ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ঢাকাইয়া কুট্টি
পুরান ঢাকাইয়া
দেশোদ্ভববাংলাদেশ
অঞ্চলপুরান ঢাকা
মাতৃভাষী

বাংলা লিপি
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩
গ্লোটোলগনাই[১]

ঢাকাইয়া কুট্টি, পুরান ঢাকাইয়া নামেও পরিচিত, বা শুধু ঢাকাইয়া, হচ্ছে একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যে ভাষায় বাংলাদেশের পুরান ঢাকার কুট্টি সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা কথা বলেন। শব্দভান্ডারে কিছুটা বৈচিত্র্য থাকলেও এই ভাষাটি মূলত প্রমিত বাংলার সাথে যথেষ্ট বোধগম্য। ভাষাটি এখন আর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয় না, যদিও ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয়দের দ্বারা বারো পঞ্চায়েতে কখনও কখনও এটি ব্যবহার করা হত।[২][৩] ঢাকা শহর বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগতদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার্থে যারা এই উপভাষার সাথে পরিচিত নয় এবং দেশের সরকারী মাধ্যম হওয়ায় অনেক পরিবারে শিশুদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য এই ভাষার ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে।[৪]

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

বিপুল পরিমাণে ফার্সিআরবি শব্দভান্ডারে সমৃদ্ধ এই উপভাষাটি একটি পূর্ব বাংলা-ভিত্তিক ক্রেওল ভাষা। স্ট্যান্ডার্ড বাংলার সাথে তুলনা করলে এটিতে কেবল সামান্য মহাপ্রাণ ধর্মী শব্দ রয়েছে। ঘ [gʱ], থ [tʃʰ], ধ [d̪ʱ], ভ [bʱ]- মহাপ্রাণ বর্ণসমূহ এই ভাষায় পাওয়া যায় না।[৫]

প্রমিত বাংলা ঢাকাইয়া কুট্টি
ছেলে পোলা
মেয়ে মাইয়্যা
সত্যি হাছা
কেন কেলা
কীভাবে কেমতে
শুন হুন
লাউ/কদু কদ্দু[৬]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মুঘল আমলে, সুবাহ বাংলা ধান চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং জাহাঙ্গীরনগর (বর্তমানে ঢাকা) প্রদেশের রাজধানী ছিল।  ঢাকা কেন্দ্রিক আঠারো শতকের মধ্যভাগে চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্য ছিল। চাল রফতানি করা ব্যবসায়ীরা মূলত মারোয়ারি এবং মধ্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন।  এই বণিকরা পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে চাল সংগ্রহ করত। প্যাকেজিংয়ের আগে ঢেঁকি ব্যবহার করে প্রথমে চাল পরিষ্কার করা হত এবং এই প্রক্রিয়াটিকে বাংলায় কুটা বলা হয়। অনেক স্থানীয় ধান চাষকারী এটি করার জন্য নিযুক্ত হয়েছিল।  তারা এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসতেন এবং সেখানে যাওয়ার ও কাজটি করার জন্য দীর্ঘ এবং ক্লান্তি হওয়ায় তাদের অনেকে ঢাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। এই মাইগ্রেশনটি আনুুমানিক ১৭৬০ সালে হয়েছিল। তবে সকলেই ধানের ব্যবসায় জড়িত ছিল না।  ঢাকায় মুঘলদের উপস্থিতির অর্থ ছিল যে সেখানে সাধারণত অনেক বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল, তাই তারা ঢাকাইয়া উর্দুভাষী নবাবদের এবং অন্যান্য অভিজাত পরিবারগুলির জন্য খানসামাহ, সৈন্য, প্রহরী, বাবুর্চি এবং চৌফারদের মতো অন্যান্য পেশা গ্রহণ করেছিল।[৭][৮] এই গোষ্ঠীগুলির লোকেরা একত্রে বাস করত এবং তাদের হিন্দুস্তানি লোকদের সাথে কথোপকথন এবং আড্ডাায় জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের প্রধান পেশা তাদের কুট্টি হিসাবে পরিচিতি দেয়। বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভাষার সাথে কথোপকথনের ফলে কুট্টি ভাষার জন্ম হয়।[৯] বিংশ শতাব্দীতে ঢাকার বেসিস পঞ্চায়েতগুলি ঢাকাইয়া উর্দু বা ঢাকাইয়া কুট্টির মাধ্যমে আলোচনা করত।[১০] অবশেষে, পুরান ঢাকার লোকালয়ে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ এই উপভাষায় কথা বলতেন।[১১]

সাহিত্য এবং মিডিয়া[সম্পাদনা]

ঢাকাইয়া ভাষায় লিখিত সাহিত্য রয়েছে। চান্নিপশর রাইতের লৌড় নামে জুয়েল মাজহারের একটি জনপ্রিয় কবিতা রয়েছে।[১২] শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ ঢাকাইয়া ভাষায় লেখা।[১৩] ঢাকাইয়া নাটকগুলি দেশজুড়ে জনপ্রিয়, এমনকি ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ও এই উপভাষায় সংলাপ লিখেছেন।[১৪] ঢাকাইয়া কুট্টি লোককথা সমূহ "কুট্টি কৌতুক" নামে এবং সাধারণত উপভাষার রম্য দিকের জন্য বিখ্যাত।[১৫] এটিকে বাংলা উপভাষাগুলির মধ্যে একটি মর্যাদাবান উপভাষা বলে মনে করা হয়।[১৬] সাধারণত "ঢাকাইয়া" লোকগাঁথায় উল্লেখিত, তারা বহিরাগতদের বা অ-ঢাকাইয়া বাঙালিদের "গাঁইয়া" নামে অভিহিত করে, যার অর্থ গ্রাম থেকে আগত,[১৭] এবং কোলকাতার অধিবাসীদের বিশেষ করে ডেমচি নামে ডাকে।[১৮]

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার লিখিত ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষার অভিধান - ঢাকার বাসিন্দারের দ্বারা কথা বলা, ঢাকাইয়া কুট্টি উপভাষা নামে পরিচিত বাংলার উপভাষা শব্দের অভিধান। (ঐতিহ্য, ২০১৫)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "ঢাকাইয়া কুট্টি"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট। 
  2. Prof. Dr. Hafiza Khatun (১৭ জানু ২০১৭)। Dhakaiyas and Gentrification in Old Dhaka (PDF)Asiatic Society of Bangladesh। পৃষ্ঠা 4। 
  3. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  4. Banik, Bijoy Krishna (২০১৪)। Kuttis of Bangladesh: Study of a Declining Culture (PDF) (গবেষণাপত্র)। Rajshahi University 
  5. "ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা - দৈনিক ইত্তেফাক ঈদ সংখ্যা - The Daily Ittefaq"Ittefaq.com.bd। সংগ্রহের তারিখ ৯ অক্টোবর ২০১৭ 
  6. "ঢাকার ভাষা"The Daily Sangram। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-৩০ 
  7. কবির, আহমেদ মির্জা (১৯৯৫)। শতবর্ষের ঢাকা। রাশেদা হাসনা। 
  8. Bhowmik, Satya N. (১৯৯৩)। Die Sprachenpolitik der Muslim-League-Regierung und die Entstehung der Bengali-Sprachbewegung in Ostbengalen, 1947-1956 (জার্মান ভাষায়)। Stuttgart: F. Steiner। পৃষ্ঠা ৬০। আইএসবিএন 3-515-06383-8ওসিএলসি 29492392 
  9. মোশাররফ হোসেন ভূঞা। ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষার অভিধান। প্যারীদাস রোড-বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০: ঐতিহ্য। আইএসবিএন 978-984-776-204-3ওসিএলসি 908660623 
  10. মুনতাসীর মামুন (২০১২)। "পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, ঢাকা"ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  11. "Enthralling seminar on 'Dhakaiya Kutti' language and humor"American International University-Bangladesh (AIUB)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-৩০ 
  12. "কলকাতার সল্টলেকে ঐহিক'র নিবিড় সাহিত্য-আড্ডা"Banglanews24.com। ১৩ ফেব্রু ২০২০। 
  13. ঢাকাইয়া ভাষায় আর কবিতা লেখেননি শামসুর রাহমান, প্রথম আলো, ২১ মার্চ ২০২০
  14. Haider, Daud (২ মে ২০১৯)। "Daud Haider remembering Satyajit Ray: সত্যজিৎ ও ঢাকাইয়া কুট্টি"The Indian Express 
  15. Bandopadhyay, Bhanu। "Atmokotha"। Bhanu Samagra। পৃষ্ঠা 17–20। 
  16. Alam, Shahid (২১ ফেব্রু ২০১৩)। "Reflections on a contemporary phenomenon"The Daily Star 
  17. ইমাম, আক্তার (১৯৮৮)। দূরের ছায়া। পৃষ্ঠা ৭। 
  18. Jalil, Azizul, 1933- (২০০৬)। Turbulence and tranquillity। Dhaka: University Press। পৃষ্ঠা ২০। আইএসবিএন 984-05-1751-1ওসিএলসি 70251520