নরকাসুর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
নরকাসুর
নরকাসুর
নরকাসুরের সৈন্যের সঙ্গে কৃষ্ণ এবং সত্যভামার যুদ্ধ - মেট্রোপলিটান সংগ্রহালয়ের চিত্র

ভাগবত পুরাণে উল্লেখ থাকা মতে, নরকাসুর বা নরক ভূমি (ভূদেবী) এবং বরাহর (বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার) অসুর পুত্র। বিদেহের (উত্তর বিহার) রাজা জনক তাঁকে বড়ো করেন। বাণাসুরের প্রভাবে তিনি অত্যাচারী হয়ে উঠেছিলেন।[১] তিনি শেষ দানব রাজা ঘটকাসুরকে সিংহাসনচ্যুত করে প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য স্থাপন করেন। পশ্চিমে করতোয়ার থেকে পূর্বে দিক্রঙ পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তৃত ছিল।[২] নরক বিদর্ভের রাজকুমারী মায়াকে বিয়ে করেছিলেন। পরে শ্রীকৃষ্ণের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

নরকাসুরের কিংবদন্তি অসমের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; কারণ কামরূপ শাসন করা কয়েকটি রাজবংশ নরকাসুরের থেকেই হয়েছে বলে মানা হয়। গুয়াহাটীর দক্ষিণে তাঁর নামে একটি পাহাড় আছে। শক্তি দেবী এবং উপাসনার স্থান কামাখ্যার সাথেও তাঁর নাম যুক্ত করা হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

রামায়ণ এবং মহাভারতের প্রথম শতকের পর লেখা অংশগুলিতে নরকাসুর এবং তাঁর প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের উল্লেখ আছে। তাঁর পুত্র ভগদত্ত‌ মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবদের হয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে মানা হয়। বরাহ প্রজাপতির কথা শতপথ ব্রাহ্মণে আছে যদিও আনুমানিক পঞ্চম শতকে রচিত "হরিবংশ"-এ ভূমির সংস্পর্শে পুত্র উপজার কথা উল্লেখ আছে। বিষ্ণু পুরাণে নরকের এই কাহিনী বেশি করেই বলা হয়েছে। এবং পরে রচিত ভাগবত পুরাণে এই কাহিনী পুনরায় বর্ণিত হয়েছে।

আসামে রচিত উপপুরাণ কালিকা পুরাণে (১০ম শতক) নরকাসুরের কিংবদন্তি অনেক বেশি বর্ণিত হয়েছে। এতে সীতার পিতা বিদেহর জনকের কাহিনীও নরকাসুরের কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কিংবদন্তি[সম্পাদনা]

সুদর্শন চক্র দ্বারা কৃষ্ণের নরকাসুরকে বধ করার দৃশ্য

নরকের মাতা ভূমি দেবী বিষ্ণুর কাছে বর চেয়েছিলেন যেন তাঁর পুত্র দীর্ঘ জীবন লাভ করে এবং সে শক্তিশালী হয়। বিষ্ণু এই বর পূরণ করেন। সঙ্গে বিষ্ণু নরকাসুরকে কামাখ্যা দেবীর পূজা করতে শেখান। প্রথম অবস্থায় ভালভাবে শাসন করা নরকাসুর শোণিতপুরের বাণাসুরের প্রভাবে পড়ে অত্যাচারী হয়ে ওঠে।

নরকাসুর কামাখ্যা দেবীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। দেবীকে বলাতে দেবী শর্ত রাখেন যে, মোরগ বা কুক্কুট রাত পেরোনোর জানান দেওয়ার আগে যদি নরক নীলাচল পাহাড়ের তলা থেকে মন্দির পর্যন্ত এক রাতের মধ্যে সিঁড়ি নির্মাণ করতে পারেন তবে তিনি বিয়ে করতে রাজী হবেন। নরকাসুর সেইমত সিড়ি নির্মাণ করে রাত পেরোনোর আগে শেষ করার উপক্রম করলেন। কামাখ্যা দেবী তখন ভয় পেয়ে একটি মোরগকে চেপে ধরাতে সে ডাক দেয়। নরকও রাত পেরোলো বলে ভেবে কাজ অর্ধেক রাখলেন। পরে আসল কথা জানতে পেরে নরক কুক্কুটটিকে ক্রোধবশত ধাওয়া করে হত্যা করেন। এজন্য দরং জেলায় "কুকুরাকটা" নামে একটি স্থান আছে। অন্যদিকে, অসমাপ্ত সিঁড়িটিকে "মেখেলা-উজোয়া পথ" বলে অভিহিত করা হয়। এরপর বশিষ্ঠ মুনিকে কামাখ্যা মন্দিরে উপাসনা করতে অনুমতি না দেওয়ায় মুনি নরক এবং দেবীকে অভিশাপ দেন যে এই মন্দিরে পূজা করা কারো মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে না। শিবের হস্তক্ষেপে এই অভিশাপ সেই বছর পর্যন্ত সীমিত হয়। এতে নরকাসুর বিষ্ণু এবং কামাখ্যার অপ্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন।[২]

পৃথিবীর সকল রাজ্য জয় করার পর নরকাসুর স্বর্গ আক্রমণ করেন এবং ইন্দ্র পালাতে বাধ্য হন। এরপর নরক অদিতি দেবীর কুণ্ডলজোড়া চুরি করেন এবং ১৬০০০ স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে যান।[৩] ইন্দ্রকে ধরর সকল দেবতা বিষ্ণুর কাছে গিয়ে নরকাসুরের বিনাশের জন্য কাকুতি-মিনতি করে। বিষ্ণু কৃষ্ণ‌ অবতারে সেই কাজ সমাপন করবেন বলে কথা দেন। বিষ্ণুর ভূদেবীকে দেয়া বর অনুসারে নরক দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে কৃষ্ণর ভার্যা সত্যভামার (তাঁকে ভূদেবীর অবতার বলে বিশ্বাস করা হয়) সম্বন্ধী অদিতি সত্যভামাকে নরকাসুরের কুকীর্তি বলে। সত্যভামা কৃষ্ণকে নরকাসুরের বিপক্ষে যুদ্ধের জন্য রাজি করান। কৃষ্ণ এবং সত্যভামাগরুড়ে উঠে নরকাসুরের রাজ্য আক্রমণ করেন। কৃষ্ণ‌ নরকাসুরের সেনাপতি "মুর"কে বধ করার জন্য তিনি "মুরারী" বলেও পরিচিত। অবশেষে সুদর্শন চক্র দ্বারা কৃষ্ণ‌ নরকাসুরকে বধ করেন এবং অদিতির সোনার কুণ্ডলের সঙ্গে ১৬০০০ জন স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। প্রাগজ্যোতিষপুরের সিংহাসনে নরকাসুরের পুত্র ভগদত্তকে স্থাপন করা হয়।

উত্তর গুয়াহাটীতে "অশ্বক্রান্ত" (অর্থ - অশ্বের আরোহণ) নামে একটি মন্দির আছে। বিশ্বাস করা হয় যে, প্রাগজ্যোতিষপুর আক্রমণ করার পূর্বে কৃষ্ণ এই স্থানে বিশ্রাাম নিয়েছিলেন এবং তাঁর ঘোড়াগুলি এখানে জল খেয়েছিল।

পৃথিবী দেবীর অদিতির কুণ্ডল কৃষ্ণকে দেওয়ার দৃশ্য

নরকাসুরের মৃত্যুর পূর্বে তিনি মাতা সত্যভামাকে অনুরোধ করেন যে, সকলে যেন তাঁর মৃত্যু রঙিন আলোকোজ্জ্বলভাবে উদ্‌যাপন করে। সেইজন্য এই দিনটি 'নরক চতুর্দশী' হিসেবে (দীপান্বিতার আগের দিনটি) পালন করা হয়।[৪] দক্ষিণ ভারতে এই প্রথা জনপ্রিয়।[৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Srimad Bhagavatam। The Bhaktivedanta Book Trust International, Inc.। পৃষ্ঠা 3.3.6। ৩ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ এপ্রিল ২০১৮ 
  2. Edited by Suresh Kant Sharma, Usha Sharma (২০০৫)। "Discovery of North-East India"। Mittal Publications। পৃষ্ঠা 147। সংগ্রহের তারিখ ৩১ জুলাই ২০১৭ 
  3. Swami, Parmeshwaranand (২০০১)। Encyclopaedic Dictionary of the Puranas। New Delhi: Sarup and Sons। পৃষ্ঠা 941। আইএসবিএন 8176252263 
  4. Ray, Dipti (২০০৭)। Prataparudradeva, the Last Great Suryavamsi King of Orissa (A.D. 1497 to A.D. 1540)। Northern Book Centre। পৃষ্ঠা 89। আইএসবিএন 8172111959। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০১৪ 
  5. Maithily Jagannathan। "South Indian Hindu Festivals and Traditions"2005। Abhinav Publications। পৃষ্ঠা 120। সংগ্রহের তারিখ ৩১ জুলাই ২০১৭ 

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

  • Epico-Puranic Myths and Allied Legends, D. C. Sircar, in The Comprehensive History of Assam, Vol 1, ed H. K. Barpujari 1990.
  • Vettam Mani, Puranic Encyclopaedia.