বিষয়বস্তুতে চলুন

বরেন্দ্রী উপভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বরেন্দ্রী বাংলা
রাজশাহী-বাংলা
দেশোদ্ভববাংলাদেশ, ভারত
অঞ্চলরাজশাহী বিভাগ, মালদা বিভাগ
মাতৃভাষী

বাংলা বর্ণমালা
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩
গ্লোটোলগnort2658  (Northern Bengali)[]
rajs1238  (Rajshahi)[]

বরেন্দ্রী উপভাষা বা বরেন্দ্রী বাংলা হচ্ছে বাংলাদেশ এবং ভারতের পদ্মামহানন্দা উপত্যকা অঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষার একটি উপভাষা। এই উপভাষার একটি বিশেষ সুর আছে। যার কারণে উপভাষাটি সমগ্র বঙ্গে বেশ জনপ্রিয়। [] ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানে এই উপভাষা ব্যবহার হয়।

বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

এই উপভাষায় বিশেষ এক ধরনের সুর আছে। যার কারণে এটি শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে। তাছাড়া বরেন্দ্রী বাংলা প্রমিত বাংলার মতোই বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

ধ্বনিতাত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]
  • বরেন্দ্রী উপভাষার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য অভিশ্রুতি। যেমন-
    • কহিয়া > কহে, করিয়া > কইরে, বসিয়া > বইস্যা, আঁকিয়া > আঁইকে, ইত্যাদি হল অভিশ্রুতি জনিত পরিবর্তন।
  • ‘এ’ অনেকসময় ‘অ্যা’ উচ্চারিত হয়। যেমন — এক > অ্যাক, কেমন > ক্যামন, করেছে > কর‍্যাছে ইত্যাদি।
  • নাসিক্যীভবন বরেন্দ্রী উপভাষায় বহুত স্পষ্ট। যেমন — ক্রন্দ > কান্না, স্কন্ধ > কাঁধ, স্মৃতি > স্‌রিঁতি, ইত্যাদি। এছাড়া সতোনাসিক্যীভবনও দেখা যায়, যেমন — পুস্তক > পুথি > পুঁথি, কাচ > কাঁচ, পেচক > প্যাঁচা, ইত্যাদি।
  • অধিকাংশ শব্দের প্রথমে ‘ন’ থাকলে ‘ল আর ‘ল’ থাকলে ‘ন’ হয়।
    • যেমন — নেওয়া→লেওয়া, নীল→লিল; লুচি→নুচি, লেবু→নেবু, ইত্যাদি।
  • কোনো শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত হলে সেই শব্দের অন্তে অবস্থিত মহাপ্রাণ ধ্বনি স্বল্পপ্রাণ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন — দুধ > দুদ, মাছ > মাচ, বাঘ > বাগ, ইত্যাদি। যেকোনো শব্দের আদিতে মহাপ্রাণ হতে পারে, কিন্তু এর পরের ধ্বনি অল্পপ্রাণ হয়। যেমন — জাম > ঝাম, বেরোনো > ভেরোনো, ইত্যাদি।
  • শব্দের পরের অঘোষধ্বনি ঘোষধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়। যেমন — কাক > কাগ, বুঝতে > বুইজদে, বুঝছে > বুইজঝে, ইত্যাদি।
  • বরেন্দ্রী উপভাষায় কিছু শব্দের আদিতে অকারণে ‘র’ এর আগম ও লোপ। যেমন — রাম > আম , রস > অস, ইত্যাদি।
  • বরেন্দ্রী উপভাষায় কিছু জেলা ব্যতিত (পাবনা, সিরাজগঞ্জ) সব জেলাতেই সবসময় ‘শ’, ও ‘স’-কে স [s] ধ্বনিতে উচ্চারণ করা হয়। ‘ষ’ ট-বর্গীয় ধ্বনির সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেই শুধু শ [ʃ] উচ্চারিত হয়, নইলে এটিতেও ‘স’ উচ্চারিত হয়।
  • স্থানভেদে ‘ক’ বা ‘কে’ উভয় বিভক্তির ব্যবহার গৌণ কর্ম কারকে দেখা যায়। যেমন— আমাকে > হামাক/হামাকে, তাকে > তাক/তাকে/ওকে, ইত্যাদি।
  • অধিকরণ কারকে ‘এ’ বা ‘অ্যা’ এবং ‘ত’ বা ‘তে’ বিভক্তি হয়। যেমন- ঘরে, মাটিতে/মাটিত ইত্যাদি।
  • কর্তৃকারকের বহুবচনে ‘গুনো’ বা ‘গুনা’এবং অন্য কারকের বহুবচনে ‘দের’ বিভক্তির প্রয়োগ।
    • যেমন — মেয়েগুনো, পাখিগুনা, লোকেদের, ইত্যাদি।
  • বরেন্দ্রীতে উত্তম পুরুষের সাধারণ অতীতে ‘নু’ আর নিত্যবৃত্ত অতীতে কিছু এলাকায় ‘তুং’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন — করলাম > কন্নু, গেলাম > গেনু, করতাম > কত্তুং, যেতাম > যেতুং, ইত্যাদি।
  • সামান্য অতীত বােঝাতে প্রথম পুরুষের অকর্মক ক্রিয়াপদে ‘ল’ বিভক্তি এবং সকর্মক ক্রিয়াপদে ‘লে’ বিভক্তির প্রয়ােগ। যেমন — সে গেল; সে বইটা দিলে; ইত্যাদি।[][]
  • না-বোধক অব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘না’ বা ‘নেই’ হলে ‘লাই’ আর ‘নয়’ হলে ‘লয়’-এ পরিবর্তন হয়ে যায়।
  • ঘটমান কালে ‘চ্ছি’ থেকে ‘ইচি’, ‘চ্ছে’ থেকে ‘ইচে’, ‘চ্ছেন’ থেকে ‘ইচেন’, ‘চ্ছ’ থেকে ‘ইচ', ‘চ্ছিস’ থেকে ‘ইচিস’ হয়ে যায়। যেমন — হচ্ছি > হইচি, করাচ্ছে > করাইচে, সরাচ্ছেন > সরাইচেন, দিচ্ছ > দিচ, বোঝাচ্ছিস > বোঝাইচিস, ইত্যাদি।
  • বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া বাকি সব জেলাতে চ, ছ-কে স [s] এবং জ, ঝ-কে বঙ্গালীর মত জ় [z] উচ্চারণ করে। তবে ‘জ’-কে মাঝেমধ্যে জ় [z] বরেন্দ্রীর সবস্থানেই উচ্চারিত হয়।
  • বেশিরভাগ অঞ্চলে ভবিষ্যত কালের উত্তম পুরুষের ক্রিয়াপদে ‘(ই)বো’ বিভক্তি হয়। যেমন — করব, চাইব, যাব, ইত্যাদি। তবে স্থানভেদে বহু অঞ্চলে 'মো' বিভক্তির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন — করমো, যামো, আসমো, ইত্যাদি।

তুলনা

[সম্পাদনা]

“আজকে নদীতে অনেক পানি বেড়েছে আর খুব স্রোতও আছে“ = আজকে লদ্দীতে ম্যালায় পানি বাইড়েছে আর খুব সোঁতও আছে।

“তুমি কোথায় যাচ্ছো?“ = তুমি কোথি/কুন্ঠে যাইচ্ছো?

“আমি বাড়িতে গেলাম কাল আবার আসবো” = আমি/হামি বাড়িতে গেনু কাল ফের আসবো/আসমো।

নিচে বরেন্দ্রী উপভাষা আর তাদের উপভাষাগুলোর মাঝে তুলনা দেওয়া হলো:

চলিত বাংলা: একজন ব্যক্তির দুটি পুত্র/ছেলে ছিল।

সাধু বাংলা: কোনো মানবের দুইটি পুত্রের অস্তিত্ব থাকিল।

রাজশাহী : একজন মানসের দুইটা ব্যাটা/ছাওয়াল ছিল।
নওগাঁ : একজ়নের দুটা ব্যাটা/সোয়েল সিলো।
নাটোর : একজন মানুসের দুটা বেটা/ছোওয়াল ছিল।
সাপাহার : একজ়ুন মানুসির দুটা বেটা/সোওয়াল সিলো।
দক্ষিণ দিনাজপুর : একজ়নের দুটা বেটা/ছওৱা(বা)ল ছিল।
পাবনা : একজ়োন মানশের দুইডা ব্যাটা/সাওয়াল সিলো।
সিরাজগঞ্জ : একজ়ন মাইনশের দুইদো ব্যাটা/সোল সিলো।
ঈশ্বরদী : একজ়ন মাইনসের দুইদি ব্যাটা/সোল সিলো।
কাজীপুর : একঝন মানুসার দুইটা সোল সিলো।
তাড়াশ : একঝন মানুসের দুটা সোল আসিল্।
মালদা : একঝন মানুসের দুইটা ব্যাটা/ছাওয়াল ছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : একঝন মাইনসের দুটা ব্যাটা/ছাওয়াল আছিল।
রায়গঞ্জ : একঝন মানুসার দুটো বেটা/ছোওয়াল ছিল।
শেরশাবাদিয়া : একঝন বেক্তির দুইটি ব্যাটা/সাওয়াল সিলো।
সাহেবগঞ্জ : একজ়ন বেক্তির দুটা বেটা সিলো।
বগুড়া : একজ়নের দুই ব্যাটা/সোইল আসিল্।
জয়পুরহাট : একজ়ন মানষের দুইকনা ব্যাটা/সাওয়াল/সোল সিলো।
হাকিমপুর : একজ়ন দুইয়া ব্যাটা/সোইল আসিল।
ধামইরহাট : একজ়ৈন দুইয়া ব্যাটা/সাওয়োল আসিল্।
গোবিন্দগঞ্জ : এক বেক্তির দুটা ব্যাটা/সোল আসিল্।
মুর্শিদাবাদ : কোনো লোকের দুটা সেলে/সোবাল সিলো।
বহরমপুর : কুনো লোকের দুটো সেলে সিলো।
জঙ্গীপুর : কোনো এক লোকার দুইটা সোওয়াল আসিল্।
কান্দি : কোনো ব্যক্তির দুটো ছোওয়াল আছিল।
ডোমকল : কোনো মানুষির দুটা ছেইলে/ছাওয়াল ছিল।
দিনাজপুর (দিনাজপুর সদর উপজেলা ও সীমান্ত অঞ্চল) : একজ়ন মানশের দুই ব্যাটা/সাওয়াল সিলো।
পূর্ব পূর্ণিয়া (শিরিপুরিয়া) : একঝনার দুই ছাওয়াল ছিল্।

ধ্বনিব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

এখানে ঘৃষ্টধ্বনিগুলো পশ্চিমবঙ্গের কিছু জ়েলা আর বাংলাদেশের রাজশাহীচাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া সব জেলায় একই বঙ্গালী উপভাষার মতো উচ্চারিত হয়। সব জেলায় এরকম করে উচ্চারণ করা হয়।

স্বরধ্বনি
সম্মুখকেন্দ্রীয়পশ্চাৎ
সংবৃত ~
i
~
u
সংবৃত-মধ্য

e

o

বিবৃত-মধ্য (অ্যা)
(æ)

ɔ
বিবৃত
ä~ɐ
নাসিক্য স্বরধ্বনি
সম্মুখকেন্দ্রীয়পশ্চাৎ
সংবৃত ইঁ~ঈঁ
ĩ
উঁ~ঊঁ
ũ
সংবৃত-মধ্য এঁ
ওঁ
õ
বিবৃত-মধ্য (অ্যাঁ)
(æ̃)
(অঁ)
(ɔ̃)
বিবৃত আঁ
ɑ̃
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি
ওষ্ঠ্য দন্ত্য দন্তমূলীয় তালু-দন্তমূলীয়/দন্তমূলীয় তালু-দন্তমূলীয়/তালব্য পশ্চাত্তালব্য কণ্ঠনালীয়
নাসিক্য mnŋ
স্পর্শ অঘোষ অল্পপ্রাণ p ~k
মহাপ্রাণ t̪ʰ t̠ʰ tɕʰ~tʃʰ
ঘোষ অল্পপ্রাণ b~ɡ
মহাপ্রাণ d̪ʱ d̠ʱ dʑʱ~dʒʱ
উষ্ম অঘোষ ফ় (f)sশ (ʃ)h~ɦ
ঘোষ
নৈকট্য l~ য় (j)
তাড়ন অল্পপ্রাণ ɾ~r ড় ɾ̠
মহাপ্রাণ ঢ় ɾ̠ʱ

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Northern Bengali"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
  2. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Rajshahi"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
  3. "রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় ধারাবাহিক"। ৮ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ আগস্ট ২০১৮
  4. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৩৯
  5. SK Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, Calcutta University, Calcutta, 1926; CP Masica, The Indo-Aryan Languages, Cambridge University Press, Cambridge, 1991.