনা]

চাঁটগাঁইয়া ভাষার শব্দ বিন্যাস বা বাক্যগঠন হয় কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া ধারায়।

যেমনঃ ইঁতারা(তারা) হাঁমত(কাজে) যার গুঁই(যায়)।

কর্তা কর্ম ক্রিয়া
অ্যাঁই (আমি) বাত (ভাত) হ্যাই (খাই)।
ইঁতি (সে) টিবি (টিভি) চার (দেখছে)।
ইঁতে (সে) ছাইরকেলত (সাইকেলে) চর‌্যের (চড়ছে)।
ইঁতারা (তারা) খ্যালা (খেলা) হার (

(খলছে)।

কয়েকটি চাঁটগাঁইয়া শব্দের উদাহরণ[সম্পাদনা]

(একবচন) (বহুবচন)
কেতি ইয়েন (ক্ষেত টি) কেতি গিন (ক্ষেত গুলি)
ফটু ইয়েন (ছবি টি) ফটু গিন (ছবি গুলি)
ফাতা-ও (পাতা টি) ফাতা গিন (পাতা গুলি)
তার গান (তার টি) তার গিন (তার গুলি)
দুয়ার গান (দরজা টি) দুয়ার গিন (দরজা গুলি)
ফা'র-গো (পাহাড় টি) ফা'র গুন (পাহাড় গুলি)
দেবাল ইয়েন (দেয়াল) দেবাল ইয়ুন (দেয়াল গুলি)
বই -ও (বইটি) বই উন (বইগুলো)
মানুষ উয়া/ইবে (মানুষ) মানুষ উন (মানুষ গুলো)
উগ্গ ফাতা (একটি পাতা) হদুউন ফাতা (কিছু পাতা)
এক্কান ফটু (একটি ছবি) হতিক্কিন/হদিইয়িন ফটু (কিছু ছবি)
…---------অথবা---------- … …----------অথবা----------- …
ফাতা উগ্গ (একটি পাতা) ফাতা হদুইন (কিছু পাতা)
ফটু এক্কান (একটি ছবি) ফটু হদিইয়িন (কিছু ছবি)
মরদ ফোয়া ইতে(ছেলেটি) মরদ ফোয়া এগুন (ছেলে গুলা)
মাইয়া পোয়া ইবে(মেয়েটি) মাইয়া পোয়া এগুন (মেয়েগুলো)
(বাংলা) (চাঁটগাঁইয়া)
লেবু হঁজি/হঁচি
ছাগল ছঁল্
মুরগি কুঁরি কুরা
মোরগ রাতা কুরা
প্রধান দরজা মেইন দোয়ার
চালচলন হাচ্চা হাছিয়ুত/হাছলত
বাড়ির পিছনে বারিসদি/বারির পিছদি/
মই আট্টা/দাহর/শিরি
টাকা টিঁয়া
সাঁকো অঁ
সকাল বেইন্নে
সন্ধ্যা আজইন্নে/আজিইন্না
ভাল গম
চাকরি চঁরি
বজ্রপাত টাডার
একটু করে ইক্কিনি গরি/এক্কানা গরি
দাড়াঁন থিয়/থিঁয়ো
দক্ষিণ দইন
ঝগড়া হঁইজ্জে
গোয়ালঘর গরুর গোতাইল/গরুর ওরা
মুরগিরঘর কুরর আরাইল
পাকঘর বসখানা, অঁলা
পায়খানা পেহানা/টাট্টিহানা
পাগল পঅল
হাতি আতি/ মৌ
মসজিদ মছৈদ
বেড়া টিয়ারা,জলি,বেরা
ঢেঁড়স বেরা
আসমান আসমান
মেঘ মেওলা
সাঁতার আঁচুর
বর্তা চান্নি
জাম্বুরা তরুনজা/ হন্নাল
আগামি কাল আইদ্দে হালিয়া
তুই তুই
আপনি অনে
তুমি তুঁই
আসল আছল
অভদ্র বেরাইজ্জে
কলম হলম
গম গিঁও
চাল চইল
ছেলেমেয়ে ফোয়াছা
খাওয়াদাওয়া হানাফিনা
জ্যোৎস্না চান্নিপঁর
বৃহস্পতিবার বিশিদ বার
শুক্রবার শুক্কুর বার
বড় ভাই বদ্দা
খারাপ হারাপ
ব্যাথা দুঃখপাই
কাঠাল হাট্টল
কমলা হঁঅলা
একটু দেখি এক্কানা চাই
আজকে আজিয়ে
কালকে হালিয়ে
অয়াওও অবাজি
আরেকটু আরেক্কানা

বাংলা বার মাস চাটগাঁইয়া ভাষায়[সম্পাদনা]

(বাংলা) (চাঁটগাঁইয়া)
বৈশাখ বৈশাখ
জৈষ্ঠ জেট
আষাঢ় আষার
শ্রাবন শঅন
ভাদ্র ভাদঅ
আশ্বিন আশিন
কার্তিক হাতি
অগ্রহায়ণ অঁন
পৌষ পোষ
মাঘ মাঘ
ফাল্গুন ফৌন
চৈত্র চৈত

মিডিয়া ও গানে ব্যবহার[সম্পাদনা]

শেফালী ঘোষ এবং শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে বলা হয় চট্টগ্রামের চাটগাঁইয়া গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞি। এছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামে রয়েছে চাটগাঁইয়ে ভাষার শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদ। মাইজভান্ডারী গান ও কবিয়াল গান চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য। কবিয়াল রমেশ শীল একজন বিখ্যাত কিংবদন্তি শিল্পী ও গীতিকার। আবদুল গফুর হালী চাটগাঁইয়া ভাষায় বেশিরভাগ জনপ্রিয় গানগুলোর গীতিকার ও সুর করেছেন।তিনি প্রায় দুই হাজারের ও অধিক চাটগাঁইয়ে ভাষায় গান রচনা করেছেন এবং সুর করেছেন।

চট্টগ্রামের ভাষায় অনেক গান রয়েছে। তার মধ্যে কিছু গানের নাম উল্ল্যেখ করা হল:

  • মন হাছারা মাঝি তোর সাম্পানত চৈত্তাম নঁ।
  • অ জেডা ফৈরার বাপ
  • বাঁশখালি মইশখালি পাল ওড়ায়া দিলে সাম্পান
  • সাম্পান কেককুরত
  • মধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা
  • টেকনাইফফা ফনা সুয়ারি মইশখাইল্লা পান রে
  • বাইক্কা টিয়া দে
  • আই আইলে এনকা গরর
  • হেড মাস্টরে তোয়ারে তোয়ার
  • আই ভাত নাহায়ুম গোসসা অইয়ুম
  • যার গরত গাই গরু নাই তারত বেছের দই
  • ঘুম যারে বাচা তুই
  • সুর্য ওড়েরে ভাই লাল মারি
  • ওরেও হালা ভোমরা আই আইজ ফুলর হরা
  • বন্ধু আঁর দুয়ার দি যঅর
  • আইলা অসমত বেইন্না ফজরত
  • হতদিন অইয়িদে বারিত নজাইদ্দি
  • অ হালাচান গলার মালা
  • পিরিত মানি পুডুর পাডুর
  • নযাইও দুবাই বন্ধু আরে ফেলাই
  • যদি সুন্দর এক্কান মন ফাইতাম
  • বানু রে অ বানু
  • কুতুবদিয়া আর বাড়ি
  • নাতিন বরই হা
  • রসর হতা হই হই
  • কইলজার ভিতর গাথি রাইক্কুম তোয়ারে
  • বাইন দুয়ার দি নোয়াইসস তুই
  • ও ভাই আঁরা চাঁটগাইয়া নওজোয়ান
  • রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেলগই

বর্তমানে চট্টগ্রামের ভাষায় সিপ্লাস টিভি সম্প্রচারিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে চট্টগ্রামের ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Ghosh, Iman (২০২০-০২-১৫)। "Ranked: The 100 Most Spoken Languages Around the World"Visual Capitalist (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-০৮ 
  2. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Chittagonian"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট। 
  3. "Chittagonian A language of Bangladesh"। Ethnologue: Languages of the World, Sixteenth edition। ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  4. Ethnologue (২০০৫)। "Chittagonian, a language of Bangladesh"