বিষয়বস্তুতে চলুন

বঙ্গালী উপভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বঙ্গালী
পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা
বঙ্গীয় • বঙ্গ উপভাষা
দেশোদ্ভববাংলাদেশ
অঞ্চলঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, ফরিদপুর অঞ্চল বরিশাল বিভাগ, খুলনা বিভাগ, কুমিল্লা বিভাগ, সিলেট বিভাগ (সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ অঞ্চল), ত্রিপুরা
মাতৃভাষী

উপভাষাময়মনসিংহীয়, ঢাকাইয়া কুট্টি, ঢাকাইয়া, বরিশালি, নোয়াখালীয়, ত্রিপুরা খাস বাংলা, খুলনাইয়া ইত্যাদি
বাংলা লিপি
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩
গ্লোটোলগeast2744  (Eastern Bengali)[]

বঙ্গালী উপভাষা বা পূর্ববঙ্গীয় বাংলা হলো উপভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলা ভাষার সবথেকে বড় উপভাষা। অধুনা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এই উপভাষায় কথা বলে।[]

নামসমূহ

[সম্পাদনা]

এটি বঙ্গালী [] নামেও পরিচিত, এছাড়াও পূর্ববঙ্গীয়,[] প্রাচ্য বাংলা,[] বঙ্গ,[] অথবা বঙ্গীয় নামেও পরিচিত। চট্টোপাধ্যায় প্রায়ই একটি সাধারণতর রূপের পূর্ববঙ্গীয় বাংলাকে প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ববঙ্গীয় নামে উল্লেখ করতেন, যা তিনি অন্যান্য বাংলা উপভাষার সঙ্গে তুলনার সুবিধার্থে ব্যবহার করতেন।[]

পূর্ববঙ্গীয় বাংলা প্রচিলিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঘটিদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালদের ঐতিহাসিক সংযুক্তির কারণে পশ্চিমবঙ্গে বাঙাল ভাষা নামে সুপরিচিত। এটি কখনো কখনো খাইছি-গেছি বাংলা[] (ইংরেজি: khaisi-gesi Bangla) নামেও পরিচিত, যা দ্বারা উপভাষাগত দিক থেকে প্রমিত বাংলার সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষাগুলোর উচ্চারণের পার্থক্যকে তুলে ধরে। যেমন "আমি খেয়েছি" (খেয়েছি kheẏechhi — প্রমিত বাংলা) বনাম "আমি খাইছি" (খাইছি khaisi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা), এবং "আমি গিয়েছি" (গিয়েছি giẏechhi) বনাম গেছি gesi)।

একই রকম আরেকটি নাম হলো খাইতাছি-যাইতাছি বাংলা (ইংরেজি: khaitasi-jaitasi Bangla), যেখানে উদাহরণ হিসেবে দেয়া হয় "আমি খাচ্ছি" (khacchi — প্রমিত বাংলা বনাম "আমি খাইতাছি" (khaitasi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা), এবং "আমি যাচ্ছি" (jacchhi — প্রমিত বাংলা) বনাম "আমি যাইতাছি"(jaitasi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা)।

বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

ধ্বনিতাত্ত্বিক

[সম্পাদনা]

১. বঙ্গালী উপভাষার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য সর্বত্র অপিনিহিতির ব্যবহার। যেমন — আজি > আইজ, কাজিয়া > কাইজ্জা, অন্য > অইন্য > করিয়া > কইর‍্যা ইত্যাদি।

২. কখনাে কখনাে অনুনাসিক স্বরধ্বনিতে অর্ধঅনুনাসিকের ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন — চন্দ্র→চান্দ্, স্কন্ধ→কান্দ্; ক্রিয়া — বন্ধ→বান্দা, রন্ধন→রান্দা ও ক্রন্দন→কান্দা। একটি শব্দে সতোনাসিক্যভবনও পাওয়া যায়, যেমন — বানর→বান্দর।

৩. ‘এ’ ধ্বনি বেশিভাগ সময় ‘অ্যা’ হিসেবে উচ্চারিত হয়। যেমন — দেশ > দ্যাশ, দেখা > দ্যাখা/দ্যাহা, বেল > ব্যাল, মেঘ > ম্যাগ, ইত্যাদি।

৪. মহাপ্রাণ ঘোষ ধ্বনি অল্পপ্রাণ ঘোষ ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — ভাত > বাত, ভাই > বাই, ঘর > গর, দুধ > দুদ ইত্যাদি।

৫. তাড়নজাত ধ্বনি ‘ড়’ ও ‘ঢ়’ এর উচ্চারণ সবসময় ‘র’ হয়। যেমন — গাড়ি > গারি, পড়া > পরা, আষাঢ় > আষার, ইত্যাদি।

৬. ঘটমান ক্রিয়া পুরাঘটিত ক্রিয়ার বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়, তবে ‘ছ’ এর পরিবর্তে ‘’ উচ্চারিত হয়; কিন্তু ঢাকাইয়া কুট্টিতে ‘’ প্রমিত বাংলার মত একইভাবে উচ্চারিত হয়। যেমন — করেছি > করসি, করেছিলাম > করসিলাম, হয়েছি > হইসি/অইসি, ইত্যাদি।

৭. বেশিরভাগ বঙ্গালী উপভাষায় স্পৃষ্ট ধ্বনি চ, ছ, জ, ঝ, ফ ধ্বনি উষ্মধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — চ > ৎস, ছ > স /s/, জ, ঝ > জ় /z/, ফ > ফ় /f/। করেছে > করসে, যাই > জ়াই, ইত্যাদি। তবে যুক্তবর্ণ হলে মূল ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — আচ্ছা, ইচ্ছা, ইত্যাদি।

৮. পদের আদ্যাক্ষর ‘শ’ ‘ষ’ ‘স’ ধ্বনি ‘হ’ ধবনিতে পরিবর্তিত হয়। যথা- শালিক > হালিক, শামুক > হামুক, সকাল > হকাল, শৌল > হৌল, শালা > হালা, শশুর > হউর সেইটা > হেইডা, সেইদিন > হেইদিন, সকল > হগল/হক্কল ইত্যাদি।

৯. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় অনেকসময় পদের আদ্যক্ষর ‘হ’ ধ্বনি ‘অ’ ধ্বনিতে কয়েকটি শব্দে পরিবর্তিত হয়ে যায়; যথা- ‘অওয়া’ (হওয়া), ‘অইলো’ (হল) ইত্যাদি।

১০. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় পদের অন্তে থাকা ‘ট’ ও ‘ঠ’ ধ্বনির উচ্চারণ ‘ড’ তে পরিবর্তিত হয়; যথা- ‘এইডা’ (এইটা), ‘হেইডা’ বা ‘ওইডা’ (সেইটা/ওইটা), ‘বেডা’ (বেটা), ‘ডা’ (টা), জেডা (জেঠা), ইত্যাদি।

১১. ‘ও’ ধ্বনির উচ্চারণ ‘উ’ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়; যথা- ‘লুক’ (লোক), ‘তুমার’ (তোমার), ‘কুন’ (কোন), ‘কুনডা’ (কোনটা), ‘বুকা’ (বোকা), ‘বুঝা’ (বোঝা), ‘খুজা’ (খোঁজা), ইত্যাদি। তবে দক্ষিণবঙ্গের খুলনা, বরিশাল এবং ফরিপুরের কিছু অংশের লোকেরা প্রমিত বাংলার মতোই ‘ও’ এর উচ্চারণ করে।

১২. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় পদের অন্তে ‘ক’ ও ‘খ’ ধ্বনি ‘হ’ ধ্বনি হয়। যথা- টাকা > টাহা/ট্যাহা, দেখা > দ্যাহা ইত্যাদি।[][১০]

রূপতাত্ত্বিক

[সম্পাদনা]
  1. কর্মসম্প্রদানের একবচনে “রে” বিভক্তি, যথাঃ হ্যারে কও = তাকে বল, আমারে/মোরে দেও = আমাকে দাও।
  2. কর্তৃকারকে এক বচনে “এ্যা” বিভক্তি। যথাঃ সফিজ্যা বাড়ী গেছে, করিম্যা এদিকে আয়।
  3. অধিকরণ কারকে “এ” এবং ”তে”/”ত” বিভক্তি। যেমন: ঘরে যাই, বাড়িতে/বাড়িত যাইতাছি ইত্যাদি।
  4. সর্বনাম পদের কর্তৃকারকের বহুবচনে "রা" বিভক্তি হয়। যেমন: আমরা/মোরা, তোমরা, তোরা, আপনেরা ইত্যাদি।
  5. কর্তৃকারক ছাড়া অন্য সব কারকের বহুবচনে “গো” বা “গোর” ব্যবহৃত হয়। যেমন: আমাগো/মোগো/আমগোর (আমাদের/মোদের), তোমাগো/তোমগোর (তোমাদের), তোগো/তোগোর (তোদের) ইত্যাদি। দক্ষিণে খুলনা এবং যশোর এবং কুষ্টিয়ার উপভাষার বহুবচনে যথাক্রমে “গে” এবং “গের” ব্যবহৃত হয়। যেমন: আমাগে/আমাগের, তোমাগে/তোমাগের ইত্যাদি। রাঢ়বঙ্গের নদীয়া এবং ২৪ পরগনা জেলার একাধিক অঞ্চলেও “গো” এবং “গের” বিভক্তির ব্যবহার দেখা যায়।
  6. বাংলার সাধু মতোই মধ্যম পুরুষের সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি হলো “(ই)বে”/“(ই)ব”। যেমন: যাইবে/যাইব, খাইবে/খাইবো, লাগবে/লাগবো।
  7. উত্তম পুরুষের বর্তমান কালে মূল ধাতুর সঙ্গে ‘ই’ প্রত্যয় হয়। যেমন - করি, যাই, খাই ইত্যাদি।
  8. উত্তম পুরুষের সাধারণ অতীতে ‘লাম’ যেমন — করলাম, গেলাম, দিলাম যেমন — করলাম, গেলাম, দিলাম নিত্যবৃত্ত অতীতে ‘তাম’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয় যথা: করতাম, যাইতাম, দিতাম ইত্যাদি।
  9. বেশিরভাগ বঙ্গালী উপভাষায় ভবিষ্যতকালের উত্তম পুরুষের ক্রিয়া পদে স্থানভেদে ‘উম', 'মু' এবং 'আম' বিভক্তি হয়। যথাঃ করমু/করুম/করাম, খামু/খায়াম ইত্যাদি। তবে দক্ষিণের খুলনা-যশোরের বাংলায় 'বানি' বিভক্তি হয়। যেমন: করবানি, খাবানি, যাবানি ইত্যাদি।

ধ্বনিব্যবস্থা

[সম্পাদনা]
স্বরধ্বনি
সম্মুখকেন্দ্রীয়পশ্চাৎ
সংবৃত ~
i
~
u
সংবৃত-মধ্য ()

(e)

()

(o)

বিবৃত-মধ্য /অ্যা
æ~ɛ

ɔ
বিবৃত
ɐ
ব্যঞ্জনধ্বনি
উভয়ৌষ্ঠ্য দন্ত দন্তমূলীয় তালু-দন্তমূলীয়/দন্তমূলীয় তালু-দন্তমূলীয়/তালব্য পশ্চাত্তালব্য কণ্ঠনালীয়
নাসিক্য mnŋ
স্পর্শ অঘোষ p

t̪ʰ


t̠ʰ
~
tɕʰ~tʃʰ
k
~(x)
ঘোষ b

d̪ʱ

d̠ʱ
~
dʑʱ~dʒʱ
ɡ~(ɣ)
উষ্ম অঘোষ প, ফ (ɸ~f)স, শ sস, শ (ʃ) h~ɦ
ঘোষ ভ (β~v)
নৈকট্য (w)l~ য় j
তাড়ন অল্পপ্রাণ ɹ~ɾ
মহাপ্রাণ

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Eastern Bengali"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
  2. Bangladesh Quarterly (ইংরেজি ভাষায়)। Department of Films & Publications, Government of Bangladesh.। ২০০২। পৃ. ৬।
  3. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Sen 1957 136 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  4. Morshed, Abul Kalam Manzur (৫ মে ২০১৪)। উপভাষাবাংলাপিডিয়া। ২৯ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  5. (Shahidullah 1958, পৃ. 62)
  6. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Chatterji 1926 138 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  7. (Chatterji 1926, পৃ. 141)
  8. Esh, Dhruba (৩ অক্টোবর ২০১৯)। তোমার যে ফুলBhorer Kagoj
  9. Shaw, Dr. Rameswar (১৯৮৪)। সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা (in Bengali)। Kolkata: Pustak Bipani. ISBN 81-85471-12-6. Retrieved 29 June 2025।
  10. Admin (৯ জুলাই ২০২৪)। "বঙ্গালী উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলি উদাহরণসহ আলোচনা কর"সাহিত্যের পাঠশালা (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২ জুন ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৫