বঙ্গালী উপভাষা
| বঙ্গালী | |
|---|---|
| পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা | |
| বঙ্গীয় • বঙ্গ উপভাষা | |
| দেশোদ্ভব | বাংলাদেশ |
| অঞ্চল | ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, ফরিদপুর অঞ্চল বরিশাল বিভাগ, খুলনা বিভাগ, কুমিল্লা বিভাগ, সিলেট বিভাগ (সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ অঞ্চল), ত্রিপুরা |
মাতৃভাষী | |
| উপভাষা | ময়মনসিংহীয়, ঢাকাইয়া কুট্টি, ঢাকাইয়া, বরিশালি, নোয়াখালীয়, ত্রিপুরা খাস বাংলা, খুলনাইয়া ইত্যাদি |
| বাংলা লিপি | |
| ভাষা কোডসমূহ | |
| আইএসও ৬৩৯-৩ | – |
| গ্লোটোলগ | east2744 (Eastern Bengali)[১] |
বঙ্গালী উপভাষা বা পূর্ববঙ্গীয় বাংলা হলো উপভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলা ভাষার সবথেকে বড় উপভাষা। অধুনা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এই উপভাষায় কথা বলে।[২]
নামসমূহ
[সম্পাদনা]এটি বঙ্গালী [৩] নামেও পরিচিত, এছাড়াও পূর্ববঙ্গীয়,[৪] প্রাচ্য বাংলা,[৫] বঙ্গ,[৬] অথবা বঙ্গীয় নামেও পরিচিত। চট্টোপাধ্যায় প্রায়ই একটি সাধারণতর রূপের পূর্ববঙ্গীয় বাংলাকে প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ববঙ্গীয় নামে উল্লেখ করতেন, যা তিনি অন্যান্য বাংলা উপভাষার সঙ্গে তুলনার সুবিধার্থে ব্যবহার করতেন।[৭]
পূর্ববঙ্গীয় বাংলা প্রচিলিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঘটিদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালদের ঐতিহাসিক সংযুক্তির কারণে পশ্চিমবঙ্গে বাঙাল ভাষা নামে সুপরিচিত। এটি কখনো কখনো খাইছি-গেছি বাংলা[৮] (ইংরেজি: khaisi-gesi Bangla) নামেও পরিচিত, যা দ্বারা উপভাষাগত দিক থেকে প্রমিত বাংলার সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষাগুলোর উচ্চারণের পার্থক্যকে তুলে ধরে। যেমন "আমি খেয়েছি" (খেয়েছি kheẏechhi — প্রমিত বাংলা) বনাম "আমি খাইছি" (খাইছি khaisi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা), এবং "আমি গিয়েছি" (গিয়েছি giẏechhi) বনাম গেছি gesi)।
একই রকম আরেকটি নাম হলো খাইতাছি-যাইতাছি বাংলা (ইংরেজি: khaitasi-jaitasi Bangla), যেখানে উদাহরণ হিসেবে দেয়া হয় "আমি খাচ্ছি" (khacchi — প্রমিত বাংলা বনাম "আমি খাইতাছি" (khaitasi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা), এবং "আমি যাচ্ছি" (jacchhi — প্রমিত বাংলা) বনাম "আমি যাইতাছি"(jaitasi — পূর্ববঙ্গীয় বাংলা)।
বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]ধ্বনিতাত্ত্বিক
[সম্পাদনা]১. বঙ্গালী উপভাষার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য সর্বত্র অপিনিহিতির ব্যবহার। যেমন — আজি > আইজ, কাজিয়া > কাইজ্জা, অন্য > অইন্য > করিয়া > কইর্যা ইত্যাদি।
২. কখনাে কখনাে অনুনাসিক স্বরধ্বনিতে অর্ধঅনুনাসিকের ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন — চন্দ্র→চান্দ্, স্কন্ধ→কান্দ্; ক্রিয়া — বন্ধ→বান্দা, রন্ধন→রান্দা ও ক্রন্দন→কান্দা। একটি শব্দে সতোনাসিক্যভবনও পাওয়া যায়, যেমন — বানর→বান্দর।
৩. ‘এ’ ধ্বনি বেশিভাগ সময় ‘অ্যা’ হিসেবে উচ্চারিত হয়। যেমন — দেশ > দ্যাশ, দেখা > দ্যাখা/দ্যাহা, বেল > ব্যাল, মেঘ > ম্যাগ, ইত্যাদি।
৪. মহাপ্রাণ ঘোষ ধ্বনি অল্পপ্রাণ ঘোষ ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — ভাত > বাত, ভাই > বাই, ঘর > গর, দুধ > দুদ ইত্যাদি।
৫. তাড়নজাত ধ্বনি ‘ড়’ ও ‘ঢ়’ এর উচ্চারণ সবসময় ‘র’ হয়। যেমন — গাড়ি > গারি, পড়া > পরা, আষাঢ় > আষার, ইত্যাদি।
৬. ঘটমান ক্রিয়া পুরাঘটিত ক্রিয়ার বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়, তবে ‘ছ’ এর পরিবর্তে ‘স’ উচ্চারিত হয়; কিন্তু ঢাকাইয়া কুট্টিতে ‘ছ’ প্রমিত বাংলার মত একইভাবে উচ্চারিত হয়। যেমন — করেছি > করসি, করেছিলাম > করসিলাম, হয়েছি > হইসি/অইসি, ইত্যাদি।
৭. বেশিরভাগ বঙ্গালী উপভাষায় স্পৃষ্ট ধ্বনি চ, ছ, জ, ঝ, ফ ধ্বনি উষ্মধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — চ > ৎস, ছ > স /s/, জ, ঝ > জ় /z/, ফ > ফ় /f/। করেছে > করসে, যাই > জ়াই, ইত্যাদি। তবে যুক্তবর্ণ হলে মূল ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়। যেমন — আচ্ছা, ইচ্ছা, ইত্যাদি।
৮. পদের আদ্যাক্ষর ‘শ’ ‘ষ’ ‘স’ ধ্বনি ‘হ’ ধবনিতে পরিবর্তিত হয়। যথা- শালিক > হালিক, শামুক > হামুক, সকাল > হকাল, শৌল > হৌল, শালা > হালা, শশুর > হউর সেইটা > হেইডা, সেইদিন > হেইদিন, সকল > হগল/হক্কল ইত্যাদি।
৯. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় অনেকসময় পদের আদ্যক্ষর ‘হ’ ধ্বনি ‘অ’ ধ্বনিতে কয়েকটি শব্দে পরিবর্তিত হয়ে যায়; যথা- ‘অওয়া’ (হওয়া), ‘অইলো’ (হল) ইত্যাদি।
১০. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় পদের অন্তে থাকা ‘ট’ ও ‘ঠ’ ধ্বনির উচ্চারণ ‘ড’ তে পরিবর্তিত হয়; যথা- ‘এইডা’ (এইটা), ‘হেইডা’ বা ‘ওইডা’ (সেইটা/ওইটা), ‘বেডা’ (বেটা), ‘ডা’ (টা), জেডা (জেঠা), ইত্যাদি।
১১. ‘ও’ ধ্বনির উচ্চারণ ‘উ’ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়; যথা- ‘লুক’ (লোক), ‘তুমার’ (তোমার), ‘কুন’ (কোন), ‘কুনডা’ (কোনটা), ‘বুকা’ (বোকা), ‘বুঝা’ (বোঝা), ‘খুজা’ (খোঁজা), ইত্যাদি। তবে দক্ষিণবঙ্গের খুলনা, বরিশাল এবং ফরিপুরের কিছু অংশের লোকেরা প্রমিত বাংলার মতোই ‘ও’ এর উচ্চারণ করে।
১২. ঢাকাইয়া কুট্টি ব্যতীত বাকি সব বঙ্গালী উপভাষায় পদের অন্তে ‘ক’ ও ‘খ’ ধ্বনি ‘হ’ ধ্বনি হয়। যথা- টাকা > টাহা/ট্যাহা, দেখা > দ্যাহা ইত্যাদি।[৯][১০]
রূপতাত্ত্বিক
[সম্পাদনা]- কর্মসম্প্রদানের একবচনে “রে” বিভক্তি, যথাঃ হ্যারে কও = তাকে বল, আমারে/মোরে দেও = আমাকে দাও।
- কর্তৃকারকে এক বচনে “এ্যা” বিভক্তি। যথাঃ সফিজ্যা বাড়ী গেছে, করিম্যা এদিকে আয়।
- অধিকরণ কারকে “এ” এবং ”তে”/”ত” বিভক্তি। যেমন: ঘরে যাই, বাড়িতে/বাড়িত যাইতাছি ইত্যাদি।
- সর্বনাম পদের কর্তৃকারকের বহুবচনে "রা" বিভক্তি হয়। যেমন: আমরা/মোরা, তোমরা, তোরা, আপনেরা ইত্যাদি।
- কর্তৃকারক ছাড়া অন্য সব কারকের বহুবচনে “গো” বা “গোর” ব্যবহৃত হয়। যেমন: আমাগো/মোগো/আমগোর (আমাদের/মোদের), তোমাগো/তোমগোর (তোমাদের), তোগো/তোগোর (তোদের) ইত্যাদি। দক্ষিণে খুলনা এবং যশোর এবং কুষ্টিয়ার উপভাষার বহুবচনে যথাক্রমে “গে” এবং “গের” ব্যবহৃত হয়। যেমন: আমাগে/আমাগের, তোমাগে/তোমাগের ইত্যাদি। রাঢ়বঙ্গের নদীয়া এবং ২৪ পরগনা জেলার একাধিক অঞ্চলেও “গো” এবং “গের” বিভক্তির ব্যবহার দেখা যায়।
- বাংলার সাধু মতোই মধ্যম পুরুষের সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি হলো “(ই)বে”/“(ই)ব”। যেমন: যাইবে/যাইব, খাইবে/খাইবো, লাগবে/লাগবো।
- উত্তম পুরুষের বর্তমান কালে মূল ধাতুর সঙ্গে ‘ই’ প্রত্যয় হয়। যেমন - করি, যাই, খাই ইত্যাদি।
- উত্তম পুরুষের সাধারণ অতীতে ‘লাম’ যেমন — করলাম, গেলাম, দিলাম যেমন — করলাম, গেলাম, দিলাম নিত্যবৃত্ত অতীতে ‘তাম’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয় যথা: করতাম, যাইতাম, দিতাম ইত্যাদি।
- বেশিরভাগ বঙ্গালী উপভাষায় ভবিষ্যতকালের উত্তম পুরুষের ক্রিয়া পদে স্থানভেদে ‘উম', 'মু' এবং 'আম' বিভক্তি হয়। যথাঃ করমু/করুম/করাম, খামু/খায়াম ইত্যাদি। তবে দক্ষিণের খুলনা-যশোরের বাংলায় 'বানি' বিভক্তি হয়। যেমন: করবানি, খাবানি, যাবানি ইত্যাদি।
ধ্বনিব্যবস্থা
[সম্পাদনা]| সম্মুখ | কেন্দ্রীয় | পশ্চাৎ | |
|---|---|---|---|
| সংবৃত | ই~ঈ i | উ~ঊ u | |
| সংবৃত-মধ্য | (এ)
(e) |
(ও)
(o) | |
| বিবৃত-মধ্য | এ/অ্যা æ~ɛ | অ ɔ | |
| বিবৃত | আ ɐ |
| উভয়ৌষ্ঠ্য | দন্ত | দন্তমূলীয় | তালু-দন্তমূলীয়/দন্তমূলীয় | তালু-দন্তমূলীয়/তালব্য | পশ্চাত্তালব্য | কণ্ঠনালীয় | ||
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| নাসিক্য | ম m | ন n | ঙ ŋ | |||||
| স্পর্শ | অঘোষ | প p ফ pʰ | ত t̪
থ t̪ʰ |
ট t̠ ঠ t̠ʰ | চ tɕ~tʃ ছ tɕʰ~tʃʰ | ক k খ kʰ~(x) | ||
| ঘোষ | ব b ভ bʱ | দ d̪ ধ d̪ʱ | ড d̠ ঢ d̠ʱ | জ dʑ~dʒ ঝ dʑʱ~dʒʱ | গ ɡ~(ɣ) ঘ gʱ | |||
| উষ্ম | অঘোষ | প, ফ (ɸ~f) | স, শ s | স, শ (ʃ) | হ h~ɦ | |||
| ঘোষ | ভ (β~v) | |||||||
| নৈকট্য | (w) | ল l~l̠ | য় j | |||||
| তাড়ন | অল্পপ্রাণ | র ɹ~ɾ | ||||||
| মহাপ্রাণ | ||||||||
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Eastern Bengali"। গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
- ↑ Bangladesh Quarterly (ইংরেজি ভাষায়)। Department of Films & Publications, Government of Bangladesh.। ২০০২। পৃ. ৬।
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Sen 1957 136নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Morshed, Abul Kalam Manzur (৫ মে ২০১৪)। উপভাষা। বাংলাপিডিয়া। ২৯ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ (Shahidullah 1958, পৃ. 62)
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Chatterji 1926 138নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ (Chatterji 1926, পৃ. 141)
- ↑ Esh, Dhruba (৩ অক্টোবর ২০১৯)। তোমার যে ফুল। Bhorer Kagoj।
- ↑ Shaw, Dr. Rameswar (১৯৮৪)। সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা (in Bengali)। Kolkata: Pustak Bipani. ISBN 81-85471-12-6. Retrieved 29 June 2025।
- ↑ Admin (৯ জুলাই ২০২৪)। "বঙ্গালী উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলি উদাহরণসহ আলোচনা কর"। সাহিত্যের পাঠশালা (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২ জুন ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৫।