বিষয়বস্তুতে চলুন

রাঢ়ী উপভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রাঢ়ী বাংলা
কেন্দ্রীয় বাংলা
দেশোদ্ভবভারত এবং বাংলাদেশ
অঞ্চলভারত: নদিয়া জেলা সহ প্রেসিডেন্সি বিভাগ, মুর্শিদাবাদ জেলা, পূর্ব বর্ধমান জেলা
বাংলাদেশ: কুষ্টিয়া জেলা, মেহেরপুর জেলা, চুয়াডাঙ্গা জেলা
মাতৃভাষী

বাংলা লিপি
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩
গ্লোটোলগcent1983  (Central Bengali)[]

রাঢ়ি উপভাষা বা কেন্দ্রীয় বাংলা বাংলা ভাষার একটি উপভাষাপশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের বাঙালিদের কথাবলার মধ্যে এই উপভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।[] এই উপভাষার পরিমার্জিত বাংলা রূপকেই বাংলা ভাষার প্রমিত লিখন রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়।[]

ভৌগোলিক সীমানা

[সম্পাদনা]

এই উপভাষাটি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বাঁকুড়া জেলার পূর্বাংশ, বীরভূম, হুগলি, হাওড়া, কলকাতা, উত্তরদক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, নদিয়ামুর্শিদাবাদ জেলায় প্রচলিত। এছাড়া বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, খুলনা, ঝিনাইদহমেহেরপুর জেলাতেও এই উপভাষা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।

পশ্চিমবঙ্গের রাঢ়িকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে – পশ্চিম রাঢ়ি ও পূর্ব রাঢ়ি। পূর্ব রাঢ়ের নদিয়া উপভাষা থেকে আধুনিক প্রমিত বাংলার ভিত্তি গঠিত হয়।[] পূর্ব রাঢ়ি উপভাষা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, কলকাতা, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রচলিত। তবে সব জেলাতেই ভাষার ভিন্নতা দেখা যায়।

বাংলাদেশের রাঢ়ি উপভাষায় বেশিরভাগই চ-বর্গীয় ধ্বনির উচ্চারণ বঙ্গালীর মত দেখা যায়। এই উচ্চারণ পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা ও নদিয়া জেলার দক্ষিণাংশেও দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]
  • রাঢ়ি উপভাষার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য অভিশ্রুতি ও স্বরসংগতি। যেমন-
    • বলিয়া > বলে, করিয়া > করে, বসিয়া > বসে, আঁকিয়া > এঁকে, ইত্যাদি হল অভিশ্রুতি জনিত পরিবর্তন।
    • দেশি > দিশি/দিসি, ইংরেজি > ইংরিজি, শিয়াল > শেয়াল/সেয়াল, তুলা > তুলো, ইচ্ছা > ইচ্ছে, ইত্যাদি স্বরসঙ্গতি জনিত পরিবর্তন।
  • ই, ঈ, উ, ঊ, ক্ষ এবং ‘য’-ফলা যুক্ত আগের ‘অ’ ব্যঞ্জনের উচ্চারণ ‘ও’ হয়, যেমন — অতি→ওতি, মধু→মোধু, ইত্যাদি। অন্য ক্ষেত্রেও ‘অ’-কে ‘ও’ উচ্চারণের প্রবণতা দেখা যায়, যেমন — মন→মোন, বন→বোন, ইত্যাদি; তবে ‘অ’-কে ‘ও’ উচ্চারণের প্রবণতা সর্বত্র লক্ষ্য করা যায় না।
  • নাসিক্যীভবন রাঢ়ি উপভাষায় খুবই স্পষ্ট, যেমন — ঙ: অঙ্কন > আঁকা, কঙ্কন > কাঁকন, কঙ্কর > কাঁকর, পঙ্ক্তি > পাঁতি, পঙ্ক > পাঁক, ভঙ্গ > ভাঁজ, ঢেঙ্ক > ঢেঁকি, শঙ্খ > শাঁখ; ঞ: অঞ্চল > আঁচল, অঞ্জলি > আঁজলা, পঞ্চ > পাঁচ, পঞ্জর > পাঁজর, হঞ্জি > হাঁচি, কুঞ্চিকা > কুঁচ, কুঞ্চিত > কোঁচানো, গঞ্জিকা > গাঁজা; ণ: কণ্টক > কাঁটা, কণ্টকী > কাঁঠাল, চণ্ডাল > চাঁড়াল, ভণ্ড > ভাঁড়, ভাণ্ডার > ভাঁড়ার, শুণ্ড > শুঁড়, ষণ্ড > ষাঁড়, হণ্টন > হাঁটা, দণ্ড > দাঁড়ানো, খণ্ড > খোঁড়া, কুণ্ডিকা > কুঁড়ি, হণ্ডিকা > হাঁড়ি, গুণ্ড > গুঁড়া, বণ্টন > বাঁটা, কুণ্ড > কুঁড়, বণ্ড > বাঁড়া, গণ্ড > গাঁড়; ন: অন্ধকার > আঁধার, ক্রন্দন > কাঁদা, গ্রন্থন > গাঁথা, চন্দ্র > চাঁদ, দন্ত > দাঁত, বন্ধ > বাঁধা, বৃন্ত > বোঁটা, সন্ধ্যা > সাঁঝ, স্কন্ধ > কাঁধ, রন্ধন > রাঁধা, উন্দুর > ইঁদুর, সিন্দূর > সিঁদুর; ম: কম্পন > কাঁপা, গ্রাম > গাঁ, চম্পক > চাঁপা, ঝম্প > ঝাঁপ, ধূম > ধোঁয়া, সমর্পণ > সঁপা, গুম্ফ > গোঁফ, বাম > বাঁ, ক্ষুম্প > খোঁপা;ং: বংশ > বাঁশ, বংশী > বাঁশি, সংক্রম > সাঁকো, হংস > হাঁস, কাংস্য > কাঁসা ও সংতরণ > সাঁতার। এছাড়া সতোনাসিক্যীভবনও দেখা যায়, যেমন — পুস্তক > পুঁথি, কাচ > কাঁচ, পেচক > প্যাঁচা, ইত্যাদি।
  • অধিকাংশ শব্দে ব্যবহৃত ‘ন’-কে ‘ল’ রূপে এবং ‘ল’-কে ‘ন’ রূপে উচ্চারণ লক্ষ্য করা যায়।
    • যেমন — নেওয়া→লেওয়া, নৌকা→লৌকা, নীল→লিল; গুলো→গুনো, লুচি→নুচি, লেবু→নেবু, ইত্যাদি।
  • কোনো শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত হলে সেই শব্দের অন্তে অবস্থিত মহাপ্রাণ ধ্বনি স্বল্পপ্রাণ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়, যেমন — দুধ > দুদ, মাছ > মাচ, বাঘ > বাগ, ইত্যাদি।
  • শব্দের শেষে অঘোষধ্বনি ঘোষধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়, যেমন — কাক > কাগ, শাক > শাগ/সাগ, আজকে > আজগে, বুঝতে > বুজদে, রাখতে > রাগদে, রাখছে > রাগজে, বাঁচতে > বাঁজদে, শিখতে > শিগদে/সিগদে, শিখছে > শিগজে/সিগজে, লাগতে > লাগদে, লাগছে > লাগজে, কাঁদতে > কাঁদদে, কাঁদছে > কাঁদজে, রাঁধতে > রাঁদদে, রাঁধছে > রাঁদজে, লিখতে > লিগদে, লিখছে > লিগজে, উপকার > উপগার, ইত্যাদি।
  • পশ্চিম রাঢ়ি উপভাষায় কিছু শব্দের আদিতে অকারণে ‘র’ এর আগম ও লোপ, যেমন — রাম > আম , রস > অস, ইত্যাদি।
  • পূর্ব রাঢ়ি উপভাষায় সবসময় ‘শ’, ‘ষ’ ও ‘স’-কে s ধ্বনিতে উচ্চারণ করা হয়।
  • অধিকরণ কারকে ‘এ’ ও ‘তে’ বিভক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন — ঘরে যাও; বাড়িতে থেকো; ইত্যাদি।
  • কর্তৃকারকের বহুবচনে ‘গুনা’ ও ‘গুনো’ এবং অন্য কারকের বহুবচনে ‘দের’ বিভক্তির প্রয়োগ।
    • যেমন — মেয়েগুনা, পাখিগুনো, লোকেদের, ইত্যাদি।
  • রাঢ়িতে উত্তম পুরুষের সাধারণ অতীতে ‘লুম’ বা ‘নু’ আর নিত্যবৃত্ত অতীতে ‘তুম’ বা ‘তু’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়, যেমন — করলাম > কললুম/কন্নু, গেলাম > গেলুম/গেনু, করতাম > করতুম/করতু, যেতাম > যেতুম/যেতু, ইত্যাদি।
  • সামান্য অতীত বােঝাতে প্রথম পুরুষের অকর্মক ক্রিয়াপদে ‘ল’ বিভক্তি এবং সকর্মক ক্রিয়াপদে ‘লে’ বিভক্তির প্রয়ােগ। যেমন — সে গেল; সে বইটা দিলে; ইত্যাদি।[][]
  • না-বোধক অব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘না’ বা ‘নেই’ হলে ‘লাই’ আর ‘নয়’ হলে ‘লয়’-এ পরিবর্তন হয়ে যায়।
  • ক্রিয়াপদ শব্দে ‘ছ’-এর স্থানে ‘চ’ উচ্চারিত হয়। যেমন – এসেছি > এঁইচি, করেছি > করিচি, ইত্যাদি।
  • ঘটমান কালে ‘চ্ছি’ থেকে ‘ইচি’, ‘চ্ছে’ থেকে ‘ইচে’, ‘চ্ছেন’ থেকে ‘ইচেন’, ‘চ্ছ’ থেকে ‘ইচ', ‘চ্ছিস’ থেকে ‘ইচিস’ হয়ে যায়। যেমন — হচ্ছি > হইচি, করাচ্ছে > করাইচে, সরাচ্ছেন > সরাইচেন, দিচ্ছ > দিচ, বোঝাচ্ছিস > বোঝাইচিস, ইত্যাদি।

পূর্ব রাঢ়ি উপভাষার ধ্বনিব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

এখানে ঘৃষ্টধ্বনিগুলো পূর্ব রাঢ়ির ২৪ পরগনানদীয়ার দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গালী উপভাষার মত উচ্চারিত হয়। এছাড়া সব জেলায় একইভাবে উচ্চারণ করা হয়।

স্বরধ্বনি
সম্মুখকেন্দ্রীয়পশ্চাৎ
সংবৃত ~
i
~
u
সংবৃত-মধ্য

e

o

বিবৃত-মধ্য (অ্যা)
(æ)

ɔ
বিবৃত
ɐ
নাসিক্য স্বরধ্বনি
সম্মুখকেন্দ্রীয়পশ্চাৎ
সংবৃত ইঁ~ঈঁ
ĩ
উঁ~ঊঁ
ũ
সংবৃত-মধ্য এঁ
ওঁ
õ
বিবৃত-মধ্য (অ্যাঁ)
(æ̃)
অঁ
ɔ̃
বিবৃত আঁ
ɐ̃
ব্যঞ্জনধ্বনি
উভয়ৌষ্ঠ্য দন্তৌষ্ঠ্য দন্তমূলীয় তালু-দন্তমূলীয়/তালব্য পশ্চাত্তালব্য কণ্ঠনালীয়
নাসিক্য m nŋ◌̃
স্পর্শ অঘোষ p

t̪ʰ


t̠ʰ
k

ঘোষ b

d̪ʱ

d̠ʱ

ɡ

ɡʱ

ঘৃষ্ট অঘোষ

tʃʰ

ঘোষ ~

dʒʱ

উষ্ম s h~ɦ
নৈকট্য (w) l (j)
তাড়নজাত ɾ ɽ

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Central Bengali"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
  2. "Indian Journal of Linguistics" (ইংরেজি ভাষায়)। ২০। Bhasa Vidya Parishad.। ২০০১: ৭৯। {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য |journal= প্রয়োজন (সাহায্য)
  3. Bangladesh Quarterly (ইংরেজি ভাষায়)। Department of Films & Publications, Government of Bangladesh.। ২০০২। পৃ. ৬।
  4. 1 2 সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৩৯
  5. SK Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, Calcutta University, Calcutta, 1926; CP Masica, The Indo-Aryan Languages, Cambridge University Press, Cambridge, 1991.