অসহযোগ আন্দোলন (১৯৭১)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দিয়ে ১৯৭১ সালের ২ মার্চে শুরু হয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং সাধারণ জনগণ কর্তৃক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পরিচালিত একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। [১] [২]

পটভূমি[সম্পাদনা]

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসন সহ ৩১৩ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। [৩]

আওয়ামী লীগের এই বিজয়ে ফলে ৬ দফা বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে পিপিপি সহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা ভীত হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে দুই দফা আলোচনা করেন। এই আলোচনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু জানান:

পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান

একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাংবাদিকদের বলেন,

ফিরে গিয়ে তিনি লারকানায় পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাসভবনে যেয়ে জেনারেলদের সাথে গোপন বৈঠক করেন।

তারপর জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে দলের অন্যান্য নেতাদের সাথে ঢাকায় এসে ২৭ ও ২৮ তারিখে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই জাতীয় পরিষদের বৈঠকে ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র রচনা করার কথা বললেও ভুট্টো আরও আলোচনার কথা বলেন।

তিনি চান যাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে হোক। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।

কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ যদি তাদের ৬ দফার ব্যাপারে আপস বা পরিবর্রতন করা না করে তাহলে জুলফিকার আলী ভুট্টো অধিবেশনে যোগদানের বিরোধীতা করেন।

পাকিস্তান পিপলস পার্টি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো

তাই ১৯ ফ্রেব্রুয়ারিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে নিয়ে ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর এবং মধ্যে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর ভুট্টো জানান যে শর্ত না মানলে তিনি কোনভাবেই অধিবেশনে যোগ দেবেন না।

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা নির্বাচনের ফলাফল বানচালের পরিকল্পনা করছে। তাই তিনি দিন দিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। ভুট্টোর সাথে আঁতাত করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১লা মার্চ তারিখে জাতিয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করেন। ফলে বাংলার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে; শুরু হয় আন্দোলন। [৪]

আন্দোলন[সম্পাদনা]

১ মার্চ

ভুট্টোর হুমকির পরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৭১-এর ১ মার্চের দুপুর ১টা ৫ মিনিটে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা করেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ফলে বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর আদেশ ছাড়াই আন্দোলনে নেমে পড়ে। সেদিন বঙ্গবন্ধু সহ আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সদস্যরা হোটেল পূর্বাণীতে ৬ দফার উপর ভিত্তি করে শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের কাজে ব্যস্ত থাকায় বিক্ষুব্ধ জনতা হোটেল পূর্বাণীর সামনে জড়ো হয়। তখন তিনি সকলকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন জোরদার করার পরামর্শ দেন। তিনি একই সাথে ২ মার্চ থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতালের ঘোষণা দেন। [৪]

২ মার্চ
তৎকালীন ডাকসু ভিপি এবং সর্বপ্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনকারী আ. স. ম. আব্দুর রব

এদিন ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ.স.ম. আব্দুর রবের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করে।

এদিন লে. জে. ইয়াকুব খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর নিযুক্ত হয়। সামরিক আইন এবং জারি এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ থাকার পরেও ব্যাপক আন্দোলন হতে থাকে। ঢাকায় দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয়। আন্দোলনে গুলি চালানো হয়। পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশ ব্যাপি হরতালের ডাক দেন এবং সাত মার্চে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত সবাইকে জানান।

৩ মার্চ

এদিন দেশের প্রায় সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস-প্রতিষ্ঠান, সচিবালয়, হাইকোর্ট সহ অন্যান্য আদালত, পিআইএ, রেলওয়ে সহ অন্যান্য সবধরণের যোগাযোগ মাধ্যম, শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ দেশে সবজায়গায় হরতাল পালিত হয়; চলে মিটিং-মিছিল। দেশের অনেক স্থানে এসব মিছিলে গুলিবর্ষণ হন। ফলে ঢাকা শহরে ২৩ জন ছাড়াও চট্টগ্রামে ৭৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। [৫] ঢাকা, রংপুর এবং সিলেটে কার্ফ্যু জারি করা হয়। এদিন পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিততে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ ঘোষণা করে। এতে পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করার ঘোষণা এবং এর লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়।

৪ মার্চ
সাহেবজাদা ইয়াকুব খান

ঢাকা শহর থেকে কারফিউ তুলে নেয়া হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১৩ নং সামরিক আইন জারি করা হয়। দেশের শিল্পী ও সাংবাদিকেরা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। এদিন ন্যাপ-এর সভাপতি মওলানা ভাসানী ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে এদেশের মানুষের অধিকার দাবি করেন। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পদত্যাগ করেন। [১]

৫ মার্চ

আন্দোলন অব্যাহত থাকে। গাজীপুরের টঙ্গীতে গুলিতে ৪ জন নিহত হন এবং আহত হন ২৫ জন। চট্টগ্রামে গুলিবর্ষণের ফলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৮ হয়। রংপুর এবং রাজশাহীতে পুনরায় কারফিউ জারি করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। [৫]

৬ মার্চ

জেনারেল ইয়াহিয়া খান এদিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ২৫ মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার ঘোষণা দেন। এদিন টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ভারতের আকাশ সীমা দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখা হয়।

রাজশাহীতে এদিন ১৪ জন আহত এবং ১ জন নিহত হন। খুলনাতে ৮৬ জন আহত এবং ১৮ জন নিহত হন। অন্যদিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গেট ভেঙে প্রায় ৩৫০ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। [৫]

৭ মার্চ
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ

এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন ৪টি শর্ত পূরণ হলে তিনি অধিবেশনে যোগ দিবেন। সেগুলো হল :

  1. অবিলম্বে মার্শাল ল' (সামরিক আইন) উইথড্র (প্রত্যাহার) করতে হবে।
  2. সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে
  3. গণহত্যার তদন্ত করতে হবে
  4. গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

তিনি বাংলার মানুষকে খাজনা-ট্যাক্স দিতে নিষেধ করেন। সচিবালয় সহ অন্যান্য সরকারি-আধা সরকারি অফিস, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সহ দেশের সব কোর্ট বন্ধ রাখতে বলেন। তবে দৈনিক মাত্র ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা রাখার অনুমতি দেন। সামরিক বাহিনী ছাড়া অন্যান্য সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য সব ধরনের বাস-ট্রাক, রিক্সা, ট্যাক্সি চলাচলের অনুমতি দেন। [৬]

এই ভাষণ প্রচার না করাই বাঙালি কর্মীদের প্রতিবাদে ঢাকা বেতার সেদিন বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যা সাতটায় বেতার ভবনের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতা বোমা ফেলে।

সেদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া লে. জেনারেল নিয়াজীসহ পাঁচ সামরিক অফিসারকে সহকারী সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত করে। [৫]

৮ মার্চ

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরেই অসহযোগ আন্দোলন নতুন রূপ নেয়। এই ভাষণের সাথে ছাত্রনেতারা একাত্মতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হবে– এই শর্তে বেতার কর্মীরা কাযে যোগ দেন। ছাত্রলীগ নেতারা এদিন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করার প্রস্তাব করে। [১]

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের নির্দেশ মতে সকল সরকারি অফিস অচল হয়ে পড়ে। টিক্কা খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয়। ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুকে '"বাংলাদেশ জাতীয়"' সরকার গঠনের পরামর্শ দেয়। পল্টন ময়দানের এক ভাষণে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর সাথে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন। ঢাকাতে থাকা অন্যান্য দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে ঢাকায় তাদের দেশের বিমান অবতরণ করে। জাতিসংঘের মহাসচিব প্রয়োজনে তাদের কর্মীদের ঢাকা থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন।

৯ মার্চ

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের নির্দেশ মতে সকল সরকারি অফিস অচল হয়ে পড়ে। এদিন তাজউদ্দিন আহমদ এদেশের বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৬ টি নির্দেশনা জারি করেন। ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুকে '"বাংলাদেশ জাতীয়"' সরকার গঠনের পরামর্শ দেয়। পল্টন ময়দানের এক ভাষণে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর সাথে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন।

টিক্কা খান

টিক্কা খানকে এদিন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি বি.এ সিদ্দিকী তাকে শপথ করাতে অপারগতার কথা জানিয়ে দেন। [১]

ঢাকাতে থাকা অন্যান্য দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে ঢাকায় তাদের দেশের বিমান অবতরণ করে। জাতিসংঘের মহাসচিব প্রয়োজনে তাদের কর্মীদের ঢাকা থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন। [৫]

১০ মার্চ

এদিন দেশের অভিনেতা ও অন্যান্য শিল্পীরা মিলে কবি গোলাম মোস্তফা এবং খান আতাউর রহমানের নেতৃত্বে ‘বিক্ষুদ্ধ শিল্পী সমাজ’ নামক ব্যানারে বিক্ষোভ প্রকাশ করে। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় শ্রেণির বাঙালি কর্মচারীরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। [১]

১১ মার্চ

বঙ্গবন্ধুর নিকট পিপিপির নেতা ভুট্টো একটি তারবার্তা দিয়ে ঢাকায় আসতে রাজি হওয়ার কথা জানান। ১লা মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাগজ পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো বন্ধ হওয়ায় নিউজপ্রিন্টের অভাবে এদিন থেকে ডন পত্রিকা সহ সেখানকার বিভিন্ন সংবাদপত্রের কলেবর ব্যাপক হ্রাস পায়। [৫]

কবি আহসান হাবিব, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সহ অনেক খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব আন্দোলনের সমর্থনে তাদের খেতাব অর্জন করেন। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো এক কথায় অচল হয়ে পড়ে। তাই এদিন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব উথান্ট পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত তাদের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। [১]

১২ মার্চ

এদিন আওয়ামী লীগ প্রদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার আদেশ দেয়। পূর্ব পকিস্তানে কর্মরত বাঙালি সিএসপি ও ইপিসিএস অফিসার, সরকারি এবং আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা এই আন্দোলনে সমর্থন দেন। অনির্দিষ্ট কালের জন্য মালিকেরা দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের ঘোষণা দেয়।[১]

১৩ মার্চ

প্রতিরক্ষা খাত থেকে বেতন প্রাপ্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫ মার্চ সকালে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। আদেশ না মানলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধীতা করেন বঙ্গবন্ধু

পশ্চিম জার্মানি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা, ফ্রান্স এবং জাতিসংঘের ২৬৫ জন কর্মকর্তাকে ঢাকা থেকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। [৫]

১৪ মার্চ

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগকে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পিপিপি-কে অর্থাৎ দুই পাকিস্তানে দুই দলকে ক্ষমতা দেওয়ার ফর্মুলা প্রদান করেন। মুসলিম লীগের আব্দুল কাইয়ুম ছাড়া তৎকালীন পাকিস্তানের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

অসহযোগ আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমা শিল্পপতিরা বঙ্গবন্ধুর চার দফা মেনে নেওয়ার জন্য সামরিক সরকারের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। [৫]

১৫ মার্চ

শুধুমাত্র সেনাবাহিনী ছাড়া সর্ব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে এদিন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। তার সফরসূচিতে ছিল গোপনীয়তা। সাংবাদিকদের সাথে বিমানবন্দরে কোন কথা বলেননি।

ভুট্টোর দুই পাকিস্তানের দুই দলকে ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তার এই সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। [৫]

১৬ মার্চ

বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। স্থানীয় নেতাদের সাথে আলোচনা করে তিনি প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। বৈঠকে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু সামনে কালো পতাকা লাগানো এবং উইন্ডো শিল্ডে বাংলাদেশের মানচিত্র রাখা একটি সাদা গাড়িতে চড়ে যান।

এদিন নিউজউইক পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। [৫]

১৭ মার্চ

এদিন বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আলোচনা চলে। তবে এই আলোচনা সম্পর্কে সামরিক সরকার বা আওয়ামী লীগ– কোনপক্ষই বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেনি।

এদিন চট্টগ্রামের এক জনসভায় ন্যাপ-এর সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে সেই দিনটিকে ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস’ হিসেবে পালনের আহবান করেন।

১ মার্চ থেকে চলমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য সরকার পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। [১]

১৮ মার্চ

এদিন বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে কোনো বৈঠক হয়নি।

পূর্বোক্ত তদন্ত কমিটিকে আওয়ামী লীগ এদিন প্রত্যাখ্যান করে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবিদুর রেজা এবং ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর সমন্বয়ে অন্য একটি ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। [১]

১৯ মার্চ

বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফায় বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়ছিল, পরদিন বঙ্গবন্ধু এবং ইয়াহিয়া খান দুজনই তাদের উপদেষ্টাসহ আলোচনা করবেন। তাই এদিন আলাদা-আলাদা ভাবে উপদেষ্টামন্ডলীর মধ্যে বৈঠক হয়। ইয়াহিয়া খানের পক্ষে কর্নেল হাসান, লে. জেনারেল পীরজাদা ও এ আর কার্নেলিয়াস এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে তাজউদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন এবং , সৈয়দ নজরুল ইসলাম অংশ নেন। এদিন তারা পরদিনের আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বৈঠক করেন। কিন্তু আলোচনা চলাকালে রংপুর, সৈয়দপুর এবং জয়দেবপুরে পাকবাহিনী জনতার উপর গুলি চলায়। জয়দেবপুরে বাঙালিরা পাকবাহিনীর প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। [১]

২০ মার্চ

বঙ্গবন্ধু এদিন আওয়ামী লীগের ৬ জন প্রতিনিধি (শীর্ষস্থানীয় নেতা) সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন, এম. মনসুর আলীএ এইচ এম কামারুজ্জামানকে নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন লে. জেনারেল পীরজাদা, এ আর কার্নেলিয়াস, ও কর্নেল হাসান। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে দুবার বৈঠক হয়।

বৈঠকের পর বঙ্গবন্ধু আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির কথা জানান। এছাড়াও তিনি জানান যে তিনি এবং তার উপদেষ্টারা পরদিন প্রেসিডেন্ট এবং তার উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠক করবেন।

এদিন সরকার দেশের সব বেসামরিক জনগণকে তাদের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিকটস্থ থানায় জমা দিতে বলেন।

২১ মার্চ

এদিন বঙ্গবন্ধুইয়াহিয়া খানের মধ্যকার বৈঠকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুকে আলোচনায় সহায়তা করেন।

আলোচনায় যোগদান করতে এদিন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা ১২ জন উপদেষ্টা সহ ঢাকায় আসেন। মওলানা ভাসানী এদিন চট্টগ্রামে সবাইকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের যোগদানের আহ্বান করেন।

২২ মার্চ

মার্শাল ল' প্রত্যাহার না করলে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান না করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু অনমনীয় থাকায় এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধু, ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হয়। এছাড়াও এদিন ইয়াহিয়া খানের চারজন উপদেষ্টা এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির পাঁচ জন আইনবিদের মধ্যে আলোচনা হয়। আইনগত জটিলতার যুক্তি দিয়ে তারা অধিবেশনের আগেই মার্শাল ল' প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা দেয়ার তীব্র বিরোধিতা করে। এছাড়াও এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতাদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করেন।

২৩ মার্চ

এদিন দেশের সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। এদিন বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পতাকা উত্তোলন করেন।

দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রজাতন্ত্র দিবসের নির্ধারিত ভাষণ বাতিল করে দেন।

বঙ্গবন্ধুইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকে। তাদের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ছাড়াও আওয়ামী লীগ এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টাদের মধ্যেও আলাপ-আলোচনা হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা এদিন ৬ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রস্তাব পেশ করেন। এদিন সন্ধ্যায় শাসনতন্ত্রের অর্থনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে পুনরায় আলোচনা হয়। [১]

২৪ মার্চ

২৩ তারিখে প্রস্তাবিত খসড়া শাসনতন্ত্রের অর্থনৈতিক বিভাগ গুলো নিয়ে এদিন সকাল-সন্ধ্যা–দুইবার আওয়ামী লীগ এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং তার উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে আলোচনা হয়।

এদিন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা খসড়া শাসনতন্ত্রে ‘ফেডারেশন’-এর বদলে ‘কনফেডারেশন’ প্রস্তাব করে। কিন্তু এটি আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সরকার এর প্রতিবাদ করে।

এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বৈঠক হয় কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধু এদিন আন্দোলন আরো জোরদার করার পরামর্শ দেন। তাজউদ্দিন আহমেদ এদিন অতি শীঘ্রই প্রেসিডেন্টের ঘোষণার দাবি জানান। [১]

২৫ মার্চ

এদিন সোয়াত জাহাজ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র খালাসের সময় সাধারণ জনতা এতে বাধা দেয়। বাধা এড়াতে পাক বাহিনী গুলি চালায়। এরপরে সারাদেশে চরম বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ বা সান্ধ্য আইন জারি করা হয়।

জয়দেবপুর, রংপুর এবং সৈয়দপুরে সাধারন জনতার উপর পাকবাহিনীর গুলি চালানোর প্রতিবাদে এদিন আওয়ামী লীগ ২৭ মার্চ সারাদেশে হরতাল ডাকে। এদিন খসড়া শাসনতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে উত্থাপন করার কথা থাকলেও সেই বৈঠক হয়নি। এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। [১]

পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা এবং চলমান অসহযোগ আন্দোলন থামাতে এদিন টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী এবং খাদিম হুসেন রাজার[৭] নেতৃত্বে মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. এ.টি.এম যায়েদ হোসেন, আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। "অসহযোগ আন্দোলন ১৯৭১"bn.banglapedia.orgবাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০২০ 
  2. "Bangabandhu's clarion call"দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১০-০৩-২৫। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০২০ 
  3. সিরাজুল, ইসলাম। "নির্বাচন"bn.banglapedia.orgবাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০২০ 
  4. "অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা"albd.orgবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০২০ 
  5. "১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ"www.banglatribune.comবাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০২০ 
  6. "বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ"www.kalerkantho.comকালের কণ্ঠ। ২০ মার্চ ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২০ 
  7. মেজর রফিকুল ইসলাম,লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, p ৫৭, আইএসবিএন ৯৮৪-৪১২-০৩৩-০

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]