উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার অবস্থান

উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা ভারত এর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরের উত্তরপূর্ব দিকের একটি জেলা। জেলাটি প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এই জেলা কলকাতা থেকে প্রায় ৩০ কিমি দুরে অবস্থিত। এর প্রশাসনিক ভবন ও সদর দপ্তর বারাসাত শহরে অবস্থিত। এ জেলার শহরগুলি কলকাতা শহরের সাথে রাস্তা ও রেললাইন দ্বারা যুক্ত। উল্লেখনীও শহরগুলির নাম বারাসত, বারাকপুর, বসিরহাট ও বিধাননগর (সল্টলেক)। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বা গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র ব-দ্বীপ স্থিত এই জেলায় গঙ্গা নদী পশ্চিম সীমানা বরাবর বইছে। জেলার উল্লেখনীও নদীর গুলির নাম ইছামতি, যমুনাবিদ্যাধরী

বেড়াচাঁপার কাছে চন্দ্রকেতুগড় ঢিপি, উত্তর ২৪ পরগণা, যা প্রায় প্রাক মৌর্য যুগের সময় বলা হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব মীরজাফর কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলে ২৪ টি জংলীমহল বা পরগনার জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। এই ২৪টি পরগনা হল-১। আকবরপুর ২।আমীরপুর ৩।আজিমবাদ ৪।বালিয়া ৫।বাদিরহাটি ৬।বসনধারী ৭।কলিকাতা ৮। দক্ষিণ সাগর ৯।গড় ১০।হাতিয়াগড় ১১।ইখতিয়ারপুর ১২।খাড়িজুড়ি ১৩।খাসপুর ১৪।মেদনমল্ল ১৫।মাগুরা ১৬।মানপুর ১৭।ময়দা ১৮। মুড়াগাছা ১৯। পাইকান ২০।পেচাকুলি ২১।সাতল ২২।শাহনগর ২৩।শাহপুর ২৪।উত্তর পরগনা। সেই থেকে অঞ্চলটির নাম হয় ২৪ পরগণা।

১৭৫৯ সালে কোম্পানি লর্ড ক্লাইভকে এই ২৪টি পরগনা ব্যক্তিগত জায়গীর হিসাবে দেয়। ১৭৭৪ সালে লর্ড ক্লাইভের মৃত্যুর পর এটি আবার কোম্পানির হাতে চলে আসে। ইংরেজ আমলে ২৪টি পরগনা জেলা প্রশাসনিক কারণে বহুবার ভাগ হয়েছে।১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তান হবার পর যশোর জেলার বনগাঁ২৪টি পরগনা জেলার মধ্যে চলে আসে এবং সুন্দরবনের বৃহত্তম অংশ খুলনা ও বাখরগঞ্জের মধ্যে চলে আসে। ইংরেজ আমলে কলকাতা ২৪টি পরগনা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতের রাজধানীতে পরিনত হয়। ১৯৮৩ সালে ডঃ অশোক মিত্রের প্রসাসনিক সংস্কার কমিটি এই জেলাকে বিভাজনের সুপারিশ করে। ১৯৮৬ সালে ১লা মার্চ জেলাটিকে উত্তর ২৪ পরগণা জেলাদক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা নামে দুটি জেলায় ভাগ করা হয়। দুটি জেলাই প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিক ভুগোলবিদ টলেমির “ট্রিটিজ অন জিওগ্রাফি” বইয়ে গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিদাই জাতির কথা বলা হয়েছে। গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিদাই জাতির মানুষের আবাসস্থল ছিল এই অঞ্চলে।

২৪টি পরগনা সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। গৌড় রাজ শশাঙ্ক এই অঞ্চলে শাসন কায়েম করতে পারেনি। পাল বংশের রাজা ধর্মপালের রাজ্যভুক্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে সেন যুগের বহু দেব্দেবীর মূর্তি জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আবিস্কৃত হয়েছে।

“মনসামঙ্গল” কাব্যে ২৪টি পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। চাঁদ সওদাগর চম্পকনগরী থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁর তরী ভাসিয়েছিলেন ভাগীরথীর প্রবাহে।তিনি কুমারহট্ট, ভাটপাড়া,কাকিনাড়া,মুলাজোর,গারুলিয়া,ইছাপুর, দিগঙ্গা-চনক (ব্যারাকপুর),খড়দহ, চিৎপুর, কলিকাতা,কালীঘাট ইত্যাদি জায়গা পার হয়েছিলেন।তিনি চম্পকনগরী থেকে যাত্রা শুরু করে বারুইপুরে পৌছেছিলেন।

কর্ণপুর রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে ও ২৪টি পরগনা জেলার অনেক জায়গার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।“মনসামঙ্গল” কাব্যে ও “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে পাওয়া বিভিন্ন জায়গার নাম ও বিবরণ তুলনা করলে দেখে যায় ২৪টি পরগনা জেলার উক্ত জায়গাগুলির অস্তিত্ব ছিল। চাঁদসওদাগর বারুইপুরে পৌছে আদি গঙ্গা তীরবর্তী মনসামন্দির লুঠ করেন। শ্রীচৈতন্যদেব বারুইপুরের কাছে অতিসরাতে অনন্ত পন্ডিতের আতিথ্য গ্রহণ করেন।মথুরাপুর থানা অঞ্চলে ছিল ছত্রভোগ বন্দর।

ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলের নদীপথে পর্তুগিজ জলদস্যুদের একচ্ছত্র আদিপত্য ছিল। পরবর্তি ১০০ বছর তাদের আদিপত্য বজায় ছিল উত্তর ২৪টি পরগনা ও দক্ষিণ ২৪টি পরগনার বসিরহাট অঞ্চলে। এই সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে অনেক সমৃদ্বশালী জনপদ জনশূন্য হয়ে যায়।

১৭ শতাব্দীর শুরুতে প্রতাপাদিত্য যশোর,খুলনা, বরিশালসহ গোটা ২৪টি পরগনা জেলার অধিপতি ছিলেন। যশোররাজ প্রতাপাদিত্য পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি সাগরদ্বীপ, সরসুনা ,জগদ্দল প্রভৃতি অঞ্চলে দুর্গ বানিয়ে এদের আটকাবার চেষ্ঠা করেন।

১৬১০ সালে মুঘলদের হাতে প্রতাপাদিত্য পরাজিত হয়। প্রতাপাদিত্যের পরাজয়ে বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরী বংশের প্রতিষ্টাতা লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার(গাঙ্গুলি) বাংলার সুবেদার মানসিংহের পক্ষ নেন। এর প্রতিদানে ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গির তাকে মাগুরা,পাইকান, আনোয়ারপুর, কলকাতার জমিদারি স্বত্ত্ব দেন।

লক্ষ্মীকান্ত মজুমদাররে নাতি কেশবচন্দ্র মজুমদার মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে দক্ষিণ ২৪টি পরগনা ও খুলনার জমিদার নিযুক্ত হন।

বিভাগ[সম্পাদনা]

প্রশাসনিক উপবিভাগ[সম্পাদনা]

ব্যারাকপুর মহকুমা[সম্পাদনা]

হুগলী নদীর পূর্ব পারে জুড়ে বারাকপুর মহকুমার প্রশাসনিক সদর দপ্তর বারাকপুর৷ প্রধানত শহরকেন্দ্রিক এই মহকুমা ইন্জিনিয়ারিং, পাটকল, রাসায়নিক শিল্পর জন্য বিখ্যাত৷ ভারতের প্রাচীনতম সেনানিবাস বারাকপুরে অবস্থিত৷ ইতিহাসগত ভাবে বারাকপুর মহকুমার গুরুত্ব অপরিসীম৷ ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহর প্রথম শহীদ বারাকপুরের মঙ্গল পান্ডে৷ এছাড়া বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান বারাকপুর মহকুমা৷ হিন্দুতীর্থ দক্ষিণেশ্বর এই মহকুমায় অবস্থিত৷

অসংখ্য বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় সমৃদ্ধ বারাকপুর মহকুমা শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে৷ এখানে মেডিক্যাল কলেজ সহ একাধিক উন্নতমানের সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল আছে৷

সড়কপথ, জলপথ ও রেলপথে বারাকপুর কলকাতা সহ সমগ্র রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত৷ মেট্রোরেল বারাকপুর মহকুমাকে নোয়াপাড়া ও দমদম স্টেশনের মাধ্যমে যুক্ত করেছে, যা অদূর ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারিত হবে৷ কলকাতা বিমানবন্দর প্রশাসনিক ভাবে বারাকপুর মহকুমার অন্তর্গত৷

বারাসত সদর মহকুমা[সম্পাদনা]

বারাসত এই জেলার জেলাসদর৷ পাঁচটি পৌরসভা সমৃদ্ধ এই মহকুমায় ৭টি ব্লক ও পঞ্চায়েত সমিতি আছে৷ যশোহর রোড, ৩৪ নং জাতীয় সড়ক দ্বারা এই মহকুমা কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷ এছাড়া রেলপথে এই মহকুমা কলকাতাকে বসিরহাট ও বনগাঁ মহকুমাকে যুক্ত করেছে৷ শীঘ্রই মেট্রোরেলও এই মহকুমাকে কলকাতার সঙ্গে যুক্ত করবে

এই মহকুমাতেও অনেক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে৷ সরকারী বেসরকারী অনেকগুলি হাসপাতাল মহকুমা তথা রাজ্যের মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করছে৷

বনগাঁ মহকুমা[সম্পাদনা]

বনগাঁ মহকুমা বনগাঁ গাইঘাটা ও বাগদা ব্লক ও বনগাঁ পুরসভা নিয়ে গঠিত৷ সীমান্ত বানিজ্য ও কৃষি এই মহকুমার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি৷ সড়কপথে যশহর রোডের মাধ্যমে মহকুমাটি কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷ রেলপথে বনগাঁ কলকাতা ও নদীয়ার রাণাঘাটের সঙ্গে যুক্ত৷

মতুয়া সম্প্রদায়ের পূণ্যতীর্থ ঠাকুরনগর এই মহকুমায় অবস্থিত৷

বসিরহাট মহকুমা[সম্পাদনা]

বসিরহাট এইজেলার বৃৃহত্তম মহকুমা৷ তিনটি পুরসভা ১০টি ব্লক নিয়ে এই মহকুমা গঠিত৷ কৃৃষিভিত্তিক এই মহকুমার দক্ষিন অংশশ সুন্দরবনের অংশ৷

টাকী রোড এবং রেলপথে মহকুমাটি কলকাতার সঙ্গে যুক্ত৷

বিধাননগর মহকুমা[সম্পাদনা]

বিধাননগর মহকুমা বিধাননগর কর্পোরেশন নিয়ে গঠিত৷ উন্নত আধুনিক নগরজীবনের সকল সুবিধা সম্পন্ন বিধাননগর রাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র৷ তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পর ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম কেন্দ্রস্থল বিধাননগর৷

বিধানসভা আসন[সম্পাদনা]

এই জেলায় ৩৩টি বিধানসভা কেন্দ্র আছে, যা রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ৷

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]